ফোকলা দিগম্বর

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
 

ফোকলা দিগম্বর

 
প্ৰথম ভাগ

প্ৰথম পরিচ্ছেদ বাঙ্গালী বালিকা “এই বাটীতে ডাক্তারবাবু আছেন?” বাহির হইতে কে একজন এই কথা জিজ্ঞাসা করিল। “এ বাড়ীতে ডাক্তার আছেন?” আগ্রহের সহিত পুনরায় কে এই কথা জিজ্ঞাসিল। বামা-কণ্ঠ বলিয়া বোধ হইল। রাত্রি তখন প্রায় দশটা বাজিয়াছে। আমার আহারের স্থান হইয়াছে। আমি আহার করিতে যাইতেছি। কে এই কথা জিজ্ঞাসা করিতেছে, তাহ দেখিবার লণ্ঠনটি হাতে লইয়া, আমি বাহিরে আসিলাম। দ্বারের নিকট যাই গিয়া উপস্থিত হইয়াছি, আর পুনরায় সেই স্বর অতি আগ্রহসহকারে আমাকে জিজ্ঞাসা করিল,-“ ཝུ་རྒྱུ་ནི་མི་ কি ডাক্তার?” লণ্ঠনটি আমি তুলিয়া ধরিলাম। ত র সহায়তায় দেখিতে পাইলাম যে, একটি স্ত্রীলোক এই কথা জিজ্ঞাসা । স্ত্রীলোক বটে; কিন্তু বয়স্থা নহে। পূর্ণ যুবতীও তাহাকে বলিতে পারি না; কারণ, বয়স ত্রয়োদশ কি চতুৰ্দশ বৎসরের অধিক হইবে না। আমি বিস্মিত হইলাম। একে স্থান কাশী, তাহাতে রাত্রিকাল। রাত্রি দশটার সময় এরূপ অল্পবয়স্ক বাঙ্গালীর মেয়ে ঘর হইতে বাহির হইয়াছে কেন? বালিকা কি হতভাগিনী?— জঘন্য ব্যবসায়-অবলীম্বনী? এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে অন্যমনস্কভাবে আমি উত্তর করিলাম,-“তুমি বোধ হয়, রামকমল ডাক্তারকে খুঁজিতেছি? এ বাড়ী তাঁহার নহে। আরও একটু আগে গিয়া বামদিকে যাইবে; সেই আমার এই কথা শুনিয়া বালিকাটি কীদিয়া ফেলিল। চক্ষুর জল মুছিতে মুছিতে সে বলিতে লাগিল,— “ও মা! তবে আমি কি করি? রামকমল ডাক্তার রামনগর গিয়াছেন। আজ তিনি ফিরিয়া আসিবেন না। আমি তাঁহার বাড়ীতে গিয়াছিলাম। তাঁহার চাকরেরা আমাকে এই কথা বলিল। তাহারা আমাকে বলিয়া দিল যে, এই বাড়ীতেও একজন ডাক্তার সম্প্রতি কলিকাতা হইতে আসিয়াছেন, তাই আমি এখানে আসিয়াছি। ও মা, তবে কি হইবে? বিনা চিকিৎসায় বাবু হয়ত মারা পড়িবেন, তাহা হইলে আমার দশা কি হইবে?” বিদেশে সেই রাত্ৰিতে সেই বাঙ্গালী-কন্যার খেদ শুনিয়া মনে আমার বড় দুঃখ হইল। ফোকুলা দিগম্বর &Svo sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro কুচরিত্রা স্ত্রীলোক বলিয়া পূৰ্ব্বে যে সন্দেহ হইয়াছিল, তাহার কথা শুনিয়া এক্ষণে সে সন্দেহ অনেকটা দূর হইল। এতক্ষণ পৰ্যন্ত তাহার মুখশ্ৰী আমি নিরীক্ষণ করিয়া দেখি নাই। আমার খাবার প্রস্তুত ছিল; দুই-চারি কথায় তাহাকে বিদায় করিয়া দিব, কেবল এই ইচ্ছা! করিতেছিলাম । এক্ষণে লণ্ঠনটি পুনরায় তুলিয়া ধরিলাম। লণ্ঠনের আলোকে পূৰ্ব্বাপেক্ষা উজ্জ্বলভাবে বালিকার মুখের উপর পড়িল। বালিকার রূপ ও ভাবভঙ্গি দেখিয়া আমি চমকিত হইলাম। পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি যে, তাহার বয়স ত্রয়োদশ কি চতুৰ্দশ বৎসর। একখানি সামান্য সাদা কালাপেড়ে কাপড় সে পরিধান করিয়াছিল। কাপড়খানি সামান্য বটে; কিন্তু পরিষ্কার ছিল। তাহাতে পাছা ছিল না। কাপড়ের ভিতর শেমিজ ছিল; কিন্তু গায়ে জ্যাকেট কিংবা অন্য কোনপ্রকার জামা ছিল না। বালিকার দুই হাতে দুইগাছি সোনার বালা ছিল। কানে দুইটি ইয়ারিং ছিল। শরীরের অন্য কোন স্থানে কোনরূপ গহনা ছিল না। মস্তকের অৰ্দ্ধেকভাগ সেই কালাপেড়ে শাড়ী দ্বারা আবৃত ছিল। ঝিউড়ি মেয়ে ঘর হইতে বাহির হইলে যেরূপ লজ্জা করা উচিত বোধ করে, অথচ লজ্জা করিতে তাহার লজ্জা হয়, মস্তকের অৰ্দ্ধভাগ কাপড় দ্বারা আবরণে যেন সেইরূপ ভাব ঠিক প্ৰকাশ পাইতেছিল। বালিকার হইয়া সেই কাপড়ের আবরণ যেন সকলকে বলিতেছিল,-“লজ্জা করা আমার উচিত বটে; কিন্তু লজ্জা করিতে এখনও আমি শিক্ষা করি নাই, সেজন্য তোমরা সকলে আমার নিন্দা করিও না।” বালিকা সেদিন বোধ হয় চুল বঁধে নাই। সে নিমিত্ত কোঁকড়া কোঁকড়া কেশরাশি খোলো হইয়া, তাহার কাধের মানুষের চক্ষু কৃষ্ণবর্ণ হইয়া থাকে; কিন্তু র বিষয় এই যে, এ বালিকার তাহা নহে। ইহার চক্ষুর কিরূপ বর্ণ, তাহা আমি ঠিক রয়া বলিতে পারি না। নীলবৰ্ণ সাগরজলে সূৰ্যকিরণ মিশ্ৰিত করিলে যেরূপ এক নূতন প্রকার বর্ণের সৃষ্টি হয়, বালিকার চক্ষুতারা দুইটি সেইরূপ এক অদ্ভুত নূতন বর্ণেরঞ্জিত ছিল। আমার এত বয়স হইল, এরূপ চক্ষু কখন কাহারও দেখি নাই। চক্ষুর পাতাগুলি দীর্ঘ, নিবিড় ও ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। ভ্রযুগলও সেইরূপ; কিন্তু অধিক ঘন বা স্কুল নহে। ফল কথা, বালিকা বিলক্ষণ সুন্দরী। কথাবাৰ্ত্তা ও ভাবভঙ্গি দেখিয়া তাহাকে ভদ্রকন্যা বলিয়া বোধ হইল। পাপ, কপটতা বা কুচিন্তা কখনও যে তাহার মনে উদয় হয় নাই, তাহাও সেই ভাবভঙ্গিতে প্ৰকাশ পাইতেছিল। সত্য, সরলতা, সাধুতা ও শিশুভাব যেন তাহার মুখশ্ৰীতে দেদীপ্যমান ছিল। এই অপূৰ্ব্ব রূপ, এই সরল ভাব দেখিয়া কে না বশ হইয়া পড়ে? তাহার উপর, যখন সেই বিমল মুখজ্যোতিঃ মনোদুঃখে মলিনতায় আচ্ছাদিত হয়, যখন সেই সূৰ্যকিরণমিশ্ৰিত সগরজল-গঠিত চক্ষু দুইটি হইতে অশ্রবারি বিগলিত হয়, তখন সেই বালিকার দুঃখনিবারণের নিমিত্ত লোকে কি না করিতে পারে? ক্ষুধা-তৃষ্ণা আমি সব ভুলিয়া গেলাম। আমার অন্ন প্ৰস্তৃত; তাহা পড়িয়া রহিল। SS8 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com"ির্ড”******** দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ আমি বড় বোকা বালিকার রূপ, বালিকার দুঃখ দেখিয়া আমি মুগ্ধ হইলাম। আমি বলিলাম,- “রামকমলবাবু যখন বাড়ী নাই, তখন আমাকে যাইতে হইবে। আমি একজন ডাক্তার বটে; কিন্তু এ স্থানে আমি ডাক্তারি করি না। কলিকাতা হইতে কেবল দুইদিন আমি এ স্থানে আসিয়াছি।” বালিকা চক্ষু মুছিয়া কাতরস্বরে বলিল,— “ও মহাশয়! তবে আসুন, তবে শীঘ্ৰ আসুন; বিলম্ব করিলে তিনি মারা পড়িবেন; বিলম্ব করিবেন না, শ্ৰীঘ্ৰ আসুন।” বালিকার জুলুম দেখিয়া মনে মনে আমি একটু হাসিলাম। কিন্তু যাহার এরূপ দেবদুর্লভ সৌন্দৰ্য্য, পৃথিবীতে সে জুলুম করিবে না ত' আর করিবে কে? আমি ত’ আমি, পৃথিবীর সকল লোককেই সেই অলৌকিক রূপলাবণ্যবিশিষ্ট বালিকার হুকুম “যে আজ্ঞা” বলিয়া মানিতে হয়! অতি নম্রভাবে আমি বলিলাম,- “না, আমি বিলম্ব করিব না, শীঘ্য চাদরখানা লইয়া আসি।” তখন আমি ব্ৰহ্মদেশে কৰ্ম্ম করিতাম । ছুটি লইয়া দেশে আসিয়াছিলাম। আমার পিতামহী। কাশীবাসিনী হইয়াছিলেন। দুই-চারি দিনের নিমিত্ত তাঁহাকে দেখিতে আসিয়াছিলাম। এক বৃদ্ধ চাকর ব্যতীত অন্য কাহাকেও আমি সঙ্গে আনি নাই। আমি মনে করিলাম যে বালিকার বাটী নিকটেই হইবে। সেজন্য গাড়ী আনিবার নিমিত্ত চেষ্টা করিলাম না। চাদরখানি গায়ে দিয়া আমার ডাক্তারি ব্যাগটি ও লণ্ঠনটি নিজেই হাতে করিয়া মন্ত্র হইতে বাহির হইলাম। রাত্রিকালে আমার সে বৃদ্ধ চাকরকে সঙ্গে লইতে ইচ্ছা করিল্যাম/না। বালিকা দ্রুতবেগে আগে আগে তৈ লাগিলাম। তাহার বয়স অল্প; সে প্রায় ছুটিয়া যাইতে লাগিল। আমি যদিও ঠিকুবুন্টুর্নই, তথাপি আমার বয়ঃক্রম তখন পঞ্চাশের স্বাসৱেষ্ট্র হইবার উপক্রম হইল। তাহাতে একহাতে ব্যাগ, লিইয়া যাইতে আমার কষ্টবোধ হইতে লাগিল। তখন আমি বালিকাকে বলিলাম,- “একটু ধীরে ধীরে চল; অতি দ্রুত আমি যাইতে পারিব না।” বালিকা তখন আমার দিকে চাহিয়া দেখিল। আমি যে বালক নই, কি যুবা নাই, আমি যে বৃদ্ধ, বালিকা তখন প্রথম যেন তাহা বুঝিতে পারিল। কিন্তু অপ্রতিভ হইয়া সে আমার হাত হইতে লণ্ঠনটি কাড়িয়া লইল ও ব্যাগটি লাইতেও হাত বাড়াইল। তাহাকে আমি ব্যাগ লইতে দিলাম না। তখন হইতে বালিকা একটু ধীরে ধীরে চলিতে লাগিল। এতক্ষণ পৰ্যন্ত কোন কথাই আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিতে পারি নাই। অবসর পাইয়া এইবার আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “কাহার পীড়া হইয়াছে? কি হইয়াছে?” বালিকা উত্তর করিল,- “বাবু বড় পড়িয়া গিয়াছেন; বড় লাগিয়াছে, বড় রক্ত পড়িতেছে।” “বাবু” অর্থে অনুমানে স্বামী বলিয়া বুঝিলাম। কিন্তু এরূপ বিপদের সময় বালিকা পাছে লজ্জা পায়, সে নিমিত্ত বিশেষ করিয়া আর সে কথা জিজ্ঞাসা করিলাম না। “বাবু” অর্থে না হয় স্বামী হইল; কিন্তু ভদ্রঘরের বাঙ্গালী-কন্যা এত রাত্ৰিতে ঘর হইতে একলা ডাক্তার ডাকিতে কেন বাহির হইয়াছে? তাহার বাড়ীর অন্য কোন লোক আসে নাই কেন? অথবা চাকর-বাকর কেহ আসে নাই কেন? ইহার মৰ্ম্ম আমি কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। অবশেষে আমি মনে মনে ভাবিলাম,- “আমি ডাক্তার মানুষ, লোকের রোগ দূর করা, লোকের শারীরিক যাতনা নিবারণ করা আমার কাজ। আমরা সাধু জানি না, পাপী জানি না; —রোগের চিকিৎসা লইয়া আমাদের ফোকুলা দিগম্বর S6 sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro SR কথা । লোকের ঘর-সংসারের কথায় আমার প্রয়োজন কি? সে সকল কথা বালিকাকে আমি কিছুমাত্র জিজ্ঞাসা করিব না।” ” এইরূপ ভাবিয়া আমি তাহাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলাম,- “তোমার বাবু কখন পড়িয়া গিয়াছেন? কোথায় লাগিয়াছে? তাহার জ্ঞান আছে, না। তিনি অজ্ঞান হইয়া গিয়াছেন?” বালিকা একেবারে সকল কথার উত্তর দিল না; ক্ৰমে ক্রমে একটি একটি করিয়া বলিতে লাগিল,- “আজ প্ৰাতঃকালে বেড়াইতে গিয়াছিলেন। ফিরিয়া আসিলেন। দাঁড়াইতে পারেন না। কথা কহিতে পারেন না। আমি তাহাকে বিছানায় শয়ন করিতে বলিলাম। প্রথম সে কথা তিনি শুনিলেন না। তাহার পর শুইয়া পড়িলেন। চাদর ছিাড়িয়া কাঁধে বাধিয়াছিলেন!! তাহার ভিতর হইতে ক্রমাগত রক্ত পড়িতেছিল। আমি ডাক্তার আনিতে চাহিলাম। তিনি মানা করিলেন। সমস্ত দিন রক্ত পড়িল। মুখ তাহার সাদা হইয়া গেল। দুৰ্ব্বল হইয়া পড়িলেন। তাহার পর এখন তিনি নিজেই ডাক্তার আনিতে বলিলেন। ডাক্তার আনিবার নিমিত্ত সমস্ত দিন আমি কতবার বলিয়াছিলাম, তখন তিনি আনিতে দেন নাই। এখন ডাক্তারের জন্য নিজেই ব্যস্ত হইয়াছেন। কি যে কপালে আছে, তা বলিতে পারি না। আমি এখানে আর কখন আসি নাই। কাহাকেও আমি জানি না। লোককে জিজ্ঞাসা করিতে করিতে রামকমল ডাক্তারের বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইয়াছিলাম। রামকমল ডাক্তার বাড়ী নাই। তাঁহার চাকরেরা আপনার ঠিকানা বলিয়া দিল। সেজন্য আপনার নিকট দীেড়াইয়া গেলাম।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,— “তোমরা এ স্থানে থাক না? কাশীতে তোমরা কবে আসিয়াছি। এ স্থানে কাহাকেও আমরা জানৃিত্যু ইস্!! করিলাম কি? আমরা কে, কোথা হইতে ক্টরিয়াছেন। পাছে কেহ কোন কথা জিজ্ঞাসা করে, রন নাই। আমি বড় বোকা, তাই এত কথা বলিয়া আমার মনে পুনরায় ঘোরতর সন্দেহ হইল,— কাশী স্থান! কুকৰ্ম্মান্বিত লোক দেশ হইতে পলায়ন করিয়া এইস্থানে আশ্ৰয় লাভ করে, এ বালিকাও সেইরূপ না কি? আহা, তাহা হইলে কি দুঃখের বিষয়! বালিকার প্রতি আমার মন এত আকৃষ্ট হইয়াছিল যে, সেই কথা ভাবিয়া আমি ঘোর শোকাকুল হইয়া পড়িলাম। আবার ভাবিলাম, না, না, তাহা কখনই হইতে পারে না। লজ্জাশীলতা, কোমলতা, পতিব্ৰত সতী-সাবিত্রী ভাব বালিকার মুখশ্ৰীতে যেন অঙ্কিত রহিয়াছে। এরূপ লক্ষ্মীস্বরূপা কন্যা দুষ্কৰ্ম্মান্বিতা হইতে পারে না। ইহারা কে, কি বৃত্তান্ত,~~– সে সমুদয় গোপন রাখিবার বোধ হয় কোন কারণ আছে। . , ŽIJÚCassaggi gbajɔ SS af :Iist ~itë 3 q<; &&! a www.amarboi.comi“ 82द তৃতীয় পরিচ্ছেদ এখন লজা করিতে পারি না। আমি এইরূপ ভাবিতেছি, এমন সময় বালিকা পুনরায় বলিল,— “বাবু কে, কোথা হইতে আসিয়াছেন, সেসব তাঁহাকে আপনি জিজ্ঞাসা করিবেন না। পাছে সেসব কথা কেহ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করে, সেই ভয়ে তিনি এতক্ষণ ডাক্তার আনিতে দেন নাই। বাবু গোপনে আমাকে বিবাহ করিয়াছেন। আমার মেসো মহাশয় ও মাসী তাহার সহিত আমার বিবাহ দিয়াছেন। বাবুর পিতা জানিতে পারিলে বড়ই রাগ করিবেন; সেই জন্য এখন তিনি একথা গোপন রাখিতেছেন । এইবার পাশ দিয়া বাবু দেশে গিয়া, তাহার পিতাকে সকল কথা বলিবেন। তখন আর কোন কথা গোপন করিতে হইবে না! ঐ যা! পুনরায় অনেক কথা বলিয়া ফেলিলাম; কে জানে, লোকে কি করিয়া মনে কথা রাখে, আমি ত’ তা পারি না!” কথা গোপন রাখিবার ভাব দেখিয়া আমি মনে মনে একটু হাসিলাম। যাহা হউক, বালিকা যে স্বামীর সহিত কাশী আসিয়াছে, ইহার ভিতর যে কোন মন্দ বিষয় নাই, এই কথা শুনিয়া আমি আনন্দিত হইলাম। এই অল্পক্ষণের মধ্যেই সেই বালিকার প্রতি আমার মনে একপ্রকার স্নেহের উদয় হইয়াছিল । বালিকা পুনরায় বলিল,— “বাবু বড়ই দুৰ্ব্বল । মুখে যেন আর কিছুমাত্র রক্ত নাই। মুখ এমনই সাদা হইয়া গিয়াছে। আমার কপূল্লে/যে কি আছে, তা জানি না। আমাদের নূতন বিবাহ হইয়াছে। আমার লজ্জা করা উছিষ্ট কিন্তু এই বিদেশে আমাদের কেউ নাই। তাহার উপর এই ঘোর বিপদ! এ বিপূৰ্দ্ধসময় আমি লজ্জা করিতে পারি না; তাহাতে আমাকে যে যাই বলুক।” (సా এই কথা বলিয়া বালিকা যেন ঈষ্ট এইরূপ অৰ্থ- “তুমি আমাকে বেহায়া ভাবিতেছ! এখন আমার বাবুর প্রাণ লইয়। টানাটানি! তোমার ইচ্ছা যে, এখন আমি একহাত ঘোমটা দিয়া বসিয়া থাকি! বাটে ! বালিকা অবশ্য এরূপ কোন কথা প্ৰকাশ করিয়া বলে নাই। মনে মনে তাহার এরূপ চিন্তা উদয় হইয়াছিল কি না, তাহাও আমি জানি না। প্রকৃত সে কোপাবিষ্টভাবে আমার প্রতি চাহিয়াছিল কি না, তাহাও আমি ঠিক বলিতে পারি না; কিন্তু এই অল্পক্ষণের মধ্যেই তাহার উপর আমার এরূপ বাৎসল্যভাবের উদয় হইয়াছিল যে, পাছে সে রাগ করে- আমার মনে সেই ভয় হইল। আমি যেন কত দোষ করিয়াছি, আমি যেন কত অপরাধে অপরাধী হইয়াছি,-সেইরূপ অতি বিনীতভাবে আমি বলিলাম,- “না, তোমাকে আমি বেহায়া ভাবি নাই। বরং এই বিপদের সময় এত রাত্রিতে অপরিচিত স্থানে তুমি যে সাহস করিয়া ঘর হইতে বাহির হইতে পারিয়াছ, তাহার জন্য তোমার আমি প্রশংসা করি।” বালিকা বলিল,— “বিপদের সময় লোকের ভয় থাকে না। তাছাড়া আমি পল্লীগ্রামের মেয়ে। যখন আমি বালিকা ছিলাম, তখন মাঠে-মাঠে আমরা কত বেড়াইতাম। ঐ যা! আবার একটা কথা বলিয়া ফেলিলাম। দূর ছাই! কত সাবধান হইব?” যাইতে যাইতে এইরূপ কথাবাৰ্ত্ত হইতে লাগিল বটে, কিন্তু সেইসঙ্গে আমরা দুইজনই দ্রুতপদে পথ চলিতেছিলাম। পথ আর ফুরায় না। কিন্তু কতদূর যাইতে হইবে, সে কথা আমি ফোকুলা দিগম্বর SA sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro SR বাবু বলিল,- “কুসী! তুমি একবার ঘরের বাহিরে যাও। ডাক্তারবাবু আমার কাঁধ পরীক্ষা করিয়া দেখিবেন । রক্ত দেখিলে তোমার ভয় হইবে।” কুসী। উত্তর করিল,— “না। বাবু! তুমি আর যা বল, তাই করিব, তোমাকে একেলা ছাড়িয়া আমি এ ঘরের বাহিরে যাইব না ।” বাবু বলিল,- “আচ্ছা কুসী! তবে তুমি এককাজ করা, ঘরের ঐ কোণে দাঁড়াইয়া প্রাচীরের দিকে মুখ করিয়া থাকা; আমার দিকে চাহিও না। যদি আবশ্যক হয়, তাহা হইলে তোমাকে আমি ডাকিব ।” কুসী আস্তে আস্তে ঘরের কোণে গিয়া দাঁড়াইল। প্রাচীরের দিকে মুখ করিয়া রহিল। পঞ্চম পরিচ্ছেদ ঘোরতর সন্দেহ বাবু আপনার স্কন্ধের দিকে দৃষ্টি করিয়া, চক্ষু টিপিয়া আমার প্রতি ইসারা করিল। কিন্তু সে ইঙ্গিতের অর্থ কি, তাহা আমি বুঝিতে পারিলাম না। তাহার পর বাবু বলিল,— “আমি বড় পড়িয়া গিয়াছি। কাশীর ঘাট উচ্চ। সেই ঘাট হইতে গুড়িয়া গিয়াছি। নিম্নে একখণ্ড তীক্ষা প্রস্তর ছিল। আমার কাঁধে তাহা ফুটিয়া গিয়াছিল। ভূৰ্জক রক্ত পড়িয়াছে।” এই কথা বলিয়া তাহার গায়ে যে বিছানার ড্ৰেট, চাদরখানি ছিল, প্রথম সেই চাদরখানি বাবু খুলিয়া ফেলিল; তাহার পর স্কন্ধে আহতুৰ্থর্নৈ যে ছিন্ন চাদর বাধা ছিল, তাহাও খুলিয়া ফেলিল । আমি দেখিলাম যে, স্কন্ধে একটি টর্গোলাকার ছিদ্র হইয়াছে। প্রস্তরখণ্ড দ্বারা আহত হইলে সেরূপ ক্ষত হয় না; বন্দুক অথবা পিস্তলের গুলী লাগিলে যেরূপ গোলাকার ছিদ্র হয়, তাহাঁই হইয়াছিল। বাবু বলিল,— “সমস্ত দিন ইহা হইতে এরূপ রক্ত পড়ে না; অল্পক্ষিণ হইল, অধিক শোণিত স্রাব হইতেছে।” এই কথা বলিয়া বাবু পুনরায় চক্ষু টিপিয়া আমার প্রতি ইঙ্গিত করিল। এবার আমি তাহার অর্থ বুঝিলাম । পিস্তলের গুলী দ্বারা সে যে আহত হইয়াছিল, একথা সে বালিকার নিকট গোপন করিতেছিল। সেই কথা গোপন রাখিবার নিমিত্ত ইঙ্গিত দ্বারা আমাকে সে অনুরোধ করিতেছিল। বাবুর স্কন্ধে গুলীর দাগ দেখিয়া পুনরায় আমার বড় সন্দেহ হইল। এই বালিকা প্রকৃত কি ইহার স্ত্রী নহে? অন্য কাহারও স্ত্রী অথবা কাহারও কন্যাকে বাবু কি বাহির করিয়া আনিয়াছে? সে নিমিত্ত কন্যার স্বামী, পিতা, ভ্রাতা অথবা কোন আত্মীয় ইহাকে কি গুলী মারিয়াছে? আমার মনে ঘোরতর সন্দেহ উপস্থিত হইল। আমি ভাবিলাম,- “এই পাপিষ্ঠ নরাধাম লক্ষ্মীরূপা বালিকার ইহকাল পরকাল নষ্ট করিয়াছে। যাহারা ইহাকে গুলী করিয়াছিল, একবারে তাহারা ইহাকে বধ করে নাই কেন? আমি ইহার চিকিৎসা করিব না। রক্তস্রাব হইয়া এ মৃত্যুমুখে পতিত হউক। তাহার পর, বালিকাকে আমি তাহার পিতার নিকট পঠাইয়া দিব।” এইরূপ ভাবিতেছি, এমন সময় বাবুর মুখের দিকে আমার দৃষ্টি পড়িল। তাহার মুখে ভয় অথবা ফোকুলা দিগম্বর sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro RSd কুকৰ্ম্মজনিত লজ্জার চিহ্ন লেশমাত্র দেখিতে পাইলাম না। কুকৰ্ম্মান্বিত অপরাধীর মুখে এরূপ শান্তি বিরাজ করে না। বাবুর স্থির শান্ত মুখ দেখিয়া ও বালিকার কথা স্মরণ করিয়া আমার ক্ৰোধের কিছু উপশম হইল। ভালমন্দ আমি কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। কোনও কথা জিজ্ঞাসা করিতে বালিকা আমাকে নিষেধ করিয়াছিল। আমি ভাবিলাম,-“ইহাদের ভিতর কি ডাক্তারি করিয়া চলিয়া যাই।” এইরূপ ভাবিয়া আমি বলিলাম,- “গুরুতর আঘাত লাগিয়াছে বটে। সেটা— সেই বস্তুটা এখনও কি ইহার ভিতর আছে?” আমার প্রশ্নের মৰ্ম্ম এই যে, গুলীটা বাহির হইয়া গিয়াছে, না এখনও কন্ধের ভিতর আছে? বাবু উত্তর করিল,— “পাথরের টুকরা ভিতরে নাই, আমি নিজে তাহ বাহির করিয়া ফেলিয়াছি।” এই কথা বলিয়া বালিসের নীচে হইতে যুবক একটি গুলী বাহির করিয়া চুপিচুপি আমাকে দেখাইল । বন্দুক অথবা পিস্তলের গুলী মানুষের গায়ে লাগিলে এত শোণিতস্রাব হয় না। এত রক্ত কেন পড়িল, সেই কথা আমি ভাবিতেছিলাম। ক্ষতস্থানের প্রতি দৃষ্টি করিয়া দেখিতে পাইলাম যে, তাহার একপার্শ্বে কাটা দাগ রহিয়াছে। পরীক্ষা করিয়া দেখিলাম যে, গুলীর আঘাত হইতে অধিক শোণিতপাত হয় নাই; সেই কাৰ্ত্তিত স্থান হইতেই শোণিতধারা বহিতেছিল। বাবুকে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,-“এ কি? এ থা হইতে আসিল?” বাবু উত্তর করিল,-“ঐ দ্রব্যটা (অর্থাৎ গুস্ট্রষ্ঠ” আমার স্কন্ধের ভিতর রহিয়া গিয়াছিল, আমি আপনি ছুরি দিয়া কাটিয়া তাহাকে বৃষ্ট্রির করিয়াছি।” এই কথা বলিয়া বাবু হাসিয়া উঠিল। হাসি শেষ হইতে না হইতে সে হইয় পড়িল । নিজে ছুরি চালনা করিয়া, বাবু য় কাজ করিয়াছিল। কারণ, সেই ছুরির আঘাত হইতেই শোণিতস্রাব হইতেছিল; গুলীর আঘাত হইতে বড় নয়। ছুরি চালনার রক্তস্রাব হইতে বাবুর চাই কি মৃত্যু ঘটিতে পারিত। ষষ্ঠ পরিচ্ছদ বিপদের সম্ভাবনা আছে যাহা হউক, বাবুর মূৰ্ছিয় আমার পক্ষে সুবিধা হইল। মূৰ্ছিত অবস্থা না হইলে, আমি ক্ষতস্থান ভাল করিয়া পরীক্ষা করিতে পারিতাম না, অন্ততঃ রোগীর বড় যাতনা হইত। সেই মূৰ্ছিত অবস্থায় তাহাকে রাখিয়া, আমি রক্ত বন্ধ করিলাম ও আহত স্থান ভাল করিয়া ড্রেস করিলাম। পকেট-কেস, ছোট একশিশি ব্র্যাণ্ডি ও চারি-পাঁচটি নিতান্ত প্রয়োজনীয় ঔষধ আমার ব্যাগের ভিতর থাকে। যখন আমি বিদেশে গমন করি, তখন এই ব্যাগটি সৰ্ব্বদাই আমার কাছে রাখি। বাবুর মুখে একটু ব্র্যাণ্ডি দিয়া তাহার। আমি চৈতন্য উৎপাদন করিলাম। বাবু চক্ষু উমীলিত করিয়া বলিল,- “এ কি! আমি কোথায় আসিয়াছি? এ কাহাদের বাড়ী? RRo wifi Rist •ičxis gxis &g! ~ www.amarboi.comí°237”**°”°* কুসী! কুসী কোথায়?” এতক্ষণ ধরিয়া কুসী ঘরের কোণে দাড়াইয়াছিল। বাবু যে অজ্ঞান হইয়া গিয়াছিল, সে তাহার বিন্দুবিসর্গ জানিতে পারে নাই। কুসী বলিয়া বাবু যাই ডাকিল, আর সে বিছানার ধারে আসিয়া দাঁড়াইল । কুসী বলিল,- “কেন বাবু! আমাকে ডাকিলে কেন? তুমি কেমন আছ?” মৃদুস্বরে বাবু বলিল,- “এখন আমার সব মনে পড়িতেছে। আমি বুঝিয়াছি, আমি অনেক ভাল আছি, কুসী!” “আমি ভাল আছি” এই কথা বলিবার সময় বাবু আমার মুখপানে চাহিল। চক্ষু-পলকের সহায়তায় আমাকে যেন জিজ্ঞাসা করিল,- “সত্য সত্য কি আমি ভাল আছি? না কোন বিপদ তাহার মনের ভাব বুঝিয়া আমি বলিলাম,- “এ ঘা শীঘ্রই ভাল হইয়া যাইবে। ইহাতে কোন বিপদের আশঙ্কা নাই। তবে দিনকত তোমাকে স্থিরভাবে শয়ন করিয়া থাকিতে হইবে।” দুইজনেই বালক-বালিকা,-সকল বিষয়ে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ। এ স্থানে তাঁহাদের যে কেহ। আত্মীয়-স্বজন অথবা বন্ধু-বান্ধব নাই, বালিকার মুখে পূৰ্ব্বেই তাহা আমি শুনিয়াছিলাম। বালিকার উপর আমার স্নেহ পড়িয়াছিল; তাহার অনুরোধে বাবুর প্রতিও আমার ভালবাসা হইয়াছিল। বাবুর স্কন্ধে আঘাতটি গুরুতর:- যদিও মৃত্যু ঘটিবার সম্ভাবনা ছিল না। যাহা হউক, ইহাদের আত্মীয়-স্বজনের নিকট সংবাদ প্রেরণ করা । ইহারা প্রকৃত আমার দয়া ও স্নেহের পাত্র কি না, প্রথম তাহা আমাকে জানিতে এইরূপ মনে করিয়া আমি বাবুকে বললামুখ-পদেখ তােমাকে আমি একটা কথা বলি। তােমরা উভয়েই ভদ্রলোকের পুত্র-কন্যা বৃত্তিৰ্ভুক্ত? আমার বােধ হইতেছে। কিন্তু তােমরা যে অবস্থায় কাশীর বাহিরে এই বনের ভিতৰু রহিয়াছ, তাহা দেখিয়া আমার বড় সন্দেহ হইতেছে। ইহার ভিতর যদি কোন প্ৰািঞ্জ’থাকে, তাহা হইলে নিশ্চয় আমি তাহার প্রতিবিধান করিব । তোমাকে আমি হাসপাতালে য়া দিব। তারপর এই বালিকার পিতামাতার সন্ধান করিয়া তাহাদিগের নিকটে ইহাকে আমি পাঠাইয়া দিব।” সপ্তম পরিচ্ছেদ অভিভাবকের অভাব আমার এই কথা শুনিয়া, বালিকা মস্তক অবনত করিয়া ঈষৎ হাসিতে লাগিল। বাবু হাে হাে করিয়া উচ্চৈঃস্বরে হাসিয়া উঠিল। তাহার সে হাসি আর থামে না। আমার ভয় হইল, পুনরায় পাছে রক্তস্রাব আরম্ভ হয়। কিছু রাগত হইয়া আমি বলিলাম,- “হাসি-তামাসার কথা আমি কিছু বলি নাই। আমি তোমাদের পিতার বয়সের লোক, আমার কথায় এরূপ বিদ্রুপ করা তোমার উচিত নয়।” এই কথা বলিলাম বটে, কিন্তু কুসীর ভাব ও বাবুর হাসি দেখিয়া আমার নিশ্চয় প্রতীতি হইল যে, ইহাদের মধ্যে কোনপ্রকার পাপ নাই। ফোকুলা দিগম্বর sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro RS বাবু আমাকে বলিল,— “মহাশয়! এইরূপ কথা উঠিবে বলিয়াই আমি সমস্ত দিন ডাক্তার আনিতে দিই নাই। যাই হউক, আমি সত্য সত্য আপনাকে বলিতেছি যে, কুসী। আমার বিবাহিতা স্ত্রী। বাপ রে! আপনি যা মনে করিতেছেন, কুসী। যদি তা হইত, তাহা হইলে এ প্ৰাণ কি আমি রাখিতে পারিতাম? আমার কুসী পাপিনী! একথা ভাবিতে গেলেও আমার বুক ফাটিয়া যায়। ভিতরের কথা এই যে, পিতার অমতে আমি কুসীকে বিবাহ করিয়াছি; অর্থাৎ কি না, আমার পিতা এ কথার বিন্দুবিসর্গ জানেন না। আমার পিতা বড় দৃঢ়প্ৰতিজ্ঞ তেজস্বী ব্যক্তি। তাহাকে না বলিয়া আমি এই কাজ করিয়াছি। তিনি জানিতে পারিলে বোধ হয়, আমার বিশেষ ক্ষতি হইবে। আমাদের, অন্ততঃ আমার নিবাস বঙ্গদেশ। আমি কলেজে অধ্যয়ন করি! তিনি হয়ত আমার খরচপত্র বন্ধ করিয়া দিবেন। তখন আমি কি করিব? সেইজন্য মনে করিয়াছি যে, এবার বিএল পরীক্ষা দিয়া যখন দেশে যাইব, তখন পিতাকে সকল কথা বলিব। তখন পিতা বাড়ী হইতে দূর করিয়া দেন দিবেন। বি-এল পরীক্ষা দিতে পারিলে, ওকালতী করিয়া কি অন্য কাজ করিয়া কোনমতে কুসীকে প্রতিপালন করিতে পারিব। এক্ষণে আপনাকে মিনতি করি যে, আর অধিক কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করিবেন না। কি করিয়া আমি আঘাতপ্ৰাপ্ত হইয়াছি, তাহাও জিজ্ঞাসার প্রয়োজন নাই।” বাবুর এই সকল কথা শুনিয়া আমার সন্দেহ দূর হইল। কুসীকে একবার আমি বাহিরে যাইতে বলিলাম। কুসী অন্তরালে গমন করিলে, আমি বাবুকে পুনরায় বলিলাম,-“একে বিদেশ, তোমার এ স্থানে পরিচিত লোক কেহ নাই, তাহার উপর তুমি এইরূপ গুরুতর আহত হইয়াছ। যদিও সে ভয় নাই, তথাপি দৈবের কথা কিছুই বলিতে পারা যায় না। যদি - SS 2 JOŠ কি হইবে? এ অবস্থায় হয় তোমার ক তারযোগে সংবাদ প্রেরণ করা র তুমুৰ্ভুিভাবকবৰ্গকে সংবাদ দিতে পারি না। কেন পারি না, তাহা পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি। কুসীর অভিভাবক কেহ নাই; একমাত্র মেসোমহাশয় আছেন; তিনি শয্যাধরা পীড়িত। যদি আমার ভালমন্দ হয়, তাহা হইলে মহাশয় অনুগ্ৰহ করিয়া একখানি টিকিট কিনিয়া, স্ত্রীলোকের গাড়ীতে কসীকে বসাইয় দিবেন। কুসী দেশে চলিয়া যাইবে। কোথাকার টিকিট কিনিতে হইবে, কুসী। তখন আপনাকে বলিয়া দিবে। কিন্তু বিপদ ঘটিবার কোনরূপ সম্ভাবনা আছে কি?” আমি উত্তর করিলাম,-“না, সে ভয় নাই, এরূপ আঘাতে কোন ভয়ের কারণ নাই।” তাহার পর আমি বালিকাকে ডাকিয়া বলিলাম,-“তোমার স্বামী পীড়িত, এ অবস্থায় তোমার একেলা থাকা উচিত নয়; তোমার কাছে থাকে, এমন লোক এখানে কি কেহই नाई।" বালিকা উত্তর করিল,-“মালীর স্ত্রী আমাদের কাজকৰ্ম্ম করে; কিন্তু সে রাত্রিতে থাকে না। তাহার ছোট ছোট ছেলে-পিলে আছে; সন্ধ্যা হইলেই সে চলিয়া যায়।” আমি বলিলাম,-“আমার একজন বৃদ্ধ চাকর আছে। আমার নিকট সে অনেকদিন আছে; যদি বলা ত’ তাহাকে আমি পাঠাইয়া দিই; কিন্তু পথ চিনিয়া সে আসিবে কি করিয়া, আমি তাই ভাবিতেছি।” বাবু বলিল,—“রাত্ৰিতে এ স্থানে কেহ থাকে, তাহা কি নিতান্ত প্রয়োজন?” RSS দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.configািক্যনাথ রচনাসংখ্যাই আমি উত্তর করিলাম,-“নিতান্ত প্রয়োজন নয়, তবে এই অল্পবয়স্ক বালিকা একেলা থাকিবে, তাই বলিতেছি।” বাবু বলিল,-“তবে কাজ নাই, কাহাকেও পাঠাইতে হইবে না।” অষ্টম পরিচ্ছেদ আমি ঘোর অপরাধী আমি পুনরায় বলিলাম,-“আর একটি কথা আছে; রাত্রিতে যাহাতে ভালরূপ তোমার নিদ্রা হয়, আমি সেই প্রকার কোনরূপ ঔষধ তোমাকে দিব। কারণ, জুর যাহাতে না হয়, সে বিষয়ে সাবধান হইতে হইবে। আমার ব্যাগে সেরূপ ঔষধ নাই। কোন ডাক্তারখানায় গিয়া সে ঔষধ আনিতে হইবে। কে সে ঔষধ আনিবে? আমি নিজে না হয় ডাক্তারখানা হইতে ঔষধ লইলাম; কিন্তু কাহা দ্বারা পাঠাইয়া দিব? আমার চাকরকে দিয়া পাঠাইতে পারিতাম; কিন্তু সে পথ চিনিয়া আসিতে পরিবে না। আমরাও এখানে কেবল দুইদিন আসিয়াছি। আমার চাকর একে বৃদ্ধ, তাহাতে পথঘাট জানে না। এ রাত্রিকালে কিছুতেই সে এতদূর আসিতে পরিবে না।” এই কথা শুনিয়া কুসী বলিল,—“আপনার সঙ্গে হয়। যাই।” বাবু বলিল,-“তা কি কখন হয়? এত রায় তোমাকে আমি ততদূর পাঠাইতে পারি না। প্রাণের আশঙ্কা হইয়াছিল, তাই এক্সর পাঠাইয়াছিলাম! কাশী স্থান! এ রাত্রিতে আবার তোমাকে পাঠাইতে পারি না।” (পূৰ্হঃ কুসী। আমার পানে চাহিল। তাহার দোষ আমার, এইভাবে কুসী অ জুর আসে, তাহা হইলে কি হইবে?” কথাগুলিতে যেন আমার প্রতি ভৎসনার ভাব মিশ্রিত ছিল। কিন্তু কুসী। যাহা বলে, তাহাই মিষ্ট। কুসীর উপর রাগ করিবার যো নাই! ক্ষুধায় আমি প্ৰপীড়িত হইয়াছিলাম, রাত্রি অধিক হইয়াছিল। এক ক্রোশের অধিক পথ চলিয়া আমি শ্ৰান্ত হইয়াছিলাম। কিন্তু কুসীর কঁদ-কঁদ মুখ ও ছলছল চক্ষু দেখিয়া সেসব আমি ভুলিয়া যাইলাম। আমি বলিলাম,-“আচ্ছা, তবে আমিই না হয়। আর একবার আসিব । ডাক্তারখানা হইতে ঔষধ লইয়া, আমি নিজেই পুনরায় আসিব ।” বাবু বলিল,-“তা কি কখন হয়! অনুগ্রহ করিয়া আপনি যে একবার আসিলেন, তাহাই যথেষ্ট । পুনরায় আপনাকে আমি কষ্ট দিতে পারি না।” কুসী বলিল,—“ঔষধ না আনিলে চলিবে কেন? যদি তোমার জুর হয়, তখন কি হইবে?” কুসীর সকলতাতেই আব্দার। তাহার বাবুর অসুখ!—পৃথিবীশুদ্ধ লোকের বাবুর জন্য পরিশ্রম করা উচিত, কুসীর ইচ্ছা এইরূপ। যাহা হউক, ঔষধ লইয়া আমাকেই পুনরায় আসিতে হইবে, তাহাঁই স্থির হইল। আসিবার সময় বাবু আমার হাতে একখানি কুড়ি টাকার নোটি গুজিয়া দিল। বাবু বলিল-“এই রাত্ৰিতে আপনাকে বড় কষ্ট দিয়াছি। যাহা দিলাম, তাহা আপনার উপযুক্ত নহে। ফোকুলা দিগম্বর গুঞ্জ মৃদুত নয়নযুগল ছলছল করিয়া আসিল । যেন যত —“ঔষধ না খাইলে বাবুর যদি নিদ্ৰা না হয়! যদি w sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro &:: কিন্তু অধিক টাকা আমার সঙ্গে নাই, অনুগ্রহ করিয়া ইহাই গ্ৰহণ করুন।” আমি টাকা লইলাম না। আমি বলিলাম,-“ব্ৰহ্মদেশে আমি কৰ্ম্ম করি। সেই স্থানের আমি সরকারী ডাক্তার। সেস্থানে লোকের বাটী। গিয়া ভিজিট গ্রহণ করি সত্য; কিন্তু এ স্থানে আমি টাকা লইব না। ছুটি লইয়া আমি দেশে আসিয়াছিলাম। কাৰ্যোপলক্ষে অল্পদিনের নিমিত্ত কাশী আসিয়াছি। এ স্থানে ডাক্তাৱী করিতে আমি আসি নাই। এ বালিকার অনুরোধে তোমাকে আমি দেখিতে আসিলাম। আমাকে টাকা দিতে হইবে না। তবে দুইদিন পরে আমি দেশে প্ৰতিগমন করিব। রামকমল ডাক্তারকে তোমার কথা বলিয়া যাইব । তাহাকে বোধ হয়, টাকা দিতে হইবে।” এই কথা বলিয়া আমি সে স্থান হইতে প্ৰস্থান করিলাম। টাকা লইলাম না বটে, কিন্তু বাবু যে ধন্যবান লোকের পুত্র, তাহা বুঝিতে পারিলাম। সামান্য লোকে একেবারে কুড়ি টাকা বাহির করিয়া দিতে পারে না। যতক্ষণ কুসীর নিকট ছিলাম, ততক্ষণ আমার মন ঠিক যেন কাদার ন্যায় কোমল ছিল! সেই মন লইয়া কুসী যাহা ইচ্ছা তাঁহাই করিতেছিল। কুসী যাহা আজ্ঞা করিতেছিল, তাঁহাই আমি স্বীকার করিতেছিলাম। কিন্তু যাই বাহিরে আসিলাম, আর আমার অন্তঃকরণ কঠিন ভাব ধারণ করিল। ক্ষুধায় পেট জুলিয়া উঠিল। শ্ৰান্তিজনিত দুৰ্ব্বলতা অনুভব করিতে লাগিলাম। মনে মনে বলিলাম,-“কি পাগল আমি যে, এই রাত্রিতে পুনরায় এতদূর আসিতে অঙ্গীকার করিয়া বসিলাম ।” যাহা হউক, যখন অঙ্গীকার করিয়াছি, তখন তাহাকরিতেই হইবে। পথে ডাক্তারখানা হইতে যথাপ্রয়োজন ঔষধ লইলাম। তাহার পর গ্ন বাসায় আসিয়া আহার করিলাম। আহার করিয়া পুনরায় সেই একক্রোশ পথ গিয়া ইহঁধ দিয়া আসিলাম। সে রাত্রিতে আর ঘরের ভিতর প্রবেশ করলাম না। দ্বারে কুসীকে ডাকিঃ পরদিন প্ৰাতঃকালে পুনরায় সেই বৃশ্বাসীর্ঘইলাম জুর হয় নাই। যুবাকাল। বাবু যে মুঞ্জ আরোগলাভ করতে পারবে, সম্পূর্ণ সেই সম্ভাবনা হইল । আমি আর দুইদিন কাশীতে রহিলাম। বাবু উঠিয়া বসিতে সমর্থ হইল। যাহা হউক, তবুও আমি রামকমল ডাক্তার মহাশয়কে বাবুর জন্য অনেক বলিয়া আসিলাম। বিদায় হইবার সময় বাৰু আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিল। কুসী। আমার জন্য কঁদিতে লাগিল। আমি বলিলাম,-“কুসী। তোমাকে প্রথম দেখিয়াই আমার মনে এক অপূৰ্ব্ব স্নেহের উদয় হইয়াছিল! সেই অবধি তোমাকে আমি ঠিক আমার কন্যার মত স্নেহ করি। লোকে বলিয়া জানিও। