বত্রিশ সিংহাসন/১৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

ত্রিলােচনী ত্রয়ােদশ পুত্তলিকা

কহিল, হে নরপতে, বিক্রমাদিত্যের তুল্য যাহার ক্ষমতা তিনিই এই সিংহাসনে বসিবার উপযুক্ত পাত্র। আমি তাহার এক সাহসােদাহরণ কহি শ্রবণ কর। ভােজরাজ বলিলেন হে সুন্দরি আমি বিক্রমাদিত্যের বল ও সাহসের কথা শুনিতে সতত বাসনা করি, অতএব আমাকে তাহা শুনাও। পুত্তলিকা বলিল শুন।

 এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য অমাত্যগণ সমতিবাহারে অশ্বারােহণে মৃগয়া করিতে গিয়াছিলেন। তাহার সঙ্গে এমত বেগগামী এক এক ঘােটক ছিল তাহারা, একবারে সহস্র সহস্র ক্রোশ পথ অনায়াসে গমন করিতে পারিত। রাজা বনপ্রবেশ করিয়া শীকারীগণকে কহিলেন তােমরা শীকার কর আমি দেখি, যে ব্যক্তি ভাল শীকার করিতে পারিবে তাহাকে পুরস্কার দিব, যে শীকার করিতে না পারিবে সে অপদস্থ হইবে। এই আজ্ঞায় সকলে বাজপক্ষী উড়াইয়া পক্ষীশীকার আরম্ভ করিল, রাজা দেখিতে লাগিলেন। পরে রাজাও এক পক্ষী লক্ষ্য করিয়া স্বয়ং এক বাজ ছাড়িলেন, এবং তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ অশ্বারােহণে এমত বেগে গমন করিলেন যে অল্প ক্ষণের মধ্যে অনেক দূরে গিয়া পড়িলেন। তাঁহার সঙ্গীগণ সঙ্গে যাইতে পারিল না। এবং তাহারা তাহার অনুসন্ধান না পাইয়া ক্রমে ক্রমে রাজধানীতে ফিরিয়া আসিল।

 রাজা একাকী ঘােরতর অরণ্যে পড়িয়া পথভ্রান্তি প্রযুক্ত ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। পরে রজনী উপস্থিত হইলে এক নদীতটে উপনীত হইলেন, এবং তথায় অশ্ব হইতে অবরােহণ পূর্ব্বক অশ্বকে বৃক্ষমূলে বন্ধন করিয়া আপনি নদীতীরে ঘােড়ার জিনপােষ বিছাইয়া বসিলেন। কিয়ৎকাল পরে নদীর জল বৃদ্ধি হইতে লাগিল। ক্রমে ক্রমে জল নিকটবর্তী হইলে তিনি উঠিয় কিঞ্চিৎ অন্তরে বসিলেন। নদী ক্রমে ক্রমে পরিপর্ণ হইল। পরে রাজা দেখিলেন নদী দিয়া এক শব ভাসিয়া আসিতেছে, এবং তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ এক পিশাচ ও এক যােগী বিবাদ করিতে করিতে আসিতেছে। যােগী পিশাচকে বলিতেছে তুমি অনেক শব ভক্ষণ করিয়াছ, আমি বহুযত্নে এই শব পাইয়াছি, অতএব ইহা পরিত্যাগ কর, আমি লইয়া যােগ সাধন করি, আর তুমি মনে কর, তােমা হইতে আমি সিদ্ধ হইলাম। পিশাচ বলিতেছে আমাকে এমত নির্বোধ বােধ করিও না যে তােমার বাক্যে ভুলিয়া আমি তােমাকে আপন খাদ্য দ্রব্য ছাড়িয়া দিব। উভয়ে এই প্রকার বিবাদ করিতে করিতে আসিতেছে, এবং মধ্যে মধ্যে বলিতেছে এখানে এমত কেহ নাই যে তাহার দ্বারা আমাদের বিবাদ নিষ্পত্তি হয়, অতএব কল্য রাজসভায় যাইতে হইবে, রাজা যে বিচার করেন তাহাই হবে। ইতিমধ্যে রাজার প্রতি উভয়ের দৃষ্টিপাত হইল। তাহাতে তাহারা হাস্য পূর্ব্বক বলিল, নদীতীরে মনুষ্য দেখিতেছি, চল উহার নিকটে যাই, উনি আমাদিগের বিবাদ ভঞ্জন করিয়া দিবেন।

