বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বিদ্যাসাগর জননী

ভ গ ব তী দে বী

 

প্রিয়দর্শন হালদার

 

প্রজ্ঞাভারতী

 

প্রকাশক
সুশান্ত দে
প্রজ্ঞাভারতী
১, ন্যায়রত্ন লেন
কলিকাতা ৭০০০০৪

 

প্রথম মুদ্রণ ১৩১৯ বঙ্গাব্দ

 

মুদ্রক
মিহিরকুমার মুখােপাধ্যায়
টেম্পল প্রেস
২, ন্যায়রত্ন লেন
কলিকাতা ৭০০০০৪

 

 "The genius of humanity is the real subject whose biography is written in our annals". —Emerson

 "Not only in the common speech of man, but in all art too—which is or should be concentrated and conserved essence of what men speak and show—Biography is almost the one thing needful". —Carlyle

 
 

পুস্তকশেষে পরিচিতি’র মধ্যে গ্রন্থকার সম্বন্ধে কিছু তথ্য দিয়ে অধ্যাপক শ্রীঅলোক রায় ও শ্ৰীঅশোক উপাধ্যায় আমাদের বিশেষ সাহায্য করেছেন। এজন্য তাঁদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

প্রকাশক
 
 

ভূমিকা

 মানবদেহ নশ্বর। জগতে কিছুই চিরস্থায়ী নহে। কিন্তু যতদিন জগৎ থাকিবে, ততদিন গুণের আদর থাকিবে। কারণ, গুণই চিরস্থায়ী,—প্রতিভাই চির আদরণীয় ও পূজনীয়। প্রকৃত প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তিই প্রকৃতির সক্ষ্মশক্তির পরিচায়ক ও তাঁহারাই মানুষের আদর্শ। প্রতিভা দৈবশক্তি বলিয়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তাঁহাদের শক্তি বিসর্পিত।

 জীবনী সমালোচনা লোকশিক্ষার প্রধান অবলম্বন। করুণার প্রতিমূর্ত্তি, পুণ্যশীলা ভগবতী দেবীর ন্যায় ভাগ্যবতী নারীরত্নের জীবনী সমালোচনায় অনেক শিখিবার আছে। বিশ্বজনীন ভক্তি—প্রীতি যাহার পুরস্কার, তাঁহার জীবনী আলোচনায় পুণ্য আছে।

 প্রাতঃস্মরণীয়া রাণী ভবানী, অহল্যাবাই প্রভৃতি যে সকল রমণীরত্ন জন্মগ্রহণ করিয়া পুণ্যের লীলাক্ষেত্র ভারতভূমিকে ধন্য করিয়াছেন, তাঁহাদের সহিত আমাদিগের পুণ্যশীলা ভগবতী দেবীর তুলনা সম্ভবে কি? তাঁহারা রাজরাজেশ্বরী, ধনশালিনী,—আর ভগবতী দেবী পর্ণকুটীরবাসিনী। বহির্জগতে পার্থক্য দৃষ্ট হইলেও আমাদিগের মনে হয়, অন্তর্জগতের ব্যাপারে সকলেই একরূপ। নদীতে বন্যা আসিলে, যেমন নদীহৃদয় পরিপূর্ণ করিয়া অগাধ জলরাশি নদীর দুই পার্শ্ব প্লাবিত করে,—উচ্চ নীচ দেখে না, পাহাড় পর্ব্বত মানে না,—অপ্রতিহত প্রভাবে আপনার বলে আপনি ধাবিত হয়, সেইরূপ যে প্রেম ভগবতী দেবীর হৃদয় পরিপূর্ণ করিয়া চতুর্দ্দিকের বাধা, বিঘ্ন, প্রলোভন না মানিয়া আপনার মহালক্ষ্যপথে ধাবিত হইয়াছিল, যে প্লাবনে জাতিধর্ম্মনির্ব্বিশেষে স্বদেশের ও বিদেশের শত শত নরনারীকে ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছিল, সে প্রেমের তুলনা কোথায়!

