বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী/পারিবারিক জীবন

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ॥ পারিবারিক জীবন

 পারিবারিক বন্ধন মানবজাতির অশেষ কল্যাণ ও সুখের নিদানস্বরূপ। পারিবারিক সম্বন্ধই মানবজীবন ও পশুজীবনে প্রভেদের পরিচায়ক, এবং পারিবারিক দায়িত্বজ্ঞান বা দায়িত্বহীনতাই, মানবচরিত্রকে দেবভাবে সম্বর্ধিত বা পশুভাবে পরিণত করে। ইহসংসারে যিনি পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ নহেন, তাঁহার চরিত্রপরীক্ষার উপযুক্ত স্থল কোথায়? ইহসংসারে যাঁহার আপনার বলিতে কেহই নাই, এই সুখময় ভূমণ্ডল তাঁহার নিকট যে দুঃখময় জীর্ণ অরণ্যবৎ প্রতীয়মান হইবে, তাহাতে আর বিচিত্র কি? মানবের পরিজনবেষ্টিত সংসার সত্য সত্যই তদীয় সুখ ও সদ্গতির লীলাভূমিস্বরপ। পারিবারিক বন্ধনই মনুষ্যহৃদয়ে প্রকৃত বল ও শক্তির সঞ্চার করিয়া থাকে, এবং পরিবারস্থ সকলের পরিচর্য্যা দ্বারাই মানবচরিত্রের উৎকর্ষলাভ ঘটে।

 হৃদয়ের উদারতাই মানবের সভ্যতার পরিচায়ক। সেইরূপ, যেখানে হৃদয়ের ক্ষুদ্রতা ও সকীর্ণতা, সেইখানেই অজ্ঞানতা ও অসভ্যতার আধিপত্য। মানুষ যতদিন এই অজ্ঞানান্ধকারে থাকে, ততদিন তাহার চারিধারের এই বহুর মধ্যে সে সেই এককে দেখিতে পায় না। মানবসমাজের এই অসংখ্য খণ্ডতার মধ্যে চিরদিন যে মহতী একতা বিরাজ করিতেছে, তাহা উপলদ্ধি ও অনুভব করিতে সে অসমর্থ। সেইজন্য, আপনার মোহবশে সে তাহার চতুর্দ্দিকের এই বৃহৎ জগতকে, এই বিপুল মানব সমাজকে সঙ্কীর্ণ ও ক্ষুদ্র করিয়া তাহার আপন ধারণার ও হৃদয়ের উপযুক্ত করিয়া লয়। কিন্তু, ক্রমে তাহার জ্ঞান যতই পরিস্ফুট হইয়া উঠে, প্রাণ যতই প্রসারিত হইতে থাকে, ততই সে তাহার সেই ক্ষুদ্র জগতের সীমার গণ্ডীকে বিস্তৃত ও বৃহৎ করিয়া তুলে। এই ক্রমোন্নতি ও ক্রমবিকাশই সংসারের নিয়ম। এই নিয়মের বশে মনুষ্যহৃদয় তাহার আপন ক্ষুদ্র সীমা অতিক্রম করিয়া, ক্রমে পরিবারের, তাহার পর গ্রামের, তাহার পর প্রদেশের, তাহার পর দেশের ও অবশেষে জগতের সকলেরই মধ্যে ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে। তখন তাহার চতুর্দ্দিকের এই অসংখ্য দেশকে সে একই পৃথিবী বলিয়া উপলদ্ধি করে, এবং বহুবর্ণে, ধর্ম্মে ও আচার ব্যবহারে পৃথগ্‌ভূত এই অগণ্য মানবসমাজকে তাহার আপন সমাজ বলিয়া সে স্বীকার করে। তখন এই পৃথিবীর সকল দেশই তাহার স্বদেশ, সকল জাতিই তাহার স্বজাতি। এই উদারতা, এই সভ্যতাই উন্নতির চরম আদর্শ।

 মহাজনগণের কথা স্বতন্ত্র। যাহারা বিশ্বপ্রেমিক, দিব্যজ্ঞানালোকে যাঁহাদিগের চক্ষু জ্যোতিষ্মান, বসুধাকে যাঁহারা আপনার বলিয়া মনে করিতে পারিয়াছেন, যাঁহারা ‘অয়ং নিজঃ পরোবেতি’ গণনা বিস্মৃত হইয়া, সাধনার বলে ধৃতি, ক্ষমা সহিষ্ণুতা চরিত্রগত করিয়াছেন, ইহসংসারে শোণিতসম্পর্কবিচার তাহাদের পক্ষে প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করি না। কারণ, তাঁহারা স্বজাতি বা পৃথিবীর সমস্ত অধিবাসিবৃন্দকে এক পরিবারস্থ মনে করিয়া, তাঁহাদেরই পরিচর্য্যায় আত্মসমর্পণ করিয়াছেন। কিন্তু জগতে সেরূপ রমণীরত্ন, ব্য সেরূপ মহাপুরুষ অতি দুর্লভ সে বিষয়ে অণুমাত্র সন্দেহ নাই।

 পারিবারিক বন্ধন মনুষ্যহৃদয়ে সুখ, শান্তি ও পবিত্রতা বিস্তার করে। লঘু ভেদে পরিবারস্থ পরস্পরের প্রতি পরস্পরের প্রীতি ও পরিচর্য্যার বিনিময়ই ইহার কারণ। জনক জননী যদি নিঃস্বার্থ প্রীতিবশতঃ সন্তানের হিতকামনা না করিতেন, সন্তান যদি স্বাভাবিক ভক্তিবশে পিতামাতার সেবা না করিত, পতি যদি প্রণয়ের অনুরোধে পত্নীর সুখ সাধনে যত্নবান্ না হইতেন, এবং পত্নী যদি পৃথিবীর সমস্ত আকর্যণ তুচ্ছজ্ঞান করিয়া সর্ব্বকালে সব স্থানে পতির সুখ দুঃখের অংশভাগিনী না হইতেন, তাহা হইলে এই সংসার মরীচিকাসঙঙ্কুল মরুভূমি বা ভয়ঙ্কর শ্মশানভূমি হইতেও যে ভীষণতর হইত, তাহা কে না স্বীকার করিবেন? সুখদঃখের অংশভাগী কাহাকেও যদি মানুয ইহসংসারে না পায়, তাহা হইলে সে জীবিত থাকিতে পারে না। কেহ কোন বিষয়ে অকৃতকার্য্য হইলে, তাহার সহিত সমবেদনা প্রকাশ করিবার অথবা তাহার দুঃখ উপশম করিবার জন্য ইহসংসারে যদি তাহার কেহ না থাকে, তাহা হইলে তাহার হৃদয় যে দুঃখভারে অবনত ও হইয়া পড়িবে, ইহা ধ্রুব নিশ্চিত। সেইরপ কোন ব্যক্তি অসাধ্যসাধনে কৃতকার্য্য হইয়া গৃহে প্রত্যাগত হইলে, যদি তাহার মুখের দিকে প্রসন্নভাবে দৃষ্টিপাত করিবার তাহার কেহ না থাকে, তাহার উৎসাহ ও তৃপ্তির অংশভাগী হয়, এরূপ কোন প্রিয়জন সে ইহসংসারে অন্বেষণ করিয়া না পায়, তাহা হইলে সৎকার্ষ্য ও সাধনায় তাহার অনুরাগ কোন ক্রমেই অনুদিন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইতে পারে না।

 ইহসংসারে নারীপ্রকৃতি ও পুরুষপ্রকৃতি করুণাময় পরমেশ্বরেব দুই বিচিত্র সৃষ্টি। এই উভয় প্রকৃতিই অনুপম সৌন্দর্য্যের আধার। পুরুষের শরীর বলিষ্ঠ, কর্ম্মঠ, —নারীদেহ সুকোমল ও লাবণ্যে পরিপূর্ণ; পুরষপ্রকৃতি শৌর্য্য, বীর্য্য, দৃঢ়তা প্রভৃতি গুণের আধার—আর নারীপ্রকৃতি স্নেহ, মমতা, সহিষ্ণুতা প্রভৃতি গুণের মূর্ত্তিমতী প্রতিকৃতি। বিধাতার এমনই সৃষ্টিকৌশল যে, পাছে, ঐ প্রকৃতিদ্বয় পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইয়া তাঁহার শুভ অভিপ্রায়ের পরিপন্থীরূপে যাবতীয় সৃষ্টিক্রিয়ার ব্যাঘাত উৎপাদন করে, এইজন্য তিনি উহাদিগকে পরম্পরসাপেক্ষ করিয়া দিয়াছেন। যেরূপ পর্ব্বতগাত্র নিঃসৃত দুইটি জলস্রোত সমতল ভূমিতে আসিয়া পরস্পর মিলিত হইযা এক হইয়া যায় এবং সেই একীভূত জলস্রোত শক্তি ও সৌন্দর্য্য বিস্তার করিতে করিতে অনন্ত সাগরাভিমুখে প্রধাবিত হয়, সেইরূপ রমণী ও পুরষ ইহসংসারে জন্মগ্রহণ করিয়া লালিত পালিত ও সম্বর্দ্ধিত হয়, এবং শুভ-পরিণয় যোগে পরস্পর সম্বন্ধ হইয়া অনন্ত উন্নতি ও সাধনার দিকে অগ্রসর হইতে থাকে। ইহারই নাম স্বাভাবিক প্রেম। এই স্বাভাবিক প্রেমমুগ্ধ দুই অভিন্ন হৃদয়ের যে পরপর উদ্বাহ বন্ধন, তাহাই প্রকৃত পবিত্র পরিণয়। এই শুভ-পরিণয় প্রথাই পরিবারগঠনের মূল এবং মানবের সংসারবন্ধনের সেতুস্বরূপ।

