বাঙ্গলার পরিচিত পাখী/বাঁশপাতি

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


বাঁশপাতি

 এই পাখীটীও আমাদের পল্লীপ্রান্তের সুষমা বর্দ্ধন করে। কলিকাতার উপকণ্ঠে যাদবপুরে বাসকালে লক্ষ্য করিয়াছি যে প্রায় খঞ্জনের সঙ্গে সঙ্গে ইহারা আসিয়া উপস্থিত হইত। ইহারা আংশিক যাযাবর কিংবা সম্পূর্ণ যাযাবর তাহা সঠিক আমি বলিতে পারি না। তবে আমাদের গ্রামে ইহাকে শীতের প্রারম্ভেই আসিয়া ভরা গ্রীষ্মের সময় অন্তর্হিত হইতে দেখিতাম। বাংলা, বিহার ও যুক্ত প্রদেশে ইহাকে আমি গ্রীষ্মকালে দেখি নাই।

 খাস কলিকাতা সহরে গড়ের মাঠে ইহাকে দেখিতে পাওয়া যায়। কার্জন পার্কের পশ্চিম প্রান্তের গাছগুলি হইতে বাহির হইয়া দ্রুত সঞ্চরমান কীটপতঙ্গের পশ্চাদ্ধাবমান হইতে ইহাদিগকে বহু বৎসর লক্ষ্য করিয়াছি। ইহাদের উড়িবার ক্ষিপ্রতা ও উড়ন্ত অবস্থায় কীটপতঙ্গ ধরিবার রীতি ফিঙ্গের মত।

 ইহাদের নাম হইতেই ইহাদের দেহবর্ণ অনুমেয়। উহা কচি বাঁশের পাতার মত সবুজ। তবে পৃষ্ঠে, মাথায় ও ডানায় অগ্রভাগে লাল্‌চে পীত আভা থাকায় যখন ইহা নানা ভঙ্গীতে উড়ন্ত কীটপতঙ্গের পশ্চাতে ধাবমান হয় তখন সূর্য্যালোক ইহার দেহে নিপতিত হইয়া বিচিত্র বর্ণের আভা সৃষ্টি করে। গণ্ডদেশ উজ্জ্বল নীল। চঞ্চুটী ঘন কৃষ্ণ। চঞ্চুর মূলদেশ হইতে একটী সুপরিসর ঘনকৃষ্ণ রেখা চঞ্চুর নীচ দিয়া ঘাড়ের দিকে চলিয়া আসিয়াছে। গলা ও বক্ষের সংযোগস্থলে একটী সঙ্কীর্ণ কালো রেখা কণ্ঠহারের মত দেখা যায়। চক্ষু উজ্জ্বল লাল। সুতরাং বিবিধ বর্ণের সমাবেশে ইহাকে দেখিতে মনোহর। ইহাদের পুচ্ছের গঠন এই মনোহারিত্ব বৃদ্ধি করিয়াছে। পুচ্ছের মাঝখান হইতে সরু দুটী কৃষ্ণবর্ণের সুচ্যগ্রভাগ পালক লেজ ছাড়াইয়া দুই ইঞ্চি বাহির হইয়া থাকে। সুতরাং এই হরিদ্বর্ণ, ক্ষিপ্র, চঞ্চল অদ্ভুত পুচ্ছবিশিষ্ট পাখীটীকে চিনিতে কাহারও অসুবিধা হইবার কথা নয়। যে রেখাছবি বাঁশপাতি এই পুস্তকে সন্নিবিষ্ট হইয়াছে তাহা ইহাকে চিনিয়া লওয়া, আশা করি, সহজ করিইয়া দিবে।

 খঞ্জন ভূমির উপর ছুটাছুটী করিয়া কীটপতঙ্গ পাকড়াও করে, বাঁশপাতি ভূমির উপর বড় একটা আসে না। সে উড্ডীয়মান অবস্থায় তাহার খাদ্য শিকার করে, সেই জন্য পলায়মান কীটপতঙ্গের পশ্চাদ্ধাবন কালে দ্রুতগতি এপাশ ওপাশ ও ডিগবাজী খাইতে ইহাকে অহরহ দেখা যায়। ভূমির অতি নিকটে আসিয়া তৃণ-শস্যাদির শীর্ষদেশ হইতেও সে উড়ন্ত অবস্থাতেই পতঙ্গ ধরে। ফিঙ্গেরাও ইহারই মত উড্ডীন অবস্থায় শিকার ধরে; কিন্তু প্রয়োজন হইলে মাটীতে আসিয়া বসিতে দ্বিধা বোধ করে না, যদিও তাহার দীর্ঘপুচ্ছটী কিঞ্চিৎ অসুবিধার সৃষ্টি করে। কিন্তু বাঁশপাতি আদৌ মাটির উপর উপবেশন করে না। ইহাদের পদাঙ্গুলী যুগ্ম হওয়াতে বোধ হয় মাটীতে বসিতে ইহার পারে না। সুতরাং মাঠের মধ্যে যে দুই একটী বৃক্ষ থাকে তাহার পত্রবিরল ডালের উপরই ইহারা বিশ্রাম করে। কানন মধ্যেও প্রবেশ করে না আবার গাছের ভিতরও যায় না। মুক্তস্থানই এদের বিচরণ ক্ষেত্র। আবার খঞ্জনের মত মনুষ্যসান্নিধ্য পরিহার করিয়া চলার কথা ইহারা মোটেই ভাবে না।

