বাল্যস্মৃতি

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

অপ্রকাশিত রচনাবলী প্ররোচিত করল। আমি তাদের নবপ্রকাশিত যমুনা’র জন্য একটি ছোট গল্প পাঠালাম। এই গল্পটি প্রকাশ হতে না হতেই বাঙলার পাঠকসমাজে সমাদর লাভ করল। আমিও একদিনেই নাম করে বসলাম । তারপর আমি অদ্যাবধি নিয়মিত ভাবে লিখে আসছি। বাঙলাদেশে বোধ হয় আমিই একমাত্র সৌভাগ্যবান লেখক যাকে কোনদিন বাধার দুর্ভোগ ভোগ করতে হয়নি "* বাল্য-স্মৃতি পুরাতন কথার আলোচনা-শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হইয়াছে । ইহাতে আমার সম্বন্ধে কিছু কিছু আলোচনা আছে, কিন্তু আছে বলিয়াই যে সে-আলোচনায় আমিও যোগ দিই এ আমার স্বভাব নয়। তাহার প্রধান কারণ আমি অত্যন্ত অলস লোক-সহজে লেখালিখির মধ্যে ঘোষি না ; দ্বিতীয় কারণ, আমার বিগত জীবনের ইতিবৃত্ত সম্বন্ধে আমি অত্যন্ত উদাসীন । জানি, এই লইয়া বহুবিধ জল্পনা-কল্পনা ও নানাবিধ জনশ্রুতি সাধারণ্যে প্রচারিত আছে, কিন্তু আমার নিৰ্ব্বিকার আলস্তকে তাহা বিন্দুমাত্র বিচলিত করিতেও পারে না। শুভার্থীরা মাঝে মাঝে উত্তেজিত হইয়া আসিয়া বলেন, এইসব মিথ্যের আপনি প্রতিকার করবেন না ? আমি বলি, মিথ্যে যদি থাকে ত সে প্রচার আমি করিনি, স্বতরাং প্রতিকার করার দায় আমার নয়—তাদের। র্তাদের করতে বলে গে । তার রাগিয়া জবাব দেন—লোকে যে আপনাকে অদ্ভূত ভাবে তার কি ? আমি বলি, সে দায়ও তাদের, কিন্তু এই সাতান্ন বছরেও যদি ক্ষতি না হয়ে থাকে ত আর কয়েকটা বছর ধৈর্য্য ধরে থাকো—আপনিই এর সমাপ্তি হবে। কোন চিন্তা নেই। আজ. এই লেখাটা পড়িতে পড়িতে ভাবিতেছিলাম আমাদের ছেলেবেলার সেই অতি ক্ষুদ্র অকিঞ্চিৎকর সাহিত্য-সভায়’নেপথ্যে যোগদান করার—নেপথ্য' শব্দটি কে-একজন দিতে ভুলিয়াছেন বলিয়া-কি অস্থিরতা ! একবারও ভাবিয়া দেখি নাই কতটুকু ইহার মূল্য এবং জগৎসংসারে কেই বা সে-কথা মনে রাখিবে । অবশ্য ইহার জবাবও আছে। সেনাই হোক, নিজের কথাটাই বলি। বলার একটু হেতু আছে,-কিন্তু সে আমার নিজের জন্য নয়—এ লেখার শেষ পর্যন্ত পড়িলে তাহা বুঝা যাইবে। معدیم-a-محسنبےپیہصہ *:-l.--ഷിബത്ത് ‘বাতায়ন, শরৎ-স্মৃতি সংখ্যা, 88סי צ | ᎼᎼ Ᏹ শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রই শ্ৰীযুক্ত স্বরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় আমার আত্মীয় ও আবাল্যবন্ধু । ‘কল্পোল এবং ‘কালি কলমে তিনি আমার বাল্যজীবনের প্রসঙ্গে কি কি লিখিয়াছেন আমি পড়ি নাই এবং...