 এই পুণ্যশীলা নারীরত্নের জীবনচরিত লিখিতে হইলে, যে সকল উপাদানের প্রয়ােজন, তৎসমুদয় সম্যকরূপে সংগ্রহ করিবার কোন উপায় নাই। কারণ কালবশে তাহার অধিকাংশই বিস্মৃতির অতল সলিলে নিমগ্ন হইয়াছে। যাহা হউক আমরা বিশ্বস্তসূত্রে যতদূর সংগ্রহ করিতে পারিয়াছি, তাহার ত্রুটি করি নাই। এই পুস্তকসন্নিবিষ্ট অধিকাংশ ঘটনা আমরা ভগবতী দেবীর কনিষ্ঠা কন্যা মন্দাকিনী দেবীর নিকট হইতে সংগ্রহ করিয়াছি। তিনি আবেগময়ী ভাষায় মাতৃচরিত্র বর্ণনা করিয়া তাঁহার জননীর দিব্যমূর্ত্তি আমাদিগের চিত্তক্ষেত্রে অঙ্কিত করিয়া দিয়াছিলেন। কলিকাতা টাউন স্কুলের ভূতপূর্ব্ব প্রধান পণ্ডিত বীরসিংহনিবাসী রামেশ্বর বিদ্যাবাগীশ, ওরিয়েন্টাল সেমিনারীর শিক্ষক শ্রীযুক্ত অম্বিকাচরণ চট্টোপাধ্যায়, পুড়শুড়ী নিবাসী শ্রীযুক্ত দুর্গাদাস মুখােপাধ্যায়, ও বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পুত্র শ্রীযুক্ত নারায়ণচন্দ্র বিদ্যারত্ন মহাশয়ের নিকট হইতেও আমরা কয়েকটি ঘটনা সংগ্রহ করিয়াছি।

 উপসংহারে কৃতজ্ঞতার সহিত জানাইতেছি যে, ভগবতী দেবীর মধ্যমা কন্যা দিগম্বরী দেবীর পৌত্র, ডাক্তার ভােলানাথ মুখােপাধ্যায় মহাশয় এ পুস্তকের উপাদান সংগ্রহ বিষয়ে আমাদিগকে যের‍ূপ সাহায্য করিয়াছেন, তাহাতে চিরদিন তিনি আমাদের ধন্যবাদভাজন হইয়া রহিলেন।

কলিকাতা,
গ্রন্থকার
 

আশ্বিন, ১৩১৯ সাল।

পরিচিতি

 পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুগে যুগে মহামানবদের উদ্ভব হয়েছে। এইসব বন্দিত ব্যক্তিদের কীর্তিকাহিনী সমগ্র মানব জাতিকে চিরধন্য করেছে—পথের নিশানা দিয়েছে। এইসব ব্যক্তিদের অলৌকিক জীবনের কার্যাবলীর পিছনে রয়েছে, তাঁদের জননীদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি। দুঃখের বিষয় এইসব বরনারী —মহীয়সী মহিলাদের জীবনালেখ্য উপেক্ষিত হয়ে আছে। সন্তানদের উপর জননীর সংগঠনকার্য কি ভাবে পরিচালিত হয়েছিল সেইসব তথ্য যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি।

 পঞ্চদশ শতকে ‘বাঙালীর হিয়া অমিয় মথিয়া’ নিমাই কায়া ধারণ করেছিলেন। জগতে তিনি শচীনন্দন নিমাই—শচীদেবীর পুত্র মানব পরিত্রাতা শ্রীচৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩)। একমাত্র তাঁর জীবনীর মধ্যে মাতা শচীদেবীর কাহিনী অতি শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়েছে।