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, জীবনে আর বোধ হয় তোমাদের সহিত আমার সাক্ষাৎ হইবে না।” কুসী। উত্তর করিল,—“আপনি মহাত্মা লোক। আমি আমার নিজের পিতাকে জানি না, তাহাকে কখন দেখি নাই। আমার বড় ভাগ্য যে, আজ আমি পিতা পাইলাম।” এই কথা বলিয়া কুসী চক্ষু মুছিতে লাগিল। তাহার পর নিতান্ত উৎসুক নেত্ৰে সে বাবুর পানে চাহিল। আমাকে তাঁহাদের নাম-ধাম প্ৰকাশ করিয়া বলে, কুসীর সেইরূপ ইচ্ছা। কিন্তু বাবু তাহাকে নিষেধ করিল। বাবু বলিল,-“কুসী! তাড়াতাড়ি করিও না। একটু অপেক্ষা কর। এখন পরিচয় দিয়া লাভ কি?” তাহার পর আমার দিকে দৃষ্টি করিয়া বাবু পুনরায় বলিল,— SS8 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comাির্ড”********* "ভগবান যদি দিন দেন, তাহা হইলে আপনাকে শীঘই পত্র লিখিব। মহাশয়ের নাম ও ঠিকানা আমি আমার পুস্তকে লিখিয়া লইতেছি।” আমি বলিলাম,-“আমার নাম যাদবচন্দ্র চক্ৰবৰ্ত্তীৰ্ণ । লোকে আমাকে যাদব ডাক্তার বলিয়া জানে।” ব্ৰহ্মদেশে যে স্থানে আমি কৰ্ম্ম করিতাম, সেই ঠিকানা আমি বাবুকে বলিলাম। বাবু আপনার পুস্তকে তাহা লিখিয়া লইল । এইরূপে কুসী ও বাবুর নিকট বিদায় লইয়া আমি চলিয়া আসিলাম। বাঙ্গালা ১৩০২ সালের পূজার সময় কাশীতে কুসী ও বাবুর সহিত আমার সাক্ষাৎ হয়। দ্বিতীয় ভাগ প্ৰথম পরিচ্ছেদ সেইদিন আমি কলকাতায় এভাগমন করিলাম গুর্খার পর দুটি যুৱাইলে আমি পুনরায় ব্ৰহ্মদেশে যাইলাম। প্রথম প্রথম কুসী ও ব্যকুঠি”সৰ্ব্বদাই মনে হইত। বাবু আমাকে চিঠি লিখিবে বলিয়াছিল। কিন্তু তাহার নিকট হুইড্‌পিেচঠিপত্র কিছুই পাইলাম না। তাহার নাম-ধামঠিকানা আমাকে বলে নাই। আমি যে ক্টোর্ন অনুসন্ধান করিব, সে উপায়ও ছিল না; সুতরাং যতদিন গত হইতে লাগিল, ততই তাঁহাঁরা আমার স্মৃতিপথ হইতে অন্তৰ্হিত হইতে লাগিল। অবশেষে আমি তাহাদিগকে ভুলিয়া যাইলাম। কুসী ও বাবু বলিয়া পৃথিবীতে যে কেহ আছে, তাহা আর আমার মনে বড় হইত না । দুই বৎসর কাটিয়া গেল । ১৩০৩ সালে আমি সরকারী কৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিলাম। পেনসন লইয়া কিছুদিন দেশে আসিয়া স্বগ্রামে বাস করিলাম। কিন্তু চিরকাল বিদেশে থাকা অভ্যাস; চুপ করিয়া দেশে বসিয়া থাকা আমার ভাল লাগিল না। তাহার পর ম্যালেরিয়াজুরের উপদ্ৰবেও বিলক্ষণ উৎপীড়িত হইলাম। সেজন্য ১৩০৪ সালের শীতকালে আমি বায়ু পরিবর্তন ও উত্তরপশ্চিম অঞ্চলের নানা স্থান দর্শন করিবার নিমিত্ত ঘর হইতে বাহির হইলাম। এলাহাবাদ, উপস্থিত হইলাম। লাহােরে আসিয়া খাইবার প্রভৃতি সীমান্তের গিরিসঙ্কট দেখিতে আমার বড়ই সাধ হইল। কিন্তু দুরন্ত পাঠানদিগের গল্প শুনিয়া সে বাসনা আমাকে পরিত্যাগ করিতে হইল। গ্ৰীষ্মকাল পড়িলেই কাশীর যাইব । এইরূপ মানস করিলাম। চৈত্র মাসের প্রথমে একদিন আমি লাহােরের পথে বেড়াইতেছি, এমন সময় রসময়বাবুর সহিত আমার সাক্ষাৎ হইল। অনেকদিন ব্ৰহ্মদেশে আমরা একসঙ্গে একস্থানে ছিলাম। তাঁহার সহিত আমার বিশেষ বন্ধুতা ছিল না, কারণ, তাঁহার প্রকৃতি একরূপ, আমার প্রকৃতি অনুরূপ। তবে বিদেশে একসঙ্গে অল্পসংখ্যক বাঙ্গালী থাকিলে পরস্পর অনেকটা ঘনিষ্ঠত হয়। ব্ৰহ্মদেশে 6o7*7”* sig oriż35 g35 KG! ay www.amarboi.com My RRG? থাকিতে রসময়বাবুর সহিত আমার সেইরূপ ঘনিষ্ঠতা হইয়াছিল। অবশ্য একথা বলা বাহুল্য যে তাহার নাম প্রকৃত রসময় নহে। এই গল্পে যে সমুদায় নামের উল্লেখ হইতেছে, তাহা প্রকৃত নহে। কারণ, অন্ততঃ দুইটি সংসারের কথা ইহাতে রহিয়াছে। প্রকৃত নাম দিয়া লোকের সংসারের কথা সাধারণের সমক্ষে প্ৰকাশ করা উচিত নহে। দূর হইতে রসময়বাবু আমাকে দেখিয়া তাড়াতাড়ি আসিয়া আমার হাত ধরিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “রসময়বাবু! আপনি এখানে কি করিয়া আসিলেন?” রসময়বাবু উত্তর করিলেন- “কেন? আপনি শুনেন নাই? আমি পঞ্জাবে বদলি হইয়াছি। প্রথম একটি বড় ছাউনিতে আমাদের আফিস ছিল। এক্ষণে সীমান্তে সামান্য একটি স্থানে আছি। কিন্তু যাদববাবু! আপনি এ স্থানে কি করিয়া আসিলেন?” আমি বলিলাম— “পেনসন লইয়া আপনাদের নিকট হইতে চলিয়া আসিলাম । তাহার পর দিনকতক দেশে রহিলাম। ম্যালেরিয়াজুরে বড়ই ভুগিতেছিলাম, সেজন্য পশ্চিমে বেড়াইতে আসিয়াছি।” রসময়বাবু পুনরায় বলিলেন, — “আর শুনিয়াছেন? না,-বলিলে আপনি উপহাস করিবেন, আপনাকে সে কথা বলিব না।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “কি কথা? উপহাস করিবার কি কথা আছে?” রসময়বাবু উত্তর করিলেন,- “আমি পুনরায় বিবাহ করিয়াছি। এই বয়সে পুনরায় বিবাহ করিয়াছি।” আমি বলিলাম,- “তবে বৰ্ম্মণীকে ভুলিয়া গিয়াছেন?” তাহার শোকে সেদিন যে ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়াছিলেন?” ব্ৰহ্মদেশে থাকিতে রসময়বাবুর স্ত্রী-পুত্র-পরিবার ছিল না। বহুদিন পূৰ্ব্বে তাঁহার স্ত্রী-বিয়োগ হইয়াছিল। ব্ৰহ্মদেশের একজন স্ত্রীলোক লইয়া সে স্থানে তিনি ঘর-সংসার করিয়াছিলেন। রসময়বাবুর আর একটি দোষ ছিল। অতিরিক্ত পান-দোষটাও তাঁহার ছিল। সেইজন্য পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি যে, আমার সহিত তাঁহার বিশেষ মিত্রতা ছিল না। তাঁহার স্বভাব একরূপ, আমার স্বভাব অন্যরূপ। ব্ৰহ্মদেশে থাকিতে পুনরায় বিবাহ করিবার নিমিত্ত দুই-একবার তাঁহাকে আমরা অনুরোধ করিয়াছিলাম; কিন্তু বৰ্ম্মণী তাঁহার সংসারে সদাচারে থাকিয়া একপ্রকার স্ত্রীর ন্যায় ঘনকান্না করিতেছিল। পাছে তাহার প্রতি নিষ্ঠুরতা হয়, সেজন্য রসময়বাবুকে বিবাহ করিবার নিমিত্ত আমরা জোর করিয়া বলিতে পারি নাই। আর জোর করিয়া বলিলেই বা তিনি আমাদের কথা শুনিবেন কেন? আমি পেনসন লইয়া ব্ৰহ্মদেশ হইতে চলিয়া আসিবার অল্পদিন পূৰ্ব্বে বৰ্ম্মণীর মৃত্যু হয়। সেই শোকে রসময়বাবুরক্ষিপ্তপ্রায় হইয়াছিলেন। রসময়বাবু বলিলেন, সত্য বটে, বৰ্ম্মণীর শোকে আমি ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়াছিলাম। পুনরায় বিবাহ করিবার কারণও তাই। মন আমার যেন সৰ্ব্বদাই উদাস থাকিত। সংসারে আমার কেহ।। ·::9 afraig -iibg gis so! - www.amarboicomf287'******** নাই, সৰ্ব্বদাই যেন সেইরূপ বােধ হইত। পরিবার বিয়ােগ হইলে লোকে যে বলে, 'গৃহ-শূন্য' হইয়াছে, সে সত্যকথা। গৃহ-শূন্য হওয়ার ভোগও আমি একবার ভুগিয়াছি। আমার শরীরটা কিছু মায়াবী । সহজেই আমি কাতর হইয়া পড়ি। আমার প্রথম পত্নীর যখন বিয়োগ হয়, তখনও আমি পাগলের ন্যায় হইয়া পড়িয়াছিলাম।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,--“কবে সে ঘটনা ঘটিয়াছে?” রসময়বাবু উত্তর করিলেন, —“সে অনেকদিনের কথা । তখন আপনাদের সহিত আমার আলাপ হয় নাই। সেই পরিবারের শোকে আমি দেশত্যাগী হই। নানাস্থানে ভ্ৰমণ করিয়া অবশেষে ব্ৰহ্মদেশে গিয়া উস্থিত হই। কমিসেরি বিভাগে ভাল কৰ্ম্ম মিলিল, সেজন্য সেই স্থানেই রহিয়া যাইলাম। আপনি এখন এ স্থানে কিছুদিন থাকিবেন?” আমি উত্তর করিলাম,-“না, শীঘ্রই কাশীরে যাইব বলিয়া মানস করিতেছি। সীমান্তের কথা খবরের কাগজে অনেক পড়িয়াছি। সেই সীমান্ত কিরূপ, তাহা দেখিবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সে দিকে কাহাকেও আমি জানি না। পাঠানদের উপদ্রবের কথা শুনিয়া অপরিচিত স্থানে একেলা যাইতেও সাহস করি না। সেজন্য কাশ্মীরে যাইব মনে করিতেছি?” রসময়বাবু বলিলেন, —“তার ভাবনা কি? আমি উজিরগড়ে থাকি। সে স্থান একেবারে সীমান্তে । আমাদের পল্টন এখন সেই স্থানে রহিয়াছে। উজিরগড় ছোট একটি ছাউনি, চৌকি বলিলেও চলে। সে স্থানে বাঙ্গালী অধিক নাই, আমরা কেবল আটজন সেখানেই আছি। আপনাকে অতি আদরে আমরা রাখিব । দেখিবার কিছু আছে, তাহা দেখাইব । আমি বিবাহ করিতে কলিকাতা গিয়াছিলাম । স্ত্রী লইয়া উজিরগড়ে প্রত্যাগমন করিতেছি। আপনি আমার বাসায় থাকিবেন। কি ৱৰ্লন? উজিরগড়ে যাইবেন তো?” আমি উত্তর করিলাম,-“আচ্ছা, যাইবুর্গকিন্তু কাশীর দেখিতে আমার মন হইয়াছে। কাশীর হইতে প্রত্যাগমন করিয়া আপনার যাইব ।” রসময়বাবু বলিলেন,-"১৫ই পূৰ্ব্বে যদি আমার নিকট গমন করেন, তাহা হইলে আমার বড় উপকার হয়। সেইদিন কন্যার বিবাহ হইবে। আপনারা পাঁচজনে দাঁড়াইয়া থাকিলে সেই কাজ সুচারুরূপে নিৰ্ব্বাহিত হইবে।” আমি আশ্চৰ্য্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম,-“আপনার কন্যা? আপনার আবার কন্যা কোথা হইতে আসিল? সগৰ্ভ সপুত্ৰ সকন্যা স্ত্রী বিবাহ করিয়া আনিলেন না কি?” রসময়বাবু একটু হাসিয়া উত্তর করিলেন, —“তা নয়! এ আমার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর কন্যা।” আমি বলিলাম,-“আপনার প্রথম পক্ষের স্ত্রী তো বহুকাল গত হইয়াছে। বৰ্ম্মায় তোর-চৌদ বৎসর আমরা একত্রে ছিলাম। আপনি এই বলিলেন, তাহার পূৰ্ব্বে আপনার স্ত্রী-বিয়ােগ হইয়াছিল। এতবড় অবিবাহিতা কন্যা আছে? ব্ৰহ্মদেশে থাকিতে আপনার এ কন্যার কথা কখন শুনি নাই।” রসময়বাবু উত্তর করিলেন,-“সে সকল কথা আমি আপনাকে পরে বলিব। কন্যা বড় হইয়াছে সত্য। এদেশে একটি ভাল পাত্ৰ স্থির করিয়াছি। বিবাহ করিতে তিনি দেশে যাইতে পরিবেন না। তাই আমি কন্যা আনিতে গিয়াছিলাম। দেশে সেইজন্যই আমি গিয়াছিলাম । নিজে বিবাহ করিব বলিয়া যাই নাই। কিন্তু দেশে উপস্থিত হইয়া একটি বড় পাত্রী মিলিয়া গেল। আমার মন উদাসী ছিল। আমি নিজেও বিবাহ করিলাম। বিদেশে বিবাহ দিবার নিমিত্ত কেবল কন্যাকে ঘাড়ে করিয়া আনা ভাল দেখায় না, সেই কারণে নববিবাহিতা স্ত্রীকে সঙ্গে ফোকুলা দিগম্বর sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro ՀՀԳ कलेिशी उाभिज्ञा । তবে কেমন? বৈশাখ মাসের প্রথমে আপনি উজিরগড়ে যাইবেন তো?” আমি বলিলাম,- “যাইতে খুব চেষ্টা করিব।” তৃতীয় পরিচ্ছেদ রসময়ের অনুতাপ এইরূপ কথাবাৰ্ত্তার পর রসময়বাবু প্ৰস্থান করিলেন। চৈত্র মাসের প্রথমে লাহােরে রসময়বাবুর সহিত আমার সাক্ষাৎ হইল। দুই-চারি দিন পরে আমি কাশীর গমন করিলাম। কাশীরে পৰ্ব্বত, হ্রদ, বন, উপবনের সৌন্দৰ্য্য দেখিয়া বড়ই বিস্মিত হইলাম। বৈশাখ মাসের প্রথমে কাশীর হইতে প্ৰত্যাগমন করিলাম, ৫ই বৈশাখ উজিরগড়ে গিয়া উপস্থিত হইলাম। অতি সমাদরে রসময়বাবু আমাকে তাহার বাসায় স্থান দিলেন। ১৫ই বৈশাখ রসময়বাবুর কন্যার বিবাহ হইবে। আমি যখন উজিরগড়ে গিয়া উপস্থিত হইলাম, তখন বিবাহের আয়োজন হইতেছিল। সেইদিন সন্ধ্যাবেলা রসময়বাবু আমাকে বলিলেন, ওআপনি এ স্থানে আসায় আমার আর একটি উপকার হইয়াছে। দুই-চারি দিন বিশ্রাম আপনার পথশ্ৰান্তি দূর হইলে, আমার কন্যাকে একবার দেখিতে হইবে। কন্যার ভাবুগুতিক আমি কিছুই বুঝিতে পারি না। তাহার শরীরে কােনরূপ পীড়া আছে বলিয়া বােধহঁয়াঁ মুখ মলিন, শরীর রুগ্ন ও কৃশ । তাহার পর কোনরূপ বায়ুর ছিট আছে কি না, তাকুণ্ঠ জানি না। মুখে তাহার কথা নাই, সৰ্ব্বদাই ঘাড় হেঁট नारे।" আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “আপনার কন্যা এতদিন কোথায় ছিল?” রসময়বাবু উত্তর করিলেন— “আপনারা সকলেই জানেন যে, আমি নিতান্ত সাধু ছিলাম না। এই কন্যার প্রতি আমি অতি নিষ্ঠুর ব্যবহার করিয়াছি, সেজন্য এখন আমার বড়ই অনুতাপ হয়। নিজের দোষ স্বীকার করাই ভাল, এককুড়ি মিথ্যা কথা বলিয়া তাহা আর গোপন করা উচিত নয়।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “কন্যার প্রতি আপনি কি নিষ্ঠুর ব্যবহার করিয়াছিলেন?” রসময়বাবু উত্তর করিলেন, — “এই কন্যা যখন ছয় দিনের, তখন আমার স্ত্রী সূতিকাগারে পরলোকপ্ৰাপ্ত হয়। শোকে আমি অধীর হইয়া পড়িলাম। আমার এক আত্মীয় ও তাঁহার স্ত্রী নিঃসন্তান ছিলেন। নব-প্ৰসূতা শিশুকে তাঁহাদের হস্তে সমৰ্পণ করিয়া আমি দেশ হইতে বাহির হইয়া পড়িলাম। নানা স্থান ভ্ৰমণ করিয়া অবশেষে ব্ৰহ্মদেশে গিয়া উপস্থিত হইলাম। কন্যার প্রতিপালনের নিমিত্ত প্ৰথম প্রথম তাহাদিগের নিকট কিছু কিছু খরচ পাঠাইতাম। তাহার পর বন্ধ করিয়া দিলাম।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “আপনার সে আত্মীয় কি সঙ্গতিপন্ন লোক?” রসময়বাবু উত্তর করিলেন, — “কিছুমাত্র নয়। সামান্য একটু চাকরী করিয়া তিনি দিনযাপন Rbr află cios (gs se - www.amarboicom** করিতেন। যখন কন্যা বিবাহযোগ্য হইল, তখন তিনি আমাকে বার বার পত্র লিখিলেন। আমি পত্রের উত্তর দিলাম না। বিবাহের নিমিত্ত একটি টাকাও প্রেরণ করিলাম না। তিনি গরীব, টাকা কোথায় পাইবেন যে, আমার কন্যার বিবাহ দিবেন। শেষকালটায় তিনি রোগগ্ৰস্ত হইয়া অনেকদিন শয্যাশায়ী হইয়াছিলেন। এইসব কারণে আমার কন্যা বড় হইয়া পড়িয়াছে; আজি পৰ্যন্ত তাহার বিবাহ হয় নাই। তাহার পর আমার সেই আত্মীয়ের পরলোক হয়। তাহার স্ত্রী আমার কন্যাটিকে লইয়া একেবারে নিঃসহায় হইয়া পড়েন। তিনি পুনরায় আমাকে পত্ৰ লিখিলেন। সেই সময় বৰ্ম্মণীর মৃত্যু হইয়াছিল। আমার চক্ষু উন্মুক্ত হইয়াছিল। আমি খরচপত্র পাঠাইয়া দিলাম ও একটি সুপাত্র অনুসন্ধান করিতে আমার সেই আত্মীয়াকে লিখিলাম। কিন্তু ভালরূপ পাত্রের সন্ধান হইল না। এই সময়ে আমি পঞ্জাবে বদলি হলাম। মনে করিয়াছিলাম যে, এ স্থানে আসিবার সময় কলিকাতায় দিনকত থাকিব। সেই স্থানে থাকিয়া, ভাল একটি পাত্রের অনুসন্ধান করিয়া, কন্যার বিবাহ দিয়া তবে পঞ্জাবে আসিব। কিন্তু কলিকাতায় কিছুদিন অবস্থিতি করিবার নিমিত্ত ছুটি পাইলাম না। বরাবর আমাকে পঞ্জাবে আসিতে হইল। প্ৰথম একটি বড় ছাউনিতে আমাদের আফিস হইয়াছিল। সেই স্থানে দিগম্বরবাবুর সহিত আমার আলাপ হয়।” চতুর্থ পরিচ্ছেৰ্গস্ট 3) আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- AA ל" রসময়বাবু উত্তর করিলেন,- রবাবু কে? কেন, ফোকলা দিগম্বর!” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “ফোকলা দিগম্বর কে?” রসময়বাবু কিছু বিস্মিত হইয়া উত্তর করিলেন,- “ফোকুলা দিগম্বর কে? ফোকলা দিগম্বরের নাম শুনেন নাই? তাহার যে অনেক টাকা। এ অঞ্চলে সকলেই যে তাহাকে জানে।” আমি বলিলাম,- “না, আমি কখন ফোকলা দিগম্বর নাম শুনি নাই। তিনি কে?” রসময়বাবু উত্তর করিলেন,- “দিগম্বরবাবু আমার হবু জামাতা। তিনিও কমিসেরি বিভাগে কৰ্ম্ম করেন। কিছুদিন পূৰ্ব্বে এলাহাবাদ কি আগ্ৰা হইতে তিনি পঞ্জাবে আসিয়াছেন। বিলক্ষণ সঙ্গতি করিয়াছেন। আমি যখন পাঞ্জাবে আগমন করি, সেই সময় তাহার পত্নীবিয়োগ হইয়াছিল।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “দিগম্বরবাবু সুপােত্র?” রসময়বাবু উত্তর করিলেন,- “দেখিতে তিনি সুপুরুষ নহেন, বয়সও হইয়াছে। তবে সঙ্গতিপন্ন লোক। কন্যা আমার সুখে থাকিবে।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “আর-পক্ষের তাঁহার পুত্ৰাদি আছে?” রসময়বাবু বলিলেন,- “আছে। পুত্ৰ-কন্যা কেন, শুনিয়াছি, দেশে পৌত্র-দৌহিত্রও আছে। পাছে এ বিবাহে তাহারা আপত্তি করে, সেইজন্য দিগম্বরবাবু দেশে গিয়া বিবাহ করিতে ইচ্ছা! করিলেন না। সেইজন্য আমাকেও এই স্থানে কন্যার বিবাহ দিতে হইল।” ফেঙ্কলী দিগম্বর দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ Sis আমি বলিলাম,- “এরূপ পাত্রের সহিত কন্যার বিবাহ দেওয়া কি উচিত হয়?” রসময়বাবু বলিলেন,- “কি করি! সেদিন হিসাব করিয়া দেখিলাম যে, আমার কন্যার বয়ঃক্রম ষোল বৎসর হইয়া থাকিবে। দেশে আমার এমন কোন অভিভাবক নাই যে, তাঁহাকে ভাল পাত্রের অনুসন্ধান করিতে বলি। চাকরী ছাড়িয়া আমি নিজেও যাইতে পারি না। তাহা ভিন্ন ভাল পাত্রের সহিত বিবাহ দিতে অনেক টাকার প্রয়ােজন। সে টাকা আমার নাই। দিগম্বরবাবু বৃদ্ধই হউন আর যাহাঁই হউন, কন্যার বিবাহ না দিয়া আর আমি রাখিতে পারি না।” রসময়বাবু উত্তর করিলেন, — “তা ঠিক বলিতে পারি না । ষাট হইয়াছে কি হয় নাই।” বলে?” রসময়বাবু উত্তর করিলেন,- “কেবল তা নয়। তাঁহার দন্তহীন মাড়ি কৃষ্ণবর্ণ ও কিছু উচ্চ। অল্প বয়স্ক যুবকের মত দেখাইবে বলিয়া সৰ্ব্বদা তিনি হাস্য-পরিহাস করিয়া থাকেন। সেইসময় মাড়ি দুইটি বাহির হইয়া পড়ে। সেইজন্য লোকে তাঁহাকে ফোকলা দিগম্বর বলে। কিন্তু তাহার অনেক টাকা আছে। কন্যা আমার সুখে থাকিবো।“ আমি আর কি বলিব! আমি চুপ করিয়া রহিলাম । দিগম্বরবাবু বৃদ্ধই হউন আর যুবাই হিউন, তাঁহার প্রাণে যে সখ আছে, পরদিন তাহা আমি জানিতে পারিলাম। কারণ, প্ৰাণে সখ না থাকিলে, কেহ আর হবু স্ত্রীর ফটোগ্রাফ দর্শন করিতে ইচ্ছা করে না। এ পৰ্যন্ত তিনি রসময়বাবুর কন্যাকে দেখেন নাই। কন্যা না দেখিয়াই সম্বন্ধ স্থির হইয়াছিল। মনে করিলেই এ স্থানে আসিয়া অনায়াসে কন্যা দেখিয়া যাইতে পারিতেন; কিন্তু তাহা তিনি করেন নাই। রসময়বাবু কন্যা আনিতে যখন দেশে গিয়াছিলেন, তখন কন্যার ফটােগ্ৰাফ লইবার নিমিত্ত তিনি অনুরোধ করিয়াছিলেন। কলিকাতায় সেই ফটােগ্রাফ গৃহীত হইয়াছিল। আজ ডাকে সেই ফটােগ্রাফ আসিয়া উপস্থিত হইল। পুলিন্দাটি খুলিয়া সেই ছবি সকলে দেখিতে লাগিলেন। তাহাতে রসময়বাবুর নিজের, তাহার নববিবাহিতা পত্নীর ও কন্যার ছবি ছিল। এ স্থানে রসময়বাবুর সংসারে অভিভাবকস্বরূপ একজন বয়স্কা বিধবা স্ত্রীলোক ছিলেন। তিনি কে, তখন তাহা আমি জানিতে পারি নাই। তাহার ফটােগ্রাফ ছিল না।, একএকজনের ছয় ছয়খানি করিয়া ছবি ছিল। একখানি ছবি আমার হাতে দিয়া রসময়বাবু বলিলেন, — “ইহা আমার কন্যার ছবি। কেমন, আমার কন্যা সুন্দরী নয়?” ছবিখানি হাতে লইয়া আমি চমকিত হইলাম । যাহার ছবি, তাহাকে যেন কোথায় দেখিয়াছি, এইরূপ আমার মনে হইল। কিন্তু কবে কোথায় দেখিয়াছি, তাহা আমি স্মরণ করিতে পারিলাম না। চিন্তা করিয়া স্মরণ করিতে চেষ্টা করিতেছি, এমন সময় রসময়বাবু পুনরায় বলিলেন,- “চুপ করিয়া রহিলেন যে? কন্যা আমার সুন্দরী নহে?” SvSbo দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com%"o আমি বলিলাম,- “সুন্দৱী! চমৎকার রূপবতী কন্যা। ছবিখানি তুলিয়াছেও ভাল। কিন্তু বাম গালের এই স্থানে একটু যেন মুছিয়া গিয়াছে। আর একখান দেখি?” রসময়বাবু কন্যার আর পাঁচখানি ছবি আমার হাতে দিলেন। একে একে সকলগুলিরই বাম গালের একস্থানে সেই মোছা দাগটি দেখিতে পাইলাম। তখন রসময়বাবু হাসিয়া বলিলেন,- “বাম গালে এ স্থানটা মুছিয়া যায় নাই। আমার কন্যার এই স্থানে ক্ষুদ্র একটি আঁচিল আছে, ইহা তাহার দাগ।” যাহার এ ফটােগ্রাফ, তাহাকে কোথায় যে দেখিয়াছি, তবুও আমার মনে হইল না। সকলের দেখা হইলে রসময়বাবু দুইখানি ছবি সেই দিনের ডাকেই দিগম্বরবাবুর নিকট প্রেরণ করিলেন। তাহার পরদিন রসময়বাবুর পরিবারবর্গ নদীতে স্নান করিতে গিয়াছিলেন। বেলা প্ৰায় এগারটা বাজিয়া গিয়াছিল। রসময়বাবু আফিসে গিয়াছিলেন। বাহিরের ঘরে আমি একাকী বসিয়া আছি, এমন সময় রসময়বাবুর পরিবারবর্গ যে এক্কাতে স্নান করিতে গিয়াছিলেন, সেই এক্কা ফিরিয়া আসিল। রসময়বাবুর বাসার সম্মুখে সামান্য একটু বাগানের মত ছিল। বাগানের পর বাড়ী। প্ৰথম বৈঠকখানা, তাহার পশ্চাতে অন্দরমহল। অন্দরমহলে যাইবার নিমিত্ত বাগানের ভিতর বৈঠকখানার পার্শ্বে একটি খিড়কি দ্বার ছিল। এক্কা সেই খিড়কির দ্বারে গিয়া লাগিল। এক্কা হইতে নামিয়া স্ত্রীলোকেরা একে একে বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিল। স্ত্রীলোকেরা সকলেই দাঁড়াইলাম। তখনও এক্কা চলিয়া যায় নাই। বৈঠকখানার বারান্দায় দাড়াইয়া আমি সেই এক্কা, তাহার ঘোড়া ও ভীমসদৃশ দেহবিশিষ্ট সেই এক্কাও দেখিতে লাগিলাম। এমন সময় সেই খিড়কি দ্বারের নিকট বাটীর ভিতর হইতে কে -- “ও কুসুম! এক্কার উপর ভিজা গামছাখানা পড়িয়া আছে। নিয়ে এস তো মা!” & রসময়বাবুর পরিবারের মধ্যে যে অভিভাবুকুঠুরূপ একজন বয়স্কা বিধবা স্ত্রীলোক আছেন, এ কণ্ঠস্বর তাহার। তিনি রসময়বাবুর ভগিনী এখন পৰ্যন্ত তাহা আমি জানিতে পারি নাই। তাহার সেই কথা শুনিয়া একটি স্ত্রীলোক বাটীর ভিতর হইতে ধীরে ধীরে ঘাড় হেঁট করিয়া বাহির হইল। এক্কার পদ তুলিয়া তাহার ভিতর হইতে গামছাখানি লইয়া পুনরায় সেইরূপ ঘাড় হেঁট করিয়া বাটীর ভিতর সে চলিয়া গেল। গামছা লইয়া যাইতে এক মিনিট কালও অতিবাহিত হয় নাই। কিন্তু তাহার ঘোমটা ছিল না, মাথায় কাপড় পৰ্যন্ত ছিল না। মাথা হেঁট করিয়া ছিল বটে, তথাপি আমি তাহার মুখ দেখিতে পাইলাম। তাহার মুখ দেখিয়া আমার ব্যাৎ করিয়া পূৰ্ব্বকথা সমুদায় স্মরণ হইল। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ কাশীর কুসী বটে। এইমাত্র আমি যাহাকে দেখিলাম, সে কুসী ভিন্ন আর কেহ নয়। সেদিন যাহার ছবি দেখিয়াছিলাম, সে-ও কুসী ব্যতীত আর কেহ নয়। সেই মুখ, সেই বাম গালে আঁচল। কুসী বটে, কিন্তু সে কুসী। আর নাই! কেবল তিন বৎসর পূৰ্ব্বে তাহাকে আমি দেখিয়াছিলাম। ইহার মধ্যেই সে বিশ্ৰী হইয়া গিয়াছে। সে পুরন্ত গাল তাহার নাই। রক্তিম (*** firla citya gas xel - www.amarboicom a SNS আভা-সম্বলিত সে বর্ণ এখন নাই। চক্ষু বসিয়া গিয়াছে, চক্ষের কোলে কালি মাড়িয়া দিয়াছে। সঙ্কটাপন্ন পীড়া হইলে লোক যেরূপ হয়, কুসীর আকর এখন সেইরূপ হইয়া গিয়াছে! এ কি সেই কাশীর কুসী? ঠিক সেইরূপ মুখ বটে, কিন্তু কুসীর বিবাহ হইয়া গিয়াছে। পুনরায় তাহার বিবাহ কি করিয়া হইবে? এ কুসী। কি না, এই বিষয়ে আমার মনে বড় সন্দেহ উপস্থিত হইল। একবার মনে হয়, এ আর কেহ নহে, নিশ্চয় কুসী। আবার মনে হয় যে, না, তা নয়, কুসীর সহিত রসময়বাবুর কন্যার সাদৃশ্য আছে, এই মাত্র। সেই সাদৃশ্য দেখিয়া আমি এইরূপ ভ্ৰমে পতিত হইতেছি। আবার মনে হয় যে, কেবল মুখশ্ৰীীর সাদৃশ্য নয়,-তাহার নাম কুসী, ইহার নাম কুসুম; কুসুমের সংক্ষেপে কুসী। তাহার পর, সেই বাম গণ্ডদেশে আঁচিল। এ নিশ্চয় আমার সেই পাতানো কুসী। কিন্তু আবার যখন ভাবি যে, তবে পুনরায় বিবাহ হইতেছে কেন, তখন আবার মনে বড় সন্দেহ হয়। বয়স অধিক হইয়াছিল, সেজন্য রসময়বাবুর কন্যা কাহারও সম্মুখে বাহির হয় না। গোপনে যে তাহার সহিত কোন কথা কহিব, সে উপায় ছিল না। আমি ভিতর বাটীর ভিতর যখন আহার করিতে যাই, কুসী। তখন অবশ্য আমায় দেখিতে পায়। যদি প্রকৃত সে কুসী হয়, তাহা হইলে আমার সহিত দেখা করে না কেন? পুনরায় বিবাহ করিতেছে; সেই লজ্জায় দেখা করে না? যাহা হউক, রসময়বাবু যখন কন্যাকে দেখাইবেন, তখন এ রহস্য ভেদ করিতে চেষ্টা করিব । রসময়বাবু বাটী আসিলে, আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম,- “কৈ আপনার কন্যাকে দেখাইলেন না? (G) রসময়বাবু উত্তর করিলেন– “পথুশ্ৰমে ভূনি শ্ৰান্ত ছিলেন, সেইজন্য দেখাই নাই; তাহার পর, আজ তাহারা নদীতে স্নান করিঙ্গুেসীয়ছিল। সন্ধ্যার সময় দেখাইব ।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “আপুনর্গুকন্যার কি হইয়াছে, ভাল করিয়া বলুন দেখি, শুনি ।” রসময়বাবু উত্তর করিলেন,- “কি হইয়াছে, তাহা আমি নিজেই জানি না। সেদিন কলিকাতায় তাহার সহিত আমার প্রথম সাক্ষাৎ হইল। শুনিয়াছি যে, দুই বৎসর পূৰ্ব্বে তাহার জুর-বিকার হইয়াছিল; তাহার পর, একপ্রকার পাগলের মত হইয়া আছে। শরীর দিন দিন শুষ্ক হইয়া যাইতেছে। কাহারও সহিত সে কথা কয় না। আমার সহিত এ পৰ্যন্ত সে একটিও কথা কয় নাই। তবে সেদিন আমার নিকট আসিয়া বলিল,- “বাবা, আমার বিবাহ দিবেন না; বিবাহের পূৰ্ব্বেই আমি মরিয়া যাইব।” সকলের সাক্ষাতে সে ক্রমাগত এই কথা বলিতেছে! কিন্তু বিবাহ হইলেই বোধ হয়, সব ভাল হইয়া যাইবে। সেই জন্য বিবাহের নিমিত্ত আমি আরও ব্যস্ত হইয়াছি।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “আপনার কন্যার নাম কুসুম?” রসময়বাবু উত্তর করিলেন,- “ হাঁ!” w সেই দিন সন্ধ্যাবেলা রসময়বাবু ও আমি দুইজনে বৈঠকখানায় বসিয়াছিলাম। সেই সময় তিনি কন্যাকে ডাকিয়া আনিলেন। কুসুম অবগুষ্ঠিত হয় নাই সত্য কিন্তু যতদূর পারিয়াছিল, ততদূর শরীরকে বস্ত্র দ্বারা আবৃত করিয়াছিল। অতি ভয়ে ভয়ে মস্তক অবনত করিয়া সে আমার সম্মুখে দাঁড়াইল। সেই কাশীর কুসী বটে, তাহাতে আর কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু সে কুসী। আর নাই, তাহার ছায়া মাত্র রহিয়া গিয়াছে। তাহার শরীর অতিশয় কৃশ হইয়া গিয়াছে। চক্ষু বসিয়া SRAADSR দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarbo.com:5'" গিয়াছে। মুখ বিবৰ্ণ হইয়া গিয়াছে। যেন ঠিক মৃত লোকের আকার হইয়াছে। কতবার তাহাকে আমি মস্তক তুলিতে বলিলাম। কিন্তু কিছুতেই সে মস্তক উত্তোলন করিল না, ঘাড় হেঁট করিয়া মাটির দিকে চাহিয়া রহিল। আমি নানারূপ প্রশ্ন করিলাম। কিন্তু সকল কথাতেই হয় “হঁয়া”, আর না হয় “না”— এইরূপ উত্তর দিল। আমার দিকে একবার চাহিয়া দেখিল না। অবশেষে সে কাদিয়া ফেলিল। তাহার শরীরের অবস্থা দেখিয়া আমার বড় দয়া হইল। সে কোন কথা বলিবে না, সুতরাং আর তাহাকে কষ্ট দেওয়া বৃথা। সে নিমিত্ত আমি তাহাকে বাটীর ভিতর যাইতে বলিলাম। a সপ্তম পরিচ্ছেদ আমি করি কি কুসী বাটীর ভিতর চলিয়া যাইলে, তাহার পিতা আমাকে বলিলেন,- “দেখিলেন তো মহাশয়! ইহার মনের গতিক ভাল নহে। সেই বিকারের পর হইতে ইহার বুদ্ধিভ্রংশ হইয়া গিয়াছে; কিয়ৎ পরিমাণে বায়ুগ্ৰস্ত হইয়াছে। বিবাহ হইয়া গেলে, নানারূপ বসন-ভূষণ পাইয়া বােধ হয় সারিয়া যাইবে।” আমি উত্তর করিলাম,— “বায়ুগ্ৰস্ত হইয়াছে কি নাপ্তাহা আমি জানি না, কিন্তু ইহার মনের অবস্থা যে নিতান্ত মন্দ, তাহা নিশ্চয় কথা। সোিন্টমিত্ত শরীরের অবস্থাও ভাল নহে। আপনার কন্যা যাহা বলে, সত্য সত্য তাহাই বা ঘট্ৰেংষ্ট যাহা হউক, আমি ঔষধাদি প্ৰদান কৃষ্টিীর্ম না। কোনরূপ ঘোরতর দুশ্চিন্তার নিমিত্ত শরীরের এইরূপ অবস্থা হইয়াছে, তাহাতে ঔষধ দিয়া কি হইবে? বোধ হয়, দ্বিতীয় বার এই বিবাহই যত অনার্থের মূল। রসময়বাবু কেন এ কাজ করিতেছেন, তাহা আমি বুঝিতে পারিলাম না! কুসীর স্বামী “বাবু” কোথায় গেল, তাহাও জানি না। এ বিধবা-বিবাহ নহে। তাহা যদি হইত, তাহা হইলেও না হয়, এ ব্যাপারের অর্থ বুঝিতে পারিতাম। কুসীর যে একবার বিবাহ হইয়াছে, সে কথা গোপন রাখা হইতেছে। কাশীতে কুসীর সহিত যখন আমার সাক্ষাৎ হয়, রসময়বাবু সে সময় ব্ৰহ্মদেশে ছিলেন। কুসীর যে একবার বিবাহ হইয়াছে, তিনি কি তা জানেন না? ফল কথা, ভাবিয়া-চিন্তিয়া আমি কিছুই স্থির করিতে পারিলাম না। যাহা ইচ্ছা হউক, আমার এত ভাবনায় আবশ্যক কি? এই বিবাহের শেষ পৰ্যন্ত দেখিয়া, আমি এ স্থান হইতে চলিয়া যাইব । এইরূপ চিন্তা করিয়া আমি চুপ হইয়া রহিলাম, আর কুসীকে দেখিতে চাহিলাম না। তবে কুসী কেমন আছে, সে কথা প্রতিদিন জিজ্ঞাসা করিতাম। রসময়বাবু প্রতিদিন বলিতেন, — “সেইরকম আছে, কথা তো সে কয় না, তবে মাঝে মাঝে বলে যে, তাহার বিবাহ দিতে হইবে না, বিবাহের পূৰ্ব্বেই সে মরিয়া যাইবে। বৃথা সকল আয়ােজন হইতেছে।” আমি চুপ করিয়া রহিলাম বটে, কিন্তু মন আমার বড়ই উদ্বিগ্ন হইল। এ বিবাহ যাহাতে না হয়, সম্পূর্ণভাবে সেই ইচ্ছা হইল। কাশীর কথা প্ৰকাশ করিয়া এ বিবাহ নিবারণ করি, সে ইচ্ছা! বার বার আমার মনে উদয় হইল। কিন্তু “বাবু”, যদি ইহার যথার্থ স্বামী না হয়? সে বিষয়েও যদি কোনরূপ গোল থাকে? তাহা হইলে, কাশীর কথা প্ৰকাশ করিয়া আমি নিজেই ঘোর ফোকুলা দিগম্বর sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro SSAS বিপদে পড়িব । মাঝে মাঝে এ সন্দেহ আমার মনে উদয় হইল বটে, কিন্তু কুসী যে দুশ্চরিত্রা, সে কথা আমার কিছুতেই বিশ্বাস হইল না। যাই হউক, আমি দুই দিনের জন্য এ স্থানে বেড়াইতে আসিয়াছি। পরের কথায় হস্তক্ষেপ করিয়া, কেন আমি সকলের বিরাগভাজন হইব? কুসীর প্রতি কোনরূপ অত্যাচার কি হইতেছে? তাহা যদি হয়, আর কুসী। যদি একটা কথা আমাকে বলে, তাহা হইলে, যেমন করিয়া পারি, আমি এ বিবাহ নিবারণ করিব। কুসী। আমাকে হয় চিঠি লিখিবে, না হয় গোপনে কিছু বলিবে, প্রতিদিন এই আশা করিতে লাগিলাম। কিন্তু দিনের পর দিন কাটিয়া যাইতে লাগিল। বিবাহের দিন নিকটবৰ্ত্তী হইল। তবুও কুসী। আমাকে কিছু বলিল না। এ অবস্থায় আমি কি করিতে পারি? ভগবানের যাহা ইচ্ছা তাঁহাই হইবে, এই কথা ভাবিয়া আমি চুপ করিয়া রহিলাম। বিবাহের আয়োজন হইতে লাগিল। বরযাত্রীদিগের থাকিবার নিমিত্ত রসময়বাবু নিকটে একখানি বাটী ভাড়া করিলেন। বিবাহের পূর্বদিন বর ও বরযাত্ৰিগণ আসিয়া উপস্থিত হইবে। খাদ্যসামগ্ৰী প্রভৃতির তদনুযায়ী আয়ােজন হইতে লাগিল। উজিরগড়ে পুরোহিত ছিল না, যে স্থান হইতে বর আসিবে, কন্যাপক্ষের পুরোহিতও সে স্থান হইতে আসিবে। রসময়বাবুর বৈঠকখানাটি বড় ছিল । তাহার একপার্শ্বে কন্যাদান হইবে । অপর পার্শ্বে ও বারেন্দায় সভা হইবে । ক্রমে বিবাহের পূর্বদিন উপস্থিত হইল। অপরাহ চারিটার গাড়ীতে বর ও বরযাত্ৰিগণ৷ আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বরের পরিধানে মূল্যবান গায়ে ফুলকটা কামিজ, গলায় দীর্ঘ সোনার চেন, হাতে পাথর বসান পানিপথের যাতি 1/ফ্রী’ল” কথা, বরসজ্জার কিছুমাত্র ক্রটি হয় নাই। যুবা বর হইলে এরূপ সজ্জা করে কি না, জ্বৰ্গেই। কিন্তু সজ্জা হইলে কি হয়, বরের রূপ দেখিয়া আমার হরিভক্তি উড়িয়া গেল। বয়সূণ্ঠটি বৎসরের কম নহে, কৃষ্ণকায়, মুখে একটিও দাঁত নাই, মাথায় একগাছি কালো চুল ত কদাকার বৃদ্ধ। তাহার পর, সেই ফোকলা এরূপ কিন্তুতকদাকার রূপ বাহির যে, সত্যকথা বলিতে কি, তাহার দুই গালে দুই থাবড়া মারিতে আমার নিতান্ত ইচ্ছা হইতেছিল। দিগম্বরবাবু আমার কি ক্ষতি করিয়াছেন যে, তাহার উপর আমার এত রাগ? আমার পাতানো মেয়ে কুসী,- “বাবু’ হেন সুন্দর সুশীল যুবকের হাত হইতে, এইরূপ কদাকার হেঁদলকৎকুতের হাতে গিয়া পড়িবে, সেই চিন্তা আমার অসহ্য হইয়াছিল। যাহা হউক, এসব চিন্তা আমি মন হইতে দূর করিতে চেষ্টা করিতে লাগিলাম । বিবাহ সম্বন্ধে কোন কথায় লিপ্ত না থাকিয়া কেবল অভ্যাগত বরযাত্রীদিগের যাহাতে কোন কষ্ট না হয়, সেই কাৰ্য্যে ব্যস্ত রহিলাম। বর ও বরযাত্ৰিগণ তাঁহাদিগের বাসায় উপবেশন করিলে, সে স্থানে সহসা একটু গোলযোগ উপস্থিত হইল। কি হইয়াছে, জানিবার নিমিত্ত তাড়াতাড়ি আমি সে স্থানে গমন করিলাম। সে স্থানে গিয়া দেখিলাম যে, ফোকলা মহাশয় ক্রোধাবিষ্ট হইয়া একজন যুবক বরযাত্রীকে ভৎসনা করিতেছেন। আমাকে দেখিয়া তিনি কিছু অপ্ৰস্তুত হইয়া, ধীরভাবে মিনতি করিয়া সেই যুবককে বলিলেন,- “দে না ভাই, রসিক ! এ কি তামাসার সময়?” বর উত্তর করিলেন,- “এই দেখুন দেখি মহাশয়! আমার র্যাতিখানি লুকাইয়া রাখিয়াছে। S8 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comাির্ড” ”*** যাতিখানি, এই—এই এই এমনি করিয়া ট্যাকে স্ট্রজিয়া রাখিতে হয়। যাঁতিখানি ট্যাকে পুঁজিয়া না রাখিলে বরের অকল্যাণ হয় ।” কি করিয়া র্যাতিখানি ট্যাকে গুজিয়া রাখিতে হয়, বর আমাকে দেখাইলেন। আমি দেখিলাম বরযাত্ৰিগণ সকলেই চুপে চুপে হাসিতেছিলেন। বর পুনরায় আমাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, —“মহাশয়! যাতিখানি ফিরাইয়া দিতে আপনি রসিককে বলুন। এ সময় কিছু লোহার দ্রব্য শরীরে না। রাখিলে ভূতে পায়।” একজন বরযাত্রী আস্তে আস্তে বলিলেন,— “ভুত,—আপনার চেহারা দেখিলে ভয়ে পলাইবে না?” আমি আর কি বলিব, লজ্জায় ঘূণায় আমি সে স্থান হইতে চলিয়া আসিলাম। মনে মনে কহিলাম,- “হায় হায়! কুসীর কপালে কি এই ছিল।” অষ্টম পরিচ্ছেদ মাসীর খেদ সন্ধ্যার পর রসময়বাবু বরযাত্রীদিগের বাসায় /হবু জামাইবাবুকে সঙ্গে লইয়া তাঁহার নিজের বাটীতে গমন করিলেন। তাঁহাকে বাটীর পৃষ্ঠােঠর লইয়া অতি সমাদরের সহিত জলখাবার খাইতে দিলেন। জলযোগ করিয়া দিগম্বরূৰ্ব্বাস্ত্র বৈঠকখানায় আসিয়া বসিলেন । সেই সময় আমিও সে স্থানে গিয়া উপস্থিত হইলামাওঁবৈঠকখানার ভিতর অন্তঃপুরের দিকে দ্বারের নিকট আমি গিয়া দণ্ডায়মান হইয়াছি, এমন সময় বাড়ীর ভিতর হইতে অল্প অল্প ক্ৰন্দনের শব্দ আমার কৰ্ণ কুহরে প্রবেশ করিল। রসময়বাবুর সংসারে অভিভাবকস্বরূপ সেই যে বয়স্ক স্ত্রীলোকটি আছেন, তিনিই কাঁদিতেছিলেন। কাদিয়া কাদিয়া তিনি বলিতেছিলেন,- “হতভাগি! কেন যে এত রূপ লইয়া জগতে আসিয়াছিস! তোকে ছয়দিনের রাখিয়া তোর মা আঁতুড়ঘরে মরিয়া গেল। সেই দিন হইতে তোকে আমি প্রতিপালন করিলাম । তোর বাপ তোকে ফেলিয়া চলিয়া গেল। নিজে না খাইয়া তোকে আমি মানুষ করিলাম। এবার যা তোর কপালে ছিল, তা হইল। তোর জন্য ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম সব জলাঞ্জলি দিলাম। কত মিথ্যাকথা বলিলাম। তোর সুখের জন্য আমি ইহকাল-পরকাল সব নষ্ট করিলাম, শেষে একটা বুড়ে চাঁড়ালের হাতে পড়িবি বলিয়া কি, আমি এইসব করিলাম? ছিঃ! ছিঃ, কি তাের অদৃষ্ট!” দিগম্বরবাবু একথা শুনিতে পাইলেন কি না, তাহা আমি বলিতে পারি না। বোধ হয়, তিনি শুনিতে পান নাই; কারণ সেই সময় তিনি রসময়বাবু প্ৰভৃতির সহিত কথোপকথন করিতেছিলেন। আমি নিজেও সকল কথা শুনিতে পাই নাই; কেবল গুটিকতক কথা আমার কানে প্রবেশ করিয়াছিল। কিন্তু তাহাতেই আমি বুঝিলাম যে, এই স্ত্রীলোক রসময়বাবুর ভগ্ৰী নহেন, ইনি তাঁহার সেই আত্মীয়ের স্ত্রী,-যিনি কুসীকে প্রতিপালন করিয়াছিলেন। ফল কথা, ইনি আর কেহ নহেন, ইনি কুসীর মাসী,-যাহার কথা কাশীতে আমি শুনিয়াছিলাম। কাশীতে যখন আমি খবর দিতে ইচ্ছা করি, তখন কুসী ও “বাবু” আমাকে বলিয়াছিল যে, মেসো

