বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রেম-পাগলিনী/সপ্তম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

 পণে আসিয়া সৌভাগ্যক্রমে একখানা গাড়ী দেখিতে পাইলাম। বিনা বাক্যব্যয়ে আমরা উভয়ে তাহাতে আরোহণ করিলাম, পরে কোচমানকে কাঁকুড়গাছি যাইতে বলিয়া দিলাম।

 মানিকতলার গোল পার হইয়া গাড়ীখানি ক্রমাগত পূর্ব্বমুখে অন্ধকারময় পথ দিয়া যাইতে লাগিল এবং প্রায় এক ঘণ্টার পর একখানি প্রকাও বাগানের ফটকে আসিয়। থামিল। হোসেনআলি আমাকে সেই স্থানে অবতরণ করিতে অনুরোধ করিলেন এবং স্বয়ং ধীরে ধীরে সেই বাগানের ভিতর প্রবেশ করিলেন। আমিও গাড়ী হইতে সত্ত্বর অবতরণ করিয়া তাঁহার অনুসরণ করিলাম।

 কিছু দূর যাইলে পর একটী আলোক আমার দৃষ্টিগোচর হইল। আমরা অন্ধকারময় পথের উপর দিয়া সেই আলোক লক্ষ্য করতঃ গমন করিতে লাগিলাম।

 যখন সেই আলোকের নিকটবর্ত্তী হইলাম, তখন দেখিলাম, বাগানের ভিতর একখানি ক্ষুদ্রকুটীর হইতেই ঐ আলোক বাহির হইতেছিল। তখন অতি সন্তর্পণে উভয়ে সেই কুটীরের দ্বারে উপস্থিত হইলাম। সৌভাগ্যক্রমে কুটীরের সেই দিকে একটী ক্ষুদ্র জানালা খোলা ছিল আমি সেই জানালার নিকট দাঁড়াইয়া উঁকি মারিয়া ভিতরে দেখিলাম। যাহা আমার দৃষ্টিগোচর হইল, তাহাতে মাল্‌কাই যে মহম্মদকে খুন করিয়াছে তাহা স্পষ্টই বুঝিতে পারিলাম; এবং আর সেখানে অপেক্ষা না করিয়া হোসেনআলিকে তথায় রাখিয়া আমি একাই ভিতর প্রবেশ করিলাম।

 ভিতরে চাহিয়া দেখিলাম, মাল্‌কা একজন অপর পুরুষের সহিত কথা কহিতেছে। মালকা যদিও অনেকবার আমাকে দেখিয়াছিল, তত্রাপি ছদ্মবেশে ছিলাম বলিয়া সে তখন আমাকে চিনিতে পারিল না, কিন্তু আমি ও আত্ম পরিচয় না দিয়া থাকিতে পারিলাম না। অতি কর্কশস্বরে জিজ্ঞাসা করিলাম, মাল্‌কা? তুমি এই রাত্রে এখানে কেন?

 আমার চীৎকার ধ্বনি শুনিয়া হোসেনআলি বেগে সেই গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং সত্যই সত্যই মালকাকে দেখিয়া বলিয়া উঠিলেন, কি সর্ব্বনাশ! এই রাত্রে এতদূরে আসিয়া কি কার্য্য করিতেছ? কাল তোমার স্বামীর সহসা মৃত্যু হইল, আর আজ কি না এই রাত্রিকালে স্বচ্ছন্দে এতদূরে আসিয়া একজন পরপুরুষের সহিত হাস্য পরিহাস করিতেছ? এই জন্যেই বুঝি তুমি আমাকে বিবাহ করিতে চাহিয়াছিলে? এখন তোমাদের সমস্ত ব্যাপার বুঝতে পারিয়াছি।”

 মাল্‌কা কোন উত্তর করিল না। স্থানে দাঁড়াইয়া রহিল। সে অবনতমস্তকে সেই তখন আমি সেই যুবককে জিজ্ঞাস! করিলাম, “তোমার নাম কি বাপু? এই কুটীরখানি কাহার?”

 যুবককে বলবান বলিয়া বোধ হইল। কিন্তু আমার কর্কশ কথায় সে কোন উচ্চবাচ্য করিল না। অতি ধীরে ধীরে বলিল, “আমার নাম আব্বাসআলি আমি মহম্মদের একজন কারিকর। এই কুটীরে আমি বাস করি।”

 আ। এ বাগান কার?