 কর্ত্তব্যসাধনেই মানুষের মনুষ্যত্ব। হিতাহিত বিচার কর্ত্তব্যজ্ঞানের মূূলেই নিহিত রহিয়াছে। পরিণয়-সূত্রে আবদ্ধ হইয়া পরিবারবর্গে পরিবেষ্টিত হইলে, মানুষের দাম্পত্যকর্ত্তব্য এবং অপত্যাদির প্রতি কর্ত্তব্যের উৎপত্তি হইয়া থাকে। প্রতিবেশীর সুখস্বচ্ছন্দতার প্রতি দৃষ্টি রাখাও পৌরজন মাত্রেরই কর্ত্তব্য। মানবজাতিতে জন্ম হেতু, আর আত্মকর্ম্ম ও অবস্থাবশতঃই মানুষকে কতকগুলি কর্তব্যসাধন করিতে বাধ্য হইতে হয়। এইরপে চিন্তা করিলে, মানুষের কর্তব্যের অসীম পরিসর দেখিতে পাওয়া যায়। পিতামাতার প্রতি সন্তানের, সন্তানের প্রতি পিতামাতার, পতির প্রতি পত্নীর, পত্নীর প্রতি পতির, ভ্রাতাভগিনীর প্রতি ভ্রাতাভগিনীর, আত্মীয় কুটুম্বের প্রতি আত্মীয় কুটুম্বের, প্রতিবেশীর প্রতি প্রতিবেশীর, স্বদেশবাসীর প্রতি স্বদেশবাসীর এবং প্রত্যেক মনুষ্যের প্রতি প্রত্যেক মনুষ্যের কর্ত্তব্য রহিয়াছে। এই সকল কর্ত্তব্যের কোন একটি সাধিত না হইলেই, মানুষকে অপরাধী হইতে হয়।

 জ্ঞান ও শক্তি অনুসারে মানুষের কর্তব্যের পরিসর বর্ধিত হইয়া থাকে। মাতাপির প্রতি কর্ত্তব্য বুদ্ধিমান ও পারদর্শী সন্তানের যত অধিক, নির্বোধ বা অল্পবয়স্ক সতানের তত নহে। যিনি যে পরিমাণে বিধাতার প্রদত্ত সম্পদ লাভ করিয়াছেন, তিনি সেই পরিমাণে তাহার সদ্ব্যবহার না করিলে প্রত্যব্যয়গ্রস্ত হইবেন তাহাতে সন্দেহ কি? কর্ত্তব্যসাধনেই প্রকৃত ধার্ম্মিকতা। কর্ত্তব্য যাহার নিকট দুর্ব্বহ নহে, কর্ত্তব্যকার্য্যসম্পাদন, তিক্ত ঔষধ সেবনের ন্যায় যাঁহার নিকট ক্লেশকর নহে, বালকের ব্যায়ামের ন্যায় কর্ত্তব্য যাহার নিকট মঙ্গলকর ও সুখপ্রদ, তিনিই প্রকৃত নিষ্কামধর্ম্মের অধিকারী ও সাধুপদবাচ্য।

 ১২৪৮ সালের অগ্রহায়ণ বা ১৮৪১ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে, ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের প্রধান পণ্ডিতের পদে মাসিক ৫০ টাকা বেতনে বিদ্যাসাগর মহাশয় নিযুক্ত হন। ইহার কয়েক মাস পরে বিদ্যাসাগর মহাশয় পিতাকে কর্ম্ম পরিত্যাগ করিতে পরামর্শ দেন। তিনি বলিলেন, “বাবা, এখন আমি মাসে ৫০ টাকা বেতন পাইতেছি, ইহার দ্বারা স্বচ্ছন্দে সংসার চলিবে। আপনি এ পর্য্যন্ত আমাদের জন্য বিস্তর কষ্ট সহ্য করিয়াছেন এবং অকাতরে পরিশ্রম করিয়াছেন। আপনাকে আর শরীরপাত করিতে দিব না। আপনি দেশে গিয়া অবস্থিতি করুন।” বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিরতিশয় নির্বন্ধে বাধ্য হইয়া ঠাকুরদাস কর্ম্ম পরিতাগপূর্ব্বক বীরসিংহে গমন করিলেন। বিদ্যাসাগর প্রতি মাসে তাহাকে ২০ টাকা পাঠাইয়া দিতেন এবং আপনার বাসাখরচের নিমিত্ত ৩০ টাকা রাখিতেন।

 ঠাকুরদাস কর্ম্ম হইতে অবসর গ্রহণ করিলে পর মাতা দুর্গাদেবী উপযুক্ত পুত ও পুত্রবধুর উপর সংসারের যাবতীয় ভার অপণ করিয়া প্রশান্তমনে ভগবচ্চিন্তায় দিনযাপন করিতে লাগিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ও সংসারের জন্য অর্থব্যয়ের ভার পিতার উপর এবং পরিবারে গৃহিণীপনার ভার জননীর উপর অর্পণ করিয়া নিশ্চিন্ত রহিলেন। মাতাপিতাও উপযুক্ত পুত্রের অনভিমত কোন কর্ম্ম প্রাণান্তেেও করিতেন না। পরস্পরের মধ্যে এইরূপ দায়িত্বজ্ঞান ছিল বলিয়াই ঐ একান্নবর্ত্তী পরিবারের গার্হস্থ্য ধর্ম্মসাধনে কোন প্রকার অন্তরায় উপস্থিত হয় নাই।

 ন্যায়পরাণতা পারিবারিক শান্তি ও উন্নতির প্রতিভূ-স্বরূপ। একান্নবর্ত্তী পরিবার মধ্যে বাস করিতে হইলেই প্রবল ও দুর্ব্বল, স্বার্থপর ও পরার্থপরায়ণ, কোপন এবং ক্ষমাশীল, এবম্বিধ বিবিধ প্রকার অবস্থা ও চরিত্রশালী বহু লোককে একত্র অবস্থিতি করিতে হয়। ন্যায়জ্ঞান যদি মানুষের স্বাভাবিক না হইত, ন্যায়ান্যায় বিচার দ্বারা যদি পরিবার পরিচালিত না হইত, তাহা হইলে অত্যাচার, অপচয় এবং বাদ বিসংবাদে উহা উৎসন্ন হইয়া যাইত। একান্নবর্ত্তী বৃহৎ পরিবারে সদ্য যে সকল অসুবিধা সংঘটনের সম্ভাবনা, ঠাকুরদাসের গৃহে সেরাপ অসুবিধার অভাব ছিল না। কিন্তু তাঁহার ন্যায়দণ্ডের তুলাবিধানে সে সকল অসুুবিধা ও অভিযোগ জলবিম্ববৎ উৎপত্তি মাত্রই লয় প্রাপ্ত হইত। এইরূপে ঠাকুরদাস গৃহকর্ত্তারূপে স্বীয় পরিবারের এবং অভিভাবকরূপে প্রতিবেশিগণের তত্ত্বাবধান করিতে আরম্ভ করিলেন এবং ভগবতী দেবী গৃহিণীরূপে গৃহের ও হিতৈষীণীরপে প্রতিবেশিগণের সেবা শুশ্রূষায় নিয়ত নিরত হইলেন এবং তাঁহার পারিবারিক জীবনেরও সূচনা হইল।

 বর্ত্তমান এবং ভবিষ্যৎ সুখ ও মঙ্গল সাধনের জন্যই মানুষ সংসারযাত্রা আরম্ভ করে। কিন্তু মানুষের আত্মকর্ম্মফলে সেই সুখ ও মঙ্গল লাভের কতকগুলি অন্তরায় ঘটিয়া থাকে। আলস্য পারিবারিক সুখ নাশের এক প্রধান হেতু। আলস্য দারিদ্র্যের মুলীভূত কারণ এবং চরিত্র-শিথিলতার নিত্যসহচর। দারিদ্র্য নানা দুঃখের জন্মদাতা, মনুষ্যের মনুষ্যত্বনাশক, এবং জনসমাজের শক্তি ও পবিত্রতার মুলোৎপাটক। এই গুণরাশিনাশী দারিদ্র্যের এক প্রধান কারণ আলস্য। কেবল দারিদ্রতারই উৎপাদক নহে। সংসারের মধ্যে এক ব্যক্তি অলস হইলে, তাহাকে অপর ব্যক্তির গলগ্রহ হইতে হয়, অপর ব্যক্তি বা ব্যক্তিদিগকে তাহার করণীয় পরিশ্রমের ভার বহন করিতে হয়। ইহাতেও বহুস্থলে মনোভঙ্গ হইয়া থাকে।

 অক্ষমা পারিবারিক শান্তিভঙ্গের অন্য এক প্রধান কারণ। পরস্পরের সুখদুঃখের ভাগী হইয়া, যে কতকগুলি লোক এক পরিবারভুক্ত হইয়া থাকে, তাহাদিগের মধ্যে বিশেষ সহিষ্ণুতার প্রয়োজন। একপরিবারস্থ জনগণের পদেপদে পরস্পরের ইচ্ছা, রুচি ও স্বচ্ছন্দতার বিরোধী হইবার সম্ভাবনা। অতএব যাহাতে মনোভদের কারণ না ঘটে, তদ্বিষয়ে যেমন সাবধান হওয়া আবশ্যক, তেমনই আবার ক্ষমাশীল হইতে যত্ন করাও সর্ব্বতোভাবে কর্ত্তব্য। উগ্রস্বভাবই অসহিষ্ণুতার কারণ। ক্ষমাশীল লোক পারিবারিক বন্ধনের অটল স্তম্ভ। ক্ষমাশীল লোকদ্বারা যে পরিবার গঠিত হয়, তাহা সংসার সুখের দুর্গস্বরূপ।