    • firls six g3 881 - www.amarboicom a SS মহাশয় ও মাসী ভিন্ন সংসারে কুসীর আর কেহ নাই; তাহারাই “বাবু’র সহিত কুসীর বিবাহ দিয়াছিলেন। সেই সময় আরও শুনিয়াছিলাম যে, কুসীর মেসো মহাশয় পীড়িত ছিলেন। রসময়বাবুও সেদিন এই কথা বলিয়াছিলেন। কুসীর প্রতিপালকদিগকে তিনি কেবল আমার “আত্মীয়” এই বলিয়া উল্লেখ করিয়াছিলেন। এখন আমি বুঝিলাম যে, সেই “আত্মীয়” তাহার ভায়রাভাই ও প্ৰথম পক্ষের শালী ব্যতীত অন্য কেহ নহে।

বিবাহের দিন বৈকালবেলা রসময়বাবু আমাকে বলিলেন যে,- “কুসুম আজ সমস্ত দিন বিছানায় পড়িয়া আছে, কিছুতেই উঠিতেছে না। একরতি দুধ পৰ্যন্ত আজ তাহার উদরে যায় নাই। ক্রমাগত বলিতেছে যে, এসব উদ্যোগ বৃথা, বিবাহের পূর্বেই সে মরিয়া যাইবে। আপনি পূৰ্ব্বে বলিয়াছিলেন যে, তাহার আকার ঠিক মৃত লোকের ন্যায়। কিন্তু আজ একবার দেখিবেন চলুন। সত্য সত্যই সে মরিয়া যাইবে না কি?” রসময়বাবুর সহিত আমি বাটীর ভিতরে যাইলাম! কুসী বিছানায় পড়িয়া আছে। কিন্তু তাহার চক্ষে জল নাই। মুখ পূৰ্ব্বেই বিবৰ্ণ ছিল, আজ আরও হইয়াছে। আমাকে দেখিয়া সে চক্ষু মুদ্রিত করিল। তখন তাহাকে আরও শবের ন্যায় দেখাইতে লাগিল। কুসীকে বিছানা হইতে উঠিতে আমি বারবার অনুরোধ করিলাম। তাহার পিতার সাক্ষাতেই আমি তাহাকে বলিলাম,- “কুসুম! আমি ডাক্তার!! বুড়ো মানুষ! আমার এখন কাশীবাস হইলেই হয়। কাশী জানি তো? সেই কাশীতে গিয়া থাকিলেই হয়। তোমার মনে যদি কোন কথা থাকে তো চুপিচুপি মামূল্কে বল। আমি সত্য করিয়া বলতেছি। যে, নিশ্চয় তােমার আমি ভাল করিব, তোমার মৃত্যু আমার একটি পাতানো কন্যা ছিল। টুর্থসৰ্ব্বস্বন্তি হইতে প্ৰস্তুত আছি। কুসুম, মা! যদি তোমার মনে কোন কথা থাকে, তাহা হইলে আমাকে গোপনে বল। তোমার পিতাকে কিন্তু এই ঘটনার প্রকৃত অর্থাকিস্তােহা আমি জানিতে না পাবিলে, কি করিয়া আমি প্রতিবন্ধকতা করি? আমার প্রতি কুসীর বিশ্বাস হইবে, নিৰ্ভয়ে সে আমাকে মনের কথা বলিতে সাহস করিবে, সেই জন্য আমি “কাশী” শব্দ কয়বার উচ্চারণ করিলাম। সেই জন্য পাতানো মেয়ের কথা উল্লেখ করিলাম। কিন্তু কুসী চক্ষু উনীলিত করিল না, একটি কথাও বলিল না, চক্ষু মুদ্রত করিয়া ঠিক যেন মৃত লোকের মত পড়িয়া রহিল। আমি কুসীর হাত দেখিলাম, নাড়ী অতি দুৰ্ব্বল বটে, কিন্তু তাহাতে কোনরূপ রোগের চিহ্ন অথবা আশু মৃত্যুলক্ষণ কিছুই দেখিতে পাইলাম না। বাহিরে আসিয়া রসময়বাবুকে বলিলাম যে,- “আপনার কন্যার যেরূপ নাড়ী আমি দেখিলাম, তাহাতে মৃত্যু হইবার কোন ভয় নাই।” SAVO দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboicomo নবম পরিচ্ছেদ কিিষ্টা! কিিষ্টা কুঁথায় রে! কুসীর যে আর একবার বিবাহ হইয়াছে, কাশীতে তাহার পতিকে যে আমি দেখিয়াছি, এই সব কথা প্ৰকাশ করিবার নিমিত্ত সেদিনও আমার বারবার ইচ্ছা হইল। কিন্তু রসময়বাবু সে সব কথা অবগত আছেন কি না আছেন, তাহা আজি জানিতে পারি নাই। সকল কথা প্ৰকাশ করিলে কুসীর পক্ষে ভাল হইবে কি মন্দ হইবে, তাহাও আমি স্থির করিতে পারিলাম না। তাহার পর, ইহাদের সহিত আমার কোন সুবাদ সম্পর্ক নাই। বৃথা পরের ব্যাপারে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন কি? এইরূপ ভাবিয়া-চিন্তিয়া আমি চুপ করিয়া রহিলাম। কিন্তু এই কয়দিন ধরিয়া, যাহাতে এ বিবাহ না হয়, সে নিমিত্ত নিয়তই ভগবানের নিকট প্রার্থনা করিতেছিলাম। কোনরূপ দৈবঘটনাসূত্রে এ বিবাহ নিবারিত হইবে, কয়দিন ধরিয়া সেই আশা আমার মনে বলবতী ছিল। কিন্তু বিবাহলগ্ন যতই নিকটবৰ্ত্তী হইতে লাগিল, ততই সে আশা আমার মন হইতে তিরোহিত হইতে লাগিল। তবুও সন্ধ্যা পৰ্যন্ত, একটু কোনরূপ শব্দ হয়, কি কেহ উচ্চৈঃস্বরে কথা কয়, কি কেহ কোন স্থান হইতে দৌড়িয়া আসে, আর আমার হৃৎপিণ্ড “দূড়দৃড়” করিয়া উঠে, আর আমি মনে ভাবি, এইবার বুঝি এই কাল-বিবাহ-নিবারণের ঘটনা ঘটিল । আর একটি কথা। “বাবু’র সহিত হয়তো কুসীর বিরূহ হয় নাই। এই সব ব্যাপারের ভিতর হয়তো কোন মন্দ কথা আছে। সে সন্দেহও মনে বারবার উদয় হইতে লাগিল । কিন্তু যখন আবার কুসীর সেই মধুমাখা মুখপত্নীর "বাবু”র সেই সরল ভােব চিন্তা করিয়া দেখি, তখন সে সন্দেহ আমার মন হইত্ত্বে ত হয়। ফল কথা, আমি কিছুই বুঝিতে পারিলাম না । কোনরূপ দৈব ঘটনা ঘটিয়া এ ধীল-বিবাহ বন্ধ হইয়া যাইবে, অনুক্ষণ আমি সেই আশা করিতেছিলাম; কিন্তু আমার সকল আশা বৃথা হইল। সন্ধ্যা উপস্থিত হইল, বিবাহ নিবারণের নিমিত্ত কোনরূপ ঘটনা ঘটিল না। বিবাহের লগ্ন উপস্থিত হইল। যথাসময়ে সভায় বরকে আনিবার নিমিত্ত রসময়বাবু আমাকে প্রেরণ করিলেন। বরযাত্রীদিগের বাসায় গমন করিয়া বর ও বরযাত্রীদিগকে আমি গাত্ৰোথান করিতে বলিলাম। আর সকলে উঠিয়া দাড়াইলেন, বির উঠিলেন না। তিনি চীৎকার করিয়া বলিলেন,- “কিষ্টা! ও কিষ্ট!” আমি হতভম্ব হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। ইহার অর্থ কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। মনে মনে কহিলাম যে, “এ হতভাগা ফোকলার সব বিটকেল!” বর পুনরায় চীৎকার করিয়া উঠিলেন, — “কিষ্ট ! কিষ্টা কুথিায় রে!” যে বাটীতে বরযাত্রীদিগের বাসা হইয়াছিল, সেই স্থানে ফুলের বাগান ছিল। বৈশাখ মাস। সেই বাগানে অনেক যুঁই, চামেলি, বেলা প্রভৃতি ফুল ফুটিয়াছিল। সেই ফুল-বাগান হইতে একজন চীৎকার করিয়া উঠিল,-“ঐঃ! এই পদাই আৰ্জেজ্ঞ।” তখন আমি বুঝিতে পারিলাম যে, দিগম্বরবাবুর সঙ্গে যে বাঙ্গালী চাকর ছিল, তাহার নাম কিিষ্টা বা কৃষ্ণ । তাহাকেই তিনি ডাকিতেছিলেন। কিষ্টার বাড়ী বােধ হয় পশ্চিমবঙ্গে। দিগম্বরবাবু পুনরায় চীৎকার করিয়া বলিলেন,- “ঐঃ! শীগগির আয়! লগ্ন ভস্ম হয় যে রে!” ফেঙ্কলী দিগম্বর দুনিয়ার পাঠক এক হও! ... www.amarboi.com ~ SAVO কিষ্টা তাড়াতাড়ি আসিয়া তাহার হাতে একছড়া ফুলের মালা দিল। বাগান হইতে ফুল লইয়া চুপিচুপি একছাড়া মালা গাঁথিয়া চাকরকে তিনি আজ্ঞা করিয়াছিলেন। সেই মালার জন্য ব্যস্ত হইয়া তিনি চাকরকে ডাকিতেছিলেন । মালা পাইয়া হষ্টচিত্তে তাহা গলায় পরিয়া বির গাত্ৰোখান করিলেন । বর গাত্ৰোথান করিয়াছেন, এমন সময় রসময়বাবু হাঁপাইতে হাঁপাইতে দৌড়িয়া সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তখন ঠিক সন্ধ্যা হইয়াছিল; সন্ধ্যার পরেই বিবাহের লগ্ন ছিল। রাত্রি দশটার পর আর এক লগ্ন ছিল। রসময়বাবু আমার কানে কানে বলিলেন,- “কুসুম কিরূপ করিতেছে, শীঘ্য চলুন।” তাহার পর বরযাত্রীদিগকে লক্ষ্য করিয়া তিনি বলিলেন,- “মহাশয়গণ! আমার কন্যার শরীর সহসা কিছু অসুস্থ হইয়াছে। এ প্রথম লগ্নে বোধ হয় বিবাহ হইবে না। রাত্রি দশটার পর যে লগ্ন আছে, সেই লগ্নে বিবাহ হইবে।” রসময়বাবুর সহিত তাড়াতাড়ি আমি তাহার বাটীতে যাইলাম। যে ঘরে কুসী শয়ন করিয়াছিল, সেই ঘরে তিনি আমাকে লইয়া গেলেন। আমি দেখিলাম যে, কুসীর মুখ নিতান্ত রক্তহীন হইয়া বিবৰ্ণ হইয়াছে। চক্ষু বুজিয়া সে শয়ন করিয়া আছে। ডাকিলে উত্তর প্রদান করে না। হাত ধরিয়া দেখিলাম যে, তাহার নাড়ী আরও দুৰ্ব্বল হইয়া পড়িয়াছে। ঘর হইতে বাহির হইয়া আমি রসময়বাবুকে জিজ্ঞাসা করিলাম,- “আপনার বাড়ীতে অভিভাবকস্বরূপ যে স্ত্রীলোকটি আছেন, তিনি কি আপনার শালী, কুসুমের মুসী? তিনিই কি কুসুমকে প্রতিপালন করিয়াছেন?” 9)م( রসময়বাবু উত্তর করিলেন,- “হী। তি ইতুঙ্গুমের মাসী, তিনিই কুসুমকে প্রতিপালন করিয়াছেন।” 3) আমি বলিলাম, - “আপনার ‘ণ আমি ভাল দেখিলাম না। তাহাকে কিছু ঔষধ দিতে হইবে। কিন্তু কুসুমের গোপনে দুই-চারিটি কথা জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা! করি। স্ত্রীলোকদিগের নানা প্রকার রোগ হয়। ডাক্তার ভিন্ন অন্য লোকের সে সব কথা শুনিয়া আবশ্যক নাই। কুসুমের মাসীকে জিজ্ঞাসা করিয়া, তাহার পরে আমি ঔষধের ব্যবস্থা করিব।” বাড়ীর ভিতর একপার্শ্বে ছোট একটি ঘর ছিল, সেই ঘরে আলো জুলিতেছিল। দুইজন পাঞ্জাবী স্ত্রীলোক তাহার ভিতর বসিয়া কি করিতেছিল। রসময়বাবু তাহাদিগকে সে ঘর হইতে বাহির করিয়া দিলেন। ঘরের ভিতর দ্বারের নিকট একখানি চারপাই ছিল । আমাকে সেই চারপাইয়ে বসিতে বলিয়া রসময়বাবু চলিয়া গেলেন। অল্পক্ষণ পরে কুসুমের মাসী আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সম্পূর্ণভাবে নয়, কিন্তু ঘোমটা দ্বারা কতকটা তিনি মুখ আবৃত করিয়াছিলন। আমি তাহাকে বলিলাম,- “কুসুমের প্রাণ সংশয় হইয়াছে। আপনি বোধ হয় জানেন যে, আমি একজন ডাক্তার। আপনাকে সকল কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া আমি তাহাকে ঔষধ দিতে পারিতেছি না। তাহার সম্বন্ধে অনেক কথা আছে। আপনি বসুন। দাঁড়াইয়া থাকিলে হইবে না।” মাসী মুদুস্বরে উত্তর করিলেন, — “কুসুমকে তুমি ভাল কর, বাবা! কুসুমকে লইয়া আমি সংসারে আছি। ছয় দিনের মেয়েকে আমার হাতে দিয়া তাহার মা মারা পড়িয়াছে। সেই অবধি St দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comন্মিলাকনাথ রচনাসংখহ আমি তাহাকে মানুষ করিয়াছি। তুমি তাকে ভাল কর, বাবা!” আমি উত্তর করিলাম,- “রসময়বাবুর সহিত আমার ভাই-সম্পর্ক। কুসুমকে আমি কন্যার মত দেখি। সে জন্য আপনি আমাকে বাবা বলিতে পারেন না। কুসুমকে ভাল করিতে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করিব। কিন্তু তাহার রোগের কারণ কি, তাহা জানিতে না পারিলে কি করিয়া আমি ঔষধ দিব?” মাসী বলিলেন,- “আর বৎসর এই সময় তাহার জ্বর-বিকার হয়। তাহার পর—” আমি বলিলাম,- “সে কথা নয়। আমি আপনাকে যে যে কথা জিজ্ঞাসা করিব, তাহার উত্তর ঠিক দিবেন কি না?” মাসী উত্তর করিলেন,- “তা কেন দিব না! আমার কুসীর প্রাণ বড়, না। আর কিছু বড়।” আমি বলিলাম,- “তবে আপনি বসুন। অনেক কথা আমি জিজ্ঞাসা করিব।” মাসী দ্বারের নিকট ভূমিতে উপবেশন করিলেন। আমি চারপাইয়ের উপর বসিয়া রহিলাম। আমি বলিলাম,- “কুসুমকে আমি ইহার পূর্বে দেখিয়াছি। দুই বৎসরের অধিক হইল, তাহার সহিত কাশীতে আমার সাক্ষাৎ হইয়াছিল। তাহার সহিত সে সময় একজন অল্পবয়স্ক পুরুষমানুষ ছিল। কুসুম তাহাকে ‘বাবু বলিয়া ডাকিত। কুসুম আমাকে বলিয়াছিল যে, ‘বাবু তাহার স্বামী। সে কথা যদি সত্য হয়, তাহা হইলে এসব আবার কি?” আমার পা দুইটি ভূমিতে ছিল। কুসুমের মাসী শশব্যস্ত হইয়া সেই পা জড়াইয়া ধরিলেন। মাসী বললেন,- “পাপ হউক, পুণ্য হউক, কুসীর ভূলর জন্য আমি এ কাজ করিতেছি। তোমার পায়ে পড়ি, তুমি কোন কথা প্ৰকাশ করিও করিলে বড় কেলেঙ্কারি হইবে। পৃথিবীতে আমি আর মুখ দেখাইতে পারিব না! হাড়ীক্ষণ না তুমি আমার কথা স্বীকার করবে, ততক্ষণ আমি তোমার পা ছাড়িব না।” g “ও কি করেন। ও কি করেন!” আমার পা সরাইয়া লইতে চেষ্টা করিলাম । কিন্তু মাসী কিছুতেই আমার পা ছাড়ি । আমি বড় বিপদে পড়িলাম। আমি বলিলাম,- “আপনি স্থির । কেহ যদি এ স্থানে আসিয়া পড়ে, তাহা হইলে সে কি মনে করিবে! যদি কুসুমের প্রতি নিতান্ত কোনরূপ অন্যায় না দেখি, তাহা হইলে আমি প্ৰকাশ করিব না। আপনাদের ঘরের কথায় আমার প্রয়োজন কি? পাপ হয়, পুণ্য হয়, তাহার জন্য আপনারা দায়ী। আমার তাহাতে কি? কিন্তু কুসীর প্রতি আপনারা কোন অত্যাচার করিতেছেন কি না, তাহা আমাকে বুঝিয়া দেখিতে হইবে?” মাসী উত্তর করিলেন,- “কুসীর প্রতি অত্যাচার! যাহার জন্য এই কলঙ্কের পসরা আমি মাথায় লইতেছি, তাহার প্রতি আমি অত্যাচার করিব! রায় মহাশয় কোন কথা জানে না।” আসি বলিলাম,- “রসময়বাবু যে কিছু জানেন না, তাহা আমি বুঝিতে পারিয়াছি। এখন বলুন, সে ‘বাবু কে? সে প্রকৃত কুসুমের স্বামী কি না? যদি কুসুমের সহিত তাহার বিবাহ হইয়া থাকে, তাহা হইলে পুনরায় তাহার বিবাহ দিতেছেন কেন?” ইতিপূৰ্ব্বে মাসী আমার পা ছাড়িয়া দিয়াছিলেন। এখন তিনি পুনরায় দ্বারের নিকট গিয়া বসিলেন। কাহাকেও আসিতে দেখিলে তিনি সাবধান হইতে পরিবেন, সে নিমিত্ত দ্বারের একটু বাহিরে বারেণ্ডাতে তিনি উপবেশন করিলেন। তাহার পর তিনি পূৰ্ব্ববৃত্তান্ত আমাকে বলিতে লাগিলেন। এই পূৰ্ব্ববৃত্তান্ত আমি আমার নিজের কথাতে বলিব; কুসুমের মাসী যেভাবে বলিয়াছিলেন, সেভাবে বলিব না। তাহার কারণ এই যে, তিনি সংক্ষেপে সকল কথা বলিয়াছিলেন। এই ফোকুলা দিগম্বর sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro SAĐ& সমুদয় ঘটনার পরে অন্যান্য লোকের মুখ হইতে আমি যে সকল কথা সংগ্ৰহ করিতে সমর্থ হইয়াছি, তাহাও আমি এই বিবরণে যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিলাম। তৃতীয় ভাগ প্ৰথম পরিচ্ছেদ সূতিকাগার কুসীর পূর্ববৃত্তান্ত অবগত হইতে হইলে, আমাদিগের চব্বিশ পরগণা জেলার অন্তঃপাতী সামান্য একখানি গ্রামে গমন করিতে হইবে। সেই গ্রামে একটি একতলা কোটা বাড়ী আছে, সেই কোটা বাড়ীতে দুইটি ঘর আছে। তাহার সম্মুখে একখানি চালাঘর আছে। সেই চালার শুক মুকুম মরুভূক্ত। সেই ভাগে বান্না হয়! গুর ভাগ আবৃত নহে, তাহাতে কাঠ পাতা ঘুটে প্রভৃতি দ্রব্য থাকে। (C) চালার সে ভাগে এখন কাষ্ঠ প্রভৃতি দ্রব্য নারিকেলপাতা দিয়া এখন সেই ভাগ সামান্যভাবে আবৃত করা হইয়াছে। পাতাগুলি এরূপ দূরে দূরে সন্নিবেশিত হইয়াছে যে, তাহা দ্বারা কেবল একটু সুড়ার্ল হইয়াছে মাত্র। আমি এখনকার কথা বলতেছি নষ্টস্স্পনের ষোল বৎসর পূৰ্ব্বে যাহা ঘটিয়াছিল, সেই কথা বলিতেছি। এ সমুদয় ঘটনা আমি চক্ষে দেখি নাই; সে স্থানে আমি উপস্থিতও ছিলাম না। কুসীর মাসী ও অন্যান্য লোকের মুখে যাহা শুনিয়াছি, তাহাই আমি বলিতেছি। বর্ষাকাল। দুৰ্জ্জয় বাদল। টিপটপ করিয়া সৰ্ব্বদাই জল পড়িতেছে। মাঝে মাঝে এক একবার ঘোর করিয়া প্ৰবল ধারায় বৃষ্টি হইতেছে। হু-হু করিয়া শীতল পূৰ্ব্ব-বায়ু প্রবাহিত হইতেছে। ঘর হইতে বাহির হয়, কাহার সাধ্য! এই দুৰ্য্যোগে নারিকেলপত্র দ্বারা আবৃত সেই চালার ভিতর এক ভদ্রমহিলা শয়ন করিয়া আছে। একখানি গলিত, নানাস্থানে ছিন্ন, পুরাতন ময়লা বস্ত্ৰ স্ত্রীলোকটি পরিধান করিয়াছিলেন। সেইরূপ একখানি ছিন্ন পুরাতন মাদুর ও ছোট একটি ময়লা বালিশ ভিন্ন আর কিছু বিছানা ছিল না। যে মৃত্তিকার উপর এই মাদুরটি বিস্তৃত ঝাপটা আসিতেছিল; তাহাতে বিছানা, স্ত্রীলোকটির পরিধেয় কাপড় ও সৰ্ব্বশরীর ভিজিয়া যাইতেছিল। সেই পাতার ফাঁক দিয়া সৰ্ব্বদাই বাতাস আসিতেছিল! সেই জলে, সেই বাতাসে, সেই ভিজা মেজেতে, সেই ভিজা মাদুরে সেই ভিজা কাপড়ে স্ত্রীলোকটি পড়িয়াছিল। এরূপ অবস্থায় সহজ মানুষের কম্প উপস্থিত হয়। কিন্তু সে স্ত্রীলোকটির অবস্থা সহজ ছিল না। বিছানার নিকট কিঞ্চিৎ দূরে কাঠের আগুন জুলিতেছিল। আগুন জলিতেছিল বটে, কিন্তু তাহাতে সে চালার ভিতর বিন্দুমাত্র উত্তাপের সঞ্চার হয় নাই। স্ত্রীলোক এবং আগুন এই দুইয়ের মধ্যস্থলে S8o দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboicon:5'" ছিন্ন দ্বারা আবৃত একটি নবপ্রসূত শিশু নিদ্রা যাইতেছিল। আজ চারি দিন এই শিশু জন্মগ্রহণ করিয়াছে। ইহাই সূতিকাগার। যে স্ত্রীলোকটি মাদুরে শয়ন করিয়াছিলেন, তিনিই প্ৰসূতি। এই সঙ্কট সময়ে তিনি এইরূপ আৰ্দ্ৰ নারিকেলপাতায় সামান্যভাবে আবৃত চালাঘরে পড়িয়া ভিজিতেছিলেন। কেবল তাহা নহে। তিনি উৎকট রোগগ্ৰস্ত হইয়াছিলেন। প্রসবের একদিন পরে তাঁহার জুর হয়; তাহার পরদিনই সেই জ্বর,-বিকারে পরিণত হয়; এক্ষণে তিনি একেবারে জ্ঞানশূন্য হইয়া পড়িয়াছেন। জ্ঞানশূন্য হইয়া ক্রমাগত এপাশ-ওপাশ করিতেছেন; ক্রমাগত তাহার মস্তক সেই ক্ষুদ্র বালিশের উপর হইতে পড়িয়া যাইতেছে। কখনও উচ্চৈঃস্বরে কখনও-বা বিড়বিড় করিয়া তিনি বকিতেছেন। তাঁহার শিয়ারদেশে আর একটি স্ত্রীলোক বসিয়া আছেন। তিনি দাই নহেন, ভদ্র-কন্যা বলিয়া তাঁহাকে বোধ হয়। পীড়িত স্ত্রীলোকের সহিত তাহার মুখের সাদৃশ্য দেখিয়া, তাঁহাকে বড় ভগিনী বলিয়া বােধ হয়। পীড়িতার মস্তক যখন বালিশ হইতে নীচে পড়িয়া যাইতেছিল, তখন তাঁহার মস্তক পুনরায় তিনি বালিশের উপর তুলিতেছিলেন। ঘোর তৃষ্ণায় কাতর হইয়া পীড়িত। যখন হাঁ করিতেছিলেন, তখন একটু একটু জল দিয়া তিনি তাঁহার শুষ্ক মুখ ক্ষণকালের নিমিত্ত সিক্ত করিতেছিলেন। পীড়িত যখন বিড়বিড় করিয়া বকিতেছিলেন, তখন তিনি তাঁহার মস্তক অবনত করিয়া তাঁহার মুখের নিকট আপনার কান রাখিয়া কথা বুঝিবার জন্য চেষ্টা করিতেছিলেন। কিন্তু সে সমুদয় প্ৰলাপবাক্য, সে কথার কোন অর্থ ছিল না। বিকারের বলে পীড়িত যখন উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিতেছিলেন, তখন তিনি মাঝে মাঝে তাঁহাকে প্ৰবোধ দিয়া বলিতেছিলেন,- “ক্ষান্ত! স্থির হও; ক্ষান্ত! স্থির হও!” গাভীদুগ্ধ পান করাইতেছিলেন। পীড়িতা ও অপরাষ্ট্রেই স্ত্রীলোকটি ব্যতীত এ বাড়ীতে আর কেহ। ছিল না। অপর স্ত্রীলোকটি পীড়িতার বড় ভ । তাহার বাটী এই গ্রাম হইতে আট-দশ ক্রোশ দূরে। ভগিনীর পূর্ণ গৰ্ভ হইলে, তাহার শুশ্রুষার নিমিত্ত তিনি আসিয়াছিলেন। তাহার পর এই বি দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পীড়িতা প্ৰসূতি পীড়িতা প্ৰসূতির এইরূপ অবস্থা। সে সংসারের এইরূপ অবস্থা। অপরায় হইয়াছে,বেল প্রায় ছয়টা বাজিয়া গিয়াছে। বৃষ্টি নিয়তই পড়িতেছে। মেঘাচ্ছন্ন পৃথিবীতে সন্ধ্যার অন্ধকার ঢাকিবার উপক্ৰম করিতেছে। এই সময় একজন প্রতিবাসিনী ভিজিতে ভিজিতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। W প্রতিবাসিনী জিজ্ঞাসা করিলেন, — “বীে এখন কেমন আছে গা?” পীড়িতার ভগিনী উত্তর করিলেন,- “আর বাছা! কেমন থাকার কথা আর নেই! এখন রাতটি কাটিলে হয়।” এই বলিয়া তিনি কাঁদিতে লাগিলেন। চক্ষু দিয়া তাঁহার টপ্‌টপূ করিয়া জল পড়িতে লাগিল । ফোকুলা দিগম্বর SBS sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro পীড়িতার মাথা পুনরায় বালিশের নিম্নে গিয়া পড়িল। আঁচল দিয়া চক্ষু মুছিয়া, তাড়াতাড়ি তিনি মাথাটি তুলিয়া বালিশের উপর রাখিলেন। প্রতিবাসিনী পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন,- “রসময়ের কোন খবর নাই?” ভগিনী উত্তর করিলেন,- “পরশু তাহাকে পত্ৰ দিয়াছি। চিঠিখানি রেজেক্টারি করিয়াছি; কাল সে পাইয়া থাকিবো। আজ তাহার আসা উচিত ছিল, কিন্তু এ দুৰ্যোগে সে কি করিয়া আসিবে, তাই ভাবিতেছি।” প্ৰতিবাসিনী জিজ্ঞাসা করিলেন,- “খুকী কেমন আছে?” ভগিনী উত্তর করিলেন,- “সে আছে ভাল! পোড়ারমুখী মাকে খাইতে আসিয়াছিল। দেখ গা! পৃথিবীতে আর আমাদের কেহ নাই; মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই, কেহ নাই! সংসারে আমার কেবল এই ক্ষান্ত ছিল। দিদি বলিতে ক্ষান্ত অজ্ঞান হইত। আমার ছেলে-পিলে হয় নাই। মনে করিয়াছিলাম, ক্ষান্তর পাঁচটা হইবে, তাদের মুখ দেখিয়া আমি সুখী হইব।। কৰ্ত্তাও ক্ষান্তকে বড় ভালবাসেন। রায় মহাশয়ের পত্র যাই তিনি পাইলেন, আর তৎক্ষণাৎ আমাকে পঠাইয়া দিলেন। ক্ষান্তর ছেলে হইবে, মনে মনে কত আশা করিয়া আমি আসিলাম। ক্ষান্ত যে আমাকে ফেলিয়া চলিয়া যাইবে, একথা এখনও মনে ভাবি নাই।” এই কথা বলিয়া তিনি পুনরায় কঁদিতে লাগিলেন। প্রতিবাসিনী প্ৰবোধ দিয়া বলিলেন,- “ভয় নাই, ভাল হইবে । মানুষের রোগ কি হয় না? যদুর স্ত্রীর আঁতুড়ে এইরূপ হইয়াছিল। ভাল হইয়া আবার কত ছেলে-পিলে তাহার হইয়াছে। দাই গেল?” ভগিনী উত্তর করিলেন,- “দুই প্ৰহরের সময় র নিমিত্ত সে বাটী। গিয়াছে। সেই পৰ্যন্ত এখনও আসে নাই; বােধ হয়। শীঘ্রই আঙ্গু প্ৰতিবাসিনী বলিলেন,- “ঔষধ-পালা ਕ?" ভগিনী উত্তর করিলেন, — “ঐ গ্রামে হইবে? দাই কি ঔষধ দিয়াছিল।” ৰ প্রতিবাসিনী বলিলেন,- “দাই , তেল গরম করিয়া সৰ্ব্বশরীরে মাখাইয়া উত্তমরূপে তাপ দিতে বলিবো।” এই বলিয়া প্ৰতিবাসিনী চলিয়া গেলেন । বলা বাহুল্য যে, এই পীড়িত স্ত্রীলোকটি আর কেহ নহেন, ইনি রসময়বাবুর প্রথম পক্ষের স্ত্রী। রসময়বাবু তখন কলিকাতায় কৰ্ম্ম করিতেন। তিনি তখন অতি অল্প বেতন পাইতেন। দাস-দাসী রাখিবার তখন তাহার ক্ষমতা ছিল না। তাহার অন্য অভিভাবকও কেহ ছিলেন না । অগত্যা স্ত্রীকে একেলা ছাড়িয়া কলিকাতায় তাঁহাকে থাকিতে হইত। কিন্তু তাহার জন্য বিশেষ ভাবনার কোন কারণ ছিল না; প্রতিবাসী ও প্রতিবাসিনীগণ সকলেই তাঁহার স্ত্রীর তত্ত্বাবধান করিতেন। এই বিপদের সময়ও তাঁহারা দিনের মধ্যে ভিজিতে ভিজিতে অনেকবার আসিয়া তত্ত্ব লাইতেছিলেন। আবশ্যক হইলে তাহারা আনিয়া দিতেন। কিন্তু চারি ক্রোশ দূরে একখানি গণ্ডগ্ৰাম হইতে ডাক্তার আনিতে হইত। একবার ডাক্তার আনিতে দশ টাকা খরচ হয়। সে টাকা ৱসময়বাবুর স্ত্রীর ভগিনীর হাতে ছিল না। প্রসবকালে ভগিনীর সেবা করিবার নিমিত্ত সম্প্রতি তিনি সেই গ্রামে আসিয়াছিলেন। তাহার স্বামী অল্প বেতনে সামান্য একটি চাকরী করিয়া দিনপাত করিতেন। সেজন্য টাকা-কড়ি লইয়া তিনি ভগিনীর গৃহে আগমন করেন নাই। বাঁধা দিয়া টাকা কজর্জ করিবেন, এরূপ গহনাও তাঁহার নিকট ছিল না। রসময়বাবুর নিকট তিনি পত্ৰ প্রেরণ করিয়াছিলেন। ভগিনীপতি শীঘ্রই আসিয়া উপস্থিত হইবে। সে আসিয়া ডাক্তার আনিবে, নাই, কবিরাজ নাই, ঔষধ-পালা কি করিয়া SR8 R দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comাির্ড”******** সেই প্ৰতীক্ষায় তিনি পথপানে চাহিয়াছিলেন। ৱসময়বাবু সন্ধ্যার পর আসিয়া উপস্থিত হইলেন। স্ত্রীর অবস্থা দেখিয়া তিনি অধীর হইয়া পড়িলেন। সেই রাত্রিতেই তিনি চারি ক্রোশ দূরে ডাক্তার আনিতে দৌড়িলেন। কিন্তু সে দুৰ্যোগে পালুকী-বেহারাগণ বাহির হইতে সম্মত হইল না। স্ত্রীর অবস্থা বলিয়া ডাক্তারের নিকট হইতে কিছু ঔষধ লইয়া বিরাসবদনে রাত্রি দুইটার সময় তিনি প্রত্যাগমন করিলেন। তৃতীয় পরিচ্ছেদ খুকীকে ভুলিও না পরদিন প্ৰাতঃকালে ডাক্তার আসিয়া উপস্থিত হইলেন। এরূপ রোগ আমি অনেক দেখিয়াছি; ভালরূপ চিকিৎসা হইলেও এ রোগ কচিৎ কেহ রক্ষা পাইয়া থাকে। ডাক্তার আসিয়া প্ৰথম সূতিকা-ঘর দেখিয়াই জলিয়া উঠিলেন। তিনি বলিলেন,- “এরূপ স্থানে সুস্থ মানুষ থাকিলেও মরিয়া যায়! কোন প্ৰাণে পীড়িতা প্ৰসূতিকে আপনারা এরূপ স্থানে রাখিয়াছেন?” রসময়বাবু কোন উত্তর করিলেন না। কিন্তু একজনুগ্ৰীণ প্রতিবাসী বলিলেন, — “আপনি যে বিলাতী সাহেব দেখিতে পাই। আপনার বাড়ীতে কি হয়? আপনি যখন জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তখন আপনার আঁতুড় ঘরের জন্থ'মীবৃবেল পাথরের মনুমেন্ট প্রস্তুত হইয়াছিল न दि?" ডাক্তার কিছু অপ্রতিভ হইয়া “প্ৰসূতিকে আপনারা ঘরের মধ্যে লইয়া যাইতে পারেন না?” রসময়বাবু উক্তর করিলেন, — “এ পল্লীগ্রাম। দুই চারিটা নারিকেলপাতা দিয়া চিরকাল আমাদের আঁতুড় ঘর হয়। আজ যদি আমি তাহার অন্যথা করি, তাহা হইলে সকলে আমার নিন্দা কৱিবে ।” ডাক্তার আর কোন কথা বলিলেন না, বলিবার বড় প্রয়োজনও ছিল না; কারণ, পীড়িতার তখন আসন্নকাল উপস্থিত হইয়াছিল। ঔষধের ব্যবস্থা করিয়া ডাক্তার চলিয়া গেলেন। পীড়িতা প্ৰসূতি যে এপাশ-ওপাশ করিতেছিলেন, ক্রমে তাহা স্থির হইয়া আসিল। নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস কাৰ্য্য অতি কষ্টে সম্পন্ন হইতে লাগিল। রসময়বাবু ও তাঁহার শালী বুঝিলেন যে, আর অধিক বিলম্ব নাই। দুইজনে দুই পার্শ্বে বসিয়া রহিলেন। অবিরল ধারায় চক্ষুর জল পড়িয়া, দুইজনের বক্ষঃস্থল ভাসিয়া যাইতে লাগিল। অপরাহ প্ৰায় তিনটা বাজিয়া থাকিবে, এমন সময় রোগিণীর সহসা একটু জ্ঞানের উদয় হইল। বিস্মিত মনে তিনি চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন। তাহার পর অতি ধীরে ধীরে তিনি বলিলেন,- “এ কি! আমি কোথায়?” মস্তক অবনত করিয়া রসময়বাবু তাঁহার মুখের নিকট আপনার কর্ণ রাখিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ তিনি আর কোন কথা বলিলেন না। স্থিরভাবে তিনি যেন চিন্তা করিতে লাগিলেন। চিন্তা করিয়া তাহার যেন সকল কথা মনে হইল। তখন ভগিনীর মুখের দিকে চাহিয়া তিনি বলিলেন, — “দিদি!” ফোকুলা দিগম্বর sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro S8wo নিকটে অগ্রসর হইয়া, ভগিনী মস্তক অবনত করিয়া, কান পাতিয়া রহিলেন। রোগিণী অতি মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন,— “যা হইয়াছিল, তা আছে?” ভগিন উত্তর করিলেন,- “আছে বই কি?” এই বলিয়া তিনি তাড়াতাড়ি খুকীকে লইয়া তাঁহার সম্মুখে ধরিলেন। রোগিণী আস্তে আস্তে খুকীর ক্ষুদ্র হস্তটি ধরিয়া ভগিনীর হস্তের উপর রাখিয়া বলিলেন, — “তোমাকে দিলাম।” তাহার পর রসময়বাবুর হাতটি ধরিয়া তিনি সেইরূপ মৃদুস্বরে বলিলেন, — “বাবু! তবে যাই! কিছু মনে করিও না। তুমি পুনরায় বিবাহ করিবে। আমাকে একেবারে ভুলিও না। খুকী দিদির কাছে থাকিবে। খুকীকে ভুলিও না। তবে যাই।” অতি কষ্টে, হাঁপাইতে হাঁপাইতে, এক একটি করিয়া এই কথাগুলি তিনি রসময়বাবুকে বলিলেন। তাহার পর আর তিনি কথা কহিতে পারিলেন না। পরমুহুর্তেই তাঁহার ভগিনী কাদিয়া উঠিলেন। এই অল্প বয়সেই তাঁহার ইহলীলা সমাপ্ত হইয়া গেল। কাদিতে কাঁদিতে রসময়বাবু সে স্থান হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। কিছুদিন পরে রসময়বাবুর শালী, -খুকীকে লইয়া স্বগ্রামে প্ৰস্থান করিলেন। রসময়বাবুও কলিকাতা চলিয়া গেলেন। রসময়বাবু একবার আমাকে বলিয়াছিলেন যে, তাহার অন্তঃকরণ নিতান্ত কোমল। সে কথা সত্য। বৰ্ম্মণীর মৃত্যুর পর তিনি যে ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়াছিলেন, তাহা আমি স্বচক্ষে দেখিয়াছিলাম। আমি শুনিয়াছি যে, তাহার এই প্ৰথম স্ত্রী-বিয়োগের পরেও তিনি শোকে অধীর হইয়া পড়িয়াছিলেন। সূতিকাগারে পত্নীৱ রোগিণীর নিমিত্ত কলিকাতা হইতে তিনি এক বৃেন্তৰ্ল’ব্র্যাপ্তি লইয়া গিয়াছিলেন। শোকজীবিয়্যোগুর সময়বাবু এতদূর অধীর হইয়া পড়লেন যে, কাজ-কৰ্ম্ম তিনি আর কিছুই করিতে পারিাষ্ট্ৰন না। চাকরী ছাড়িয়া পাগলের ন্যায় তিনি দেশ চতুৰ্থ পরিচ্ছেদ নিবিড় বনে দেবকন্যা রসময়বাবুর শালী,-কন্যাটিকে প্রতিপালন করিতে লাগিলেন। যখন সে ছয় মাসের হইল, তখন তাঁহারা স্ত্রী-পুরুষে পরামর্শ করিয়া, তাহার নাম কুসুমকুমারী রাখিলেন। বলা বাহুল্য যে, তাহাকেই বিবাহ করিবার নিমিত্ত ফোকলা দিগম্বর মহাশয়ের শুভাগমন হইয়াছে। ব্ৰহ্মদেশে কৰ্ম্ম পাইয়া রসময়বাবু প্ৰথম প্রথম ভায়রা-ভাইকে চিঠি-পত্ৰ লিখিতেন। কুসীর প্রতিপালনের নিমিত্ত মাঝে মাঝে টাকাও পাঠাইতেন। কুসীর যখন পাঁচ বৎসর বয়স, তখন বৰ্ম্মণী তাঁহার গৃহের গৃহিণীত্ব-পদ প্রাপ্ত হইল। সেই সময় হইতে র্তাহার পানদােষও দিন দিন বৃদ্ধি হইতে লাগিল! ক্ৰমে ক্রমে তিনি ভায়রা-ভাইকে পত্ৰাদি লেখা বন্ধ করিয়া দিলেন। ক্ৰমে ক্ৰমে তিনি কুসীকে S88 fing <nž3. g3 ze - www.amarboi.comfoo3"*"***"**** বিস্মৃত হইলেন। সেই সময় হইতে কন্যার প্রতিপালনের নিমিত্ত আর একটি পয়সাও তিনি প্রেরণা করিলেন না । কুসীর মেসো-মহাশয় আট টাকা বেতনের সামান্য একটি চাকরী করিতেন। পল্লীগ্রামের খরচ অল্প, সেই আট টাকাতেই কোনোরূপে তাহার দিনপাত হইত। ইহাতে কষ্টে সংসার চলে বটে, কিন্তু সঞ্চয় কিছু হয় না। সে নিমিত্ত কুসীর বয়ঃক্রম যখন দশ বৎসর হইল, তখন তাহার বিবাহের নিমিত্ত ইনি বড়ই চিন্তিত হইলেন। তিনি দেখিলেন যে, অতি সংক্ষেপে বিবাহ দিলেও দুই শত টাকার কমে হয় না। কিন্তু যখন দুইটি পয়সা হাতে নাই, তখন দুই শত টাকা তিনি কোথায় পাইবেন? কুসীর বিবাহের নিমিত্ত রসময়বাবুকে ইনি বারবার পত্র লিখিলেন। রসময়বাবু একখানি পত্রেরও উত্তর দিলেন না। কুসীর বয়স বারো বৎসর উত্তীর্ণ হইয়া গেল, তবুও তাহার বিবাহ হইল না! এই সময় আর একটা বিপদ ঘটিল। কুসীর মেসো-মহাশয় পীড়াগ্রস্ত হইয়া শয্যাশায়ী হইয়া পড়িলেন। কুসীর বিবাহ দেওয়া দূরে থাকুক, তাঁহাদের দিন চলা ভার হইয়া উঠিল। আমাদের চিন্তা করা বৃথা, যিনি মাথার উপরে আছেন, তিনি যাহা করেন, তাঁহাই হয়। মেসো-মহাশয়ের বাটী হইতে কিছুদূরে গ্রামের প্রান্তভাগে বৃহৎ একটি বাগান আছে। সেই বাগানের মাঝখানে একটি পুষ্করিণী আছে। উপরে আম, কঁঠাল, নারিকেল প্রভৃতি ফলের গাছ, নিম্নে ছোট ছোট বন-গাছ, নানপ্রকার তরু-পল্লবসম্বলিত নিবিড় বন দ্বারা পুকুরটির চারি ধার আবৃত রহিয়াছে। পুকুরটিতে বাঁধা ঘাট নাই; সে স্তু আনিতে যায় না। দুই ধারে বন, মাঝখানে গরু ও মানুষত্ত সঙ্কীর্ণ পথ। সেই পথ পুষ্করিণীর একপার্শ্বে কৃটিম ঘাটে গিয়া শেষ হইয়াছে। মানুষে এ সূক্ষ্মান্য একটু ঘাটের মত হইয়াছে এইমাত্র। স্থানটি বালিকা বটে, কিন্তু বয়ঃক্রম দ্বাদশ উত্তীর্ণ হইয়া থাকিবে। তবে তাহার সীথিতে সিন্দুর ছিল না। আমি অবশ্য তাহা দেখি নাই; কারণ, আমি সে স্থানে উপস্থিত ছিলাম না। কিন্তু পুষ্করিণীর অপর পার্শ্বে বনের ভিতর লুক্কায়িত থাকিয়া, ছোট একগাছি ছিপ লইয়া, যে লোকটি পুঁটিমাছ ধরিতেছিল, সে লোকটি সমুদয় দেখিয়াছিল। কি নিমিত্ত বালিকা ক্ৰন্দন করিতেছিল, তাহাও সে বুঝিতে পারিয়াছিল। একবার ঐ লোকটিকে ভাল করিয়া দেখা। ফুট গৌরবর্ণ, বিমল-কান্তি, সত্য-উচ্চভাব-দয়া-মায়া-পূর্ণ মুখশ্ৰী:- নানাগুণসম্পন্ন ঐ যে যুবক বনের ভিতর বসিয়া আছে, উহাকে একবার ভাল করিয়া দেখ। যেদিন কুসী মাতৃহীনা হয়,সেই রাত্ৰিতে বিধাতা আসিয়া উহারই নাম শিশুর ললাটে লিখিয়াছিলেন। যুবকের বয়ঃক্রম সতের কি আঠারো হইবে। কিছুক্ষণ পূৰ্ব্বে বাম হস্তে একটু ময়দা মাখিতে মাখিতে দক্ষিণ হস্তে পুঁটিমাছ ধরিবার ছােট ছিপগাছটি লইয়া, সে এই পুষ্করিণীর ধারে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল। প্রথম ঘাটের নিকট গিয়া দেখিল যে, সে স্থানে অতিশয় রৌদ্র। সে নিমিত্ত পুকুরের বিপরীত দিকে গিয়া অতি কষ্টে জঙ্গল ঠেলিয়া বনের ভিতর সে মাছ ধরিতে বসিয়াছিল। অল্পক্ষণ পরেই ঘাটের দিকে মানুষের পদশব্দ হইল। সে চাহিয়া দেখিল। অলৌকিক রূপলাবণ্যসম্পন্না এক বালিকাকে সেই নিৰ্জ্জন স্থানে একাকী আসিতে দেখিয়া, যুবক চমকিত হইল। বালিকার যৌবন আগতপ্ৰায়। এ নিবিড় বনে— এই নিৰ্জন স্থানে, কোন দেবকন্যা আগমন করিলেন না কি! এমন রূপ তো কখনও দেখি নাই । অনিমেষ নয়নে সে """ firls six gas 38 - www.amarboicom a :8(? সেই বালিকার দিকে চাহিয়া রহিল। সামান্য একখানি পাছ-পেড়ে বিলাতী শাড়ী সেই বালিকা পরিধান করিয়াছিল। কিন্তু তাহার উজ্জ্বল শুভ্ৰ দেহের উপর, স্থানে স্থানে কাপড়ের কালো পাড়টি পড়িয়া, কি এক অপূৰ্ব্ব সৌন্দর্ঘ্যের আবির্ভাব হইয়াছিল। হাতে গাছকত কাঁচের চুড়ী ব্যতীত তাহার শরীরে অন্য কোন অলঙ্কার ছিল না। কিন্তু সেই গোল কোমল শুভ্ৰ হস্তে কৃষ্ণবর্ণের চুড়ী— কেমন অপূৰ্ব্ব শোভার সৃষ্টি করিয়াছিল। নিবিড় চাকচিক্যশালী কেশগুলি,— মস্তকের মধ্যস্থলে কেমন একটি সূক্ষ্ম শুভ্ৰ রেখা দ্বারা দ্বিখণ্ডিত হইয়াছিল! ললাটের উপর সীথির আরম্ভ-স্থলে সিন্দুরবিন্দু ছিল না। নিমেষের মধ্যে তাহাও যুবকের নয়নগোচর হইয়াছিল। মস্তক অবনত করিয়া বালিকা আসিতেছিল, সে নিমিত্ত চক্ষুদ্বয় ভূমির দিকে অবনত ছিল। ঘোর কৃষ্ণবর্ণের সুদীর্ঘ ঘন অবনত সেই চক্ষু-পল্লবশ্রেণী দেখিলেই মানুষের মন মােহিত হইয়া যায়। কিন্তু তাহার অন্তরালে যে তরল অনলগঠিত নীলপঙ্কজ-সদৃশ নয়ন দুটি রহিয়াছে, তাহা দেখিলে মানুষের কি হয়? আর গোপন করিবার আবশ্যক কি? এই বালিকা আমাদের কুসী। তাই বলি, হে ফোগলেন্দ্র! আর জন্মে তুমি কিরূপ তপস্যা করিয়াছিলে?” পঞ্চম পরিঙ্গুেঞ্জ অপরাহে অল্প S. পুষ্করিণীর অপর পার্শ্বে বসিয়া ছিপ তে করিয়া, যুবক অনিমেষ-নিয়নে কুসীর দিকে চাহিয়া রহিল। বাম কক্ষে কলসী দিকে দৃষ্টি রাখিয়া কুসী দ্রুতবেগে সেই সামান্য ঘাট দিয়া জল অভিমুখে নামিতে । ঘাটের সঙ্কীর্ণ পথ পিচ্ছিল ছিল, সহসা পদস্থলিত হইয়া কুসী ভূমির উপর পতিত হইল। পতিত হইয়া সেই নিম্নগামী পথ দিয়া আরও কিছুদূর সে হড়িয়া পড়িল। কক্ষদেশ হইতে কলসীটি পৃথক হইয়া গেল, পরীক্ষণেই তাহা গড়াইয়া জলে গিয়া পড়িল। আশ্বিন মাস। পুষ্করিণী তখন জলপূৰ্ণ ছিল। যে স্থানে কলসীটি ডুবিয়া গেল, সে স্থানে গুটিকত বুদবুদ উঠিল। কুসী তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিল । সেই বুদবুদের দিকে চাহিয়া সে কাদিতে লাগিল । যুবক মনে করিল যে, বালিকাকে অতিশয় আঘাত লাগিয়া থাকিবে, সেই জন্য সে কাঁদিতেছে। সেই মুহূৰ্ত্তে সে উঠিয়া দাঁড়াইল। কোন কথা না বলিয়া, বন ভাঙ্গিয়া অতি দ্রুতবেগে সে উপরে উঠিতে চেষ্টা করিল। বনে ছিপের সূতা জড়াইয়া গেল। ব্যস্ত হইয়া একটান মারিয়া সে সূতা ছিড়িয়া ফেলিল। ক্রোধাভরে ছিপটি ভাঙ্গিয়া দূরে নিক্ষেপ করিল। বন পার হইয়া সে উপরে উঠিল; বন পার হইয়া পুষ্করিণীর পাড় প্ৰদক্ষিণ করিয়া, যথাসাধ্য দ্রুতবেগে সে ঘাটের দিকে দীেড়িতে লাগিল। কাঁটা-খোচায় তাহার পরিধেয় কাপড় ফালাফালা হইয়া ছিড়িয়া গেল, পদদ্বয়ের নানাস্থান হইতে রক্তধারা পড়িতে লাগিল। সে সমুদয়ের প্রতি ভ্ৰক্ষেপ না করিয়া, সে বন-জঙ্গল অতিক্রম করিতে লাগিল। অবশেষে ব্যস্ত হইয়া, সে সেই ঘাটের উপরে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহার পর বালিকার নিকট যাইবার নিমিত্ত সেই পিচ্ছিল S89 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comাির্ড” ”ৰ নিম্নগামী পথ দিয়া সে-ও দ্রুতবেগে নামিতে লাগিল। কিন্তু হায়! কথায় আছে যে,-“দেবি তুমি যাও কোথা? না, তাড়াতাড়ি যেথা ।” তাড়াতাড়িতে যুবকেরও পদস্থলিত হইল, যুবকও পড়িয়া গেল; সেই পিচ্ছিল নিম্নগামী পথ দিয়া একেবারে সে জলে গিয়া পড়িল। কিনারার অতি অল্পদুরেই গভীর জল ছিল। ক্ষণকালের নিমিত্ত যুবক একেবারে ডুবিয়া গেল, কিন্তু তৎক্ষণাৎ সে ভাসিয়া উঠিল। যদি সে সীতার না জানিত, তাহা হইলে, আজ এই স্থানে ঘোর বিপদ ঘটিত । তাহা হইলে, আমার এ পুস্তকও আর লেখা হইত না। যাহা হউক, সামান্য একটু সন্তরণ দিয়া, যুবক পুনরায় কূলে আসিয়া উপনীত হইল। সে স্থানে আসিয়া অতি সাবধানে অতি ধীরে ধীরে, পায়ের নখ আর্দ্র মৃত্তিকার উপর প্রোথিত করিয়া, পুনরায় সে উপরে উঠিতে লাগিল। যে স্থানে বালিকা উপবেশন করিয়াছিল, তাহার নিকটে আসিয়া সে-ও তাহার পার্শ্বে বসিয়া পড়িল । যুবক যখন মাছ ধরিতেছিল, তখন কুসী। তাহাকে দেখে নাই। তাহার পর বনে যখন শব্দ হইতে লাগিল, তখন সে মনে করিল যে, গরু-বাছুরে বুঝি এইরূপ শব্দ করিতেছে। ঘাটের উপর আসিয়া যুবক উপস্থিত হইলে, কুসী। সেই দিকে চাহিয়া দেখিল। সেই নিৰ্জ্জন স্থানে অকস্মাৎ একজন মানুষ দেখিয়া তাহার অতিশয় ভয় হইল। পরীক্ষণেই যখন সেই মানুষ উপবিষ্ট অবস্থায় দুই হাত দুই দিকে মাটিতে রাখিয়া হুড় হুড় শব্দে অতি দ্রুতবেগে জল অভিমুখে নামিতে লাগিল, তখন কুসী ঘোরতর বিস্মিত হইল। অবশেষে যখন সে জলে ডুবিয়া গেল, তখন তাহার ভায়ের আর সীমা রহিল না। লোকুড়কিবার নিমিত্ত সে চীৎকার করিতে উদ্যত হইল। কিন্তু পরীক্ষণেই সে-মানুষ ভাসিয়া উঠিী এ সমুদয় ঘটনা অতি অল্পকালের মধ্যেই ঘটিয়া গেল। একটি ঘটনার পর আর এত সত্ত্বর ঘটিয়া গেল যে, কোন অবস্থায় কি করা। কৰ্ত্তব্য সে কথা ভাবিবার র নিমিত্ত কুসী। আর সময় পাইল না। সঁতার দিয়া কৃলে উপনীত হইয়াও যুবক র উঠিতে পারে নাই। স্থানটি এমনি পিচ্ছিল ছিল, আর নিকটেই জল এত যে, দুই-তিন বার চেষ্টা করিয়াও সে সোজা হইয়া দাঁড়াইতে চেষ্টা করিল। কিন্তু সে উঠিতে পারিল না। তাহার দক্ষিণ পায়ের গাঠিতে অতিশয় বেদনা হইল। পড়িয়া গিয়া তাহার পায়ে যে আঘাত লাগিয়াছে, পূৰ্ব্বে সে জানিতে পারে নাই। উঠিতে গিয়া এখন সে তাহা জানিতে পারিল। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ পায়ে বড় ব্যথা যাহা হউক, অতি কষ্টে উপরে উঠিয়া যুবক বালিকার নিকট আসিয়া বসিল । ইহার পূৰ্ব্বেই কুসীর ক্ৰন্দন থামিয়া গিয়াছিল। এখন আর বিপদের আশঙ্কা নাই। যে ভাবে যুবকের পতন হইয়াছিল, কুসীর এখন তাঁহাই স্মরণ হইল। কুসীর গণ্ডদেশ কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত হইয়া ওষ্ঠীদ্বয়ে ঈষৎ হাসির চিহ্ন উদিত হইল। যুবকও হাসিয়া ফেলিল। ফোকুলা দিগম্বর Հ8Գ sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro তাহার পর যুবক বলিল,-“তুমিও তো পড়িয়া গিয়াছিলো! তুমি মনে করিয়াছ, তাহা আমি দেখি নাই। কিন্তু পুষ্করিণীর ও-পারে বনের ভিতর বসিয়া আমি সব দেখিয়াছি। তোমাকে কি বড় লাগিয়াছে? ভাই কি তুমি কাঁদিতেছিলে?” কুসীরা এখন অতিশয় লজ্জা হইল। লজ্জায় তাহার মুখ দিয়া কথা বাহির হইল না। ঘাড় হেঁট করিয়া সে চুপ করিয়া রহিল। যুবক পুনরায় বলিল,—“আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি, তোমাকে কি বড় লাগিয়াছে? সেই জন্য কি তুমি কাঁদিতেছিলে?” কুসী দেখিল যে, উত্তর না দিলে আর চলে না। আস্তে আস্তে সে বলিল,—“আমি সেজন্য कँ िनाङ्ग्रे ।” যুবক জিজ্ঞাসা করিল,—“তবে কি জন্য কঁদিতেছিলে?” কুসী পুনরায় চুপ করিয়া রহিল। কিন্তু যুবক ছাড়িবার পাত্র নহে। বার বার সে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল,—“তবে কেন তুমি কাঁদিতেছিলে?” নিরুপায় হইয়া কুসী। সেইরূপ মৃদুস্বরে উত্তর করিল,-“আমি জল লইতে আসিয়াছিলাম। আমার কলসী জলে পড়িয়া গিয়াছে। আমাদের বাড়ীতে আর কলসী নাই।” যুবক বলিল,-“ওঃ। দুই পয়সার একটা মেটে কলসীর জন্য তুমি কঁদিতেছিলে? তাহার জন্য আবার কান্না কি?” কুসী। উত্তর করিল,—“মাসী-মা আমাকে বকিবেন?”(N যুবক উত্তর করিল,—“হঠাৎ তুমি পড়িয়া গিয়াঙ্গুঠীই কলসীও গিয়াছে, সে জন্য তিনি বকিবেন কেন ।” C কুসীর ইচ্ছা নয় যে, সকল কথার উত্তর শুর্দষ্ট করে। কিন্তু সে অপরিচিত যুবক কিছুতেই তাহাকে ছাড়ে না। বাড়ী পলাইবার কুসীরা এখন চেষ্টা হইল, কিন্তু তাহার পায়ে অতিশয় ব্যথা হইয়াছিল। 零 যুবক বলিল,—“তুমি বাড়ী র জন্য ইচ্ছা করিতেছ। কিন্তু আমার সকল কথার উত্তর না দিলে কিছুতেই আমি পথ ছাড়িয়া দিব না। তুমি বলিলে তোমাদের বাড়ীতে আর কলসী নাই; পিত্তলের ঘাড়া আছে?” কুসী। উত্তর করিল,—“না।” যুবক জিজ্ঞাসা করিল,-“কখনও ছিল?” কুসী। উত্তর করিল,-“ছিল।” যুবক জিজ্ঞাসা করিল,-“সে ঘড়া কি হইয়াছে? চোরে লইয়া গিয়াছে? কুসী বলিল,-“আমি বাড়ী যাই।” যুবক দেখিল যে, বালিকা বিরক্ত হইতেছে। আর অধিক কথা সে জিজ্ঞাসা করিল না। সে বলিল,-“রও! তোমার কলসী আমি তুলিয়া দিতেছি।” কুসী। তাহাকে নিবারণ করিতে না করিতে, সে জলে ঝাঁপ দিল। ডুব দিয়া কলসী তুলিল। কিন্তু পূৰ্ণঘড়া গভীর জল হইতে উপরে তুলিতে না তুলিতে, দুই খণ্ড হইয়া ভাঙ্গিয়া গেল। তখন যুবক বলিল,-“ঐ যা! কলসীটি ভাঙ্গিয়া গেল। এবার কিন্তু আমার দোষ।” পুনরায় অতি সাবধানে পদক্ষেপ করিয়া যুবক উপরে উঠিয়া কুসীর নিকট আসিয়া দাঁড়াইল। বাটী প্ৰত্যাগমন করিবার নিমিত্ত কুসী এইবার দাঁড়াইতে চেষ্টা করিল। কিন্তু সে Հ8Եr. fing <nž3. g3 ze - www.amarboi.comfo%"”"***"**** দাঁড়াইতে পারিল না, একটু উঠিয়া পুনরায় বসিয়া পড়িল; তাহার পায়ে অতিশয় বেদন হইল। ফুসী কঁদিতে লাগিল। যুবক জিজ্ঞাসা করিল,—“তোমার পায়ে অতিশয় লাগিয়াছে?” কুসী। উত্তর করিল,-“আমি দাঁড়াইতে পারিতেছি না। উঠিতে গেলেই আমার পায়ের গাঁঠিতে বড় লাগে। আমি কি করিয়া বাড়ী যাইব ।” যুবক বলিল,—“চল! আমি তোমার হাত ধরিয়া লইয়া যাই।” কুসী বলিল,-“না। তুমি আমার বাড়ীতে যদি খবর দাও।” যুবক জিজ্ঞাসা করিল,—“কোন বাড়ী? কাহার বাড়ী?” কুসী উত্তর করিল,—“নিমাই হালদারের বাড়ী আমার মাসীকে বলিবে।” সপ্তম পরিচ্ছেদ বাঙ্গাল দেশের মানুষ আর কোন কথা না বলিয়া, যুবক তৎক্ষণাৎ সে স্থান প্ৰস্থান করিল, নিমাই হালদারের বাটী অনুসন্ধান করিয়া, কুসীর মাসীকে সে সংবাদ করিল। মাসী আসিয়া কুসীকে কোলে লইয়া গৃহে গমন করিলেন। SNర్ শুষ্ক বস্ত্ৰ পরিধান করিয়া কিছুক্ষণ পরোক্কুরী উপস্থিত হইল। হালদার মুহাশয়ের ক্ৰেৱৰ্ল্যািত্রকত্ব উপর তিনি শয়ন করিয়াছিলেন। পেঁই ঘরের দাওয়া বা পিড়াতে একটি মাদুরের উপর পা ছড়াইয়া, দেওয়ালের গায়ে কাষ্ঠ পিড়া ঠেস দিয়া, কুসী। তখন বসিয়াছিল। মাসী তাহার নিকটে বসিয়া পৈতা কাটিতেছিলেন। মাসীকে যুবক জিজ্ঞাসা করিল,—“তোমাদের মেয়েটি বড় পড়িয়া গিয়াছিল। তাহাকে কি অধিক আঘাত লাগিয়াছে?” মাসী উত্তর করিলেন, —“কুসী দাঁড়াইতে পারিতেছে না। সে জন্য বোধ হয়, অধিক লাগিয়া থাকিবে। হালদার মহাশয় বড় পিটুপিটে লোক। তিনি বলেন যে, যে পুষ্করিণীতে অধিক লোক স্নান করে গায়ের তেল-ময়লা সব ধুইয়া যায়, সে পুকুরের জল খাইতে নাই। তাই কুসী ঐ বাগানের পুষ্করিণী হইতে জল লইয়া আসে। কিন্তু যে ঘাট! ভাগ্যে মেয়ে আমার জলে পড়ে নাই। বোসো-না-বাছা!” এই বলিয়া মাসী একখানি তালপাতার চটি সরাইয়া দিলেন। যুবক সেই চটির উপর উপবেশন করিল। মাসী পুনরায় বলিলেন, —“কুসী তোমার অনেক সুখ্যাতি করিতেছিল। তুমি তাহাকে তুলিতে গিয়া নিজে পড়িয়া গিয়াছিলে? তাহার পর ডুব দিয়া কলসী তুলিতে গিয়াছিলে? কলসীর জন্য কুসী কাঁদিতেছিল! কি করিব, বাছা! এখন আমাদের বড় অসময় পড়িয়াছে। কৰ্ত্তা বিছানায় পড়িয়া আছেন। সংসার চলা আমাদের ভার হইয়াছে। দুই পয়সার কলসী বটে, কিন্তু ফোকুলা দিগম্বর sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro S8s এখন আমাদের দুইটি পয়সা নয়, দুইটি মোহর। তুমি বুঝি রামপদদের বাড়ীতে আসিয়াছ?” যুবক উত্তর করিল,-"হাঁ গো, আমি রামপন্দর বন্ধু। কলিকাতায় আমরা এক বাসায় থাকি, এক কলেজে পড়ি। এবার পূজার ছুটীর সময় আমি বাড়ী যাই নাই। রামপদ আমাকে এ স্থানে ধরিয়া আনিয়াছে।” মাসী বলিলেন, —“কলিকাতা হইতে রামপন্দর একজন বন্ধু আসিয়াছে তা শুনিয়াছি; কিন্তু তোমাকে দেখি নাই। তোমাদের বাড়ী কোথায়?” যুবক উত্তর করিল,—“আমাদের বাড়ী বাঙ্গাল দেশে। আমরা হ্যান ক্যান করিয়া কথা বলি। বাঙ্গাল কথা কখনও শুনিয়াছ কুসী? মেয়েটির নাম বুঝি কুসী?” বাঙ্গাল কথার নাম শুনিয়া কুসী ঈষৎ হাসিল, কিন্তু কোন উত্তর করিল না। মস্তক অবনত করিয়া সে পায়ের নখ খুঁটিতে লাগিল। : মাসী বলিলেন, —“হাঁ, বাছা! ছয় দিনের মেয়ে আমার হাতে দিয়া, কুসীর মা চলিয়া গিয়াছে। আমি ইহাকে প্রতিপালন করিয়াছি। আমরাই ইহার নাম কুসুমকুমারী রাখিয়াছি। দুঃখের কথা বলিব কি, বাছা! ইহার বাপ বেশ দু-পয়সা রোজগার করে, কিন্তু মেয়ের খোজখবর কিছুই লয় না। এই এতবড় মেয়ে হইল, এখনও ইহার আমরা বিবাহ দিতে পারি নাই। একবার সাগর গিয়া, আমি বাঙ্গাল দেশের মানুষ দেখিয়াছিলাম। কিন্তু তোমার কথা খুব মিষ্ট, শুনিলে প্ৰাণ শীতল হয়। তোমার নাম কি বাছা?” སྣ་བུག་བྱ། གཉིས་ལ་ལག་ཕྱིས་ཀུ་ཡ་ལ་ཤཱཤུཁབi, ལོ་ཙཱལ། " এইরূপ কথাবাৰ্ত্তার পর হীরালাল চলিয়া গেল। @ সে রাত্রিতে কুসীর অনেকক্ষণ পৰ্যন্ত কি নিদ্রান্তৰ্ভুর্সে নাই? হীরালালের মুখ বার বার তাহার মনে কি উদয় হইয়াছিল? হীরালাল কখন কিংবলিয়াছিল, তাহার মনে অঙ্কিত হইয়াছিল? আবার হীরালালুড্‌ন্সিবে কি না, আবার তাহার সহিত দেখা হইবে কি না, -একথা সে কি বার বার ভাবিয়ান্টু পাছে তাহার সহিত আর দেখা না হয়, সেই চিন্তা করিয়া তাহার চক্ষুদ্বয় কি ছলছল করিয়াছিল? হীরালাল ব্ৰাহ্মণ, বীডুয্যে। ইহা শুনিয়া কুসীর মনে কি কোনরূপ আশার সঞ্চার হইয়াছিল? আমি এ সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না । অষ্টম পরিচ্ছেদ 3|Novo (pjši এক প্রতিবাসীর পুত্রের নাম রামপদ। রামপদ কলিকাতায় থাকিয়া কলেজে বিদ্যা অধ্যয়ন করে। হীরালাল ও রামপদ এক বাসায় থাকে, এক কলেজে পড়ে; দুই জনে বড় ভাব। এবার পূজার ছুটীতে হীরালাল দেশে গমন করে নাই। অনেক অনুরোধ করিয়া, রামপদ তাঁহাকে আপনার বাটীতে আনিয়াছে। SqGfo দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboicom 25?" কলিকাতায় সৰ্ব্বদা আবদ্ধ থাকিতে হয়; সে জন্য পল্লীগ্রামে আসিয়া হীরালালের আর আনন্দের সীমা নাই। সকাল, সন্ধ্যা, সে মাঠে-ঘাটে ভ্রমণ করিত; এর বাড়ী, তার বাড়ী যাইত। আর যখন তখন পুটুলে ছিপগাছটি লইয়া, এ-পুকুর সে-পুকুর করিয়া বেড়াইত। বড় মাছ ধরিবার নিমিত্ত ছিপ ফেলিয়া, তীর্থের কাকের ন্যায় একদৃষ্টি ফাতাপানে চাহিয়া থাকিবার ধৈৰ্য कोशल श्नि नी। সেই দিন সন্ধ্যাবেলা হীরালাল ও রামপদ পুস্তক হাতে লইয়া বসিল। “অধ্যয়ন করিতেছি” এই কথা বলিয়া, মনকে প্ৰবোধ দিবার নিমিত্ত তাহারা পুস্তক হাতে লইয়াছিল, পড়িবার নিমিত্ত নহে। পুস্তক হাতে করিয়া গল্প-গুজব করিলে, বড় একটা দোষ হয় না। দুই জনেই কিন্তু সুবুদ্ধি বালক। বিদ্যালয়ে ইহাদের বিলক্ষণ সুখ্যাতি আছে। ছুটীর সময় দিন-কত আলস্যে কাটাইলে বিশেষ কোন ক্ষতি হইবে না:- এইরূপ মনে করিয়া পড়া-শুনা আপাততঃ তাহারা তুলিয়া রাখিয়াছে। অন্যমনস্কভাবে পুস্তকখানির পাতা উল্টাইতে উল্টাইতে হীরালাল বলিল,- “রামপদ! আজি ভাই আমি এক Adventureয়ে (ঘটনায়) পড়িয়ছিলাম।” রামপদ বলিল,-“এক প্ৰকাণ্ড বাঘ তোমাকে গ্ৰাস করিতে আসিয়াছিল? আর তুমি অসীম বীরত্ব প্ৰদৰ্শন করিয়া তাহার পা ধরিয়া আছাড় মারিয়াছিলে?” হীরালাল কিছু রাগতঃ হইয়া উত্তর করিল,- “তামাসার কথা নয়। বড়ই শোচনীয় অবস্থা। আহা! এরূপ সোনার প্রতিমা কতই না কষ্ট ! তাহার সেই মলিন মুখখানি মনে করিলে, আমার বুক ফাটিয়া যায়।” রামপদ বলিল,— “বুঝিয়াছি কি জুমি ল’ভে (ভালবাসায়) পড়িয়াছ। তুমি কুসীকে দেখিয়াছ। আমার অনুমান যদি ঠিক হয়? তাহা হইলে তোমাকে দোষ দিই না। পথের লোকও কুসীর রূপে মোহিত হয়; হইয়া তাহার পানে চাহিয়া দেখিতে হয় । কেন যে এখনও কোনও বড়মানুষের ঘরে বিবাহ হয় নাই, তাহাই আশ্চৰ্য্য কথা। যদি এক গোত্র না হই, তাহা হইলে আমি কুসীকে বিবাহ করিতাম।” হীরালাল উত্তর করিল,— “ল’ভে পড়ি আর না পড়ি, কিন্তু এরূপ লক্ষ্মীরূপিণী বালিকা যে অন্ন-বস্ত্রের কষ্ট পাইতেছে, তাহা শুনিলে বড় দুঃখ হয়। এই পাড়াগায়ে, গরীবের ঘরে, এমন অদ্ভুত সুন্দরী কন্যা কি করিয়া জন্মগ্রহণ করিল, তাই আমি ভাবিতেছি।” রামপদ বলিল,- "Full many a gem of purest ray serene, The dark unfathoned caves of ocean bear; Full many a flower is born to blush unseen, And waste its sweetness in the desertair." কত শত মণি যার কিরণ উজ্জ্বল, সিন্ধু-মাঝে আছে যথা সলিল অতল। ʻ ́***7"ʼ"°° fGNRIligi oiiğiq5 q<5 38! ~v www.amarboi.com ~v SRGS কত শত ফুল ফুটে অরণ্য-ভিতর, বৃথা নষ্ট হয় যার গন্ধ মনোহর॥] কুসীকে তুমি কোথায় দেখিলে?” হীরালাল যে স্থানে মাছ ধরিতে গিয়াছিল, সেই পুকুরে কুসী। কিরূপে পড়িয়া গিয়াছিল, অবশেষে মাসীর সহিত কিরূপ কথাবাৰ্ত্ত হইয়াছিল, আদ্যোপান্ত সমুদয় কথা সে রামপন্দর নিকট বর্ণনা করিল। তাহার পর হীরালাল বলিল,— “ইংরেজী পুস্তকে সেকালের নাইট (বীর) দিগের কথা অনেক পড়িয়াছি। কিরূপে কোন দুৰ্ব্বত্ত দানব পরমাসুন্দরী কোন রাজকন্যাকে হরণ করিয়া দুৰ্গমধ্যে আবদ্ধ করিয়া রাখিত, কিরূপে কোন বীর তুমুল যুদ্ধ করিয়া সেই দানবকে নিধন করিয়া রাজকন্যার উদ্ধারসাধন করিত, কিরূপ অশ্রুপূর্ণ নয়নে সেই যুবতী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিত, সেই ঢুলু-চুলু নয়নের কুটিল কটাক্ষে দিশাহারা হইয়া কিরূপে বীর আপনার মন-প্ৰাণ তাহার পায়ে সঁপিত, আজ সেই সকল কথা ক্রমাগত আমার মনে উদিত হইতেছে।” রামপদ বলিল,- “দেখ, হীরালাল! তাহারা গরীব, তাহারা পীড়িত, তাহারা বিপন্ন। তাহাদের কথা লইয়া এরূপ তামাসা-ফষ্টি করা তোমার উচিত নয়। তাহারা আমাদের প্ৰতিবাসী। আমরা ও গ্রামের সকলে তাহদের রক্ষক।” হীরালাল বলিল,- “তুমি রাগ কর, এমন কথা আমি কিছু বলি নাই। আমি প্রকৃতই তাহাদের দুঃখে নিতান্ত দুঃখিত হইয়াছি। আমা দ্বারা র। যদি কোন সাহায্য হয়, তাহা করিতে আমি প্ৰস্তুত আছি।” রামপদ উত্তর করিল,- “তাহারা তোমার ধা হয় ভিক্ষা প্রার্থনা করে নাই ।” হীরলাল বলিল,- “তুমি এই বলিলে যে তোমার সগোত্র, তবে তুমি রাগ কর কেন?” রামপদ হাসিয়া উঠিল । রামপদ * - “হীরালাল! তোমার সহিত আমার কখনও ঝগড়া হয় নাই, আজও হইবে না।” তাহার পর, কুসী, তাহার পিতা, ও মেসোমহাশয়ের সমুদয় পরিচয় রামপদ প্ৰদান করিল; আর তাহাদের বর্তমান অবস্থা কি, তাহাও সে হীরালালকে বলিল। তাহদের অবস্থার কথা শুনিয়া, হীরালালের মনে আরও দুঃখ হইল । নবম পরিচ্ছেদ নানা প্ৰতিবন্ধকতা লাগিল। অবশেষে অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া মনে মনে সে এই স্থির করিল যে, “কুসীর সহিত আর আমি সাক্ষাৎ করিব না। সাক্ষাৎ করিয়া কোন ফল নাই; মনে অসুখ হইবে ব্যতীত আর সুখ হইবে না।” পরদিন প্ৰাতঃকালে উঠিয়া সে মাঠের দিকে বেড়াইতে গেল। মাঠে যাইলে কি হইবে, মন SQG?*Sq ifting -ibs gas sel - www.amarboiconf:""" তাহার সঙ্গে সঙ্গে গমন করিল। সেই মনে কুসীর মুখখানি চিত্রিত হইয়াছিল। মন হইতে সেই চিত্ৰখানি মুছিয়া ফেলিবার নিমিত্ত হীরালাল বার বার চেষ্টা করিতে লাগিল। একেবারে মুছিয়া ফেলা দূরে থাকুক, অধিকক্ষণের নিমিত্ত সে তাহা আচ্ছাদিত অবস্থায়ও রাখিতে পারিল না। অন্য চিন্তা দ্বারা এক একবার সে সেই চিত্ৰখানিকে আবৃত করে, কিন্তু আবার একটু অন্যমনস্ক হয়, আর পুনরায় তাহা বাহির হইয়া পড়ে। হীরালালের তখন যেন চমক হয়, সে তখন আপনাকে ভৎসনা করিয়া বলে,—“দূর ছাই। আবার তাহাকে ভাবিতেছি!” মাঠ হইতে বাটী প্রত্যাগমনের দুইটি পথ ছিল; একটি কুসীর বাটীর সন্মুখ হইয়া, অপরটি অন্যদিক দিয়া। ভুলক্রমে অবশ্য, হীরালাল প্রথম পথটি অনুসরণ করিল। ভুলক্রমে যখন এই পথে আসিয়া পড়িয়াছি, তখন কুসী। আজ কেমন আছে না দেখিয়া যাওয়াটা ভাল হয় না। সেই কথা জিজ্ঞাসা করিবার নিমিত্ত ভুলক্রমে মেসো-মহাশয়ের বাটীতে সে গমন করিল। পূৰ্ব্বদিন অপেক্ষা কুসীর বেদনা অধিক হইয়াছিল। সে জন্য মাসীকে হীরালাল বলিল,— “কুসীর পায়ে একটু ঔষধ দিতে হইবে, ও-বেলা আমি ঔষধ আনিয়া দিব।” এ কথাটাও কি সে ভুলক্রমে বলিয়াছিল? হীরালাল যে ডাক্তারখানা হইতে মূল্য দিয়া ঔষধ আনিবে, মাসী তাহা বুঝিতে পারেন নাই। সে জন্য কোনও আপত্তি করিলেন না। আজ মেসো-মহাশয়ের সহিতও হীরালালের আলাপ হইল। ঘরের ভিতর গিয়া তাহার তক্তাপোষের একপার্শ্বে বসিয়া হীরালাল অনেকক্ষণ গল্প-গাছা করিল। মেসো-মহাশয় কুসীর ও কুসীর পিতার কথা বলিলেন। তাহার বাড়ী কোথায়, তাহারা কোন গাই, কাহার সন্তান, স্বভাব কি সকল পরিচয়ও হীরালালকে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন। মেসো-মহাশয়েরর নিজের থাও অনেক হইল। অপরাহে হীরালাল যথারীতি আর এক প লইয়া রামপদদিগের ঘর হইতে বাহির হইল। কিন্তু সে দিন সে মাছ ধরিতে না। লোককে জিজ্ঞাসা করিয়া একটি মাঠ পার হইয়া নিকটস্থ আর একটি গ্রাম অভি করিতে লাগিল। সেই গ্রামে ডাক্তারখানা ছিল। সেই গ্রামে উপস্থিত হইয়া রািসহিত পরামর্শ করিয়া, সে কুসীর জন্য কিছু ঔষধ ক্রিয় করিল। যাহাতে শরীরে বলা হয় ও রাত্রিতে নিদ্ৰা হয়, মেসো-মহাশয়ের নিমিত্তও সেইরূপ কিছু ঔষধ লইল। কুসীর ঔষধ শিশিতে ও মেসো-মহাশয়ের ঔষধ কীেটাতে ছিল। ভুল হইবার কোনও সম্ভাবনা ছিল না। পথে আসিতে আসিতে সে দুইটি ঔষধ হইতেই ডাক্তারখানার কাগজ তুলিয় ফেলিল; কুসীদের বাটীতে আসিয়া সে ঔষধ দুইটি মাসীকে প্ৰদান করিল। পায়ে কিরূপ ঔষধ লাগাইতে হয়, তাহা ভাল করিয়া বুঝাইয়া দিতে অনেক বিলম্ব হয়; সেই জন্য তাহা বুঝাইয়া দিবার নিমিত্ত কুসীর নিকট হীরালালকে অনেকক্ষণ বসিয়া থাকিতে হইল। কুসীর নিকট হীরালাল বসিয়া কেবল যে ঔষধের কথা বলিল, তাহা নহে। বঙ্গদেশের কথা, কলিকাতার কথা, নানা প্রকার গল্প হইল। পূৰ্ব্বদিন অপেক্ষা আজ কুসী কিছু ভয়-ভাঙ্গা হইয়াছিল বটে, কিন্তু লজ্জায় সৰ্ব্বদাই তাহাকে মুখ অবনত করিয়া থাকিতে হইয়াছিল। মাঝে মাঝে কেবল দুই-একটি কথার উত্তর দিতে সে সমর্থ হইয়াছিল। হীরালাল চলিয়া গেলে কুসী মনে মনে ভাবিল,-“ইহাকে দেখিলেই আমার এত লজ্জা হয় কেন? অন্য লোককে দেখিলে তো এত লজ্জা হয় না!” সেই রাত্রিতে গৃহিণীকে সম্বোধন করিয়া মেসো-মহাশয় বলিলেন,— “ছােকরা বড় ভাল। বড়ঘরের ছেলে। আমনি একটি ছেলের হাতে কুসীকে দিয়া মরিতে পারিতাম। কিন্তু তাহার পরিচয় লইয়া বুঝিতে পারিলাম যে, সে আশা বৃথা। ইহারা বঙ্গদেশের বড় কুলীন; আমাদের ফোকুলা দিগম্বর ՀճԻՑ sNNis viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro ঘরে ইহারা বিবাহ করিবে না।” সেই দিন সন্ধ্যাবেলা হীরালাল বলিল,- “রামপদ! কুসীদের অবস্থা আমি যতই ভাবিতেছি, ততই আমার মনে দঃখ হইতেছে। কুসীর মেসো-মহাশয় অধিক দিন বোধ হয়, আর বঁচিবেন না; তখন ইহাদের দশা কি হইবে?” রামপদ উত্তর করিল,— “তুমি দুই দিনের জন্য এস্থানে আসিয়াছ, ইহাদের কথায় তোমার থাকিবার আবশ্যক কি? তুমি যদি না আসিতে, তাহা হইলে কি হইত? পাড়া-প্ৰতিবাসী আমরা পাঁচজনে আছি, আমরা অবশ্য দেখিতাম।” হীরালাল বলিল,- “তবে এখন দেখ না কেন? সে দিন দুপিয়সার একটা মেটে কলসীর জন্য সে কাঁদিতে লাগিল। নিতান্ত অভাব না হইলে, দুই পয়সার কলসীর জন্য কেহ কঁদে ना।" রামপদ বলিল,- “তাহদের প্রতি যদি তোমার এতই দয়া হইয়াছে, তাহা হইলে তাহাদের দুঃখ নিবারণ করা না কেন? কুসী ব্ৰাহ্মণের মেয়ে, মনে করিলেই তুমি তাহাকে বিবাহ করিতে পার। তুমি বড় মানুষের ছেলে, তোমাদের অর্থের অভাব নাই; তুমি কুসীকে বিবাহ করিলেই তাহাদের দুঃখমোচন হয়।” হীরালাল উত্তর করিল,- “মনে করিলেই আমি সে কাজ করিতে পারি না। অনেক প্ৰতিবন্ধক আছে।” রামপদ জিজ্ঞাসা করিল,— “প্রতিবন্ধক কি, তা পাই না?” হীরালাল উত্তর করিল,— “আমি স্বভাব কুলীন, বিবাহ করিলে আমার কুল ভাঙ্গিয়া যাইবে।” ○ রামপদ বলিল,—“লেখা-পুড়া শিবিদ্যার্ডেমীর বিদ্যা বড় মন্দ হয় নাই। এক কৰ্ম্ম করাপাঁচ শত বিবাহ কর, নম্বর-ওয়ারি পত্নীদিহিঙ্গীর খাতা কর, এ শ্বশুরবাড়ী হইতে সে শ্বশুরবাড়ী গস্ত করিয়া বেড়াও, দুই-তিন বৎসর অস্ট্রির এক এক শ্বশুরবাড়ী গিয়া দেখা যে, চমৎকার খোকাখুকী দ্বারা তোমার স্ত্রীর কোল হইয়া আছে।” হীরালাল উত্তর করিল,-“কুলীনগিরি কথা ছাড়িয়া দিলাম। আমি স্বকৃতভঙ্গ হইলেও চারি পুরুষ পৰ্যন্ত বংশের সম্মান থাকিবে; ততদিন কুলীনগিরি উঠিয়া যাইবে। কিন্তু বিশেষ প্রতিবন্ধক এই যে, আমার পিতামাতা বৰ্ত্তমান। পিতার আমতে এ কাজ কি করিয়া করি? তাহার পর, দেশে এক ব্যক্তির কন্যার সহিত বিবাহ দিবেন। বলিয়া, শিশুকাল হইতে পিতা আমার সম্বন্ধ স্থির করিয়া রাখিয়াছেন। সে ব্যক্তির এই এক কন্যা ব্যতীত অন্য সন্তান-সন্ততি নাই। তাঁহার সমুদয় বিষয় আমি পাইব ।” রামপদ উত্তর করিল,-“সম্পত্তির কখা বড় ধরি না। কিন্তু তোমার পিতার অমতে এরূপ কােজ তুমি কি করিয়া করিবে, তাহাই ভাবিতেছি।” হীরালাল বলিল,-“তাহা করিলে পিতা আর আমার মুখদর্শন করিবেন না।” রামপদ বলিল,-“তুমি কলিকাতা চলিয়া যাও; আর তুমি এ স্থানে থাকিও না।” Sce দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ wamboicom 267 দশম পরিচ্ছেদ তোমার কি মত হীরালাল সত্বর কলিকাতা চলিয়া যাইবে, ইহাই স্থির হইল। পরদিন প্ৰাতঃকালে সে কুসীকে একবার দেখিতে যাইল । মেসো-মহাশয়ের বাটীতে গমন করিয়া তাহার নিকট ও মাসীর নিকট সে বিদায় গ্ৰহণ করিল। তাহার পর, কি সূত্রে কুসীর নিকট বিদায় গ্ৰহণ করিবে, তাহাই সে ভাবিতে লাগিল । হীরালাল যখন তাহাদের বাটীতে আসিল, তখন কুসী পিড়াতে মাদুরে বসিয়া পৈতা কাটিতেছিল। দূর হইতে হীরালালকে দেখিয়া সে কাটনার ডালাটি আপনার পশ্চাতে লুক্কায়িত করিল ও তাহার পর ভালমানুষের মত পুনরায় দেয়াল ঠেস্ দিয়া বসিল। হীরালাল কিন্তু ডালা দেখিতেছিল। কুসী এখনও চলিতে ফিরিতে পারে না। হীরালাল তাহার নিকট গিয়া বসিল,- “তোমার পায়ের ব্যথা কমে নাই? তুমি বোধ হয়, ভাল করিয়া ঔষধ দাও না। কাই! তোমার • cप्धाशि!!' যদি বা পা একটু খোলা ছিল, তা হীরালালের এই কথা শুনিবা মাত্র সমুদয় পা-টুকু কুসী ভাল করিয়া কাপড় দিয়া ঢাকিয়া ফেলিল। হীরালাল হাসিয়া বলিল,— “বা! বেশ! আমি পা দেখিতে চাহিলাম, তুমি আরও ভাল করিয়া ঢাকিয়া ফেলিলে! তােমার যে পায়ে আঘাত লুপ্তয়ছে, সেই পা একবার আমি দেখিব, তাহাতে দোষ কি আছে?” (9 মাসীও,— কুসীকে বকিতে লাগিলেন। মাসীতাঞ্জলি - “একবার পাটা দেখাইতে দোষ কি আছে? মেয়ের সকল তাতেই লজ্জা!” হীরালাল কুসীর নিকটে বসিয়া jইরালাল বলিল,— “যদি তুমি আপনি দেখাও তো ভাল, তা না হইলে এখনি তোমার টানিয়া বাহির করিব। তখন বেদনায় তুমি কাদিয়া ফেলিবে ।” নিরুপায় হইয়া কুসী পা একটু বাহির করিল; কিন্তু হীরালাল যাই পা টিপিয়া দেখিবার উপক্রম করিল, আর কুসী। তাড়াতাড়ি পুনরায় ঢাকিয়া ফেলিল। হীরালাল ঈষৎ হাসিয়া বলিল,— “ভয় নাই! তোমার পা আমি খাইয়া ফেলিব না। একটু হাত দিয়া দেখি, কোথায় অধিক ব্যথা, তাহা হইলে বুঝিতে পারিব।” পুনরায় পা বাহির করিতে কুসী কিছুতেই সম্মত হইল না। মাসী বকিতে লাগিলেন। হীরালাল বুঝাইতে লাগিল। অনেক সাধ্যসাধনার পর অগত্যা পুনরায় সে পায়ের তলভাগ একটু বাহির করিল। যে যে স্থান স্ফীত হইয়াছিল ও যে যে স্থানে বেদনা ছিল, হীরালাল ধীরে ধীরে টিপিয়া দেখিতে লাগিল । পা পরীক্ষা করিতে করিতে হীরালাল অতি মৃদুস্বরে বলিল,- “কুন্সী কাল আমি কলিকাতা চলিয়া যাইব ।” হীরালাল যাই এই কথা বলিল, আর কুসী তৎক্ষণাৎ আপনার পা সরাইয়া লইল । যে পা আজ কয়দিন সে অতি ভয়ে-ভয়ে অতি ধীরে ধীরে নাড়িতে-চাড়িতেছিল, এখন ব্যথা, বেদনা, ক্লেশ সব বিস্মৃত হইয়া, সেই পা অতি সত্বর সে সরাইয়া লইল। কিন্তু এরূপ করিয়া তাহার যে বেদনা হয় নাই তাঁহা নহে, কারণ, সেই মুহুৰ্ত্তেই ক্লেশের চিহ্ন তাহার মুখমণ্ডলে প্রতীয়মান হইল।

