বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বঙ্গলক্ষীর ব্ৰতকথা [ ১৯০৬ সনের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত ] O উৎসর্গ বঙ্গলক্ষ্মীর ব্ৰতকথা বঙ্গেব গৃহলক্ষ্মীসিল কবকমলে অর্পণ কৰিলাম। লেখক O ভূমিকা গত পৌষেব বঙ্গদর্শন হইতে বঙ্গলক্ষ্মীব ব্ৰতকথা পুনমূত্রিত হইল। বঙ্গ-ব্যবচ্ছেদেব দিন অপবাঙ্গে জেমো-কান্দি গ্রামের অৰ্দ্ধসহস্রাধিক পুর্বনারী আমাব মাতৃদেবীব আহানে আমাদেব বাডীব বিষ্ণুমন্দিরেব উঠানে সমবেত হইযাছিলেন , গ্রন্থোক্ত অনুষ্ঠানেব পব আমাৰ কন্যা শ্ৰীমতী গিবিজ কর্তৃক এই ব্ৰতকথা পঠিত হয । বন্ধুবগে ব অনুবোৰে ইহা পুস্তিকাকারে প্রকাশ করিলাম । সম্প্রতি এডুকেশন গেজেটে বঙ্গলক্ষ্মীব ব্ৰতকথাৰ সঙ্গ ত অনুবাদ বাহিব হইতেছে দেখিযা আনন্দিত হইলাম । শ্রীরামেন্দ্রসুন্দব ত্রিবেদী চৈত্র ১১১১ বন্দে মাতবম্। বাঙলা নামে দেশ, তার উত্তবে হিমাচল, দক্ষিণে সাগর। মা গঙ্গা মর্ত্যে নেমে নিজের মাটিতে সেই দেশ গড়লেন। প্রয়াগ কাশী পার হয়ে মা পূৰ্ব্ববাহিনী হয়ে সেই দেশে প্রবেশ করলেন। প্রবেশ ক’রে মা সেখানে শতমুখী হলেন ৷ শতমূখী হয়ে মা সাগরে মিশলেন। তখন লক্ষ্মী এসে সেই শতমুখে অধিষ্ঠান করলেন। বাঙলার লক্ষ্মী বাঙলাদেশ জুড়ে বসলেন। মাঠে মাঠে ধানেব ক্ষেতে লক্ষ্মী বিরাজ করতে লাগলেন। ফলে ফুলে দেশ আলো হ’ল। সরোবরে শতদল ফুটে উঠল। তাতে রাজহংস খেলা করতে লাগল। লোকের গোলা-ভরা ধান, গোয়াল-ভরা গরু, গাল-ভরা হাসি হ’ল। লোকে পরমহ্মথে বাস করতে লাগল। ૨ রামেন্দ্রসুন্দর রচনাসমগ্র এমন সময় মর্ত্যে কলির উদয় হ’ল । লোকে ধৰ্ম্মকৰ্ম্ম ছাড়তে লাগল। ব্রাহ্মণসজ্জনে অনাচারী হ'ল। সন্ন্যাসীরা ভণ্ড হ’ল। সকলে বেদবিধি অমান্য করতে লাগল। লক্ষ্মী চঞ্চল ; তিনি চঞ্চল হলেন । লক্ষ্মী ভাবলেন—হায়, আমি বাঙলার লক্ষ্মী ; আমাকে বুঝি বাঙলা ছাড়তে হ’ল। তখন বাঙলাতে রাজা ছিলেন, তার নাম আদিশূর। লক্ষ্মী তাকে স্বপ্ন দিলেন, আমি বাঙলার লক্ষ্মী ; বাঙলায় অনাচার ঘটেছে ; অামি বাঙলা ছেড়ে চললেম। রাজ কেঁদে বললেন—ন মা, তুমি বাঙলা ছেড়ে যেয়ে না ; যাতে বাঙলায় সদাচার ফিরে আসে, তা আমি করছি। রাজা ঘুম ভেঙে দরবারে বসলেন। দরবারে বসে পশ্চিমদেশে কনে জে-লোক পাঠালেন ; কনোজ থেকে পাচ জন পণ্ডিত ব্রাহ্মণ আনালেন । তাদের সঙ্গে পাচ জন সজ্জন কায়েত এলেন । রাজা তাদের রাজ্যের মধ্যে বাস করালেন। তারা বাঙলাদেশে বেদবিধি নিয়ে এলেন, সদাচার নিয়ে এলেন। তাদের ছেলেমেয়ে বাঙলার গায়ে গায়ে বাস করতে লাগল। তাদের দেখাদেখি দেশে বেদবিধি সদাচার ফিরে এল। বাঙলার লক্ষ্মী বাঙল জুড়ে বসলেন । ধনে ধানে দেশ পূর্ণ হ’ল। চিরদিন সমান যায় না। লক্ষ্মী চঞ্চল ; তিনি আবার চঞ্চল হলেন। বাঙলার ধন দেখে ধান দেখে মোছলমান বাঙলায় এলেন। তখন বাঙলার রাজা ছিলেন, র্তার নাম ছিল লক্ষ্মণ সেন । র্তার রাজ্য গেল। মোছলমান বাঙলার রাজা হ’লেন। হিন্দুর জাতিধৰ্ম্ম নষ্ট হতে লাগল। হিন্থর ঠাকুরঘর ভেঙে, মোছলমান মসজিদ তুলতে লাগলেন। অৰ্দ্ধেক হিন্দু মোছলমান হল। হিন্দু-মোছলমানে এক গায়ে এক ঠায়ে বাস ক’রে মারামারিকাটাকাটি করতে লাগল। লক্ষ্মী ভাবলেন, হায়, আমি বাঙলার লক্ষ্মী, আমাকে বুঝি বাঙলা ছাড়তে হ'ল। তখন বাঙলাতে গৌড়ের পাঠানবাদশ রাজা ছিলেন, তার নাম ছিল হোসেনশা। লক্ষ্মী তাকে স্বপ্ন দিলেন, আমি বাঙলার লক্ষ্মী, আমার হিন্দুও যেমন, মোছলমানও তেমনি ; হি দু মোছলমান ভাই-ভাই যখন মারামারি-কাটাকাটি করতে লাগল, আমি বাঙলা ছেড়ে চললেম। পাঠান রাজা কেঁদে বল্পেন—ম, তুমি যেতে পাবে না ; আমি হি দু-মোছলমান সমান দেখব ; তাদের ভাই-ভাই একঠাই করব ; তুমি বাঙলা ছেড়ে যেয়ে না। লক্ষ্মী বল্পেন— আচ্ছা, তাই হবে ; আমি এখন থাকব। দিল্লীতে মোগল বাদশা হবেন । দিল্লীর বাদশা বাঙলার রাজা হবেন ; সেই রাজা হি দুমোছলমান সমান দেখবেন ; তখন হি দু-মোছলমান ভাই-ভাই হবে, ঝগড়-বিবাদ মিটে যাবে। রাজ ঘুম ভেঙে দরবারে বস্লেন। দরবারে ব্রাহ্মণ এসে রাজাকে মহাভারত শোনালে। মোছলমান রাজ ব্রাহ্মণকে মান্য করে রাজমন্ত্রী করলেন। হিন্দু গিয়ে মোছলমানের পীরতলায় সিন্নি দিতে লাগল। এমন সময় মহাপ্রভু নদীয়ায় অবতার হ’লেন। তিনি যবন ব্রাহ্মণ সবাইকে ডেকে কোল দিলেন। পাঠানের পর দিল্লীর মোগল বাদশা বাঙলার রাজা হ’লেন। তিনি হি দু-মোছলমানকে সমান চোখে দেখতে লাগলেন। হিছু-মোছলমান ভাই-ভাই হ’ল, ঝগড়া-বিবাদ মিটে গেল। বাঙলার লক্ষ্মী বাঙলা জুড়ে বসলেন । ধনে ধানে দেশ পূর্ণ হ’ল । এইরূপে বহুদিন গেল। চিরদিন 'সমান যায় না। লক্ষ্মী চঞ্চল ; তিনি আবার চঞ্চল হলেন। দিল্লীর তখনকার বাদশা ছিলেন, তার নাম ছিল আলমগির। তিনি হিছ-মোছলমানে তফাত করতে গেলেন। বর্গী এসে বাদশার রাজ্য লুঠ করতে লাগল। বঙ্গলক্ষ্মীর ব্ৰতকথা ৩ সাত সমুদ্র পার হয়ে থষ্টান ইংরেজ সদাগর বাঙলায় বাণিজ্য করতে এসেছিল। দিল্লীর বাদশা তাদের আদর ক'রে নিজের রাজ্যমধ্যে জায়গা দিয়েছিলেন। বাঙলার ধন দেখে, ধান দেখে তাদের লোভ হ’ল । লক্ষ্মী তখন আলমগিরের বংশের দিল্লীর বাদশাকে ছেড়েছেন। বাদশা ইংরেজকে বাঙলার দেওয়ান করে দিলেন। বাদশার দশা দেখে বাদশাকে খাজনা দেওয়া বন্ধ ক’রে তারাই হ’ল বাঙলার রাজা । তারা এসেছিল সদাগর, হয়েছিল বাদশার দেওয়ান, হয়ে গেল দেশের রাজা। রাজা হ’ল ; কিন্তু রাজ্যে বাস করল না। বাঙলাদেশের ধন নিয়ে ধান নিয়ে সাত সমুদ্রপারে আপন দেশে চল ল । সাগরের জাত কিনা, মেজাজ ঠাণ্ডা, তীক্ষ্ম বুদ্ধি, অতিশয় ধূৰ্ত্ত। তার চোরডাকাত দমন কর্ল, মিষ্টি মিষ্টি কথা কইতে লাগল, আবার নিজের দেশ হ'তে খেলনা এনে পুতুল এনে প্রজার মন ভুলাতে লাগল। লক্ষ্মী যখন চঞ্চল হন, তখন মানুষের বুদ্ধিলোপ হয়। বাঙলার লোকের বুদ্ধিলোপ হ’ল। বুড়ামানুষে শিশু সাজ ল , ইংরেজের দেওয়া খেলনা-পুতুল নিয়ে ছেলেখেলা করতে লাগল। সদাগর রাজা কাচ এনে দিলেন। বাঙলার প্রজা কাঞ্চনবদলে সেই র্কাচ নিতে লাগল। দেশের জিনিষে লোকের মন উঠে না। ঝু টোমণির রঙ দেখে দেশের সাচ্চামণিকে অনাদর করতে লাগল। রাজা যত আদর দেন, সোহাগ করেন, দেশের লোক ততই খোকা সাজতে লাগল। রাজা হাততালি দিতে লাগলেন , দেশের যত বুড়ে হামাগুড়ি দিয়ে আধ-আধ কথা বলতে লাগল। লক্ষ্মী বললেন—আর না, আমি বাঙলার লক্ষ্মী, বাঙলার লোকের এই দশা, আমার