 পারিবারিক সুখের আর এক অন্তরায় আতিশয্য। কোন বিষয়েই আতিশয্য বাঞ্ছনীয় নহে। সামঞ্জস্য রক্ষা করা প্রাকৃতিক নিয়মের এক প্রধান লক্ষণ। মানুষের হৃদয়মনের কোন ব্যৃত্তি বা ভাব অস্বাভাবিক রূপে আতিশয্য লাভ করিলে, মানবজীবন বিকৃত এবং অক্ষম হইয়া পড়ে। সমঞ্জসীভূত উন্নতি সাধনেই মনুষ্য জীবনের সৌন্দর্য্য ও কার্য্যকারিতা অবস্থিতি করে। কোন বিষয়ে আতিশয্য হইলেই জীবনের সৌন্দর্য্য ও কার্য্যকারিতার ব্যাঘাত ঘটিয়া থাকে। আত্মরক্ষার্থে এবং আত্মজনের হিতার্থে অর্থসঞ্চয় করা যেমন মনুষ্যমাত্রেরই কর্ত্তব্য, তেমনিই আবার দয়াদাক্ষিণ্য প্রভৃতি সদ্‌গুণের বিকাশ দ্বারা চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন ও সমাজের হিতসাধন করিবার জন্য, দান এবং পরোপকার করাও মানুষের অবশ্য কর্ত্তব্য। কিন্তু সঞ্চয় বা দান, ইহার কোন বিষয়েই আতিশয্য প্রার্থনীয় নহে। সঞ্চয়ে আতিশয্য অবলম্বন করিলে, মানুষ কার্পণ্য অবলম্বন করিয়া কেবল যে দান বা পরোপকারেই নিবৃত্ত থাকে, তাহা নহে, আত্মহিত এবং আত্মজনের প্রয়োজন সাধনার্থে ব্যয় করিতেও কুণ্ঠিত হইয়া থাকে। চন্দনভারবাহী গর্দ্দভ যেমন উহার ভারই উপলব্ধি করিতে পারে, উহার অন্যান্য গুণ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে না, কৃপণ ব্যক্তিও সেইরূপ সংসারের ভার বহন করে এবং ঐ ভার মাত্র উপলব্ধি করিতে পারে— পারিবারিক জীবনের মাধুর্য্য হৃদয়ঙ্গম করিতে অসমর্থ।[১] এইজন্য কবি অমরভাষায় সমৃদ্ধিশালী কৃপণ ব্যক্তিদিগকে সম্ভাষণ করিয়া বলিয়াছেন—“তুমি ধনী হইলেও দরিদ্র। গর্দ্দভ উহার নিপীড়িত পৃষ্ঠে পিণ্ডীভূত সুবর্ণরাশির ভার বহন করে, তুমিও সেইরূপ ধনের ভার মাত্র বহন করিয়া পথে একটুকু অগ্রসর হইতেছ, এবং পরিশেষে মত্যু আসিয়া তোমায় সেই ভার হইতে বিমুক্ত করিতেছে।[২] ব্যয়কুণ্ঠতা যেমন একদিকে অন্যায়, সেইরূপ অপরদিকে দান বা পরোপকারে আতিশয্য অবলম্বন করিলেও মানুষ অপব্যয়ী এবং অপরিণামদর্শী হইয়া সর্বস্বান্ত হইয়া থাকে, এবং পরিণামে বিপৎকালে আত্মরক্ষা বা আত্মজনের প্রতি অবশ্য কর্ত্তব্যকার্য্যও করিয়া উঠিতে পারে না। কার্পণ্য এবং অমিতব্যয়িতা হইতে দূরে থাকিয়া, জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করিবার চেষ্টা করাই প্রকৃত জ্ঞানী লোকের কর্ত্তব্য।

 পারিবারিক সুখের আর এক অন্তরায়, পারিবারিক জীবনে শ্রদ্ধর অভাব। শাস্ত্রে আছে:—“ক্ষুধাতে প্রজ্ঞা নষ্ট করে, ধর্ম্মবুদ্ধি বিলুপ্ত হয়। যাহার জ্ঞান ক্ষুধাতে নষ্ট হইয়াছে, তাহার ধৈর্য্যও থাকে না। যে বভুক্ষাকে জয় করে, সে নিশ্চিত স্বর্গ জয় করে। যেখানে দান প্রবৃত্তি থাকে, সেখানে ধর্ম্ম কখনও অবসন্ন হয় না। মনুয্যের দ্রব্যার্জ্জন সূক্ষ্ম ব্যাপার। উপযুক্ত পাত্রে দান করা, তাহা হইতে শ্রেষ্ঠ। উপযুক্ত কালে দান, তাহার অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, কিন্তু শ্রদ্ধাই সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। স্বর্গ দ্বার অতি সূক্ষ্ম। মনুষ্য মোহবশতঃ তাহা দেখিতে পায় না। লোভবীজ তাহার অর্গলঘস্বরূপ। ক্রোধকর্তৃক তাহা রক্ষিত। অতএব তাহা অতি দুরাসদ। যে পুরুষেরা জিতক্রোধ, জিতেন্দ্রিয়, যোগযুক্ত, তপস্বী, ব্রাহ্মণ, এবং যাঁহারা যথাশক্তি দান করেন, তাঁহারাই তাহা দেখিতে পান। যাঁহার শক্তি সহস্র পরিমিত, তিন শত দান করিলে যে ফল হয়, যাঁহার শক্তি শত পরিমিত, তিনি দশদান করিলেই সেই ফল হয়। শক্তি অনুসারে কেবল জলদান করিলেও সেই ফল হয়। মহামুল্যদানে ধর্ম্ম প্রীত হন না, ন্যায়লবদ্ধ সামান্য বস্তু শ্রদ্ধাপূতচিত্তে দান করিলে সন্তুষ্ট হন। ঐশ্বর্য্য মনুষ্যের পুণ্যের কারণ নহে। সজ্জনগণ আপনার শক্তিতে যাহা সদুপায়ে উপার্জ্জন করেন, বিবিধ যজ্ঞ, সেই ন্যায়লদ্ধ ধনের তুল্য পুণ্যের কারণ নহে। ক্রোধ দান ফল নষ্ট করে। লোভ থাকিলে কেহ স্বর্গে যাইতে পারে না। ন্যায়বৃত্তি দ্বারাই দানবিৎ স্বর্গপ্রাপ্ত হন। রন্তিদেব নামে রাজা দরিদ্রাবস্থায় শুদ্ধচিত্তে কেবল একটু জলদান করিয়াই স্বর্গে গমন করিয়াছিলেন। নৃগ রাজা ব্রাহ্মণগণকে সহস্র গো দান করিয়াও একটি পরকীয় গো দান করিয়াছিলেন বলিয়া তাঁহার নরকগমন হইয়াছিল। উশীনর পুত্র শিবিরাজা আত্মমাংস দান করিয়া পুণ্যবান্‌গণের প্রাপ্য যে লোক তাহা লাভ করিয়া আনন্দ ভোগ করিতেছেন।[৩] ফলতঃ পারিবারিক জীবনের সমস্ত বিষয়ই শ্রদ্ধাপূতচিত্তে সম্পন্ন করা সর্ব্বতোভাবে বিধেয়।

 পারিবারিক সুখের প্রধান অন্তরায় মানবের ধর্ম্মহীনতা। ধর্ম্মভাব ও ধর্ম্মানুষ্ঠানবিহীন পরিবার বর্ত্তমান ও ভাবী দুর্গতির উৎপত্তি স্থান। যাঁহারা ঈশ্বরের অযাচিত স্নেহের প্রতিনিধিজ্ঞানে জনকজননীকে ভক্তি করেন, যাঁহারা পতিপত্নীতে প্রাণের বিনিময় করিয়া, সম্মিলিতহৃদয়ে ঈশ্বরদত্ত সংসার ভোগ করেন, যাঁহারা ঈশ্বরের ভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া সন্তান প্রতিপালন করেন, তাঁহারাই যথার্থ পবিবার প্রতিপালন করেন। পরিবারসাধন তাঁহাদিগেরই পক্ষে তৃপ্তি ও সদ্গতির হেতু হইয়া থাকে। যাঁহারা পারিবারিক ক্ষুদ্র মহৎ প্রত্যেক ব্যাপার ঈশ্বরের অযাচিত করুণার অভিনয়রূপে প্রত্যক্ষ করিতে পারেন, পরিবার তাঁহাদিগের নিকট স্বর্গসুখের প্রতিকৃতিস্বরূপ, পারিবারিক উন্নতির জন্য তাঁহাদিগের পরিশ্রম, পুণ্যতীর্থের পথপর্য্যটনস্বরূপ, এবং তাঁহাদের পারিবারিক প্রত্যেক কার্য্য স্বর্গরাজ্যের সোপানস্বরূপ হইয়া থাকে।