কোন কথা বলিয়াছেন তাহাও দেখি নাই। এও আমার স্বভাব। কিন্তু আমি জানি আমার প্রতি সুরেনের কি অপরিসীম স্নেহ, সুতরাং তাহার লেখায় অতিশয়োক্তি যে আছেই তাহা না পড়িয়াও হলফ করিতে পারি। কিন্তু না পড়িয়া হলফ করা এক কথা,—এবং না পড়িয়া প্রতিবাদ করা অন্য কথা । অতএব ইহা কাহারও লেখার প্রতিবাদ নয়, শুধু যতটুকু আমার মনে পড়ে তাহাই বলা। ভাগলপুরে আমাদের সাহিত্য-সভা যখন স্থাপিত হয় তখন আমাদের সঙ্গে শ্ৰীমান বিভূতিভূষণ ভট্ট বা তার দাদাদের কিছুমাত্র পরিচয় ছিল না। বোধ হয় একটা কারণ এই যে, তারা ছিলেন বিদেশী এবং বড়লোক। স্বৰ্গীয় নফর ভট্ট ছিলেন সেখানকার সাবজজ। তারপর কি করিয়া এই পরিবারের সঙ্গে আমাদের ক্রমশঃ জানাশুনা এবং ঘনিষ্ঠত হয় সে-সব কথা আমার ভালো মনে নাই। বোধ হয় এই জন্য যে, ধনী হইলেও ইহাদের ধনের উগ্রত বা দাস্তিকতা কিছু মাত্র ছিল না । এবং আমি আকৃষ্ট হইয়াছিলাম বোধ হয় এই জন্য বেশী যে, ইহাদের গৃহে দাবা-খেলার অতি পরিপাটি আয়োজন ছিল। দাবা-খেলার পরিপাটি আয়োজন অর্থে বুঝতে হইবে—খেলোয়াড়, চা, পান ও মুহুমূর্ব তামাক । সম্ভবতঃ সেই সময়েই শ্রমান বিভূতিভূষণ আমাদের সাহিত্য-সভার সভ্যশ্রেণীভুক্ত হন। আমি ছিলাম সভাপতি, কিন্তু আমাদের সাহিত্য সভার গুরুগিরি করিবার অবসর অথবা প্রয়োজন আমার কোনকালেই ঘটে নাই । সপ্তাহে একদিন করিয়া সভা বসিত এবং অভিভাবক গুরুজনদের চোখ এড়াইয়া কোন একটা নির্জন মাঠের মধ্যে বসিত । জানা আবশ্বক যে, সে সময়ে সে-দেশে সাহিত্যচর্চা একটা গুরুতর অপরাধের মধ্যেই গণ্য ছিল । এই সভায় মাঝে মাঝে কবিতা পাঠ করা হইত। গিরীন পড়িতে পারিত সবচেয়ে ভালো, মৃতরাং এ ভার তাহার উপরেই ছিল, আমার ’পরে নয়। কবিতার দোষগুণ বিচার হইত এবং উপযুক্ত বিবেচিত হইলে সাহিত্যসভার মাসিক-পত্র ‘ছায়া’য় প্রকাশিত হইত। গিরীন ছিলেন একাধারে সাহিত্যসভার সম্পাদক, ছায়া’র সম্পাদক ও “অঙ্গুলি-যন্ত্রে অধিকাংশ লেখার মুদ্রাকর । এ-সম্বন্ধে এই আমার মোটামুটি মনে পড়ে। সাহিত্য-সভার সভ্যগণের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ছিলেন.বিভূতি। যেমন ছিল তার পড়াশুনা বেশী, তেমনি ছিলেন তিনি ভদ্র এবং বন্ধুবৎসল । সমঝদার সমালোচকও তেমনি ••• কিন্তু না বলিয়া জানা এবং বলিয়া প্রকাশে প্রতিবাদ করাও ঠিক এক বস্তু ية الإيا অ প্রকাশিত রচনাবলী নয়। তখন সঙ্কোচে বাধা দেয়, बुक्लाई কাহাকেও অকারণে ক্ষুণ্ণ করার ক্ষোভে মন অশাস্তি বোধ করে। অথচ সত্য প্রতিষ্ঠা যখন করিতেই হয় তখন অপ্রিয় কৰ্ত্তব্যের এই পুন:পুন: দ্বিধা নিজের বক্তব্যকে পদে পদে অস্বচ্ছ করিয়া তোলে। পুরাতন কথার আলোচনায়.