  • ""* flala -isa gis so a www.amarboi.com N SGłół হীরালালের হৃদয়-তন্ত্রী সেই মুহূৰ্ত্তে বাজিয়া উঠিল। কেন কুসী হঠাৎ আপনার পা সরাইয়া লইল, হীরালাল তাহা বুঝিতে পারিল। কুসী ঈষৎ রাগ করিল, তাহাতেই হীরালাল পৃথিবী অন্ধকার দেখিল। হীরালাল বুঝিল যে, নিয়তি তাহাকে এই স্থানে টানিয়া আনিয়াছো-কুসী বিনা সংসার বৃথা! জীবন বৃথা! কুলমৰ্যাদা? ধনসম্পত্তি? কুসীর তুলনায় সে সমুদয় কি ছার বস্তৃ! আবশ্যক হইলে কুসীর নিমিত্ত সে প্রাণ পৰ্যন্ত বিসৰ্জন করিতে পারে। কুসী অভাবে প্ৰাণে প্রয়োজন কি? তোমরা হীরালালকে দোষ দিও না। এ নূতন কথা নহে, চিরকাল এরূপ ঘটনা ঘটিয়াছে; এখনও ঘটিতেছে। অসংখ্য নর-নারী এই সংসারক্ষেত্রে নিয়তই বিচরণ করিতেছে। স্ত্রী-পুরুষ সম্বন্ধে কিছুদিন ইহলোকে আবদ্ধ থাকিয়া, কালগ্ৰাসে পতিত হইতেছে। তাহাতে বিশেষত্ব কিছুই নাই। কিন্তু প্ৰকৃত যে যাহার পুরুষ, প্রকৃত যে যাহার প্রকৃতি, যখন এইরূপ দুই জনে সহসা চার-চক্ষু হইয়া যায়, তখনই পুরুষ-প্রকৃতির অর্থ মানুষের উপলব্ধ হয়। সেই দুই জনে বুঝিতে পারে যে, তাহারা দুই নহে, তাহারা এক;— এক মন, এক প্ৰাণ, কেবল দেহ ভিন্ন। তাহারা বুঝিতে পারে যে, এক নিয়তিসূত্রে বিধাতা দুই জনকে একত্র বন্ধন করিয়াছেন। সে বন্ধন কে বিচ্ছিন্ন করিতে পারে? হীরালাল তাহা বুঝিতে পারিল; কুসী। তাহা বুঝিতে পারিল না, কিন্তু অনুভব করিল। অবলম্বিত তরুকে সহসা কড়িয়া লইলে লতার যে গতি হয়, কুসীর প্ৰাণের আজ সেই অবস্থা হইল। জগতে আর যেন তাহার কেহই নাই। — সেইরূপ নিঃসহায় ভাব দ্বারা কুসীর মন আচ্ছন্ন হইল; লতার ন্যায় ভূতলে পড়িয়া, কুসীর প্রাণ যেন ধূলায় ধূসরিত হইতে লাগিল। যাহাতে কান্না না আসিয়া যায়, মস্তক অৱনত করিয়া কুসী। সেই চেষ্টা করিতে লাগিল । ള്