 ঠাকুরদাসের ঔরসে ও ভগবতী দেবীর গর্ভে সাত পুত্র ও তিন কন্যা জন্ম গ্রহণ করেন। পুত্রগণের নাম, ঈশ্বরচন্দ্র, দীনবন্ধু, শম্ভুচন্দ্র, হরচন্দ্র, হরিশচন্দ্র, ঈশানচন্দ্র ও ভূতনাথ। তিন কন্যার নাম,—মনোমমোহিনী, দিগম্বরী ও মন্দাকিনী। আমরা যে সময়ের প্রসঙ্গ বলিতেছি, তখন ঈশ্বরচন্দ্র ও দীনবন্ধুর শুভ পরিণয় কার্য্য্য সম্পন্ন হইয়াছে। সুতরাং পুত্র, কন্যা, পুত্রবধু ও পরিবারভুক্ত আশ্রিত আত্মীয় স্বজন লইয়া ভগবতী দেবীর এক বৃহৎ সংসার। সংসারই মানুষের প্রকৃত পরীক্ষার স্থল। সংসাররূপ পরীক্ষাক্ষেত্রে ভগবতী দেবী কি ভাবে ও কি পরিমাণে কর্তব্যানুষ্ঠান করিতে পারিয়াছিলেন, নিম্নলিখিত ঘটনাবলী পাঠে পাঠকগণ তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতে প্রয়াস পাইবেন।

 আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি, আলস্য পারিবারিক সুখের এক অন্তরায়। আলস্য ও জড়তা যাহাতে পরিবার মধ্যে প্রবেশ লাভ করিতে না পারে, তৎপ্রতি ভগবতী দেবীদ তীক্ষ দৃষ্টি ছিল। তিনি পরিবারস্থ প্রত্যেকের কতকগুলি কার্য্য নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছিলেন। পর্য্যায়ক্রমে প্রত্যেককেই সেই সকল কার্য্য প্রত্যহ সুসম্পন্ন করিতে হইত। এইরূপে একের করণীয় পরিশ্রমের ভার অপরকে বহন করিতে হইত না। সুতরাং পরিবার মধ্যে এ সম্বন্ধে মনোভঙ্গেরও কোন কারণ উপস্থিত হইত না। এই সকল পারিবারিক বিধি যাহাতে পরিবারস্থ সকলে ক্লেশকর মনে না করে, সেইজন্য তিনি স্বয়ং প্রাতঃকাল হইতে রজনীর প্রায় তৃতীয় প্রহর পর্যন্ত অক্লান্ত ভাবে পরিশ্রম করিতেন। প্রাতঃকালে শয্যাত্যাগ করিয়া প্রাতঃকৃত্য সমাপনান্তর গৃহ এবং গৃহের যাবতীয় পদার্থের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি তিনি মনোনিবেশ করিতেন। দ্রব্যের অপচয় সম্পত্তি সঞ্চয়ের বিরোধী, সকল দ্রব্য হইতেই কোন না কোন প্রয়োজন সাধিত হইতে পারে, এইজন্য তিনি অতি সামান্য দ্রব্যও সযত্নে রক্ষা করিতেন। গৃহসামগ্রীসকল বিশৃৃঙ্খল করিয়া রাখা, সম্পত্তি রক্ষা ও সম্পত্তি বৃদ্ধির প্রতিকূল। গৃহ এবং গৃহস্থিত দ্রব্যাদি শীঘ্র বিনষ্ট হইতে দিলে সত্বরই ধনক্ষয় হয়, এইজন্য তিনি সর্ব্বাগ্রে গৃহের যাবতীয় বিষয়ের শৃঙ্খলা স্থাপন করিতেন। এই সকল কার্য্যে তিনি গহের শিশু সন্তানদিগের সাহায্য গ্রহণ করিতেন। তিনি গৃহের সন্তানদিগকে শিক্ষা দিতেন, “আমি যদি গৃহে থাকি, আর কেহ কোন দ্রব্য লইতে আইসে তাহা হইলে, ‘নাই’ কথা কখন মুখে আনিও না। আমি যে পরিমাণে দিই, সে পরিমাণে না দিলেও, কিছু দিবে। শুধু হাতে তাহাদিগকে ফিরাইয়া দিবে না।” তিনি প্রত্যহ স্বয়ং রন্ধন করিতেন। এবং পরিবারস্থ সকলকে সমভাবে পরিবেশন করতেন। এ সম্বন্ধে কেহ কখন তাঁহার পার্থক্য দৃষ্টিগোচর করে নাই। পরিবারস্থ সকলের আহারাদি সুসম্পন্ন হইতে দ্বিপ্রহর অতীত হইয়া যাইত। তৎপরে কোন অতিথি সমাগত হয় কি না দেখিবার জন্য তিনি দুই এক ঘণ্টা অপেক্ষা করিতেন। ইহার মধ্যে কোন অতিথি উপস্থিত হইলে, মুখের অন্নে অভ্যাগতের পরিচর্য্যা করিতেন। শেষে হয়ত স্বয়ং উপবাস কিম্বা সামান্য জলযোগ করিয়া সমস্ত দিন যাপন করিতেন। তিনি যে কেবল আপনার সংসার লইয়াই দিবারাত্রি ব্যস্ত থাকিতেন এরূপ নহে। প্রতিবেশী দিগের মধ্যে কেহ হয়ত পীড়িত হইয়াছে, পথ্যাদি রন্ধন করিয়া দিবার লোক নাই, এই সকল তাঁহার কর্ণগোচর হইলেই তিনি তৎক্ষণাৎ নিজ গৃহ হইতে পথ্যাদি রন্ধন করিয়া প্রসন্নচিত্তে তাহাকে দিয়া আসিতেন। নিরন্তর তিনি কোন না কোন কার্য্যে ব্যাপত থাকিতেন। দ্বিপ্রহর রজনীতে ভোজনান্তে যখন সকলে বিশ্রাম সুখ লাভ করিত, তখনও তিনি একাকিনী বসিয়া চরকায় সুতা কাটিতেন। এইরূপে সংসারকে তিনি এক প্রকৃত কর্ম্মক্ষেত্রে পরিণত করিয়াছিলেন এবং হিংসা, দ্বেষ, অসূয়া প্রভৃতি মানসিক ব্যাধিসমূহ যাহাতে পরিবারস্থ জনগণকে আক্রমণ করিতে না পারে, তিনি তাহার প্রকৃষ্ট উপায় বিধান করিয়া রাখিয়াছিলেন। পরনিন্দায়, পরচর্চ্চায় তিনি অত্যন্ত বিরক্তি প্রকাশ করিতেন। তিনি বলতেন, “তুমি নিজের মন্দ না করিয়া কখন পরের অপকার করিতে পার না। অপরকে লঘু; মনে করিতে গিয়া নিজেই লঘু হইয়া যাইবে। অপরের সহৃদয়তা গ্রহণ করিতে বিমুখ হইলে, তুমিও শীঘ্র হৃদয়শূন্য হইবে। তুমি স্বয়ং ভিন্ন অন্য কে তোমার অপকার করিতে পারে? তোমার যাহা অমঙ্গল ঘটে, তুমি নিজে তাহা দিবারাত্রি সঙ্গে সঙ্গে বহন করিয়া থাক; এবং নিজের দোষ ব্যতীত কখনই সত্য সত্য ক্লেশভোগী হও না। সুতরাং অপরের যাহা গুণ তাহাই দেখিবে ও আলোচনা করিবে। দোষের দিকে লক্ষ্য রাখিবে না। অন্যের প্রতি হিংসা, দ্বেষ প্রকাশ করিবে না। অন্যের ভাল দেখিলে আনন্দ প্রকাশ করিবে।”

 ফলতঃ সমাজে থাকিয়া ন্যায় ও প্রীতির বন্ধন ছেদন করিতে গেলেই শীঘ্র শাস্তিভোগ করিতে হয়। ভয় ও আশঙ্কা নানাদিকে উদিত হইয়া তাহার শাস্তি বিধান করে। যতদিন সহচর মানবগণের সহিত স্বভাবের সরল বন্ধনে আবদ্ধ থাকি, ততদিন তাহাদিগকে দেখিয়া কোন বিরক্তি জন্মে না। তখন পরস্পর মিলনে সরিৎ সঙ্গম বা দুই বায়ু প্রবাহের ন্যায় মিশিয়া এক হইয়া যাই। কিন্তু ঋজুপথ পরিত্যাগ করিয়া কুটিল পথ অবলম্বন করিলে, অথবা ‘আমার ভাল, তাহার নয়’ ইত্যাকার স্বার্থানুকূল কর্ম্মের চেষ্টা করিবামাত্র প্রতিবেশী অন্যায় বুঝিতে পারে। আমি তাহার প্রতি যতদূর সঙ্কোচ প্রকাশ করিয়াছি, সেও আমার প্রতি ততদূর সঙ্কোচ প্রকাশ করে। তাহার চক্ষু আর আমার চক্ষুকে অন্বেষণ করে না। বিরোধ উভয়ের অন্তরে উদিত হয় এবং তাঁহার মনে ঘৃণা ও আমার মনে ভয়ের সঞ্চার হইতে থাকে। সুতরাং আমার কার্য্যের জন্য আমিই একমাত্র দায়ী। ক্রিয়া মাত্রেরই দণ্ড ও পুরস্কার স্বতঃই বিহিত হইয়া থাকে। দণ্ড অপরাধের স্বভাবসহর। অপরাধ ও দণ্ড এক বৃক্ষ হইতেই সম্পন্ন। দণ্ডরূপ ফল, প্রমো কুসুমের স্নিগ্ধ ও সুরভি অভ্যন্তরেই অজ্ঞাতসারে পরিপক্কতা লাভ করে। ও পরিণাম, উপায় ও উদ্দেশ্য, বীজ ও ফল স্বভাবতঃ যুগ্ম সামগ্রী; তাহাদিগকে বিচ্ছিন্ন করা মনুষ্যের সাধ্য নহে। কারণ পরিণাম হেতুর অভ্যন্তরেই প্রস্ফুটিত ও উদ্দেশ্য উপায় মধ্যেই প্রাগ্বর্ত্তমান এবং বীজের অভ্যন্তরেই ফল স্বভাবতঃ সন্নিহিত।

