বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (তৃতীয় খণ্ড)/১৫৭
(পৃ. ৩৩০-৩৩১)
| শিরোনাম | সূত্র | তারিখ |
|---|---|---|
| বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যুদ্ধরত পুলিশদের প্রতি স্বরাষ্ট্র দপ্তর |
বাংলাদেশ সরকার স্বরাষ্ট্র বিভাগ | .............১৯৭১ |
বাংলাদেশের বীর পুলিশ ভাইসব,
সাড়ে সাত কোটি নিরস্ত্র বাঙ্গালী আজ মরিয়া হয়ে ইয়াহিয়া খানের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আমরা বাংলাদেশের সন্তান, আমরা বাঙ্গালী, আমরা বাংলাদেশের পুলিশ আমরা মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের।
অতীতে এবং বিগত ২৫শে মার্চ থেকে পাক ফৌজ বাংলাদেশে যে নিধনযজ্ঞ ও বর্বরতা চালিয়েছে তার নজীর ইতিহাসে নাই। সোনার বাংলা আজ এক প্রেতপুরী। সেখানে এখন কবরের শান্তি বিরাজ করছে। এই হত্যাযজ্ঞের প্রথম শিকার হয়েছিল বাংলার পুলিশ বাহিনী। রাজারবাগ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা ও অন্যান্য জেলাসমূহের পুলিশ বাহিনীকে কিভাবে মেশিনগানের গুলিতে ও বোমার আঘাতে হত্যা করা হয়েছে তার করুণ দৃশ্য আমরা কোনদিন ভুলতে পারবো না।
আপনারা স্বচক্ষে দেখেছেন নারী হত্যা, নারীধর্ষণ, শিশু-ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী হত্যার বীভৎস দৃশ্য। হারিয়েছি আমরা প্রিয়জন, আত্মীয়-স্বজন, বেনাদক্লিষ্ট জীবনের সব সঞ্চয় ও সম্বল। ধ্বংসের ঢেউ শহর বন্দর ছড়িয়ে এখন পৌছেছে গ্রামে-গ্রামান্তরে। রাস্তাঘাটে হাটে মাঠে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে নিরীহ বাংগালী পুলিশ বাহিনীকে, ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের পরিবারকে দুঃখের অতল সাগরে। এই গণহত্যা ও ধ্বংসের তুলনা ইতিহাসে মেলে না।
তাই আজ বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুলেছেন-স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পাক ফৌজকে দাঁড়াতে দেবে না। পশ্চিম পাক ফৌজের সর্বশেষ প্রাণীটি বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব।
হালকা অস্ত্র নিয়ে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী মেশিনগান, ট্যাঙ্ক ও বোমার মুখে যে বীরত্ব দেখিয়েছে তা কখনও ভোলা যায় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে পুলিশের ত্যাগ ও অবদান ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে।
বাংলাদেশের পুলিশের মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার জন্য পুলিশ কর্তাদেরকে মেশিনগানের মুখে রেখে বাধ্য করা হয়েছে একথা ঘোষনা করতে-যেন বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীি ইয়াহিয়ার জঙ্গী শাসকদের কাজে যোগদান করেন। মুক্তিফৌজের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে আঘাত হানার জন্য এই হীন প্রচেষ্টা। এই ঘোষনা বা ডাকে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী সাড়া দেবেন না। নানা কৌশলে পুলিশ বাহিনীকে একবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলাই পাক ফৌজের উদ্দেশ্য একথা আমাদের ভুললে চলবে না। একবার ভেবে দেখুন-কেন পাক ফৌজ আমাদের সহকর্মী পুলিশ ভাইদেরকে অকাতরে নৃশংসভাবে হত্যা করছে-কেন তারা বাংলাদেশেরে পুলিশ লাইন পুড়িয়ে জুলিয়ে ধ্বংস করেছে-কেন হাজার হাজার পুলিশকে দেশছাড়া করেছে। জঙ্গী সরকার অস্ত্রের শক্তিতে শক্তিশালী এবং সেই শক্তির দাপটে ইয়াহিয়া সরকার আমাদেরকে নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এই জঙ্গী সরকারের সাথে সহযোগিতা করা বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছু নয়।
আমরা বাংলাদেশের সন্তান-বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে আমরা বহু ত্যাগ করেছি। আমরা আমাদের সর্বস্ব ত্যাগ করেছি। মুক্তিযুদ্ধে হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছি। বাংলাদেশের শত্রদের সংগে লড়াই করে বহু কর্মচারী শহীদ হয়েছেন। তাদের কাছে আমরা চিরঋণী। তাদেরকে চিরদিন জানাব শ্রদ্ধা। তাদের পরিবারবর্গকে জানাব সহানুভূতি-যারা শত্রুসেনার হাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে মৃত্যুর সংগে লড়াই করছে। তাদের জীবন বাঁচাবার জন্য আমরা সব কিছু করতে প্রস্তত। বর্বর পাক ফৌজের অমানুষিক অত্যাচারের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য অনেক পুলিশ কর্মচারী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদেরকে আহবান জানাচ্ছি তারা যেন অবিলম্বে মুক্তিফৌজে যোগদান করেন।
আমরা পুলিশ—আমরা অস্ত্র চালনা জানি। বাংলাদেশের এই মুহূর্তে আমাদের অনেক কিছু করার আছে। আমরা শত্রু শিবিরে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে যাব না—শত্রুর কাছে মাথা নত করবো না। তাদের সংগে সহযোগিতা করার আহবানে আমরা সাড়া দেব না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে প্রাণ দেব। আমরা জানি যারা শত্রুর সংগে হাত মিলিয়ে চলেছেন-বাংলাদেশের সংগ্রামী জনতা তাদেরকে কোনদিন ক্ষমা করবে না। পুলিশের সংগে যারা অফিসের কাজ করছেন তাদের প্রতিও আমাদের এই একই আবেদন।
পুলিশের ভাইয়েরা যারা সীমান্তের ওপারে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তারা ৯নং সার্কাস এভেনিউ, কলিকাতায় (বাংলাদেশ মিশন) অথবা সুবিধামত মুজিবনগরে পুলিশ সদর দপ্তরের সংগে যোগাযোগ স্থাপন করবেন।
আমরা একথাই মনে রাখবো যে-আমরা বাংলাদেশের সন্তান-বাংলাদেমের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম আমাদের বাঁচার সংগ্রাম। আমরা লড়ছি সত্যের জন্য-ন্যায়ের জন্য। এই সংগ্রামে আমরা জয়ী হবই।
—জয় বাংলা—