বিষয়বস্তুতে চলুন

বড়বাড়ী (১৯২৬)/৬

উইকিসংকলন থেকে

(পৃ. ২৬-২৮)
◄  
  ►

 সুরেন্দ্রনাথ পূর্ব্বে যখন ইংরাজী স্কুলের নিম্ন শ্রেণীতে পড়িতেন, তখন মহেন্দ্র নামে একটি বালকের সহিত তাঁহার অতিশয় বন্ধুত্ব হয়। মহেন্দ্র সুরেন্দ্রকে বড় ভালবাসিতেন। উভয়ে এক স্কুলে পড়িতেন এবং মহেন্দ্র সুরেন্দ্রের তিন শ্রেণী উপরে পড়িতেন। উভয়ে অধিকাংশ সময়েই একত্র থাকিতেন। মহেন্দ্রের যে গ্রামে বাড়ী, সুরেন্দ্র সেই গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়ীতে থাকিয়া স্কুলে পড়িতেন, কারণ সুরেন্দ্রের নিজ গ্রামে ভাল স্কুল ছিল না এবং কলিকাতায় যাইতে তাঁহার ইচ্ছা ছিল না। মহেন্দ্র দরিদ্রের সন্তান, সংসারে মা ব্যতীত তাঁহার আর কেহই ছিল না। মহেন্দ্রের মা অতি কষ্টে তাঁহাকে ইংরাজী স্কুলে পড়াইতেন। এই সময়ই মহেন্দ্রের সহিত সুরেন্দ্রের পরিচয় হয়। কিছুদিন পরে মহেন্দ্র প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ হইয়া ১৫ টাকা বৃত্তি পাইলেন এবং মাতার নিকট হইতে বিদায় লইয়া কলিকাতায় এল্-এ পড়িতে গেলেন। সুরেন্দ্র তাহার পরেও কিছুদিন সেই গাঁয়েই ছিলেন, কিন্তু মহেন্দ্রকে ছাড়িয়া আর অনেক দিন থাকিতে পারিলেন না, সুতরাং তিনিও মাস কয়েকের মধ্যেই কলিকাতায় পড়িতে গেলেন। সেখানে তাঁহাদের নিজেদেরই বাসা ছিল। কিন্তু মহেন্দ্র অপর একস্থানে থাকিয়া পড়িতেন।

 এই দুটী বন্ধুর এ প্রকার অভিন্ন ভাব অনতিকাল মধ্যেই কার্ত্তিক এবং তারকের কর্ণগোচর হইলে তাঁহারা অতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন, এমন কি মহেন্দ্রকে তাঁহাদের নিজ কনিষ্ঠ ভ্রাতার ন্যায় ভালবাসিতে লাগিলেন। সুরেন্দ্রের বড় ইচ্ছা যে মহেন্দ্র তাঁহার সঙ্গে একত্র থাকেন, কিন্তু নানা কারণে মহেন্দ্র এল-এ পরীক্ষা পর্য্যন্ত তাহা করিতে পারেন নাই। বিশেষ মহেন্দ্র ১৫ টাকা বৃত্তি পাইতেন, তাহাতেই তাঁহার সমস্ত ব্যয় নির্ব্বাহ হইত। কিন্তু এল-এ পরীক্ষায় অকৃতকার্য্য হওয়ায় কলিকাতায় থাকিয়া অধ্যয়ন করিবার আর যখন তাঁহার কোন উপায় রহিল না, তখন কার্ত্তিক তাঁহাকে সযত্নে নিজেদের বাসায় আহ্বান করিয়া, লইলেন, এবং তাঁহার সমস্ত ভার গ্রহণ করিলেন। এইরূপে দুই বন্ধু পুনরায় একত্র মিলিত হইলেন। মহেন্দ্র তখনও বিবাহ করেন নাই; বিবাহের কথা উঠিলেই তিনি নানা প্রকার যুক্তি দিয়া বাধা দিতেন। শ্বশুরবাড়ী ছিল না, তাই তিনি কলেজের অবকাশে অর্দ্ধেক সময় নিজের বাটীতে এবং অর্দ্ধেক সময় সুরেন্দ্রের মনোহরপুরের বাড়ীতে গিয়া অতিবাহিত করিতেন। সুরেন্দ্রের বাড়ীর স্ত্রীলোকেরা পর্য্যন্তও মহেন্দ্রকে বড় স্নেহ করিতেন। সুপ্রভা মহেন্দ্রকে নিজের সহোদরের ন্যায় জ্ঞান করিতেন। শ্রাবণ মাসে স্বর্ণের অসুখের সময়ে যখন সুরেন্দ্র বাড়ীতে আসেন, তখন মহেন্দ্রও আসিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিয়াছিলেন; কিন্তু সে সময়ে তাঁহার শরীর অসুস্থ থাকায় সুরেন্দ্র তাঁহাকে আসিতে দেন নাই। বাড়ী আসিয়া সুরেন্দ্র প্রায় প্রতিদিনই তাঁহাকে স্বর্ণের খবর লিখিতেন।