বঙ্গবিজেতা/প্রথম পরিচ্ছেদ – রুদ্রপুরে আগমন

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


WHILE the ploughman near at hand,
Whistles o’ver the furrowed land,
And the milkmaid singeth blithe,
And the mower whets the scythe,
And every shepherd tells his tale
Under the hawthorn in the dale.               —Milton.

১২০৪ খৃষ্টাব্দে বঙ্গ ও বিহার দেশে হিন্দুরাজ্য বিলুপ্ত হইল। সেই অবধি ১৫৭৪ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত, অর্থাৎ ৩৭০ বৎসর, আফগান অথবা পাঠানেরা এই দেশে রাজত্ব করেন। ইঁহারা কখন দিল্লীর সাম্রাজ্যের অধীনতা স্বীকার করিতেন, কখন বা সময় পাইলে স্বাধীনভাব অবলম্বন করিতেন। ইঁহাদিগের রাজ্যতন্ত্র অনেকাংশে ইউরোপীয় ফিউডল রাজ্যতন্ত্রের সদৃশ ছিল। দেশের সিংহাসন শূন্য হইলেই কখন কখন রাজপুত্রই রাজা হইতেন; এবং কখন বা কোন সেনাপতি আপন বাহুবলে সিংহাসনে আরোহণ করিতেন। দেশের অধিপতি কোন একটি উৎকৃষ্ট জেলা আপন অধীনে রাখিতেন, অন্যান্য জেলা প্রধান প্রধান সেনাপতিগণ নিজ নিজ অধিকারে রাখিতেন। তাঁহারা আবার আপন অধীনস্থ কর্ম্মচারীদিগের মধ্যে জমী বিভাগ করিয়া দিতেন। সেনাপতিগণ কখন কখন বঙ্গাধিপতির অধীনতা স্বীকার করিতেন; আবার সুযোগ পাইলেই আপন আপন জেলায় স্বাধীনভাব অবলম্বন করিতেন।

পাঠানদিগের শাসনাধীনে হিন্দু জমীদারদিগের বিশেষ ক্ষমতা ও প্রভুত্ব ছিল। এমন কি, বঙ্গদেশের পাঠান রাজাদিগের মধ্য্যে আমরা একজন হিন্দুরাজারও নাম দেখিতে পাই। ১৩৮৫ খৃষ্টাব্দে গণেশ রাজা বঙ্গদেশের অধিপতি হইয়া সাত বৎসর নিরাপদে রাজত্ব করেন। তিনি পূর্ব্বে জমীদার ছিলেন, আপন বাহুবলে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁহার পুত্র মুসলমানধর্ম্ম অবলম্বন করেন এবং তাঁহার বংশ সর্ব্বশুদ্ধ চত্বারিংশৎ বৎসর বঙ্গদেশে রাজত্ব করেন।

মোগলগণ যখন বঙ্গদেশ জয় করেন, তখন হিন্দু জমীদারদিগের আট লক্ষ পদাতিক ও তেইশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য এবং চারি সহস্র রণতরি ছিল। জমীদারগণ প্রায়ই জাতিতে কায়স্থ ছিলেন, এবং প্রকৃতপক্ষে দেশের রাজা ছিলেন। দেশের কৃষক ও প্রজাগণ সম্পূর্ণরূপে জমীদারদিগের অধীনে থাকিত। প্রজাদিগের মধ্যে বিবাদ বিসম্বাদ হইলে তাঁহারা কিংবা তাঁহাদের কর্ম্মচারিগণ নিষ্পত্তি করিয়া দিতেন, দস্যু ও দুশ্চরিত্র লোকদিগকে তাঁহারাই দণ্ড দিতেন, তাঁহারাই গ্রামে গ্রামে শান্তিরক্ষা করিতেন, তাঁহারাই প্রজাগণের “বাপ মা” ছিলেন। ফলতঃ জমীদারেরাই প্রজাদিগের পালনকর্ত্তা ও বিচারপতি ছিলেন। তাঁহারাই প্রজাদিগের রক্ষক ও রাজা ছিলেন। এইরূপে পাঠানদিগের শাসনে দেশে হিন্দুশাসন প্রবল ছিল।

