বিষয়বস্তুতে চলুন

বড়বাড়ী (১৯২৬)/৭

(পৃ. ২৮-৩৩)
◄  ৬
৮  ►
​

৭

 তাহার পর দুই বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। এই দুই বৎসরের মধ্যে এমন কোন ঘটনা ঘটে নাই, যাহা এস্থলে উল্লেখ করা যাইতে পারে। সংসারের তাঁহার একমাত্র বন্ধন ছিলেন মাতা। সেই মা যখন একদিন হঠাৎ পরলোকে চলিয়া গেলেন, তখন মহেন্দ্র বি-এ পড়া ছাড়িয়া দিয়া একেবারে সুরেন্দ্রের বাটী মনোহরপুরে আসিয়া বাস করিলেন। মনে মনে বলিলেন, আর পড়িয়া কি হইবে। যাঁহার সুখস্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি করিবার জন্য পাশ করা, তিনিই যখন নাই, তখন থাকুক এইখানে সমস্ত বিদ্যালয়ের বোঝা। আমি আর বৃথা এ ভার বহিয়া বেড়াইব না। অথচ জীবিকার জন্য উপার্জ্জনেরও আবশ্যকতা ছিল না; এই কারণে তিনি মিত্রদের বাটীতেই রহিলেন। সুপ্রভা তাঁহাকে ভ্রাতার অধিক ভালবাসিতেন, তাই কোনমতেই তাহাকে অধিক দিন আলস্যে দিন কাটাইতে দিলেন না। তিনি বাটীর উপরে একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করিয়া দিয়া তাহার সমস্ত ভার চাপাইয়া দিলেন মহেন্দ্রের উপর। তবে নিজেও একেবারে ভারশূন্য রহিলেন না। দ্বিপ্রহরের অবকাশে রঙ্গিণীকে সঙ্গে লইয়া মেয়েদের সূচের কাজ ও গৃহস্থালীর কাজ শিখান, তাহাদিগকে পরীক্ষা করা, যোগ্যতা ​অনুসারে পুরস্কার দেওয়া, এই সমস্ত কর্ত্তব্য সম্পন্ন করিতে লাগিলেন। তা ছাড়া সুপ্রভা বালিকাদিগকে মধ্যে মধ্যে টাকা দিতেন এবং সে টাকা তাহারা কিসে ব্যয় করে তাহার সন্ধান লইতেন। রঙ্গিণীও দিদির সমস্ত কার্য্যেই যোগ দিতেন। কার্ত্তিক ছোট বধূদ্বয়ের এই সমস্ত কার্য্য দেখিয়া আনন্দিত হইতেন এবং তাঁহাদের কার্য্যে যথোচিত উৎসাহ দিতেন।

 বাটীর যে অংশে স্কুল হইত, তাহার উপরের ঘরেই মহেন্দ্র থাকিতেন। এই কামরা বাটীর মধ্যের দিকে, কিন্তু বাহিরেরও অতি নিকটে। সুপ্রভা এই ঘর মহেন্দ্রের জন্য নিজে সজ্জিত করিয়া দিয়াছিলেন। এই ঘরে মহেন্দ্র এবং তারক অধিক সময় একত্র কাটাইতেন। সুরেন্দ্র যখন কলিকাতা হইতে বাটীতে আসিতেন তখন তিনিও এই ঘরেই থাকিতেন। তারক এবং মহেন্দ্র সমবয়স্ক, সুরেন তাহাদের অপেক্ষা দেড় বৎসরের ছোট, কাজেই উভয়ের সহিতই মহেন্দ্রের বিশেষ প্রণয় ছিল। মহেন্দ্র আর নিজ গ্রামে যাইতেন না, মনোহরপুরে মিত্র-পরিবারভুক্ত হইয়াই জীবনযাপন করিতে লাগিলেন।