 শ্বশ্রু দুর্গাদেবী যতদিন পর্য্যন্ত জীবিত ছিলেন, ততদিন ভগবতী দেবী সাংসারিক অনেক বিষয়ে তাঁহার পরামর্শ গ্রহণ করিতেন। এক সময়ে দুর্গাদেবী ভগবতী দেবীকে বলিয়াছিলেন, ‘মা, এখন সন্তানের মা হইয়াছ, গৃহিণী হইয়াছ, এখনও কি সমস্ত বিষয়ে আমার পরামর্শ লইয়া কাম করিতে হইবে?” তদুত্তরে ভগবতী দেবী বিনীত ভাবে বলিলেন, ‘মা বাপের নিকট সন্তান চিরকালই শিক্ষা করিবে। বাল্যকালেই মাতুলালয় হইতে এখানে আসিয়াছি। আপনিই লালন পালন করিয়াছেন, নানা বিষয়ে শিক্ষা দিয়াছেন। সংসারে আমার মা বলিতে আপনি ভিন্ন আর কেহই নাই। সাংসারিক বিষয়ে আমার অপেক্ষা আপনার জ্ঞান অনেক অধিক। যতদিন পর্য্যন্ত জীবিত থাকিবেন, ততদিন সকল বিষয়ে আপনার পরামর্শ লইয়াই কার্য্য করিব।” এই কথা শ্রবণ করিয়া দুর্গাদেবী আনন্দাশ্রু, বিসর্জ্জন করিতে করিতে পুত্রবধুকে আশীর্ব্বাদ করিলেন। ভগবতী দেবী দুর্গাদেবীকে মাতৃবৎ শ্রদ্ধা ও ভক্তি করিতেন, দুর্গাদেবী পরলোক গমন করিলে, ভগবতী দেবী এরূপ শোকাকুল হইয়াছিলেন যে, মধ্যে মধ্যে তাঁহার নাম স্মরণ করিয়া মাতৃহীন শিশুর ন্যায় বিলাপ ও রোদন করিতেন।

 পরিবারস্থ জনগণ পদে পদে পরপরের ইচ্ছা, রুচি ও স্বচ্ছন্দতার বিরোধী হইবার সম্ভাবনা। অতএব যাহাতে মনোভঙ্গের কারণ না ঘটে, তদ্বিষয়ে যেমন সাবধান হওয়া আবশ্যক, তেমনিই আবার ক্ষমাশীল হইতে যত্ন করাও সর্ব্বতোভাবে কর্তব্য। উগ্র স্বভাবই অসহিষ্ণুতার কারণ। অগ্নিস্ফুলিঙ্গ যেমন ফুৎকারে প্রজ্বলিত হইরা গ্রাম ও নগর দগ্ধ করে, সেইরূপ সামান্য কারণেও ক্রোধোদয় হইয়া, পৃথিবীতে তদপেক্ষা গুরতর বিভ্রাটই ঘটিয়া থাকে। উগ্রতাবশতঃ মুহূর্ত্ত মধ্যে যে ক্ষতি হইতে পারে, চিরজীবনে তাহার প্রতিকার হয় না। কোন কোন লোক এমন অসহিষ্ণু যে, পরিবার মধ্যে বিসম্বাদ ঘটাইয়া পরের নিকট গৃহচ্ছিদ্র প্রকাশ করিয়া দেয়। অত্যধিক উগ্রতাই তাহাদিগকে অন্ধ করিয়া ফেলে। কিন্তু কালক্রমে পরের দ্বারা নিন্দিত ও নিগৃহীত হইয়া, তাহার এই অপরিণামদর্শিতার প্রায়শ্চিত্ত করিয়া থাকে। পরিবারস্থ সকলে যাহাতে সহিষ্ণু ও ক্ষমাশীল হয়, ভগবতী দেবী সর্ব্বপ্রযত্নে সেই চেষ্টা করিতেন। কন্যাগণ কোন নবীনা বধূর কোন ত্রুটি উল্লেখ বা তাহার উপর দোষারোপ করলে ভগবতী দেবী বলতেন, “সংসারের সামান্য বিষয়ে এরূপ দৃষ্টি কেন? আহা! ছোট ছোট বৌগুলি মা বাপের কোল হইতে আমার কাছে আসিয়াছে। আমি যদি উহাদের মুখের দিকে না চাহিব, তবে আর কে চাহিবে? তোমরাও আমার নিকট যেরূপ, উহারাও সেইরূপ। তোমাদের শত শত দোষ দিবারাত্রি মাপ করিতেছি, আর উহাদের দোষ কি আমি মাপ করিব না? কই, বৌমারা ত তোমাদের নামে কখন কিছু বলে না। তোমাদের দেখি কত সুখ্যাতি করে। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কি ভগিনী কোন কনিষ্ঠ ভ্রাতা কি ভগিনীকে প্রহার কি তিরস্কার করিলে, যদি সে তাঁহাকে বলিতে আসিত, তিনি বলিতেন, “অন্যায় কার্য্য করিয়াছ সেই জন্য মারিয়াছে। আর ওরূপ কার্য্য করিও না, দেখিবে কত ভাল বাসিবে।” পরিশেষে জ্যেষ্ঠ সহোদর কি জ্যেষ্ঠা ভগিনীকে সুযোগক্রমে বলিতেন, “আহা, ছোট ছোট ভাই, বোনগুলিকে ওরূপ করিয়া মার কেন? উহারা রাত দিন ‘দাদা’, ‘দিদী’, ‘দিদী’ করিয়া বেড়ায়; তোমাদের কি একটু মায়া মমতা হয় না; ওরূপ অধৈর্য্য কেন? মিষ্ট কথায় উহাদিগকে বুঝাইয়া দিলেই হয়।” এইরূপে পরিবার মধ্যে যাহাতে ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা গুণের আধিক্য পরিলক্ষিত হয় সে বিষয়ে ভগবতী দেবী বিশেষ যত্নবতী ছিলেন। পরস্পরের প্রতি পরস্পরের যাহাতে অনুরাগ বৃদ্ধি হয়, তিনি তাহারই উপায় বিধান করিতেন। ফলতঃ ভক্তি, প্রেম, প্রণয় ও স্নেহাদি অনুরাগেরই অন্তর্ভূত। ‘ইহা আমার অনুকূল’ এই জ্ঞানই অনুরাগ বা প্রীতির মূলে বর্ত্তমান এবং ইহার বাহ্য প্রকাশই উক্ত ভক্তি ইত্যাদি। কোথাও ইহার ব্যভিচার দৃষ্টিগোচর হয় না। ভক্তি, প্রেম, প্রণয় ও স্নেহাদি সকলই এই অনুরাগ মহোদধির ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা মাত্র। ভক্তি বা প্রেম উৎপত্তির পথে ভক্তিভাজন ও প্রেমাষ্পদের সৌন্দর্য্য অনুভূত হয়, অনন্তর ‘ইনিই আমার অনুকল’ এবম্বিধ জ্ঞান জন্মে; ক্রমে উহা ধারাবাহিক রূপ ধারণ করে এবং ঘনীভূত হইতে থাকে। তখনই মানব অন্যবস্তু ভুলিতে থাকে। অবিরত ঐ ছবি তাহার সম্মুখে বর্ত্তমান থাকে। অবিশ্রান্ত এই সৌন্দর্য্যময়ী ধারা চিত্তে প্রবাহিত থাকিয়া যাবতীয় পদার্থে সেই মনোমোহন রূপের সম্বন্ধ আনয়ন করিয়া তাহাকে বিচিত্র রসানুভব করাইতে থাকে। ভগবতী দেবী পুত্র ও পুত্রবধূদিগের মধ্যেও পরস্পরের সৌন্দর্য্যের অনুভূতি দ্বারা যাহাতে অনুরাগ বৃদ্ধি পায়, সে বিষয়েও সবিশেষ যত্নবতী ছিলেন।

 নবীনা বধূরা তাঁহার স্নেহ মমতায় এরপ মুগ্ধ হইয়াছিলেন যে, শ্বশুর গৃহে আসিয়া একদিনের জন্যও তাঁহারা মাতার অভাব অনুভব করিতে পারেন নাই। পিত্রালয় অপেক্ষা শ্বশুরালয়ে তাহারা পরম সুখে কালাতিপাত করিয়াছিলেন।