১৫৭৩ খৃষ্টাব্দে শেষ পাঠান রাজা দায়ুদখাঁ বঙ্গদেশের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাহার পরবৎসরই আকবরশাহ এই দেশ জয় করিবার অভিলাষ করেন। তিনি স্বয়ং পাটনা নগর অধিকার করিয়া মনাইমখাঁকে সেনাপতি রাখিয়া দিল্লী যাত্রা করেন। মনাইমখাঁ নামে মাত্র সেনাপতি ছিলেন; ক্ষত্রিয়চূড়ামণি রাজা টোডরমল্লই বস্তুতঃ পাঠানদিগের হস্ত হইতে বঙ্গদেশ জয় করেন। তিনিই দায়ুদখাঁকে বার বার পরাস্ত করিয়া অবশেষে কটকের মহাযুদ্ধে জয়লাভ করেন। তাহাতে দায়ুদখাঁ ভীত হইয়া ১৫৭৪ খৃষ্টাব্দে বঙ্গ ও বিহারদেশ মোগলদিগের অর্পণ করিয়া কেবলমাত্র উড়িষ্যা প্রদেশ আপন অধীনে রাখিলেন। এই সন্ধির পরই টোডরমল্ল দিল্লী যাত্রা করেন, এবং দায়ুদখাঁ অবকাশ পাইয়া সন্ধির কথা বিস্মৃত হইয়া পুনরায় বঙ্গদেশ অধিকার করেন। ১৫৭৬ খৃষ্টাব্দে আকবরশাহ হোসেনকুলীখাঁকে সেনাপতিপদে নিযুক্ত করেন, তিনি নামে মাত্র সেনাপতি; রাজা টোডরমল্লই সর্বেসর্বা। টোডরমল্ল দ্বিতীয়বার বঙ্গদেশে আসিয়া রাজমহলের মহাযুদ্ধে দায়ুদখাঁকে পরাস্ত করেন, এবং সেই যুদ্ধে দায়ুদখাঁ নিহত হয়েন। দিল্লীর হোসেনকুলীখাঁকে বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যার শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করেন, এবং টোডরমল্ল পুনরায় দিল্লী প্রত্যাগমন করেন। ১৫৮০ খৃষ্টাব্দে পুনরায় বিদ্রোহানল প্রজ্বলিত হইল; এবার দেশে নব আগন্তুক মোগল সেনাপতি ও জায়গীরদারগণই বিদ্রোহী হইলেন। আকবরশাহ অতিশয় বুদ্ধিমান সম্রাট ছিলেন। তিনি দেখিলেন যে, যে হিন্দুসেনাপতি দুইবার পাঠান শত্রুদিগের জয় করিয়াছেন, সেই হিন্দুসেনাপতি ভিন্ন আর কেহই দেশীয় হিন্দুদিগের সাহায্য লইয়া মোগল বিদ্রোহীদিগকে পরাস্ত করিতে পারিবেন না; সুতরাং ১৫৮০ খৃষ্টাব্দে টোডরমল্ল সেনাপতি ও শাসনকর্ত্তৃপদে নিযুক্ত হইয়া বঙ্গদেশে প্রেরিত হইলেন। কি প্রকারে এই নিঃশঙ্ক বীরপুরুষ তৃতীয়বার বঙ্গদেশ জয় করিয়া দুই বৎসরকাল বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা প্রদেশ শাসন করেন, তাহা এই আখ্যায়িকায় বিবৃত হইবে। এই আখ্যায়িকায় ১৫৮০ খৃষ্টাব্দের কথা লিখিত হইবে, সুতরাং এই সময়ে হিন্দু ও মুসলমান, জমীদার ও প্রজা, পাঠান ও মোগলদিগের মধ্যে কি প্রকার সম্বন্ধ ছিল, সংক্ষেপে বর্ণিত হইল।

