বাঙ্গলার পরিচিত পাখী/কোকিল

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন




কোকিল

 আমরা বাংলাদেশে যেদিন সরস্বতী পূজা করি, বাংলার বাহিরে আর্য্যাবর্ত্তের অন্যান্য স্থানে সেদিন “বসন্ত-পঞ্চমী” উদ্‌যাপিত হয়। এই দিন বসন্তোৎসবের আরম্ভ হয়, যাহার শেষ হয় ফাল্গুন পূর্ণিমায় হোলির দিন। বাঙ্গালীর হঠাৎ এদিনটাকে সরস্বতীপূজার জন্য কেন ধার্য্য করিয়াছেন তাহা গবেষণার বিষয়। বাস্তবিকপক্ষে ঐ দিবস হইতেই আবহাওয়ার পরিবর্ত্তন বেশ বোধগম্য হয়। শীতের তীক্ষ্ণতা চলিয়া গিয়া বাতাসে একটা হাল্কা ঝিরঝিরে ভাব অনুভূত হয়—অর্থাৎ দখিনা বাতাস মাঝে মাঝে আগমন-বার্ত্তা ঘোষণা করিতে আরম্ভ করে। কোকিলের রুদ্ধকণ্ঠকে সহসা মুক্তি দিয়া প্রকৃতিও ইহার ইঙ্গিত দেয়। বর্ষাকাল হইতেই কোকিলের ডাক শোনা যায় না। শোনা গেলেও তার তীব্রতা, মাধুর্য্য ও উচ্ছ্বাস থাকে না। শীতকালে কোকিলের কণ্ঠরব একান্ত নীরব থাকে। মনে হয় কোকিল বুঝি দেশের কোথাও নাই। কিন্তু বসন্ত-পঞ্চমী দিবসে (আমাদের সরস্বতী পুজা) বা তার ২৷৪দিন অগ্রপশ্চাতে কোকিলের উচ্চ কুহুতান সহসা বনানী প্রকম্পিত করিয়া তোলে। ১৯২৫ সালে প্রথম আমি সরস্বতী পূজার দিন কোকিলের কণ্ঠস্বর শুনিয়া—ইহাকে সত্যসত্যই বসন্তের বার্ত্তাবহ বলিয়া বুঝিতে পারি। তারপর বহুবৎসর ধরিয়া আমি বসন্ত-পঞ্চমী দিবসের কয়েকটা দিন সর্ব্বদা উৎকর্ণ হইয়া থাকিতাম, এবং ঐ দিবসের ২৷১দিন পূর্ব্বে বা পরে কোকিলের প্রথম কলধ্বনি শুনিতে পাইয়াছি। কোকিল যে বসন্তের বার্ত্তাবহ ইহা শুধু কবির কল্পনা নয়—প্রাকৃতিক সত্য।

 কোকিলের জীবনকাহিনীর দ্বারা পক্ষিতত্ত্বের কয়েকটি রহস্যের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। কোকিল কাকের বাসায় ডিম পাড়িয়া কিরূপে নিজ সন্তান উৎপাদন করায় সে কথা “কাক” প্রবন্ধে উল্লেখ করিয়াছি। আবার শীতকালে যার অস্তিত্ব বুঝা যায় না সে পাখী সম্বন্ধে প্রশ্ন জাগে, সে তাহলে কি এ দেশে থাকে না? অথবা তার কণ্ঠনালী শীতের কোকিল সময় এমন আড়ষ্ট হইয়া যায় যে সে শব্দ উচ্চারণ করিতে পারে না? অনেকে বলেন যে কোকিল ভারতবর্ষের অভ্যন্তরেই অপেক্ষাকৃত কম শীতের দেশে শীতকালটা কাটায়। অর্থাৎ ইহা আংশিক যাযাবর।

 যাযাবরত্ব পক্ষি-জীবনের একটা প্রকাণ্ড রহস্য এবং ভারতবর্ষের পাখীদের যাযাবর জীবনের ইতিহাস সম্বন্ধে যথেষ্ট গবেষণা হয় নাই। সুতরাং এ সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। যে সমস্ত পাখী একদেশে প্রজনন ঋতু কাটায় এবং অন্য ঋতুতে শতসহস্র মাইল দূরে গিয়া শীতের কয়েকটা মাস থাকে, তাহাদেরই যাযাবর বলে। কি ভাবে, কোন পথে, কোন দেশে পাখী যায়—ইহা অতীব কৌতুহলোদ্দীপক। আমাদের দেশে এই সব জানিবার কৌতুহল কয়জনের আছে?

 যাযাবর পাখীদের তিন শ্রেণীতে ভাগ করা চলে। (১) কতকগুলি পাখী ভারতবর্ষে গ্রীষ্মকালে শাবকোৎদন করিতে চায় না। তাহারা সুদূর সাইবেরিয়া বা নিকটবর্ত্তী দেশে ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় শাবকদের জনন ও পালন করিয়া লয় এবং শীত পড়িতে আরম্ভ করিলেই সেখান হইতে চলিয়া আসে। ইহারাই আসল যাযাবর অর্থাৎ ট্রু মাইগ্র্যান্ট। (২) আর একদল হিমালয়ের বায়ুই যথেষ্ট শীতল মনে করে এবং গ্রীষ্মকালে হিমালয়ের জঙ্গল প্রদেশে গিয়া শাবকোৎপাদন ক্রিয়া সম্পন্ন করে। ইহাদিগকে স্রেফ মাইগ্র্যান্ট বা যাযাবর বলা হয়। (৩) যে সব পাখী ভারতবর্ষ ছাড়িয়া চলিয়া যায় না, কাশ্মীর হইতে লঙ্কাদ্বীপের মধ্যবর্ত্তী ভূখণ্ডেই ঋতুবিশেষে বাস করে, তাহাদিগকে আংশিক যাযাবর বা পারসিয়েল মাইগ্র্যাণ্ট বলা হয়। বাংলায় “আভ্যন্তরিক যাযাবর” বলা হয়তো অসঙ্গত হইবে না। কোকিলকে এই শেষোক্ত শ্রেণীর যাযাবর বলা যায়। তবে এ সম্বন্ধে শেষ কথা বলা চলে কিনা আমার সন্দেহ আছে। বোম্বে ন্যাচুরেল হিষ্ট্রি সোসাইটি কোকিল ও পাপিয়াকে আভ্যন্তরিক যাযাবর শ্রেণীতে ফেলিয়াছেন। তবে বাংলা দেশের কোকিল আদৌ দেশ ছাড়িয়া যায় কিনা সন্দেহ। দক্ষিণবঙ্গে আমি

শীতকালে কোকিলকে বহুবার লক্ষ্য করিয়াছি। উত্তরবঙ্গ সম্বন্ধে যদি কেহ লক্ষ্য করিয়া থাকেন, আমাকে জানাইলে বাধিত হইব।

 এ বিষয়ে আমার ধারণা এই যে কোকিল শৈত্যের আধিক্য সহ্য করিতে পারে না। সেইজন্য উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে শীত অত্যন্ত তীব্র হয় বলিয়া কোকিল ঐ সময় সেখান হইতে দক্ষিণে ও পূর্ব্বে অপেক্ষাকৃত কম ঠাণ্ডার দেশে চলিয়া আসে। দক্ষিণ বঙ্গের শীতে মোটেই তীব্রতা নাই, সুতরাং এ অঞ্চল ছাড়িয়া যাইবার প্রয়োজনীয়তা সে বোধ করে না। আমাদের দেশের পরিচিত কোকিলদের মধ্যে “শাহী বুলবুল” ( পরে বর্ণনা আছে) একমাত্র যাযাবর বা মাইগ্র্যাণ্ট কেন না ইহা হিমালয়ে থাকে এবং শুধু বর্ষাকালেই এ দেশে চলিয়া আসে।