 ইহারা নাকি মৌমাছি খায় কেন না ইহাদের ইংরাজি নাম “গ্রীণ বী-ইটার”। তবে একমাত্র মৌমাছিই ইহাদের ভক্ষ্য নহে। যদি তাহা হইত, তাহা হইলে ইহাদিগকে আমরা সুনজরে দেখিতে পারিতাম না কেননা, মানুষের একট অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য, মধু, সঞ্চয় করে বলিয়া মৌমাছি মানুষের মিত্রস্থানীয়। উপরে উল্লেখ করিয়াছি যে ইহাদের বিচরণ ক্ষেত্রের একটু বৈচিত্র্য আছে। উড়ন্ত অবস্থায় শীকার ধরিতে হয় বলিয়া ইহারা পল্লবনিবিড় কানন মধ্যে থাকিতে পারে না। আবার উন্মুক্ত প্রান্তরও ইহাদের বাসোপযোগী নহে। তাই বাগানের প্রান্তে যেখানে খানিকট খোলা স্থান আছে সেই স্থানই ইহাদের প্রিয় আড্ডাস্থান। বৃক্ষাদির নাতিউচ্চ ডালগুলিতে যাইয়া ইহারা বসে এবং সেখান হইতে শূন্যপথে নিজেকে প্রক্ষিপ্ত করিয়া পতঙ্গের পশ্চাদ্ধাবন করে। বৃক্ষহীন মুক্ত প্রান্তর সেইজন্য ইহাদের পক্ষে অনুপযোগী। রেল লাইনের ধারে ধারে টেলিগ্রাফের তার সেইজন্য ইহাদের অতি প্রিয়। ঐরূপ স্থানে বসিয়া—উড্ডীয়মান কীটপতঙ্গাদি লক্ষ্য করা অতি সুবিধাজনক। এই পাখীগুলিও কীটভুক্‌ হওয়া সত্বেও একাকী বিচরণ করে না, অনেকগুলি দলবদ্ধ হইয়াই থাকে।

 পশ্চিমভারতের কোনও কোনও স্থানে বোধহয় ইহারা যাযাবর নহে। বাংলা দেশেও কোনও স্থানে ইহারা স্থায়ী বাসিন্দা কিনা বলিতে পারিনা। এই সকল তথ্য অবগত হওয়া যায় যদি বিভিন্ন জেলায় কৌতুহলী পর্য্যবেক্ষক ইহাদের আনাগোনা লক্ষ্য করিয়া লিপিবদ্ধ করেন। ইহাই হইল “নেচার ষ্টাডি” বা প্রকৃতি পরিচয়। ইহার জন্য কাহাকেও বৈজ্ঞানিক তত্ত্বজ্ঞ হওয়ার আবশ্যক করে না। প্রাণীতত্ত্বে অবৈজ্ঞানিকের নেচার ষ্টাডি নোটস্ বৈজ্ঞানিক গবেষণার সহায়তা করে।

 ধূলিস্নান করিয়া দেহ পরিষ্কার রাখা ইহাদের একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। শূন্যবিহারী এই পাখী সাধারণতঃ ধরিত্রীপৃষ্ঠে অবতরণ না করিলেও ধরণীর ধূলা অঙ্গে মাখিতে ভালবাসে। হুপো, চড়াই ভরত, প্রভৃতি পাখীও ধূলিস্নান করিতে পটু, ইহা পূর্ব্বেও উল্লেখ করিয়াছি।

 নীড় রচনা কার্য্যও ইহারা ধরিত্রীয় ক্রোড়েই সম্পন্ন করে। এজন্য বৃক্ষের আশ্রয় ইহারা লয় না। মাঠের ধারে কোনও উচ্চ পাড়ে বা কোনও বাঁধের ধারে ইহারা গাঙশালিকের ন্যায় গর্ত্তমধ্যে নীড় স্থাপন করে।

 নীড়ের জন্য ইহারা স্বয়ং নখর ও চঞ্চুর দ্বারা গর্ত্তখনন করিয়া লয় এবং প্রায় ২ হইতে ৪ হাত দীর্ঘ সুড়ঙ্গ করে। ইহাদের নীড়রচনার পদ্ধতি লক্ষ্য করিবার মত; চঞ্চুর দ্বারা খানিকটা গর্ত্ত করিয়া লয় তারপর ভিতরে চঞ্চুদ্বারা খনন করিতে করিতে অগ্রসর হয় এবং আলগা মাটি পদদ্বয় দ্বারা পশ্চাদ্দিকে ছুঁড়িয়া দিতে থাকে। ইহাদেরও ডিম সাদা। মার্চ্চ এপ্রিলে ইহার নীড়রচনা শাবকোৎপাদন কার্য্য সমাধা করে।