হীরালাল বলিল,—“আমি কলিকাতা যাইব সুনিয়া, তুমি আমার উপর রাগ করিলে?” কোন উত্তর নাই । ஜி হীরালাল পুনরায় বলিল,-“কুসী! বুলক্ষীকি হইয়াছে? চুপ করিয়া রহিলে কেন?” ဇ္ရိအံ့နှီဇို হীরালাল পুনরায় বলিল,-“আমি”কলিকাতা যাই, তাহা তোমার ইচ্ছা নহে?” কোন উত্তর নাই । হীরালাল পুনরায় বলিল,—“কেবল “হাঁ’ কি না”। এই দুইটি কথার একটি কথা বল। আমি কলিকাতায় যাইব কি না যাইব? হাঁ কি না?” কোন উত্তর নাই । হীরালাল পুনরায় বলিল,-“আমি সত্য বলিতেছি, তুমি যাহ বলিবে, তাহাই আমি করিব। তুমি যদি কলিকাতায় যাইতে বল, তাহা হইলে আমি যাইব, তুমি যদি যাইতে মানা কর, তাহা হইলে আমি যাইব না। আচ্ছা! কথা কহিয়া বলিতে হইবে না; তুমি ঘাড় নাড়িয়া বল,— আমি কি করিব? আমি যাইব কি যাইব না?” যতদূর সাধ্য, ততদূর মস্তক অবনত করিয়া কুসী এইবার ঈষৎ ঘাড় নাড়িল। হীরালাল বলিল,-“তবে আমি যাইব না?” আরও একটু স্পষ্টভাবে কুসী ঘাড় নাড়িল। কিন্তু হীরালাল যেন বুঝিয়াও বুঝিল না। হীরালাল বলিল,-“তোমার ঘাড় নাড়া আমি ভালরূপ বুঝিতে পারিতেছি না। এইবার তুমি কথা কহিয়া বল।” কুসী অতি মৃদুস্বরে বলিল,-“না।” SCO ifting -iba gas sel - www.amarboicomf:""" হীরালাল বলিল,-“তা, বেশ! যতদিন আমার ছুটী থাকিবে ততদিন আমি কলিকাতা যাইব না। এখন আমার দিকে চাহিয়া দেখ।” যদি বা কুসী মুখখানি অল্প তুলিয়াছিল, কিন্তু হীরালাল যাই বলিল,-“আমার দিকে চাহিয়া দেখ”-আর সেই মুহূৰ্ত্তেই পুনরায় তাহা অবনত হইয়া গেল। হীরালাল বলিল,-“আমার দিকে যদি তুমি চাহিয়া না দেখ, তাহা হইলে কিন্তু আমি কলিকাতায় চলিয়া যাইব ।” একাদশ পরিচ্ছেদ সংসারের কথা চাহিয়া দেখিবে কি, কুসীর চক্ষু তখন জলে পূর্ণ হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু হীরালাল কলিকাতা যাইবার ভয় দেখাইল। সেজন্য অগত্যা তাহাকে মুখ তুলিতে হইল। আঁচলে চক্ষু দুইটি মুছিয়া, ঈষৎ হাসিমুখে হীরালালের দিকে সে চাহিয়া দেখিল। কালো মেঘ দ্বারা কতক আচ্ছাদিত,- সূৰ্যকিরণ দ্বারা কতক আলোকিত,- আকাশ যেরূপ দেখায়, কুসীর মুখখানি তখন সেইরূপ দেখাইতে লাগিল । O) বাম গালে একটু কালি লাগিয়াছে। দেখায়; সেইজন্য ঐ কালো দাগটি আমি খুঁইয়া ফেলিতে বলি নাই।” ক্ষেপাইতেছ। ও কালির দাগ নয়, উহাকে তিল, না জরুরি, না কি বলে।” হীরালাল বলিল,— “বটে! তবে ছুরি দিয়া চাঁচিয়া ফেলিলেই চলিবে ।” কুসী বলিল,— “যাও!” হীরালাল বলিল,—“কুসী! তামাসার কথা নহে। আমি তোমাকে দুই-একটি কথা জিজ্ঞাসা করি। তোমাদের সংসারের কথা!— আমাকে পর ভাবিও না, লজ্জা করিও না। ঠিক ঠিক উত্তর ING !” মৃদুস্বরে কুসী জিজ্ঞাসা করিল,-“কি কথা?” হীরালাল বলিল,- “তোমার মেসো-মহাশয়ের যে রোগ হইয়াছে, তাহাকে পক্ষাঘাত বলে। ভাল হইয়া আর যে তিনি কাজ-কৰ্ম্ম করিতে পরিবেন, তাহা বোধ হয় না। এমন কি, অধিক দিন তিনি না বঁচিলেও বঁচিতে পারেন। তাঁহার অবৰ্ত্তমানে তোমাদের সংসার চলিবে কি করিয়া, তাহাই আমি ভাবিতেছি।” হীরালাল যে তাঁহাকে বিবাহ করিবে, কুসীর মনে সে চিন্তা একেবারেই উদিত হয় নাই। নাটক-নভেলের "লাভ'। কাহাকে বলে, তালবাসা কাহাকে বলে, সে সব কথা কুসী কিছু জানে না। হীরালাল কলিকাতা চলিয়া যাইবে, তাহা শুনিয়া তাহার মনে দুঃখ হইল; পৃথিবী সে শূন্য দেখিল, তাহাই সে জানে। কোন বিষয় গোপন করিতে সে শিক্ষা করে নাই; সেজন্য তাহার ফোকুলা দিগম্বর SÓዓ sNNis viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro মনের ভাব মুখে প্ৰকাশ হইয়া পড়িল, সেজন্য সে তাহাকে কলিকাতা যাইতে মানা করিল। হীরালাল যখন সংসারের কথা জিজ্ঞাসা করিল, কুসী। তাহার কিছুই উত্তর করিতে পারিল না। সে কেবল বলিল,- “আমি জানি না।” হীরালাল জিজ্ঞাসা করিল,- “এখন তোমাদের সংসার কি করিয়া চলিতেছে?” কুসী। উত্তর করিল,— “মেসো-মহাশয়ের কিছু জমি আছে। তিনি ধান পাইয়াছিলেন। তাহাতেই এখন চলিতেছে।” হীরালাল জিজ্ঞাসা করিল,- “সে ধানে বারো মাস চলে?” কুসী বলিল,- “সে কথা আমি বলিব না। ঘরের কথা বলিতে নাই।” হীরালাল বলিল,- “তবে তুমি আমাকে পর ভাব! এ তোমার বড় অন্যায়। আমার দিব্য! তোমাকেই বলিতেই হইবে। আমি বৃথা। এ সব কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি না। বিশেষ কারণ আছে, সেইজন্য জিজ্ঞাসা করিতেছি।” নিরুপায় হইয়া কুসীকে সকল কথা বলিতে হইল। লজ্জায় অধোবদন হইয়া সে বলিল,— “বারো মাস চলে না। আর অল্প ধানই আছে। পৌষ মাসের এ দিকে পুনরায় আর আমরা ধান পাইব না। সেজন্য যাহাতে পৌষ মাস পর্যন্ত চলে, আমরা তাঁহাই করিতেছি।” হীরালাল জিজ্ঞাসা করিল,- “সে আবার কি?” কুসী পুনরায় চুপ করিয়া রহিল। কিন্তু হীরালাল কিছুতেই ছাড়িল না। তখন ছলছল চক্ষে কুসী বলিল,— “মাসী-মা এখন একবেলা আহার করেন। সেইরূপ করিতে আমিও চাহিয়াছিলাম। কিন্তু তিনি না। তাঁহাকে লুকাইয়া যতদূর পারি, ততদূর আমিও অল্প আহার করিতেছি।” 9 হীরালাল বলিল,- “সৰ্ব্বনাশ! কুসী! তুমিঠাধ কুসী উত্তর করিল,—“না, তা নয়। শুদ্ধ কুসী। উত্তর করিল,— “মাছ অ’ তরকারি আমাদের কিনিতে হয় না। পাড়ায় যাহার বাড়ীতে যাহা হয়, আমাদিগের সকলে তাহা দিয়া যায়। তারপর সজিনা শাক আছে, কলমি শাক আছে, ডুমুর আছে, খোড় আছে, পাড়িয়া কি তুলিয়া কি কাটিয়া আনিলেই হয়। অধিক করিয়া সেই সব খাইলে আর ক্ষুধা পায় না।” হীরালাল জিজ্ঞাসা করিল,— “তেল নুন কি করিয়া হয়?” কাটনার ডালার দিকে দৃষ্টি করিয়া, কুসী। উত্তর করিল,— “মাসী-মা ও আমি দুইজনেই পৈতা কাটি । আমি একদিনে একটা পৈতা কাটিতে পারি। তাহা এক পয়সায় বিক্রীত হয়। মাসী-মা চক্ষে ভাল দেখিতে পান না। দুই দিনে তিনি একটি পৈতা কাটিতে পারেন। রাত্রিতে সূতা কাটিলে আমি আরও অধিক পৈতা কাটিতে পারি। কিন্তু তাহাতে তেল খরচ হয়।” এইসব কথা শুনিয়া হীরালালের মনে বড় কষ্ট হইল। কুসীর দুঃখে হীরালালের বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। আর কোন কথা না বলিয়া, হীরালাল তখন সে স্থান হইতে উঠিল; দ্রুতবেগে রামপন্দর নিকট গমন করিল। যে পথ দিয়া হীরালাল চলিয়া গেল, কুসী বিরস-বদনে একদৃষ্টি সেইদিকে চাহিয়া রহিল। কুসী ভাবিল,- “এমন কি কথা বলিয়াছি যে, ইনি রাগ করিয়া চলিয়া গেলেন। আমরা বড় দুঃখী, সেইজন্য কি ইনি চলিয়া গেলেন? আর কখনও কি আসিবেন না?” এইরূপ ভাবিয়া কুসী। দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিল। SCጽbr দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ wamarboicomo বড় ঘরের নিকট সামান্য একটি রান্নাচালা ছিল। কুসীর মাসী তাহার ভিতর রন্ধন করিতেছিলেন। তিনি গোপনভাবে হীরালাল ও কুসীর ভাব-ভক্তি নিরীক্ষণ করিতেছিলেন। কিন্তু তাহাদের কথাবাৰ্ত্তা তিনি শুনিতে পান নাই। হীরালাল চলিয়া যাইলে, তিনি বড় ঘরে প্ৰবেশ করিয়া হাসিতে হাসিতে স্বামীকে বলিলেন,- “বিধাতা বা আপনি কুসীর বর আনিয়া ब्लिन्” তাহার স্বামী বলিলেন,- “তুমি পাগল না কি?” গৃহিণী বলিলেন,—“দেখিতে পাইব!” এই বলিয়া পুনরায় তিনি রান্নাচালায় প্রতি গমন করিলেন। দ্বাদশ পরিচ্ছেদ The Die is Cast বাটী গিয়া হীরালাল বলিল,— “রামপদ! The Die is cast” (পাশা ফেলিয়াছি;-অর্থাৎ এ রামপদ জিজ্ঞাসা করিল,—“কি হইয়াছে?” ৫৫%, হীরালাল উত্তর করিল,- “কুসীর মুখে ভুঞ্জ তাহাদের সংসারের কথা যাহা শুনিলাম, তাহাতে আমার মন বড়ই অস্থির হইয়াছে ভূমি তাঁহাকে নিশ্চয় বিবাহ করিব।” রামপদ বলিল,— “তোমার পি ట్రో হীরালাল উত্তর করিল,- “আমার কপালে যাহা থাকে, তাহাই হইবে। পিতা অতিশয় রাগ করবেন, সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নাই। তিনি যেরূপ দৃঢ়প্ৰতিজ্ঞ লোক, তাহাতে চাই কি আমাকে বাড়ী হইতে তাড়াইয়া দিলেও দিতে পারেন; আমাকে ত্যাজ্য পুত্র করিলেও করিতে পারেন। কিন্তু সে ভয় করিয়া আমি কাপুরুষ হইতে পারি না। আমি যাহা শুনিলাম, তাহা শুনিয়া যদি আমি চুপ করিয়া থাকি, যদি যথাসাধ্য তাহার প্রতিকার করিতে চেষ্টা না করি, তাহা হইলে আমা অপেক্ষা নরাধম। আর পৃথিবীতে নাই। এখন তুমি সহায়তা কর।” রামপদ জিজ্ঞাসা করিল,- “এ বিষয়ে আমি তোমার কি সহায়তা করিতে পারি?” হীরালাল উত্তর করিল,- “তুমি কুসীর মেসো-মহাশয়ের নিকট গমন কর। তাঁহাকে এ বিষয়ে সম্মত কর । তাহার নিকট কোন কথা গোপন করিবে না । আমি যে পিতার বিনা অনুমতিতে এ কাজ করিতেছি, তাঁহাকে সে কথা বলিবে। পিতার অনুমতি প্রার্থনা করিতে গেলে, এ কাজ যে কিছুতেই হইবে না, তাহাও তাঁহাকে বলিবে। এই কাজের জন্য আমার পিতা যে আমাকে বাড়ী হইতে দূর করিয়া দিতে পারেন, তাহাও তাঁহাকে বলিবে। কারণ, যদি তাহাদের মনে টাকা কি গহনার লোভ থাকে, আর কাৰ্য্যে যদি তাহা না হয়, তাহা হইলে পরে তাহারা আমার উপর দোষারোপ করিতে পারেন। সেজন্য কোন কথা তাহাদিগের নিকট গোপন করিবে না। আর একটা কথা, এই বিবাহকাৰ্য আপাততঃ গোপনে সম্পন্ন করিতে হইবে, দুই বৎসর কাল এ কথা গোপন রাখিতে হইবে। তাহার পরে যাহা হয় হইবে।” ʻ°"*”""ʼ° ifGnRIlsf °itäq° q<q5 zR8! ~v www.amarboi.com v SIG?» রামপদ জিজ্ঞাসা করিল,— “যদি সত্য সত্যই তোমার পিতা তােমাকে বাটী হইতে দূর করেন, তাহা হইলে তুমি কি করিবে? নিজের বা কি করিবে, আর ইহাদের বা কি উপকার করিতে পরিবে?” হীরালাল উত্তর করিল,- “সেইজন্য বিবাহ গোপন করিতে চাহিতেছি, সেইজন্য একথা আপাততঃ গোপন রাখিতে ইচ্ছা করিতেছি। শুন রামপদ! আমি মনে মনে এই স্থির করিয়াছি;-কলিকাতার খরচের নিমিত্ত পিতা আমাকে মাসে মাসে যে টাকা প্ৰদান করেন, তাহা হইতে আমি কিছু কিছু বঁাচাইতে পারিব। আপাততঃ সেই টাকা আমি মেসো-মহাশয়কে দিব। চাকরী করিয়া কুসীর মেসো-মহাশয় যে বেতন পাইতেন, তাহা অপেক্ষা আমি অধিক দিতে পারিব। সুতরাং এ পল্লীগ্রামে তাহাদের আর অন্ন-বস্ত্রের কষ্ট থাকিবে না। তাহার পর, মেসো-মহাশয়ের ভালরূপ চিকিৎসা হয় নাই। এ রোগে চিকিৎসা হইলেও যে বিশেষ কিছু ফল হইবে, তাহা ৰোধ হয় না। তবু, তাহাকে কলিকাতা লইয়া গিয়া একবার চেষ্টা করিয়া দেখিব। সেই সময় কলিকাতাতেই আমি গোপনে কুসীকে বিবাহ করিব। কেবল তুমি ও আর দুইচারিজন আমাদের বন্ধু সে কথা জানিবে, আর কাহাকেও জানিতে দিব না। আমার বোধ হয় যে, পরবৎসর নিশ্চয় আমি বি-এল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারিব। যদি বি-এল পরীক্ষায় আমি উত্তীর্ণ হইতে পারি, তাহা হইলে পরীক্ষায় পরেই পিতার নিকট গিয়া সকল কথা প্ৰকাশ করিব। পিতা যদি ক্ষমা করেন তো ভালই; কিন্তু যদি রুথ করিয়া তিনি আমার খরচ-পত্ৰ বন্ধ আমি প্রতিপালন করিতে পারিব। সুবিধার বিষয়ুংখ্রষ্ট যে, ইহার ভিতর পিতা আমাকে বিবাহ করিতে বলিবেন না। আমি বি-এল, কি গুঞ্জ, পাশ করিলে, তবে তিনি আমার বিবাহ দিবেন; এই কথা স্থির হইয়াছে।” ぐ。 রামপদর সহিত হীরালালের এইরূৰ্ণ১৯ ক কথা হইল, দুইজনে অনেক পরামর্শ করিল। সেইদিন সন্ধ্যাবেলা রামপদ কুসীয় মেসো-মহাশয়ের নিকট গমন করিল। পিতার অমতে হীরালাল এই কাজ করিবে, সেজন্য মেসো-মহাশয় প্রথম এ প্রস্তাবে সম্মত হইলেন না। কিন্তু রামপদ তাঁহাকে বুঝাইয়া বলিল যে, সম্মতি প্রার্থনা করিতে গেলে হীরালালের পিতা কিছুতেই সম্মতি দান করিবেন না। তাঁহার এই পীড়িত অবস্থা, তাঁহার অর্থ নাই, কুসীর পিতার ব্যবহার, এইরূপ নানা বিষয় রামপদ মেসো-মহাশয়কে বুঝাইয়া বলিল। মাসী-মাও হীরালালের পক্ষ হইয়া স্বামীকে বুঝাইতে লাগিলেন। অবশেষে অগত্যা কুসীর মেসো-মহাশয় এ কাজ করিতে সম্মত হইলেন । মেসোমহাশয় বলিলেন, —“আমি নিশ্চয় বুঝিতেছি যে, এরূপ কাজ করা আমার উচিত নয়। কিন্তু কোন উপায় নাই। কুসীর পিতাকে আমি কত যে চিঠি লিখিয়াছি, তাহা বলিতে পারি না। আমার একখানি পত্রেরও সে উত্তর দিল না; সে একেবারে বে-হেড হইয়া গিয়াছে। পরমা সুন্দরী মেয়ে, আমার অবৰ্ত্তমানে তাহার কি হইবে- তাহাই ভাবনা। কোন একটি ভদ্রলোকের ছেলের হাতে তাহাকে সমৰ্পণ করিয়া যাইতে পারিলে, আমি নিশ্চিন্ত হই; সেইজন্য আমি সম্মত হইলাম। যদি ইহাতে কোন পাপ থাকে, ভগবান আমাকে ক্ষমা করিবেন।” হীরালালের সহিত কুসীর বিবাহ-সম্বন্ধ স্থির হইল। কিন্তু এক রামপদ ভিন্ন একথা আর কেহ। জানিতে পারিল না । SAVO দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.confাির্ড”********* এ বিষয়ে আর অধিক কিছু বলিবার নাই। যতদিন কুসীর পায়ে বেদনা ছিল, ততদিন হীরালাল আসিয়া তাহার নিকট বসিয়া গল্প করিত। বেদনা ভাল হইয়া গেলে পাছে হীরালাল আর না আসে, পাছে সেরূপ কথাবাৰ্ত্তা আর না হয়, সেজন্য কুসীর পা সুস্থ হইতে কি কিছু বিলম্ব হইয়াছিল? অবশেষে তাহার পা যখন একান্তই ভাল হইয়া গেল, তখন কুসী। কি পায়ের উপর রাগ করে নাই? কি জানি!! পরের কথায় আমার আবশ্যক কি! আর একটি কথা, ইহার মধ্যে হীরালালের সহিত কুসীর কি একবারও বিবাদ হয় নাই? একবার কেন? প্রায় প্রতি দিনই বিবাদ হইত। কিরূপে পায়ে ঔষধ দিতে হইবে, তাহা লইয়া বিবাদ হইত। হীরালাল দুই বেলা কুসীর কাটনা ডালা ভাঙ্গিয়া দিতে যাইত, তাহা লইয়া বিবাদ হইত। হীরালাল নিজে পৈতাসূতা কাটিতে গিয়া কুসীর টেকে আড়া করিয়া দিত; তাহা লইয়া ঝগড়া হইত। এইরূপ নানা কারণে দুইজনে বিবাদ হইত। কুসী বড় দুষ্ট! বিবাদের পর প্রায় এক মিনিট কাল সে হীরালালের সহিত কথা কহিত না, মুখ হাঁড়ি করিয়া বসিয়া থাকিত। হীরালাল সেজন্য মাসীর নিকট নালিশ করিত। মাসী বলিতেন,-“যা বাছা! তোদের ও শিয়াল-কুকুরের ঝগড়া!” সেই কথা শুনিয়া কাজেই কুসীর মুখে হাসির উদয় হইত, কেঁজেই তাঁহাকে পুনরায় কথা কহিতে হইত। হায়! সে এক সুখের দিন গিয়াছে! 9 হীরালালের ছুটি ফুরাইল, পরদিন যাইবে । সেদিন কতবার হীরালাল কুসীর নিকট বিদায় গ্ৰহণ করিতে গিয়াছিহঁক” বিদায় গ্ৰহণ আর ফুরায় না। ভাগ্যে নিমাই হালদারের বাড়ী গ্রামের প্রান্তভাগে ছিলঠা না হইলে, পাড়ার লোকে কি মনে করিত, কে W3C ନମ୍ବ ! এই সকল বিদায় গ্রহণের সময়, একবার হীরালাল জিজ্ঞাসা করিল,- “কুসী! তুমি লিখিতে-পাঁড়িতে পাের?” কুসী। উত্তর করিল,- “রামপদ ও গ্রামের অন্যান্য লোক মেয়েদের একটি স্কুল করিয়াছে। ছেলেবেলা সেই স্কুলে আমি পড়িতে যাইতাম। আমার মাসীও লেখা-পড়া জানেন। তাঁহার নিকট আমি রামায়ণ ও মহাভারত পড়িতে শিখিয়াছিলাম।” হীরালাল বলিল,— “আমি তোমার নিকট খানিকত খাম দিয়া যাইব । তাহার উপর আমার নাম ও কলিকাতার ঠিকানা লেখা থাকিবে। মাঝে মাঝে আমি তোমাকে পত্ৰ দিব। তোমার মেসো-মহাশয় কেমন থাকেন, তুমি আমাকে লিখিবো।” মেসো-মহাশয় কেমন থাকেন, কেবল তাহাই জানিবার নিমিত্ত হীরালালের বাসনা। কুসীর চিঠিতে যে আর কোন কথা লেখা থাকে, তাহা তাহার বাসনা নয়। না, মোটে নয়,-- একেবারেই নয়! হীরালাল! পৃথিবীর লোক কি সব বোকা! পরদিন ইরালাল ও রামপদ কলিকাতা যাত্রা করিল। иašli -ij d 93 33! - www.amarboi.com u ব্ৰয়োদশ পরিচ্ছেদ শুভ সংবাদ বা মন্দ সং কলিকাতা প্ৰত্যাগমন করিয়া হীরালাল কলেজে অধ্যয়ন করিতে লাগিল। পিতা তাহাকে যে খরচ দিতেন, তাহা হইতে কিছু কিছু বঁাচাইয়া মেসো-মহাশয়ের নিকট সে পাঠাইত। মেসোমহাশয়ের সংসারে অন্নকষ্ট দূর হইল। বড়দিনের ছুটীর সময় হীরালাল দেশে গমন করিল। হীরালালের আর দুই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছিল। কিন্তু মাতা,-কনিষ্ঠ পুত্র হীরালালকে অধিক ভালবাসিতেন। সে যখন যাহা চাহিত, তাহাকে তিনি দিতেন। মাতার নিকট হইতে কিছু টাকা লইয়া হীরালাল কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিল। কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিয়া মেসো-মহাশয়কে সে স্থানে আনিবার নিমিত্ত সে রামপদকে তাহাদিগের গ্রামে প্রেরণ করিল। স্ত্রী ও কুসীকে লইয়া অল্পদিন পরে তিনি কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। হীরালাল তাঁহাদের জন্য একটি বাটী ভাড়া করিয়াছিল। তাহারা সেই বাটীতে রহিলেন। বড় বড় ডাক্তার আনিয়া, হীরালাল মেসো-মহাশয়কে দেখাইল। কিছুদিন ডাক্তারি চিকিৎসা চলিল; কিন্তু তাহাতে বিশেষ কিছু উপকার হইল না। অবশেষে তাঁহার কবিরাজী চিকিৎসা হইতে লাগিল । পৌষ মাসে মেসো-মহাশয় কলিকাতা আসিয় মাসে হীরালালের সহিত কুসীর বিবাহকাৰ্য সম্পন্ন হইল। মেসো-মহাশয় পীড়িত9 কুসীর মাসী কন্যা সম্প্রদান ikykSiyyiyky iikyyyi yyiSiZikkek ukSeS হীরালালের তিন-চারি জন বন্ধু, w সধবা ব্ৰাহ্মণী,-বিবাহকালে কেবল এই কয়জন উপস্থিত ছিলেন। মেসো- র গ্রামের লোক, অথবা তাহার কি হীরালালের আত্মীয়-স্বজন কেহই এ কথা জানিতে পারিল না। দুই বৎসর কাল এ কথা গোপন রাখিতে হইবে, তাহাই তখন স্থির হইল। বিবাহের কিছুদিন পরে মেসো-মহাশয় কুসীকে লইয়া স্বগ্রামে প্ৰত্যাগমন করিলেন । পরবৎসর পূজার পূৰ্ব্বে হীরালাল শুনিল যে, তড়িৎ-চিকিৎসায় পক্ষাঘাত রোগের বিশেষ উপকার হয়। সেজন্যও বটে, আর কুসীর সহিত সাক্ষাৎ হইবে বলিয়াও বটে, রামপদ দ্বারা পুনরায় সে মেসো-মহাশয়কে কলিকাতায় আনয়ন করিল। কুসীর সহিত হীরালালের যে বিবাহ হইয়াছিল, রামপদ ভিন্ন গ্রামের অন্য কেহ সে কথা জানিত না। সৰ্ব্বদা যাতায়াত করিলে প্রতিবাসীদিগের মনে পাছে কোনরূপ সন্দেহ জন্মে, সেজন্য হীরালাল নিজে আর সে গ্রামে বড় যাইত না। সংসার-খরচ ও কলিকাতা-গমনের ব্যয় সম্বন্ধে কুসীর মাসী সকলকে বলিয়াছিলেন যে, তাহার ভগিনীপতি, অর্থাৎ কুসীর পিতা, পুনরায় টাকা পাঠাইতে আরম্ভ করিয়াছেন। মেসো-মহাশয় সপরিবারে কলিকাতা আগমন করিলেন। হীরালালের উদ্যোগে তাঁহার তড়িৎ-চিকিৎসা হইতে লাগিল। ক্রমে পূজার সময় উপস্থিত হইল। কলিকাতার বিদ্যালয়সমূহ পূজার ছুটিতে বন্ধ হইল। সেই অবকাশে কুসীকে লইয়া হীরালাল কাশী বেড়াইতে গেল। মাসী ও মেসো-মহাশয় কলিকাতায় রহিলেন । হীরালালের অনেক দেশের লোক কাশী-বাসী হইয়া আছে। পাছে তাহাদের সহিত সাক্ষাৎ হয়, পাছে তাহারা ইরালালের বাসায় আসিয়া কুসীকে দেখিতে পায়, সেই ভয়ে সে কাশীর SRINGSR দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comশ্মির্ত্য" "**** বাহিরে একটি বাগানের ভিতর নিভৃতে বাস করিতেছিল। কিন্তু সন্ধ্যার পর কুসীকে লইয়া সে নানাস্থানে বেড়াইতে যাইত। সেইজন্য কুসী কাশীর পথ-ঘাট চিনিতে সমর্থ হইয়াছিল। সেজন্য কোন বন্ধুর নিকট হইতে হীরালাল একটি পাঁচনিলি পিস্তল চাহিয়া লইয়াছিল। কিন্তু পিস্তলের পাশ তাহার নিকট ছিল না। কাশীতে গিয়া সে কথা তাহার স্মরণ হইল। যে বাগানে সে বাস করিতেছিল, সে স্থানে পিস্তল ছুড়িলে পাছে পুলিসের লোক আসিয়া কোন কথা জিজ্ঞাসা করে, সে নিমিত্ত একদিন প্ৰাতঃকালে সে দূরে মাঠের মাঝে গিয়া এক নির্জন স্থানে বসিয়া পিস্তলটি পরীক্ষা করিয়া দেখিতেছিল। পিস্তলের ব্যবহার হীরালাল ভাল ভালরূপ জানিত না। অসাবধানতাবশতঃ সহসা একবার আওয়াজ হইয়া, তাহার স্কন্ধাদেশে গুলী প্ৰবেশ করিল। বয়ঃক্রমসুলভ সাহস ও চপললতাবশতঃ নিজেই ছুরি দিয়া আপনার স্কন্ধের মাংস কাটিয়া সে গুলিটি বাহির করিয়াছিল। তাহার পর চাদরখানি ছিড়িয়া সেই ক্ষতস্থানের উপর বাধিয়া, বাসায় প্রত্যাগমন করিয়াছিল। সেই ক্ষতস্থান হইতে অতিশয় রক্তস্রাব হয়। সেই সূত্রে হীরালালের সহিত আমার সাক্ষাৎ হয়। বলা বহুল্য যে, হীরালাল কাশীর সেই “বাবু” ব্যতীত আর কেহ। নহে। পিস্তলের গুলী দ্বারা সে আহত হইয়াছে। তাহা শুনিয়া কুসীর পাছে অতিশয় ভয় হয়, পাছে কান্নাকাটি করে, সেজন্য এ ঘটনার প্রকৃত বিবরণ কুসীকে হীরালাল প্ৰদান করে নাই। পূজার ছুটির পর হীরালাল কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিল। তড়িৎ-চিকিৎসায় মেসোমহাশয়ের প্রথম প্রথম কিছু উপকার হইয়াছিল বটে। সে উপকার চিরস্থায়ী হইল না। আরোগ্যলাভ সম্বন্ধে হতাশ হইয়া, মেসো-মহাশয় কুসীকে লইয়া স্বগ্রামে প্রত্যাগমন করিলেন । ༦༦༦) হীরালাল যখন কাশী গিয়াছিল, সেই সূর্ডেশ এক বড় শােচনীয় ঘটনা ঘটিয়াছিল। পূজার ছুটির সময় রামপদ গ্রামে গিয়াছিল। ভাগে রামপদ ম্যালেরিয়া জ্বর দ্বারা আক্রান্ত হইয়া, চারি দিনের জুরে মৃত্যুমুখে হইল। কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিয়া হীরালাল সেই শোক-সংবাদ শুনিয়া, নিতান্ত কাতর পড়িল। রামপদ উচ্চভাবাপন্ন পরোপকারী সত্যনিষ্ঠ যুবক ছিল। দেশের দূরদৃষ্ট যে, এরূপ যুবক অকালে মৃত্যুমুখ পতিত হইল! ক্ৰমে শীতকাল উপস্থিত হইল। আগ্রহায়ণ মাসে আর একটি বিপদ ঘটিল। একদিন রাত্রিকালে কিরূপ একপ্রকার শব্দ হইয়া, মেসো-মহাশয়ের নিঃশ্বাস- প্ৰশ্বাসের কাৰ্য সম্পন্ন হইতেছিল। সেই শব্দে তাঁহার গৃহিণীর ও কুসীর নিদ্ৰাভঙ্গ হইল। দুইজনে উঠিয়া দেখিলেন, যে, মেসো-মহাশয়ের জ্ঞান নাই, মুখে কথা নাই। তাহার পরদিন তাঁহার মৃত্যু হইল। সকলেই জানিত যে, তিনি আর অধিক দিন জীবিত থাকিবেন না। তাহার পর, শেষ অবস্থায় তাহার বঁচিয়া থাকা একপ্রকার বিড়ম্বনা হইয়াছিল। সে নিমিত্ত তাঁহার মৃত্যুজনিত শোক পূৰ্ব্ব হইতেই আত্মীয়-স্বজনের একপ্রকার সহ্য হইয়াছিল। এখন কুসীর অভিভাবক বল, সহায় বল, সম্পত্তি বল, এক হীরালাল ব্যতীত জগতে আর কেহ রহিল না। ফোকুলা দিগম্বর SVO sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro চতুৰ্দশ পরিচ্ছেদ ঘোরতর অপমান মেসো-মহাশয়ের মৃত্যুর অল্পদিন পরেই বি-এল পরীক্ষার সময় আসিয়া উপস্থিত হইল। কুসীর অবস্থা স্মরণ করিয়া, হীরালাল রাত্রিদিন পরিশ্রম করিয়াছিল। বি-এল পরীক্ষায় সে অনায়াসে উত্তীর্ণ হইল। এম-এ পরীক্ষা সে দিয়াছিল কি না, তাহা আমি জানি না, বলিতে পারি না। বি-এল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া, হীরালাল তৎক্ষণাৎ দেশে গমন করিতে পারে নাই। বৈশাখ মাসে সে দেশে গমন করিল। দেশ হইতে কুসীকে যে দুইখানি পত্র সে লিখিয়াছিল, তাহা আমি দেখিয়াছি। কুসী ও হীরালাল, এই দুইজনের মধ্যে যেরূপ পবিত্ৰ প্ৰণয়, তাহাতে সে পত্ৰ সাধারণের পাঠোপযোগী নহে। এরূপ অবস্থায় বাক্য দ্বারা মনের ভাব প্ৰকাশ করিতে না পারিয়া, হৃদয়ের আবেগে মানুষ কত কি যে বলিয়া ফেলে তাহা পাঠ করিলে লেখককে পাগল বলিয়া সন্দেহ হয়। হীরালালকে সাধারণের নিকট হাস্যাস্পদ করা আমার অভিপ্ৰায় নহে। সে নিমিত্ত দুইখানি চিঠির কেবল সারাংশ এ স্থানে আমি প্ৰদান করিলাম। প্রথম চিঠির সারাংশ এইরূপ,- “প্ৰাণাধিকা কুসী! আমি নিরাপদে বাটী পৌঁছিয়াছি। আমাকে দেখিয়া পিতা, মাতা, ভ্ৰাতা সকলেই সাতিশয় আনন্দিত হইয়াছেন। পিতার নিকট এখনও আমাদের কথা বলিতে সাহস করি নাই। এত আনন্দে পাছে নিরানন্দ হয়, এত আদরে অনাদর হয়, সেই ভয়ে আমি যেন কাপুরুষের মত হইয়া আছি। কিন্তু শীঘ্রই আমার্কে সে কথা বলিতে হইবে। কারণ, ইহার মধ্যেই পূৰ্ব্বসম্বন্ধ অনুসারে আমার বিবাহেরুর্ভূক্লথা দুই-একবার উত্থাপিত হইয়াছিল। দুই-এক দিনের মধ্যে সাহসে ভর করিয়া পুস্তু নিব সমুদয় বৃত্তান্ত প্ৰকাশ করিব; তাহার পর, কপালে যাহা আছে, তাহাই হইবে। পিতা আমার বড় দৃঢ়প্ৰতিজ্ঞ লোক; সেইজন্য আমার বড় ভয় হইতেছে।” চারি-পাঁচ দিন পরে কুসী দ্বিতীয় পত্ৰখানি পাইল। তাহার মৰ্ম্ম এইরূপ-- “প্ৰাণাধিকা কুসী। ঘোর বিপদ! আমি আজ পনর মাস ধরিয়া যে ভয় করিতেছিলাম, তাহাই ঘটিয়াছে। তোমার সহিত আমার বিবাহের কথা পিতার নিকট প্ৰকাশ করিলাম। ক্ৰোধে পিতা কাপিতে লাগিলেন। তাহার পর তিনি বলিলেন,- “তোর আর মুখদর্শন করিব না। এই মুহুর্তে তুই আমার বাড়ী হইতে দূর হইয়া যা। আমি চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। মনে করিলাম যে, একটু রাগ পড়িলে তিনি আমাকে ক্ষমা করিবেন। কিন্তু কুসী! কি ঘূণার কথা। আমাকে বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিবার নিমিত্ত তিনি দ্বারবানদিগকে আজ্ঞা করিলেন!! “এইরূপ অপমানিত আমি জন্মে কখন হই নাই। শিশুকাল হইতে আমি আদরে ললিতপালিত হইয়াছিলাম। দ্বারবান আমাকে গলা-ধাক্কা দিয়া বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিবে! ছি, ছি, কি ঘূণার কথা! যাহা হউক, কুসী, ভয় করিও না। তোমার জন্য আমি এরূপ অপমানিত হইলাম, সেজন্য মনে তুমি দুঃখ করিও না! “পিতা আমার মুখ দেখিবেন না? বেশ! আমিও তাঁহাকে আমার মুখ দেখাইতে ইচ্ছা করি Se8 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com"র্ড”********* না। আমি তাঁহার বাড়ীতে আর যাইব না। তাঁহার টাকা, তাহার সম্পত্তি,-আমি আর কিছুই চাই না। লজ্জায় ঘূণায় ক্ৰোধে আমি আত্মহত্যা করিব বলিয়া মনে করিয়াছিলাম। আমি মনে করিলাম যে, যেমন তিনি আমাকে অপমান করিয়াছেন, তেমনি, আমি তাঁহাকে পুত্ৰশোকে কাতর করিব। অপমানের জ্বালায় আমি এত জ্ঞানশূন্যা হইয়াছিলাম যে, আমার নিশ্চয় বোধ হয়, আমি একাজ করিয়া ফেলিতাম। কিন্তু কুসী। তিমিরাবৃত আকাশে যেরূপ চাঁদের উদয় হয়, আমারও অন্ধকারময় মনে সেই সময় তোমার মুখখানি উদয় হইল। সেই মধুমাখা মুখখানি স্মরণ করিয়া, আমার মন হইতে সকল দুঃখ দূর হইল। “যাহা হউক, কুসী! তুমি ভয় করিও না। আমি যদি মানুষ হই, আমার নাম যদি হীরালাল হয়, তাহা হইলে দেখিও, আমি অর্থ উপাৰ্জন করিতে পারি কি না। সেজন্য, কুসী, তুমি কিছুমাত্র ভয় করিও না। তবে আপাততঃ তোমাকে বসন-ভুষণে সুসজ্জিত করিতে পারিলাম না, তাহাই আমার দুঃখ । “আমি একজন প্রতিবাসীর বাটীতে আছি। আজ সন্ধ্যাবেলা সেই স্থানে গোপনে মাতার সহিত সাক্ষাৎ করিব। তাঁহার নিকট হইতে বিদায় হইয়া, কল্যই কলিকাতা রওনা হইব। দুই চারি দিনের মধ্যে তােমার সহিত সাক্ষাৎ করিব। সাক্ষাৎ হইলে সমুদয় বৃত্তান্ত আরও ভাল করিয়া তোমাকে বলিব ।” দুই চারি দিন অতীত হইয়া গেল, আট দিন অতিবাহিত হইল, দশ দিন অতিবাহিত হইল, হীরালাল আর কোন চিঠি-পত্ৰ লিখিল না। হীরালালের কোন সংবাদ নাই। কুসী ও তাহার মাসী-মা বড়ই উদ্বিগ্ন হইলেন। দিনের পর দিন যত ত লাগিল। কুসী যে কোনও সন্ধান লাইবে, তাহার উপায় ছিল না। কাহাকে সূপুত্ৰ ? পাছে কুসীর পত্র কাহারও হাতে পড়ে, সে জন্য হীরালাল তাহাকে দেশের পৃষ্ঠানসম্বলিত খাম দিয়া যায় নাই। হীরালালের বাড়ী কোথায়, কুসী। তাহা জানিত না। মাষ্ট্ৰীও জানিতেন না। জানিত কেবল রামপাদ, আর জানিতেন মেসো-মহাশয়। তাহারা জীবর্তি নাই। তাহার পর হীরালালের ঠিকানা জানিলেও কুসী। কি করিয়া পত্র লিখিবে! সে বাড়ীতে নাই। তাহার পিতা তাহার উপর খড়গহস্ত হইয়াছেন। বিবাহের সময় হীরালালের যে দুই চারিজন বন্ধু উপস্থিত ছিল, তাহাদের নাম-ধাম কুসী কিছুই জানে না। হীরালালের সন্ধান করিবার কোন উপায় ছিল না। পািনর দিন এই ভাবে কাটিয়া গেল। দুর্ভাবনার আর সীমা পরিসীমা রহিল না। ষোল দিনের দিন, কুসী। দূর হইতে ডাকপেয়াদাকে দেখিতে পাইল। কুসীর আর আনন্দের সীমা রহিল না। ডাকহরকরা তাহদের বাড়ী পৰ্যন্ত আসিয়া উপস্থিত হয়, সে বিলম্ব কুসীর সহ্য হইল না। দৌড়িয়া আগে গিয়া তাহার নিকট হইতে পত্র চাহিয়া লইল। একখানি ছাপা কাগজ ডাকে আসিয়াছিল। কিন্তু তাঁহাদের উপর যে শিরোনামা লেখা ছিল, দেখিয়া কুসীর মুখখানি মলিন হইল। দুইখানিই তাহার মাসীর নামে আসিয়াছিল। শিরোনামা হীরালালের হস্তাক্ষরে লিখিত হয় নাই৷ অজানিত অপরিচিত হস্তাক্ষরে মাসীকে কে পত্র লিখিল, কাগজ ও চিঠিখানি হাতে লইয়া কুসী। তাঁহাই ভাবিতে লাগিল। চিঠিখানির সহিত আর একখানি ক্ষুদ্র হরিদ্রাবর্ণের কাগজ সংলগ্ন ছিল। ኴ

  • " দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.com ০০০ RO(? পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ রেজেষ্টারি চিঠি

ডাক-হরকরা বলিল,- “এখানি রেজেষ্টারি চিঠি, বাড়ী চল, রসিদে সহি কারিয়া দিবে। তোমার মাসীর চিঠি ।” চিঠি ও কাগজখানি হাতে লইয়া, বিরসবদনে কুসী গৃহ অভিমুখে চলিতে লাগিল। ডাকহরকরা তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিতে লাগিল। গৃহে আসিয়া কুসী ঘরের ভিতর হইতে দোয়াত-কলম বাহির করিয়া দিল । মাসী রসিদে স্বাক্ষর করিলেন। ডাক-হরকরা মোহর দেখিয়া লইতে বলিল । মোহর ঠিক ছিল। চিঠি দিয়া ডাক-হরকরা চলিয়া গেল । চিঠিখানির চারিদিকে সূতা দিয়া বাঁধা ছিল, খামের বিপরীত দিকে সেই সূতার সহিত জড়িত গালার মোহর ছিল। দাঁত দিয়া কুসী সূতা ছিন্ন করিয়া চিঠিখানি মাসীর হাতে দিল। ছাপা কাগজখানি সে আপনি খুলিতে খুলিতে বলিল,— “এ দেখিতেছি। খবরের কাগজ কে ?" মাসীও সেই সময়ে চিঠিখানি খুলিলেন। চিঠির সঙ্গে অনেকগুলি নোট বাহির হইয়া পড়িল । পত্ৰখানি দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু বয়সের গুণে মাসীর দৃষ্টিশক্তির হ্রাস হইয়াছিল। পড়িতে তাঁহার दिनक्ष ठूङ्ग्रेल । খবরের কাগজখানি খুলিয়া কুসী দেখিল যে, তাহারওঁফ্লপার্থে লাল রেখার দ্বারা কে চিহ্নিত করিয়াছে; প্রথমেই কুসী। সেই অংশ পাঠ করিতে লাগিল্পী কিছুক্ষণ পরেই অতি কাতর-স্বরে কুসী বলিয়ুষ্ঠষ্ট -- “এ কি মাসি! এ কি সৰ্ব্বনাশ!” এই কথা বলিয়া সে মাসীর দিকে দৃষ্টি কুৰ্বল সে দেখিল যে, পত্ৰখানি মাসীর হাতে আছে বটে, কিন্তু তিনি তাহা পড়িতেছেন ধ্ৰুসীর হাত থলু-থর করিয়া কঁাপিতেছে। মাসীর হাত হইতে কুসী কিৗড়িয়া লইল। নিমেষের মধ্যে তাহার চক্ষু, পত্রের উপর হইতে নীচে পৰ্যন্ত ভ্ৰমণ করিল। পরীক্ষণেই কুসী মূৰ্ছিত হইয়া ভূতলে পতিত হইল। প্রতিবাসীদিগের নিকট এখন আর কোন কথা গোপন করিবার আবশ্যকতা ছিল না । কিন্তু গত পািনর মাস ধরিয়া কুসীর বিবাহের কথা মাসী সকলের নিকট গোপন করিতেছিলেন। এ কথা গোপন করা তাহার এক প্রকার অভ্যাস হইয়া গিয়াছিল। সেই অভ্যাসবশতঃ তিনি চীৎকার করিয়া ক্ৰন্দন করিলেন না, কোনরূপ গোল করিলেন না। তাঁহার নিজেরও মূৰ্ছা! হইবার উপক্রম হইয়াছিল। কিন্তু বিশেষরূপে চেষ্টা করিয়া, তিনি আপনার মন সংযত করিলেন। তাহার চক্ষেও সেই সময় জল আসিয়া গেল, সেই জলের সহায়তায় তিনি কথঞ্চিৎ ধৈৰ্য্য ধরিতে সমর্থ হইলেন। মূৰ্ছিত কুসীকে কোলে লইয়া তিনি ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলেন; তক্তাপোষের উপর সেই অবসন্ন দেহ শয়ন করাইলেন। তাহার পর, পুনরায় বাহিরে আসিয়া চিঠি, নোট ও খবরের কাগজ লইয়া গেলেন। ঘরের ভিতরে একটি ভাঙ্গা বাক্সের ভিতর সাবধানে সেগুলি রাখিয়া দিলেন । চিঠি-পত্র রাখিয়া মাসী কুসীর নিকট আসিয়া উপবেশন করিলেন। কুসীর মুখে জল দিয়া তাহার শিয়রে বসিয়া, নীরবে তাঁহাকে বাতাস করিতে লাগিলেন। তাঁহার চক্ষু হইতে ক্ৰমাগত বারিধারা বিগলিত হইতে লাগিল। কথা কহিবার তাহার শক্তি ছিল না। কিছুক্ষণ পরে কুসী একবার চক্ষু মেলিয়া চাহিয়া দেখিল। কিন্তু সে পাগলের দৃষ্টি, সহজ

9 fitRig sniž3. g3 ze - www.amarboi.com"3"*"**********

Σ’ ό দৃষ্টি নহে। কি ঘটনা ঘটিয়াছে, কেন সে বিছানায় শুইয়া আছে, মাসী কেন কঁদিতেছেন, কুসী যেন কিছুই জানে না। একদৃষ্টিতে একদিক পানে সে চাহিয়া ভাবিতে লাগিল। কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া, সকল কথা তাহার স্মরণ হইল। যা তাহার স্মরণ হইল, আর-“মাসী! এ কি হইল!”— এই কথা বলিয়া সে পুনরায় মূৰ্ছিত হইল। ক্ষণকালের নিমিত্ত জ্ঞান ও পরীক্ষণেই অজ্ঞান, এইরূপ অবস্থা কুসীর বার বার হইতে লাগিল। তাহার নিকট বসিয়া নীরবে মাসী কাঁদিতে লাগিলেন ও তাহার শুশ্রুষা করিতে লাগিলেন। সন্ধ্যার পূৰ্ব্বে ডাক-হরকরা চিঠি দিয়া গিয়াছিল। ক্রমে সন্ধ্যা হইল, ক্রমে রাত্রি হইল। রাত্রি যখন প্ৰায় দশটা, তখন কুসীর ভালরূপ একবার জ্ঞানের উদয় হইল। কুসী বলিল,— “মাসী! সে চিঠি আর সে কাগজ একবার দেখি” নীরবে বাক্স হইতে চিঠি ও কাগজ আনিয়া তিনি কুসীর হাতে দিলেন। তক্তাপোষের নিকট প্রদীপটি সরাইয়া দিলেন। কুসীর চক্ষুতে জলের লেশমাত্ৰ নাই। ধীরভাবে বিশেষরূপে মনোযোগের সহিত কুসী পত্ৰখানি প্রথম আদ্যোপােন্ত পাঠ করিল। তাহার পর খবরের কাগজের লাল চিহ্নিত স্থানটিও সেইরূপ ধীরভাবে পাঠ করিল। পাঠ করা যেই সমাপ্ত হইল, আর কুসীর হাত কঁাপিতে লাগিল। তাহার হাত হইতে কাগজ দুইখানি পড়িয়া গেল। অবশেষে প্রবল বেগে একটি দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া, কুসী পুনরায় মূৰ্ছিত হইল। সে চিঠি ও সংবাদপত্র আমি দেখিয়াছি। চিঠিখানিতে এইরূপ লেখা ছিল— “প্ৰণামপুরঃসরনিবেদন— (G) “হীরালালবাবু আমার পরম বন্ধু ছিলেন। গত ৪৪শে বৈশাখ রাত্রিকালে পদ্মা নদীতে নীেকাas is ভূমি'যে কি পৰ্য্যন্ত দুঃখিত হইয়াছি, তাহা বলিতে পারি না। বিধাতার লিখন, কে খণ্ডইতৃে পূঞ্জী “আপনার নিকট পাঠাইবার নিমিত্ৰু১৯দশ হইতে হীরালালবাবু আমার নিকট দুইশত টাকা কা প্ৰযুক্ত এতদিন আমি পাঠাইতে পারি নাই। এক্ষণে প্রেরণ করিয়াছিলেন। কাৰ্য্যে ব্যস্ত সেই টাকা আপনার নিকট পাঠাইলাম । “হীরালালবাবুর নব-বিবাহিত পত্নীর জন্য আমি বড়ই কাতর হইয়াছি। তাঁহাকে আপনি বিশেষ সাবধানে রাখিবেন । অধিক আর কি লিখিব। ইতি-লোচন ঘোষ।” লোচন ঘোষ কে, তাহা মাসীও জানিতেন না, কুসীও বোধহয় জানিত না। লোচন ঘোষের নাম পৰ্যন্ত মাসী কখনও শ্রবণ করেন নাই। চিঠিতে তাহার ঠিকানা ছিল না। খবরের কাগজে সংবাদটি এইরূপ প্ৰকাশিত হইয়াছিল;- “পদ্মা নদীতে সম্প্রতি এক বিষম দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। সেদিন হরিহরপুর হইতে একখানি নীেকা গোয়ালন্দ অভিমুখে আসিতেছিল। দাঁড়ি-মাঝি ব্যতীত নীেকাতে অনেকগুলি আরোহী ছিল। সন্ধ্যার পর হঠাৎ ঝড় উঠিয়া, নৌকাখানি জলমগ্ন হইল। দুইজন মাঝি ব্যতীত নীেকার সমস্ত লোক জলমগ্ন হইয়া মারা পড়িয়াছে। আমরা শুনিয়া আরও দুঃখিত হইলাম যে, মজিদপুরের সুপ্ৰসিদ্ধ জমীদার শ্ৰীযুক্ত বাবু বিধুভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের কনিষ্ঠ পুত্ৰ হীরালালবাবু এই নীেকাতে ছিলেন। হীরালালবাবু বাটীতে রাগ করিয়া কলিকাতা আসিতেছিলেন। সে নিমিত্ত তিনি এরূপ নীেকাতে আরোহণ করিয়াছিলেন। হীরালালবাবু গাত বি-এল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন। তাঁহার অকাল-মৃত্যুতে আমরা নিতান্ত দুঃখিত ফোকুলা দিগম্বর sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro SSe হইলাম।” পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি যে, এই সমুদয় পূৰ্ব্ব-বিবরণ কুসীর মাসী আমাকে যে ভাবে বলিয়াছিলেন, আমি এ স্থানে সে ভাবে বলি নাই। আমি আমার নিজের কথায় তাহা বৰ্ণনা করিলাম। কুসুমের মাসী এই সমুদয় পূৰ্ব্ব-কথা অতি সংক্ষেপে বলিয়াছিলেন। এই সমুদয় কথা বলিতে অতি অল্প সময়ই লাগিয়াছিল। পরে অন্য লোকের নিকট হইতে আমি যে সমুদয় তত্ত্ব সংগ্ৰহ করিয়াছি, তাহাও এই মাসীর বিবরণের ভিতর যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিয়াছি। সে জন্য আমার বিবরণ কিছু বিস্তারিত হইয়াছে। জিজ্ঞাসা করিলেন,- “তোমাদের কথা এখনও শেষ হয় নাই? এ দিকে যে অনেক কাজ পড়িয়া আছে!” তাহার উত্তরে, মাসী অল্প উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন,-“যাই!” তাহার পর আমাকে লক্ষ্য করিয়া তিনি বলিলেন, “২১”রায় মহাশয় এ দিকে আসিতেছে। দুহাই তােমার! প্ৰকাশ করিও না। আমার মুখে, দিও না । আর সকল কথা পরে বলিব ।” রসময়বাবু নিকটে আসিয়া শালীকে বিবাহ সম্বন্ধে কোন একটা দ্রব্যের কথা বলিলেন। কুসুমের মাসী তৎক্ষণাৎ সেই স্থান প্রস্থান করিলেন । তাহার পর রসময়বাবু অ — “কুসুমের কি রোগ হইয়াছে, তাহা কি কিছু বুঝিতে পারিলেন? এখন একটু যেন ভাল আছে বলিয়া বোধ হয়। আমার স্ত্রীর অনেক সাধ্য-সাধনায় এখন সে একটু দুধ পান করিয়াছে।” আমি উত্তর করিলাম,-“কতকটা বুঝিয়াছি; তাহাকে একটু ঔষধ দিতে হইবে! একটা শিশি দিতে পারেন?” এই কথা বলিয়া আমি বাহিরে গমন করিলাম। রসময়বাবুও একটা শিশি লইয়া বাহিরে আসিলেন । আমার ব্যাগ হইতে ঔষধ বাহির করিয়া, তাহা প্ৰস্তুত করিতে করিতে আমি ভাবিলাম,-“তবে এ বিধবা-বিবাহ! বাবু জীবিত নাই! যাহাঁদের কন্যা, তাহারা বুঝিবে। আমার কথায় কাজ কি? কিন্তু বাবুর জন্য আমার বড় দুঃখ হইল। তাহার সেই হাসি-হাসি মুখখানি আমার মনে পড়িতে লাগিল। ঔষধ প্ৰস্তুত করিয়া আমি রসময়বাবুকে দিলাম; তিনি বাটীর ভিতর গমন করিলেন। আমি বরযাত্রীদিগের বাসায় গমন করিলাম । sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro চতুৰ্থ ভাগ প্রথম পরিচ্ছেদ । মৃত্যু নহে মূচ্ছিা! বরযাত্রীদিগের বাসায় গমন করিয়া, নীরবে একপার্শ্বে আমি উপবেশন করিলাম। সে স্থানে বসিয়া একবার দিগম্বরবাবুর মুখ-পানে চাহিয়া দেখি, একবার ‘বাবুর মুখখানি স্মরণ করি। দেবকুমার ও বান্দরে যদি তুলনা হয়, তথাপি এ দুইজনে তুলনা হয় না। ‘বাবু’র জন্য শোক হইল, কুসীর দুঃখে ঘোরতর দুঃখিত হইলাম। আজ কুসীর মৃত্যু না হউক, কিন্তু কুসী যে আর অধিক দিন বঁচিবে না, তাহা এখন আমি নিশ্চয় বুঝিলাম। কুসী মরিয়া যাইবে, তাহা ভাবিয়া আর আমার বড় কষ্ট হইল না। “বাবু যে স্থানে গিয়াছে, কুসীও সেই স্থানে যাউক, এখন বরং সে ইচ্ছা আমার মনে উদয় হইল। রাত্রি দশটা বাজিয়া গেল, পুনরায় বিবাহের লগ্ন উপস্থিত হইল। রসময়বাবু নিজে এবার বির লাইতে আসিলেন। আমাকে দেখিয়া তিনি বললেন,-“আপনি গুলী বসিয়া আছেন? আপনাকে এতক্ষণ খুঁজতুেছিলাম। কেন ভাই, এত বিমর্ষ কেন?” ৫৯৮ আমি উত্তর করিলাম,- “আপনার আমি কিছু চিন্তিত আছি।” রসময়বাবু উত্তর করিলেন, — “ র এই কাজটা ভালয় ভালয় হইয়া গেলে হয় । স্ত্রীলোক! গহনা-গাঁঠি পাইয়া মনে হইলে, এরূপ ভাবটা কাটিয়া যাইবে । শুনিয়াছি, বাতশ্লেষ্মা বিকার হইলে একটা না একটা অঙ্গহানি হয়; অঙ্গহানি না হইয়া কুসীর মন বিকৃত হইয়াছে।” বর ও বরযাত্ৰিগণ গাত্ৰোথান করিলেন। রসময়বাবুর বৈঠকখানাটি প্রশস্ত ছিল; তাহার একপার্থে বাড়ীর ভিতরের সামিল ছােট একটি ঘর ছিল। বৈঠকখানার সেই অংশে ক্ষুদ্র ঘর দিয়া বাটীর ভিতর যাইবার দ্বারের নিকট কন্যাসম্প্রদানের স্থান হইয়াছিল। বৈঠকখানার অবশিষ্ট অংশে বরযাত্রী ও কন্যাযাত্রীদিগের বসিবার স্থান হইয়াছিল। বর, বরযাত্রী ও নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগণ সভায় উপবেশন করিলেন। রসময়বাবুর বাটীর বাগান ও সম্মুখে প্রশস্ত রাজ-পথ লোকে পূর্ণ হইয়া গেল। বাটীর ভিতর বাঙ্গালী, পাঞ্জাবী ও হিন্দুস্থানী স্ত্রীগণের কলরবে: প্ৰতিধ্বনিত হইতে লাগিল। ኴ বিবাহের লগ্ন উপস্থিত হইল। কন্যা-সম্প্রদান করিবার নিমিত্ত রসময়বাবু সভাস্থ লোকদিগের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। তাহার পর, বিবাহস্থানে তিনি নিজের আসনে গিয়া উপবেশন করিলেন; বির তাহার সম্মুখে উপবিষ্ট হইলেন। দুই পুরোহিত দুইজনের পশ্চাতে বসিলেন । যথাবিধি সঙ্কল্পাদি মন্ত্র পাঠের পর, বিবাহ স্থলে কন্যা আনয়নের নিমিত্ত আদেশ হইল। ফোকুলা দিগম্বর Nos sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro একপার্শ্বে বসিয়া নীরবে আমি এই সমুদয় ব্যাপার দর্শন করিতে লাগিলাম। একজন বলিষ্ঠ পাঞ্জাবী স্ত্রীলোক কন্যাকে কোলে করিয়া বাহিরে আনিল। তাহার পশ্চাতে কুসুমের মাসী ও অন্যান্য স্ত্রীগণ আগমন করিলেন। পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি যে, বৈঠকখানার যে পার্শ্বে কন্যা-সম্প্রদানের নিমিত্ত স্থান হইয়াছিল, তাহার পশ্চাদিকে বাড়ীর ভিতরের সামিল ছোট একটি ঘর ছিল। সেই ঘর দিয়া বাড়ীর ভিতর যাইবার নিমিত্ত বিবাহ-স্থানের ঠিক পশ্চাতে একটি দ্বার ছিল। সেই দ্বারের নিকট কুসুমের মাসী ও অন্যান্য শ্ৰীগণ উপবেশন করিলেন । পাঞ্জাবী স্ত্রীলোকটি কন্যাকে আনিয়া নির্দিষ্ট আসনে বসাইল। কিন্তু যাই সে ছাড়িয়া দিল, আর কন্যা তৎক্ষণাৎ মুখ “খুবড়িয়া” ভূতলে পতিত হইল। “কি হইল, কি হইল”। বলিয়া কন্যার পিতা, বর, পুরোহিতদ্বয় ও অন্যান্য লোক ব্যস্ত হইয়া তাহাকে তুলিতে গেলেন। চারিদিকে হৈ হৈ রৈরৈ পড়িয়া গেল। বাটীর ভিতর দিকে সেই ছোট ঘরটিতে কুসুমের মাসী বসিয়াছিলেন। “ও মা! এ কি হইল!” বলিয়া তিনি কাঁদিয়া উঠিলেন। সে স্থানে উপবিষ্টা অন্যান্য স্ত্রীগণও তাঁহার কান্নার সহিত আপন আপনি সুর জুড়িয়া দিলেন। আমি অন্যমনস্ক হইয়া কি ভাবিতেছিলাম। সহসা এই গোলযোগে আমার চমক হইল। আমি ডাক্তার,- আমি আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলাম না; সত্ত্বর সেই ধরা-শায়িনী কন্যার নিকট গিয়া উপস্থিত হইলাম। রসময়বাবু, কন্যার এক হাত ধরিয়া, তাহাকে তু চেষ্টা করিতেছিলেন; দিগম্বরবাবু অপর হাত ধরিয়া টানাটানি করিতেছিলেন। আমি ত নিষেধ করিলাম । কুসুমের মুখ তাম্রপাত্রের উপর পড়িয়াছিল ; বসিয়া অতি সাবধানে তাহার মুখটি তুলিয়া, আমি আমার উরুদেশে রাখিলাম। মুখটি ফিরাইয়া আমি দেখিলাম যে, তাহার নাসিকা হইতে শোণিতস্রাব হইতেছে, ত র কণা লাগিয়া তাহার ওষ্ঠও কাটিয়া গিয়াছে। সেই কাৰ্ত্তিত স্থান দিয়াও রক্ত পড়ি নাসিকা ও মুখে রক্ত দেখিয়া আমার বড় ভয় হইল। মনে করিলাম যে, কুসুম বরাবর যাহাঁ বলিয়া আসিতেছিল, তাহাই বা সত্য হয়। তাহার নাড়ী টিপিয়া দেখিলাম। নাড়ী দেখিয়া আমার মন আশ্বাসিত হইল। সে যে মৃত্যুমুখে পতিত হয় নাই, কেবল মূৰ্ছিত হইয়াছে, নাড়ী দেখিয়া তাহা আমি বুঝিতে পারিলাম। কোসা হইতে জল লইয়া তাহার চক্ষু ও মুখে সিঞ্চন করিলাম। বাটীর ভিতর হইতে শীঘ পাখা আনিবার নিমিত্ত রসময়বাবুকে প্রেরণ করিলাম। বর, বরযাত্রী প্রভৃতি লোকগণ চারিদিকে বায়ুরোধ করিয়া ঘিরিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। তাঁহাদিগকে দূরে সরিয়া যাইতে বার বার বলিলাম। কিন্তু কেহই আমার কথা শুনিলেন না। জনতা করিয়া সেই মূৰ্ছিতা কন্যাকে ঘিরিয়া সকলে দাঁড়াইলেন। সকলেই ঔষধ জানেন। সেই সমুদয় ঔষধ প্রয়োগ করিবার নিমিত্ত সকলে আমাকে পরামর্শ দিতে লাগিলেন । ኳ বসিয়া ‘হায় হুতাশ” করিতেছিলেন। নিকটে আসিয়া তাঁহাকে আমি বাতাস করিতে বলিলাম। কুসুমের মাথা আমার উরুদেশে রহিল। চক্ষু মুদ্রিত করিয়া কুসুম পড়িয়া রহিল। বামহস্তে আমি উৎপাদনের নিমিত্ত চেষ্টা করিতে লাগিলাম । SRAo frig ož3. g3 ze - www.amarboi.comf737”"**”**** দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ তুমি তো বড় তেরপণ্ড এই বিপদের সময় দিগম্বরবাবু এক গোল উপস্থিত করিলেন। আমাকে লক্ষ্য করিয়া তিনি বলিলেন,- “তুমি তো বড় তেরপণ্ড দেখিতে পাই! কি বলিয়া তুমি আমার স্ত্রীকে কোলে লইয়া বসিলে? ডাক্তারি করিবে, ডাক্তারি কর; পরের স্ত্রীকে কোলে করিয়া ডাক্তারি করিতে হয়, এ তো কখনও শুনি নাই।” চেষ্টা করিলেন। অচেতন হইয়া কুসী পড়িয়া আছে, তাহার প্রাণ-সংশয়; এরূপ সময়ে ফোকলার এই পাগলামি দেখিয়া আমার কিছু রাগ হইল। আমি বলিলাম— “You are a brute” (অর্থাৎ তুমি একটা পশু!) দিগম্বরবাবু আরও ক্রোধাবিষ্ট হইয়া, আমাকে এক ধাক্কা মারিলেন। আমি বুকিয়া পড়িলাম। পুনরায় উঠিয়া, বরযাত্রিগণকে সম্বোধন করিয়া আমি বলিলাম,- “মহাশয়গণ! এ বে-পাগলা বুড়োকে লইয়া আপনারা বাসায় গমন করুন। কন্যার অবস্থা দেখুন,-বঁচে কি না। তাহার ঠিক নাই। এ সময়ে এরূপ পাগলামি ভাল দেখায় না।” হবু-জামাতার ভাব-ভঙ্গী দেখিয়া, ঘূণায় ও ক্ৰোধে রসময়বাবুর চক্ষুদ্বয় আরক্ত হইয়া উঠিল। কিন্তু পরীক্ষণেই তিনি আত্মসংবরণ করিয়া, বাসায় লইয়া যাইবার নিমিত্ত, অতি বিনয়ভাবে সকলের নিকট অনুরোধ করিলেন। দুইজন বরযাত্রী দিগম্বরবাবুকে দুই হাত লাগিলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই যাইবেন না । ক্রোধে তিনি কাপিতে কুঁকিয়া কুঁকিয়া, ঘুসি দেখাইয়া তিনি Ο Χ রাখিয়াছিল, তাহা না হইলে, ধা হয়, চড়টা-চাপড়টা, কিলটা-ঘুসিটা খাইতে হইত। সেই সময় ফোকলা মুখে হাউ হাউ করিয়া তিনি কত কি বলিতে লাগিলেন। তাঁহার মুখগহবরের দুইপার্শ্বে সাদা ফেকো পড়িয়াছিল, তাহা ঢাকিবার নিমিত্ত থেতো-করা পান সৰ্ব্বদাই তিনি মুখে রাখিতেন। তাম্বুল রঞ্জিত লালা,-রক্তের ন্যায় তাহার কষ দিয়া প্রবাহিত হইতে লাগিল। ফুলকাটা কামিজের বক্ষদেশ ও বেলফুলের মালা ভিজিয়া গেল। ঘোর উগ্ৰমূৰ্ত্তি। তাহার উপর শোণিতপ্রায় লালার প্রবাহ-তাহাকে ঠিক যেন রক্তমুখী মন্দা-কালীর ন্যায় দেখাইতে লাগিল। একে সেই হাউ হাউ, তাহার উপর আমার মন তখন মূৰ্ছিত কুসীর দিকে, সকল কথা আমি তাঁহার বুঝিতে পারিলাম না। দুই একটা কথা কেবল আমার কর্ণগোচর হইল, যথা,- “তুমি আমাকে বুড়ো বলিলে! এরূপ কটু কথা কেহ কখন আমাকে বলে নাই! তোমার নামে আমি ড্যামেজের নালিশ করিব। তোমাকে জেলে দিব; যত টাকা খরচ হয়, তাহা করিব।” ইত্যাদি। রসময়বাবু একটু রাগিয়া উঠিলেন। তিনি বলিলেন,– “মহাশয়গণ! আপনারা কি তামাসা দেখিতেছেন? কন্যার অবস্থা দেখিয়া, আপনাদের কি একটু দয়া হয় না? আর তােমার বাপু কি একটু জ্ঞান নাই? আমার কন্যা যদি বঁাচে, তবে তো তোমার সহিত বিবাহ হইবে? এখন আপনারা বাসায় গমন করুন।” রসময়বাবুর এই কথা শুনিয়া দিগম্বরবাবু একটু নরম হইলেন। তিনি বলিলেন, — “আচ্ছা, ফোকুলা দিগম্বর sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro SRAN আর আমি গোল করিব না। আমি চুপ করিয়া বসিয়া থাকিব। আমার হাতে একখানা পাখা দাও, আমার স্ত্রীকে আমিও বাতাস করি।” যেমন করিয়া হউক, পাগলাকে এখন শান্ত করাই শ্ৰেয়ঃ মনে করিলাম। চক্ষু টিপিয়া রসময়বাবুকে আমি ইশারা করিলাম। তিনি দিগম্বরবাবুর হাতে একখানি পাখা দিলেন। দিগম্বরবাবু আমার নিকটে বসিয়া, কুসীর মুখপানে একদৃষ্টি চাহিয়া, বাতাস করিতে লাগিলেন। দুই একবার পাখা নাড়িয়া মূৰ্ছিতা কুসীকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলিলেন,- “কন্যা! তোমার জন্য আমি অনেক গহনা আনিয়াছি। একবাক্স গহনা আনিয়াছি। আমাদের বাসায় আছে। তুমি চক্ষু চাহিয়া দেখা! এখনই সে গহনা তোমাকে আমি দেখাইব ।” গহনার লোভে কুসী চক্ষু চাহিল না। মৃত্যুবৎ সে পড়িয়া রহিল। দিগম্বরবাবু উচ্চৈঃস্বরে চাকরকে ডাকিলেন,- “কিষ্টা! কিষ্টা! কিষ্টা কুঁথায় রে!” ভিড়ের ভিতর হইতে কিষ্টা উত্তর দিল,— “হাে! পদাই আজ্ঞা ।” অর্থাৎ “আমি পশ্চাতেই আছি।” দিগম্বরবাবু বলিলেন,- “বাসায় যা । ছোট্রটু সিংহের কােছ হইতে গহনার বাক্সটা চাহিয়া उभे ।।' রসময়বাবু বিরক্ত হইয়া বলিলেন, — “আপনি নিতান্ত পাগল! ছিঃ!” মানুষ সব কি বে-আড়া! দিগম্বরবাবু সকলের প্রশংসাভাজন হইতে এত চেষ্টা করিতেছেন, কিন্তু তবুও কেহ তাঁহার প্রশংসা করে না। গুহনা দেখিয়ুকোথায় সকল লােকে তাঁহাকে ধন্য ধন্য করবে, না গহনার নাম শুনিয়া সকলে বিরক্ত জুইত দুঃখিত হইয়া কিিষ্টকে তিনি গহনার বাক্স আনিতে মানা করিলেন। সকলের অত্যছক্স’নিতান্ত ক্ষুব্ধ হইয়া, বিরসবদনে তিনি ইলেন্ত কিন্তু দুই চারিবার পাখা নাড়িয়া, এবার তিনি দুৰ্ল্ল “আমি তোমাদিগকে বেশ চিনি । লোকের কান S হইলেও, ভিজিট ছাড় না। তোমরা ভিজিটিখোর! আমি যা বলি তা যদি কর, তাহা হইলে তোমাকে আমি ভিজিট দিব। কন্যার মাথাটি তুমি আমার কোলে দাও । পরপুরুষের কোলে যুবতী স্ত্রীলোকের মাথা রাখা উচিত নয়, তাই বলিতেছি।” আমি সে কথায় কোন উত্তর করিলাম না। ভিজিটের লোভে কুসীর মস্তক তাঁহার কোলে দিলাম না। কুসীকে এখনও চেতন করিতে পারিলাম না, সে জন্য আমার বড় ভয় হইল। তাহার নাসিকা হইতে যে রক্তস্রাব হইতেছিল, তাহা বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। তাহার নাড়ী অতিশয় দুৰ্ব্বল হইয়াছিল বটে, কিন্তু তাঁহাতে বিশেষ কোন ভয়ের লক্ষণ দেখিতে পাইলাম না। কিন্তু এখনও চেতন হয় না কেন? পাছে সহসা হৃৎপিণ্ডের কাৰ্য বন্ধ হইয়া যায়, সে জন্য আমার বড় ভয় হইল। হৃৎপিণ্ড পরীক্ষা করিবার নিমিত্ত মস্তক অবনত করিয়া, আমি আমার কৰ্ণ,-কুসীর বক্ষস্থলের বামপ্রদেশে রাখিতে যাইতেছি, এমন সময় দিগম্বরবাবু বলিয়া উঠিলেন, — “ও আবার কি! বেল্লিক!” এই বলিয়া আমার সেই কিঞ্চিৎ অবনত বামগালে ঠাস করিয়া তিনি সবলে এক চপেটাঘাত করিলেন। চারিদিকে সকলে ছিছি করিয়া উঠিল। আমি স্তম্ভিত হইলাম। কিন্তু এ বিষয় লইয়া আর অধিক গোল হইল না; কারণ, সেই সময় সকলের দৃষ্টি অন্যদিকে পড়িল। যেস্থানে কুসীকে লইয়া আমি বসিয়াছিলাম, তাহার চারিদিকে লোক দাড়াইয়াছিল। বার বার অনুরোধ করিয়াও, S*R.S. দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comঠি", "********* আমি সে ভিড় কমাইতে পারি নাই। সেই ভিড়ের পশ্চাৎ দিকে এখন একটু গোল উঠিল। সকলে দেখিল যে, একজন সন্ন্যাসী অতি ব্যগ্রভাবে দুইহাতে দুইদিকে লোক সরাইয়া, ভিড় ঠেলিয়া অগ্রসর হইতেছেন। গৈরিক বস্ত্ৰ দ্বারা সন্ন্যাসীর দেহ আবৃত ছিল। তাঁহার শরীর ধূলায় ধূসরিত হইয়াছিল। ভিড় ঠেলিয়া সন্ন্যাসী ক্ৰমে আমাদিগের নিকট উপস্থিত হইলেন। তৃতীয় পরিচ্ছেদ (प्थ ब्ी प्ी আমার গালে চড় মারিয়া, দিগম্বরবাবু একটু অপ্রতিভ হইয়াছিলেন। সন্ন্যাসীকে দেখিয়া এখন তিনি বলিয়া উঠিলেন, — “ভাল হইয়াছে যে, এই সন্ন্যাসীঠাকুর আসিয়াছেন। কন্যাকে ইনি এখনই ভাল করিবেন। ইহারা সন্ন্যাসী, পবিত্র পুরুষ, পর-স্ত্রী ইহারা স্পর্শ করেন না। দূর হইতে ইনি ঝাড়-ফুক করিবেন। ডাক্তারবাবু! কিছু মনে করিও না। এখন তুমি সরিয়া যাও, ডাক্তারি চিকিৎসা আর আমি করাইব না। আমি ইহাকে কোলে লইয়া বসি। সন্ন্যাসীঠাকুর দূরে বসিয়া ঝাড়-ফুক করিবেন।” সন্ন্যাসীঠাকুর কিন্তু দূর হইতে ঝাড়-ফুক করিলেন না। দিগম্বরবাবুর পা মাড়াইয়া তিনি আমার নিকট উপস্থিত হইলেন। তাহারাষ্ট্রীয়ৈর অঙ্গুলীতে যে জুতার কড়া ছিল, সন্ন্যাসীঠাকুরের পা ঠিক তাহার উপর পড়ুয়ািছল। যাতনায় দিগম্বরবাবু উঃ করিয়া উঠিলেন। তাহার সকাতরতা-সূচক শব্দের প্রতিক্ৰিফ্‌টুক্ষপ না করিয়া, সন্ন্যাসীঠাকুর সবলে তাঁহাকে এক ঠেলা মারিলেন। দিগম্বরবাবু শুইয়া পড়িলেন। তাঁহাতে একটু স্থান হইল। সেই স্থানে বসিয়া তিনি আমাকে অন্যদিকে ঠেলিয়া দিলেন। আমিও অন্যদিকে শুইয়া পড়িলাম। তাঁহাতে আর একটু স্থান হইল। এ দিকে এক ঠেলা ও দিকে এক ঠেলা মারিয়া সন্ন্যাসীঠাকুর যে স্থান করিলেন, সেই স্থানে তিনি ভাল করিয়া উপবেশন করিলেন। তাহার পর বাম হাতে কুসীর বাম হাতের উপর রহিল। অৰ্দ্ধশায়িতভাবে কন্যাকে বসাইয়া, তিনি নিজের মস্তক অবনত করিয়া, কুসীর দক্ষিণ কৰ্ণে অতি মৃদুস্বরে বলিলেন,— “কুসি! কুসি!” দিগম্বরবাবু জুলিয়া উঠিলেন। তিনি বলিলেন,- “ও ভাই রসময়! দেখ না দাদা, এ আবার কি বলে!” রসময়বাবু কোন উত্তর করিলেন না; বিস্মিত হইয়া সন্ন্যাসীর মুখপানে তিনি চাহিয়া রহিলেন। দিগম্বরবাবু এবার সন্ন্যাসী ঠাকুরকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন,- “বলি, ও গোসাইজি! এ তোমার কিরূপ ব্যবহার বল দেখি! আমি তোমাকে ভাল মানুষ মনে করিয়াছিলাম, কিন্তু এই ভিজিটিখোরের চেয়ে তুমি আবার এককাটি সরেশ! ইনি তবু পায়ের উপর কন্যাকে রাখিয়াছিলেন। তুমি তাহাকে বুকে তুলিয়া লইলে! কন্যা যে বালিকা নয়, পূর্ণ যুবতী, তাহা কি তোমার জ্ঞান নাই? ভণ্ড তপস্বি!” দিগম্বরবাবুর কথায় কেহ উত্তর করিল না। পাগল বলিয়া সকলে তাঁহার কথা তুচ্ছ করিল। কন্যার কানের নিকট মুখ রাখিয়া, সন্ন্যাসী মৃদুস্বরে বারবার কেবল—“কুসি! কুসি!” বলিয়া