 আব্বাস। মহম্মদেরই জমা আছে। এই বাগানেই আতসরাজী প্রস্তুত হইত।

 আ। এখানে কেন? নাই।

 আব্বাস। সহরের ভিতর আতসবাজী প্রস্তুত করিবার হুকুম

 আমি যদিও সে কথা জানিতাম, তথাপি বলিলাম, “সত্য না কি?”

 আব্বাস। আজ্ঞে হাঁ।

 আ। এখন বল দেখি, মালকার সহিত গোপনে কি পরামর্শ করিতেছ? কোন কথা গোপন করিও না—আমি বাহিরে দাঁড়াইয়া তোমাদের সকল কথাই শুনিয়াছি।

 এই কথা আমার মুখ হইতে বহির্গত হইবামাত্র মাল্‌কা আমার দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিল। পরে আমার পঙ্গুতলে পড়িয়া, দুইহস্তে আমার পদদ্বয় জড়াইয়া বলিল, “এ যাত্রা আমায় রক্ষা করুন। আপনারা যে সন্ধান করিয়া এতদূর আসিবেন, তাহা আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই।”

 আমি রাগান্বিত হইয়া অতি কর্কশভাবে পুনরায় বলিলাম, “রক্ষার কথা এখন ছাড়িয়া দাও। যদি মঙ্গল চাও, পরিষ্কার করিয়া সকল কথা বল। সেঁকো বিষ কোথায় পাইলে?”

 মালকা প্রথমে কিছুতেই স্বীকার করিল না, অবশেষে অনেক ভয় দেখাইবার পর বলিল, “এই আব্বাসই আমাকে বিষ দিয়াছিল এবং ইহারই পরামর্শে আমি জলের সহিত সেই বিষ মিশাইয়া আমার স্বামীকে পান করিতে দিয়াছিলাম।”

 আব্বাসকে কোন কথা জিজ্ঞাসা করিতে হইল না। সে মাল্‌কার সকল কথাই স্বীকার করিল। পরে বলিল, “কখন কখনও উৎকৃষ্ট রংমশাল প্রস্তুত করিবার জন্য সেঁকো বিষের আবশ্যক হয়, মহম্মদের নিকট ঐ বিষ থাকিত। আমি তাহার কিয়দংশ একদিন চুরি করিয়াছিলাম। তাহার পর মাল্‌কার দুঃখে দুঃখিত হইয়া তাহাকে ঐ পরামর্শ দিয়াছিলাম।”

 আমি আশ্চর্যান্বিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “মাল্‌কার দুঃখ কি?”

 আব্বাসআলি বলিল, “বৃদ্ধের স্ত্রী বলিয়াই মাল্‌কার দুঃখ।”

 আ। তোমার সহিত মাল্‌কার সম্বন্ধ কি?

 আব্বাস। কিছুই নয়। আমি তাহার স্বামীর চাকর এই সম্বন্ধ।

 আ। আর কিছুই নয়। তোমাদের ভিতর কি গুপ্ত প্রণয় নাই? মাল্‌কা বড় সামান্যা স্ত্রীলোক নয়। মহম্মদের মৃত্যুর পর সে হোসেনকে বিবাহ করিবে বলিয়াছিল। কিন্তু ভিতরে ভিতরে আবার তোমার সহিতও গুপ্তপ্রেমে মগ্ন ছিল।”

 এই বলিয়া আমি পুনরায় মাল্‌কার দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “মহম্মদকে তবে তুমিই বিষ মিশ্রিত জল পান করিতে দিয়া ছিলে?”

 মাল্‌কা যখন দেখিল যে, আমি সকল কথাই জানিতে পারিয়াছি, তখন সে আর কোন কথা লুকাইতে চেষ্টা করিল না। সে স্পষ্ট করিরা বলিল, “হাঁ - আমিই দিয়াছিলাম, এখন আর আমার যন্ত্রণা সহ্য হইতেছে না। আপনারা আমার ফাঁসি দিন।”

 আর ক্ষণকাল বিলম্ব না করিয়া তখনই মালকা, আব্বাসআলি ও হোসেনআলিকে লইয়া রাত্রি প্রায় দশটার সময় থানায় আসিয়া উপস্থিত হইলাম।

 সময়মত এই মোকদ্দমার বিচার হইয়া গেল। বিচারে মালকা ও আব্বাসআলি উপযুক্ত দণ্ডে দণ্ডিত হইল।

সমাপ্ত।




কার্ত্তিক মাসের সংখ্যা

“মরণে মুক্তি”

যন্ত্রস্থ।