 কিন্তু এ ভাবে অধিক দিন কাটিল না। পৌষ মাসে হঠাৎ এক দিন মহেন্দ্র জ্বরে পড়িলেন। প্রথম দুই তিন দিন সকলেই জ্বর সামান্য মনে করিয়াছিলেন, কিন্তু পরে ক্রমেই জ্বর বৃদ্ধি হইতে লাগিল এবং মহেন্দ্র দুর্ব্বল হইয়া পড়িতে লাগিলেন। তখন কার্ত্তিক এবং তারক উভয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিলেন। সুপ্রভা দিবারাত্রি রোগীর কাছে বসিয়া থাকিতেন; এক দণ্ডের জন্য তাঁহার ​কাছ ছাড়া হইতেন না। রঙ্গিণী কি করিবে, একবার বাটীর মধ্যে যায়, পরক্ষণেই মহেন্দ্রের পার্শ্বে আসিয়া নীরবে দাঁড়াইয়া থাকে। গ্রামের কবিরাজ আসিয়া নাড়ী দেখিয়া যখন ইহাকে দুশ্চিকিৎস্য সান্নিপাত বিকার বলিয়া প্রচার করিলেন, তখন সুপ্রভা কাঁদিতে লাগিলেন। রঙ্গিণী এতদিনও সুরেন্দ্রকে এ বিষয়ে কিছুই জানায় নাই। আজ সমস্ত বৃত্তান্ত কলিকাতায় সুরেন্দ্রকে লিথিয়া পাঠাইল। সুরেন্দ্র পত্রপাঠমাত্র বাটীতে আসিলেন এবং মহেন্দ্রের ভয়ানক অবস্থা দেখিয়া অতিশয় উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিলেন। তখনও মহেন্দ্রের জ্ঞানের বিশেষ বৈলক্ষণ্য হয় নাই; তিনি ধীরে ধীরে বন্ধুর হাতখানি টানিয়া নিজের বুকের উপর রাখিয়া কি যেন বলিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু কোন কথাই বলিতে পারিলেন না।

 সুরেন্দ্র এখন ডাক্তারী পড়িতেছিলেন। তিনি বাড়ী আসিবার সময় নানাপ্রকার ঔষধ আনিয়াছিলেন; বন্ধুর চিকিৎসার ভার তিনি নিজেই গ্রহণ করিলেন। তাঁহার নৈপুণ্য এবং সুপ্রভার অহর্নিশি অক্লান্ত সেবায় এবং সর্ব্বোপরি জগদীশ্বরের কৃপায় ২৫ দিন পরে মহেন্দ্রের বাঁচিবার লক্ষণ দেখা দিল। পীড়ার সময়ে মহেন্দ্র যখন সুপ্রভার দিকে দৃষ্টিপাত করিতেন, তখনই যেন তাহার পীড়ার যন্ত্রণা অনেক কমিয়া যাইত; তাঁহার বোধ হইত, যেন কোন দেবকন্যা তাঁহার শিয়রে বসিয়া তাঁহার রোগক্লিষ্ট মুখে হাত বুলাইতেছেন! দিন যাইতে লাগিল; ক্রমে মহেন্দ্র সুস্থ হইতে লাগিলেন। এখন মহেন্দ্র হাঁটিতে পারেন। সুরেন্দ্র এতদিন ​পর্য্যন্ত বাটীতেই ছিলেন। এক্ষণে আর থাকা অনাবশ্যক মনে করিয়া কলিকাতায় যাওয়ার কথা তারককে বলিলেন। তারক দাদাকে বলিয়া দুই দিন পরে যাত্রার দিন স্থির করিলেন। যাওয়ার যখন সমস্ত প্রস্তুত, এমন সময়ে এক নিদারুণ ঘটনায় বিনামেঘে বড়বাড়ীর মস্তকে কঠোর বজ্রপাত হইল।