    • firls six g3 &g! - www.amarboicom a ՀԳՏ) ডাকিতে লাগিলেন ।

সন্ন্যাসীর আশ্চৰ্য্য-শক্তি দেখিয়া, রসময়বাবু প্রভৃতি সকলেই বিস্মিত হইলেন। সন্ন্যাসী সম্পূর্ণ অপরিচিত লোক; রসময়বাবু কখন তাঁহাকে দর্শন করেন নাই; উজিরগড়ের কেহ। তাহাকে কখন দেখে নাই। তথাপি তিনি রসময়বাবুর কন্যার নাম,-“ভাল নাম নহে, ডাক নাম,-উচ্চারণ করিতে সমর্থ হইলেন। সন্ন্যাসী মহান্তদিগের কিছুই অবিদিত থাকে না। ভূত, ভবিষ্যৎ, বৰ্ত্তমান সকলই তাঁহারা প্ৰত্যক্ষ দেখিয়া থাকেন। সন্ন্যাসীর অদ্ভুত ক্ষমতার আরও বিশেষরূপ পরিচয় শীঘ্রই সকলে পাইল। তিনি কোনরূপ ঔষধ প্ৰদান করিলেন না, অথবা কোনরূপ মন্ত্র পাঠ করিলেন না। কেবল কন্যার নাম ধরিয়া ডাকিলেন। কিন্তু তাহাতেই সেই মৃতপ্রায় কন্যা জীবন প্রাপ্ত হইল। এতক্ষণ ধরিয়া যাহার। আমি চৈতন্য উৎপাদন করিতে পারি নাই, সন্ন্যাসীঠাকুরের অদ্ভুত তপস্যা-বলে এখন তাহার চৈতন্য হইল। কুসী প্রথমে একটি দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিল। তাহার পর, সে চক্ষু উনীলিন করিল। কিছুক্ষণের নিমিত্ত সন্ন্যাসীর মুখের দিকে সে একদৃষ্টি চাহিয়া রহিল। পুনরায় একটি দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া, সে চক্ষু মুদ্রিত করিল। পুনরায় চক্ষু উমীলিত করিয়া, সন্ন্যাসীর পানে চাহিয়া রহিল। পুনরায় সে চক্ষু মুদ্রিত করিল। চক্ষু উনীলন, সন্ন্যাসীর প্রতি দৃষ্টি, দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ, চক্ষু মুদ্রিতকরণ, তিন চারি বার সে এইরূপ করিল। শেষবার যখন সে চক্ষু উমীলন করিল, তখন ধীরে ধীরে বাম হস্তে মাথার কাপড়টি খুঁজিয়া, ঘোমটাটি টানিয়া দিল। তাহার পর, দক্ষিণ হস্তটি সন্ন্যাসীর গলদেশের পশ্চাৎ ভাগে রাখিল। অবশেষে আপনার মস্তকটি সন্ন্যাসীর বাম বাহু হইতে সরাইয়া, তাঁহার বক্ষঃস্থ সে চক্ষু বুজিল। সুস্থ হইয়া যেন সে এখন নিদৃষ্টং ནི་ལག་གི་ལག་གི་བ་ সঁকি বলিয়া সে আপনার মস্তক রাখিল! সন্ন্যাসীও না। যুবক ও উলঙ্গ শুকদেব গোস্বামীকে দেখিয়া অন্সরীগণ লজ্জা করে নাই, কিন্তু বৃদ্ধ বল্কলপরিধেয় ব্যাসকে দেখিয়া তাহারা লজ্জা করিয়াছিল! সন্ন্যাসীর অদ্ভুদ মাহাত্ম্য দেখিয়া, রসময়বাবু প্রভৃতি সকলেই বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইয়া রহিলেন। কেবল দিগম্বরবাবু সন্ন্যাসীর মাহাত্ম্য দর্শনে মুগ্ধ হইলেন না। রসময়বাবুকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলিলেন,- “রসময়! তোমার কি ঘূণা পিত্ত একেবারে নাই হে? তোমার চক্ষের উপর তোমার যুবতী কন্যাকে কেহ বা কোলে করিতেছে, কেহ বা বুকে করিয়া লইতেছে, ইহাতে তোমার কি লজ্জা বোধ হয় না? ছিঃ!” তাহার পর সন্ন্যাসীকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলিলেন, — “সন্ন্যাসীঠাকুর! কন্যার এখন জ্ঞান হইয়াছে। আর ইহার চিকিৎসা করিতে হইবে না। এ আমার কন্যা; আমি ইহার বর। আমার সহিত এখনি বিবাহ হইবে। কতক মন্ত্র বলা হইয়াছে, আর গোটাকত মন্ত্র বলিলেই হয়। কন্যাকে ছাড়িয়া দিয়া, এখন আপনি একটু সরিয়া বসুন। বাকী কয়টা মন্ত্র আমি পড়িয়া লই। আসুন পুরোহিত মহাশয় আসুন! রসময়! আয় দাদা! কাজটা শেষ করিয়া ফেলি। এই সব গোলমালে লগ্ন ভস্ম হইয়া গেল।” হবু জামাতাকে রসময়বাবু এখন বিলক্ষণ চিনিয়াছিলেন। তাহার প্রতি এখন তাহার ঘোরতর হইল না! ইহার অর্থ বোধ হয় এই S Sዓ8 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comাির্ড”******** অভক্তি জনিয়াছিল। রসময়বাবু তাঁহাকে কি উত্তর দিবেন, তাহা ভাবিতেছেন, এমন সময় বৈঠকখানার বাহিরে সেই জনতার ভিতর আবার কি গোল হইল। আমার মুখপানে চাহিয়া রসময়বাবু বলিলেন, — “আবার কি উৎপাত ঘটে দেখা। সকলেই কন্যার বিবাহ দিয়া থাকে, কিন্তু এমন কেলেঙ্কারি। আর কখনও দেখি নাই। লোকের কাছে যে মুখ দেখাইব, সে যে আর আমার রহিল না।” চতুর্থ পরিচ্ছেদ গলা-ভাঙ্গা দিগম্বরী বাস্তবিক এই সময় আর একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটিল। ভিড় ঠেলিয়া একজন বৈঠকখানার ভিতর প্ৰবেশ করিলেন। তাঁহার লম্বা-চওড়া চেহারা দেখিয়া, প্রথম তাঁহাকে পুরুষ-মানুষ বলিয়া আমার ভ্রম হইয়াছিল; কিন্তু তাঁহার পরিধেয় বস্ত্ৰ দেখিয়া সে ভ্ৰম আমার দূর হইল। চওড়া কস্তাপেড়ে শাড়ী তিনি পরিয়াছিলেন। মুখখানি তাঁহার বড় একটি হাঁড়ীর মত ছিল। সেই হাঁড়ীর মধ্যস্থল উচ্চ নাসিকা দ্বারা, দুই পার্শ্ব দুই চালুরুঞ্জস্থি দ্বারা, নিম্নদেশ মুখ-গহ্বর দ্বারা, আর তাহার উপর কতকগুলি বড় বড় গােঁফের কোষ্ঠীর সুশোভিত ছিল। যদি কোন মানুষের ঠিক বাঁশীর মত নাক থাকে, তাহা হইলে ভুক্ঠিপ্লছিল। মাথার চুলগুলি অধিকাংশ পাকিয়া গিয়াছিল, তবে পাকার ভিতর কঁচা চুলগুৰ্ভুিদীর্ক ছিল। মাথার সম্মুখভাগে টাক পড়িয়াছিল। কতক সেই টাকের উপর হইতে, কতকুণ্ঠকীৰ্চা-পাকা চুলের ভিতর হইতে সিন্দুরের ছটা বাহির হইতেছিল। শীতলাদেবী কি ললাটদেশের এতখানি অংশ সিন্দুরে রঞ্জিত করেন কি না, তা সন্দেহ। সেই সিন্দুরের ছটা দেখিয়া বোধ হইল, যেন তাহার দেহটি সমস্ত শরীরটি পতিভক্তিতে পূর্ণ হইয়া গিয়াছে; শরীরে পতিভক্তি আর ধরে না, তাই তাহার কতকটা মাথা ফুড়িয়া বাহির হইতেছে। স্ত্রীলোকটি শ্যামবর্ণ, তাহার দেহটি যেমনি দীৰ্যে, তেমনি প্রন্থে: পাঠানদিগের দেশেও তাঁহার প্রতি একবার ফিরিয়া চাহিতে হয়; তাঁহার নাকে নথ ও হাতে শাখা ছিল। বয়ঃক্রম পঞ্চাশের অধিক হইবে। কিন্তু এখনও তাঁহার দেহে অপরিমিত বল ছিল, তাহা তাঁহার আকৃতি ও ভঙ্গীতে প্ৰকাশ পাইতেছিল। স্ত্রীলোকটি যে আমাদের দেশের লোক, বাঙ্গালী, পরিধেয় বস্ত্ৰ দেখিয়া প্রথমেই তাহা আমি বুঝিতে পারিয়াছিলাম। আরও ভালরূপে নিরীক্ষণ করিয়া আমি বুঝিতে পারিলাম যে, তিনি ভদ্রকন্যা ও ভদ্ররমণী, আকৃতি-প্রকৃতি যেরূপ হউক না কেন। সিন্দুর প্রসঙ্গে আমি তাঁহার পতিভক্তির উল্লেখ করিয়াছি। সেই সম্বন্ধে তাহার দন্তপূর্ণ মুখখানি আরও পরিচয় প্রদান করিতেছিল। সেই মুখখানি যেন পৃথিবীর সমস্ত নারীকুলকে বলিতেছিল,— “ওরে অভাগীরা! পতিপরায়ণা সতী কাহারে বলে, যদি তোদের দেখিতে সাধ থাকে। তবে আয়। এই আমাকে দেখিয়া যা; আমি তাহার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত, সাক্ষাৎ পতিভক্তি মূৰ্ত্তিমতী হইয়া আমি এই পৃথিবীতে অধিষ্ঠান করিয়াছি।” স্বরে তিনি বলিলেন,- “কৈ! কোথায় সে ফোকলা কোথায়! সে মুখ-পোড়া নচ্ছার কোথায়?” ফোকুলা দিগম্বর sNAls viði (< BS! ro www.amarboi.com ro Sዓd তাহার মূৰ্ত্তি দেখিয়া, সকলে অবাক হইয়াছিল; এখন তাঁহার কণ্ঠস্বর শুনিয়া সকলে আরও অবাক হইল। আৰ্দ্ধভগ্ন গুরু-গাষ্ঠীর স্বর! কিসের সহিত সে স্বরের তুলনা করিব? ছেড়া জয়ঢাকের শব্দের সহিত? এতিক্ষণ ঘরের ভিতর কত গোলমাল হইতেছিল; কুসুমের চৈতন্য উৎপাদনের নিমিত্ত কত লোক কত ঔষধের কথা বলিতেছিল; তাহার পর বিবাহের কথা, সন্ন্যাসী মহাস্তের কথা;-সকলেই একসঙ্গে নানারূপ কথোপকথন করিতেছিল। কিন্তু এখন তাহার সেই কণ্ঠস্বর শুনিয়া, সকলেই একেবারে নিস্তব্ধ হইল। পিপীলিকার পদশব্দটি পৰ্যন্ত ঘরে আর রহিল না । গলাভাঙ্গা স্ত্রীলোকটি পুনরায় বলিলেন,- “কৈ! সে ফোকলা মুখপোড়া কোথায়?” আমার নিকটে বসিয়া, ফোকলা মহাশয় একদৃষ্টি কুসী ও সন্ন্যাসীর মুখপানে চাহিয়া পাখা নাড়িতেছিলেন। “ফোকলা মুখপোড়া কোথায়?” এই গন্ত্রর শব্দ শুনিয়াই তাঁহার মুখ শুকাইয়া এতটুকু হইয়া গেল। আমার পশ্চাৎ দিকে তিনি লুকাইতে চেষ্টা করিলেন। স্ত্রীলোকটি কে, তখন আমি বুঝিতে পারিলাম, ফোকলাকে আমি লুকাইতে দিলাম না। আমার পশ্চাৎ দিকে তিনিও যত সরিয়া আসেন, আমিও তত সরিয়া যাই। ইতিমধ্যে সেই স্ত্রীলোকের দৃষ্টি তাঁহার উপর পড়ল। তিনি বলিলেন,-“এই যে পোড়া মুখ লুকাইতেছেন। হ্যারে! ড্যাকরা এ সব তোর কি কারখানা বলা দেখি?” দিগম্বরবাবু বলিলেন, —“কেও! মনুর মা! তুমি কোথা হইতে?“ গলা-ভাঙ্গা উত্তর করিলেন,- “আমি কোথা হইতে! আমি যমের বাড়ী হইতে! তোর নড়া विनी!" সকলের দৃষ্টি এখন বিন্দীর উপর পড়ল। বিন্দী গলা-ভাঙ্গার সংসারে চাকরাণী ছিল। স্ত্রীপুরুরে যুদ্ধের সময় বিন্দী, গৃহিণীর বিশেষরূপ সহায়তা করিত। সেজন্য গলা-ভাঙ্গা তাহাকে বড় ভালবাসিতেন! বিন্দী এখন সেতোগিরি করে। রসময়বাবুর অফিসের (পাঞ্জাবী নহে) হিন্দুস্থানী চাপরাসীকে সম্মুখে পাইয়া, বিন্দী তাঁহাকে পরিচয় দিতে আরম্ভ করিল। বিন্দী বলিল,- “এই দেখ দেখি গা! মিনূসের একবার আক্কেল! আর একবার অমনি করিয়াছিল। তোর বয়স হইয়াছে। ঘরে আমন গিনী রহিয়াছে! কেন, আমার গিনী-মা দেখিতে মন্দ কি? চক্ষের কোল একটু বসিয়া গেছে, এই যা! তোর ছেলে রহিয়াছে! মেয়ে রহিয়াছে! নাতি রহিয়াছে! নাতিনী রহিয়াছে! তোর আবার বে কেন?” V,, হিন্দুস্থানী চাপরাসী কোন সময়ে কলিকাতা আসিয়াছিল, সেজন্য বাঙ্গালা ভাষা সে অতি সুন্দর জানিত। বিশুদ্ধ বাঙ্গালায় সে বলিল,— “হামিও সেই বাত বলি। বুঢ়ো আদূমির আবার বিন্দী বলিল,— “দুর মুখ-পোড়া! না, তামাসার কথা নয়। প্ৰয়াগে থাকিতে বুড়া আর S “ካዩ› fi:Ilă zi, o go sel - www.amarboi conf** একবার এই রঙ্গ করিয়াছিল। আমার গেরোশনি হইয়াছে, এই কথা বলিয়া, আর একজন বাবুর মেয়েকে বে করিতে চাহিয়াছেন। বালাই আর কি! গেরো-শান্নি হবে কেন গা! আমার গিনী-মা কেমন শক্ত, কেমন দাঁড় রহিয়াছিল। আর দেখ জমাদার! এই কার দোষ দিব! এই বাবুগুলোই বা কি বল দেখি? চোখের মাথা খেয়ে গয়নার লোভে তিনকেলে ফোকলা বুড়োর হাতে তারা মেয়ে গুজে দেবে, তা ও বেচারাই বা করে কি?” চাপরাসী বলিল,— “হামিও সেই বাত বলি।” বিন্দী বলিল,— “হাঁ ভাই জমাদার! তুমি বিবেচনা করিয়া দেখ। ভাগ্যে গিনী-মায়ের ভগিনীপতির ভায়রা-ভাই খবরটি দিল, তাই তো তিনি জানিতে পারিলেন!! তাই গিনী-মা বলিলেন, — ‘বিন্দী! বুড়ো আবার মেতেছে। চল, ফের যাই, গিয়া ব্যাটার বাড়ীতে তার বিষ ঝাড়াই।” আমি বলিলাম, যাব বই কি গিামী-মা! যখন তোমার এমন বিপদ, তখন আমি তোমাকে নিয়ে যাব। আমি পথঘাট সব জানি। কত লোককে আমি কাশী বৃন্দাবনে নিয়ে যাই। ঠাকুরবাড়ীও কতবার গিয়াছি। মেয়েমানুষ হইলে কি হয়! গিনী-মাকে পিণ্ডিতে তো আনিলাম বাছা!” গলা-ভাঙ্গা এখন বিন্দীর কথাটি লুফিয়া লইলেন। তিনি বলিলেন, — “হা, বিন্দী বলিয়াছে ভাল। আমরা দুইজনে পিণ্ডিতে আসিলাম। তোমার বাসায় যেখানে তোমার পিণ্ডি চটিকান রহিয়াছে, সেই বাড়ীতে যাইলাম। বিছানার শিয়রে, দেয়ালের গায়ে,-দেখিলাম, ছোট একটি বঁধানো ছবি রহিয়াছে। এই ষ্টুড়ির ছবি বুঝি! লোকের মুখে শুনিলাম যে, বাবু বে করিতে গিয়াছেন। হ্যা রে, মুখপোড়া! তোর না দুটাে আইবুড়ো বুড় বড় নাতিনী রহিয়াছে!” ভয়ে দিগম্বরবাবু একেবারে কঁটা হইয়া গিয়াছেনুঞ্জিবাঁহ-বিষয়ে এখন তিনি সম্পূর্ণ হতাশ হইলেন। তাঁহার যে গৃহ শুন্য হয় নাই, তিনি যে, থ্যা কথা বলিয়াছিলেন, সে কথা এখন প্ৰকাশ হইয়া পড়িল। তিনি যে ধন্যবান লোকুণ্ঠাহীর স্ত্রীর ভাব দেখিয়া তাহাও বােধ হইল না। তাঁহার যে গ্ৰী আছে, তাহা জানিয়া, রসুঙ্গুলীৰ্ব আর তাঁহার সহিত কন্যার বিবাহ দিবেন না! রসময়বাবু সম্মত হইলেই বা ফল কিংস্ট্রী। তাহা হইলে প্ৰহারের চােটে তাঁহার হাড়-গোড় চূর্ণ করিয়া দিবে। গলা-ভাঙ্গার হাতে র তাহার উত্তম-মধ্যম হইয়া গিয়াছে। এলাহাবাদ থাকিতে এইরূপ আর একবার তিনি বিবাহের আয়োজন করিয়াছিলেন। মীে হইতে সে-বার যখন এলাহাবাদে বদলি হইয়াছিলেন, তখন গৃহিণীকে দেশে পাঠাইয়া এই কীৰ্ত্তি করিয়াছিলেন। উত্তর-পশ্চিম হইতে পঞ্জাবে বদলি হইবার সময় এবারও সেইরূপ গৃহিণীকে সঙ্গে লইয়া আসেন নাই। তাঁহাকে দেশে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাঁহার পত্নীবিয়োগ হইয়াছে—পঞ্জাবে আসিয়া সকলকে এইরূপ পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন। এই ভয়ে তিনি দেশে গিয়া কুসীকে বিবাহ করিতে সম্মত হন নাই। এলাহাবাদে যে বিবাহের সম্বন্ধ হইয়াছিল, তাহাতে দিগম্বরবাবুকে এবারের মত বরসজ্জা করিতে হয় নাই। বিবাহদিনের পূৰ্ব্বেই তাঁহার স্ত্রী আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। তাহার পর, গাত্র-বেদনায় দিগম্বরবাবু সাত আট দিন উঠিতে পারেন। নাই। আজ পাছে এই সভার মাঝখানেই সেইরূপ গাত্র-বেদনার যোগাড় হইয়া পড়ে, সেজন্য ভয়ে জড়-সড় হইয়া তিনি সুর ফিরাইলেন। """ firls six g3 &g! - www.amarboicom a Saq পঞ্চম পরিচ্ছেদ সূতা বাঁধা কেন ড্যাকরা দিগম্বরবাবু বলিলেন, —“বে। কার বে? আমি বে করতে আসি নাই, মাইরি বলিতেছি, আমি বে। করিতে আসি নাই। হয় না হয়, তুমি বরং এই রসময়বাবুকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখ। না, प्रप्र?** গলা-ভাঙ্গা উত্তর করিলেন,- “তোর বে নয়।” তবে তোর হাতে সূতা বাঁধা কেন রে, ড্যাকারা? দিগম্বরবাবু উত্তর করিলেন,- “হাতে সূতা বাধা? কার? আমার? স্ত্রী বলিলেন,- “একবার ন্যাকামি দেখ! হাতে সূতা বাঁধা কেন তা বল?” বিন্দীও সেই কথায় যোগ দিয়া বলিল,— “তা বাছা! তোমায় বলিতে হইবে। হাতে সূতা বাধা কেন, তা তোমায় বলিতে হইবে।” নিজের হাতে সূতা দেখিয়া, দিগম্বরবাবু অতিশয় বিশ্মিত হইলেন। কিরূপে কোথা হইতে তাহার হাতে সূতা আসিয়া গেল, ভাবিয়া চিন্তিয়া তিনি তাহা মনে করিতে পারিলেন না। কিন্তু ইহার কারণ না বলিলেও নয়। সেজন্য একটু ইতস্ততঃ করিয়া তিনি উত্তর করিলেন, — “হাতে সূতা বঁধা! তাই তো! ওটা আমার ঠাওর হয় নি।” গলা-ভাঙ্গা উত্তর করিলেন,- “ওটা তোমার ঠাওরু হয় নি!! পিণ্ডিতে চল। তোমার বাসায় গিয়া যাহাতে ঠাওর হয়, তাই করিব। বঁটার SN র ঠাওর করিয়া দিব। তবে আমার বলিলেন,- “কোন আটকুড়ীর বেটা ও কথা বলে রে? তোর মা হউক গলা-ভাঙ্গা দিগম্বরী!! মন্ত্ৰ! যত বড় মুখ, তত বড় কথা! হাড়হাবাতে বাহাতুরে ফোকলা! তোর জন্যে আমাকে এইরূপ অপমান হইতে হইল।” দেশে ও অন্যান্য স্থানে দিগম্বরবাবুর স্ত্রীকে অনেকেই জানিত। কেবল জানিত তাহা নহে, স্ত্রী-পুরুষ সকলেই তাঁহাকে ভয় করিত। বরযাত্রীদিগের মধ্যে কেহ বোধ হয়, ইহার সুখ্যাতি শুনিয়া থাকিবে। পরিচিত লোকেরা আড়ালে ইহাকে “গলাভাঙ্গা দিগম্বরী” বলিত। কিন্তু তাঁহার সম্মুখে সে নাম উচ্চারণ করে, কাহার সাধ্য! দিগম্বরী ইহার প্রকৃত নাম নহে, ইহার প্রকৃত নাম জগদম্বা। দিগম্বরবাবুর স্ত্রী, সেইজন্য দুষ্টলোকে ইহার নাম দিগম্বরী রাখিয়াছিল। তাহার পর কৰ্ত্তাটির যখন নিজস্ব একটি বিশেষণ আছে, তখন ইহারও একটি বিশেষণ আবশ্যক ইহার কণ্ঠস্বর ভাঙ্গা ভাঙ্গা মেঘগৰ্জ্জনের ন্যায়; সেজন্য দিগম্বরী নামের পূৰ্ব্বে গলা-ভাঙ্গা বিশেষণটিও দুষ্টলোকে যোগ করিয়াছিল। আমি পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি যে, ইহার যে “গলা-ভাঙ্গা” নাম হইবে, সে কিছু বিচিত্ৰ কথা নহে। নামকরণের ভার আমার উপর হইলে, আমিও ঐ নামটি তাঁহাকে বাছিয়া দিতাম । আড়াল হইতে কে তাঁহাকে “গলা-ভাঙ্গা দিগম্বরী” বলিল, সেজন্য প্রথম তাঁহার অতিশয় ক্ৰোধ হইল। তাহার পর, তাহার অপমান বোধ হইল। তাহার পর তাহার দুঃখ হইল। তাহার Seዓbr দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comশ্মির্ত্য","র্থ "**** পর তাঁহার কান্না আসিয়া গেল। তৎক্ষণাৎ সভাস্থলেই তিনি থপি করিয়া বসিয়া পড়িলেন। তাহার পর ঘরের দেওয়ালটি তিনি ঠেস দিলেন, তাহার পর পা দুইটি তিনি ছড়াইয়া দিলেন। অবশেষে তাহার ফাটা কণ্ঠভেরীর গগনস্পশী শব্দে তিনি জগৎ নিনাদিত করিলেন। এ দুঃখের সময়, তাহার জীবিত পুত্র, কন্যা, পৌত্র, দৌহিত্র,- তাহাদিগকে তাঁহার স্মরণ হইল না! ত্রিশ বৎসর পূৰ্ব্বে আঁতুড়ঘরে তাহার একটি তিনদিনের কন্যা মারা পড়িয়াছিল, তাহাকে এখন তাতার স্মরণ হইল। সেই শোক এখন তাহার উথলিয়া পড়িল। তাহাকে স্মরণ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে তিনি ক্ৰন্দন করিতে লাগিলেন,- “কোথায় রে! খুকী রে! দেখিয়া যা! এখানে তোর মায়ের দশা কি হইয়াছে! তোর মাকে গলা-ভাঙ্গা বলিয়া আটকুড়ার বেটারা অপমান করিতেছে। কোথায় রে! আমার খুকী কোথায় গেলি রে!” ইত্যাদি। আহা! বড় দুঃখের বিষয় যে,-সে খুকী নাই! সে খুকী থাকিলে, এতক্ষণ কোন কালে আসিয়া রক্ষা করিত! বিবাহ-সভায় হুলস্থূল পড়িয়া গেল। নূতন ধরনের এই অভিনয় দেখিয়া, সভার সভ্যগণ পরম গ্ৰীতি উপভোগ করিতে লাগিলেন। এইরূপে কিছুক্ষণ কাদিয়া গলা-ভাঙ্গার নিদ্রার আবেশ হইল। কান্নার সুর কিছু টিমে হইল, মাঝে মাঝে কথার ফাঁক পড়িতে লাগিল; ক্রমে তাঁহার চুল আসিল। চুল আসায় তাহার মস্তক সম্মুখ দিকে অবনত হইতে লাগিল। একটু অবনত হইল, আরও অবনত হইল, আরও অবনত হইল। ক্রমে পায়ের নিকট মস্তক আসিয়া উপস্থিত হইল। আমি মনে করিলাম, এইবার ইহাকে ধরা উচিত হইতেছে, তা না হইলে মুখ থুবড়িয়া ইহার মাটিতে গিয়া পড়িবে। কিন্তু মাথা যাই মাটিতে পড়-পড় হইল, আর তৎক্ষণাৎ ইনি বসিলেন। সোজা হইয়া মৃদুস্বরে একবার বলিলেন,- “কোথায় আমার খুকী রেংগুই কথা বলিয়া পুনরায় তাহার ঢুল আসিয়া গেল। পুনরায় সেইভাবে তাহার মস্তক আরম্ভ হইল। পুনরায় তিনি মাটিতে পড়-পড় হইলেন। যাই পতিতপ্ৰায় আর সেই মুহূৰ্ত্তে পুনরায় তিনি সোজা হইয়া, “কোথায় আমার খুকী রে!” এই য়া একবার মৃদুস্বরে কীদিলেন। আবার পুনরায় ঢুল আসিয়া গেল, এইরূপ ক্রমাগত লাগিল। প্রতিবার যাই তিনি পড়-পড়া হইতে লাগিলেন, মাটিতে পড়িয়া এ বঁাশী-নাক বা ছেছিয়া যায়। তাঁহাকে ধরিবার নিমিত্ত দুই একবার আমি প্ৰস্তুতও হইয়াছিলাম। ফলকথা , তাহার বার বার এই পড়-পড় ভােব আমার পক্ষে একপ্রকার সাজা হইয়াছিল। রসময়বাবু অবাক! একবার গলা-ভাঙ্গার দিকে, একবার দিগম্বরের দিকে, একবার আমার দিকে, একবার কুসীর দিকে, একবার সন্ন্যাসীর দিকে,- তিনি চাহিয়া দেখিতেছিলেন। কেবল রসময়বাবু কেন? অনেকেই সে রাত্রিতে অবাক হইয়াছিল। উপন্যাসেও এরূপ ঘটনা হয় না। সকলেই বুঝিল যে, এ বিবাহ আর হইবে না! এই সময় বাড়ীর ভিতর হইতে পঞ্জাবী চাকরাণী আসিয়া রসময়বাবুকে ডাকিল। রসময়বাবু তাহার সঙ্গে বাটীর ভিতর গমন করিলেন। একটু পরেই ফিরিয়া আসিয়া তিনি আমাকে ডাকিলেন । আমিও তাঁহার সঙ্গে বাটীর ভিতর গমন করিলাম। রসময়বাবু আমাকে বলিলেন,- “যাদববাবু! কি কেলেঙ্কারি। কি লজ্জা। এ অঞ্চলে আমি আর মুখ দেখাইতে পারিব না। সে যাহা হউক, আবার এক বিপদের কথা শুনুন। আমার শালী কোথায় চলিয়া গিয়াছেন। আমার স্ত্রীর নিকট হইতে কুড়িটি টাকা লইয়া তিনি কোথায় ফোকুলা দিগম্বর sNAls viði (< BS! ro www.amarboi.com ro Sዒኡ গিয়াছেন। আমার স্ত্রী অত বুঝিতে পারে নাই। সে মনে করিল, বিবাহের কি কাজের জন্য টাকার প্রয়োজন হইয়াছে। তাহার পর, কোন স্থানে তাহাকে দেখিতে না পাইয়া, সে ও চাকরাণী তন্ন তন্ন করিয়া সকল স্থান অন্বেষণ করিয়াছে। আমিও সকল স্থানে খুঁজিয়া দেখিলাম কোন স্থানে তাঁহাকে দেখিতে পাইলাম না। কি কুক্ষণে আজ রাত্রি প্রভাত হইয়াছিল, তাহা বলিতে পারি না। চাকরীর স্থানে আমার অপমানের আর সীমা রহিল না!” আমি বলিলাম,- “কুসুমের মূৰ্ছা হইলে, তিনি তাহাকে পাখার বাতাস করিতেছিলেন। যখন সন্ন্যাসীঠাকুর আসিয়া আমাকে ঠেলিয়া ফেলিয়া কুসুমকে আমার নিকট হইতে কাড়িয়া লাইলেন, সেই সময় হইতে আর আমি তাঁহাকে দেখি নাই।” রসময়বাবু উত্তর করিলেন,- “হাঁ! সেই সময় তিনি বাটীর ভিতর গমন করেন। ছোটঘর বাহিরের ছোটঘরে প্রত্যাগমন করিল, আমার শালী বাটীর ভিতর রহিলেন। তাহার পর, আর কেহ তাঁহাকে দেখে নাই। কিছুক্ষণ পরে আমার স্ত্রী বাটীর ভিতর আসিয়া, তাঁহাকে দেখিতে না পাইয়া, চারিদিকে অন্বেষণ করিতে লাগিল; তাঁহাকে দেখিতে পাই না। তিনি বাটীতে নাই; তিনি কোথায় চলিয়া গিয়াছেন। কেন, তা বলিতে পারি না।” আমি বলিলাম,- “তবে কি তিনি বাগানের দ্বার দিয়া গিয়াছেন?” রসময় উত্তর করিলেন,- “হী! তাঁহাই বোধ হয়।” আমি বলিলাম,- “আমি তাহার অনুসন্ধান করিতে যাইতেছি। অন্য কোন বাঙ্গালীর বাটীতে বোধ হয় থাকিবেন। আপনি কুসীর নিকট । সন্ন্যাসী মহাশয় বড়ই উপকার আমি খিড়কি-দ্বার অভিমুখে যাইলাম; রসময়বাবু বৈঠকখানা-ঘরে প্রত্যাগমন করিলেন। খিড়কি-দ্বার দিয়া আমি বাগানে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সে স্থানে অনেকগুলি ঐ দেশী স্ত্রী ও পুরুষ দাড়াইয়া বিবাহের তামাসা দেখিতেছিল। মাসীর কথা আমি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলাম। একজন স্ত্রীলোক আমাকে বলিল যে, কিছুক্ষণ পূৰ্ব্বে সে যখন এই বাটীতে আসিতেছিল, তখন পথে তাহার সহিত তাহার সাক্ষাৎ হইয়াছিল। সেই পথ দিয়া তিনি দ্রুতবেগে যাইতেছিলেন। সে কোন পথ, তাহা আমি জানিয়া লইলাম। সে রাস্তার নাম “ষ্টেশন—রোড়” রেল-ষ্টেশন অভিমুখে তাহা গিয়াছে। সেই রাস্তার উপর হারাণবাবুর বাড়ী । Stro দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboicom 26: আমি মনে করিলাম যে, মাসী বোধ হয়। হারাণবাবুর বাড়ীতে গিয়াছেন। সেই পথ ধরিয়া হারাণবাবুর গৃহ অভিমুখে আমি গমন করিতে লাগিলাম। গ্ৰীষ্মকাল। সুন্দর চন্দ্রালোকে দিনের মত পথ-ঘাট আলোকিত হইয়াছিল। সেজন্য পথ চলিতে আমার কষ্ট হইল। না। কুসুমের মাসী বাটী হইতে হঠাৎ কেন বাহির হইলেন, সেই কথা আমি ভাবিতে লাগিলাম। কুসীর তিনি বিধবা-বিবাহ দিতেছেন। এই কথা প্রকাশ হইবার কোনরূপ সূচনা হইয়া থাকিবে, সেই ভয়ে বোধ হয়, তিনি বাটী হইতে বাহির হইয়াছেন। মনে মনে আমার এইরূপ সন্দেহ হইল । যাহা হউক, দিগম্বরবাবুর সহিত কুসীর যে বিবাহ হইল না, সেজন্য আমি আহাদিত হইলাম। আহাদ আর কি করিয়া বলিব? মৃত হীরালালকে তো আর ফিরিয়া আনিতে পারিব না। সন্ন্যাসীঠাকুর আপাততঃ কুসীর চেতনা উৎপাদন করিলেন। তাহাকে সম্পূর্ণরূপে ভাল করিলেও তিনি করিতে পারেন। কিন্তু তাহাতে আর আহাদ কি? এ জীবনে কুসীর আর সুখ হইবে না! চিরকাল তাহাকে দুঃখে কাটাইতে হইবে! এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে আমি পথ চলিতে লাগিলাম। কিছুদূর গিয়াছি, এমন সময়ে দেখিলাম যে, ষ্টেশনের দিক হইতে একখানি এক্কা আসিতেছে। রসময়বাবুর বাসা হইতে ষ্টেশন প্ৰায় তিন মাইল পথ। আমাকে দেখিয়া এক্কাওয়ালা জিজ্ঞাসা করিল,— “বাবু, ভাড়া হবে।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “আমি হারাণবাবুর বাড়ী যাইব, সে স্থান হইতে পুনরায় রসময়বাবুর বাটীতে ফিরিয়া আসিব। কত নিবি?” (S) ভাড়া চুক্তি হইল। আমি এক্কার উপর উঠিলাম। ঘোড় যে, এইমাত্র সে একজন বাঙ্গালী স্ত্রীলোককে ষ্টেশনের আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,—“কি?” 4, এক্কাওয়ালা উত্তর করিল,- “ র্ব একজন বাঙ্গালী স্ত্রীলোক আমার এক্কা ভাড়া করিয়াছিলেন। আমি তাহাকে র্যা যাইলাম। সে স্থানে উপস্থিত হইয়া, তিনি আমাকে লাহােরের টিকিট কিনিয়া দিতে । প্ৰাতঃকালে পাচটার সময় গাড়ী যায়। টিকিটবাবু এখন আমাকে টিকিট দিলেন না। ষ্টেশনের নিকট যে সরাই আছে, স্ত্রীলোকটিকে আমি সেইস্থানে রাখিয়া আসিলাম। ভেটিয়ারাকে বলিয়া আসিয়াছি, পাচটার সময় সে তাঁহাকে Dिकि किनिया निल।" স্ত্রীলোকটি কিরূপ, তাহার বয়স কত, সেইসব কথা আমি এক্কাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করিলাম। যেরূপ বিবরণ সে আমাকে দিল, তাহাতে আমি নিশ্চয় বুঝিলাম যে, সে স্ত্রীলোকটি কুসীর মাসী ব্যতীত অন্য কেহ নয়। হারাণবাবুর বাটী না গিয়া, এক্কাওয়ালাকে আমি ষ্টেশনের নিকট সেই সরাইয়ে যাইতে বলিলাম। পুরস্কারের লোভে এক্কাওয়ালা দ্রুতবেগে এক্কা হাঁকাইয়া দিল। আমি পুনরায় এই কথা সকলকে বলিয়া রাখি যে, যে স্থানে এই সমুদয় ঘটনা ঘটিয়াছিল, তাহার প্রকৃত নাম আমি দিই নাই। স্থান সম্বন্ধে আমার কেহ কোনরূপ ভুল ধরিবেন না। ষ্টেশনের নিকট সেই পান্থশালায় গিয়া আমি উপস্থিত হইলাম। পান্থ-নিবাসের প্রাঙ্গণে, একটি খাটিয়ার উপর গালে হাত দিয়া বসিয়া কুসীর মাসী ভাবিতেছিলেন। এক্কা দাঁড়াইয়া রহিল। আমি সেই খাটিয়ার একপার্শ্বে গিয়া উপবেশন করিলাম। মাসী আমাকে দেখিয়া চমকিয়া উঠিলেন । আমি তাঁহাকে বলিলাম,-“এ কি আপনি ভাল কাজ করিয়াছেন? এখন বাড়ী চলুন।”

    • firls six g3 &g! a www.amarboicom a Sabrð মাসী উত্তর করিলেন,-“আমি এ পোড়া-মুখ আর কাহাকেও দেখাইব না। আমি কাশী চলিয়া যাইব । সে স্থানে ভিক্ষা মাগিয়া খাইব ।”