আর বাঙলায় থাকা চললো না । লক্ষ্মী চঞ্চল। চঞ্চল হয়ে বাঙলার লক্ষ্মী বাঙলা ছেডে চললেন । আঁধার রাতে কালপেচা ডেকে উঠল। তথন সাত কোটি বাঙালী কেঁদে উঠল। রাজার দোষে লক্ষ্মী আমাদের ছেডে চল লেন বলে রাজার দোষ দিয়ে সকলে কেঁদে উঠল। ইংরেজ রাজা সেই কাদন শুনে বিরক্ত হ’লেন। ই-বেজ রাজার তখন একটা ছোকরা নায়েব ছিল , সে আপন দেশে ছিল কেরাণী, হয়ে এসেছিল নায়েব । নায়েবী পেয়ে সে ধরাকে সর জ্ঞান করত। আলমগির বাদশার তত্তে বসে সে আপনাকে আলমগিরের নীতি ঠাওরা’ত। সে বললে এরা বড় ঘ্যানঘ্যান করছে ; থাকৃ, এদের দু-দল ক’রে দিচ্ছি, এক দিকে যাকৃ মোছলমান, এক দিকে থাকৃ হিন্দু। এরা ভাই-ভাই একঠাই থেকে বড় বিরক্ত করছে ; এদের ভাই-ভাই ঠাই-ঠাই ক’রে দাও, এদের জোট ভেঙ্গে দাও। এই বলে তিনি বাঙালীকে দু-দল ক’রে দিলেন, – এক দিকে গেল হি দু এক দিকে গেল মোছলমান। পূর্ব-উত্তরে গেল মোছলমান, পশ্চিমে-দক্ষিণে থাকুল হিছ। লক্ষ্মী দেখলেন, আমি বাঙলার লক্ষ্মী ; আর আমার নিতান্তই বাঙলায় থাকা চলল না। আমার হিন্দু যেমন, মোছলমান তেমনি। হিন্দু মোছলমান যখন ভাই-ভাই ঠাই-ঠাই হ’ল, তখন আর আমার বাঙলায় থাকা চলল না। ১৩১২ সাল, আশ্বিন মাসের তিরিশে, সোমবার কৃষ্ণপক্ষের তৃতীয়া, সে দিন বড় দুদিন, সেই দিন রাজার হুকুমে বাঙলা ভূ-ভাগ হবে ; দু-ভাগ দেখে বাঙলার লক্ষ্মী বাঙলা ছেড়ে যাবেন । পাচ কোটি বাঙালী আছাড় খেয়ে ভূমে গড়াগড়ি দিয়ে ডাকতে লাগল – মা, তুমি বাঙলার লক্ষ্মী, তুমি বাঙলা ছেড়ে যেয়ে না, আমাদের অপরাধ ক্ষমা কর ; বিদেশী রাজা আমাদের স্বখ দুঃখ বোঝেন না ; তাই ভাই-ভাই ঠাই ঠাই 8 - রামেন্দ্রসুন্দর রচনাসমগ্র করতে চাইলেন ; আমরা ভাই-ভাই ঠাই-ঠাই হব না ; মা, তুমি কৃপা কর ; আমরা এখন থেকে মানুষের মত হব ; আর পুতুলখেলা করব না, কাঞ্চন দিয়ে কাচ কিম্ব না ; পরের দুয়ারে ভিক্ষা করব না ; মা, তুমি আমাদের ঘরে থাক। বাঙলার লক্ষ্মী বাঙালীকে দয়া করলেন। কালীঘাটের মা-কালীতে তিনি আবির্ভাব হলেন। মা কালী নববেশে মন্দিরে দেখা দিলেন। সে দিন আশ্বিনের অমাবস্ত, ঘোর দুর্য্যোগ। ঝমঞ্চম বৃষ্টি, হুহু ক’রে হাওয়া। পঞ্চাশ হাজার বাঙালী মা কালীর কাছে ধন্ন দিয়ে পড়ল। বললে, মা আমাদের রক্ষা কর। বাঙলার লক্ষ্মী যেন বাঙলা ছেড়ে না যান। আমরা আর অবোধের মত ঘরের লক্ষ্মীকে পায়ে ঠেলব না। কাঞ্চন দিয়ে কাচ নেবে। না। ঘরের জিনিষ থাকতে পরের জিনিষ নেবে না। মায়ের মন্দির হতে ম৷ ব’লে উঠলেন—জয় হউক, জয় হউক, ঘরের লক্ষ্মী ঘরে থাকবেন; বাঙলার লক্ষ্মী বাঙলায় থাকৃবেন ; তোমরা প্রতিজ্ঞ ভূলো না ; ঘরের থাকৃতে পরের নিয়ে না ; পরের দুয়ারে ভিক্ষা চেয়ে না ; ভাই-ভাই ঠাই-ঠাই হয়ে না ; তোমাদের “এক দেশ এক ভগবান, এক জাতি এক মনপ্রাণ" হোক, ; লক্ষ্মী তোমাদের অচল হবেন। তিরিশে আশ্বিন, কোজাগরী পূর্ণিমার পর তৃতীয়া। পূর্ণিমার পূজা নিয়ে বাঙালীর লক্ষ্মী ঐ দিন বাঙলা ছাড় ছিলেন। ঐ দিন বাঙলার লক্ষ্মী বাঙলায় অচল হ’লেন। বাঙলার হাট-মাঠ-ঘাট জুড়ে বসলেন। মাঠে মাঠে ধানের ক্ষেতে লক্ষ্মী বিরাজ করতে লাগলেন। ফলে ফুলে দেশ আলো হ’ল । সরোবরে শতদল ফুটে উঠল। তাতে রাজহংস খেলা করতে লাগল। লোকের গোলাভর ধান, গোয়ালভরা গরু, গালভরা হাসি হ’ল। বাঙলার মেয়ের ঐ দিন বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রত নিলে। ঘরে ঘরে সে দিন উকুন জল্ল না । হিন্দু মোছলমান ভাই ভাই কোলাকুলি করলে। হাতে হাতে হলদে স্বতোর রার্থী বাধ লে। ঘট পেতে বঙ্গলক্ষ্মীর কথা শুনলে । যে এই বঙ্গলক্ষ্মীর কথা শোনে, তার ঘরে লক্ষ্মী অচলা হন । বচ্ছর-বচ্ছর ঐ দিনে বাঙালীর মেয়েরা এই ব্ৰত নেবে। বাঙালীর ঘরে ঐ দিন উতুন জলবে না। হাতে হার্তে হলদে স্বতোর রার্থী বাধ বে। বঙ্গলক্ষ্মীর কথ শুনে শাখ বাজিয়ে ঘটে প্রণাম ক’রে বাতাসা-পাটালি প্রসাদ পাবে। ঘরে ঘরে লক্ষ্মী অচলা হবেন। ঘরের লক্ষ্মী ঘরে থাকবেন । বাঙলার লক্ষ্মী বাঙলায় থাকবেন। সবাই বল— আমরা ভাই ভাই একঠাই । ভেদ নাই ভেদ নাই । ভেদ নাই ভেদ নাই ॥ ভাই ভাই একঠাই । ভাই ভাই একঠাই। ভেদ নাই ভেদ নাই । মা লক্ষ্মী, রুপ কর। কাঞ্চন দিয়ে কাচ নেবে না। শাখা থাকতে চুড়ি পরবো না ! ঘন্ধের থাকৃতে পরের নেবে না। পরের দুয়ারে ভিক্ষা করবে না। ভিক্ষার ধন হাতে তুলবো না। মোটা অন্ন ভোজন করবো। মোট বসন অঙ্গে নেবে। মোটা ভূষণ আভরণ করবো। পড়শীকে খাইয়ে নিজে থাব। ভাইকে খাইয়ে পরে খাব। মোট জন্ন অক্ষয় হোকৃ। মোট বস্ত্র অক্ষয় হোকৃ। ঘরের লক্ষ্মী ঘরে থাকুন। স্বাঙলার লক্ষ্মী-বাঙলায় থাকুন। বাঙলার মাটি লোকশিক্ষা বাঙলার জল বাঙালীর পণ, বাঙালীর আশা, যাঙলার বায়ু বাঙলার ফল বাঙালীর কাজ, বাঙালীর ভাষা, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক, - পুণ্য হউক, হে ভগবান। সত্য হউক, হে ভগবান । বাঙলার ঘর, বাঙলার মাঠ, যাঙালীর প্রাণ, বাঙালীর মন, বাঙলার বন, বাঙলার হাট, বাঙালীর ঘরে যত ভাইবোন, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, এক হউক, এক হউক, পূর্ণ হউক, হে ভগবান। এক হউক, হে ভগবান । বন্দে মাতরম্ अश्छेॉन প্রতি বৎসর আশ্বিনে রঙ্গবিভাগের দিনে বঙ্গের গৃহিণীগণ বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রত অনুষ্ঠান করিবেন। সে দিন অরন্ধন। দেবসেবা ও রোগীর ও শিশুর সেবা ব্যতীত অন্য উপলক্ষে গৃহে উকুন জলিবে না। ফলমূল চিড়ামুড়ি অথবা পূর্বদিনের রাধা-ভাত ভোজন চলিবে । পরিবারস্থ নারীগণ যথারীতি ঘট স্থাপন করিয়া ঘটের পাশ্বে উপবেশন করিবেন। বিধবারা ললাটে চন্দন ও সধবারা সিন্দুর লইবেন। হরীতকী বা স্বপারি হাতে লইয়া । বঙ্গলক্ষ্মীর কথা শুনিবেন । কথাশেষে বালকেরা শঙ্খধ্বনি করিলে পর ঘটে প্রণাম করিবেন। প্রণামান্তে বাম হস্তের ( বালকের দক্ষিণ হস্তের ) প্রকোষ্ঠে স্বদেশী কার্পাসের বা রেশমের হরি দ্রারঞ্জিত সূত্রে পরস্পর রার্থী বাধিয়া দিবেন । রাখীবন্ধনের সময় শঙ্খধ্বনি হইবে । তৎপরে পাটালি প্রসাদ গ্রহণ করিবেন। সংবৎসরকাল যথাসাধ্য বিদেশী, বিশেষতঃ বিলাতী দ্রব্য বর্জন করিবেন। সাধাপক্ষে প্রতিদিন গৃহকৰ্ম্ম আরম্ভের পূর্বে লক্ষ্মীর ঘটে মুষ্টিভিক্ষ রাখিবেন এবং মাসান্তে বা বৎসরান্তে উহ কোনরূপ মায়ের কাজে বিনিয়োগ করিবেন। ఇ; $ লোকশিক্ষা মাননীয় ঐযুক্ত