একদিন প্রাতঃকালে একজন ব্রহ্মচারী নদীয়া জেলার অন্তঃপাতী ইচ্ছামতী নদীতীরস্থ রুদ্রপুর নামক এক ক্ষুদ্র গ্রামাভিমুখে গমন করিতেছিলেন। চারিদিকে কেবল বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্র দৃষ্টিপথে পতিত হইতেছে; প্রভাতবায়ু রহিয়া রহিয়া শস্যক্ষেত্রের উপর খেলা করিতেছে; শস্য আনন্দে যেন তাহার সঙ্গে সঙ্গে নৃত্য করিতেছে। বহুদূরে প্রান্তরসীমায় দুই একটী পল্লীগ্রাম দেখা যাইতেছে; কুটীরাবলী দেখা যায় না, কেবল নিবিড় হরিৎবর্ণ বৃক্ষাবলী নয়নগোচর হইতেছে। আকাশ অতি নীল, পক্ষী সকল গান করিতেছে, এবং কৃষকগণও পল্লীগ্রাম হইতে আসিতে আসিতে মনের উল্লাসে গান করিতেছে। ব্রহ্মচারী যাইতে যাইতে একজন লোককে জিজ্ঞাসা করিলেন,—রুদ্রপুর আর কতদূর? সে উত্তর করিল,—অধিক দূর নাই, প্রায় আধ ক্রোশ হইবে।

ব্রহ্মচারী যাহার সহিত কথা কহিলেন, তাহার বয়স ৪০ বৎসর হইয়াছে; সে জাতিতে কৈবর্ত্ত, কিন্তু বেশভূষা ভদ্রোচিত। সে ব্রহ্মচারীকে প্রণাম করিয়া বলিল,—ঠাকুর, রুদ্রপুরে যাইতেছেন? আমি তথাকার লোক; চলুন, একত্রে যাই, আপনার নাম কি, নিবাস কোথায়? ব্রাহ্মণ উত্তর করিলেন,—আমার নাম শিখণ্ডিবাহন, ইচ্ছামতী নদীতীরস্থ মহেশ্বরমন্দির হইতে আসিতেছি। তোমার নাম কি?

নবীন। আমার নাম নবীন দাস; এই স্থানে আমার কিছু জমী আছে, সেইজন্য আমি আসিয়াছিলাম।

শিখণ্ডি। এবার শস্য কেমন হইয়াছে?

নবীন। ঠাকুর, আমার দুই কুড়ি বৎসর পার হইয়াছে, এমন সুন্দর শস্য কখন দেখি নাই। এই বৎসর বিধাতার অনুগ্রহের সীমা নাই।

ক্ষণেক পরে নবীন দাস আবার বলিতে লাগিল,—ঠাকুর! আমাদের জমীদারপুত্রের কি হইয়াছে, শুনিয়াছেন?

শিখণ্ডি। না; কি হইয়াছে?

নবীন। তিনি এক প্রকার উন্মত্তের মত হইয়াছেন, কারণ কেহ জানে না। তাঁহার পিতা তাঁহারা আরোগ্যের জন্য কত যত্ন করিলেন, কোন ফল হইল না। আপনি ঠাকুর লেখাপড়া জানেন, আপনি কিছু স্থির করিতে পারেন?

শিখণ্ডি। শাস্ত্রে উন্মত্ততার অনেক কারণ নির্দেশ করে,—বন্ধুর বিয়োগ, রমণীর প্রেম—

নবীন। না, সেরূপ নহে; আমাদের জমীদারপুত্র কত প্রকার বিহ্বল কথা বলেন—কিছু ঠিকানা থাকে না। বোধ হয়, অনেক লেখাপড়া শিখিয়া উন্মত্তের ন্যায় হইয়াছেন।

শিখণ্ডি। কি বলেন, বলিতে পার?