বিপদ হইয়াছে এইখানে। অথচ প্রয়োজন ছিল না । এই মুদীৰ্ঘবর্ষ পরে আমি হইলে বলিতাম কত ভুলই ত সংসারে আছে, থাকিলই বা আর একটা । কি এমন ক্ষতি ! কিন্তু আমার ও অপরের ক্ষতিবোধের হিসাব ত এক নয় ।

  • * * - - - এখানে একটা গল্প মনে পড়িয়াছে । গল্পটা এই—

“কয়েক বৎসরের কথা, একবার হাবড়ায় "শরৎচন্দ্র সম্বন্ধীয় একটি সভার একজন বক্তা বোধ হয় মুরেন্দ্রনাথের ঐ লেখাটি পড়িয়াই ( ‘কল্লোল, মাঘ ১৩৩২ ) বক্তৃতায় বলিয়াছিলেন, টিলাকুঠির মাঠে ( ভাগলপুর ) এই সভা বসিত এবং মুরেন্দ্র, গিরীন্দ্র... বিভূতিভূষণ র্তাহার পদতলে বসিয়া সাহিত্য সাধনা করিত। এই সভার একজন শ্ৰোতা ( তার নাম ৮বিনয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, শারীরিক বলের জন্য আদমপুর ক্লাবে এই বিনয়বাবুকে সকলেই জানিত । তিনি গৃহশিক্ষকরূপে ভাগলপুরে বহুদিন বাস করায় সবই জানিতেন ) উত্তেজিত হইয়া আমাদের এ-খবর দেন এবং প্রতিবাদ করিতে বলেন। বিভূতিবাবু তাহাকে বহু কষ্টে প্রকৃতিস্থ করিয়া বুঝান যে.অপরের মুখের শোনা কথা লেখায় প্রতিবাদ চলে না। আপনি মুখে যাহা বলিয়াছেন সেই পর্য্যন্তই ভাল।” - বিভূতিবাবু তাহার ভূতপূৰ্ব্ব গৃহশিক্ষক বিনয়কুমারকে যদি সত্যই প্রকৃতিস্থ করিতে সক্ষম হইয়া থাকেন ত একটা বিস্ময়কর ব্যাপার করিয়াছিলেন তাহ মানিবই । কারণ, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এক ঘণ্টাও উহাকে প্রকৃতিস্থ করা সহজ বস্তু ছিল না। “পদতলে বসিয়া সাহিত্য-সাধনা করিত," সভায় এই মানিকর উক্তি শুনয়। ভূতপূৰ্ব্ব গৃহশিক্ষক বিনয়কুমার নিজে উত্তেজিত হইয়া প্রতিবাদ করিয়াছেন এবং অপরকে উত্তেজিত হইতে প্রয়োচিত করিয়াছেন । কিন্তু ঘটনাটা আমার কাছে একেবারে নূতন। ১৬৩২ সনে আমি হাবড়াতেই ছিলাম অথচ আমার সম্বন্ধে এরূপ একটা সভা হওয়ার কথা আমি আদী বিদিত নাই। সত্য সতাই হইয়া থাকিলে এবং নিজে উপস্থিত থাকিলে এমন একটা কথা আমার নিজের পক্ষে যত বড় গৌরবের সামগ্রীই হোক, অসত্য বলিয়া নিশ্চয়ই প্রতিবাদ করিতাম এবং বিনয়ের উত্তেজিত হইয়া উঠার প্রয়োজন হইত না তা নিঃসন্দেহে বলিতে পারি। • * * * * * নতুন স্বভাবত অনেকটা যে কল্পনাপ্রবণ তাহা সত্য এবং কল্পনারও যে গুণাবলিত আছে তাহাও সত্য, কিন্তু যথাস্থানে। ভূতপূর্ব গৃহশিক্ষক