গোখলে মহাশয় ভারতবর্ষে লোকশিক্ষা বিস্তারের জন্য ভারত গবর্মেন্টের নিকট যে প্রস্তাব উপস্থিত করিয়াছিলেন, তাহা এখন কিছু দিনের জন্য তাকে তোলা রহিল। ইহাতে দুঃখিত হইব কি না, সেই চিন্তা উপস্থিত হইয়াছে। বড় দেশের বড় নজির দেখাইয়া অক্লেশে প্রতিপন্ন করা যাইতে পারে, আজিকার দিনে সমাজের নিম্নতম স্তর পর্য্যন্ত শিক্ষার বিস্তার না ঘটিলে বিংশ শতাব্দীর জীবন-সমরে টিকিয়া থাকিবার উপায়ান্তর নাই। প্রস্তাবকৰ্ত্ত। স্বয়ং রাশি রাশি নজির উপস্থিত ჯ) রামেঞ্জস্বন্দর রচনাসমগ্র করিয়াছিলেন, পুনরুত্থাপনের প্রয়োজন নাই। শিক্ষা যখন মানুষের গায়ে বল দেয়, অশিক্ষিত যখন দুৰ্ব্বল এবং জীবসমাজে যখন দুৰ্ব্বলের স্থান নাই, তখন শিক্ষাবিস্তারের আবশ্যকতা স্বতঃসিদ্ধ সত্য ; ইহাতে কোনরূপ বাকৃচাতুরীর অবসর নাই। বড় বড় দেশে সকলেই এই স্বতঃসিদ্ধ সত্য মানিয়া লইয়। আপামর সাধারণকে শিক্ষিত করিয়া জীবনযুদ্ধে বলীয়ান করিয়া লইবার চেষ্টা করিয়াছে ও করিতেছে ; রাষ্ট্রভাণ্ডারে অর্থাভাব বা অন্য কোন অভাব এই চেষ্টার প্রতিকূলতা করিতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশে অবস্থাভেদে ব্যবস্থা স্বতন্ত্র হইয়া থাকে। কাজেই গোখলে মহাশয়ের প্রস্তাবের সদগতি দেখিয়া বিস্মিত হইবার সম্যক হেতু নাই। প্রস্তাব পরিত্যক্ত হওয়াতে বিস্ময় নাই বটে, কিন্তু কি জানি, যদি নূতন ব্যবস্থাপক সভা প্রস্তাবটা গ্রহণ করিয়াই বসেন এবং ভারত গবর্মেন্টও তদনুসারে দেশের ছেলেগুলাকে দশটা হইতে পাচটা পৰ্য্যস্ত পাঠশালায় পুরিবার ব্যবস্থা করিয়া ফেলেন, এই আশঙ্কা একটু না ছিল, এমন বলিতে পারি না। বিশেষতঃ দেশের সমুদয় খবরের কাগজ যখন সমস্বরে বলিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন, ভারত জুড়িয়া শিশু-কারাগার স্থাপন ভারতউদ্ধারের পক্ষে নিতান্ত আবখ্যক হইয়া পড়িয়াছে। আমার কৰ্ত্তব্য এই যে, লোকশিক্ষার আবশ্বকতা স্বতঃসিদ্ধ স্বীকার করিয়া লইলে ও পাঠাগারের নামে কারাগার স্থাপনকে অত্যাবশ্বক বলিয়া গ্রহণ করিতে কিঞ্চিৎ সংকোচ হইতে পারে এবং দেশে বৰ্ত্তমান কালে যে নিম্নশিক্ষার প্রণালী বর্তমান আছে, তাহাতে পাঠশালার সহিত কারাগারের ভেদকল্পনায় কিছু অতিরিক্ত বুদ্ধি খরচ করিতে হয়। শিক্ষার উদ্দেশ্রোর মহত্ত্ব সম্বন্ধে প্রকাগু একখানি বহি লেখা যাইতে পারে, অথবা বহি লিখিয়া একট লাইব্রেরি করা যাইতে পারে ; কিন্তু লোকশিক্ষার উদ্দেশু কি, তৎসম্বন্ধে সকলেরই একটা মোটামুটি ধারণ আছে। সে বিষয়ে বাগ বাহুল্য অনাবশ্বক। মচুন্যজন্মলাভ মনুষের পক্ষে দুর্ভাগ্য, কি সৌভাগ্য, সে বিষয়ে মতভেদ থাকিলেও, যখন নিতান্তই বাধ্য হইয়া জন্মগ্রহণ করিতে হইয়াছে, তখন যতদূর পারা যায়, জন্মকে সার্থক করিয়া যাওয়া কৰ্ত্তব্য, এ বিষয়ে বড় মতভেদ নাই। কিরূপে উহা সার্থক হইবে, এ বিষয়ে মতভেদ আছে বটে। সৎপথে থাকিয়া জীবনের কৰ্ত্তব্যগুলা যথাজান ও যথাশক্তি সম্পন্ন করিয়া যাইতে পারিলেই হাজারের মধ্যে ন শ নিরানব্বই জনের পক্ষে যথেষ্ট। যথেষ্ট—কেন না, এই কৰ্ত্তব্য সাধনের পথেও নানা বিঘ্ন, নানা অস্তরায়। তাকিক এইখানে তর্ক তুলিতে পারেন, জীবনের কৰ্ত্তব্য কি, তাহা স্পষ্টভাবে বলিয়৷ দাও ; কেন না তাহাতেও পণ্ডিতে পণ্ডিতে মতভেদ রহিয়াছে। তর্কের মধ্যে এই কৰ্ত্তব্য যেরূপই নিৰ্দ্ধারিত হউক না, সেই কৰ্ত্তব্য যথাঞ্জান ও ਬਖ਼ੀ সাধিত হইলেই জীবন সফল হইল, স্কুল কথা । ইহাতে কেহ তর্ক তুলিবেন না। যথাঞ্জান ও যথাশক্তি' এই দুইটা কথাতেই শিক্ষার সমস্ত নিহিত আছে। শিক্ষার উদ্বেগু হইতেছে জ্ঞানের বর্দ্ধন ও শক্তির বদ্ধন। জ্ঞান ও শক্তি যাহার যতট, তাহার কর্তব্যসাধনে সফলতাও ততটা। বিধাতা সকলকে সমান পরিমাণে জ্ঞান ও শক্তি দিয়া জগতে প্রেরণ করেন নাই। তবে তাহার অনুগ্রহ এই যে, অধিকাংশকে একেবারে বঞ্চিত করেন নাই। তিনি কিছু লোকশিক্ষা * দিয়াছেন, এবং বসিয়া বসিয়া দেখিতেছেন, চেষ্টা দ্বারা আমরা তাহা বাড়াইয়া লই কি না । বস্তুতঃ আমার চেষ্টা দ্বারা জ্ঞান ও শক্তি, উভয়ের পরিমাণ বাড়াইয়া লইতে পারি, এবং সেই উদ্দেশ্যেই পৃথিবীর যাবতীয় পাঠশালা স্থাপিত হইয়াছে। নানাবিধ জ্ঞানের মধ্যে নিজের শক্তি সম্বন্ধে জ্ঞান একটু বিশেষ আবশ্যক। আমাদের মধ্যে যে শক্তি নিগৃঢ় ভাবে সঞ্চিত আছে, তাহা আমরা অনেক সময় জানিতে পারি না ; এই জ্ঞানটাকে ফুটাইয়৷ তোল শিক্ষার একটা বিশেষ উদ্দেশু । ব্যক্তির হিতের জন্য, সমাজের হিতের জন্য .এইরূপ জ্ঞান বৰ্দ্ধনার্থ ও শক্তি বৰ্দ্ধনার্থ শিক্ষার ব্যবস্থা কল্পিত হইয় থাকে। কিন্তু এই কল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা কোথাও সম্পূর্ণ ফল লাভ করিতে পারে নাই। দুঃখের বিষয় যে, কল্পিত শিক্ষাপ্রণালী ব্যবস্থাদোষে অনেক সময় উদ্দেশ্যের প্রতিকূল হইয়া দাড়ায় এবং মহন্তত্বের উৎকর্ষ সাধনে সাহায্য না করিয়া, বরং বিঘ্ন উপস্থিত করে। লেখা, পড়া ও খড়ি পাতা, মানবজাতির শিক্ষাঘটিত ইতিহাসে এই তিনটা অতি অদ্ভূত উদ্ভাবনা । জ্ঞানবৃদ্ধির ও শক্তিবৃদ্ধির এমন উৎকৃষ্ট উপায় আর উদ্ভাবিত হয় নাই। যে লিখিতে পড়িতে ও খড়ি পাতিতে শিখিয়াছে, সে যেন একটা নুতন জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কৰ্ম্মেন্দ্রিয় লাভ করিয়াছে। বিধাত যে কয়ট ইন্দ্রিয় দিয়াছেন, ইহা তাঁহার উপর অতিরিক্ত লাভ । এই কৃত্রিম ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে মনুষ্যের বল কতটা বাড়িয়া গিয়াছে, তাহার ইয়ত্ত করা যায় না। এই কৃত্রিম ইন্দ্রিয়লাভে কাহাকেও বঞ্চিত রাখা সাধ্যপক্ষে উচিত নহে। প্রত্যেক বালক বালিকা যাহাতে এই নূতন সামর্থ্য লাভের সুযোগ পায়, তজ্জন্য সমাজের সমবেত চেষ্টার প্রয়োগ করা কৰ্ত্তব্য। লোকশিক্ষা নূনকল্পে এই ত্ৰিবিধ বিদ্যাতে—লেখা পড় ও খড়ি পাতাতে আবদ্ধ হওয়া উচিত। কিন্তু নূনকল্পে যাহা আবশ্বক, তাহারও স্বব্যবস্থার জন্য এত দিন পর্য্যন্ত কোন দেশে কোন সমাজ বা রাষ্ট্র সমুচিত চেষ্টা করিয়া উঠিতে পারে নাই। অল্প দিন হইল, কয়েকটা দেশে—যেখানে রাষ্ট্রশক্তি অত্যন্ত স্বব্যবস্থ ও বলীয়ান হইয়া উঠিয়াছে—সেইরূপ কয়েকটা দেশে, আপামর সাধারণকে নিম্নশিক্ষালাভে বাধ্য করিবার চেষ্ট হইতেছে ; এবং সেই নজির দেখিয়া আমাদেরও চোখ ফুটিয়াছে, এবং