 ইহা বলিয়া উভয়ে শব সহিত রাজার নিকটে আসিল, এবং রাজাকে চিনিতে পারিয়া বিচারের প্রার্থনা করিল। যােগী কহিল মহারাজ আমি বহু আয়সে একটী শব পাইয়াছি, কিন্তু এই পিশাচ উহা লইতে দিতেছে না, আমার সঙ্গে অনর্থক বিবাদ করিতেছে। আমি নানাপ্রকার বিনয় করিতেছি, এবং এ পর্য্যন্ত কহিলাম যে এই শবটী আমাকে ভিক্ষা দাও, কিন্তু তাহাও গ্রাহ্য করে না। পিশাচ কহিল মহারাজ এই যােগী অতি মিথ্যাবাদী, আমি অনেক দুর হইতে অনেক পরিশ্রম করিয়া এই শব আনয়ন করিতেছি, যােগী পথিমধ্যে দেখিয়া যাচ ঞা করিতেছে, কিন্তু আমি এত ক্লেশে যে দ্রব্য আনিলাম তাহা আপনি আহার করিয়া উহাকে কেন দিব। তুমি এই বিবাদের বিচার কর, তুমি যাহা কহিবে তাহাই মান্য করিব।

 রাজা কহিলেন তােমরা উভয়েই শ্রেষ্ঠ, আমি তােমাদিগের নিকটে যাহা প্রার্থনা করি যদি তাহা দাও তবে তােমাদের বিচার করিতে পারি। ইহা শুনিবা মাত্র যােগী ঝুলি হইতে এক থলিয়া বাহির। করিয়া রাজার হস্তে অর্পণ পূর্বক বলিল মহারাজ যাহা মনে করিয়া ইহাতে হস্তাৰ্পণ করিবে তাহা তৎক্ষণাৎ পাইবে। পিশাচ বলিল আমি তােমাকে এক ভেলা দিতেছি, ইহা ঘর্ষণ করিয়া যখন কপালে তিলক ধারণ করিবে তখনি আমি তােমার সহায় হইব, এবং তােমার তুল্য, পরাক্রমশালী পুরুষ কেহ হইতে পারিবেনা। রাজা বলি ও ভেলা গ্রহণ করিয়া, পিশাচকে কহিলেন তুমি এই শব যােগীকে দাও, এবং আমার অশ্ব লইয়া ভক্ষণ কর, তাহা হইলে তােমার ক্ষুধা নিবৃত্তি হইবে এবং যােগীরও কর্ম্ম সাধন হইবে। ইহা শুনিয়া পিশাচ অশ্বকে ভক্ষণ করিল, এবং যােগী শব লইয়া মন্ত্র সাধন করিতে গেল।

 তখন রাজা বেতালকে স্মরণ করিয়া তাহার স্কন্ধারূঢ় হইয়া আপন নগরাভিমুখে আসিতে লাগিলেন। পথিমধ্যে এক ভিক্ষুক যাইতেছিল। সে রাজাকে দেখিয়া কহিল, মহারাজ, আমি আপনার রাজধানীতে বহু দিবস ছিলাম, কিন্তু আমার অভিলাষ পরিপূর্ণ হয় নাই, এইক্ষণে আমি আপনার স্থানে প্রার্থনা করি, আমাকে কিঞ্চিৎ ভিক্ষা দেউন। ইহা শুনিয়া বাজা তৎক্ষণাৎ তাহাকে সন্ন্যাসীদত্ত পাত্র প্রদান পূর্ব্বক তাহার গুণ ব্যাখ্যা করিলেন। ভিক্ষুক আশীৰ্বাদ করিয়া গৃহে গমন করিল। রাজাও আপন বাটীতে আসিলেন।

 ত্রিলােচনী পুত্তলিকা কহিল যে ব্যক্তি এই প্রকার দাতা ও বিচক্ষণ সেই ব্যক্তি এই সিংহাসনােপবেশনের যােগ্য। তদ্ভিন্ন যিনি উপবেশন করিবেন তিনি নরক- গামী হইবেন। এই কথা শুনিয়া রাজা সে দিবস সিংহাসনারােহণ করিলেন না। পর দিবস স্নান পূজা করণানন্তর সভায় আসিয়া অমাত্যবর্গকে আহ্বান করিয়া কহিলেন অদ্য আমার চিত্ত প্রসন্ন আছে, অতএব সিংহাসনােপবেশন করিব। ইহা বলিয়া ব্রাহ্মণ দিগকে একশত গাভি দান করিলেন, তৎপরে গণেশকে প্রণাম করিয়া সিংহাসনে উপবেশনার্থ পদপ্রসারণ করিতেছেন এমত সময়ে,