ভগবতী দেবী

 ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর—(১৮২০-৯১) মাতা ভগবতী দেবীর জীবনালেখ্য তাঁর মহান পুত্র ঈশ্বরচন্দ্রের কীর্তিকথার মধ্যেই পাওয়া যায়। এর মধ্যেই সঞ্চিত রয়েছে সব উপকরণ। এ বিষয়ে পথিকৃৎ বিদ্যাসাগর জীবনীকার চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৫৮-১৯১৬)। তাঁর রচিত ‘মা ও ছেলে’ গ্রন্থ দু খণ্ডে প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৮৮৭-৮৯ খ্রীষ্টাব্দে। তারপর ভগবতী দেবীর পৃথক জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন প্রিয়দর্শন হালদার।

গ্রন্থকার পরিচয়

 প্রিয়দর্শন হালদার-এর ‘শােক সংবাদ’ আনন্দবাজার পত্রিকার ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮, বুধবার তারিখে প্রকাশিত হয়। এই সংবাদটি এখানে দেওয়া হল—

 ‘খুলনা জেলার কপােতাক্ষ নদ তীরস্থ ধান্দিয়া গ্রামনিবাসী প্রিয়দর্শন হালদার মহাশয় গত বৃহস্পতিবার রাত্রি ১১॥০ ঘটিকার সময় ৫৬ বৎসর বয়সে পরলােকগমন করিয়াছেন; আর্য্যগৌরব, ভারতচিত্র, বিদ্যাসাগর জননী—ভগবতী দেবী, প্রিয় প্রসঙ্গ প্রভৃতি গ্রন্থ প্রণেতা হিসাবে তাঁহার নাম বঙ্গ সাহিত্যানুরাগী ব্যক্তি বর্গের নিকট সুপরিচিত। তিনি দীন দুঃখীর প্রতি সদয় ছিলেন ও বহু সৎকার্য্য করিয়া গিয়াছেন। তিনি বিধবা পত্নী ও একটী নাবালক পুত্র রাখিয়া গিয়াছেন। আমরা তাঁহাদের শােকে সমবেদনা জ্ঞাপন করিতেছি।

 প্রিয়দর্শন হালদার ‘আর্য্যভূমি’ সাময়িক পত্র সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছিলেন। এই পত্রিকা প্রায় তিন বছর (১৩১৩—১৩১৫) চলেছিল।

 প্রিয়দর্শন হালদার রচিত এই কয়টি গ্রস্থের সন্ধান পাওয়া যায়—

 ১। ভারত-চিত্র। ১ম সংস্করণ ডিসেম্বর ১৯১৪। ২য় সংস্করণ, কলিকাতা, এস, সি, আড্ডি এন্ড কোং, নভেম্বর ১৯১৬, ২+২+১৯৪ পৃষ্ঠা। সচিত্র [সূচী: ভীম, দ্রোণ, কর্ণ, ভীম, দুর্য্যোধন, গান্ধারী, কুন্তী, দ্রৌপদী, যুধিষ্ঠির, অর্জ্জুন, শ্রীকৃষ্ণ; ২। অমৃতাভ। কলিকাতা, কমলা বুক ডিপাে, [জানুয়ারি ১৯১৯], ২+১+২০০ পৃষ্ঠা। [বুদ্ধদেব, যীশুখ্রীষ্ট, হজরত মহম্মদ, চৈতন্যদেব—এই চারজনের জীবনী]; ৩। নিভৃত বিলাপ কাব্য। ১৯১২; ৪। আর্য্যগৌরব; ৫। শিশুরঞ্জন ভারতের ইতিহাস; ৬। শিশুরঞ্জন মহাভারত; ৭। শিশুরঞ্জন রামায়ণ; ৮। বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী। ১৯১২।

গ্রন্থপরিচয়

 প্রিয়দর্শন হালদারের গ্রন্থগুলির মধ্যে ‘বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী’ একটি উলেখযােগ্য গ্রন্থ। গ্রন্থকার সমসাময়িক বিদ্যাসাগর জীবনীর উপকরণের সহায়তায় এই জীবনী লিখেছিলেন। এই গ্রন্থে তিনি মাতা ভগবতীর এক বিশিষ্ট রূপ দিয়েছেন।