দেশের রাষ্ট্রশক্তি যাহাদের করায়ত্ত, র্তাহাদের দ্বারে নিম্নশিক্ষা বিস্তারের ব্যবহার জন্য দরখাস্ত দাখিল করিতে আমরাও উষ্ঠত হইয়াছি। বলা উচিত, হালের নিম্নশিক্ষা কেবল লেখা পড়া ও খড়ি পাতাতেই আবদ্ধ নাই । এখন উহাকে আর একটু উচ্চ স্তরে তুলিবার চেষ্টা হইয়া থাকে. পাঠশালার ছাত্র লিখিতে পড়িতে শিথিবী মাত্র তাহাকে পুথির সাহায্যে বা শিক্ষকের সাহায্যে খানিকট অতিরিক্ত জ্ঞানদানের চেষ্টা করা হয়। যতটুকু দান করা যায়, জীবনের পথে চলিবার সময় তাহাতে ততটুকুই সাহায্য ঘটবে, এই উদ্দেশ্য। e বাহু জগতের সঙ্গে কারবারের জন্য আপনার শরীটটা সুস্থ ও সবল রাখা অত্যন্ত আবখ্যক ; কাজেই জীবনতত্ত্ব ও জগৎতত্ত্ব সম্বন্ধে দুই দশটা মোট কথা জানিলেই লাভ। সামাজিক জীবকে সমাজের সঙ্গে কারবার করিতে হইবে, অতএব নিজের দেশের সম্বন্ধে, b- রামেজয়ন্দর রচনাসমগ্র সমাজের সম্বন্ধে, রাষ্ট্রের সম্বন্ধে, যাহা কিছু জানা যায়, তাহাই লাভ ; আর নিজের দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের বাহিরে যে অন্য দেশ, অন্য সমাজ ও অন্য রাষ্ট্র বর্তমান আছে, তাহার সম্বন্ধেও যতটা স্পষ্ট ধারণা থাকে, তাহাও লাভ । সেই সঙ্গে সমাজের সহিত মানুষের যে দেনা-পাওনা আছে, অর্থাং কৰ্ম্মশালায় প্রবেশ করিলে সমাজ প্রত্যেকের উপর যতটুকু দাবি রাখিবে, এবং সমাজের নিকট প্রত্যেকে যেটুকু প্রত্যাশা করিবে, সেটুকু কিছু পূৰ্ব্ব হইতে জানিয়া রাখিলেও মন্দ হয় না। লাভ আছে বলিয়াই আজকাল নিম্নশিক্ষার মধ্যে ভূগোল, ইতিহাস, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও শরীরবিজ্ঞান সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ উপদেশ দিবার চেষ্ট হইতেছে ; ইহা উত্তম কথা । আধুনিক নিম্নশিক্ষার প্রণালী এইরূপে নানা শাস্থে কিঞ্চিৎ জ্ঞানদানের চেষ্টা করে ; পরস্তু তার চেয়েও একটু অধিক কাজ করিতে চায়। উপযুক্ত ব্যবস্থার দ্বারা দেশের বালক-বালিকাকে কিছু না কিছু জ্ঞান দেওয়া যাইতে পারে ; কিন্তু লোকাভাব, ধনাভাব, সময়াভাব প্রভৃতি নানা অভাবে এইরূপে উপদিষ্ট জ্ঞানের মাত্রা বড় অধিক হয় না। এমন কি, বালকের যে বিদ্যাটুকু উপার্জন করে, ব্যবহারকালে তাহা প্রয়োগ করিতে পারে না। তাই আজকাল বুদ্ধিমান লোকে বলিতে আরম্ভ করিয়াছেন যে, জ্ঞানদানের চেষ্টা অপেক্ষ জ্ঞানাহরণে ক্ষমত সঞ্চারের চেষ্টা করিলে ভাল হয়। ফলে চাষার ছেলে,—সম্ভবতঃ ভবিষ্যতে যে রাজমন্ত্রী হইবার কোনও অবসর পাইবে না ব। যে কালিদাসের মত কবি বা নিউটনের মত বৈজ্ঞানিক হইবার সুযোগ পাইবে না— যাহাকে লাঙ্গল ধরিয়৷ জমি হইতে ফসল তুলিতে হইবে,—তাহাকে দশটা হইতে পাচটা পর্যন্ত ইস্কুলে পুরিয়া সমগুণশ্রেট ও সস্তৃয় সমুখান, যবক্ষার জান ও রোমরস, ইব্রাহিম লোদি ও জুসপ ফাৰ্ণাণ্ডেজের বিবরণ মুখস্থ করাইবার অদ্ভুত চেষ্টা সম্পূর্ণ নিরর্থক ও ভয়াবহ। ইহাতে তাহার কোন লাভ হয় না ; প্রত্যুত ক্লোমরসের আলোচনায় পিত্তরসে বিকার জন্মে, এবং সভূয় সমুখান ও ইব্রাহিম লোদির বিভীষিকাজাত দুঃস্বপ্নে অনিদ্রারোগ উপস্থিত হয়। শিক্ষার্থী বালকের জ্ঞানবৃদ্ধি শক্তিবৃদ্ধির পরিবত্তে এইরূপ শিক্ষার প্রণালী তাহার নৈসৰ্গিক শক্তিকে সঙ্কুচিত করে, ও জীবনের পথে দক্ষতার পরিবত্তে। শোচনীয় অক্ষমতা আনিয়া দেয়। যদি কোন কৃষকসস্তানে বিস্মার্কের বা কালিদাসের বা নিউটনের অঙ্কুর গজাইবার সম্ভাবনা থাকে, সেই অঙ্কুরকে টিপিয়া মারিবার এমন উৎকৃষ্ট উপায় আর নাই। এইরূপ শিক্ষার বিস্তার অপেক্ষা ইহার কবল হইতে শিক্ষার্থীকে রক্ষণ করাই সামাজিকের পক্ষে কৰ্ত্তব্য বলিয়া মনে করি । প্রকৃতি ঠাকুরাণী, যিনি মানবশিশুকে নিতান্ত অসহায় অবস্থায় সংসারের রণক্ষেত্রে প্রেরণ করিয়াছেন, মানবসমাজ সেই শিশুর শক্তিবৃদ্ধি ও সামর্থ্য লাভ পক্ষে কতটা ব্যবস্থা করিবে না করিবে, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকেন নাই। এ বিষয়ে মানবশিশুর প্রতি র্তাহার মমত্বের পরিচয় নানারূপে পাওয়া যায়। মানবশিশু ভূমিষ্ঠ হইয়াই বাহ জগতের সহিত ঘনিষ্ঠ পরিচয়লাভে স্বভাবের প্রেরণাতেই প্রবৃত্ত হয় ; এবং প্রকাগু বৈজ্ঞানিকের মত পর্য্যবেক্ষণ ও পরীক্ষাকার্য্যে—observation ও experiment কার্য্যে প্রবৃত্ত হয়। দিবানিশি সে ইচ্ছাপূর্বক ও আনন্দের সহিত এই কৰ্ম্মে ব্যাপৃত থাকে ; ইহার জন্য প্রলোভন বা শাসন কিছুমাত্র আবশ্বক হয় না । মাষ্টারের বেতেরও দরকার হয় না ; রাঙা ফিতায় বাধা প্রাইজের বহিও দিতে হয় না। তাহার এই জ্ঞান-তৃষ্ণার লোকশিক্ষা § নিকট অতিবড় পণ্ডিতেও হারি মানেন ; লর্ড কেলবিনকেও জ্ঞানসংগ্রহপ্রবৃত্তিতে এই শিশু বৈজ্ঞানিকের নিকট হারি মানিতে হয়। যাহা আমরা সৰ্ব্বদা চোখের উপর দেখিয়া অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি, তাহার গুরুত্ব উপলব্ধি করিতে পারি না। আমাদের এই বাঙ্গালা দেশে চাষার ছেলে অষ্টম বর্ষে উপনীত হইয়াই যে গুরুর নিকট বিদ্যালাভে প্রেরিত হয়, তাহার মত সদ গুরু জগতে নাই। নিসগ-দেবতা স্বয়ং গুরুগিরিতে প্রবৃত্ত রহিয়াছেন। রাতি পোহানর সঙ্গে যখন পার্থী সব কলরব করিয়া উঠে ও কাননে কুসুমকলি ফুটিয়া উঠে, বাঙ্গালার প্রত্যেক পল্লীর ঘরে ঘরে তখন বালগোপাল রাখালবেশে সাজিয়া গরুর পাল সঙ্গে মাঠে বাহির হইয়া থাকে, এবং এই গোপাললীলার অবসরে সে যাহা অর্জন করে, তাহার সহিত—সদাশয় বাঙ্গাল গবর্মেন্টের স্থাপিত কিণ্ডারগার্টেন প্রণালী-মাজ্জিত গুরুমহাশয়ের পরিচালিত কোন প্রাইমারিঙ্কুলে টেকৃষ্টবুক কমিটির অনুমোদিত গ্রন্থরাশির গলাধঃকরণে যে বিদ্যা অর্জিত হয়, তাহার তুলনা চলে না। খোলা মাঠের মুক্ত হাওয়ার মধ্যে দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি, গাছের ডালে বসিয়া ঝুলনবাজি, এ-ডাল হইতে ও-ডালে লাফ, নদী নালার এ-পার হইতে ও-পারে সাতার, ক্রীড়া কৌতুক, মারামারি, হাস্যকলরব স্মরণে আনিয়া এই বৃদ্ধ লেখকেরও হৃৎপিণ্ডে স্পন্দন উপস্থিত হইতেছে। ইহাতে জড় জগতের সহিত যেরূপ অন্তরঙ্গ পরিচয়লাভ ঘটে, কোন বোধোদয় বা বিজ্ঞানপাঠের সাহায্যে তাহা ঘটিবার সম্ভাবনা মাত্র নাই । আকস্মিক ঝড় বৃষ্টি, বান তুফান হইতে আত্মরক্ষার চেষ্টা— সেই চেষ্টা সফল দেখিয়া যে শক্তিবৃদ্ধি, সম্মানবুদ্ধি, মৰ্য্যদাবৃদ্ধি ঘটে, ভূগোলবিবরণ ও স্বাস্থ্যরক্ষা আগাগোড়া কণ্ঠস্থ করিলেও তাহার তুল্য হয় না। আট বৎসরের বালক —ষাহার উপর কৃষক পরিবারের সর্বস্বধন গাভীগুলির রক্ষা-কাৰ্য্য সমপিত আছে, সেই গাভীগুলিকে খোলা মাঠে ছাড়িয়া দিয়া, গাছের ডগার উপর হইতে তাহাদের গতিবিধির উপর নজর রাখিয়া, তাহাদের গায়ের রং ও গলার ডাকের সহিত পরিচিত হইয়া, ঝড় জল ও বাঘের মুখের উপস্থিত বিপদ হইতে তাহাদিগকে বাচাইয়৷ আনিয়া দিনাস্তে আপন আপন ঘরে ফিরিয়া আসা—এই বৃহৎ কাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিয়া, এই বৃহৎ দায়িত্বের ভার দিনের পর দিন বহন করিয়া, তাহার মনুষ্যত্বে যে বলাধান হয়, তাহার আত্মমর্য্যাদা যেমন ফুটয় উঠে, তাহার কত্ত ব্যবুদ্ধি যেরূপ জাগ্রত হইয়া ওঠে, কোন পাঠশালার কোন শিক্ষা তাহার নিকট পৌছাইতে পারে! বর্তমান কালের প্রাইমারি ইস্কুলে বিদ্যালাভ করিয়া বামন কায়েতের ছেলে, সঙ্গতি থাকিলে ইংরাজি পড়িতে যায় ও শেষ পর্য্যন্ত তাহাদের অনেকের একটা সদগতি হয়। কিন্তু চাষার ছেলে, তাতীর ছেলে, মুদির ছেলে, যাহাদের জন্য মুখ্যতঃ এই লোকশিক্ষা, তাহাদের পরিণামটা একবার চিন্তনীয়। প্রাইমারি ইস্কুল হইতে বাহির হইয়া অর্থাভাবে তাহারা ইংরাজি ইস্কুলে প্রবেশ করিতে পারে না ; এ দিকে চাষার ছেলে লাঙ্গল ধরিতে, উাতীর ছেলে তাতে বসিতে ও মুদির ছেলে তুলদাড়ি হাতে লইতে লজ্জা বোধ করে। এগজামিন পাস করিয়া তাহারা ভদ্রলোকে পরিণত হইয়াছে ; জুতা, জামা, ছাত ব্যবহারে অভ্যস্ত হইয়া “ইতর” কাজে হাত দিতে পারে না। অগত্যা তাহারা উকিল মহাশয়ের মুহুরি বা আদালতের পেয়াদী হইয়া জাম, জুতা, ছাতার কড়ি যোগাইবার জন্য যুষ খায় এবং ঘুষের পয়সায় মদ খাইতে ধরে। যাহাদের এই কৰ্ম্মও না জুটে, সে নিতান্ত অকৰ্ম্ম৷ У о রামেন্দ্রসুন্দর রচনাসমগ্র হইয়া যাত্রার দল করে ও গাজা খায়। অধিকাংশ ছেলের প্রাইমারি ইস্কুলে অজিত বিদ্যার এই পরিণাম । ফলে, শিক্ষার সহিত আমার বিরোধ নাই, শিক্ষাপ্রণালীর সহিত আমার বিরোধ ; শিক্ষা বিডম্বনার সহিত আমার বিরোধ। অন্য দেশের কথা উপস্থিত করিবার দরকার নাই ; আমাদের দেশে বর্তমান কালে যে শিক্ষাবিড়ম্বন বৰ্ত্তমান আছে, তৎসম্বন্ধেই আমি এই প্রসঙ্গ উপস্থিত করিতেছি। যত দিন এই শিক্ষাপ্রণালীর আমূল সংস্করণ ন হইতেছে, তত দিন আমি এই শিক্ষাবিস্তারের প্রস্তাবে কিছু আতঙ্ক অতুভব করিব। কিছুদিন পূর্বে এ দেশের খাটি স্বদেশী.পাঠশালায় নিম্নশিক্ষার যে প্রণালী ছিল, শিশুবোধকের চাণক্যশ্লোকেও দাতা কর্ণের উপাখ্যানেই যাহার সমাপ্তি ঘটিত, শিশুজনভয়াকব গুরুমহাশয় যে শিক্ষাপ্রণালীর পরিচালনে সৰ্ব্বতোমুখ প্রভুত্ব নিয়োগ করিতেন, সেই প্রণালীতে নান| দোষ বর্তমান ছিল, সন্দেহ নাই । কয়েক বৎসর মধ্যে এ দেশেব লোকশিক্ষা একবারে গবর্মেণ্টের অধীন হইয়াছে , বড় বড় মনীষী পণ্ডিতের ধীশক্তি এই বিষয়ে নিযুক্ত রহিয়াছে। কিন্তু এই আধুনিক শিক্ষাপ্রণালীতে যে সকল দোষ প্রবেশ কবিয়াছে, তাহ পূৰ্ব্বেব তুলনায় গুরুতর কি না, তাহ বিচারের সময় আসিয়াছে। এই শিক্ষাপ্রণালী দোষযুক্ত, তাহ গবর্মেন্ট মানিয়া লইয়াছেন , সংস্কারেব ও প্রচুব চেষ্ট৷ হইয়াছে। কিন্তু যে কারণেই হউক, সংস্কারচেষ্টা এখনও কোন ফল লাভ করে নাই। ইনস্পেক্টরের সংখ্য। অতিমাত্রায় বাডিলেও কোন ফলই পাওয়া যায় নাই , বহু স্থলে সংস্কারচেষ্ট হাস্যরসের স্বষ্টি কবিয়াছে মাত্র। যত দিন বর্তমান শিক্ষাপ্রণালী প্রচলিত থাকিবে, তত দিন কোন বালককে এই শিক্ষাগ্রহণে বাধ্য করা উচিত কি না, তাহারই বিচাবের জন্য আমি এই প্রসঙ্গ উপস্থিত করিয়াছি। লোকশিক্ষার বিচার আবশ্যক, ইহা স্বতঃসিদ্ধ সত্য, এ সম্বন্ধে আমার কোনও বক্তব্যই নাই। কিন্তু শিক্ষার নামে অপশিক্ষার প্রশ্রয় দেওয়া উচিত কি না, তাহাই বিচাৰ্য্য। পাঠাগারের নামে কারাগারে বালকগণকে প্রেবণ করিয়া তাহাদের জীবনশক্তির ধ্বংসসাধনে উদ্যোগ উচিত কি না, তাহারই আমি মীমাংসা চাহিতেছি । ( 'প্রবাসী, বৈশাখ ১৩১৭) যন্ত্রবদ্ধ শিক্ষাপ্রণালী আমি নিজে শোণপুরেব মেলা দেখি নাই, কিন্তু আমার কোন মান্য বন্ধুর নিকট মেলার গল্প শুনিয়াছি। মেলার দিন নির্দিষ্ট আছে, কিন্তু কে কবে ঐ দিন নিদিষ্ট করিয়াছে, তৎসম্বন্ধে কোন জনশ্রুতি নাই। মেলার জন্য কেহ কোন বিজ্ঞাপন বাহির করে না, পূৰ্ব্ব হইতে কোন আয়োজন করে না। যথাসময়ে মেলার ক্ষেত্রে লোকজন জিনিষপত্র আসিতে আরম্ভ হয়। বহু কাল হইতে যে জিনিষের ষে স্থান নিদিষ্ট আছে, সেই জিনিষ আসিয়া স্তুপীকৃত হইতে থাকে। স্থানের জন্য কোনরূপ বিবাদ বিসম্বাদ হয় না। হাতীর স্থানে হাতী, ঘোড়ার স্থানে ঘোড়া, গরুর স্থানে গরু—গণ্ডায় গণ্ডায়, দশে দশে বা শতে শতে আসিয়া উপস্থিত হয়। দিগ দিগন্ত হইতে ব্যবসায়ী ক্রেতার আসে, হাজার হাজার টাকার দ্রব্য দিন দিন বিক্রয় হয়, কোনরূপ শান্তিভঙ্গ হয় না, কোনরূপ গণ্ডগোল যন্ত্রবদ্ধ শিক্ষাপ্রণালী Y } হয় না, আবার দিন অতিক্রান্ত হইলে যে যাহার আপন দেশে চলিয়া যায়। মেলা কেহ ডাকে নাই, মেলা ভাঙ্গিতেও কাহারও আদেশ দিতে হয় না। আর কয়েক দিনের মধ্যে বিনা উদ্যোগে, বিনা আয়োজনে, বিনা বিজ্ঞাপনে একটা প্রকাগু ব্যাপার ঘটিয়া যায়। এইরূপ বৎসরের পর বৎসর চলিয়া আসিতেছে,—কত কাল হইতে চলিতেছে, তাহা কেহ বলিতে পারে না । এ হইল এ দেশের পুরাতন নিয়ম। হালের নিয়মে সেবার কলিকাতায় শিল্পমেলা হইয়া গেল, এবার এলাহাবাদে মেলা হইবে । এই মেলার ব্যবস্থা অন্যরূপ । মেলার ছয় মাস আগে হইতে খববের কাগজে লেখালেখি–জেনারল-কমিটি, অধ্যক্ষ কমিটি,— সব কমিটি, চাদ তোলা—দেশ বিদেশের ব্যবসায়ীদিগকে নিমন্ত্রণ—স্থান নিরূপণ—ক্টাচা পাকা ঘর নিৰ্ম্মাণ—স্থানের বিভাগ—কে আধ কাঠা জায়গা পাইবে, কে পৌনে দুই কাঠা জায়গা পাইবে, কে চল্লিশ বর্গফুটে সন্তুষ্ট হইবে, তাহা লইয়া তর্ক বিতর্ক—আলো জল হাওয়ার বন্দোবস্ত-ৰ আগুন নিবাইবার বন্দোবস্ত—অফিসার, কেরাণী, ভলণ্টিয়ার— চেয়ার টেবিল বেঞ্চি–রীম রীম কাগজ—বস্ত দরুনে লাল ফিতা—হাজার টাকার ডাক টিকিট–পাচ হাজার টাকার ছাপাখানার বিল—তদুপরি নাচ, গান, বাজি, কৌতুক, তামাশা—চায়ের সরঞ্জাম—তকমাপরা পিয়ন— খবরের কাগজে বহারম্ভ বিবরণ ও বিজ্ঞাপন—শেষ পর্য্যস্ত উদ্যোগীরা ক্লাস্ত হইয় পড়েন—আয়ের চেয়ে ব্যয়ের মাত্রা অধিক হইয়া