বিনয়কুমার w973 ۹۰ س}ه و শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ f পরবর্তী কালে ছিলেন Statesman কাগজের Reporter. বার বার ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকিয়াও খরতর কল্পনার সাহায্যে report দাখিল করার জন্য র্তাহার চাকরি গিয়াছিল এবং কাগজের সম্পাদককে লাঞ্ছিত হুইতে হইয়াছিল। আজ বিনয় পরলোকগত। মৃত ব্যক্তিকে লইয়া এইসকল কথা লিখিতে আমার ক্লেশবোধ হয় |- - - - - - কিন্তু ইহা বাহ। আসলে উত্যক্ত করিয়াছে কতকগুলি অতি কৌতুহলী লোকের অশিষ্ট ও অমার্জনীয় জিজ্ঞাসাবাদ । উহারা প্রশ্ন করিয়াছে, আমার কাছে.সাহিত্য-ব্যাপারে কে কতটা ঋণী । লোকেরা এ-পেশ্ন আমাকেও যে না করিয়াছে তাহা নয় কিন্তু যে কেহ জিজ্ঞাসা করিয়াছে তাহাকেই অকপটে এই সত্য কথাটাই চিরদিন বলিয়াছি যে আমার কাছে লেশমাত্র কেহ ঋণী নয়। এইস্থানে এক সময়ে ছেলে-বয়সে সাহিত্যচর্চা করিতে থাকিলে লোক পরস্পরকে উৎসাহ দিয়াই থাকে, ভালো লাগিলে ভালো বলিয়া বন্ধুজনের অভিনন্দিত করিয়াই থাকে, তাহাকে ঋণ বলিয়া অভিহিত করিতে গেলে মানুষের ঋণের কোথাও আর সীমা থাকে না। যেমন স্বরেন, গিরীন, উপেন, তেমনি বিভূতি...প্রভৃতি। লেখা পড়িয়া ভালো লাগিলে ভালো বলিয়াছি—কোথাও তেমন ভালো না লাগিলে ছিড়িয়া ফেলিয়া আবার লিখিতে অনুরোধ করিয়াছি । কোনদিন সংশোধন করি নাই । এতকাল পরে এই সকল কথা ব্যক্ত করার উদ্দেশ্য আমার শুধু এই যে, এ সম্বন্ধে আমার বক্তব্য যেন লিপিবদ্ধ হইয়া থাকিতে পারে। এইবার আমার নিজের সম্বন্ধে দুই-একটা কথা বলিয়া এ আলোচনা শেষ করিতে চাই । ছেলেবেলার লেখা কয়েকটা বই আমার নানা কারণে হারাইয়া গেছে । সবগুলার নাম আমার মনে নেই। শুধু দুখান বইয়ের নষ্ট হওয়ার বিবরণ জানি । একখানা, অভিমান, মস্ত মোট খাতায় স্পষ্ট করিয়া লেখা,—অনেক বন্ধুবান্ধবের হাতে হাতে ফিরিয়া অবশেষে গিয়া পড়িল বাল্যকালের সহপাঠী কেদার সিংহের হাতে । কেদার অনেকদিন ধরিয়া অনেক কথা বলিলেন, কিন্তু ফিরিয়া পাওয়া আর গেল না। এখন তিনি এক ঘোর তান্ত্রিক সাধুবাবা। বইখানা কি করলেন তিনিই জানেন —কিন্তু চাহিতে ভরসা হয় না -র্তার সিদুর মাখানো মস্ত ত্রিশূলটার ভয় করি। এখন তিনি নাগালের বাইরে—মহাপুরুষ—ঘোরতর তান্ত্রিক সাধুবাবা। দ্বিতীয় বই ‘শুভদা । প্রথম যুগের লেখা ওটা ছিল আমার শেষ বই, অর্থাৎ ‘বড়দিদি,’ ‘চন্দ্রনাথ’, ‘দেবদাস’ প্রভৃতির পরে *

  • 'ছোটদের মাধুকরী, আশ্বিন, ১৩৪৫

చిg