 আমরা যাকে কোকিল বলি সে পাখী কিন্তু মোটেই ইংরেজদের ‘কুক্‌কু’ নহে। ইংরেজ লেখকরা সেইজন্য এই পাখীকে তাঁদের কেতাবে কুক্‌কু বলেন না, হিন্দী “কোয়েল” শব্দই তাঁদের ভাষায় গ্রহণ করিয়াছেন। বৈজ্ঞানিক মতে কোকিলের গোষ্ঠি বেশ বৃহৎ এবং বাংলা দেশে এই গোষ্ঠির কোকিল ছাড়া একাধিক পাখী বেশ পরিচিত। ইহাদের নাম নিম্নে দেওয়া হইল।

 (১) পাপিয়া—পাখীটি দেখিতে বাজের মত সেইজন্য ইহার ইংরাজী নাম হক-কুক্‌কু।

 (২) “বউ-কথা-কও”—একেই ইংরেজরা “দি ইণ্ডিয়ান কুক্‌কু” বলেন, কেন না বিজ্ঞানমতে ইহাই ইংরেজের “কুক্‌কু” পাখীর ভারতীয় সংস্করণ।

 (৩) “শাহী-বুলবুল”—ইহার ইংরেজী নাম “দি ইণ্ডিয়ান ক্রেষ্টেড্‌ কুক্‌কু”। পশ্চিম ভারতে কোনও কোনও স্থানে ইহাকে “কালা পাপিহা” বলে। ইহার নাম হইতেই বুঝা যাইতেছে যে পাপিয়া ইহার মাথায় ঝুঁটি আছে—কেন না ঝুঁটি থাকিলেই তাকে এদেশে বুলবুল বানাইয়া ছাড়া হয়।

 (৪) ‘কানাকূয়া’—ইহা কাকের মত দেখিতে ভূমিচর একটি পাখী, দেখিয়া কাকের জ্ঞাতি বলিয়াই সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। ইহার ইংরেজী নাম “ক্রো-ফেজ্যাণ্ট”।

 পাপিয়া, বউ-কথা-কও ও কানকূয়া বাংলাদেশে বাসিন্দা পাখী, যাযাবর নহে বলিয়াই আমার বিশ্বাস।

 এদেশে ছেলেবুড়া সকলেই বোধ হয় কোকিল দেখিয়াছেন, সুতরাং কোকিলের বিশেষ রূপবর্ণনা নিষ্প্রয়োজন। পুং কোকিল চক্‌চকে নীলাভ কৃষ্ণবর্ণ, চক্ষু দুটি লাল এবং চঞ্চুটি বেশ পুরু ও দৃঢ়। স্ত্রী পাখী কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন বর্ণের। ইহার শরীরে কৃষ্ণবর্ণ কোথাও নাই। ইহার পালকগুলি ধূসর এবং পতত্রভাগ শ্বেতাভ হওয়ায় মনে হয় ইহার শরীরে অসংখ্য সাদা রঙের ছিটে দেওয়া। অজ্ঞ ব্যক্তি ইহাকে অন্য পাখী মনে করেন, অনেকে ইহাকে “তিলে কোকিল” বলিয়া থাকেন। পূর্ণবয়স্ক কোকিল দৈর্ঘ্যে ১৭ ইঞ্চির কম নহে, কিন্তু পুচ্ছটিই ইহার অর্দ্ধেকের বেশী জুড়িয়া থকে।

 পাপিয়াকে দেখিলে হঠাৎ বাজ-পাখী বলিয়া মনে হয়। গাত্রবর্ণ ধূসর, শ্বেতাভ চক্ষু, কণ্ঠ ও মুখের দুইপাশ শ্বেতাভ, স্কন্ধ ও বক্ষ ভষ্মবর্ণ কিঞ্চিৎ লাল আভাযুক্ত, বক্ষের নিম্নাংশ ও উদর শুভ্র রেখাযুক্ত, পুচ্ছের পালকের নিম্নভাগ সাদা এবং উপরে আড়াআড়ি ভাবে ৪৷৫টি সাদা রেখা। মোটামুটি ইহাই পাপিয়ার বর্ণনা। স্ত্রী পুরুষ উভয়েই দেখিতে একরূপ।

 বউ-কথা-কও পাপিয়ার সদৃশ। ইহার বর্ণ বাদামী মস্তক ও স্কন্ধদেশ ঘন ছাই রঙের। পুচ্ছের প্রান্তভাগ শুভ্র এবং পুচ্ছের অগ্রভাগের দিকে আড়াআড়ি একটা বেশ চওড়া সাদা রেখা। কণ্ঠ আর বুক ছাই রঙের; নিম্নবক্ষ কালো রেখাঙ্কিত শুভ্র। স্ত্রীপাখীটি অনুরূপ, তবে কণ্ঠ ও বক্ষের বর্ণ আর একটু গাঢ়।

 শাহী-বুলবুলের দেহের বর্ণ অনেকটা দোয়েলের মত—সাদা কালোর সুদৃশ্য সমাবেশ। ইহার দেহের উপরিভাগ, মায় মস্তকের দীর্ঘ ঝুঁটি, উজ্জ্বল কৃষ্ণবর্ণ এবং নিম্নভাগ শুভ্র। দোয়েলের মতই ইহার ডানার উপর একটা সাদা রেখা আছে এবং পুচ্ছাগ্রভাগও শুভ্র। তবে দোয়েল আঁটিসাট দেহ ও আয়তনে ছোট, শাহী-বুলবুল ছিপ্‌ছিপে গড়নে এবং লেজটি দীর্ঘ হওয়ায় দোয়েল অপেক্ষ লম্বায় দীর্ঘতর। কলিকাতার উপকণ্ঠে বর্ষাকালে ইহাকে দেখিতে পাওয়া যায়।

 কোকিল-গোষ্ঠির সব পাখিদের বিশেষত্ব এই, যে ইহারা উন্মুক্ত স্থানে বিচরণ করিতে পছন্দ করে না। আম, লিচু, বকুল, শিরীষ, নিম, অশ্বথ, বট প্রভৃতি ঘন পল্লব-বিশিষ্ট উচ্চ বৃক্ষের শাখামধ্যে আত্মগোপন করিয়া বেড়ানই ইহাদের অভ্যাস। এক গাছ হইতে অন্য গাছে যাইতে হইলে খুব দূর পাল্লার দৌড় ইহারা দেয় না। পরের ঘরে চুরী করা যাহাদের অভ্যাস তাহারা অপরাধীর মতই ফেরে। কাক, ছাতারে প্রভৃতি পাখী ইহাদের দেখিলেই ইহাদের পিছনে লাগে, সুতরাং আত্মগোপনশীলতা ইহাদের আত্মরক্ষার জন্যই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা।

 অন্য পাখী বাসায় ইহাদের শৈশব কাটে বলিয়া সংস্কৃত সাহিত্যে ইহাদিগকে “পরভৃত” “অন্যপুষ্ট” প্রভৃতি আখ্যা দেওয়া হইয়াছে। কোকিল কাকের “পরভৃত”। পাপিয়া ও শাহী-বুলবুল ছাতারে পাখীর বাসায় নিজ সন্তান পালন করায়। বউ-কথা-কউ পাখীর সম্বন্ধে আমি নিজে কিছু জানিনা। ইহারা নাকি হিমালয়ের কয়েকটি ক্ষুদ্র পাখীকে প্রতারণা করিয়া এ কার্য্য করাইয়া লয়। কোকিল-গোষ্ঠিতে এমন পাখীও অবশ্য আছে যাহারা পরভৃত শাহী-বুলবুল নহে। পরিচিত পাখীদের মধ্যে কাণাকূয়া সেইরূপ। ইহারা নিজ নীড় রচনা করিয়া নিজেরাই শাবক লালন পালন করে।

“বউ-কথা-কও”

 “কাণাকূয়া”—আমাদের দেশে যেমন কোনও পাখীর মাথায় ঝুঁটি থাকিলেই চলতি ভাষায় আমরা তাকে “বুলবুল” আখ্যা দিয়া থাকি, ইংরেজরাও তেমনি কোনও পাখীর সুদীর্ঘ প্রলম্বিত পুচ্ছ থাকিলে তাহাকে ফেজ্যাণ্ট আখ্যা দেয়। সেইজন্য কাকের মত দেখিতে এই পাখীটিকে ইংরেজেরা “ক্রো-ফেজ্যাণ্ট” নামে অভিহিত করে। ইহাকে দেখিলে কোকিলের সহিত ইহার যে কোনও সম্পর্ক আছে তাহা বুঝা শক্ত। ইহারা বেশ হৃষ্টপুষ্ট, একটি দাঁড়কাকের মত আয়তন। পুচ্ছের অগ্রভাগ বেশ চওড়া এবং এই সুদীর্ঘ পুচ্ছটির জন্য দাঁড়কাক অপেক্ষাও ইহাকে বড় দেখায়। ইহাদের সর্ব্বাঙ্গ ঘন কালো, শুধু ডানাদ্বয় ঘন বাদামী বর্ণের। চক্ষু উজ্জ্বল লাল, কোকিলের মত। ইহারা ভিজা স্যাঁতসেঁতে জমিতে ধীর পদক্ষেপে বিচরণ করিয়া কীটাদি সংগ্রহ করে। প্রায়ই ইহাদের জলাশয়ের নিকটবর্ত্তী ঘন ঝোপের নিকটই মাটির উপর দেখা যায়। অবশ্য বাগানে ও ডালে ডালে এরা থাকে, তবে খুব উচ্চ ডালে যায় না। নিম্ন শাখা মধ্যেই এক বৃক্ষ হইতে বৃক্ষান্তরে গমনাগমন করে। সারাদিনই মাঝে মাঝে ‘গুপ্‌-গুপ্‌’ এইরূপ একটা গম্ভীর শব্দ করে। জোড়ায় জোড়ায় ইহারা বাস করে এবং দাম্পত্যপ্রেম ইহাদের অত্যন্ত প্রগাঢ়। একটি মারা গেলে আর একটি নাকি অন্য সঙ্গী গ্রহণ করে না। শুনিয়াছি ধনেশপাখীর মাংসের মত ইহাদের মাংস বাতরোগীর পক্ষে ভাল। পশ্চিম অঞ্চলে ইহাকে “মহুকল” বলে। ইহার সাপের শত্রু। এ কারণে ইহাদের নির্ব্বিবাদে বাস করিতে দেওয়াই সঙ্গত। ইহারাও লোকালয়ের মধ্যেই বাস করিতে ভালবাসে।

 কাণাকূয়া ছাড়া এই গোষ্ঠির পাপিয়া, বউ-কথা-কও এবং শাহী-বুলবুল কীটভূক পাখী। ইহারা সকলেই আবার এমন একটা কীট ভক্ষণ করিতে ভালবাসে যাহা অন্য পাখী স্পর্শ করিতেও সাহস পায় না। বর্ষাশেষে এদেশে বহু শুঁয়া পোকার প্রাদুর্ভাব হয়। অনেক শুঁয়া আবার বাগানের ফলবৃক্ষের পাতা খাইয়া গাছ নষ্ট করে। এই সব শুঁয়া উক্ত কয়প্রকার পাখীর প্রিয় খাদ্য। সুতরাং ইহারা মানুষের হিতকারী।

 ইহাদের মধ্যে শুধু “কোকিলই” নিরামিষাশী। সে সম্পূর্ণ ফলাহারী। অথচ আশ্চর্য্যের বিষয় এই, যে শৈশবে সে যখন সর্ব্বভূক কাকের বাসায় লালিত পালিত হয়, তখন কাক ইহাকে নির্ব্বিচারে সকল নোংরা ও আমিষ খাদ্যই খাওয়ায়। সে খাদ্য ইহাদের শিশু-উদর বেশ হজম করে এবং প্রকৃতিবিরুদ্ধ খাদ্য সত্ত্বেও ইহারা বেশ পুষ্ট হইয়া কাণাকুয়া উঠে। আরও আশ্চর্য্য এই, যে শৈশবে আমিষ-নিরামিষ খাদ্যে রপ্ত হইয়াও, যেদিন হইতে সে কাকের বাসা ত্যাগ করে, সেদিন হইতে শুঁয়াপোকা ছাড়া কোনও আমিষ দ্রব্য স্পর্শ করে না। এই বিধান প্রকৃতির একটা রহস্য না বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে রসিকতা তাহা জানি না।