আমি বলিলাম,-“কাশী যাইতে হইবে কেন? হইয়াছে কি? আপনার সে কথা তো প্ৰকাশ হয় নাই! তবে আপনার ভাবনা কি?” আশ্বৰ্য্যান্বিত হইয়া মাসী আমাকে বলিলেন,-“প্রকাশ হয় নাই! তুমি পাগল না কি?” আমি উত্তর করিলাম,-“না, আমি পাগল নই। পাগলের লক্ষণ আমাতে আপনি কি দেখিলেন? আমি সত্য বলিতেছি, আপনার সে কথা প্ৰকাশ হয় নাই? অন্ততঃ আমি কাহাকেও কোন কথা বলি নাই। তাহার পর, আপনি যে কাজ করিতেছিলেন, তাহা স্থগিত হইয়া গিয়াছে। দিগম্বরবাবুর সহিত কুসীর আর বিবাহ হইবে না। তবে আর আপনার ভয় কি? বাড়ী চলুন।” মাসী উত্তর করিলেন,-“তুমি পাগল।” কুসুমের মাসী এরূপ কথা বলিলেন কেন, ইহার অর্থ আমি কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। কুসুমের যে একবার বিবাহ হইয়াছিল, আমি ব্যতীত উপস্থিত ব্যক্তিগণের মধ্যে আর কেহ কি সে কথা অবগত আছে? পাছে সে প্রকাশ করে, সেই ভয়ে কি মাসী বাটী হইতে পলায়ন করিয়াছেন? কিন্তু যখন বিবাহ হইল না, তখন আর বিশেষ ভয়ের কারণ কি? কুসুমের পূর্ববিবাহ গোপন করিয়া মাসী এই কাণ্ড করিয়াছেন; সে কথা শুনিলে রসময়বাবু যে রাগ করবেন, সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু দৈব ঘটনায় যুখন বিবাহ বন্ধ হইয়া গিয়াছে, তখন ਕਿ কৃপাবার বার অনুরোধ করিলাম। কিন্তু তিনি ধ্ৰুঝিলাম যে, ইহার মন হইতে ভয় দূর করিতে একটু সময় লাগিবে। সেজন্য এ চাপা দিয়া, পুনরায় আমি সেই পূৰ্ব্ব কথার উল্লেখ করিলাম । আমি বলিলাম, - “আচ্ছা! ভাল! আপনি যদি একান্তই কাশী যাইবেন, আর আমি যদি উচিত বিবেচনা করি, তাহা হইলে টিকিট কিনিয়া, আমিই না হয় আপনাকে গাড়ীতে বসাইয়া দিব। কিন্তু গাড়ীর এখনও অনেক বিলম্ব আছে। গাড়ী সকালবেলা পাচটার সময় ছাড়িবে। এখনও বোধ হয়, রাত্রি দুই প্রহর হয় নাই। সেদিন কথা বলিতে বলিতে রসময়বাবু আসিয়া পড়িলেন। কথা শেষ হয় নাই। তাহার পর কি হইল?” আমি তাঁহাকে কাশী পাঠাইয়া দিব, এই কথা শুনিয়া মাসী কিছু স্থির হইলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,-“সেদিন তুমি কোন পৰ্যন্ত শুনিয়াছিলে?” আমি উত্তর করিলাম,- “লোচন ঘোষ নামক একব্যক্তি হীরালালের মৃত্যুসংবাদ দিয়া আপনাকে চিঠি লিখিয়াছিল। সেই চিঠির সঙ্গে একখানি খবরের কাগজও আসিয়াছিল। তাহাতেও ঐ দুঃসংবাদ লেখা ছিল। সেই চিঠি ও সেই কাগজ পড়িয়া কুসী অজ্ঞান হইয়া পড়িল। সেদিন আমি এই পৰ্যন্ত শুনিয়াছিলাম। তাহার পর কি হইল?” 多 তাহার পর হইতে মাসী পূৰ্ব্ববৃত্তান্ত আমাকে বলিতে লাগিলেন। কিন্তু সে সমুদয় কথা মাসী আমাকে যেভাবে বলিয়াছিলেন, আমি সেভাবে বলিব না। আমি আমার নিজের ভাষায় সে বিবরণ প্ৰদান করিব । ՀԵՀ দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com"ির্ড”********* সপ্তম পরিচ্ছেদ ঘোর বিকার এখন আমাদিগকে পুনরায় সেই মেসোমহাশয়ের গ্রামে যাইতে হইবে। দুই বৎসর পূৰ্ব্বে সে স্থানে যাহা ঘটিয়াছিল, এখন তাঁহাই আমি বলিব। লোচন ঘোষ যে চিঠি লিখিয়াছিলেন, কুসী তাহা ভালরূপে পাঠ করিল। তাহার সহিত যে সংবাদপত্র আসিয়াছিল, তাহাও সে ভালরূপে পাঠ করিল। চিঠি ও সংবাদপত্র পাঠ করিয়া এবার কুসীর যে মূৰ্ছা হইল, সে মূৰ্ছা আর সহজে ভাঙ্গিল না। সমস্ত রাত্রি কুসী অচেতন অবস্থায় রহিল। শেষ রাত্ৰিতে অতিশয় জুর হইল, চক্ষু দুইটি রক্তবর্ণ হইল, কপালে হাত দিয়া সে কাতরতাসূচক শব্দ করিতে লাগিল, এ-পাশ ও-পাশ সে মস্তক চালনা করিতে লাগিল। মাসী একদৃষ্টি তাহার মুখপানে চাহিয়া রহিলেন, একটু ছিন্নবস্ত্ৰ জলে ভিজাইয়া মাঝে মাঝে তাহার ওষ্ঠ ও চক্ষুদ্বয় মুছাইতে লাগিলেন। মাসী নিজেও একপ্রকার জ্ঞানাহত হইয়াছিলেন । অশ্রদ্ধজলে ক্রমাগত তাহার পরিধেয় বস্ত্র ভিজিয়া যাইতেছিল। প্ৰাতঃকাল হইলে তিনি একজন প্ৰবীণ প্ৰতিবাসীকে ডাকিয়া আনিলেন। ইনি ভালরূপ নাড়ী পরীক্ষা করিতে জানিতেন। হাত দেখিয়া ইনি বলিলেন যে, কুসীর ঘোর জুর-বিকার হইয়াছে। সত্ত্বর ডাক্তার আনয়ন করা আবশ্যক। মাসী পূৰ্ব্বদিন দুইশত টাকা পাইয়াছিলেন। র বন্ধু লোচন ঘোষ তাহা প্রেরণ করিয়াছিল। একজন প্ৰতিবাসীকে তিনি ডাক্তার পাঠাইলেন। ডাক্তার আসিয়াই কুসীর মস্তক মুণ্ডনের আর্দেশ করলেন। নাপিত আসিল, কুসীকে নেড়া করিবার নিমিত্ত সমুদয় আয়োজন হইল। এরূপ অস্থির অবস্থায় ছিল, এরূপ উঠিতে বসিতেছিল ও মাথা নাড়িতেছিল যে, ক্ষুর চালনা করিতে সাহস করিল না। মস্তক মুণ্ডন না করিবার আর একটি কারণ ছিল সঁ কুসীর অলৌকিক রূপ দেখিয়া ডাক্তার ও নাপিত, দুইজনেরই দয়া হইল। তাহার সে উজ্জ্বল সুদীর্ঘ কেশরাশি কাটিয়া ফেলিতে দুইজনেরই মায়া হইল। সেই সময় দুই-তিনজন প্রতিবাসিনীও আসিয়া বলিলেন, — “তা কি কখন হয়! আইবুড়ো মেয়ে! সহজেই ইহার বিবাহ হইতেছে না। তাহার উপর নেড়া-বেচা করিলে, আর কি ইহার বিবাহ হইবে?” কুসীর সেই কটিদেশ-লম্বিত ঘোর কৃষ্ণবর্ণের উজ্জ্বল কেশরাশি এইরূপে বঁচিয়া গেল। সেই চুলের উপরেই ছিন্নবস্ত্র রাখিয়া ডাক্তার জলসিঞ্চন করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহাতেও কুসীর জ্ঞান হইল না। সেইদিন বৈকালবেলা কয়েকজন প্রতিবাসিনী কুসীকে দেখিতে আসিয়াছিলেন। মাসী কুসীর নিকট বসিয়া কাঁদিতেছিলেন। একজন প্ৰতিবাসিনী বলিলেন,- “আহা! কাদিবে না গা! ছয় দিনের মেয়ে মানুষ করিয়াছে। সংসারের ওর আর আছে কে, তা বল?” আর একজন বলিলেন,- “আর শুনিয়াছ! সেই যে রামপদর সঙ্গে আমাদের গ্রামে একটি ছেলে আসিত, যাহার নাম মাণিকলাল না কি ছিল,- “আহা! সে ছেলেটি মারা পড়িয়াছে। হঠাৎ নীেকাডুবি হইয়া মারা পড়িয়াছে। কৰ্ত্তা খবরের কাগজে দেখিয়াছেন।” আর একজন বলিল,— “তাহার নাম হীরালাল ছিল। ছেলেটি বড় ভাল ছিল। আহা! তার ফোকুলা দিগম্বর Sbrరి sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro ব্যাপম্যায়ের মন যে কি হইতেছে!” অজ্ঞান অবস্থাতেই কুসী চীৎকার করিয়া উঠিল,- “হীরালাল! বাবু! কোথায়! ইস্! বাবু! তোমার কাপড়ে কি রক্ত! চাদর ফুটিয়া বাহির হইতেছে। যাই আমি ডাক্তার আনি।” তৃতীয় প্রতিবাসিনী বলিলেন,— “তোমাদের বিবেচনা নাই। বিকারের রোগীর কাছে মৃত্যুসংবাদ দিতে নাই। তোমরা হীরালালের গল্প করিলে, আর কুসীও দেখ সেই কথা বকিতে লাগিল।” ইহার পূৰ্ব্বে প্ৰলাপের সহিত কুসী। আরও অনেকবার “বাবু”র নাম করিয়াছিল। প্রতিবাসিনীদিগের কথায় কুসীর মাসী কোনও উত্তর করিলেন না। কুসী প্রায় কুড়িদিন এইরূপ অজ্ঞান অবস্থায় রহিল। তাহার পর ক্রমে বিকার কাটিয়া গেল। ক্ৰমে ক্ৰমে সে স্থির হইল। ক্রমে ক্ৰমে কুসী আরোগ্যলাভ করিতে লাগিল। এ যাত্ৰা কুসীর প্রাণরক্ষা হইল বটে, কিন্তু তাহার শরীর একেবারে ভগ্ন হইয়া গেল! সে গোল গড়ন ঘুচিয়া তাহার হস্ত পদ অস্থি চৰ্ম্ম-সার হইল। সে উজ্জ্বল ফুটফুটে গীেরবর্ণ ঘুচিয়া একপ্রকার রক্তহীন পাণ্ডুবৰ্ণে তাহার মুখশ্ৰী আচ্ছাদিত হইল। তাহার ভাসা ভাসা সে চক্ষু দুইটি বসিয়া গেল। চক্ষুর কোলে কালি মাড়িয়া দিল। যে চক্ষুর বর্ণ আমি সূৰ্য্য-কিরণমিশ্রিত নীল সমুদ্রজলের সহিত তুলনা করিয়াছিলাম, কিরূপ ঘোলা হইয়া সে চক্ষু এখন বিবৰ্ণ হইয়া গেল। তাহার মনও বিকৃত হইয়াছিল। ঠিক উন্মাদ নয়। কোনরূপ উপদ্রব সে করিত না। একস্থানে চুপ করিয়া সৰ্ব্বদাই সে কি ভাবিত। তাহার সহিত কথা কহিলে সে উত্তর দিত না । সৰ্ব্বদাই এরূপ অন্যমনস্কভাবে সে বসিয়া থাকিত যেকোহারও কথা সে শুনিতে পাইত কি না। সন্দেহ। কাছে দাড়াইয়া তিন চারিবার তাহাকে ডাক্সিলে, তবে তাহার চমক হইত। চমক হইয়া লােকের মুখপানে সে ফ্যািল-ফ্যাল করিয়া চৰ্হি’থার্কিত। তাহার পর হয় তাে কেবল “আঁ্যা” এই কথাটি বলিয়া পুনরায় অন্যমনস্ক ভুইকঁর্যইত। রোগ হইতে উঠিয়া প্রথম প্রথম কুসীর শরীর ও মনের অবস্থা এইরূপ ফুৰ্ফছ হইয়াছিল। তাহার সৌন্দৰ্য পুনরায় কিছু কিছু ফুটিয়াছিল, পূৰ্ব্বাপেক্ষা তাহার মনে জ্ঞানেরও সঞ্চার হইয়াছিল। সকলের কথা সে বুঝিতে পারিত, দুই একটি কথার উত্তরও প্ৰদান করিত। কিন্তু যতই হউক, কাশীতে আমি যে কুসী দেখিয়াছিলাম, সে কুসীর আর কিছুই ছিল না। লোচন ঘোষ যে দুইশত টাকা প্রেরণ করিয়াছিল, তাহার অধিকাংশ কুসীর চিকিৎসায় খরচ হইয়া গেল। কুসীর মাসীর বড় চিন্তা হইল। হীরালাল নাই। তাঁহার নিজের যাহা হউক, কুসীকে কে প্রতিপালন করিবে? তিনি অকূল পাথার দেখিতে লাগিলেন। ভাবিয়া চিন্তিয়া আর কোন উপায় ঠিক করিতে না পারিয়া, তিনি কুসীর পিতাকে একখানি পত্র লিখিলেন। কুসীর মেসো-মহাশয়ের কাল হইয়াছে, তাঁহারা নিঃসহায় হইয়া পড়িয়াছেন, চিঠিতে কেবল সেই কথা লিখিলেন। কুসীর যে বিবাহ হইয়াছিল, তাহার পর কুসী যে বিধবা হইয়াছে, ভগিনীপতিকে সে সকল কথা তিনি কিছু লিখিলেন না। তিনি ভাবিলেন যে, এখনও কন্যা অবিবাহিতা আছে, এই কথা মনে করিয়া তিনি চিন্তিত হইবেন ও সত্ত্বর পত্রের উত্তর করিবেন। যে কারণেই হউক, তিনি কুসীর বিবাহের কথা চিঠিতে উল্লেখ করেন নাই। সৌভাগ্যক্রমে সেই সময় বৰ্ম্মণীর মৃত্যু হইয়াছিল। রসময়বাবুর চক্ষু উন্মুক্ত হইয়াছিল। অনেক কষ্টে পািনদােষ হইতে তিনি নিভৃতি পাইয়াছিলেন। শালীর পত্ৰ পাইয়া তাঁহার মনে অতিশয় অনুতাপ হইল। কন্যার প্রতি তিনি যে অতি নিষ্ঠুর ব্যবহার করিয়াছেন, তখন তাহা ՀԵ8 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboicom:5'" তিনি বুঝিতে পারিলেন। পত্রের উত্তরে তিনি কুসীর মাসীর নিকট টাকা পাঠাইলেন ও কুসীর বিবাহের নিমিত্ত একটি সুপাত্রের অনুসন্ধান করিতে বলিলেন। এই সম্বন্ধে তিনি লিখিলেন, — “ছুটির জন্য আমি দরখাস্ত করিয়াছিলাম; কিন্তু ছুটি পাইলাম না। মনে করিয়াছিলাম যে, আমি নিজে দেশে গিয়া একটি পাত্র অনুসন্ধান করিয়া কুসুমের বিবাহ দিব; কিন্তু তাহা হইল না। তোমরাই একটি সুপােত্র অনুসন্ধান করিয়া আমাকে লিখিবো। আমি বিবাহের খরচ পাঠাইয়া दि।” এই পত্ৰ পাইয়া কুসুমের মাসী চুপ করিয়া রহিলেন। পাত্রের আর কি অনুসন্ধান করিবেন! তাহা কিছু করিলেন না। কুসীর যে বিবাহ হইয়াছিল, ভগিনীপতিকে তাহাও তিনি লিখিলেন না। তাহার পর, প্রতি পত্রে রসময়বাবু কন্যার বিবাহের কথা লিখিতেন। কিন্তু কুসুমের মাসী সে বিষয়ের কোন উত্তর দিতেন না। কুসীর পুনরায় যে তিনি বিবাহ দিবেন, সে চিন্তা এখনও তাহার মনে উদয় হয় নাই, স্বপ্নেও তিনি তাহা ভাবেন নাই। অষ্টম পরিচ্ছেদ লিখিয়াছিলেন,-“আমি পঞ্জাবে বদলি হইয়াৰ্ছ? আমি ভাবিয়ছিলাম যে পঞ্জাবে যাইবার সময় পারিব, কিন্তু তাহা হইল না। আর্মীকৈ সোজা পঞ্জাবে যাইতে হইবে। একদিনও আমি কলিকাতায় থাকিতে পাইব না। অতএব তুমি একটি সুপােত্র ঠিক করিয়া রাখিবো। সব ঠিক হইলে, পনের-ষোল দিনের ছুটি লইয়া আমি পঞ্জাব হইতে কলিকাতায় আসিব, আসিয়া কুসুমের বিবাহ দিব।” এ পত্ৰ পাইয়াও কুসুমের মাসী চুপ করিয়া রহিলেন। হীরালালের সহিত কুসুমের বিবাহের কথা তিনি ভগিনীপতিকে জানাইলেন না। কিন্তু পুনরায় যে কুসীর বিবাহ দিবেন, এখনও সে চিন্তা তাঁহার মনে উদয় হয় নাই, এখনও সে কথা তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নাই। কিছুদিন পরে পঞ্জাব হইতে রসময়বাবু পত্র লিখিলেন। অন্যান্য কথার পর তিনি লিখিলেন,- “কুসুমের পাত্র ঠিক করিবার নিমিত্ত আমি তোমাকে বার বার লিখিতেছি। সে কথার তুমি উত্তর দাও না কেন? ইহার কারণ আমি কিছুই বুঝিতে পারি না। মনে করিয়া দেখ, কন্যা কত বড় হইয়াছে। সে আমার দোষ বটে। কিন্তু যা হইবার তাহা হইয়াছে। এখন আর নিশ্চিন্ত থাকা উচিত নহে। এ সম্বন্ধে তুমি কতদূর কি করিলে, শীঘ্ৰ তুমি তাহা আমাকে লিখিবো।” এই পত্ৰ পাইয়া কুসীর মাসী আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলেন না। কিন্তু কুসীর যে বিবাহ হইয়া গিয়াছে, সে কথা তিনি এখনও ভগিনীপতিকে লিখিলেন না। তিনি মনে করিলেন যে, সাক্ষাৎ হইলে আদ্যোপােন্ত সে সমুদয় বৃত্তান্ত তিনি কুসীর পিতাকে বলিবেন। আপাততঃ তিনি

  • " sagl: '1óE LE 281 - www.amarbol.com - Sbrርጽ এই কথা লিখিলেন,-“আমি স্ত্রীলোক। কি করিয়া আমি পাত্রের অনুসন্ধান করিব? ঘটক কোথায় থাকে, তাহাও আমি জানি না। তুমি নিজে যাহা হয় করিবে। এতদিন যখন গিয়াছে, তখন আর কিছুদিন বিলম্ব হইলে বিশেষ কোন ক্ষতি নাই।”

এই পত্ৰ পাইয়া রসময়বাবু পুনরায় ছুটির জন্য আবেদন করিলেন, কিন্তু তিনি ছুটি পাইলেন না। ইহার কিছুদিন পূৰ্ব্বে পঞ্জাবেই দিগম্বরবাবুর সহিত তাঁহার আলাপ হইয়াছিল। তাঁহার স্ত্রী কোম্পানীর কাগজ আছে, সে সমুদয় কাগজ তিনি নূতন বধূর নামে লিখিয়া দিবেন, দেশে তাহার অনেক সম্পত্তি আছে, এইরূপ কথা সকলের নিকট তিনি সৰ্ব্বদাই প্ৰকাশ করিতেন। শালী পাত্রের অনুসন্ধান করিতে পারিলেন না। তাঁহাকে নিজে গিয়া সে কাজ করিতে হইলে অধিক দিনের ছুটি আবশ্যক, সে ছুটি তিনি পাইলেন না। সাহেব কেবল পািনর দিনের নিমিত্ত তাঁহাকে ছাড়িয়া দিতে সম্মত হইলেন। পথে তাঁহার সাত আট দিন কাটিয়া যাইবে, অবশিষ্ট কয়দিনে পাত্র অনুসন্ধান ও বিবাহ শেষ হইতে পারে না। তিনি হিসাব করিয়া দেখিলেন যে, কন্যার বয়স ষোল বৎসর হইয়াছে। রসময়বাবু ভাবিলেন যে,- “কন্যার বিবাহ আমাকে দিতেই হইবে। আর আমি তাহাকে অবিবাহিতা রাখিতে পারি না।" কথা যখন রসময়বাবু আমাকে প্রথম বলিয়াছিলেন, তাহার। পূৰ্ব্ব-আচার-ব্যবহার স্মরণ করিয়া তিনি শালীকে পত্র লিখিলেন– রসূলুল্লুবাবু লিখিলেন—“আমি কুসুমের জন্য এ স্থানে একুটি পুত্র স্থির করিয়াছি। তিনি দেশূের্তাি আনিয়া বিবাহ দিতে হইবে। তুমি গ্রুঞ্জর্ম ঠিক থাকিবে। পনরু দিনের ছুটি লইয়া আমি দেশে যাইতেছি। শীঘ্রই দেশে গিয়া দিগকে এইস্থানে লইয়া আসিব ।” এই পত্ৰ পাইয়া কুসুমের মাসীর মাথায় যেন বজ্ৰাঘাত হইল। তিনি ভাবিলেন,- “আমি মনে করিয়াছিলাম যে, যখন সে পাত্ৰ অনুসন্ধান করিতে দেশে আসিবে, তখন আমি সকল কথা তাহাকে খুলিয়া বলিব। খোট্টার দেশে যে আবার পাত্র মিলিবে, তাহা আমি কেমন করিয়া জানিব? এখন আমি করি কি? পাত্র ঠিক করিয়া মেয়ে লইতে সে দেশে আসিতেছে। এখন আমি তাহাকে কি করিয়া বলি যে, তোমার মেয়ের বিবাহ হইয়া গিয়াছে, তোমার মেয়ে বিধবা হইয়াছে!” কুসুমের মাসী অতিশয় চিন্তিত হইলেন। এই সময় তাহদের গ্রামে এক দো-পড়া মেয়ে লইয়া দলাদলি হইয়াছিল। সে কন্যাটির পিতামাতা প্রথম একস্থানে মেয়েটিকে বিক্রয় করে, অর্থাৎ টাকা লইয়া একজনকে কন্যাটি লোকের নিকট বিক্রয় করে। সেই বিষয় লইয়া এখন মোকৰ্দমা, মামলা ও দলাদলি চলিতেছিল। কন্যার দুই পতিতে মোকৰ্দমা, শ্বশুর-জামাতায় মোকৰ্দমা, আর গ্রামের দুইপক্ষে দলাদলি। কুসুমের মাসী বাল্যকাল হইতে যতগুলি দো-পড়া মেয়ের কথা শুনিয়াছেলন, তাহা স্মরণ করিয়া দেখিলেন। মনে মনে তিনি বলিলেন, — “ঐ দেখ রঘুর মা। ওর দুইবার বিবাহ হইয়াছিল। এখন কত ছেলেপিলে হইয়াছে, সুখে-স্বচ্ছন্দে ঘরকন্না করিতেছে। তারপর, আমার Sbrዩን află cios (gs se - www.amarboi conf** বাপের বাড়ীর গ্রামে সেই তিনকড়ির মা; তাহারও দুইবার বিবাহ হইয়াছিল, এখন কেমন তাহার সুখ-ঐশ্বৰ্য হইয়াছে। আমি যদি চুপ করিয়া থাকি, আর এক কাজ যদি হইয়া যায়, তাহা হইলে দো-পড়ার মত ততটা দোষের কথা হয় না।” ইরালাল নাই। সেজন্য “ততটা।” দোষের কথা হয় না । হীরালালকে তাহার মনে পড়িয়া গেল। একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস তিনি পরিত্যাগ করিলেন, তাহার চক্ষুতে জল আসিয়া গেল। ইহার মধ্যে একটা একাদশী পড়িল। একাদশী করিতে মাসী,-কুসীকে বার বার মানা করিতেন; কিন্তু কুসী। তাহা শুনিত না। সে নিরন্থ উপবাস করিত। গ্ৰীষ্মকাল পড়িয়াছে, এই একাদশীর দিন সূৰ্যের বড়ই উত্তাপ হইল। জল-পিপাসায় তাহার বুকের ছাতি ফাটিয়া যাইতে লাগিল। সমস্তদিন কুসী মাথায় ও গায়ে জল ঢালিতে লাগিল। তাহা দেখিয়া মাসীর মনোদুঃখের আর সীমা পরিসীমা রহিল না। দো-পড়া মেয়ের কথা এখন হইতে সৰ্ব্বদাই তাহার মনে জাগিতে লাগিল। তা যদি হয়, তবে এ বা নয় কেন? তিনি এইরূপ চিন্তা করিতে লাগিলেন। যাহা হউক, কি করা কীৰ্ত্তব্য, এখনও মাসী তাহা স্থির করিতে পারিলেন না। কিন্তু পঞ্জাবে যাইবার নিমিত্ত তিনি জিনিষপত্ৰ গুছাইতে সে ভাঙ্গা বাক্স হইতে লোচন ঘোষের চিঠি ও সেই খবরের কাগজ বাহির হইল। পোড়াইবার নিমিত্ত সেই দুইখানি কাগজ মাসী রান্নাঘরে লইয়া গেলেন। উনানে ফেলিয়া দিবার পূৰ্ব্বে তিনি চিঠিখানি একবার পড়িয়া দেখিলেন। তাহার পর খবরের কাগজের সেই স্থানটিও পাঠ করিলেন। সেই লাল চিহ্নিত স্থানটি পাঠ করিয়া, তিনি কাগজখানির এ-দিক ও-দিক দেখিতে লাগিলেন। সহসা আর একটি স্থানে তাঁহার দৃষ্টি পড়িল। আর একটি সংবাদের প্রচুরুঞ্জ বড় বড় অক্ষরে “বিধবা-বিবাহ” এই দুইটি কথা ছিল। কোন স্থানে এক বিধবাকাগজে প্ৰকাশিত হইয়াছিল। চিঠি ও দুইখানি পুনরায় তুলিয়া রাখিলেন। মাসী ভাবিতে লাগিলেন, তবে বিপ্লৱী-বিবাহ হয়। বিদ্যাসাগরের কথা তিনি শুনিয়াছিলেন। আমার মুখপানে চাহিয়া য় মাসী বলিলে,— “দেখ ডাক্তারবাবু! কুসীকে আমি প্রতিপালন করিয়াছিলাম। তাহার অবস্থা দেখিয়া আমার বুক ফাটিয়া যাইতেছিল; আমি ভাবিলাম যে, ইহাতে যদি কোন পাপ থাকে তো সে পাপ আমার হউক, কুসীর যদি পুনরায় বিবাহ হয় তো হউক, তাহাতে আমি প্রতিবন্ধক হইব না। কিন্তু আমি তখন এই বলিয়া মনকে প্ৰবোধ দিলাম যে, ইহাতে কোন পাপ নাই। বিদ্যাসাগর মহাশয় পণ্ডিত, ধাৰ্ম্মিক, দয়াবান, পরোপকারী লোক ছিলেন। ইহাতে যদি পাপ থাকিত, তাহা হইলে কখনই তিনি বিধান দিতেন। बना ।" আমি বলিলাম,-“যে-সকল বালিকা অতি অল্পবয়সে বিধবা হয়, স্বামীর সহিত যাহাদের কখন সাক্ষাৎ হয় নাই, সংসার-ধৰ্ম্মেৱ বিষয়ে যাহারা কিছুই জানে না, এইরূপ বিধবা বালিকাদিগের পুনরায় বিবাহ দিবার নিমিত্ত বিদ্যাসাগর মহাশয় বিধান দিয়াছিলেন।” মাসী উত্তর করিলেন,- “অতশত আমি বুঝি নাই। কুসীর পুনরায় বিবাহ হইলে যে কোন পাপ হইবে না, তাহাই ভাবিয়া সে সময় আমি মনকে প্ৰবোধ দিলাম। আমি ভাবিলাম যে, আমি নিজে উদ্যোগ করিয়া এ কাজ করিব না। তবে হয় হউক, তাহাতে আমি আপত্তি করিব। না। এইরূপ ভাবিলাম বটে, কিন্তু হীরালালের জন্য আমার মনে যে কি শোক উথলিয়া উঠিল, তাহা আর তোমাকে আমি কি বলিব! যাহা হউক, আমি পঞ্জাবে আসিবার জন্য ব্যস্ত হইতে "* firls six gas se! - www.amarboicom a ՀԵ Գ লাগিলাম, আর কুসীর নিকট এ কথা কি করিয়া বলিব, তাহাকে কি করিয়া সম্মত করিব, তাহাই ভাবিতে লাগিলাম।” নবম পরিচ্ছেদ তিন সত্য পাঁচ ছয় দিনের পরে রসময়বাবুর নিকট হইতে মাসী আর একখানি পত্ৰ পাইলেন। সে পত্ৰখানি তিনি কলিকাতা হইতে লিখিয়াছিলেন। তাহাতে তিনি বলিয়াছিলেন, —“আমি কলিকাতায় পৌছয়াছি। এ স্থানে আসিয়া আর একটি বিশেষ কাৰ্য্যে আমি ব্যস্ত আছি। সেজন্য তোমাদিগকে আনিতে আমি নিজে যাইতে পারিব না। গ্রামের কোন লোককে সঙ্গে লইয়া তোমরা কলিকাতায় আসিবে ।” কলিকাতায় আসিয়া রসময়বাবু কি এমন বিশেষ কাৰ্য্যে ব্যস্ত হইয়াছিলেন? পঞ্জাবে থাকিতেই তাহার বিবাহের কথা হইয়াছিল। সে-কন্যা দেশে ছিল। কলিকাতা আসিয়া সেই কথা পাকাপাকি হইল। তিনি কন্যা দেখিলেন। কন্যা বয়ঃস্থ ছিল, দেখিতে-শুনিতে নিতান্ত মন্দ নয়। বৰ্ম্মণীর মৃত্যুর পর হইতে তাঁহার মন নিতৃৰ্ত্ত উদাস ছিল। পুনরায় বিবাহ করিতে তাহার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু নিজের নিকট নিজে ড্ৰি’সে ইচ্ছা গােপন করিতে লাগিলেন। আপনার মনকে আপনি তিনি এই বলিয়া “আমার বয়স হইয়াছে, এ বয়সে পুনরায় আর বিবাহ না করাই ভাল। কিন্তু, আমি যষ্ট্রি” কেবল শালী ও কন্যাকে লইয়া পঞ্জাবে যাই, তাহা হইলে লোকে বলিবে, মেয়ে আনিয়া বিবাহ দিল । তাহার চেয়ে যদি আমি বিবাহ করিয়া পরিবার লইয়া পঞ্জার্ধে যাই, আর সেইসঙ্গে আমার কন্যা ও অভিভাবক-স্বরূপ বৃদ্ধ শালীকে যদি লইয়া যাই, তাহা হইলে কেহ আর সে কথা বলিতে পারিবে না।” এইরূপ তর্ক-বিতর্ক করিয়া রসময়বাবু আপনার মনকে বুঝাইলেন, মনকে বুঝাইয়া তিনি নিজের বিবাহের কাৰ্য্যে ব্যস্ত হইলেন। বিবাহের পর পাঞ্জাবে যাইবার কেবল দুইদিন পূৰ্ব্বে, যাহাতে কুসুম ও তাহার মাসী কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হয়, রসময়বাবু সেইরূপ দিন ধাৰ্য্য করিয়া তাহাদিগকে পত্র লিখিয়াছিলেন। কলিকাতায় আসিয়া রসময়বাবু এক বন্ধুর বাটীতে অবস্থিতি করিতেছিলেন। সেই স্থান হইতে তাঁহার বিবাহ হইবে, এইরূপ স্থির হইয়াছিল। কুসুম ও তাহার মাসীকে কলিকাতায় সেই ঠিকানায় আসিতে লিখিয়াছিলেন। কলিকাতায় এদিকে রসময়বাবুর বিবাহ হইয়া গেল, গ্রামে ওদিকে কুসুম ও তাহার মাসীর যাত্ৰা করিবার সময় উপস্থিত হইল। কলিকাতা যাইবার পূর্বদিন রাত্রিতে বিছানায় শয়ন করিয়া মাসী বলিলেন,- “কুসুম! মা আমার!” ኳ কুসী। উত্তর করিল,-“কি, মাসী!” মাসী বলিলেন,- “আমি তোমাকে একটি কথা বলি?” কুসী জিজ্ঞাসা করিল,— “কি মাসী?” মাসী বলিলেন, — “তুমি বল, আমি যাহা বলিব, তাহা করিবে?” কুসী কাহারও সহিত অধিক কথা কহিত না। সকল কথা তাহার কর্ণগোচর হইত কি না, Storbr află cios (gs se - www.amarboi conf** তাহাও সন্দেহ-সৰ্ব্বদাই সে অন্যমনস্কভাবে থাকিত। “হা” কি “না।” এই দুইটি কথার অধিক সে বলিত না । কুসী জিজ্ঞাসা করিল,— “কি মাসী?” মাসী উত্তর করিলেন,- “আগে তুমি তিন সত্য করিয়া স্বীকার করা যে, আমি যাহা বলিব, তাহা তুমি করিবে, তবে আমি বলিব।” কুসী বলিল,— “হাঁ মাসী!” মাসী বলিলেন,- “তুমি আমার গায়ে হাত দিয়া বল!” কুসী। ইহার মৰ্ম্ম কিছুই বুঝিতে পারে নাই। মাসীর সকল কথা সে শুনিয়াছিল কি না, তাহাও সন্দেহ। মাসীর গায়ে হাত দিয়া সে বলিল,- “হা, মাসী?” মাসী বলিলেন, — “দেখ কুসী! তোমার যে একবার বিবাহ হইয়াছিল, কলিকাতা গিয়া সে কথা তুমি তোমার ব্যাপকে কি কাহাকেও বলিতে পরিবে না। কেমন, বলিবে না বল?” অন্যমনস্কভাবে কুসী বলিল,- “না, মাসী।” মাসী বলিলেন,- “আমার মাথা খাও, তুমি সে কথা কাহাকেও বলিবে না। যদি কেহ। জিজ্ঞাসা করে যে, তুমি একবেলা ভাত খাও কেন, তুমি মাছ খাও না কেন, একাদশীর দিন উপবাস কর কেন, আমি সকলকে বলিব যে, কবিরাজে। এইরূপ করিতে বলিয়াছে। কুসী যেন আর কিছু বলিয়া ফেলিও না।” পুনরায় অন্যমনস্কভাবে কুসী বলিল,- “না মাসী!” কুসী কাহারও সহিত কথা কহে না, বুদ্ধি-শুদ্ভুি এক প্রকার জড়ের মত সে হইয়া আছে। সে যে কাহাকেও কোন কথা বলিবে না...ওঁ... বিষয়ে মাসী একরূপ নিশ্চিত হইলেন। কিন্তু পুনরায় তাহার বিবাহ হইবে, এই কথা সে কি করিবে, সে কি বলিবে, সে সম্বন্ধে মাসী নিশ্চিত হইতে পারিলেন না। , সে রাত্রিতে এই পৰ্যন্ত কথাবাৰ্ত্ত হইল। পুনরায় যে তাহার বিবাহ হইবে, সে মাসী তাহাকে বলিলেন না। কুসীকে লইয়া মাসী কলিকাতায় উপস্থিত হইলেন। কুসী পিতাকে গিয়া প্ৰণাম করিল। ছয় দিনের কন্যাকে চকিতের ন্যায় একবার তিনি দেখিয়াছিলেন। তাহার পর আজ পুনরায় তাহাকে দেখিলেন। পিতা তাহাকে নানারূপ কথা জিজ্ঞাসা করিলেন; কিন্তু কুসী ঘাড় হেঁট দিল। রসময়বাবু দেখিলেন যে, তাহার কন্যা পীড়িত; তাহার মনের অবস্থা বিষয়েও তাঁহার সন্দেহ জন্মিল। তাহার জুর-বিকারের কথা মাসী তাঁহাকে পূৰ্ব্বেই বলিয়াছিলেন!। তিনি মনে করিলেন যে, বায়ু-পরিবর্তন করিলে, ভালরূপ আহার পাইলে, তাহার পর বিবাহ হইলে, রোগ ভাল হইয়া যাইবে। এই সময় কুসীর বামগালে সেই কালো দাগটির প্রতি রসময়বাবুর দৃষ্টি পড়িল। সেই দাগটিকে ঠিক আচিল বলিতে পারা যায় না। আঁচিলের ন্যায় ইহা তত স্কুল নহে, তিলের মত ইহা তত ক্ষুদ্র নহে, ইহাকে সচরাচর লোকে জরুল, না কি বলে। রসময়বাবু যে পুনরায় বিবাহ করিয়াছেন, কলিকাতায় আসিয়া মাসী তাহা জানিতে পারিলেন। নব-মাতার সহিত কুসুমের সাক্ষাৎ হইল। তিনি নূতন বধূ, একহাত ঘোমটা দিয়া থাকেন! কুসীর মনের তো ঐ অবস্থা। দুই জনে কথা বড় কিছু হইল না। কুসীর যে পুনরায় বিবাহ হইবে, কলিকাতায় থাকিতে কুসী। তাহা জানিতে পারে নাই। নববধূ হয় তো সে কথা জানিতেন না। তিনি সে বিষয়ে কুসুমকে কিছু বলেন নাই, মাসীও কিছু বলেন নাই। ফোকুলা দিগম্বর Sbrð sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro পরদিন ফটোগ্রাফ গ্রহণের ধুম পড়িয়া গেল। পঞ্জাব হইতে আসিবার সময় রসময়বাবুকে দিগম্বরবাবু পৈ-পৈ করিয়া বলিয়া দিয়াছিলেন যে, কন্যার যেন ফটােগ্রাফ গৃহীত হয়। রসময়বাবু নিজের নববিবাহিতা পত্নীর ও কুসীর ফটােগ্রাফ লাইলেন। কুসী কোনও কথাতেই নাই। তোমরা যা কর; কোন বিষয়ে, আপত্তি করিবার তাহার শক্তি নাই। কিন্তু নববধূর ছবি বড় সহজে হয় নাই। মুখ খুলিতে তিনি কিছুতেই সম্মত হন নাই। অনেক সাধ্য-সাধনায়, অবশেষে কিছু তিরস্কারের পর তবে এ কাজ হইয়াছিল। রসময়বাবু সপরিবারে পঞ্জাব আসিবার নিমিত্ত যাত্রা করিলেন। পথে লাহােরে আমার সহিত সাক্ষাৎ হইল। উজিরগড়ে উপস্থিত হইয়া, বিবাহের কথা ক্ৰমে ক্রমে কুসীর কানে উঠিল। সহজেই কুসী স্তম্ভিত ছিল, এই কথা শুনিয়া সে আরও স্তম্ভিত হইল। স্তম্ভিত সামান্য কথা, চলিত কথায় যেমন বলে—“আক্কেল গুডুম,” কুসীর তাহাই হইল। রাত্ৰিতে মাসীর নিকট কুসী শয়ন করিত। সেই রাত্রিতেই সে মাসীকে বলিল,— “মাসী, এ কি কথা শুনিতে পাই!” মাসী জিজ্ঞাসা করিলেন,- “কি কথা?” কুসী। উত্তর করিল,— “আবার বে।” মাসী বলিলেন,-“হাঁ, আমি তোমার পুনরায় বিবাহ দিব।” কুসী বলিল,— “কি মাসী! ও কথা মুখে আনিও না ? মাসী বলিলেন,- “কুসী! তুমি আমার কাছে করিয়াছ আমার গায়ে হাত দিয়া বলিয়াছ যে, আর একবার তোমার যে বিবাহ হইয়ুছিল, সে কথা তুমি কাহাকেও বলিবে না।” কুসী বলিল,- “কিন্তু আবার বে করিব, একথা তো বলি নাই।” মাসী বলিলেন, — “তা বল আর ইষ্ট্রে আমরা তােমার পুনরায় বিবাহ দিব।” কুসী বলল,— “মাসী! এ কাজ ক্লিক্ট্র হইবে না।” মাসী বলিলেন, — “দেখ, কুসী! ছয় দিনের মেয়ে আমার হাতে দিয়া তোমার মা চলিয়া গেল। সেই অবধি আমি তোমাকে প্রতিপালন করিয়াছি। প্ৰাণের অপেক্ষা তোমাকে আমি ভালবাসি। আজ দুই বৎসর তোমার মুখপানে চাহিয়া আমার বুক ফাটিয়া যাইতেছে। তোমার এ অবস্থা আমি আর দেখিতে পারি না। তোমার ভালর জন্য আমি এ কাজ করিতেছি।” কুসী পুনরায় বলিল,- “না মাসী! এ কাজ কিছুতেই হইবে না।” মাসী বলিলেন,- “পূর্বের কথা কিছুতেই প্ৰকাশ হইবে না। রামপদ নাই, সে কথা। আর কেহ জানে না। তোমার যে একবার বিবাহ হইয়াছিল, তোমার বাপ তাহা জানে না। তাহাকে আমি সে কথা বলি নাই। তোমাকে আইবুড়ো মনে করিয়া, সে এই বিবাহের আয়োজন করিয়াছে। ভাল বর ঠিক হইয়াছে। সে তোমাকে ভাল ভাল কাপড় দিবে, ভাল ভাল গহনা দিবে, তোমার নামে কোম্পানীর কাগজ লিখিয়া দিবে।” কুসী বলিল,— “না, মাসী! এ কাজ কিছুতেই হইবে না।” মাসী বলিলেন,- “এখন আর কি করিয়া বন্ধ হইবে? এখন যদি আমি গিয়া তোমার বােপকে বলি যে, কুসীর আর একবার বিবাহ হইয়াছিল, তাহা হইলে সে কি মনে করিবে: তাহাকে না বলিয়া পূৰ্ব্বে তোমার বিবাহ দিয়াছি, তাহার পর সে বিবাহ আমি এতদিন গোপন করিয়াছি, এজন্য তোমার বাপ চাই কি আমাকে বাড়ী হইতে তাড়াইয়া দিতে পারে। এ

so află cios (gs se - www.amarboi conf** বৃদ্ধবয়সে তাহা হইলে আমি কোথায় যাইব! তোমার কি ইচ্ছা যে, আমি দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিয়া বেড়াইত?”