 সেদিন মঙ্গলবার। অপরাহ্ণকালে সুরেন্দ্র কাছারী-সংলগ্ন বাগানের মধ্যে ভ্রমণ করিতেছিলেন। এই বাগান তারকের স্বহস্তনির্ম্মিত। তারক নিজে ভিন্ন ভিন্ন দেশ হইতে নানা প্রকার বৃক্ষের কলম, বীজ প্রভৃতি আনিয়া এই বাগান প্রস্তুত করিয়াছিলেন; এবং স্বহস্তে বাগানের সমস্ত কাজ করিতেন। বাগানটির প্রতি তাঁহার যত্নের অবধি ছিল না, এবং তাঁহারই যত্নে বাগানটী সুন্দর সুদৃশ্য হইয়া উঠিয়াছিল। আট দশ হাত অন্তর ছোট ছোট আম কাঁটালের গাছ সারি দিয়া লাগান, এবং তাহারই মধ্যে মধ্যে ভাল ভাল ফুলের গাছ, তরকারীর গাছ এবং অন্যান্য গাছ ছিল। বাগানের দক্ষিণ পার্শ্বে একটি বৃহৎ গর্ত্ত ছিল এবং সেই গর্ত্তে বারমাসই জল থাকিত। এই দিকটা কিছু জঙ্গলময়, বেত এবং অন্যান্য আগাছার পরিপূর্ণ। তারক অনেক চেষ্টাতেও এই সমস্ত নিঃশেষ করিতে পারেন নাই। আজ সুরেন্দ্রের পরামর্শে তারক সেই গাছগুলিতে আগুন লাগাইয়া দিয়াছিলেন! সুরেন্দ্র বাগানের মধ্যে যাইয়া, অদূরে দাঁড়াইয়া ইহাই দেখিতেছিলেন। তারক নিকটেই কোথাও ছিলেন। হঠাৎ সুরেন্দ্রের চীৎকার শব্দে ছুটিয়া আসিয়া দেখিলেন সুরেন্দ্র পা ধরিয়া বসিয়া পড়িয়া ​ছেন। দাদাকে দেখিবামাত্র “আমাকে সাপে কামড়াইয়াছে” বলিয়া তিনি কাঁদিয়া ফেলিলেন। মুহূর্ত্তকালের জন্য তারক কি করিবেন স্থির করিতে পারিলেন না; পরক্ষণেই নিজের কোঁচার কাপড় ছিঁড়িয়া সর্পদষ্ট স্থানের উপর ভাল করিয়া বাঁধিয়া দিলেন এবং ভাইকে কোলে করিয়া বসিলেন। বাগানের মালি ছুটিয়া গিয়া এ দুঃসংবাদ বাটীর মধ্যে দিতেই কার্ত্তিক এবং অন্যান্য সকলে আসিয়া দেখিলেন বিবর্ণপ্রায় ছোট ভাইকে ক্রোড়ে লইয়া তারক কাঁদিতেছেন।

 সকলে ধরাধরি করিয়া সুরেন্দ্রকে বাটীর মধ্যে লইয়া গেলে একটা মর্ম্মভেদী কান্নার রোল পড়িয়া গেল। জননী হাত পা আছড়াইয়া সুরেন্দ্রের বুকের উপর পড়িলেন; শুধু সুপ্রভা কাঁদিবার সময় নয় বুঝিয়া নীরবে আসিয়া সুরেন্দ্রের নিকটে বসিলেন; কার্ত্তিক দূরে সরিয়া গেলেন। চতুর্দ্দিকে গণ্ডগোল করিয়া কবিরাজ, বিষবৈদ্য, ওঝা ডাকিবার জন্য লোক ছুটিয়া গেল। কান্নাকাটি শুনিয়া মহেন্দ্র উপর হইতে নামিয়া আসিতেছিলেন, এখনও তাঁহার দুর্ব্বলতা যায় নাই। নীচে আসিয়াই যাহা শুনিলেন, তাহাতে আর এক পাও অগ্রসর হইতে পারিলেন না, সেই স্থানে বসিয়া পড়িলেন। তারক কখনও বা পাগলের ন্যায় নিরর্থক ছুটাছুটি করিতেছেন, কখনও বা “ভাই, দাদা সুরেন” বলিয়া কাঁদিয়া কাছে আসিয়া বসিতেছেন। আজ তাঁহার দক্ষিণ হস্ত ছিন্ন হইয়া যাইতেছে। কার্ত্তিক হতজ্ঞানের ন্যায় দুরে বসিয়া ভাবিতেছেন; এবং এক একবার বাহিরে গিয়া ​ওঝা আসিল কি না, দেখিতেছেন। গ্রামে এবং নিকটবর্ত্তী স্থানে যত বিষবৈদ্য ছিল, সকলেই আসিল, সকলেই চেষ্টা করিল; কিন্তু সব বৃথা হইল। কিছুক্ষণ পরেই মিত্রবংশের সর্ব্বকনিষ্ঠ সন্তান সর্পবিষে জর্জ্জরিত হইয়া, এক হাত তারকের হাতে অপর হাত মহেন্দ্রের হাতে রাখিয়া, সুপ্রভার কোলের উপর মাথা রাখিয়া ইহলোক ত্যাগ করিয়া গেলেন।

 ইহার পরের দৃশ্য বর্ণনা করা নিষ্প্রয়োজন। মাতা বিগতপ্রাণ পুত্রের বুকের উপর পড়িয়া মূর্চ্ছিতা। কার্ত্তিক ও তারক শোকে উন্মত্ত। শুধু শোক করিলেন না মহেন্দ্র। এ ঘটনা বোধ হয় তাঁহার শোকের অতীত হইয়াছিল। তিনি শুধু দূরে সরিয়া গিয়া নির্ব্বাক্ নিষ্পন্দ পাথরের মূর্ত্তির মত স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিলেন।