বাঙ্গলার পরিচিত পাখী/বসন্ত বাউরী

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


৯২ পৃঃ
ছোট বসন্ত

বসন্ত বাউরী

 যে দুইটী পাখীর বর্ণনা এই প্রবন্ধের অন্তর্গত, তাহাদিগকে বাংলার সর্ব্বত্রই বহুসংখ্যায় দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু ইহাদের বাংলা নাম আমি খুঁজিয়া পাই নাই। হিন্দী ভাষায় ইহাকে “বসন্ত্‌” বা “বসন্ত্‌ বাউরী” বলে। যেটা আকারে বৃহত্তর তাহাকে “বড়া বসন্ত্‌” এবং অন্যটাকে “ছোট বসন্ত্‌” বলে। “বাউরী” শব্দটা বোধহয় “বৌরাহা” শব্দের অপভ্রংশ। ইহার অর্থ উন্মাদ। বসন্তকাল আরম্ভ হওয়ার দিন হইতে সারা গ্রীষ্মকাল ইহাদের নিরবচ্ছিন্ন একঘেয়ে “টোংক্‌ টোংক্‌” ডাকে কান ঝালাপালা হইয়া উঠে। সেইজন্য ইহাকে “বসন্ত পাগল” বলা হয় কি না জানিনা। সেই হিসাবে আমি বাংলাতে ইহার “বসন্ত বাউরী” আখ্যাই গ্রহণ করিলাম। কেহ কেহ “বসন্ত বৈরী” চালাইতে চাহেন। ইহাকে বসন্তের শত্রু বলি কি করিয়া? এখন পাঠকের অভিরুচি। কোকিলের মত ইহাদিগকেও বসন্তের বার্ত্তাবহ বলা চলে, কেন না সরস্বতী পূজার সমসাময়িক কালেই ইহাদের কণ্ঠস্বর স্ফূর্ত্ত হইয়া উঠে।

 ইংরেজ একে বারবেট বলে। তবে যেটি আকারে বড় সেইটিকে গ্রীন বারবেট অথবা ব্ল্ ফেসেড্ বারবেট নামে অভিহিত করে। ছোটটিকে বলে—কপারস্মিথ্ কিম্বা ক্রিমজন ব্রেষ্টেড বারবেট। কাঁসারীদের পাড়ায় যেমন সারাদিন নিরবচ্ছিন্ন ঠং ঠং শব্দ শোনা যায়, আমাদের কাননে উপবনেও বসন্তকাল হইতে বর্ষাকাল পর্য্যন্ত এবং কখনও কখনও শীতকালেও ‘টংক—টংক—টংক’ ধ্বনি শুনা যায়। একচোটে পঁচিশ ত্রিশবার এইরূপ শব্দ হইয়া মিনিট দুইয়ের জন্য থামিয়া পুনরায় শব্দ আরম্ভ হয়। এবং ক্ষণমাত্র বিরামের পর এইরূপে সারাদিন ইহারা ধ্বনি করে। এই ধ্বনি শুনিলেই বুঝিবেন—নিকটেই “ছোট-বসন্ত” রহিয়াছে। ইহার কণ্ঠস্বরের জন্যই ইহার মারাঠি নাম—“জুক্‌টূক্‌”।

 “বড় বসন্তের” কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ বিভিন্ন। বাগানের মধ্যে মাঝে মাঝে বেশ উচ্চগ্রামে “কুটুর-কুটুর কুটুরর—কুটুর” শব্দ করিয়া থামিয়া যায়, এবং বেশ খানিকক্ষণ বিরামের পর আবার ঐরূপ ডাক বাহির হয়। ছোট বসন্তের মত অবিরত ইহারা ডাকে না। এক একটা কণ্ঠধ্বনির ধমকের মাঝখানে বেশ খানিকটা বিরাম থাকে।

 ইহারা উভয়েই ঘন পত্রবহুল বড় বড় গাছের উচ্চতর শাখা মধ্যেই বিচরণ করিতে ভালবাসে। যদিও ইহারা নিজেদের অস্তিত্ব বেশ জোর গলায় জাহির করে, তবু ইহাদের দর্শন পাওয়া সুলভ নহে। ইহাদের সবুজ গাত্রবর্ণ সবুজ পাতার সঙ্গে মিশিয়া ইহাদিগকে অদৃশ্য করিয়া রাখে। তবে ইহারা “হলদে পাখীর” মত লাজুক নহে। মানুষের আভাস পাইলেই লুক্কাইত হইবার চেষ্টা করে না। সুতরাং একটু ধৈর্য্যসহকারে নিরীক্ষণ করিলে ইহাদের আবিষ্কার করা শক্ত নহে।

 মোটামুটি সবুজ বর্ণের পাখী হইলেও ছোট পাখীটির দেহে বর্ণবৈচিত্র্য আছে। চঞ্চুর মূলদেশে তিনটি বর্ণের সমাবেশ হইয়াছে। ঠিক চঞ্চুর গোঁড়ায় উপরদিকে ললাট ও ঘাড়ের খানিকটা উজ্জ্বল টক্‌টকে লাল, গাল, গলা, আর চোখের উপরে ও নীচে খানিকটা বেশ উজ্জ্বল হলদে। চঞ্চুর নিকট হইতে একটা কালো দাগ ঘাড় পর্য্যন্ত যাইয়া উর্দ্ধে মাথা পর্য্যন্ত উঠিয়াছে। মাঝে মাঝে সবুজ আছে। বাকী দেহটা ঈষৎ পীত আভাযুক্ত সবুজ—লেজে নিম্নদিকে নীল রংও আছে। চঞ্চুটি ঘনকৃষ্ণবর্ণ, পা দুটি লাল। লেজটি অতিশয় ছোট হওয়ায় ইহাদের চেহারাটা বেঁড়ে দেখায়। আবার চঞ্চুর মূলদেশে কতকগুলি রোঁয়া গুচ্ছের মত বাহির হইয়া থাকায় ইহাদের আরও অদ্ভুত দেখায়।

 বড় পাখীটির দেহে ছোটটির মত অতগুলি বর্ণের সমাবেশ নাই। এটির দেহের সবটাই সবুজ, শুধু মস্তকটি পীতাভ বাদামী এবং চোখের চার পাশ কমলা লেবুর বর্ণের মত।

 ইহারা প্রধানতঃ ফলভুক্। বটপাকুড়ের ফল এদের খুব প্রিয়, সেইজন্য এই উভয়বিধ গাছে ইহাদের খুঁজিলেই পাওয়া যায়। তবে নিছক নিরামিষাশী নহে। ইহারা কীটাদিও ভোজন করে।

 মার্চ মাস হইতে মে মাস পর্য্যন্ত ইহাদের সন্তানজনন কাল। এই সময় লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে একটি বসন্ত চুপ করিয়া শাখার উপর বসিয়া আছে। আর একটি ধ্বনি করিতে করিতে অনবরত মাথাটা নোয়াইতেছে। এই দ্বিতীয়টী হইলেন পুরুষ। ইনি ঐভাবে স্ত্রী পাখীটীর মনোহরণ করিবার চেষ্টা করিয়া থাকেন। কাঠঠোক্‌রার মত ইহারাও বৃক্ষকোটরে নীড় নির্ম্মাণ করে। এবং ঐ পাখীর মতই মস্তকরূপী হাতুড়ী ও চঞ্চুরূপ বাঁটালির সাহায্যে ইহারা বৃক্ষকাণ্ডে গর্ত্ত করিয়া লয়। কাঠঠোক্‌রার মতই ইহারাও গাছের ফাঁপাস্থান বাছিয়া লয়। সব সময়ে অবশ্য ফাঁপা ডাল পাওয়া যায় না। তখন গর্ত্তের মুখ হইতে নীড় পর্য্যন্ত সম্পূর্ণ সুড়ঙ্গটাও চঞ্চুর আঘাতে খনন করিয়া লইতে হয়। ইহারাও সুনিপুণ সূত্রধর এবং অতি পরিপাটী সুড়ঙ্গ খনন করে। এই কার্য্যের জন্যই প্রকৃতির বিধানে ইহাদের চঞ্চু গোড়ার দিকে পুরু এবং অগ্রভাগ সূচাল। ইহাদের বাসা নির্ম্মাণে একটা বিশেষত্ব এই যে ইহারা ডালের উপরিভাগে গর্ত্ত করে না। ইহাদের নীড়ের প্রবেশ পথটী থাকে ডালের তলদেশে। বড় বড় গাছের মাঝারি ডালগুলির নীচের দিকে যে ফুটাগুলি দেখা যায় সেগুলি “বসন্ত” পাখীর নীড় রচনার ফল। বৃষ্টির জল যাহাতে নীড়মধ্যে প্রবেশ না করে সেইজন্যই ইহারা বৃক্ষশাখার অধোভাগে কোটরের প্রবেশ পথ তৈয়ারী করে। কাঠঠোক্‌রা গাছের খাড়া কাণ্ডে কোটর প্রস্তুত করে বলিয়া তাহাদের এ সমস্যা নাই। বসন্ত পাখীর খাড়া ডালে নীড় রচনা করার অভ্যাস নাই। ভূমির সঙ্গে সমান্তরাল ডালগুলিতেই এরা নীড় প্রস্তুত করে বলিয়া ইহাদিগকে ডালের তলদেশে নীড়ের প্রবেশ দ্বার রাখিতে হয়। ইহার এক একবারে দুইটী হইতে চারিটী পর্য্যন্ত শুভ্রবর্ণের ডিম পাড়ে।

 সাধারণতঃ পাখীরা একবার যে গাছের যে স্থানে নীড় রচনা করে, পরবৎসর যে সেই গাছের সেই স্থানে নীড় রচনা করিবে তাহা নহে। যদিও কতকগুলি পাখীর চরিত্রে এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। কিন্তু যে সব পাখী বৃক্ষ বা দেয়ালের গর্ত্তে বাসা প্রস্তুত করে, তাহাদিগকে উপর্য্যুপরি একই গর্ত্তে নীড় নির্ম্মাণ করিতে দেখা যায়। দোয়েল ও হুপোকে আমি এরূপ করিতে দেখিয়াছি। “বসন্ত” পাখীও তাহাই করে। প্রতি বৎসর কাষ্ঠ খোদনের পরিশ্রম কি সাজে? শুধু তাহাই নহে, পাখীদের শাবক সাবালক হইয়া জনকজননীর আশ্রয় পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলে, পক্ষীদম্পতিও নীড়টি পরিত্যাগ করে এবং বৃক্ষশাখাই সর্ব্বসময়ের জন্য আশ্রয় করে। “বসন্ত” পাখী কিন্তু কোটরটী পরিত্যাগ করিয়া যায় না। প্রজনন ঋতুর পরও শাবকরা যখন স্বাবলম্বী হইয়া জনকজননীকে পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়, তখনও বসন্ত-দম্পতি ঐ বৃক্ষকোটর মধ্যেই নিশাযাপন করিয়া থাকে। পাখীদের চরিত্রে এই বৈশিষ্ট্য বিরল।