বিষয়বস্তুতে চলুন

বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী/তৃতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে


বিদ্যাসাগর।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।


বিদ্যাসাগরের জন্ম ৷

 যিনিই আমাদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং যাঁহার শ্রেষ্ঠতা হেতু আমরা উপকৃত হই, তিনিই ভক্তির পাত্র। যাঁহারা সমাজের শিক্ষক, তাঁহারা ভক্তির পাত্র। যাঁহারা বিদ্যাবুদ্ধিবলে, পরিশ্রমের সহিত সমাজের শিক্ষায় নিযুক্ত, তাঁহারাই সমাজের প্রকৃত নেতা। অতএব ধর্ম্মবেত্তা, বিজ্ঞানবেত্তা, নীতিবেত্তা, দার্শনিক, পুরাণবেত্তা, সাহিত্যকার, কবি প্রভৃতির প্রতি যথোচিত ভক্তি প্রদর্শন কর্ত্তব্য। পৃথিবীর যাহা কিছু উন্নতি হইয়াছে, তাহা ইঁহাদের দ্বারাই সংসাধিত হইয়াছে। ইঁহারা পৃথিবীকে যে পথে পরিচালিত করেন, সেই পথে পৃথিবী চলে। ইঁহারা নৃপমণ্ডলীরও গুরুস্থানীয়। রাজগণ ইঁহাদের নিকট শিক্ষালাভ করিয়া সমাজশাসনে সমর্থ হয়েন। এই নিয়মে, ভারতবর্ষে ভারতীয় ঋষিদিগের সৃষ্টি—এইজন্য ব্যাস, বাল্মীকি, বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, মনু, যাজ্ঞবল্ক্য, কপিল, গৌতম—সমগ্র ভারতের পূজ্যপাদ পিতৃগণস্বরূপ। ইউরোপ খণ্ডেও হোমর, ভার্জিল, গেলিলীও, নিউটন, কান্ত, কোমৎ, দান্তে, সেক্ষপিয়র প্রভৃতির স্থানও সেইরূপ।

 যাঁহাদিগের মধ্যে অলৌকিক প্রতিভা অথবা ধর্ম্মজ্ঞান বা বিশ্বপ্রেমের পূর্ণ বিকাশ দেখিতে পাই, তাঁহাদিগকে আমরা মহাপুরুষ মনে করিয়া পূজা করি। কিন্তু গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর ন্যায় বিশ্বপ্রেম, প্রতিভা ও ধর্ম্মজ্ঞানের ত্রিধারা যাঁহাতে সম্মিলিত দেখিতে পাই, তাঁহাকে বিরাট মহাপুরুষ বলিয়া বন্দনা করি। ইঁহাদের ক্রিয়াকলাপে যেরূপ অমানুষিক শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়, জন্ম বৃত্তান্তও সেইরূপ অসাধারণ ও অশ্রুতপূর্ব্ব ঘটনাপূর্ণ বলিয়া প্রচারিত হইয়া থাকে। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মবৃত্তান্তও এইরূপ কিছু বিচিত্রতাপূর্ণ বলিয়া জনশ্রুতি আছে এবং তাহা অমূলক নহে।

 আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি ঠাকুরদাস কার্য্যক্ষম হইলে, রামজয় পুনরায় তীর্থপর্য্যটনে বহির্গত হন। তিনি দ্বারকা, জ্বালামুখী, বদরিকাশ্রম ও অন্য নানা তীর্থস্থান পর্য্যটন করিয়া পরিশেষে কেদারনাথ পাহাড়ে অবস্থিতি করেন। দীর্ঘকালের মধ্যে তিনি তাঁহার পরিবারবর্গের কোন সংবাদ রাখেন নাই। রামজয় এক দিবস (কেদারনাথ পাহাড়ে) নিশীথ সময়ে স্বপ্ন দেখেন যে, “রামজয়, তুমি বৃথা কেন ভ্রমণ করিতেছ? স্বদেশে যাও, তোমার বংশে এক মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তিনি তোমার বংশের মুখ উজ্জ্বল করিবেন। তিনি সাক্ষাৎ দয়ার সাগর ও অদ্বিতীয় পণ্ডিত হইয়া, নিরন্তর বিদ্যাদান ও নিরুপায় লোকদিগের ভরণ পোষণাদির ব্যয় নির্ব্বাহ দ্বারা তোমার বংশে অনন্তকালস্থায়িনী কীর্ত্তি সংস্থাপন করিবেন।” রায়জয়, পাহাড়ের মধ্যে নিশীথ সময়ে এরূপ অসম্ভব স্বপ্নদর্শন করিয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, আমি বহুদিন অতীত হইল, সংসারাশ্রমে জলাঞ্জলি দিয়া নিভৃত স্থানে ঈশ্বরারাধনায় মনপ্রাণ সমর্পণ করিয়া কালাতিপাত করিতেছি। এক্ষণে তাহারা কি করিতেছে ও কে আছে না আছে, তাহাও জানি না। এবম্বিধ চিন্তায় নিমগ্ন হইয়া পুনর্ব্বার নিদ্রাভিভূত হইলে, পুনরায় স্বপ্নে দেখিলেন, কে যেন বলিতেছে, “রামজয়, তুমি পরিবারগণের নিকট প্রস্থান কর, আর বিলম্ব করিও না, তোমার প্রতি ঈশ্বর সদয় হইয়াছেন।” নিদ্রাভঙ্গ হইলে, নানাপ্রকার ভাবিয়া চিন্তিয়া, রামজয় স্বদেশাভিমুখে যাত্রা করিলেন। অবিরত ৬ মাস পদব্রজে গমন করিয়া, বীরসিংহে সমুপস্থিত হইয়া শুনিলেন, তাঁহার পুত্র ঠাকুরদাস কলিকাতায় বিষয় কর্ম্মে নিযুক্ত থাকিয়া সংসার প্রতিপালন করিতেছেন। কনিষ্ঠ পুত্র কালিদাসের বিবাহকর্ম্ম সম্পন্ন হইয়াছে এবং জ্যেষ্ঠপুত্র ঠাকুরদাসের পত্নী ভগবতী দেবী গর্ভবতী হইয়া অবধি উন্মাদগ্রস্তা হইয়াছেন। অনন্তর রামজয় দেশে আগমন করিয়াছেন এ সংবাদ কলিকাতায় পুত্রদ্বয়ের নিকট প্রেরিত হইল। সংবাদ প্রাপ্তিমাত্রেই বহুকালের পর পিতৃপদ সন্দর্শনার্থে ঠাকুরদাস ও কালিদাস কলিকাতা হইতে বীরসিংহে আগমন করিলেন।

 ১৭৪২ শকাব্দ। অর্থাৎ সন ১২২৭ সালের ১২ই আশ্বিন মঙ্গলবার দিবা দ্বিপ্রহরের সময় বীরশিশু ঈশ্বরচন্দ্র বীরসিংহ ক্ষুদ্র পল্লীতে দরিদ্র ঠাকুর- দাসের পর্ণকুটীরে ভূমিষ্ঠ হইলেন। স্মৃতিকাগৃহের দ্বারে সমাগত পল্লী-বাসিনীগণের মাঙ্গল্য শঙ্খধ্বনি ও হুলুধ্বনিতে ক্ষুদ্র পল্লীখানি কম্পান্বিত হইল। বার্তাবহ সমীরণ প্রতিধ্বনি বহন করিয়া দ্বারে দ্বারে মহাপুরুষের জন্মবার্তা বিঘোষিত করিলেন। একপ্রকার মাঙ্গলা অভ্যর্থনার মধ্যে ঈশ্বর-চন্দ্র প্রথম সূর্যোর আলোক দেখিলেন। তীর্থক্ষেত্র হইতে সমাগত পিতা-মহ রামজয় বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়, নাড়ীচ্ছেদনের পূর্ব্বে আল্লার দ্বারা ভূমিষ্ঠ বালকের জিহ্বার নিয়ে কয়েকটা কথা লিখিয়া, তাঁহার পত্নী দুর্গাদেবীকে বলিলেন, – “লেখার নিমিত্ত শিশুটী কিয়ৎক্ষণ মাতৃদুগ্ধ পান করিতে পায় নাই; বিশেষতঃ কোমল জিহ্বায় আমার কঠোর হস্ত দেওয়ায়, এই বালক কিছুদিন তোলা হইবে। এই বালক ক্ষণজন্মা, অদ্বিতীয় পুরুষ ও পরম দয়ালু হইবে এবং ইহার কীর্ত্তি দিগন্তব্যাপিনী হইবে। এই বালক জন্মগ্রহণ করায়, আমার বংশের চিরস্থায়ী কীর্ত্তি থাকিবে। ইহাকে দেখিয়া আমি চরিতার্থ হইলাম। এই বালককে অপর কেহ যেন মন্ত্র না দেয়; অদ্য হইতে আমিই ইহার অভীষ্টদেব হইলাম। এ বালক সাক্ষাৎ ঈশ্বরতুল্য, অতএব ইহার নাম অদ্য হইতে আমি ঈশ্বর রাখিলাম।”

