বত্রিশ সিংহাসন/১৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

বিলােচনী চতুর্দশ পুত্তলিকা

কহিল, মহারাজ অগ্রে আমার এক কথা শ্রবণ কর, তৎপরে সিংহাসনে আরােহণ করিও। এই বাক্যে রাজা পদপ্রসারণ নিবৃত্তি করিয়া সিংহাসনের নিকটে আসন পরিগ্রহ পূর্ব্বক বসিলেন। পুত্তলিকা কহিল মহারাজ শ্রবণ কর।

 এক দিবস নদীতটস্থ অট্টালিকার উপর নানা প্রকার আমােদ প্রমােদ হইতেছিল, এবং কতিপয় পরম সুন্দরী নারী সংগীতাদি করিতেছিল। রাজা বিক্রমাদিত্য বিমােহিতচিত্তে তাহা শ্রবণ করিতেছিলেন। এমত সময়ে এক নারী এক বালক ক্রোতে, আপন ভবন হইতে অতিবেগে দৌড়িয়া আসিয়া ঐ অট্টালিকার সম্মুখীন নদীতে ঝাপ দিল। পরক্ষণেই এক পুরুষ আসিয়া জলে অবগাহন পূর্ব্বক, ক্ষণবিলম্বে এক হস্তে বালককে ও এক হস্তে নারীকে ধরিয়া, জলমগ্ন। হইয়া মরিবার পূর্বাবস্থায় উচ্চৈঃস্বরে এই কথা কহিতে লাগিল এই তিন জনের প্রাণ রক্ষা করে এমত ধর্ম্মাত্মাকে আছে আমাদিগকে উদ্ধার কর। এবং ঐ পুরুষ খেদ করিতে করিতে কহিল, ক্রোধ অতি কদর্য্য রিপু, তাহাকে বশীভূত করিতে না পারিলে এইরূপ বিপদ গ্রস্ত হইতে হয়, এবং এইরূপ পশ্চাৎ তাপ জন্মে।

 রাজা এই সকল খেদোক্তি শ্রবণ করিয়া নিকউস্থ লােক দিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কোন ব্যক্তি এই প্রকার চীৎকার করিতেছে। তাহাতে এক পদাতিক কহিল মহারাজ একটা পুরুষ এক স্ত্রী ও এক বালক সহিত জলমগ্ন হইতেছে, এবং পুরুষটা বলিতেছে যদি কেহ পরােপকারী থাক, আমাদিগকে পরিত্রাণ কর। পদাতিক এই কথা বলিতেছে এমত সময় ঐ ব্যক্তি পুনর্ব্বার চীৎকার করিয়া বলিল আমরা তিন জনে জলমগ্ন হইতেছি, যদি কেহ পরমেশ্বরের প্রিয় পাত্র থাক, আমাদিগকে উদ্ধার কর। রাজা এই কথা শুনিয়া অতি ত্বরায় সভা হইতে গাত্রোত্থান পূর্ব্বক বাহিরে গিয়া জলে ঝাপ দিলেন, এবং এক হস্তে নারী ও বালক, ও অন্য হন্তে পুরুষকে ধরিলেন। রাজা অত্যন্ত সন্তরণ সমর্থ ছিলেন, অনায়াসেই সর্ব্ব সমেত উঠিতে পারিতেন, কিন্তু ঐ পুরুষটা জীবনের আশায় তাহাকে এমত জড়াইয়া ধরিল যে তাহাতে তিনি একবারেই সন্তরণ সামর্থ্য রহিত হইলেন, সুতরাং তাহারাে জলমগ্ন হইবার উপক্রম হইল। ইহাতে তিনি ব্যাকুলিত হইয়। পরমেশ্বরের চিন্তা করিতে লাগিলেন, আর কহিলেন হে নাথ আমি ধর্ম্মের জন্য আসিয়াছি, ইহাতে যদি আমার প্রাণ বিয়ােগ.হয় তবে ধর্ম্ম কর্মে কাহারও প্রবৃত্তি হইবেনা। রাজা ইহা বলিয়া বলপূর্ব্বক সন্তরণ দিতে চেষ্টা করিলেন, কিন্তু তাহাতে কোন ফল দর্শিল না। তখন তাহার তাল বেতালকে স্মরণ হইল। স্মরণ মাত্র তাল বেতাল উপস্থিত হইয়া চারি জনকে জল হইতে উত্তোলন পূর্ব্বক নদীতটে স্থাপন করিয়া প্রস্থান করিল।

 ঐ ব্যক্তি পুত্র কলত্র সহিত প্রাণদান পাইয়া। রাজার পাদবন্দন পূর্ব্বক কহিল, মহারাজ তুমি আমাদিগের প্রাণ দান করিলে, অতএব তুমি আমাদিগের প্রাণদাতা। অনন্তর রাজা তাহাদিগকে আপন অট্টালিকাতে আনিয়া শুষ্ক বস্ত্র পরিধান করাইলেন, পরে তাহারা সুস্থ হইলে তাহাদিগকে কহিলেন তােমাদিগের যাহা ইচ্ছা আমার স্থানে প্রার্থনা কর। তাহারা কহিল, মহারাজ, আমাদিগকে যাহা দিলেন তাহা অপেক্ষা অধিক আর কি চাহিব। আপনার নিকট চিরক্রীত রহিলাম এবং যাবজ্জীবন আপনার কল্যাণ প্রার্থনা করিব। সম্প্রতি আমাদিগের বিদায়ের অনুমতি দেউন, আমরা গৃহে যাই। রাজা বিক্রমাদিত্য তাহাদিগের বাক্যে সন্তুষ্ট হইয়া তৎক্ষণাৎ তাহাদিগকে অনেক অর্থ প্রদান করিলেন। তাহার পরমানন্দিত চিত্তে হস্তদ্বয় উত্তোলন পূর্ব্বক পরমেশ্বরের নিকট রাজার মঙ্গল প্রার্থনা করিয়া প্রস্থান করিল।

 এই আখ্যায়িকা সমাপ্ত হইলে পুত্তলিকা ভােজ রাজকে কহিল, নৃপতে যদি তুমি রাজা বিক্রমাদিত্যের ন্যায় এই প্রকার ক্ষমতাপন্ন হও তবে এই সিংহাসনে উপবেশন কর, নতুবা লােক সমাজে হাস্যাপদ হইবে। এই কথা বলিতে বলিতে সে দিবসের লগ্নও অতীত হইল। পরদিবস রাজা পুনর্ব্বার সিংহাসনে উপবেশন করিবেন এই চিন্তা করিতে করিতে তৎসমীপে আগমন করিলে,