বাঙ্গালীর সার্কাস/ব্যায়ামশালা গঠন
ব্যায়ামশালা গঠন
নবগোপাল মিত্রের ব্যায়ামশালা গঠনের পরে শ্রীযুক্ত গৌরমোহন মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের ব্যায়ামশালা গঠনের ও ব্যায়ামচর্চ্চা প্রচারের চেষ্টার কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৮৬২ খৃষ্টাব্দে কলিকাতার আহিরীটোলা অঞ্চলে গৌরবাবুর জন্ম হয়। তাঁহার পিতার নাম রাজবল্লভ মুখোপাধ্যায়। গৌরবাবুর মাতা এক জন বিদুষী মহিলা ছিলেন এবং বিখ্যাত পণ্ডিত নবদ্বীপচন্দ্র গোস্বামী ছিলেন গৌরবাবুর মাতুল।
বাল্যকালে গৌরবাবু পাড়ার ছেলেদের জুটাইয়া তীর-ধনুক, লাঠি প্রভৃতি লইয়া ‘যুদ্ধ-বিগ্রহ’ ইত্যাদি খেলিতে ভাল বাসিতেন; কখনও বা তাঁহারা দুই দলে বিভক্ত হইয়া ‘রাম-রাবণের যুদ্ধ’ খেলিতেন। গৌরবাবু ও তাঁহার সঙ্গিগণের হাতে পাড়ার মাতাল প্রভৃতি কোনও দুষ্কৃতকারীর লাঞ্ছনার সীমা থাকিত না। ছেলে বেলা হইতেই তিনি সত্তরণপটু ছিলেন; উপনয়নের পর ‘দণ্ডী’ ভাসাইতে গিয়া তিনি প্রথম গঙ্গা পার হইয়া যান। গঙ্গায় স্নান করিতে যাইয়া তিনি নৌকা ডিঙ্গাইয়া জলে ঝাঁপ দিতে ভাল বাসিতেন। ক্রমশঃ তিনি তিন খানি নৌকা অনায়াসে ডিঙ্গাইয়া যাইতে পারিতেন। এক বার ঐরূপে চারখানি নৌকা ডিঙ্গাইতে যাইয়া তিনি তিনখানি নৌকা সহজে পার হইবার পর চতুর্থ নৌকাখানি ডিঙ্গাইতে অসমর্থ হইয়া শেষে দুই হাতে তাহার মাস্তুল জাপ্টাইয়া ধরিয়া ঝুলিয়া পড়েন।
বেনেটোলার বটকৃষ্ণ দত্তের আখ্ড়ায় গৌরবাবু কুস্তি ও জিমন্যাষ্টিক শিখিতে আরম্ভ করেন। কালে তিনি এক জন ভাল লাঠি-খেলোয়াড় ও কুস্তিগীর হন এবং অনেক বড় বড় পালোয়ানকে পরাস্ত করিতে সমর্থ হন। গৌরবাবু হরচন্দ্র লেনের এক আখ্ড়ায় প্রত্যহ কুস্তী শিখাইতে যাইতেন ও তথায় নিয়মিত অভ্যাস দ্বারা জিমন্যাষ্টিক বিদ্যা আয়ত্ত করেন।
ঐ আখ্ড়ায় শিখাইতে শিখাইতে গৌরবাবু আহিরীটোলা ও কলিকাতার বহু পল্লীতে অনেকগুলি আখ্ড়া স্থাপন করেন। ব্যায়ামচর্চ্চা যাহাতে প্রসার লাভ করে এজন্য তাঁহার আগ্রহের সীমা ছিল না। তাঁহার ঐকান্তিক যত্ন ও চেষ্টার ফলে তাঁহার প্রভাব কলিকাতার বাহিরেও বিস্তৃত হইয়া পড়ে। তখন তাঁহার নামে ও তত্ত্বাবধানে এত ব্যায়ামশালা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল যে, তাহার সকলগুলিতে যাইয়া তাঁহার নিজের শিক্ষকতা করা সম্ভবপর হইত না। তাই তিনি তাঁহার কয়েকটি উপযুক্ত ছাত্রকে শিক্ষকতার ভার দিয়া এই ব্যায়ামশালাগুলি ভাগ করিয়া দিয়াছিলেন। বলা বাহুল্য এই সমস্ত ক্লাবই সৌখীন অর্থাৎ Amateur Club ছিল! গৌরবাবুর কৃতী ও প্রিয় ছাত্র প্রিয়নাথ বসুর উপরও ঐ রূপে অনেকগুলি ব্যয়ামশালার শিক্ষকতার ভার পড়ে।