 আজ রামজয় তীর্থক্ষেত্রের সেই স্বপ্নকে সত্য জ্ঞান করিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় ভূমিষ্ঠ হইয়া সূতিকাগৃহে পিতামহ কর্তৃক যে নামে অভিহিত হইয়াছিলেন, সেই ‘ঈশ্বরচন্দ্র’ নামেই তিনি উত্তরকালে জন-সমাজে পরিচিত হইয়াছেন। ঈশ্বরচন্দ্র যৎকালে গর্ভে ছিলেন, তৎকালে জননী ভগবতী দেবী দশ মাস উন্মত্তার হ্যায় ছিলেন। দুর্গাদেবী বধুর রোগাপনয়নের জন্য কতই প্রতিকার করিয়াছিলেন, কিন্তু কিছুতেই উপশম হয় নাই। তৎকালে কোন কোন বৃদ্ধা দুর্গাদেবীকে বলিতেন, তোমার বধূমাতাকে ভূতে পাইয়াছে; আবার কেহ কেহ বলিতেন, ডাইনী পাইয়াছে। এই সকলের রোজা আনাইয়া দেখান হয়, কিন্তু কিছুতেই উপশম হয় নাই। অবশেষে উদয়গঞ্জনিবাসী পণ্ডিত-প্রবর ভবানন্দ শিরোমণি ভট্টাচার্য্য মহাশয়কে দেখান হয়। তিনি ঐ প্রদেশের মধ্যে চিকিৎসা ও গণিতশাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। রোগের তথ্যানুসন্ধানবিষয়ে তাঁহার বিশিষ্টরূপ ক্ষমতা ছিল। ইনি রোগ নির্ণয়ের পূর্ব্বে রোগীর কোষ্ঠী গণনা করিতেন। ইনি দুর্গাদেবীকে বলিলেন, “আপনার বধূমাতার আমি রোগ নির্ণয় করিলাম, এক্ষণে ইহার কোষ্ঠী দেখিতে ইচ্ছা করি। চিকিৎসক ভট্টাচার্য্য মহাশয় উক্তরূপ কথা বলিলে দুর্গাদেবী তাঁহার কোষ্ঠী দেখিতে দিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে ভবানন্দ গণনা করিয়া বলিলেন, ইহার কোন রোগ নাই; ঈশ্বরানুগৃহীত কোন মহা-পুরুষ ইহার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহার তেজঃ প্রভাবে এরূপ হইতেছে, কোনরূপ ঔষধ সেবন করাইবেন না। গর্ভস্থ বালক ভূমিষ্ঠ হইলেই ইনি রোগমুক্তা হইবেন। ভবানন্দ ভট্টাচার্য্য মহাশয় যাহা বলিয়া-ছিলেন তাহাই হইল। প্রসবের পরক্ষণেই ভগবতী দেবীর আর কোন উন্মাদচিহ্ন পরিলক্ষিত হইল না। এ কারণ, দুর্গাদেবী সর্ব্বদা ভবানন্দ ভট্টাচার্য্যের গণনার ভূয়সী প্রশংসা করিতেন।