 ভগবতী দেবী পুত্রকন্যাদিগকে বিলাসিতা ও আত্মসুখ বিসর্জ্জন করিতে সতত শিক্ষা দিতেন। কন্যাগণকে বলিতেন, “তোমাদের বিবাহ হইলে, স্বামীর নিকট গহনা বা ভাল কাপড়ের প্রার্থনা করিও না। বরং সেই অর্থ যাহাতে পরের দুঃখমোচনে ব্যয় করিতে পার, তাহার চেষ্টা সর্ব্বতোভাবে করিবে।” ভগবতী দেবী ও ঠাকুরদাসের স্বর্ণালঙ্কারের প্রতি বিলক্ষণ দ্বেষ ছিল। তাঁহারা প্রায়ই বলিতেন, “বাটীর গ্রীলোকদিগকে অলঙ্কার দিলে, বাটীতে ডাকাইতি এবং দস্যুর ভয় হইবে। স্ত্রীলোকদিগের মনে অহঙ্কারের উদয় হইবে, এবং গহস্থালী কার্য্যে তাহাদের সেরূপ যত্ন থাকিবে না। দীন দরিদ্রের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করিবে। অলঙ্কার না করিয়া ঐ টাকায় যথেষ্ট অন্নব্যয় করিতে পারিব। তাহাতে দরিদ্র বালকেরা আমাদের বাটীতে ভোজন করিয়া লেখাপড়া শিখিতে পারিবে।” বাটীর স্ত্রীলোকদিগকে তাঁহারা সূক্ষ্মবস্ত্র পরিধান করিতে দিতেন না। কখন কখন কলিকাতা হইতে সূক্ষ্মবস্ত্র পাঠাইয়া দিলে অত্যন্ত বিরক্তি প্রকাশ করিতেন। বাটীর স্ত্রীলোকদিগের জন্য মোটা বস্ত্র ক্রয় করিয়া দিতেন। এবং পাকাদি সাংসারিক কার্য্য করিবার জন্য সর্ব্বদা উপদেশ দিতেন।

 ভগবতী দেবী পারিবারিক প্রত্যেক কার্য্যই শ্রদ্ধাপূতচিত্তে সম্পন্ন করিতেন। গৃহে কোন অতিথি উপস্থিত হইলে, ভগবতী দেবী স্বহস্তে পরিবেশন করিয়া ভোজন না করাইলে নিরতিশয় দঃখানুভব করিতেন। নবাগত ব্যক্তিদিগের যাহাতে কোন প্রকার ক্লেশ না হয়, তজ্জন্য তিনি প্রাণপণে যত্ন ও চেষ্টা করিতেন। শারীরিক অসুস্থ থাকিলেও তিনি অতিথিদিগকে আহার না করাইয়া শয়ন করিতেন না। অনেক পরিবারে এরূপ দেখা যায় যে, পরিবারস্থ লোকেরা যে প্রকার সুখ ও সুবিধায় আহারাদি করে, অতিথিদিগের ভাগ্যে সেরূপ ঘটে না। কিন্তু ভগবতী দেবীর গৃহে সেরূপ বৈষম্য ছিল না। সকলকে সমানভাবে আহার্য্য প্রদত্ত হইত; বরং অভ্যাগতদিগের বিশেষ সমাদর হইত। এক সময়ে স্কুলসমূহের ইনস্পেক্টার প্রতাপনারায়ণ সিংহ ভগবতী দেবীর গৃহে অতিথি হন। ভগবতী দেবী একখানি থালায় করিয়া স্বহস্তে অন্ন আনয়ন করিলে, প্রতাপনারায়ণ বলিলেন, “বাটীর সকলে যে প্রকার শালপাতায় ভোজন করেন, আমিও তাঁহাদের সঙ্গে একত্র বসিয়া তদ্রুপ ভোজন করিব।” ভগবতী দেবী এই কথা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া বলিলেন, “তুমি বড় ঘরের ছেলে। তুমি যে সকলের সহিত একত্র হইয়া শালপাতায় খাইতে চাহিতেছ, ইহা অতি আশ্চর্য্যের কথা। আমার মনে হয় তোমার প্রকৃত জ্ঞানলাভ হইয়াছে।”

 তিনি বিদেশীয় অনুপায় রোগীদের শুশ্রূষাদি কার্য্যে বিশেষরূপ যত্নবতী ছিলেন। কাহারও নিরামিষ ব্যঞ্জন, কাহারও মৎস্যের ঝোল প্রভৃতি স্বয়ং প্রস্তুত করিয়া দিতেন, তাঁহাকে এই কার্য্যে কেহ কখনও বিরক্ত হইতে দেখে নাই। বাটীর অন্যান্য স্ত্রীলোকেরাও এই সকল বিষয়ে তাঁহার অনুকরণ করিতেন। বিবাহিতা বিধবাদের মধ্যে কেহ পীড়িত হইয়া চিকিৎসার জন্য বাটীতে আসিলে, অথবা অপর কেহ রোগগ্রস্ত হইয়া উপস্থিত হইলে, ভগবতী দেবী তাহাদের মলমূত্রাদি পর্য্যন্ত পরিষ্কার করিতেন, তাহাতে কিছুমাত্র ঘণা বোধ করিতেন না।

 ভগবতী দেবী প্রত্যহ মধ্যাহ্নে রন্ধনাদি সম্পন্ন করিয়া এবং আশ্রিত অতিথিদিগকে ভোজন করাইয়া বাটীর দ্বারে দাঁড়াইয়া থাকিতেন। হাটবারে হাটুরেরা ফিরিবার সময়, তিনি তাহাদিগের মধ্যে যাহাদের মুখ শুষ্ক দেখিতেন, তাহাদিগকে ডাকিয়া বলিতেন, “আহা, আজ বুঝি তোমার খাওয়া হয় নাই। মুখখানি শুখাইয়া গিয়াছে। এস, এস আমাদের বাটীতে এস। গরীব ব্রাহ্মণের বাটীতে ডাল ভাত প্রসাদ পাইয়া যাও।” এই কথা বলিয়া তিনি তাহাদিগকে ডাকিয়া আনিয়া খাওয়াইতেন।

 কোন বৃহৎ কার্য্য বাটীতে উপস্থিত হইলে, গ্রামের দরিদ্র স্ত্রীজন মাছের পোঁটা, কুটনার খোলা ইত্যাদি লইতে আসিলে, তিনি তৎসঙ্গে তাহাদিগকে কিছু মাছ দিতেন। ঠাকুরদাস ইহা দেখিয়া এক সময়ে বলিলেন, “তুমি এরূপ করিলে, ব্রাহ্মণ ভোজনে কম পড়িবে।” তদুত্তরে ভগবতী দেবী বলিলেন, “তোমার ব্রাহ্মণেরা ভোজন করিবেন, আর এই গরিবেরা কি ভাল জিনিষ খাইবে না?” তদবধি ঠাকুরদাস তাঁহার এইরূপ বিতরণের জন্য স্বতন্ত্র ব্যবস্থা করিতেন।

 ভগবতী দেবী ধর্ম্মবোধে পারিবারিক সর্ব্ববিধ কর্ম সুসম্পন্ন করিতেন। ধর্ম্মবোধেই তিনি নানারূপ ক্লেশ স্বীকার করিয়াও বিবিধ সদনুষ্ঠানে সতত নিরত থাকিতেন। তিনি দয়া ও পরোপকার জীবনের মহাব্রত বলিয়া মনে করিয়াছিলেন। তাঁহার কার্য্যে পবিত্র দেবভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। কোন সদনুষ্ঠানে তিনি কখনও গর্ব্ব প্রকাশ করেন নাই। তাঁহার মুখমণ্ডল সর্ব্বদা বিনয় ও শীলতায় শোভিত থাকিত। তাঁহার কোমল প্রকৃতি কখনও অকৃতজ্ঞতায় কলুষিত হইত না এবং তাঁহার অসামান্য দয়াও কখনও পক্ষপাতের ছায়া স্পর্শ করিত না। তিনি সকল সময়েই নিস্পাপ ও নিষ্কলঙ্ক ছিলেন। সকল সময়েই পবিত্রতার কমনীয় কান্তি তাঁহাকে গৌরবান্বিত করিয়া রাখিত। ঈশ্বরের প্রতি নির্ভরের ভাব তাঁহাকে সকল সময়েই দঢ়প্রতিজ্ঞ ও অধ্যবসায়সম্পন্ন করিয়া রাখিত। তিনি যেন প্রাণে প্রাণে উপলদ্ধি করিতেন যে, এই জগৎ মধ্যে একজন মহান সর্ব্বভারাক্রান্ত চিন্ময় কর্ত্তা সর্ব্বত্র বিদ্যমান থাকিয়া, মানুষের সঙ্গে সঙ্গে সহকারীর ন্যায় কর্ম্ম করিতেছেন। সেই সত্যনিষ্ঠ স্বভাবস্থিত পুরুষ, কোন কালবিশেষ বা স্থানবিশেষের প্রসূত নহেন। প্রত্যুত তিনি যাবৎ সংসারের কেন্দ্রবর্ত্তী; যেখানে তিনি বিদ্যমান, সেইখানেই সৃষ্টিস্থিতিশীলা; এবং তিনিই তোমার আমার ও মানবজাতির অনন্ত ঘটনাপ্রবাহের একমাত্র মানদণ্ড। এইরপ ধর্ম্মভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া তিনি সংসার সাধন করিয়াছিলেন বলিয়াই তাঁহার সংসার শান্তি-নিকেতনে পরিণত এবং ঐশ্বর্য্যশ্রীতে গৌরবান্বিত হইয়াছিল।