গৌরবাবুর ছাত্রগণের মধ্যে এই প্রিয়নাথ বসু উত্তরকালে ‘প্রোফেসার বসু’ নামে সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। এই পুস্তকের প্রতিপাদ্য বিষয়ের সহিত তাঁহার সম্বন্ধ অবিচ্ছেদ্য। ইনিই বাঙ্গালীর সার্কাস ‘প্রোফেসার বোসের সার্কাসের’ প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ ছিলেন।
জিলা ২৪ পরগণার অন্তর্গত ছোট জাগুলীয়া গ্রামে তত্রস্থ বসু বংশে প্রিয়নাথ জন্মগ্রহণ করেন। ইনি বাঙ্গালার প্রসিদ্ধ কবি ও নাটককার, পূর্বোল্লিখিত ‘হিন্দুমেলার’ অন্যতম উদ্যোগী মনোমোহন বসু মহাশয়ের কনিষ্ঠ পুত্র।
প্রিয়নাথ প্রথমে নিজের গ্রামের স্কুলে ও পরে কলিকাতার ‘মেট্রোপলিটন ইন্ষ্টিটিউসনে’ বিদ্যাশিক্ষা করেন। এই ছাত্রাবস্থা হইতেই তাঁহার ব্যায়ামচর্চ্চার প্রতি প্রবল অনুরাগ দৃষ্ট হয়। তিনি উল্লিখিত গৌরবাবুর নিকট রীতিমত জিমন্যাষ্টিক প্রভৃতি শিক্ষা করেন। প্রিয়নাথ ভাল জিমন্যাষ্টিক করিতে পারিলেও, জিমন্যাষ্টিক শিখানর ক্ষমতা তাঁহার অসাধারণ ছিল। তিনি গৌরবাবুর প্রবর্ত্তিত কয়েকটি ব্যায়ামশালায় শিক্ষকতা করিতে করিতে ভোলানাথ মিশ্র এবং “আউল চারু” নামে অভিহিত এক ব্যক্তিকে লইয়া কলিকাতার সিমুলিয়া পল্লীতে একটি জিমন্যাষ্টিক ক্লাব গঠন করেন। রাজবল্লভপাড়ার এটর্ণি শরৎকুমার সরকার এই আখ্ড়ায় শিক্ষকতা করিতেন। শেষে এই সিমলার আখ্ড়ায় বিভক্ত হইয়া যায়; ভোলানাথ স্বতন্ত্র আখ্ড়া করেন এবং প্রিয়নাথ সিমুলিয়ায় নিজ বাসভবনের নিকটেই একটি আখ্ড়া স্থাপন করেন। এই আখ্ড়ায় প্রিয়নাথের মধ্যমাগ্রজ মতিলাল বসুর সহপাঠী বন্ধু এবং তাঁহাদের প্রতিবেশী স্বনামধন্য বিবেকানন্দ স্বামী কিছু দিন ব্যায়ামচর্চ্চা করিয়াছিলেন।
“প্রিয়নাথ বসুর এই একটি সিমলার আখ্ড়া হইতে সহরময় এবং সহরের বাহিরেও বহু জিমন্যাষ্টিকের আখ্ড়ার সৃষ্টি হয় এবং ঐ সকল আখ্ড়ার (গৌরবাবু বলেন, মাত্র কলিকাতায় সিমলা হইতে নেবুতলা পর্যন্ত প্রায় ৫০টি আখ্ড়ায়) প্রিয়নাথ নিজে শিক্ষকতা করিতেন। গৌরবাবু বলেন যে, প্রিয়নাথ সর্ব্বপ্রথম বাঙ্গালীর ভিতর Pyramid