 ঈশ্বরচন্দ্র ভূমিষ্ঠ হইবার কিয়ৎক্ষণ পূর্ব্বে, ঠাকুরদাস দ্রব্যাদি ক্রয় করিবার জন্য অতি সন্নিহিত কুমারগঞ্জের হাটে গিয়াছিলেন। তথা হইতে বাটীতে আসিতেছেন দেখিয়া, রামজয় কিছু অগ্রসর হইয়া বলিলেন, “ঠাকুরদাস, অ্য আমাদের একটী এঁড়ে বাছুর হইয়াছে।” তৎকালে গৃহে একটী গাভীও গর্ভিনী হইয়াছিল। ঠাকুরদাস মনে করিলেন, গর্ভবতী গাভীটী প্রসব করিয়াছে। তিনি বাটী প্রবেশ করিয়া গোশালায় গমন করিলেন, কিন্তু দেখিলেন গাভী প্রসব করে নাই। তখন রামজয় ঈষৎ হাস্যবদনে স্মৃতিকাগৃহে প্রবেশ করিয়া ঈশ্বরচন্দ্রকে দেখাইয়া বলিলেন, “এছেলে এঁড়ের মত বড় একগুয়ে হইবে। ইহার প্রতিজ্ঞা হিমাদ্রির ন্যায় অটল অচল রহিবে এবং প্রতিজ্ঞার পরাক্রমে চতুর্দিক কম্পিত হইবে, একারণ এঁড়ে বাছুর বলিলাম। ইহার দ্বারা উত্তরকালে দেশের বিশেষরূপ উপকার হইবে। তুমি ইহাকে সামান্য এঁড়ে জ্ঞান করিবে না, এ নিজের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিয়া সর্ব্বত্র জয়ী হইবে, এই বালক ক্ষণজন্মা, প্রতিদ্বন্দ্বিহীন ও দয়ার অবতার হইবে, ইহার যশোগীতিতে সমগ্র বঙ্গভূমি ধ্বনিত হইবে, এই বালক ভূমিষ্ঠ হওয়ায় আমার বংশে চিরস্থায়ী কীর্ত্তিলাভ হইল। আজ আমার স্বপ্নদর্শন সত্য হইল।”

 সত্ত্বগুণসম্পন্ন ঈশ্বরপরায়ণ সাধু মহাপুরুষগণ সময়ে সময়ে ভগবৎ-প্রেমে উন্মত্ত হইয়া আত্মহারা হইয়া পড়েন, তখন তাঁহাদের হৃদয়শায়ী ভূতভাবন ভগবান্ ভূতকল্যাণের জন্য তাঁহাদের মুখ দিয়া যাহা বলান, তাঁহারাও ভূতাবিষ্টের ন্যায় তাহাই বলেন। এই সকল সারবান্ উক্তিই মহাপুরুষের মহাবাক্য নামে খ্যাত। তীর্থ পর্য্যটনকারী, ধর্ম্মনিষ্ঠ, ঈশ্বর-পরায়ণ রামজয়, বারশিশু ঈশ্বরচন্দ্রকে সন্দর্শন করিয়াই বুঝিতে পারিয়া-ছিলেন,ঈশ্বরানুগৃহীত কোন মহাপুরুষ তাঁহার বংশে জন্ম গ্রহণ করিলেন। সেইজন্য, তিনি ভগবৎ প্রেমে আত্মহারা হইয়া সন্তোজাত শিশুর সম্বন্ধে যে সকল ভাবী উক্তি বলিয়াছিলেন, সেই সকল উক্তিই উত্তরকালে ঈশ্বর-চন্দ্রের জীবনে ভবিষ্যদ্বাণী রূপে পরিণত হইয়াছিল।

 ঈশ্বরচন্দ্রের ভূমিষ্ঠ হইবার কিছুক্ষণ পরে গ্রহবিপ্রশ্রেষ্ঠ কেনারাম আচার্য্য আসিয়া বালকের ঠিকুজী প্রস্তুত করিলেন। ঠিকুজী প্রস্তুত করি-বার কালে, ফল বিচার করিয়া কেনারাম বিস্মিত হইলেন। কোষ্ঠী গণনায় ভবিষ্যৎ জীবনের আভাষ পাওয়া যায়। আচার্য্য গণনার দ্বারা ব্যক্ত করিলেন,—"এই বালক ক্ষণজন্মা; উচ্চ গ্রহ সকল প্রত্যক্ষ পরিদৃশ্যমান হইতেছে, এরূপ ফল কাহারও কোষ্ঠীতে অদ্যাপি দেখিতে পাই নাই। এ বালক জগদ্বিখ্যাত নৃপতুল্য ও দয়াময় হইবে, এবং দীর্ঘায়ু হইয়া নিরন্তর ধন ও বিদ্যাদান করিয়া, সাধারণের দুঃখনিবারণ করিবে।”