 সন ১২৭৬ সালের শ্রাবণ মাসের শেষে বিদ্যাসাগর ভগবতী দেবীকে কাশীবাস করিবার জন্য পিতৃসন্নিধানে পাঠাইয়া দেন। তিনি কাশীধামে ঠাকুরদাসের নিকট কতিপয় দিবস অবস্থিতি করেন। তদনন্তর অন্যান্য তীর্থস্থান পর্য্যটন করিয়া পুনর্ব্বার কাশীধামে সমুপস্থিত হন। ভগবতী দেবী ঠাকুরদাসকে বলিলেন, “এখন হইতে এখানে অবস্থিতি করা অপেক্ষা আমি দেশে অবস্থিতি করিলে, অনেক অক্ষম দরিদ্র লোককে ভোজন করাইতে পারিব। দেশে বাস করিয়া প্রতিবাসিবর্গের অনাথ শিশুগণের আনুকূল্য করিতে পারিলেই আমার মনে সুখ হইবে। সেই আমার কাশী, সেখানেই আমার বিশ্বেশ্বর।” পাঠকগণ, ভগবতী দেবীর এই উক্তি হইতেই উপলব্ধি করিবেন কিরূপ ধর্ম্মভাবে তিনি সংসার সাধন করিয়াছিলেন। তাঁহার ধর্ম্মভাব ও সংসার সাধনের বিষয় যতই পর্য্যালোচনা করা যায়, ততই যেন অতি দীনভাবে বলিতে ইচ্ছা করে “হে সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর, তোমার অখণ্ড প্রতাপের পদতলশায়ী হইয়া যেন সতত শিক্ষা করি যে, এই বিশ্ব মধ্যে ধর্ম্মই কেবল মহত্ত্ব ও ঐশ্বর্যশ্রী সৃজন এবং পরিবর্দ্ধন করিতে সমর্থ।”

 ভগবতী দেবী বৃদ্ধা শ্বশ্রূদেবীকে গৃহের অধিষ্ঠাত্রী দেবতার ন্যায় জ্ঞান করিতেন। এবং ভক্তি সহকারে তাঁহার সেবা শুশ্রূষায় সতত নিরত থাকিতেন। প্রতিদিন স্বহস্তে তিনি তাঁহার পরিচর্য্যা করিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিতেন। এইরূপে তিনি গৃহের অন্যান্য ধর্ম্মানুষ্ঠানের ন্যায় তাঁহার সেবা শুশ্রূষা নিত্য নৈমিত্তিক ধর্ম্মানুষ্ঠানের মধ্যে পরিগণিত করিয়াছিলেন।

 ভগবতী দেবী আজীবন ঠাকুরদাসের সুখ দুঃখের সঙ্গিনী ছিলেন। দুঃখে কষ্টে ভগবতী যখন ঠাকুরদাসের পার্শ্বে সমাসীন হইয়া তাঁহাকে মধুর বাক্যে সান্ত্বনা দিতেন, তখন ঠাকুরদাস সত্য সত্যই মনে করিতেন, তিনি যেন আর ইহজগতের জীব নহেন; যেন স্বর্গরাজ্যে অবস্থিতি করিতেছেন এবং তাঁহার পার্শ্বদেশে কোন দেবীমূর্ত্তি অধিষ্ঠিত হইয়া তাঁহার মঙ্গল কামনায় নিরত রহিয়াছেন।[৪]

 ভগবতী দেবী ও ঠাকুরদাসের দাম্পত্য প্রেম অতীব মধুর ছিল। ফলতঃ প্রকৃত দাম্পত্য প্রেম জগতে অতি দুর্লভ পদার্থ এবং বহু পণ্যফলেই লাভ হইয়া থাকে। এ সম্বন্ধে মহাকবি ভবভূতির গভীর ভাবপূর্ণ শ্লোকটিই মনে পড়েঃ—

“অদ্বৈতং সুখদুঃখয়োরনুগুণং সর্ব্বাস্ববস্থাসুযৎ—
বিশ্রামো হৃদয়স্য যত্র জরসা যস্মিন্নহার্য্যেরসঃ।
কালেনাবরণাতায়াৎ পরিণতে যৎ স্নেহসারেস্থিতং
ভদ্রং প্রেম সুমানুষস্য কথমপ্যেকং হি তৎ প্রাপ্যতে।

 যে প্রেম সুখে ও দুঃখে একরূপ, সকল অবস্থায় অনরূপ, যাহা অবলম্বন করিয়া সাংসারিক দুঃখরাশি নিপীড়িত হৃদয় বিশ্রামসুখ লাভ করে, বার্দ্ধক্যেও যাহার মাধুর্য্য অপহৃত বা বিলুপ্ত হয় না, এবং কালের আবর্ত্তনে লজ্জাদি প্রতিবন্ধকের অপগমে, যাহা পরিপক্কতা প্রাপ্ত হইয়া স্নেহরসে পরিণত হয়, সেই শ্রেষ্ঠ অকপট সজ্জনের প্রেম বহু পুণ্যফলে প্রাপ্ত হওয়া যায়।

 পারিবারিক ধর্ম্মের মধ্যে স্ত্রীজাতির সতীত্বধর্ম্ম সর্ব্বশ্রেষ্ঠ। যেমন গন্ধবিহীন পুষ্প, বিনয়বিহীন ধার্ম্মিক, মীনহীন সরোবর ও তরুহীন জনপদ অনুশোচ্য; সতীত্ববিহীন রমণীও ততোধিক অনুশোচ্য। সকল ব্রত অপেক্ষা পাতিব্রত্যব্রত অতি কঠোর। এই ব্রত আত্মোৎসর্গের পূর্ণ বিস্ফুরণ। প্রকৃত পাতিব্রত্য কেবলমাত্র বাহ্য অনুষ্ঠানে আবদ্ধ নহে; আভ্যন্তরীণ তন্ময়ত্বও সেই আভ্যন্তরীণ তন্ময়ত্বের বাহ্যক্রিয়া—এই দুইটি ইহার অঙ্গীভূত। স্থূলদর্শীরাই ধর্ম্মের বাহ্যাড়ম্বরে ভুলিয়া যান। কিন্তু ধর্ম্ম বাহিরের জিনিষ নয়। ইহা হৃদয়ের জিনিষ, প্রাণের জিনিষ, সম্ভোগের জিনিষ। যিনি সত্যধর্ম্মের আস্বাদ একবার পাইয়াছেন, তিনি ধন্য হইয়াছেন, কৃতার্থ হইয়াছেন ও অমরত্বের অধিকারী হইয়াছেন। যখন আর্য্যভূমিতে স্বয়ম্বরপ্রথা প্রচলিত ছিল—স্ত্রীজাতির আপন আপন আদশপতি নির্ব্বাচনের অধিকার ছিল,—সেই পবিত্র সরল সত্যনিষ্ঠ পুরাকালেই ভারতে সতীত্বধর্ম্মের পূর্ণ বিকাশ হইয়াছিল। সতীত্ব গুণে পতিকে দেবভাবে পূজা আর কোন দেশের মহিলা কখন করিয়াছিলেন কি না জানি না। এই সতীত্ব গুণেই ভারতললনা চিরদিন জগতের আদর্শরূপিনী।

 মানুষের বহিরিন্দ্রিয় অপেক্ষা অন্তরিন্দ্রিয়ের আলোচনাই অধিক আনন্দজনক। মানবদেহ যেমন অস্থি, চর্ম্ম, মেদ ও মাংসে গঠিত, মানবাত্মাও সেইরূপ কতিপয় উপকরণে গঠিত হইয়াছে। জ্ঞান, ভাব ও ইচ্ছা, এই ত্রিবিধ চিত্তবৃত্তি অবলম্বন করিয়াই, মানবাত্মা কার্য্য করিয়া থাকে। চিন্তা, কল্পনা এবং ধারণা প্রভৃতি অদ্ভুত শক্তি মানুষের মন, এবং প্রেম, সাহস ও ভয় বিরাগাদি অত্যাশ্চর্য ভাবরাশি মনুষ্যের হদয় অসীম বৈচিত্র্যে পূর্ণ করিয়া রাখিয়াছে। আবার মানুষের ইচ্ছাশক্তি কি আশ্চর্য্যরূপেই না মানুষের হৃদয় মনের অনুবর্ত্তন ও কার্য্যসাধন করিতেছে! যিনি স্থিরচিত্তে মানব মনের চিন্তাপ্রণালী, মানুষের কল্পনার কমনীয় লীলচাতুরী, মানব হৃদয়ের বিবিধ ভাবের বিচিত্র তরঙ্গমালা, এবং মানুষের ইচ্ছাশক্তির অনির্ব্বচনীয় পরাক্রম পর্য্যবেক্ষণ করিতে পারেন, পথিবীতে স্বর্গের শোভা নিরীক্ষণ করিয়া, অপার্থিব সুখ সম্ভোগ করিতে তিনিই সমর্থ।

 আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি, ভগবতী দেবী সংসার সাধনকেই ধর্ম্মসাধন মনে করিতেন। কিন্তু পাতিব্রত্য ধর্ম্মসাধনে তাঁহার বাহ্যাড়ম্বরের কোন পরিচয় পাই নাই। বরং ধর্ম্মস্য তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াং মহাজনো যেন গতঃ স পন্থাঃ এই ভাবেরই পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। ফলতঃ ঠাকুরদাস ও ভগবতী দেবীর হৃদয়ে দাম্পত্য প্রেম যে কালের আবর্ত্তনে পরিপক্কতা প্রাপ্ত হইয়া স্নেহরসে পরিণত হইয়াছিল, পরস্পরকে প্রীতিসম্পন্ন করিয়াছিল, তাহাতে অণুমাত্র সন্দেহ নাই। পরম্পর প্রীতিসম্পন্ন দম্পতীই সর্ব্বতোভাবে অভিন্নহৃদয় হইয়া থাকিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু ইহলোকে সম্পূর্ণ অভিন্নহৃদয়তা সাধিত হইয়া উঠে না। যেহেতু ভাবাগমের পন্থা বিভিন্নতা হইতেই মানুষ মধ্যে এতাদৃশ মতান্তর দৃষ্ট হইয়া থাকে। একজন রূপ, আয়তন, প্রভৃতি বাহ্য গুণসম্পাতের নির্ণয় দ্বারা বস্তুসমূহকে শ্রেণীবদ্ধ করেন; অন্যজন স্বভাব-সাদশ্য বা আভ্যন্তরীণ কার্য্য কারণ সম্বন্ধ নির্ণয় করিয়া পদার্থসমূহের জাতি প্রকৃতি নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন। বুদ্ধি, কিন্তু নিয়তই কারণোন্মুখী, সর্ব্বত্রই তাহাকে পরিস্ফুট ও নিরবচ্ছিন্ন দেখিতে অভিলিপ্সু; সুতরাং বহির্বৈলক্ষণ্য সতত তাহার দষ্টিগোচর হয় না। ঋষি, কবি, দার্শনিক প্রভৃতি মনীষিগণের নয়নে সকল বস্তুই মঙ্গলময় ও পুণাময়, সর্ব্বকর্ম্ম ও ঘটনা হিতকর এবং মানব মাত্রই দেবগুণসম্পন্ন। কারণ তাঁহাদের চক্ষু সতত জীবনোপরি দৃঢ় আসক্ত, অনুষঙ্গের কোনও লক্ষ্য রাখে না। আবার প্রণয়ের স্বধর্ম্ম বিষয়াবলী সমীপবর্ত্তী হইলেই, স্বকীয় বিশুদ্ধ বহ্নিতে, তাহাদিগকে পরিশুদ্ধ করিয়া লইতে চেষ্টা করে। সুতরাং দম্পতী জীবনে পরস্পরের মধ্যে সম্যক্ অভিন্নহৃদয়তা সাধিত হইয়া না উঠিলেই, অভিমান ও উদ্বেগের উদয় হইয়া কলহের সূত্রপাত করে। অন্য বিবাদস্থলে মৌনাবলম্বনই শ্রেয়ঃ, কিন্তু দম্পতী কলহে মৌনাবলম্বন সৎপরামর্শ নহে। তাহাতে কলহাগ্নি প্রজ্বলিত হইয়া উঠে, অথবা বহির্দ্দেশে নির্ব্বাণ প্রাপ্ত হইয়া অন্তরে প্রবেশপূর্ব্বক চিত্তভূমি দগ্ধ করিয়া ফেলে। যুদ্ধক্ষেত্রে স্থির থাকিয়া সম্মুখ সংগ্রাম করাই এখানকার বিধি। ঠাকুরদাস বীরপুরুষের ন্যায় সম্মুখ সংগ্রামেই অগ্রসর হইতেন।

 ভগবতী দেবীর জ্যেষ্ঠা কন্যার বিবাহকাল উপস্থিত হইলে, ঠাকুরদাস বলিলেন, “সৎকুলীন সন্তানকে কন্যাসম্প্রদান করিব।” ভগবতী দেবী বলিলেন, “বড় ঘরে মেয়েকে বিবাহ দিতে হইবে। আমার মেয়ে যেরূপ শিক্ষাপ্রাপ্ত হইয়াছে, তাহাতে যদি বড় ঘরে বিবাহ হয়, তাহা হইলে এ মেয়ে স্বামীর দ্বারা জগতের অনেক মঙ্গলকার্য্য করিতে পারিবে।” এইরপ মতান্তর হইতে কথান্তর উপস্থিত হয়। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ঠাকুরদাস ভগবতী দেবীকে সুস্পষ্টরপে বুঝাইয়া বলিলেন, “দেখ, ধনবানের পুত্র হইলেই যে, সে পরোপকার ও সদাব্রতে নিরত থাকিবে এরূপ মনে করিও না। সদনুষ্ঠানের মূলে সৎপ্রবৃত্তি থাকা চাই। সদ্বংশে জন্মগ্রহণ করিলে প্রায়ই সৎ হয়। সুতরাং তাহার সৎপ্রবত্তি থাকাই সম্ভব। সৎপ্রবৃত্তি যদি থাকে, তাহ। হইলে সে ধনবান না হইলেও সদনুষ্ঠানে সতত যত্নবান্ হইবে।” পরিশেষে ভগবতী দেবী ঠাকুরদাসেরই ছন্দানুবর্ত্তিনী হন। সদ্বংশে কন্যাসম্প্রদান করা হয়। অতঃপর ঠাকুরদাস ভগবতী দেবীকে ‘মনসা’ বলিয়া ডাকিতেন।

 প্রবল ঝটিকার পরেই প্রকৃতি শান্তভাব ধারণ করে, কার্য্যের পরই বিরামের স্বভাবতঃ উদয় হয়, এবং বিপ্লবের পরেই শান্তি ও জ্ঞান মনুষ্যসমাজে দঢ়তর অধিকার স্থাপন করে। সেইরূপ দম্পতী কলহেরও চরম ফলটি অতীব মধুর। সুবোধ দান্তস্বভাব পুরুষের কার্য্য যাহাতে ঐ চরম ফলটি শীঘ্র ফলে, তাহার নিমিত্ত যত্ন করেন। অন্যান্য পারিবারিক বিষয় লইয়াও মধ্যে মধ্যে ঠাকুরদাস ও ভগবতী দেবীর মধ্যে মতান্তর উপস্থিত হইয়া কলহে পরিণত হইত। সময়ে সময়ে কালবৈশাখীর ন্যায় মেঘ, জল, প্রবল বাত্যা বহিয়া যাইত। ভগবতী দেবী ক্রোধাগারের দ্বার বন্ধ করিয়া শয়ন করিয়া থাকিতেন। ঠাকুরদাস জানিতেন, ভগবতী বৃহৎ মৎস্য অতিশয় ভালবাসেন। তিনি তখন মৎস্য অন্বেষণে বাহির হইতেন এবং যেখানে পাইতেন একটি বৃহৎ মৎস্য আনয়ন করিয়া ক্রোধাগারের দ্বারদেশে সজোরে নিক্ষেপ করিতেন। মৎস্য পতনের শব্দ শ্রবণমাত্র ভগবতী দেবী দ্বার উন্মোচন করিতেন এবং আস্যে হাস্য ও অপাঙ্গে অশ্রু লইয়া বাহির হইতেন। ছাই ও বঁটি লইয়া মাছ কুটিতে বসিতেন। এইরপে মধুর মিলন হইত।

 এইরূপ পারিবারিক সুখস্বাচ্ছন্দে অনেক কাল অতিবাহিত হইল। শেষে একদিন রজনীতে ঠাকুরদাস স্বপ্নে দেখিলেন, বীরসিংহ বাস্তুভিটা শ্মশানে পরিণত হইয়াছে। সংসারে ঘোর বিশৃঙ্খল উপস্থিত হইয়াছে। এইরূপ স্বপন দেখিলে পর ঠাকুরদাসের অতিশয় মানসিক অশান্তি উপস্থিত হইল। তিনি বীরসিংহ পরিত্যাগ করিয়া তীর্থবাস করিবেন স্থিরসকল্প করিলেন। সকলে তাঁহাকে বিশেষরূপে বুঝাইতে লাগিল, কিন্তু কিছুতেই তাঁহার মন প্রবোধ মানিল না। পরিশেষে তিনি কাশীধামে যাত্রা করিলেন। ভগবতী দেবী সংসারসাধন, দরিদ্র-পালন ও সেবাধর্ম্মানুষ্ঠানের জন্য বীরসিংহে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। ঠাকুরদাসের কাশীবাসের সঙ্গে সঙ্গেই সংসারে ঘোর বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হয়। ভগবতী দেবী সংকল্পিত সদাব্রতানুষ্ঠানের নিমিত্ত আমরণ যত্নবতী ছিলেন। কিন্তু ঠাকুরদাস তীর্থযাত্রা কালে তাঁহার মানসিক শান্তি যে অনেক পরিমাণে হরণ করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন, পাঠকগণ নিম্নলিখিত বিবরণ পাঠে তাহা সুস্পষ্ট হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিবেন।

 ১২৭৬ সালে শ্রাবণ মাসে ভগবতী কাশীধামে গমন করেন। এবং সেখানে কয়েক অবস্থিতি করিয়া একদিন ঠাকুরদাসকে বলিলেন, “আপনাকে এখনও অনেকদিন বাঁচিতে হইবে। কায়িক অনেক কষ্ট পাইতে হইবে, এত তাড়াতাড়ি তীর্থস্থানে আগমন করা ভাল হয় নাই। দেশে চলুন, আপনার দ্বারা দেশের লোকের অনেক উপকার হইবে। আর কিছুকাল পরে শেষে তীর্থবাস করিবেন।” কিন্তু ঠাকুরদাস তীর্থবাস পরিত্যাগ করেন নাই।

 ভগবতী দেবীর বিবিধ সদ্‌গুণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তসহ বিভিন্ন পরিচ্ছেদে বিভক্ত করিয়া এই পুস্তকে সন্নিবেশিত হইল। সে সমুদায় পাঠকগণ তাঁহার পারিবারিক জীবনের অন্তর্ভুক্ত বিবেচনা করিবেন।

  1. যথা খরশ্চন্দনভারবাহী
    ভারস্য বেত্তা ন তু চন্দনস্য।

  2. “If thou art rich, thou art poor;
    For like an ass, whose back with ingots bows,
    Thou bearest thy heavy riches but a journey,
    And Death unloads thee".—Shakespeare.

  3. মহাভারত—শান্তিপর্ব্ব।
  4. O, woman! in our hours of ease,
    Uncertain, coy, and hard to please.
    When pain and anguish wring the brow,
    A ministering angel thou!—Scott,