নবীন। শুনিয়াছি, আমাদের জমীদারপুত্র কখন কখন বলেন, বৈরনির্য্যাতনে পরম সুখ; কখন বলেন, স্ত্রীরত্ন পরম রত্ন; কখন বলেন, বন্ধুহত্যার মত পাপ নাই; আবার কখন বলেন, প্রজার কষ্ট দেখা অপেক্ষা মৃত্যু ভাল।

শিখণ্ডিবাহন অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া কহিলেন,— আমার মনে হয়, তিনি কোন ভয়ানক পাপ করিয়া থাকিবেন, মহাপাপে চিত্তের উন্মত্ততা জন্মে।

নবীন। তিনি কোন পাপ করিবেন, আমার এমন বিশ্বাস হয় না।

এই বলিয়া নবীন দাস ক্ষণেক স্থির হইয়া যেন পূর্ব্বকথা স্মরণ করিতে লাগিল। পুনরায় বলিল,— তাঁহার অন্তঃকরণে যে দয়া, তিনি পাপ করিতে পারেন না। আজ অনুমান দ্বাদশ বৎসর হইল, আমি একবার ইচ্ছাপুর গিয়াছিলাম, দেখিলাম দুই চারিজন প্রজা খাজনা দিতে পারে নাই বলিয়া ঘরে আবদ্ধ আছে। তখন আমাদের জমীদারপুত্রের বয়স আট বৎসর হইবে। তিনি লুকাইয়া ঘরের দ্বার খুলিয়া দিলেন এবং প্রজাগণের হস্তে দুইটী করিয়া মুদ্রা দিলেন। প্রজারা আনন্দে খাজনা দিয়া চলিয়া গেল।

শিখণ্ডি। তার পর?

নবীন। তাহার পর প্রজারা হঠাৎ কেন খাজনা দিল, মুদ্রাই বা কোথা হইতে পাইল, কেহ কিছু স্থির করিতে পারিল না। অবশেষে প্রজারা গৃহে ফিরিয়া গেলে পর বালক অতি ভয়ে ভয়ে পিতার নিকট আপন কর্ম্ম স্বীকার করিলেন। তাঁহার পিতা নগেন্দ্রনাথ তাঁহাকে ক্রোড়ে লইয়া মুখচুম্বন করিলেন। আমি দ্বারে দাঁড়াইয়াছিলাম; আমার চক্ষু জলে ভাসিয়া গেল।

এই প্রকার কথোপকথন করিতে করিতে দুইজনই রুদ্রপুর গ্রামে উপস্থিত হইলেন। নানাপ্রকার বৃহদাকার বৃক্ষে গ্রাম আচ্ছাদিত রহিয়াছে, মধ্যে মধ্যে সূর্য্যরশ্মি পত্রের ভিতর দিয়া শুষ্কপত্ররাশি ও গ্রাম্য পথের উপর পতিত হইতেছে। ডালে ডালে নানাপ্রকার সুন্দর পক্ষী গান করিতেছে, কোকিল, শ্যামা, দোয়েল, ফিঙ্গা, পাপিয়া, ঘুঘু, সকলেই নিজ নিজ রবে মনের উল্লাস প্রকাশ করিতেছে! মধ্যে মধ্যে গ্রাম্য সরোবরে পদ্ম, শালুকফুল ফুটিয়া রহিয়াছে, স্থানে স্থানে বৃক্ষতলে দুই একটী কুটীর দেখা যাইতেছে, স্থানে স্থানে দুই একজন কৃষক গান করিতে করিতে মাঠে যাইতেছে, তাহাদের গৃহিণীগণ মৃন্ময়-কলস কক্ষে লইয়া হেলিয়া দুলিয়া জল আনিতে যাইতেছে।

শিখণ্ডিবাহন জিজ্ঞাসা করিলেন,— মহাশ্বেতা নামে এক বিধবা এই গ্রামে বাস করেন, তাঁহার নিবাস কোথা?

নবীন দাস উত্তর করিল,— চলুন, আমি দেখাইয়া দিতেছি। অনন্তর কিছু পথ লইয়া গিয়া নবীন মহাশ্বেতার ঘর দেখাইয়া দিল। শিখণ্ডিবাহন মহাশ্বেতার ঘরে অতিথি হইলেন, নবীন দাস ব্রহ্মচারীর পদধূলি গ্রহণ করিয়া বিদায় লইয়া আপন কুটীরে আগমন করিল।