 প্রাকৃতিক সৌন্দর্যশালিনী, জ্ঞান-ভক্তি-প্রসবিনী ভূকৈলাস ভারত-ভূমি পুণ্যের লীলাক্ষেত্র। এই এই পুণ্যক্ষেত্রে কত মহাত্মাই জন্মগ্রহণ করিয়া দেশকে পবিত্র করিয়াছেন, কত অমূল্য সত্যরত্ন দান করিয়া দেশকে সমৃদ্ধিশালী করিয়াছেন, তাহার ইয়ত্তা নাই। এই সেই পুণ্যভূমি ভারতভূমি, যেখানে পুণ্যতোয়া ভাগীরথী, সরস্বতী, দৃষদ্বতী, নর্ম্মদা, সিন্ধু, কাবেরী প্রভৃতি স্রোতস্বিনীগণ প্রবাহিত হইয়া দেশকে পবিত্র করিতেছে। এই সেই পুণ্যভূমি ভারতভূমি, যেখানে আর্য্যকুলতিলক ঋষিগণ মনোহর আশ্রমে উপবেশন করিয়া সমতানে সমস্বরে সেই আদিদেবের স্তুতিবাদ করিতেন, আর সামগানে তাঁহার মহিমা কীর্ত্তন করিতেন। এই সেই দেবলোক ভারতভূমি, যেস্থানের নৈমিষারণ্যে শ্বেতশ্মশ্রুধারী, দীর্ঘকায়, তেজঃপুঞ্জ, শুদ্ধচেতা মুনিগণ ভগবদ্ভক্তিরস পান করিতে করিতে ভক্তিতত্ত্ব ব্যাখ্যা ও শ্রবণ করিতেন। এই সেই দেবলোক ভারতভূমি, যেখানে ধ্যানস্তিমিতলোচন সমাধিস্থ যোগিগণ একান্তমনে পর্ব্বতকন্দরে বা সরযূতটে ব্রহ্মধ্যানে মগ্ন হইয়া চিদানন্দ পুরুষের দর্শনে অপার যোগানন্দ সম্ভোগ করিতেন। এই সেই পুণ্যের লীলাক্ষেত্র ভারতভূমি, যেখানে বুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য, নানক আবির্ভূত হইয়া পতিত নরনারীর উদ্ধারসাধন করিয়াছিলেন। এই সেই পুণ্যের লীলাক্ষেত্র ভারতভূমি যেখানে কুমারিলভট্ট, শঙ্করাচার্য্য, কবীর, রামানুজ, রামমোহন প্রভৃতি মহাপুরুষগণ জন্মগ্রহণ করিয়া স্ব স্ব ধর্ম্মমত প্রচার করিয়াছেন। ভারতভাগ্য চিরদিনই এইরূপ বিধাতার অযাচিত অনুকম্পালাভে সুপ্রসন্ন।

 বিধাতার রাজ্যে একাদিক্রমে অন্যায় অত্যাচার অধিকদিন রাজত্ব করিতে পারে না। মানবজীবন ধারাবাহিকরূপে অধিক দিন অশেষ ক্লেশ সহা করিতে পারে না। জনসমাজ দুরাচারী পাপ-ভারাক্রান্ত লোকদিগকে বহন করিয়া অধিক দিন যন্ত্রণাভোগ করিতে অসমর্থ। যিনি ত্রিভুবনপালক বিশ্বনিয়ন্তা, তিনি নিয়ত জাগ্রত থাকিয়া এই মামবজীবনের পরিচালক হইয়া স্থিতি করিতেছেন। তিনি মানবমণ্ডলীর আধ্যাত্মিক গতি ও লক্ষ্য নির্দ্দিষ্ট করিয়া যুগে যুগে নানা প্রকার লীলা প্রদর্শন করিতেছেন। সেই জন্য দেখিতে পাই ধর্ম্মবিপ্লব, সমাজবিপ্লব, সমাজসংস্কার ও সামাজিক পরিবর্ত্তনের সময়ে অবনীমণ্ডলে এক একজন মহাপুরুষের আবির্ভাব হয়। মহাত্মা রামমোহন, ডেভিড্ হেয়ার, রামকমল, রাধাকান্ত যে কর্ম্মক্ষেত্র প্রস্তুত করিয়াছিলেন, সেই কর্ম্মক্ষেত্রে কার্য্য করিবার জন্য অলৌকিক পৌরুষ ও প্রতিভাশালী, অসাধারণ অধ্যবসায়ী ও সহিষ্ণু, দয়া ও প্রেমের অবতার, এক বিরাট মহাপুরুষের আবির্ভাবের সময় উপস্থিত হইয়াছিল। সেইজন্য, বঙ্গের শুভদিনের সুপ্রভাতে বীরসিংহ ক্ষুদ্র পল্লীর দরিদ্র ব্রাহ্মণ ঠাকুরদাসের পর্ণকুটীরে বীরশিশু ঈশ্বরচন্দ্র জন্মগ্রহণ করিলেন। পুণ্যশীলা বীরমাতা ভগবতী দেবীর পবিত্র অঙ্কে বিরাজমান হইয়া তাঁহাকে ধন্য করিলেন।