যায়—রিপোর্ট ছাপিবার খরচ কুলায় না ও আয় বায়ের হিসাব বাহির হয় না ! ফলে, একটা মেলার মত বৃহৎ আয়োজন সফল করিতে হইলে একটা বৃহৎ যন্ত্রের স্বষ্টি করিতে হয়। সেই বৃহৎ যন্ত্রের ভিতর বিস্তর ছোট বড় চাকা থাকে, যন্ত্র চালাইতে বিস্তর ইন্ধন ব্যয় করিতে হয় । চাকায় চাকায় আটকাইয়া যাইবার আশঙ্কায় প্রচুর তেল খরচ করিতে হয় ; এবং যন্ত্র যখন সবেগে চলিতে থাকে, তাহার ঘর্ষণে সমস্ত দেশে একটা চাঞ্চল্য উপস্থিত হয়, তাহার শব্দে দেশের লোকের নিদ্রাভঙ্গ হয়। বুঝিয়া লইতে হইবে, শব্দের যত বাহুল্য, আয়োজনের তত সাফল্য। দেশের পুরাতন মেলাগুলিতে এত শব্দ নাই, এত ঘর্ষণ নাই, এ রকম একটা প্রকাও যন্ত্ৰ নিৰ্ম্মাণ করিতেও হয় না। নিঃশব্দে ধীরে ধীরে সমুদয় দেশ হইতে উপকরণ সংগ্ৰহ করিয়া উহা যথাকলে আপন হইতে জমাট বাধিয়া উঠে, আবার যথাসময়ে আপনা হইতে লীন হইয়া যায়। অথচ ইহা বলা চলে না, মেলার বা প্রদর্শনীর যে সফলতা, তাহা এইরূপ যন্ত্রবদ্ধ চেষ্টায় অধিক পরিমাণে পাওয়া যাইতেছে, আর যে চেষ্টা যন্ত্রবদ্ধ নহে, তদ্বারা সেরূপ সফলতা পাওয়া যাইতেছে না। এ কালের যন্ত্রচালিত প্রদর্শনীতে চাকচিক্য, সূক্ষ্ম কারুকার্য্য অধিক থাকে, লোক ডাকিয়া আনিবার জন্য নানা প্রলোভন সংগ্ৰহ করিতে হয়, যে যেখানে যত চিকণ জিনিষ তৈয়ার করে, সে তাহ লইয়া উপস্থিত হয় এবং চিকণ জিনিষে যাহাদের চোখ ঝলসায়, তাহারা বহুপরিমাণে প্রদর্শনীক্ষেত্রে আকৃষ্ট হয়। আর সে কালের প্রদর্শনীতে মোটা মোটা হাতী আসে, বড় বড় বলদ আসে, মোটা কম্বল আর সতরঞ্চ আর গালিচার স্তৃপ উঠে—স্থঙ্ক কারুকার্ঘ্যের প্রলোভন বিশেষ একটা থাকে না—বড়লোকে রামেন্দ্রসুন্দর রচনাসমগ্র বা শিক্ষিত লোকে সেখানে কলেরা ব্যাসিলাসের ভয়ে পদার্পণে কুষ্ঠিত হন, আর দূরে রহিয়া দূরবীন লাগাইয়া কৌতুক দেখেন –কিন্তু সমস্ত দেশের বৃহৎ হৃদয়ের সহিত ও রক্তবহ নাড়ীর সহিত এই চেষ্টাহীন উদ্যমের ষে চিরন্তন সংযোগ আছে, এ কালের বহুচেষ্টাজাত বৃহৎ আয়োজনের সহিত সেরূপ সংযোগ কুত্ৰাপি দেখা যায় না। গোড়াতেই একটা পার্থক্য এই যে, এ কালের “বিরাট “ শিল্পপ্রদর্শনী বা কারুকার্য্যপ্রদর্শনী—যাহার পূৰ্ব্বে ন্যাশনাল বা জাতীয় বা ভারতীয়, এইরূপ একটা কিছু বিশেষণ দেওয়া অবশ্যকৰ্ত্তব্য বলিয়। গণ্য হয়—তাহাতে প্রবেশলাভের জন্য অন্ততঃ চারে আন দর্শনী দেওয়া অত্যাবশ্বক । চারি আনার টিকিট খরিদ করিতে যে হতভাগ্য অসমর্থ— জাতীয় প্রদর্শনীর প্রবেশদ্বার তাহার জন্য' অর্গলকুদ্ধ রহিয়াছে এবং তাহার দ্বারদেশে পুলিশ অথবা ভলণ্টিয়ার অৰ্দ্ধচন্দ্ৰ লইয়া উপবিষ্ট থাকে। আর সে কালে মেলার আয়তন যত ক্ষুদ্র হউক, অথবা বিপুল হউক,—বিধাতার নীল চন্দ্রাতপের নিম্নে যাহার —ধনী দরিদ্র, অন্ধ খঞ্জ, সকলেরই জন্য তাহা সৰ্ব্বদা মুক্ত আছে, কোনরূপ প্রাচীরের বেষ্টনী দিয়া তাহাকে ঘেরিয়া রাখিতে কেহ কখনও কল্পনায়ও আনে না। চারি আনা হাতে লইয়া না গেলে যেখানে দরিদ্র ব্যক্তি প্রবেশাধিকার পাইবে না, প্রত্যুত তাহাকে অপমানিত হইয়া ফিরিতে হইবে, সেখানে যেমনই প্রলোভন ও যেমনই আকর্ষণ থাক না কেন, মানব-সমাজের হৃৎপিণ্ড আন্দোলিত হইয়। সেখানে রক্তধারা পাঠায় না বা সেখান হইতে শোণিতধারা বাহির হইয়া সমস্ত সমাজের স্বায়ুকে স্পন্দিত বা পেশীকে পুষ্ট করিতে পারে না। কাজেই আকস্মিক ঢঙ্কানিনাদে ও চক্রঘর্ঘরধ্বনিতে শ্রবণেন্দ্রিয়ে যতই আঘাত লাগুক, স্থায়ী ফল তুলনা করিতে গেলে উভয়ের মধ্যে অনেকটা পার্থক্য আসিয়া দাড়ায়। যন্ত্রযোগে কোন মহৎ কার্য্য সম্পন্ন হয় না বা সম্পন্ন হইতে পারে না, এমন কথ। যদি আমি বলিতে যাই, তাহা হইলে পাঠকের আমাকে গগুমুখের দলে ফেলিবেন। ঐ বিশেষণে বিশিষ্ট হইতে আদৌ ইচ্ছা করি না। যন্ত্র জিনিসটা কৃত্রিম, উহাকে চেষ্টাপূৰ্ব্বক গড়িতে হয় ও অনবরত সচেষ্ট থাকিয়া চালাইতে হয় , চেষ্টার কোন একটা ক্রটি হইলে যন্ত্র বিকল হয়, ভাঙ্গিয়া যায় ; এমন কি বিপদ পর্য্যস্ত টানিয়া আনে। যন্ত্র চালাইতে হইলে বাহির হইতে ব্যয়সাধ্য ইন্ধনের জোগাড় করিতে হয়, সহসা ইন্ধনের অভাব ঘটলে সমুদয় যন্ত্র অচল হইয় পড়ে। এই সমস্ত দোষ থাকিলেও এই বিংশ শতাব্দীতে যন্ত্রের যুগে—যন্ত্রের শক্তি অপলাপ করিয়া দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিতে প্রস্তুত নহি । অন্য দেশের ব্যবস্থা অন্যরূপ, কিন্তু এ দেশে যন্ত্রবদ্ধ উদ্যম সবে আরম্ভ হইয়াছে , আশা করি, এই উদ্যম ক্রমে প্রসার ও পরিপুষ্টি লাভ করিবে এবং এই উদ্যমের ফলে দেশেরও শক্তি-সামর্থ্য ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাইবে । আমার অভিপ্রায় এই যে, এই যন্ত্রমাহায্যে মুগ্ধ হইয়। আমরা যেন এ দেশের প্রাচীন উদ্যম অনুষ্ঠানগুলি,—যাহা কেহ চালায় না, যাহা আপনা হইতে চলে, যাহার পরিচালনের জন্য কেহ এক কড়া কড়ি ব্যয় করে না বা পাচ মিনিট মাথা ঘামায় না—যাহা কোন বীজ হইতে উৎপন্ন, অঙ্কুরিত ও বদ্ধিত হইয়। বৎসরের পর বৎসর ও শতাব্দীর পর শতাব্দী কাল সমান ভাবে চলিতেছে—যাহা বটবৃক্ষের মত বহু পুরুষের পতন উত্থান দেখিবার জঙ্ক ধাড়াইয়া আছে, মাহ চারিদিকে শাখাপল্লব বিস্তার করিয়া রহিয়াছে, যাহার মন্ত্রবদ্ধ শিক্ষাপ্রণালী >WS) শাখাপ্রশাখা হইতে অধোমুখে মূল বিলম্বিত হইয়া দেশের ভূমি হইতে রস আকর্ষণ করিতেছে—সেই পুরাতন উদ্যম অনুষ্ঠানগুলিকে অবজ্ঞা না করি । আর একটা দুষ্টান্ত দিলে আমার বক্তব্য স্পষ্ট হইবে। সম্প্রতি এ দেশে শিল্প শিক্ষা দিবার জন্য একটা সচেষ্ট আয়োজন আরব্ধ হইয়াছে। বিদেশের সহিত প্রতিযোগিতায় আমাদের প্রাচীন শিল্পগুলি ক্রমেই উৎসন্ন যাইতেছে, কাজেই এখন নূতন প্রণালীতে শিল্প-শিক্ষার ব্যবস্থা নিতান্ত আবশ্বক হইয়া পড়িয়াছে। বিদেশের সহিত প্রতিযোগিতা করিতে হইলে বিদেশের শিক্ষাপ্রণালীও অবলম্বন করিতে হইবে । বিদেশে,-অর্থাৎ বিলাতে, জৰ্ম্মনিতে, আমেরিকায় শিল্প-শিক্ষার জন্য চেষ্টা যন্ত্রবদ্ধ হইয়াছে। সে । আবার কি প্রকার যন্ত্র! আধুনিক কালের উপযোগী একটা শিল্প-বিদ্যালয় স্থাপন করিতে হইলে আরম্ভেই তু ক্রোর, দশ ক্রোর টাকা লইয়া বসিতে হয়। মার্কিন দেশের এক একজন কোটিপতি বা অযুতপতি এইরূপ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকল্পে জীবনে উপাজিত সৰ্ব্বস্ব দান