Act ও Juggling Act অতি সুন্দর করিতে পারিতেন। তা ছাড়া Parallel e Horizontal Bar, অশ্বারোহণ প্রভৃতিতে তাঁহার দক্ষতা থাকিলেও তিনি এক জন ভাল ব্যায়ামবীর অপেক্ষা ভাল ব্যায়ামশিক্ষক ছিলেন। তিনি পালাক্রমে কলিকাতায় এতগুলি ক্লাবের সংগঠন ও শিক্ষাকার্য্য চালাইয়া সহরের বাহিরে নিকটবর্ত্তী গ্রামসমূহেও (যথা আগড়পাড়া, পানিহাটি এবং নিজগ্রাম জাগুলীয়া) ব্যায়ামের জন্য আখ্ড়া স্থাপন করেন। নিজের স্কুলের জলখাবারের পয়সা বাঁচাইয়া অথবা মা’র নিকট হইতে পয়সা সংগ্রহ করিয়া ঐ সকল গ্রামে গিয়াও তিনি ব্যায়াম শিক্ষা দিতেন। প্রিয়নাথ স্বয়ং বলিতেন যে, তাঁহার সকল ব্যয়ামশালায় নিম্নলিখিত কয়েকটি সাধারণ নিয়ম ছিল এবং ঐ সকল নিয়ম সকলকেই পালন করিতে হইত:—
১। অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত কেহ আখ্ড়ায় যোগ দিবেন না। (বলা বাহুল্য কোনও অভিভাবক মত না দিলে তিনি নিজে গিয়া উদ্দেশ্য বুঝাইয়া সুজাইয়া ও অনুনয় বিনয় সহকারে অনুমতি করাইবার চেষ্টা করিতেন)।
২। কেহ কোনরূপ নেশার দ্রব্য সেবন করিতে পারিবেন না―মায় পান, তামাক, নস্য পর্য্যন্ত নহে।
৩। কেহ খুব সৌখীন কায়দায় চুলের বাহার বা টেরী কাটিতে পারিবেন না, তবে চুল আঁচড়াইবেন।”[১]
প্রিয়নাথ যখন নিজগ্রাম ছোট জাগুলীয়ায় জিমন্যাষ্টিকের আখড়া খুলিয়াছিলেন, তখন গ্রামের প্রবীণ সম্প্রদায় তাঁহার প্রতি অত্যন্ত বিরূপ হইয়াছিলেন, কিন্তু তাঁহার জ্ঞাতি ভ্রাতা হাইকোর্টের প্রসিদ্ধ উকীল শ্রদ্ধেয় অমরনাথ বসু মহাশয় প্রিয়নাথকে এই কার্য্যে সমুচিত উৎসাহ প্রদান করিয়াছিলেন ও তাঁহার নিজের বাড়ীর ছেলেদের প্রিয়নাথের ক্লাবে পাঠাইয়াছিলেন।
জাগুলীয়ায় প্রিয়নাথ ক্লাবের ছেলেদের শুধু ব্যায়াম শিখাইয়াই ক্ষান্ত ছিলেন না, তিনি তাহাদের গ্রামের জঙ্গল কাটা, রাস্তা মেরামত করা, মৃতের সৎকার করা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যপ্রদ অথচ জনহিতকর কর্ম্মেও নিযুক্ত রাখিতেন। আজ যখন পল্লীর সংস্কার-কাজের এত কথা শুনা যায়, তখন তাঁহার এই কাজ স্মরণীয়। বলা বাহুল্য, ইংরাজ শাসনে দেশের পুরাতন স্বাবলম্বনমূলক প্রচেষ্টাসমূহের উচ্ছেদ সাধিত হইবার পূর্ব্বে পল্লীগ্রামের লোকরা পরমুখাপেক্ষী না থাকিয়া আপনাদের অনেক অভাব আপনারাই দূর করিতেন।
- ↑ ‘বাঙ্গালীর বাহুবল’―শ্রীযুক্ত বীরেন্দ্রনাথ ঘোষ প্রণীত