 ভগবতী দেবীকে সাক্ষাৎ ভাবে দেখেছিলেন বিদ্যাসাগর-সুহৃদ হ্যারিসন সাহেব। তিনি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে বিদ্যাসাগরের ছাত্র ছিলেন। তিনি নাকি ভগবতী দেবীকে খ্রীঃ পূঃ দুই শতকের প্রবাদ পুরুষ প্রাচীন রােমের রাজনীতিবিদ্ গ্রাকাই ভ্রাতাদের (গেয়াগ ও টাইবেরিয়াস) মহীয়সী জননী কর্ণেলিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। মত কর্ণেলিয়া তাঁর পুত্রদ্বয়কে পরম পার্থিব সম্পদ বহমূল্য রত্ন হিসাবে বিবেচনা করতেন। বাঙালী ঘরের মাতা ভগবতী দেবী তাঁর চার ছেলেদের দেখিয়ে বলেছিলেন—‘এই আমার চার ঘড়া ধন।’

 ভগবতী দেবীর ছবি এঁকেছিলেন প্রসিদ্ধ শিল্পী হাডসন সাহেব এবং এই ছবি অদ্যাবধি বিদ্যাসাগর কলেজের অধ্যক্ষের ঘরে রক্ষিত আছে। চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিদ্যাসাগর’ (১৮৯৫) গ্রন্থে সর্বপ্রথম এটি মুদ্রিত হয়। ভগবতী দেবীর এই চিত্র প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ পুস্তিকায় মন্তব্য প্রকাশ করেন ১৩০৩ সালে। এটি পঠিত হয় ১৩০২ সালের ১৩ই শ্রাবণ অপরাহ্ণে এমারেল্ড থিয়েটার রঙ্গমঞ্চে বিদ্যাসাগরের সাৎসরিক স্মারক অধিবেশনে। পরে এটি সাধনা পত্রের ১৩০২ সালে ভাদ্র-কার্তিক সংখ্যায় প্রকাশিত হয়ঃ—

 ‘বঙ্গদেশের সৌভাগ্যক্রমে এই ভগবতীদেবী এক অসামান্যা রমণী ছিলেন। শ্রীযুক্ত চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের রচিত বিদ্যাসাগর-গ্রন্থে লিথােগ্রাফ-পটে এই দেবীমূর্তি প্রকাশিত হইয়াছে। অধিকাংশ প্রতিমূর্তিই অধিকক্ষণ দেখিবার দরকার হয় না; তাহা যেন মুহূর্তকালের মধ্যেই নিঃশেষিত হইয়াও যায়। তাহা নিপুণ হইতে পারে সুন্দর হইতে পারে; তথাপি তাহার মধ্যে চিত্তনিবেশের যথােচিত স্থান পাওয়া যায় না। চিত্রপটের উপরিতলেই দৃষ্টির প্রসর পর্যবসিত হইয়া যায়। কিন্তু ভগবতীদেবীর এই পবিত্র মুখশ্রীর গভীরতা এবং উদারতা বহুক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়াও শেষ করা যায় না।’

সনৎকুমার গুপ্ত

এই লেখাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাবলিক ডোমেইনে অন্তর্গত কারণ এটি ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারির পূর্বে প্রকাশিত।


লেখক ১৯২৮ সালে মারা গেছেন, তাই এই লেখাটি সেই সমস্ত দেশে পাবলিক ডোমেইনে অন্তর্গত যেখানে কপিরাইট লেখকের মৃত্যুর ৮০ বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকে। এই রচনাটি সেই সমস্ত দেশেও পাবলিক ডোমেইনে অন্তর্গত হতে পারে যেখানে নিজ দেশে প্রকাশনার ক্ষেত্রে প্রলম্বিত কপিরাইট থাকলেও বিদেশী রচনার জন্য স্বল্প সময়ের নিয়ম প্রযোজ্য হয়।