কুসী চুপ করিয়া রহিল। মাসী পুনরায় বলিলেন,- “দেখ, কুসী! এখন আর উপায় নাই। এ কাজ আর বন্ধ হয় না। এখন যদি তুমি তোমার বােপকে বলিয়া দাও, তাহা হইলে এ মুখ আর আমি কাহাকেও দেখাইতে পারিব না। আমি তাহা হইলে গলায় দড়ি দিয়া মরিব।” কুসী চুপ করিয়া রহিল। অনেকক্ষণ চুপ থাকিয়া কুসী বলিল,- “মাসী! তুমি যাহা বলিলে, আমি তাহা শুনিলাম। এখন আমি যাহা বলি, তুমি তাহা শুন! এ বিবাহ কিছুতেই হইবে না। এ কাল-বিবাহ হইবার পূৰ্ব্বেই আমি মরিয়া যাইব ।” মাসীর সহিত এতক্ষণ কুসী যেভাবে কথা কহিল, তাহাতে তাহার মনের যে কিছু বৈলক্ষণ্য ঘটিয়াছিল, তাহা বোধ হয় না। কুসী পাগল হয় নাই, বায়ুগ্ৰস্ত হয় নাই, এই দুই বৎসর সে দুঃখ-সাগরে নিমগ্ন ছিল। দুঃখের ভারে তাহার হৃদয় একেবারে ভগ্ন হইয়া গিয়াছিল। সে অবস্থায় পৃথিবীর কোন বিষয়ে সে আর কি করিয়া লিপ্ত হয়! কি করিয়া সে আর লোকের সহিত কথা কয়! তাহার চক্ষু, তাহার কর্ণ, তাহার বাকশক্তি, তাহার মন, তাহার প্রাণ, সৰ্ব্বদা সেইখানে ছিল,-সেই যেখানে হীরালাল। যদি সন্ন্যাসীঠাকুর না আসিতেন, তাহা হইলে আমার বোধ হয়, কুসী। আজ রাত্রিতেই মারা পড়িত। “আমি অমুক দিন মারা পড়িব” এইরূপ ভাবিয়া লোক মারা পড়িয়াছে। কিম্বা “তুমি কণ্ঠলোক মারা পড়িয়াছে। এক প্রকার বিদ্যা অমুক দিন মারা পড়িবে।” এইরূপ শুনিয়াও অ vice, vaj3|(35fž9rf-TI (Hypnotis ঠুলে, তাহাতে মানুষের মনের অবস্থা পরিবর্তিত করিয়া, তাহাকে তুমি যেরূপ চিন্তা করি ত্বলি ধ, যে কাজ করিতে বলিবে, সে তাহা করিবে। এইরূপ মনের অবস্থা কােন কোন লেটিকর নিজে নিজেই হয়। তখন সে যেরূপ চিন্তা করে, কাৰ্য্যে তাহা পরিণত হয়। ইহাকে স্বতঃপ্রবৃত্তি (Selfsuggestion) বলে। কুসীরও বোধ হয়, তাহাঁই ঘটিয়াছিল। যেদিন হইতে সে বিবাহের কথা শুনিয়াছিল, সেইদিন হইতে সে আরও শীর্ণ, আরও বিবৰ্ণ হইতে লাগিল। বিবাহের আয়োজন হইতে লাগিল বটে, কিন্তু তাহার জন্য সে ভীত হইল না। আর একবার যে তাহার বিবাহ হইয়াছিল, সে কথা সে প্রকাশ করিল না। সে নিশ্চয় বুঝিয়াছিল যে, এ বিবাহের পূৰ্ব্বেই সে মরিয়া যাইবে। পিতার মিছামিছি টাকা খরচ হইতেছে, সেজন্য সে দুঃখিত হইল। তাহার মাসীকে ও তাহার নূতন মাকে সেজন্য সে সৰ্ব্বদা বলিত,- “এ সব কেন! আমি পূৰ্ব্বেই মরিয়া যাইব।” সাহস করিয়া একদিন তাহার পিতার নিকটে গিয়াও সে এই কথা বলিয়াছিল। কিন্তু তাহার কথা কেহই শুনিলেন না। সে বায়ুগ্ৰস্ত হইয়াছে, বিবাহ হইলেই সব ভুলিয়া যাইবে, এই কথা বলিয়া পিতা ও মাসী তাহার কথা উড়াইয়া দিলেন। এই অবস্থায় আমি রসময়বাবুর বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলাম। মাসীর বিবরণ সমাপ্ত হইল! পুনরায় বলি যে, মাসীর এই পূৰ্ব্ব-বিবরণ আমি আমার নিজের ভাষায় প্ৰদান করিলাম। এই বিবরণ সম্বন্ধে আমি নিজে যাহা দেখিয়াছি ও ইহার পরে অন্যান্য লোকের মুখ হইতে যাহা অবগত হইয়াছি, তাহাও যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিয়াছি। ʻ*"*""7ʼ** ifGNRIligi oiiğiq5 q<5 38! ~v www.amarboi.com ~v ২৯১ দশম পরিচ্ছেদ ভগবান রক্ষা করিয়াছেন মাসীর কথা সমাপ্ত হইলে, আমি তাঁহাকে বলিলাম যে, “তবে এখন বাড়ী চলুন!” মাসী উত্তর করিলেন, — “বাড়ী রায়মহাশয়ের বাড়ীতে আর আমি যাইব না। এ পোড়া-মুখ আর সেখানে আমি দেখাইব না।” আমি বলিলাম,- “কুসীর একবার বিবাহ হইয়া গিয়াছে শুনিলে রসময়বাবু রাগ করবেন। বটে, কিন্তু আপনি কুসীর ভালর জন্য চেষ্টা করিয়াছিলেন। যাহা হউক, কুসীর আজ যখন বিবাহ হইয়া যায় নাই, তখন বিশেষ কোন ক্ষতি হয় নাই। সেজন্য আমি তাঁহাকে সান্তুনা করিতে পারিব। আমি নিশ্চয় বলিতেছি যে, তিনি আপনাকে একটি কথাও বলিবেন না। আর একটি কথা কুসীর যে একবার বিবাহ হইয়া গিয়াছে, সে কথা এখন তাঁহাকে বলিবার বা আবশ্যক কি? পুনরায় যখন তিনি পাত্রের অনুসন্ধান করিবেন, সেই সময় তাঁহাকে বলিলেই চলিবে ।” মাসী বলিলেন, — “তোমার কথা আমি বুঝিতে পারি না। তুমি বলিতেছ যে, কুসীর পূৰ্ব্ববিবাহের কথা প্ৰকাশ হয় নাই। তবে দিগম্বরবাবুর সহিত তাহার বিবাহ বন্ধ হইল কি করিয়া?” আমি উত্তর করিলাম,- “আপনি তা জানেন না? না,-তখন আপনি সে স্থানে ছিলেন না। আপনি বাড়ীর ভিতর চলিয়া গিয়াছিলিন। দিগম্বরবাবুরুঞ্জি আছেন। তাঁহার গৃহ শূন্য হয় নাই, সে মিথ্যা কথা । ফাঁকি দিয়া তিনি এই বিবাহ করি । তাঁহার সেই স্ত্রী আসিয়া উপস্থিত। হইয়াছেন। বাপ! এমন মেয়েমানুষ কখন দেখিছেই। তাহার পর সঙ্গে যে দাসীটি আনিয়াছেন, সে-ও এক ধনুৰ্দ্ধর । এ বলে আমায় দেখাওঁ বলে আমায় দেখ। আমি মনে করিলাম, সভার মধ্যেই বা দিগম্বরবাবুকে তিনি করেন!!! যাহা হউক, সেই বিবাহ বন্ধ হইয়া গিয়াছে।” মাসী জিজ্ঞাসা করিলেন, “আর-সন্ন্যাসী?” আমি উত্তর করিলাম,- “তিনি কুসীর চিকিৎসা করিতেছেন। কুসীকে তিনি অনেকটা ভাল করিয়াছেন। এখন আপনি বাড়ী চলুন। পূৰ্ব্ব-কথা প্ৰকাশ পায় নাই, কুসীর আজ পুনরায় বিবাহ হয় নাই, বিশেষ কোন ক্ষতি হয় নাই। মনে করিয়া দেখুন, আপনার কত পুণ্যবাল! ভগবান রক্ষা করিয়াছেন!” মাসী উত্তর করিলেন,- “ভগবান রক্ষা করিয়াছেন, সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নাই। প্রথম লগ্নে যদি বিবাহ হইয়া যাইত, তাহা হইলে যে কি হইত! ভগবান রক্ষা করিয়াছেন। কিন্তু রায়মহাশয়ের বাটীতে আমি আর যাইব না। তুমি পাগল, তাই আমাকে যাইতে বলিতেছ। তুমি বাটী ফিরিয়া যাও। আমি কাশী যাইব । তোমার টিকিয়া কিনিয়া দিতে হইবে না । আমি কিনিতে পারিব।” এখন আমি একটু প্রতারণা করিলাম। জানিয়া-শুনিয়া আমি কখন মিথ্যাকথা বলি না, কি কাহারও সহিত প্রতারণা করি না। কিন্তু আজ আমি তাহা করিয়া ফেলিলাম। যদিচ ভালর জন্য আমি সে কাজ করিলাম, তথাপি সে কথা মনে হইলে এখনও আমার লজ্জা হয় । আমি বলিলাম,- “তা কি কখন হয়! আপনি স্ত্রীলোক, এ বিদেশ, ভয়ঙ্কর দেশ! এই রাত্রিকালে এ স্থানে আপনাকে একেলা ছাড়িয়া যাইতে পারি না। এক্কা দাঁড়াইয়া আছে; চলুন SRSSR দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboicon:" ষ্টেশনে যাই, সেই স্থানে গিয়া চলুন বসিয়া থাকি। তাহার পর গাড়ীর সময় হইলে টিকিট কিনিয়া আপনাকে আমি গাড়ীতে বসাইয়া দিব।” মাসী বলিলেন,- “এখনও অনেক বিলম্ব আছে। এত আগে থাকিতে গিয়া কি হইবে?” আমি বলিলাম,- “এ স্থানে বসিয়া থাকিলেই বা কি হইবে? তাহা অপেক্ষা চলুন ষ্টেশনে গিয়া বসিয়া থাকি।” মাসী সে কথায় সম্মত হইলেন। এক্কাওয়ালাকে আমি প্রস্তুত হইতে বলিলাম। সেই সময় তাহাকে গোপনভাবেও কিছু উপদেশ দিলাম। মাসী এক্কার উপর উঠিলেন। আমিও উঠিয়া তাহার একপার্শ্বে বসিলাম। এক্কাওয়ালা এক্কা হাকাইয়া দিল। এক্কা দ্বিগুণবেগে দৌড়িতে ब्लॉब्लि ! কিছুক্ষণ পরে মাসী বলিলেন, — “ষ্টেশন যে অতি নিকটে। সে স্থানে পৌছিতে এত বিলম্ব আমি কোন উত্তর করিলাম না । এক্কা দ্রুতবেগে চলিতে লাগিল। অল্পক্ষিণ পরে মাসী পুনরায় বলিলেন,- “আমি বুঝিতে পারিয়াছি, ফাঁকি দিয়া তুমি আমাকে বাড়ী লইয়া যাইতেছ। কিছুতেই আমি বাড়ী যাইব না। গাড়ীওয়ালা। গাড়ীওয়ালা দাড়া। আমি নামিয়া যাই!” আমি এক্কাওয়ালার গা টিপিলাম। মাসীর কথা শুনিল না। এক্কা দ্রুতবেগে চলিতে লাগিল । আমি তাঁহাকে বলিলাম,- “দেখুন! রসময়বাবুর আপনি অনেক ঘাড় হেঁট করিয়াছেন, আজ এই বিবাহ-সভায় যে কাণ্ড হইয়াছে, ভদ্রলোকের ঘরে/সেরাপ কখনও হয় না। রসময়বাবু পূৰ্ব্বে যে সব পাপ করিয়াছেন, মেয়ের যে এতদিন ফ্ৰেঙ্খর্বর তিনি লন নাই, সেই সকল পাপের ফল আজ বিলক্ষণ ভোগ করিয়াছেন। আর কেলেঙ্কারি করিবেন না, আর তাঁহার মাথা কিছুতেই যাইব না।” এই কথা বলিয়া মাসী পাগলিনীর মত হইয়া এক্কা হইতে লাফাইয়া পড়িবার উপক্রম করিলেন। আমি বড়ই বিপদে পড়িলাম। আমি তাঁহাকে ধরিয়া রাখিতে পারি না। একাদশ পরিচ্ছেদ হিপূ হিপূহুরে এই সময় যে স্থানে এক্কা গিয়া উপস্থিত ইহল, সে স্থানে এক অপূৰ্ব্ব দৃশ্য আমাদের নিয়নগোচর হইল। সেই দৃশ্য দেখিয়া মাসী এক্কাতে স্থির হইয়া বসিলেন। এক্কাওয়ালাকে আমি এক্কা থামাইতে বলিলাম। যে দৃশ্যটি আমাদের নয়নগােচর হইল, তাহা এই,- আমরা দেখিলাম যে, একদল বাঙ্গালী ষ্টেশন-অভিমুখে আসিতেছেন। এক্কা যখন স্থির হইয়া দাড়াইল, তখন দেখিলাম যে, তাহারা সেই বরযাত্রীদল। সেই দলের আগে আগে বিরসবদনে সভয় মনে দিগম্বরবাবু চলিয়াছেন। তাহার মুখ ঈষৎ হাঁ হইয়া গিয়াছে, বেশ আলু-থালু হইয়াছে, আঁকা ফোকুলা দিগম্বর RFC sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro বঁকা পা ফেলিতে ফেলিতে হেলিতে দুলিতে ন্যালা-গাগলার মত তিনি চলিয়াছেন। তাঁহার ঠিক পশ্চাতে একধারে বিন্দী ও অন্যধারে গলা-ভাঙ্গা দিগম্বরী। বিদীর হাতে একটি ছাতি, দিগম্বরীর হাতে একগাছি ঝাঁটা। ঝাঁটাগাছটা তিনি বোধ হয় সঙ্গে করিয়া আনেন নাই, রসময়বাবুর বাটী হইতে সংগ্ৰহ করিয়া থাকিবেন। লোকে ঠিক যেমন মহিষাকে তাড়াইয়া লইয়া যায়, বিন্দী ও তিনি সেইরূপ দিগম্বরবাবুকে তাড়াইয়া লইয়া যাইতেছেন। বিন্দী ও দিগম্বরীর এক ধারে ছোেটুটু সিং, অন্যধারে কিষ্টা। ছোটুর হাতে গহনার বাক্স, আর কিষ্টার হাতে দিগম্বরবাবুর পোষাক রাখিবার কার্পেটের ব্যাগ। ইহাদের পশ্চাতে বরযাত্ৰিগণ। বরযাত্ৰিগণের মধ্যে কেহ কেহ উলু দিতেছিলেন, কেহ কেহ বা ইংরাজী ধরনের “হিপূ হিপ হুরে! হিপূ হিপ হুরে!” জয়ধ্বনি করিতেছিলেন । সকলের পশ্চাতে জনকত লোক চেঙ্গারি মাথায় করিয়া আসিতেছিল। ইহাদের সঙ্গে একজন সিপাহী ছিল। বাবুদিগকে সে বার বার চুপ করিতে অনুরোধ করিতেছিল। সে বলিতেছিল,— “বাবুসাহেব! আপলোক আঞসা গোলমাল ন কিজিয়ে! ইয়ে ছাউনি হায়। বড়ি খারাপ জায়গা। রসময়বাবু, সাহেবসে হুকুম লিয়া সচ, মগর আএসা গোলমাল কারনেসে কুছ বখেড়া উঠেগা।” আমি পুনরায় বলিয়া রাখি, যে স্থানে এই সমুদয় ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহার প্রকৃত নাম আমি প্ৰদান করি নাই। স্থান সম্বন্ধে কেহ আমার ভুল ধরিবেন না। এই ব্যাপার দেখিয়া আমি আশ্চৰ্য হইলাম। দিগম্বরবাবু ও তাঁহার পরিচালিকাগণ একটু অগ্রসর হইলে আমি একজন বরযাত্রীকে ডাকিলাম। প্রছে মাসী পলায়ন করেন, সেই ভয়ে আমি এক্কা হইতে নামিতে সাহস করিলাম না। কতকগুলি বরযাত্রী আসিয়া আমার এক্কা ঘিরিয়া দাঁড়াইলেন। রাত্রি দুই প্ৰহরের সময় এরূপ কঠোর স্থানে, পথের মাঝে গোল করিতে আমি তাহাদিগকে প্রথম নিষেধ । তাহার পর আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “আপনারা ইহার মধ্যে চলিয়া ? আহারাদি করিয়া তাহার পর আসিলে ভাল হইত না? গাড়ীর এখন অনেক *و একজন বরযাত্রী উত্তর করিলেন, ১৮ – “আজ যে অভিনয় দেখিয়াছি, তাহাতে পেট ভরিয়া গিয়াছে, আহারাদির আর আবশ্যক নাই।” আর একজন বলিলেন, — “না মহাশয়! আপনি সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন। ঐ সকল ঘটনার পর সে স্থানে আর থাকা আমরা উচিত বোধ করিলাম না। বিশেষতঃ পাছে গলা-ভাঙ্গা ঠাকুরাণী কোনরূপ একটা ঢালাঢলি করিয়া বসেন, সেই ভয়ে আরও আমরা চলিয়া আসিলাম । তিনি না করিতে পারেন এমন কাজ নাই। সঙ্গে আবার বিন্দী আছে। সে-ও একজন নামজাদা সেপাই। আমরা বরযাত্রী আসিয়াছি, সেই অপরাধে আমাদিগকেও হয় তো দিগম্বরী প্রহার করিতে পারেন। আহারাদির বিষয়ে আপনার কোন চিন্তা নাই, রসময়বাবু প্রচুর খাদ্য-সামগ্ৰী আমাদিগকে দিয়াছেন। চেঙ্গারি করিয়া ঐ দেখুন, লোকে তাহা লইয়া যাইতেছে। ষ্টেশনের নিকটে গাছতলায় বসিয়া আমরা সকলে আহার করিব। তাহার পর প্রাতঃকালের গাড়ীতে চলিয়া যাইব ।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “রসময়বাবুর কন্যা এখন কেমন আছে?” বরযাত্রী উত্তর করিলেন,- “কন্যা এখন বেশ আছে। একবার সন্ন্যাসী তাহার কানে-কানে কি বলিলেন, তাহাতে তাহার মুখে একটু হাসিও দেখিয়াছিলাম। রসময়বাবু তাহাকে এখন বাটীর ভিতর লইয়া গিয়াছেন। সন্ন্যাসীও বাটীর ভিতর গিয়াছিলেন। শুনিলাম যে, কন্যা শুড় S8 দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comাির্ড”********* বুড় করিয়া তাঁহার সহিত অনেক কথোপকথনও করিয়াছিল। সন্ন্যাসীর ক্ষমতা আছে বলিতে হইবে।” আর একজন বরযাত্রী বলিলেন,- “কন্যার রোগও হয় নাই, মূৰ্ছাও হয় নাই, সব ঠাট । বরের রূপ-গুণের কথা শুনিয়া সে এইরূপ ঠাট করিয়া পড়িয়াছিল। তাহার পর নবীন তপস্বীকে পাইয়া, নবীন তপস্বিনী হইবার সাধে তাহার রোগ ভাল হইয়া গিয়াছে, হাসি দেখা দিয়াছে, কথা ফুটিয়াছে। দিগম্বরী নম্বর টু হইতে তাহার ইচ্ছা নাই।” সে কথায় আমি কোন উত্তর করিলাম না। এক্কাওয়ালাকে পুনরায় এক্কা হাঁকাইতে বলিলাম। যাইতে যাইতে আমি মাসীকে বলিলাম,- “শুনিলেন তো! কুসী ভাল আছে। আপনাকে কেহ। কিছু বলিবে না, সে ভয় আপনি করিবেন না, সে ভার আমার রহিল।” মাসী কোন উত্তর করিলেন না। আমি দেখিলাম যে, তিনি কাঁদিতেছেন। আমি তাঁহাকে আর কিছু বলিলাম না! রসময়বাবুর বাটীতে এক্কা আসিয়া উপস্থিত হইল । যে, তিনি দ্বার বন্ধ করিয়া দিয়াছেন। দ্বার ঠেলিয়া আমি ডাকিতে লাগিলাম। স্ট্রীয় পঞ্জাবী চাকর আসিয়া দ্বার খুলিয়া দিল। এক্কাওয়ালাকে তাহার ভাড়া দিয়া, মাসীক্সেতঁইয়া, আমি বাটীর ভিতর প্রবেশ করলাম। বাহির বাটীতে দেখিলাম যে, জন-প্ৰাণী ঠুষ্ট কিছুক্ষণ পূৰ্ব্বে যে স্থান লোকের কলরবে পূর্ণ ছিল, এখন সেই স্থান নিৰ্জ্জন ও উদ্ধ হইয়াছিল। খিড়কি-দ্বার দিয়া আমরা দুইজনে একেবারে ভিতর বাড়ীতে যাইলাম। মঙ্গীকৈ একটি ঘরে প্রবেশ করিয়া দ্বার বন্ধ করিয়া দিতে Dys র। বাহির হইতে আমি দ্বার ঠেলিয়া ধরিলাম । আমি বলিলাম,- “দ্বারে খিল দিতেছেন কেন?” মাসী উত্তর করিলেন,- “তোমার সে ভয় নাই, আমি আত্মহত্যা করিব না। অনেক পাপ করিয়াছি। সে পাপ আর করিব না।” আমি দ্বার ছাড়িয়া দিলাম। মাসী দ্বার বন্ধ করিয়া দিলেন। কিন্তু তৎক্ষণাৎ পুনরায় ঈষৎ একটু খুলিয়া আমাকে তিনি ডাকিলেন। আমি তাহার নিকট ফিরিয়া যাইলাম। মাসী বলিলেন,- “একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞাসা করি।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “কি কথা?” মাসী উত্তর করিলেন, — “তুমি না। আমাকে বলিয়াছিলে যে, কাশীতে তুমি কুসীর ‘বাবুকে দেখিয়াছিলে?” আমি উত্তর করিলাম,- “হাঁ! কাশীতে আমি তাহাকে দেখিয়াছিলাম।” মাসী বলিলেন,- “সন্ন্যাসীকে গিয়া একবার ভাল করিয়া দেখ।” sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro দ্বাদশ পরিচ্ছেদ ওটা ঠাওর হয় নাই এই বলিয়া মাসী ঝনৎ করিয়া কপাট বন্ধ করিয়া দিলেন। আমি এমনি বোকা যে, তবুও মাসীর কথা বুঝিতে পারিলাম না। সন্ন্যাসী ও রসময়বাবু বৈঠকখানায় আছেন শুনিয়া, আমি সেইস্থানে গমন করিলাম। সে স্থানে গিয়া দেখিলাম যে, কেবল তাহারাই দুইজনে আছেন, অন্যকোন লোক নাই। তাঁহাদের দুইজনে কথোপকথন হইতেছিল। বৈঠকখানায় গিয়া আমি যাই পদাৰ্পণ আসিয়া আমাকে প্ৰণাম করিয়া আমার পদধূলি গ্ৰহণ করিলেন। আমি বলিলাম,- “ও কি করেন! ও কি করেন! বয়সে ছোট হইলে কি হয়, আপনি সন্ন্যাসী, আপনি নারায়ণ!” সন্ন্যাসী হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। তাহার পর তিনি বলিলেন,- “আপনি যে আমাকে চিনিতে পারেন নাই, প্রথমেই তাহা আমি বুঝিয়াছিলাম।” এইবার আমি ভালরূপে সন্ন্যাসীকে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিলাম। ভালরূপে তাঁহাকে দেখিয়া বিস্ময়ে ও আনন্দে আমার হৃদয় পূর্ণ হইয়া গেল!! আশ্চৰ্য্য হইয়া আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “কে ও, বাবু!” “হাঁ, আমি সেই কাশীর বাবু”, এই কথা বলিয়া পুনরায় আমাকে প্ৰণাম করিল ও পুনরায় আমার পদধূলি লইল । কুসুমের মাসী বাড়ীক্টেরিতে কেন এত আপত্তি করিতেছিলেন, কেন আমাকে বার বার পাগল বলিতেছিলেনন্তের্গহার অর্থ এখন আমি বুঝিতে পারিলাম। সন্ন্যাসীবেশে হীরালাল উপস্থিত হইবামাত্ৰাৰ্থতিনি তাহাকে চিনিতে পারিয়াছিলেন। সেজন্য বিবাহসভা হইতে তিনি তৎক্ষণাৎ উঠিতুৰ্গিয়া, রসময়বাবুর স্ত্রীর নিকট হইতে টাকা লইয়া বাড়ী হইতে পলায়ন করিয়াছিলেন। ক কি করিয়া পুনরায় তিনি মুখ দেখাইবেন, সেই কুসুমও যে হীরালালকে চিনিতে পারিয়াছিল, তাহাও আমি এখন বুঝিতে পারিলাম। বাবুর কণ্ঠস্বর এখন বুঝিতে পারিলাম। বাবুর সেই ঔষধের বলেই তাহার চৈতন্য উৎপাদিত হইয়াছিল। চেতন হইয়া সহজে তাহার মনে প্রতীতি হয় নাই যে, মৃত্যমানুষ পুনরায় ফিরিয়া আসিয়াছে। সেজন্য সে বারবার নিরীক্ষণ করিয়াছিল ও চক্ষু মুদ্রিত করিয়া চিন্তা করিয়াছিল। অবশেষে যখন তাহার মনে প্ৰতীতি হইল যে, এই সন্ন্যাসী সত্য সত্যই তাহার “বাবু”, তখন সে আপনার হাতটি তাহার গলায় দিল, আপনার মস্তকটি তাহার বক্ষঃস্থলে রাখিল, যেন এ জীবনে আর তাহা হইতে সে বিচ্ছিন্ন হইবে না। আমি যে “বাবু”কে চিনিতে পারি নাই, তাহার কারণ এই যে, কাশীতে অল্পক্ষণের নিমিত্ত আমি কেবল দুই-তিন বার তাহাকে দেখিয়াছিলাম। তাহার পর, তাহার গোপ-দাড়ি উঠে নাই। এখন নবীন শ্মশ্র দ্বারা তাহার মুখমণ্ডলের আধোদেশ আবৃত হইয়াছিল। পথশ্রমে তাহার সে উজ্জ্বল কান্তিও অনেকটা মলিন হইয়া গিয়াছিল। রসময়বাবু আমাকে বলিলেন, — "জামাই বাবু আমাকে সকল কথা বলিয়াছেন। এরূপ ঘটনা উপন্যাসেও দেখিতে পাই না। এত অপমান এত লাঞ্ছনার পর আমার যে আবার সুখ হইবে, তাহা আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই। এখন কুসুমের মাসী বাড়ী আসিলেই হয়, তাহা হইলে Siso দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comাির্ড”**”** আমার সকল চিন্তা দূর হয়! তাঁহাকে আপনি খুঁজিয়া পান নাই?” আমি উত্তর করিলাম,- “হঁ। তাঁহাকে আমি বাড়ী আনিয়াছি। বাবু!” তুমি গিয়া তাঁহাকে প্ৰবোধ দাও । আমাদের কথায় হইবে না। তোমাকে কি করিয়া তিনি মুখ দেখাইবেন, সেই লজ্জায় তিনি অভিভূত হইয়া আছেন। দ্বার বন্ধ করিয়া ঘরের ভিতর তিনি পড়িয়া আছেন। চল ‘বাবু” তাঁহাকে তুমি সাস্তুনা করিবে চল। রসময়বাবু! আপনি আসিবেন না?” “বাবু” আমার সহিত চলিল। দ্বারে ধাক্কা মারিয়া কুসুমের মাসীকে আমি ডাকিতে লাগিলাম। আমি বলিলাম,- “বিশেষ একটা কথা আছে, দ্বার একবার খুলিয়া দিন।” আমার কণ্ঠস্বর শুনিয়া তিনি দ্বার খুলিয়া দিলেন। যাই তিনি দ্বার খুলিলেন, আর “বাবু’ গিয়া তাহার পায়ে পড়িল। মাসী পূৰ্ব্ব হইতেই রোদন করিতেছিলেন, এখন আরও কাঁদিতে লাগিলেন। তাঁহার কান্না দেখিয়া “বাবু”ও কাদিয়া ফেলিল। কিছুক্ষণ পরে বাবু বলিল,— “মাসী-মা! আর ক্যাদিও না। আমি যে পুনরায় বঁচিয়া আসিয়াছি, সেজন্য এখন আহাদ করিবার সময়, এখন কান্দিবার সময় নয়।” কাঁদিতে কাঁদিতে মাসী বলিলেন,-“এ পোড়ামুখ আমি তোমাকে কি করিয়া দেখাইব। আমার মরণ কেন হইল না।” “বাবু” বলিল,- “কোন মাসী-মা! হইয়াছে কি ! এ সমুদয় আমার দোষ। আমি যদি না মিথ্যা সংবাদ দিতাম, তাহা হইলে তো আর এরূপ হইত না। যাহা হউক, কুসী যে মারা যায় নাই, তাঁহাই আমার সৌভাগ্য!” মাসী কােন উত্তর করলেন না। নীরবে কঁদিতে লুণ্ঠিলেন। “বাবু” পুনরায় বলিল,-“কুসীকে আপনি বড়ঙািলবাসেন। কুসীর ভালর জন্য আপনি এ কাজ করিতে গিয়াছিলেন। আমি হইলে, আমিঠু বৈাধ হয় ঐ রূপ করিতাম। তাহাতে আর কান্না কি? সমুদয় আমার দোষ। সে যাহা খন আমার বড় ক্ষুধা পাইয়াছে। সন্ন্যাসীর বেশে আজ দুই বৎসর মাঠে-ঘাটে বেড় । চল মাসী-মা! আমাকে খাবার দিবে চল । তুমি নিজে আমাকে খাবার দিবে, তুমি আমার কাছে বসিয়া থাকিবে, তবে আমি আহার করিব, তা না হইলে আমি আহার করিব না। আমার বড় ক্ষুধা পাইয়াছে, মাসী-মা! না খাইতে পাইয়া, এই দেখি কত রোগী হইয়া গিয়াছি।” পথ-শ্রাত্তিতে হীরালাল নিতান্ত শ্ৰান্ত আছে, না খাইতে পাইয়া তাহার শরীর কৃশ হইয়া গিয়াছে, এখন তাহার বড় ক্ষুধা পাইয়াছে, এরূপ কথা শুনিয়া মাসী আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলেন না। চক্ষু মুছিতে মুছিতে তৎক্ষণাৎ তিনি উঠিয়া দাড়াইলেন, আহারীয় সামগ্ৰী আয়োজন করিয়া কাছে বসিয়া হীরালালকে তিনি আহার করাইলেন। সেই আহারের সময় নানারূপ কথা হইল। পরদিন আমি হীরালালকে বলিলাম,-“তুমি তো বড় Naughty boy (বাদৃ ছােকুরা) দেখিতে পাই। আচ্ছা কীৰ্ত্তি তুমি করিয়াছ। কোন বিবেচনায় তুমি এরূপ মিথ্যা মৃত্যুসংবাদ দিলে? দৈববলে কেবল কুসী বঁচিয়া গিয়াছে। সে যদি মরিয়া যাইত, তাহা হইলে কি হইত?” হীরালাল উত্তর করিল,-“আমি যে বড় মন্দ কাজ করিয়াছি, সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নাই। এতদূর যে হইবে, তাহা আমি বুঝিতে পারি নাই। হাতে সূতা বাঁধা সম্বন্ধে কাল রাত্রিতে দিগম্বরবাবু যাহা বলিয়াছেন, এ বিষয়ে আমারও সেই কথা,-ওটা আমার ঠাওর হয় নাই।” দিগম্বরবাবুর ঠাওর স্মরণ করিয়া আমি হাসিয়া ফেলিলাম। আমি বলিলাম,-“বাবু! তুমি যে ফোকুলা দিগম্বর sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro Sasa কাজ করিয়াছ, তাহার উপযুক্ত দণ্ড কিছু হয় নাই। দিগম্বরবাবু কুসীকে বিবাহ করিয়া লইয়া যাইতেন, তাহা হইলে ঠিক হইত। আগে যদি জানিতাম যে, তুমি এই কীৰ্ত্তি করিয়াছ, তাহা হইলে আমি নিজেই উদ্যোগী হইয়া তাহার সহিত কুসীর বিবাহ দিতাম। যাই হউক, এখন কুসী ভাল হইলে হয়। তাহার শরীরের যেরূপ অবস্থা, তাহাতে আমার বড়ই ভয় আছে।” হীরালাল উত্তর করিল,— “কুসীর নিমিত্ত আর চিন্তা নাই। আজ যদি তাহাকে দেখিতেন, তাহা হইলে এ কথা। আপনি বলিতেন না। দাঁড়ান!! আমি তাহাকে আপনার নিকট আনিতেছি।” এই কথা বলিয়া “বাবু” দৌড়িয়া বাটীর ভিতর গমন করিল। সে সময় রসময়বাবু বাটীতে ছিলেন না। অল্পক্ষিণ পরেই কুসীকে লইয়া “বাবু” বৈঠকখানায় প্রত্যাগমন করিল। কুসী কিছুতেই আসিবে না, “বাবু”ও কিছুতেই ছাড়িবে না। কুসীকে সে টানিয়া আনিতে লাগিল। কুসী বৈঠকখানার দ্বারটি ধরিল। সেই দ্বার ছাড়াইতে বাবুকে বল প্ৰকাশ করিতে হইল। তাহাতেই আমি বুঝিলাম যে, কুসীর জন্য আর কোন ভাবনা নাই বটে। যে লোকের শরীর কালো অসাড়, অবশ, মৃতপ্রায় হইয়াছিল, আজ সে সবলে দ্বার ধরিতে পারিল। এই একদিনেই কুসীর মুখশ্ৰী অনেক পরিবৰ্ত্তিত হইয়াছিল। কুসীর চক্ষুৰ্দ্ধয়ে পুনরায় জ্যোতির সঞ্চার হইয়াছিল। বৈঠকখানায় আসিয়া কুসী। আমার পশ্চাদিকে লুক্কায়িত হইল। আমি কুসীর হাতটি ধরিয়া একটু হাসিলাম; ঘােড় হেঁট করিয়া কুসীও একটু হাসিল। সেই কাশীর হাসি! হীরালালকে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “বাবু! সে লোচন ঘোষ কে?” বাবু উত্তর করিল,- “লোচন ঘোষা! সে আবার কে? আমি বললাম, " "সেই যে, কুসীর মাসীকে পর্তুষ্টিয়াছিল?” বাবু হাসিয়া বলিল,— ঐলৈাচনী ঘৈন্টাির্নং কলকাতায় যাহার রসদ, বিল, দরখাস্ত প্রভৃতি লিখিয়া জীবিকানিৰ্ব্বাহ করে,ািহদের একজনকে দুই আনা পয়সা দিয়া আমি সেই চিঠি লিখাইয়া লইয়াছিলাম। খ্যা সমাপ্ত হইলে স্বাক্ষরের সময় সে আমাকে জিজ্ঞাসা করিল,-নাম? আমি তখন নাম খুঁজিয়া পাই না; তাই যা মনে আসিল, বলিয়া ফেলিলাম। আমি বলিলাম,- “লেখ, লোচন ঘোষ।” চিঠি ও খবরের কাগজ মাসী-মায়ের নিকট আমিই প্রেরণ করিয়াছিলাম।” এয়োদশ পরিচ্ছেদ অজ্ঞাতবাসের বিবরণ ‘বাবুকে আমি পূৰ্ব্ব-কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলাম। অন্যান্য কথা জিজ্ঞাসা করিয়া আমি বলিলাম,- “বাবু! তোমার নীেকা কি সত্য সত্য ডুবিয়া গিয়াছিল?” বাবু উত্তর করিল,- “ওরে বাপ রে! সে যে কি আশ্চৰ্য বাচিয়াছিলাম, তাহা আর আপনাকে কি বলিবা বৈশাখ মাস, ঠিক দুই বৎসর আগে আর কি! আমরা গোয়ালন্দ আসিতেছিলাম। সন্ধ্যার ঠিক পরেই পশ্চিম-উত্তর দিকে ভয়ানক মেঘ উঠিল। নিবিড় অন্ধকারে পৃথিবী ঢাকিয়া গেল। আরোহিগণ নৌকা কিনারায় লাগাইতে বলিল; কিন্তু তৎক্ষণাৎ প্রবল ঝড় Risbr দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.comাির্ড”******* উঠিল; এক ঝাপটে নীেকাখানি উল্টাইয়া পড়িল। আমি অতিকষ্টে তাহার ভিতর হইতে বাহির হইলাম। একজন আমাকে জড়াইয়া ধরিল। তাহার হাত হইতে আপনাকে ছাড়াইবার নিমিত্ত আমি চেষ্টা করিতে লাগিলাম। সেই সময় নীেকার বঁাশ হউক কি কিছু হউক, আমার মাথায় লাগিয়া গেল। এই দেখুন, এখনও আমার মাথায় তাহার দাগ রহিয়াছে। অনেক কষ্টে আমি সে লোকের হাত হইতে আপনাকে ছাড়াইলাম। তাহার পর অনেক কষ্টে কিনারায় আসিয়া উঠিলাম। সে অন্ধকারে কে কোথায় গেল, তাহার কিছুই আমি জানিতে পারিলাম না। কিনারায় উঠিয়া একটি মাঠ পার হইয়া একখানি গ্রামে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সেই গ্রামে একজনের বাড়ীতে আশ্রয় লইলাম। রাত্রির শেষভাগে আমার ভয়ানক জুর হইল।” আমি একখানি চেয়ারে বসিয়াছিলাম। আমার পশ্চাতে দাঁড়াইয়া আমার বামস্কন্ধের উপর তাহার বামহাত রাখিয়া কুসী একমনে নৌকা ডুবির বিবরণ শুনিতেছিল। এই পৰ্যন্ত শুনিয়া সে কাদিয়া ফেলিল, তাহার চক্ষু দিয়া টপ টপ্‌ করিয়া জল পড়িতে লাগিল। এই সময় হীরালালের দৃষ্টি কুসীর উপর পড়ল। হীরালাল বলিল,- “কুসী! তুমি কাঁদিতেছ। এখন আবার কান্না কিসের? ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করিয়াছেন, তাই আমি বঁচিয়াছি! চুপ কর।” আমিও কুসীর দিকে ফিরিয়া দেখিলাম। আমিও তাঁহাকে বলিলাম,- “কুসী। এ আহাদের সময়, কান্নার সময় নয়। কাদিয়া পুনরায় কি রোগ করিবে? চুপ কর।” शैद्भाव्नान श्रृंनद्धांश दनिल.- ‘जाDनिन एवाभि অভিভূত হইয়া পড়িয়া রহিলাম। পুরুষে তাহারা আমার সেবা-শুশ্ৰষা করিয়াছে। বুড়ী অনেকগুলি টাকা দিয়াছিলেন । নোটগুলি মগ্নিীয়ে বাধিয়া য়াখিতাম। টাকাগুলি সেইজন্য বেঁর্ষ “আটদিনের পর আমার জুর ছাড়িয়া গেল। ক্রমে আমি আরোগ্য লাভ করিলাম। শরীরে যখন একটু বল হইল, তখন আমি গোয়ালন্দ আসিলাম । কলিকাতায় আসিবার নিমিত্ত রেলগাড়ীতে চড়িলাম। গাড়ীতে এক ব্যক্তির নিকট একখানি বাঙ্গালা খবরের কাগজ ছিল। পড়িবার নিমিত্ত সেই খবরের কাগজখানি আমি চাহিয়া লইলাম। সেই খবরের কাগজে আমি আমার মৃত্যুসংবাদ দেখিলাম, তাহা দেখিয়া আমি আশ্চৰ্য্যান্বিত হইলাম না। নৌকা যেভাবে উলটিয়া পড়িয়াছিল, তাহাতে জনপ্রাণীর বাঁচিবার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু সেই সংবাদপত্র পাঠ করিয়া আমি অবগত হইলাম যে, দুইজন মাঝির প্রাণরক্ষা হইয়াছে। “আমী মৃত্যুর সংবাদ খবরের কাগজে প্রকাশিত হইয়াছে দেখিয়া আমি ভাবিতে লাগিলাম। ভাবিয়া চিন্তিয়া আমি স্থির করিলাম যে, কিছু দিনের নিমিত্ত আমি এ সংবাদের প্রতিবাদ করিব। না। পিতা কর্তৃক সেই ঘোরতর অপমানের কথা তখনও আমার মনে জাগরিত ছিল। আমি ভাবিলাম যে, আমাকে যেরূপ তিনি দুঃখ দিয়াছেন, সেইরূপ তিনিও দিনকত পুত্ৰশোক ভোগ করুন । “তাহার পর কুসীর ভাবনা মনে উদয় হইল। আমি যে জীবিত আছি, একথা কুসীকে জানাইবা কি না, অনেকক্ষণ ধরিয়া সেই চিন্তা করিতে লাগিলাম। আমি ভাবিলাম যে, যদি কুসীকে বলি যে, জীবিত আছি, তাহা হইলে কলিকাতায় আমার বন্ধু-বান্ধবও সে কথা জানিতে ফোকুলা দিগম্বর sNAls viði (SS BS! ro www.amarboi.com ro Sss পরিবে। কলিকাতার লোক জানিতে পারিলে, আমার দেশের লোকও জানিবে। সেজন্য কুসীর নিকটও গোপন করিব, এইরূপ আমি স্থির করিলাম। কিন্তু তাঁহাতে যে এরূপ বিপদ ঘটিবে, তাহা আমি বুঝতে পারি নাই। “তাহার পর আজি ভাবিলাম যে, সংসার খরচের নিমিত্ত মাসী-মায়ের নিকট কিছু টাকা পাঠাইতে হইবে। সেইজন্য আমি নিজেই নিজের মৃত্যু-সংবাদ দিতে বাধ্য হইলাম। লোচন ঘোষের নামে সেই পত্ৰখানি লিখিয়া পাঠাইলাম, আর আমার মৃত্যুসংবাদ সম্বলিত একখানি সংবাদপত্রও প্রেরণ করিলাম।” “কিন্তু এত অধিক দিন যে আমাকে অজ্ঞাতবাসে থাকিতে হইবে, তখন তাহা আমি ভাবি নাই। আমি মনে করিয়াছিলাম যে, আপাততঃ আমাকে একটি চাকরীর যোগাড় করিতে হইবে। চাকরী হইলেই আমি কুসীকে আপনার নিকটে আনিব। গেরুয়া বস্ত্র ধারণ করিলে অল্পখরচে নানা স্থান ভ্ৰমণ করিতে পারিব, সেজন্য সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করিলাম। কিন্তু এরূপ বেশ ধারণ করিয়া আমি ভাল কাজ করি নাই। পাছে লোকে আমাকে ভণ্ড মনে করে, সেজন্য অনেক স্থানে চাকরীর চেষ্টা করিতে পারি নাই। সত্যকথা বলিতে কি, আমি চাকরীর চেষ্টা ভাল করিয়া করি।-- ও নাই। মনে করিলাম যে, কুসীর নিকট আমি দুইশত টাকা প্রেরণ করিয়াছি। তাহাতে দুই বৎসর পল্লীগ্রামে একরূপ চলিয়া যাইবে । এই মনে করিয়া ভারতবর্ষের নানা স্থানে আমি ভ্ৰমণ করিতে লাগিলাম । “আজ প্ৰায় একমাস হইল, কুসীর জন্য আমার প্রাণ্ড বড়ই কাতর হইল। আমি তখন মহীশূর অঞ্চলে ভ্ৰমণ করিতেছিলাম। তৎক্ষণাৎ আসিলাম। কলিকাতা হইতে ::::ಜ್ಜೈ নিকট গমন করিয়াছেন। কুসীর পিতা এ আছেন, সে কথা আর আমি কাহাকেও জিজ্ঞাসা করিলাম না। কুসীর পিতা যে থাকিতেন, তাহা আমি জানিতাম। আমি মনে করিলাম যে, এখনও তিনি সেই আছেন । আমি কলিকাতায় প্ৰত্যাগমন করিলাম । কলিকাতা হইতে ব্ৰহ্মদেশে গমন করিলাম। ব্ৰহ্মদেশে গিয়া আমি জানিতে পারিলাম যে, তিনি পঞ্জাবে বদলি হইয়াছেন। তখন আমার বড় ভয় হইল। আমি ভাবিলাম,-কোন বিপদ ঘটিবে না কি? তা না হইলে এরূপ বিড়ম্বনা হয় কেন? যাহা হউক, তাড়াতাড়ি আমি কলিকাতায় কালবিলম্ব না করিয়া পঞ্জাবে আসিলাম। শ্বশুর মহাশয় প্রথম যে বড় ছাউনিতে বদলি হইয়াছিলেন, গতকল্য সেই স্থানে এই বিবাহের কথা শুনিলাম। প্রথম মনে করিলাম যে, শ্বশুর মহাশয়ের অন্য কোন কন্যা আছে! কিন্তু দুই বৎসর পূৰ্ব্বে আমি শুনিয়াছিলাম যে, তিনি আমি সেই বড় ছাউনি হইতে রওনা হইলাম। পথে কত কি যে ভাবিতে লাগিলাম, তাহা আপনাকে আর কি বলিব। আমি যে গাড়ীতে আসিলাম, সেই গাড়ীতে দিগম্বরবাবুর স্ত্রীও আসিয়াছিলেন। ফলকথা, আমিই তাঁহাকে ও বিন্দীকে টিকিট কিনিয়া দিয়াছিলাম, কিন্তু তিনি যে আমার স্ত্রীর বরের স্ত্রী, আর এই অভিনয়ে তিনি যে একজন প্ৰধান Actress (নায়িকা), তখন তাহা আমি জানিতে পারি নাই। তাহার পর কি হইল, আপনি জানেন।” Α. VOO দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.comন্মিলাক্যনাথ রচনাসংগ্ৰহ চতুৰ্দশ পরিচ্ছেদ ফয়ে ওকার দিয়া যাহা হয়। একমনে কুসী এই বিবরণ শ্রবণ করিতেছিল। তাহার দিকে ফিরিয়া আমি বলিলাম,- “কুসী। শুনিলে তো তোমার বাবুর বিদ্যা।” ‘বাবু বলিল,— “হাঁ কুসী! আমি বড় অন্যায় কাজ করিয়াছি। আমি বুঝিতে পারি নাই যে এতদূর হইবে। সে যাহা হউক, কুসী, তুমি যাদববাবুকে দেখিয়া লজ্জা করিতে পরিবে না। ইনি আমাদের অনেক উপকার করিয়াছেন। ইহার সাক্ষাতে কাশীতে যেরূপ আমার সহিত হাসিতে, কথা কহিতে, এখনও তাঁহাই করিতে হইবে। মনে নাই, কাশীতে তুমি ইহাকে বাপ বলিয়াছিলে?” কুসীর আধ-ঘোমটা ছিল। ‘বাবু উঠিয়া তাহার সে ঘোমটাটুকুও খুলিয়া দিল। কুসী। আপত্তি করিল, হাত দিয়া কাপড় টানিয়া ধরিল, কিন্তু ‘বাবু তাহা শুনিল না। এখন কেবল তাহার মাথায় কাপড় রহিল। এই গোলমালের পর কুসী। আমার কানে-কানে বলিল,- “আপনাকে আমি জ্যেঠা-মহাশয় বলিব ।” বাবা না বলিয়া কেন সে আমাকে জ্যেঠা-মহাশয় বলিবে, তাহা আমি বুঝিতে পারিলাম। আমি বলিলাম,- “বেশ! অতঃপর কুসী বাটীর ভিতর চলিয়া গেল। মাসীর লজ্জা ভাঙ্গা হইয়া গেল। তিনি যে কাজ , সে সম্পর্কে কোন কথা আর কেহ উত্থাপন করিল না। রূপে-গুণে বিভূষিত পাইয়া রসময়বাবুর মনে আর আনন্দ তুৰ্তলৈাগিল। কুসীর সেই উজ্জ্বল গীেরবর্ণ পুনরায় হৰ্ণষ্টতাহার চক্ষু পুনরায় ভাসিয়া উঠিল। চক্ষু-তার সমুদ্রািজলুমকুঁশি বর্ণেরঞ্জিত হইয়া ঢুলু ঢুলু করিতে লাগিল। কাশীর সেই সরল ভাব, সেই মধুর হাসি (পুনরায় কুসীর মুখে দেখা দিল। বয়সের গুণে তাহার কথাবাৰ্ত্তায় কেবল পূৰ্ব্বাপেক্ষা একটু গাভীৰ্য্যের লক্ষণ প্রতীয়মান হইল। তা না হইলে আর সকল বিষয়ে ঠিক সেই কাশীর কুসী হইল। মাঝে মাঝে সে আমার নিকট আসিয়া আমার পাকা চুল তুলিয়া দিত। সেই সময় সে আমাকে কত কথা বলিত। একদিন আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম,- “কুসী! যখন দিগম্বরবাবুর সহিত তোমার বিবাহের কথা হইয়াছিল, তখন আমি মনে করিয়াছিলাম যে, সে বিবাহ নিবারণ করিবার নিমিত্ত তুমি আমাকে চেষ্টা করিতে বলিবে! তাহা কর নাই কেন?” কুসী। উত্তর করিল,— “পাছে মাসী আত্মহত্যা করেন, আমি সেই ভয় করিয়াছিলাম। কিন্ত আমি নিশ্চয় বুঝিয়েছিলাম যে, এ বিবাহ হইবে না, বিবাহের পূৰ্ব্বে আমি মরিয়া যাইব। তবে আর মিছামিছি গোলমাল করিবার আবশ্যক কি? আর দেখুন, জ্যেঠা-মহাশয়! এই দুই বৎসর আমি মানুষ ছিলাম না। আমি যে কি ছিলাম, তাহা বলিতে পারি না। আমার যেন জ্ঞানগোচর কিছুই ছিল না। যেন ভয়ানক একটা দুঃস্বপ্ন দেখিয়াছি, এ দুই বৎসর আমার ঠিক তাহাই বলিয়া মনে হয়!” চারি-পাঁচ দিন পর আমি হীরালালকে জিজ্ঞাসা করিলাম,- “বাবু তোমার পিতাকে তুমি পত্র লিখিয়াছ?” ‘বাবু উত্তর করিল,— “না জ্যেঠা-মহাশয়! তাঁহাকে আমি এখনও পত্ৰ লিখি নাই। তাহারা

  • ে****** দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com ~ WSDOY জানেন যে, আমি মরিয়া গিয়াছি। দুই বৎসর অতীত হইয়া গেল। তাঁহারা হয়তো আমাকে ভুলিয়া গিয়াছেন! চিঠি লিখিতে আমার লজ্জা করিতেছে।”

‘বাবুর নিকট হইতে আমি তাহার পিতার ঠিকানা জানিয়া লইলাম। আমি নিজেই তাঁহাকে পত্ৰ লিখিলাম। প্ৰত্যুত্তর আসিবার সময় অতীত হইল, তথাপি আমি আমার পত্রের উত্তর পাইলাম না। আমার ভয় হইল। তিনি কি এখনও ‘বাবুকে ক্ষমা করেন নাই? অথবা সে স্থানে কি কোনরূপ দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে? চারিদিন পরে আমার চিন্তা দূর হইল। হীরালালের পিতা নিজেই আসিয়া উপস্থিত হইলেন। হীরালালের মাতা ও এক ভ্ৰাতাও তাঁহার সঙ্গে আসিয়াছিলেন!। বলা বাহুল্য যে, পুত্র জীবিত আছে শুনিয়া পিতা-মাতা যেন স্বৰ্গে হাত বাড়াইয়া পাইলেন। আমার পত্ৰ পাইয়া হীরালালের মাতা পুত্রকে সত্ত্বর দেখিবার নিমিত্ত কাদিয়া-কাটিয়া ধুম করিয়াছিলেন। সেজন্য চিঠি না। লিখিয়া তাহারা নিজেই আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ভাগ্যে রসময়বাবুর বাড়ীটি বড় ছিল, সেজন্য সকলের তাঁহাতে স্থান হইল। পিতা-পুত্রে কিরূপে সাক্ষাৎ হইল, কুসীকে তাঁহারা কত আদর করিলেন, কত বসন-ভুষণে তাহাকে তাহারা ভূষিত করিলেন, রসময়বাবু ও মাসীর সহিত তাঁহাদের কিরূপ পরিচয় হইল, আমার সহিত তাঁহাদের কিরূপ সদ্ভাব জন্মিল, সে সব কথা লিখিয়া পুস্তকের কলেবর আর বৃদ্ধি করিব না; ফলকথা এই যে, সকলের সহিত সকলের বিশেষরূপে সদ্ভাব হইল। পুত্রকে জীবিত পাইয়া, কুসী হেন পুত্রবধূ পাইয়া, হীরালাল হেন জামাতা ধাইয়া, তাহার পিতা-মাতার ন্যায় সমৃদ্ধিশালী সদাশয় কুটুম্ব পাইয়া রসময়বাবু ও র মাসী পরম আনন্দিত হইলেন । সকলের আনন্দে আমিও আনন্দিত হইলাম। ○ কিছুদিন সেই স্থানে বাস করিয়া পতা-মাতা পুত্রবধু লইয়া দেশে প্রত্যাগমন করিতে ইচ্ছা করিলেন। কুসুমের লইয়া যাইবার নিমিত্ত তাহারা বিশেষরূপে অনুরোধ করিলেন, কিন্তু ত্ব অন্য কোন অভিভাবক ছিলেন না, সেজন্য তখন তিনি যাইতে পারিলেন না। কিন্তু কিছুদিন পরে রসময়বাবু শ্বশুরবাড়ী-সম্পৰ্কীয়া একজন বয়স্ক স্ত্রীলোক অভিভাবকস্বরূপে পাইলেন। মাসী এখন কুসুমের নিকটে আছেন। আমাকেও সঙ্গে লইয়া যাইবার নিমিত্ত হীরালাল নিজে ও তাহার পিতা অনেক অনুরোধ করিলেন। সে প্রস্তাবে প্রথম আমি সম্মত হইতে পারি নাই। কিন্তু কুসী এক কাণ্ড করিয়া বসিল। দেশে প্রত্যাগমন করিবার দুইদিন পূৰ্ব্বে একদিন দুই প্ৰহরের সময় আমি বৈঠকখানায় শয়ন করিয়া আছি। কুসী আস্তে আস্তে আমার শিয়রে আসিয়া বসিল। শিয়রে বসিয়া আমার পাকা চুল তুলিতে লাগিল। পাকা চুল আর কি ছাঁই তুলিবে, আমার অধিকাংশ চুল পাকিয়া গিয়াছিল, অল্পই কাঁচা ছিল। আমার সে মাথা খুঁটিতে লাগিল । মাথা খুঁটিতে খুঁটিতে কুসী বলিল,— “জ্যেঠা-মহাশয়! আপনি আমাদের সঙ্গে সেই পূৰ্ব্বদেশে যাইবেন কি না, তাহা বলুন।” আমি উত্তর করিলাম,- “আমি কোথায় যাইব? তুমি যাইবে শ্বশুরবাড়ী, সে স্থানে আমি যাই আমি এই কথা বলিয়াছি, আর কুসী। আমার মাথার অনেকগুলি চুল একসঙ্গে ধরিয়া একটু টান মারিল। যত লাগুক, না লাণ্ডক আমি কিন্তু বলিয়া উঠিলাম,- “উঃ! লাগে, ছাড়িয়া দাও!” \OR দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com%"oooooR কুসী বলিল,- “কখনই না। যতক্ষণ না বলিবেন যে, আমি যাব, ততক্ষণ আমি ছাড়িব ਜ" কাজেই আমাকে বলিতে হইল যে, আমি যাব। কাজেই আমাকে যাইতে হইল। কাজেই কুসীর শ্বশুরবাড়ীতে আমাকে কিছুদিন বাস করিতে হইল। কাজেই হীরালালের পিতার সমাদর ও যত্নে আমাকে পরম আপ্যায়িত হইতে হইল। কাজেই সে স্থান হইতে পুনরায় বিদায় গ্রহণের সময় কুসীর কান্না দেখিয়া আমাকেও কাঁদিয়া ফেলিতে হইল। সে স্থান হইতে আমি স্বগ্রামে প্রত্যাগমন করিলাম। কাৰ্যোপলক্ষে কলিকাতা আমাকে সৰ্ব্বদা গমন করিতে হয়। কলিকাতার পথে একদিন সহসা বিন্দীর সহিত আমার সাক্ষাৎ হইল। তাহার সহিত প্ৰায় একশত স্ত্রীলোক আর দুই-একজন পুরুষমানুষ ছিল। আমি কোন কথা বলিতে না বলিতে, বিন্দী আসিয়া আমায় ধরিল। বিন্দী বলিল,— “কেও ডাক্তারবাবু, আমাকে চিনিতে পারেন?” আমি উত্তর করিলাম,- “তোমাকে আমি বিলক্ষণ চিনিতে পারি, কিন্তু তুমি আমাকে বিন্দী বলিল,— “আমি! আমি সকলকেই চিনিতে পারি। সেই যে উজিরগড়ের ঢলঢলিতে আপনি ছিলেন!! আপনি কে, সে কথা আমি জমাদারকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “দিগম্বরবাবু আর তাহার স্ত্রী, এখন কোথায়?” বিন্দী উত্তর করিল, “নাতিনীর বিবাহ দিতে তিনি দেশে আসিয়াছেন; আমিও সেই সঙ্গে দেশে আসিয়াছি। আমি কি সে দেশে থাকিতে পারিন, আমি সেথােগিরি করি, তাহাতে বেশ দুপিয়সা পাওনা আছে, এই দেখুন কতগুলি লোকফুর্ক কালীঘাট লইয়া যাইতেছি। আমি কি সেই খোট্টার দেশে বসিয়া থাকিতে পারি। তুঙ্গুর নূতন একটি ফন বাহির করিয়াছি। উদ্ধৃত্যু পাওন্যা-থােওনা যা হয়, দুইজনে ভূমির পুরোহিত, আমি হইয়াছি মাইজী স্বামী। সে কাজের জন্য আমার রং করা আলখেল্লা আছে।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,- “সে আবার কি ফনৃ?” বিন্দী উত্তর করিল,- “এই কলিকাতায় মাইজী স্বামী হইয়া টিকিদার বাবুদের বাড়ী যাই। বাবু আর বাবুয়ানীরা আমার খুব আদর করেন। সকলেই বলেন,-মাইজী স্বামী আসিয়াছেন! মাইজী স্বামী আসিয়াছেন। তাহার পর বাবুরা আফিসে চলিয়া গেলে আমি গৃহিণীদের বলি,— “গিামীবাবু! সাবিত্ৰীব্ৰত ঘুচিয়া এখন এক নূতন ব্ৰত উঠিয়াছে, তাহা করিবেন? গিামীবাবু জিজ্ঞাসা করেন,-কি ব্ৰতা? আমি বলি, ইহার নাম দিগম্বৱী-ব্ৰত। গিনীবাবু জিজ্ঞাসা করেন,-সে ব্ৰত করিলে কি হয়? আমি বলি,- সে ব্ৰত করিলে স্বামী চিরকাল পদানত হইয়া থাকে। অনেকেই এখন সেই ব্ৰত করিতেছেন।” লেখা-পড়া শিখিয়া যাহাদের মেজাজ গরম হইয়া গিয়াছে, সংসারে কাজকৰ্ম্ম যাহারা কিছুমাত্র করেন না, পঙ্গুর মত কেবল বসিয়া থাকেন, আর রং-বেরঙের পোষাক কিনিয়া স্বামীকে যাহারা। ফতুর করেন, সেইসব মেয়েদের মধ্যে এই দিগম্বৱী-ব্ৰতটি বিলক্ষণ চলন হইয়াছে। লোকের বাড়ী বাড়ী গিয়া আমি "গিনীবাবুর’ যোগাড় করি, উদ্ধব দা-ঠাকুর পূজা করেন, আর মন্ত্র পড়ান। এখন হইতে সাবিত্রী-ব্ৰত আর কাহাকেও করিতে হইবে না, দিগম্বৱী-ব্ৰত করিলেই চলিবে। এই নূতন দিগম্বৱী-ব্ৰত করিলেই চলিবে। এই নূতন ব্ৰতের কথা। আপনিও পাঁচজনকে বলিবেন।” ফোকলা দিগম্বর দুনিয়ার পাঠক এক হও! ৩ www.amarboi.com ~ vQOv) আমি উত্তর করিলাম,- “সেই উজিরগড়ের ঘটনা সম্বন্ধে আমি একখানি বই লিখিতেছি। সেই পুস্তকে এই নৃতন ব্ৰতের কথা লিখিব।” এই সময় উদ্ধব দা-ঠাকুর আমার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি বলিলেন, — “দিগম্বরী-ব্ৰতের ফলে কথাটা ভাল করিয়া লিখিবেন। যে কুলকামিনী এ ব্ৰত করেন, তাঁহার জীবন সার্থক হয়। এ জনমে পতি তাহার পদানত হইয়া থাকে। গলাভাঙ্গা দিগম্বরীর মত চিরকাল তাঁহার সিঁথিতে সিন্দুর থাকে। ফিরে জন্মে গলা-ভাঙ্গা দিগম্বরীর মত তাঁহার রূপ হয়, গুণ হয় ও পতিভক্তি হয়, আর ফোকলা দিগম্বরের মত রূপবান। গুণবান স্ত্রীপরায়ণ স্বামী তিনি লাভ করেন।” এই কথা বলিয়া যাত্রী লইয়া বিন্দীর সহিত উদ্ধব দা-ঠাকুর প্রস্থান করিলেন। কলিকাতা হইতে স্বগ্রামে আসিয়া আমি এই পুস্তকখানি লিখিলাম। পুস্তকখানি লিখিয়া ইহার নাম কি দিব, তাহা ভাবিতেছি, এমন সময় পশ্চাল্লিখিত পত্ৰখানি আমি পাইলাম । “পরম শ্ৰদ্ধাসম্পদ শ্ৰীযুক্ত বাবু যাদবচন্দ্র চক্ৰবৰ্ত্ত, ডাক্তার মহাশয় বরাবরেষু। মহাশয়! বিন্দীর মুখে শুনিলাম যে উজিরগড়ের ঘটনা সম্বন্ধে আপনি একখানি পুস্তক লিখিতেছেন। আমার নাম ইতিপূৰ্ব্বে কখনও ছাপা হয় নাই। আপনার পুস্তকে আমার নাম ছাপা হইলে, জগতে চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিব। সেজন্য আমি আনন্দিত হইয়াছি, আর সেজন্য তাহা হইলে আপনাকে আমি ভিজিট দিব । এই যে, আমার নাম লইয়া লোকের যাহাতে ভ্ৰম না হয়, সে বিষয়ে সাবধান ণ, এ অঞ্চলে অনেকগুলি দিগম্বর আছেন। একজন দীর্ঘ ও স্কুল, সেজন্য সকলে ধেড়ে দিগম্বর বলে। একজন খৰ্ব্ব ও কৃশ, সেজন্য সকলে তাঁহাকে মৰ্কট দিগম্বর বলে। একজনের সম্মুখের দন্ত কিছু উচ্চ, সেজন্য সকলে তাহাক দাতাল দিগম্বর বলে। আর উৰ্দ্ধকের ধাতুপ্রযুক্ত আমার এই যৌবনকালেই দাঁত পড়িয়া গিয়াছে, সেজন্য সকলে আমাকে দন্তহীন দিগম্বর বলে। কথাটি কিন্তু দন্তহীন নয়। প্রকাশ করিয়া না বলিলে লোকে আমাকে চিনিতে পরিবে না, লোকে মনে করিবে এ অন্য দিগম্বর। সেজন্য আপনি প্ৰকাশ করিয়া ছাপিবেন, তাহাতে আমি রাগ করিব না। আসল কথাটি কি, তাহা বোধ হয় আপনার মনে আছে?--সেই ফয়ে ওকার! ইতি-- আপনার বশংবদ শ্ৰীদিগম্বর শম্মা” এবার আমি আর ভিজিটের লোভ ছড়িতে পারিলাম না। সেজন্য পুস্তকখানির নাম এইরূপ झंख्न । wo দুনিয়ার পাঠক এক হও! ~ www.amarboi.com%"oooooooR

এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০১৯ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৫৯ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।