করিয়া ফেলিতেছেন। প্রথমেই বড় বড় অট্টালিকা গাঁথিতে হয়—তার মধ্যে বৃহৎ শিল্পাগার, বৃহৎ পরীক্ষাগার, বৃহৎ যন্ত্রাগার,—লাইব্রেরি, লেবরেটরি কারখানা । বড় বড় ডাইনামো, বড় বড় মোটর—বড় বড় এঞ্জিন—উনান, চিমনি, ষ্টীম হামার -সর্বত্র বিশাল ও বিপুল সরঞ্জাম,—বড় বড় অধ্যাপক ও শিক্ষক, কেহ শিক্ষাগারে উপদেশ দেন, কেহ, পরীক্ষাগারে পরীক্ষাকৰ্ম্মে সাহায্য করেন, কেহ কারখানা-ঘরে হাতেকলমে কাজ শেখান। এখানে পর্য্যবেক্ষণ, ওখানে পরীক্ষা, ওখানে লেকচার—সর্বত্র একটা হৈ-হৈ ব্যাপার। অথচ সৰ্ব্বত্র শুঙ্খলার সহিত সকল কাজ সম্পন্ন হইয়। যাইতেছে এবং যাহারা শিক্ষাগার হইতে বাহির হইয়া আসিতেছে, তাহার। সেই উপাঞ্জিত অভিজ্ঞতার ফলে ধরাপুষ্ঠে দম্ভের সহিত পা ফেলিয়া বেড়াইতেছে । বিদেশের এই প্রকাণ্ড উদ্যমের সহিত প্রতিযোগিতা করিতে হইলে ঐরুপই প্রকাও উদ্যম আবশ্বক—ঐরূপ প্রকাণ্ড শিক্ষণযন্ত্র স্থাপন করা আবশ্যক। সচেষ্ট উদ্যমের সহিত লড়াই করিতে হইলে সচেষ্ট উদ্যমই আবশ্যক—এখানে ধীরভাবে বসিয়া, সমাজের ধীর গতির উপর নির্ভর করিয়া থাকিলে চলিবে না । দেশের যে সকল পুরাতন আয়োজন আছে তাহাতে কুলাইবে না। এই চিন্তা আমাদের মনে জাগিয়াছে, কিন্তু অর্থাভাবে, লোকাভাবে, সামর্থ্যাভাবে আমরা যে আয়োজন আরম্ভ করিয়াছি, তাহ সমুদ্রের তুলনায় গোপদ এখানে সেখানে छूझे চারিট শিল্প-বিদ্যালয় স্থাপিত হইতেছে বটে, কিন্তু স্থানাভাবে কারখানা হইতেছে না, অর্থাভাবে যন্ত্র আসিতেছে না, লোকাভাবে শিক্ষক জুটিতেছে না। পরস্তু কি উদ্দেশ্যে বিদ্যালয় স্থাপিত হইয়াছে, কোন বিদ্যা শিথাইতে হষ্টবে, কোন বিদ্যায় কি প্রয়োজন সাধিত হইবে, কোন বিদ্যা শিখিয়া কি কাজে লাগাইতে হইবে, এই সকল বিষয়ে শিক্ষাযন্ত্র-চালকগণের কোনরূপ স্পষ্ট ধারণা নাই। ফলে শিক্ষা-যন্ত্রগুলি যদি কিছুদিন ঘর্ঘর শব্দে চলিয়, শেষে তৈলাভাবে মরিচ ধরিয়া অচল হয়, এবং যাহার শিক্ষা পাইয়া বাহির হইতেছেন, তাহারা নিষ্কলা বিদ্যার বোঝা কাধে করিয়া অশ্রুজলে ধরাতল অভিষিক্ত করিতে থাকেন, তাহা হইলে বিস্ময়ের কারণ হইবে না। আমাদের যেরূপ সামর্থ্য, দেশের যেরূপ অবস্থা, তাহাতে এই সকল উদ্যমগুলি যদি ব্যর্থ হইয়া পড়ে, তাহাতে ব্যর্থ উদ্যমের নৈরাপ্ত আসিয়া দেশে আবার জড়তা আনিবে কি না, তাহ >8 রামেন্দ্রসুন্দর রচনাসমগ্র চিন্তিবার বিষয় । দেশের শিল্প-শিক্ষার যে পুরাতন প্রণালী ছিল, তাহা আধুনিক পাশ্চাত্ত্য প্রণালীর মত যন্ত্রবদ্ধ ছিল না, এবং তাহার সহিত প্রতিযোগিতাতেও সমর্থ ছিল না বটে ; কিন্তু তাহার কতকগুলি গুণ ছিল, তাহা সে কালের সমাজের পক্ষে উপযোগী ছিল। প্রাচীন কালে আমাদের দেশে লোকের যে যে অভাব ছিল, সে কালের শিক্ষাপ্রণালী সেই সেই অভাব মোচনের উপযোগী ছিল । এবং সেই শিক্ষা-প্রণালী এমন নিঃশব্দে কাজ করিত যে, উহার অস্তিত্ব পর্য্যন্ত হয় ত সকলে জানিতে পারিত না । হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথার অন্য যতই দোষ থাকুক, উহ। দেশ ব্যাপিয়া শিল্পশিক্ষার অতি সহজ উপায় উদ্ভাবন করিয়াছিল । এবং সেই উপায় এই দেশের অবস্থার উপযোগী। অন্যান্য দেশের বৃহদ্ব্যাপার ছাড়িয়া এ দেশে ক্ষুদ্রাকারে শিল্পবিদ্যার যে সকল ব্যবস্থা হইতেছে, তাহার সহিত তুলনা করিলেই বুঝা যাইবে। যে বিদ্যালয়ে আধুনিক প্রণালীতে শিল্প-শিক্ষা দেওয়া হয়, সেখানে নানারূপ শিক্ষাসরঞ্জাম আবশ্যক হয়,—ব্যয় করিয়া সেই সকল সরঞ্জামের সংগ্ৰহ করিতে হয়—মূল্য দিয়া বিদেশ হইতে যন্ত্রাদি কিনিতে হয়, আনিতে হয়, চালাইতে হয় ; ইহা ব্যয়সাধ্য ব্যাপার । তার পর বেতন দিয়া উপযুক্ত শিক্ষক নিযুক্ত করিতে হয়—উচ্চ বেতনে পরিচালক ও পরিদর্শক নিযুক্ত করিতে হয়। এই সকল কারণে এই শিক্ষাও ব্যয়সাধ্য হইয় পড়ে। যাহার কিছু সঙ্গতি আছে, সে-ই এই বিদ্যামন্দিরে প্রবেশ করিতে পারে ; দরিদ্রের পক্ষে অর্থাং আমাদের দেশের সাড়ে পোনের আনার পক্ষে ইহার দ্বার রুদ্ধ। যাহারা শিক্ষা পাইয়া বাহিরে আসিয়া জীবিক অর্জনে প্রবৃত্ত হইবেন, তাহাদের অবস্থাও সঙ্কটাপন্ন । স্বাধীন ভাবে শিল্পীর জীবন আরম্ভ করিতে হইলে যে সকল যন্ত্র সরঞ্জাম সংগ্ৰহ করিতে হইবে, যে কারখান। প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে, যে মুটে মজুর নিযুক্ত করিতে হইবে, তার জন্যও প্রচুর মূলধন আবশ্যক। বিশেষ সঙ্গতি না থাকিলে কোন ব্যক্তি শিক্ষালাভ করিয়াও, অজ্জিত বিদ্যা ফলাইতে পারিবেন না। কাজেই দরিদ্রের পক্ষে এই শিক্ষা নিস্ফল হইবার আশঙ্কা আছে। এ দেশের প্রাচীন প্রণালীতে জাতিভেদে ব্যবসায়ভেদের ব্যবস্থা থাকায় শিল্পশিক্ষার বন্দোবস্ত অতি সহজ হইয়া আছে। পিতা যে শিল্পে অভিজ্ঞ, পুত্রকেও সেই শিল্প শিখিতে হয়। তাহার নিজের ঘরই তাহার বিদ্যালয়, নিজের বাপ খুড়াই তাহার শিক্ষক। ঘরের ভাত খাইয়। সে বিদ্যালাভ করে—হোটেল ভাড়া দিতে হয় না, বোডিং খরচ দিতে হয় না। পয়সা খরচ করিয়া যন্ত্র কিনিতে হয় না, এক পয়সা বেতন পর্য্যন্ত দিতে হয় না। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে যখন তাহার সুবিধ, যখন বাপ খুড়ার সুবিধা, তখনই শিক্ষালাভ করিতে পায় এবং বাপ খুড়ার যতটুকু বিদ্যা আছে, তাহ যথাকালে দখল করিয়া লয়। শিক্ষা সমাপ্তির পর নিজে যখন স্বাধীন জীবনযাত্রা আরম্ভ করে, তখনও মূলধন সংগ্ৰহ করিতে হয় না ; হাতিয়ার সরঞ্জাম যাহা কিছু দরকারী, পিতার নিকট উত্তরাধিকারস্থত্রে এক কড়া মূল্য না দিয়া পাইয়া থাকে। সকলের উপর দ্রষ্টব্য এই, শিক্ষকের উপর পরিদর্শক রাখিতে হয় না—শিক্ষক এইখানে ছাত্রকে ফাকি দেয় না—শিক্ষকের যতটুকু বিষ্ঠা আছে, তাহার এক ক্রান্তি সে হাতে রাখে নী—ষোল আন ধত্বের ও শ্রদ্ধার সহিত তাহ শিক্ষার্থীকে অর্পণ করে ; কেন না, এখানে শিক্ষকের ও শিক্ষার্থীর যন্ত্রবদ্ধ শিক্ষাপ্রণালী e >(社 •স্বার্থ একেবারে অভিন্ন । - বহু সহস্ৰ বৎসর ধরিয়া সমস্ত দেশের মধ্যে এই শিক্ষাপ্রণালী চলিয়া আসিতেছে, এবং এই প্রণালীর কল্যাণে এ পর্য্যন্ত দেশের যাবতীয় অভাব পূর্ণ হইয়া আসিয়াছে। আধুনিক পাশ্চাত্য প্রণালীর সহিত ইহা প্রতিযোগিতা করিতে পারে না ও পরিবে না, তাহ৷ সত্য কথা ; কিন্তু তাই বলিয়া এই প্রণালীকে অবজ্ঞা করিলে চলিবে না। সে দিন পর্য্যন্ত এই শিক্ষাপ্রণালী বিশ কোটি লোকের বক্স যোগাইয়াছে ; এখন পর্যন্ত এই প্রণালীই ত্রিশ কোটি লোকের অন্ন যোগাইতেছে। যাহারা হিন্দু সমাজের জাতিভেদ উঠাইবার জন্য কোমর বাধিয়াছেন, তাহাদিগকে এই কথাটা বিবেচনা করিতে অনুরোধ করি। বিদেশের প্রতিযোগিতায় তাতীর ব্যবসায় গিয়াছে বা যাইতেছে ; কিন্তু কামার, কুমার, ছুতারের ব্যবসায় আজিও উঠে নাই। কামার, কুমার, ছুতারের বিদ্যা এ-কালের প্রণালীমতে অথচ সহজে ও সস্তায় শিখাইবার ব্যবস্থা যত দিন না হইতেছে, তত দিন জাতিভেদের সহিত লড়াই করিলে ফল পাওয়া যাইবে কি ? অথচ দেশের মধ্যে এই যে পুরাতন শিক্ষাপ্রণালী বর্তমান আছে, ইহাকে যন্ত্রবদ্ধ প্রণালী বলা যায় না। এই দেশজোড় শিল্পশিক্ষার উন্নতির জন্য কোথাও কোন একটা সমিতি নাই, কেহ ইহার আয়-ব্যয়ের হিসাব করে না, কেহ ইহার বার্ষিক রিপোর্ট প্রস্তুত করে না, ইহার সম্পর্কে ডাকঘরের এক পয়সা আয় বৃদ্ধি হয় না ; ছাপাখানা হইতে কেহ একখানা বিল পাঠায় না। কোন ব্যক্তি কোন তারিখে এই শিক্ষাপ্রণালীর উদ্ভাবন করিয়াছে, কোন প্রত্নতত্ত্ববিৎ তাহ নির্দেশ করিতে পারেন না, অথচ এই প্রণালী সমস্ত দেশ জুড়িয়া আপন হইতে চলিয়াছে। সমস্ত ভারতবর্ষের জমিতে যেমন যথাসময়ে ঘাস গজায়, কেহ তাহার জন্য পূৰ্ব্ব হইতে আয়োজন করে না, সেইরূপ ভারতবর্ষ জুড়িয়া কামার, কুমার, ছুতারের যথাকালে উৎপত্তি হইতেছে। কস্মিন কালে তাহার অভাব বোধ হয় নাই। ইহাকে যন্ত্র বলা চলে না। যন্ত্রের মধ্যে অতি নিষ্কৃষ্ট যন্ত্র কলুর ঘানিও ঘূরিবার সময় কট, কট, ধ্বনি করে ; কিন্তু এই শিক্ষাপ্রণালী নিঃশব্দে চলিয়া আসিতেছে। আর একটা গুরু গম্ভীর দৃষ্টান্ত দিয়া প্রবন্ধ শেষ করিব। এবার শিল্পশিক্ষার দৃষ্টান্ত নহে ; এবার খাটি বিদ্যাশিক্ষার দৃষ্টান্ত ; যে বিদ্যার সঙ্গে বিশ্বকৰ্ম্মার সম্পর্ক আছে কি না, জানি না ; কিন্তু যাহার সহিত মা সরস্বতীর সম্পর্ক আছে। আধুনিক প্রণালী-সম্মত বিদ্যাশিক্ষার যন্ত্রের নাম ইস্কুল বা কালেজ ; এখন গ্রামে গ্রামে ইস্কুল ও নগরে নগরে কালেজ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে ও হইতেছে। এক একটি ইস্কুল বা কালেজ এক একটি যন্ত্র। অথবা সমুদয় ইস্কুলগুলি বা কালেজগুলি লইয়া একটা “বিরাট যন্ত্র”—যে যন্ত্র চালাইতেছেন বিশ্ববিদ্যালয় বা স্বয়ং গবর্মেন্ট । এক একটা ইস্কুল কালেজকে ঐ বিরাট যন্ত্রের এক একখানা চাকা মনে করিলেও করিতে পারি। হাল আইনে একটা নৃতন কলেজ খুলিতে হইলেই উদ্যোগকারীকে কিছু অর্থ—যাহার পরিমাণ নিতান্ত অল্প নহে–লইয়া বসিতে হয়। একখানা পাকা বাড়ী চাই—তাহার এতগুলা কুঠরি দরকার—প্রত্যেক কুঠরি দীর্ঘ এত, প্রস্থ এত, খাড়াই এত—তাহাতে প্রত্যেক ছাত্রের জন্য এত ঘনফুট হাওয়া আবশ্বক ఫ్ట్, চাই । SSಘೀ" >ぐり রামেক্সমুন্দর রচনাসমগ্র টানাপাখা, ব্ল্যাকবোর্ড ইত্যাদি সরঞ্জাম আবশ্বক—তার পর অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, শিক্ষক— ইহার বেতন এত টাকা, ইনি হপ্তায় এত ঘন্টার অধিক কাজ করিবেন না—ইনি এত ঘণ্টা পড়াইবেন, এতগুলি কাগজ দেখিবেন, এতক্ষণ বিশ্রাম করিবেন—সমস্ত কাটায় কাটায় বন্দোবস্ত। তার পর কেরানী, উপকেরানী, দপ্তরী, দরোয়ান, পিয়ন ইত্যাদি। তদুপরি লাইব্রেরি, লেবরেটারি ইত্যাদি ত আছেই। সকল বিষয়েই কর্তৃপক্ষ খুঁটিনাটি আইন বাধিয়া দিয়াছেন। বিদ্যালয় ত হইল—তার পর বিদ্যালয় পরিচালন করিবে কে ? যিনি উদ্যোগকারী, যিনি মূলধনী—যিনি ক্ষতির সম্ভাবনা সত্ত্বেও বিদ্যালয় খুলিতে বসিয়াছেন, তিনি বিদ্যালয়কে বিদ্যাবিপণিতে পরিণত করিয়া ফেলিবেন, এই আশঙ্কা থাকে , তাহার মূলধন হইতে চক্রবৃদ্ধির নিয়মানুসারে কুসীদ আদায় করিয়া লইবেন, এই আশঙ্কা থাকে। তাই কর্তৃপক্ষ বিদ্যালয়ের পরিচালনার নিরঙ্কুশ প্রভুত্ব র্তাহার উপর দিতে চাহেন ন!—পরিচালনার জন্য নিরপেক্ষ লোক লইয়া কমিটি নিযুক্ত হয়। কমিটি মাসে মাসে অধিষ্ঠান করেন, খরচপত্রের ব্যবস্থা করেন, শিক্ষক হইতে পিয়ন পর্যন্ত বাহাল বরতরফ করেন, কোন শিক্ষক মায়ের শ্রাদ্ধে তিন দিনের উপর পাচ দিন কামাই করিলে তাহার মাহিনী কাটেন, কোন শিক্ষক ক্লাসে গিয়া কয় মিনিট ঘুমাইয়া থাকেন, তাহার আলোচনা করেন—এব’ কমিটির যিনি সেক্রেটারি, তিনি গুরুগম্ভীর ভাবে এই সকল বিরাট মীমাংস খাতার মধ্যে লিপিবদ্ধ করেন। এবং সেক্রেটারি কোন বানান ভুল করিলেন কি না, তাহ। দেখিয়া সভাপতি সেই লিপি মঞ্জুর করেন । বিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে দবোয়ানকে অতিক্রম করিয়া আপিস,—সেখানে কেরানীবৰ্গে বেষ্টিত হইয়া আপিসের অধ্যক্ষ অধিষ্ঠিত। বিদ্যালাভার্থী ছাত্রগণ সভয়ে, স্পন্দিতহৃদয়ে, আপিস-ঘরের দুয়ারে, বারাণ্ডায় কাতার দিয়া দণ্ডায়মান এবং প্রবেশ করি, কি না করি, এই সন্দেহদোলায় দোতুল্যমান। কেন না, আপিসের যিনি কত্তর্ণ, তাহার মুখ গম্ভীর ; র্যাহারা তাহার অধীন, তাহাদের মুখ আরও গম্ভীর—এবং সকলেরই মুণ্ড সম্মুখে রক্ষিত খাতাব প্রতি বদ্ধদৃষ্টি। খাতার কাছে খাতা, খাতার উপরে খাত, মেঝের উপর, টেবিলের উপর, ছাদের নীচে, সর্বত্রই খাত,—সমচতুভূজ, সমচতুরস্ৰ, দীর্ঘচতুরস্র, বহুবিধ খাত। এহেন খাতা-প্রাকাররক্ষিত দুর্গমধ্যে প্রবেশ লাভ করিয়া দুইটা মিষ্টবাক্য উপহার না পাইয়। যদি কোন ছাত্র প্রবেশিকা জমা দিয়া খাতার মধ্যে নাম লেখাইয়া নিস্ক্রান্ত হইতে পারে, তাহার ছাত্র-জীবন ধন্য। প্রবেশাস্তে বিদ্যালাভের ব্যবস্থা । কর্তৃপক্ষ নির্দেশ করিয়া দিয়াছেন, কোনশাস্ত্রের কতটুকু অধ্যয়ন করিতে হইবে, কোন, শাস্ত্র সম্পর্কে কয়খানি বহি পড়িতে হইবে, কোন, বহির কোন পাতাটা বর্জন করিতে হইবে, কোন শাস্ত্র সম্পর্কে কত ঘণ্ট লেকচার হইবে, ঘণ্টার অর্ধ ষাট মিনিট, কি ছত্রিশ মিনিট, কতগুলি লেকৃচার শুনিতে হইবে এবং কত গুলি ফাকি দেওয়া চলিবে-লেকচার শুনিতে শুনিতে কত মিনিট কাল ঘুমাইয়া পড়িলে সেই শ্রবণক্রিয় অগ্রাহ হইবে ইত্যাদি—অতএব এ সকল বিষয়ে শিক্ষক বা শিক্ষার্থী, কাহারও কোন ভূশ্চিস্তার প্রয়োজন নাই। কিন্তু লেকচার অনেক সময়ে এ কানে ঢুকিয়া ওকান দিয়া বাহির হইয়া যায় এবং কোন শিক্ষকই ইহা নিবারণ করিতে পারেন না ; কাজেই মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীকে পরখ করিয়া বাজাইয়া লওয়া দরকার হয় ; সপ্তাহে