বিষয়বস্তুতে চলুন

বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী/প্রথম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে


ভগবতী দেবী।

ভগবতী দেবী।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

জন্ম ও বাল্যজীবন।

 এই পৃথিবীর কত স্থানে কত সূর্য্যকান্তমণি, সূর্য্যকিরণব্যতিরেকে হীনপ্রভ হইয়া রহিয়াছে, কে তাহার গণনা করে। কত উদারচেতা নরনারীর উন্নতচরিত্র আলোচনার অভাবে বিস্মৃতি-সলিলে বিলীন হইতেছে, কে বা তাহার সন্ধান রাখে। প্রতিভা ইহজগতে আদরণীয় ও পূজনীয়, এবং ইহা ঐশ্বরিক দান। করুণাময় জগদীশ্বর ধনিনির্ধন নির্ব্বিকল্পে ও নরনারীনির্ব্বিশেষে এই স্বর্গীয় ধন সকলকে বিতরণ করেন। আমরা খনা লীলাবতী প্রভৃতিতে বুদ্ধিগৌরবের পরাকাষ্ঠা দেখিয়া মুগ্ধ হই, রাণী ভবানী অহল্যাবাই প্রভৃতিতে সেবাধর্ম্ম ও শাসন-নৈপুণ্য দেখিয়া পুলকিত হই, তারাবাই দুর্গাবতী প্রভৃতিতে সামরিক কৌশল ও নীতিজ্ঞানের পরিচয় পাইয়া মুক্তকণ্ঠে তাঁহাদের যশোগানে প্রবৃত্ত হইয়া থাকি, এবং এই সকল আর্য্যরমণী নারীজাতির আদর্শভূতা ও স্বর্গস্থ দেবীসমাজের বরণীয়া বলিয়া গৌরবান্বিত হই, কিন্তু দরিদ্রের পর্ণকুটীরে প্রতিভার যে উন্মেষ, সে বিষয়ের পর্য‍্যালোচনায় আমরা সম্পূর্ণ উদাসীন। সেইজন্য মনে হয়, দরিদ্রের পর্ণকুটীরে প্রতিভার যে বিকাশ, তাহা বনজাত সুরভিকুসুম, সুগন্ধি গিরিশৈবাল ও অরণ্যসুলভ পরিমলপূর্ণ কস্তূরীর স্বকীয় গুণগৌরবের ন্যায় স্বস্থানেই স্বতঃ প্রকাশিত থাকে, জগৎ তাহার অনুসন্ধান করে না! ঊনবিংশ শতাব্দী বিধাতার কি শুভ আশীর্ব্বাদ শিরোধার্য্য করিয়া অবনীমণ্ডলে আবির্ভূত হইয়াছিল, তাহা বুধগণই বলিতে পারেন। কারণ, এই শতাব্দীতে জ্ঞানের উজ্জ্বল আলোকে এবং ধর্ম্মের বিমল ও পবিত্র জ্যোতিতে বসুন্ধরা উদ্ভাসিত হইয়াছিল। এই শতাব্দীরই প্রথমার্দ্ধে কর্ম্মবীর ফ্রাঙ্কলিন, ওয়াসিংটন, ম্যাট্সিনি, গ্যারিবল্‌ডি, উইলবারফোর্স; ধর্ম্মবীর লিনকন ও থিওডোর পার্কার প্রভৃতির জননীগণ এবং সেবাব্রতধারিণী ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, ভগিনী ডোরা, গ্রেস ডার্লিং, মেরি কার্পেণ্টার ও কুমারী কব্ প্রভৃতি মহিলাগণ পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন অংশে জন্মগ্রহণ করেন। সেই সময়ে সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা এই বঙ্গভূমির কোনও দরিদ্র ব্রাহ্মণের পর্ণকুটীরে এক নারীরত্ন জন্মপরিগ্রহ করিয়া ছিলেন। ইনিই আমাদের পুণ্যশ্লোক বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জননী সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা ভগবতী দেবী।

 এই বিশ্বের কি বিচিত্র বিধান! যে বংশে কোন মহাপুরুষ বা নারীরত্ন জন্মগ্রহণ করেন, পূর্ব্ব হইতেই সেই বংশ ঈশ্বরানুগৃহীত হইয়া থাকে। ভগবতী দেবী সম্বন্ধেও আমরা এই অশেষ কল্যাণকর নিয়মের অনুক্রম দেখিতে পাই। তাঁহার পিতামহ, একজন সত্যসন্ধ, ধর্ম্মনিষ্ঠ, সাত্ত্বিক প্রকৃতির লোক ছিলেন। পিতা মহাত্মা রামকান্ত তর্কবাগীশ জাহানাবাদ মহকুমার পশ্চিম সুপ্রসিদ্ধ গোঘাট গ্রামে বাস করিতেন। ইনি সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। তন্ত্রশাস্ত্রে ইঁহার অসাধারণ জ্ঞান ও প্রগাঢ় ভক্তি ছিল। ইনি পাতুলগ্রামনিবাসী অদ্বিতীয় পণ্ডিত পঞ্চানন বিদ্যাবাগীশ মহাশয়ের জ্যেষ্ঠা কন্যা গঙ্গামণিদেবীর পাণিগ্রহণ করেন। ইঁহার গর্ভে রামকান্তের লক্ষ্মী ও ভগবতীনাম্নী পরমসুলক্ষণা দুই কন্যা জন্মে। রামকান্ত সংসারসুখসম্ভোগ অকিঞ্চিৎকর বিবেচনা করিয়া সর্ব্বথা বিষয়বাসনা পরিহার করেন, এবং রামজীবনপুরের অতি সন্নিহিত করঞ্জী গ্রামে মাতামহাশ্রয়ে অবস্থিতি করিয়া প্রতি অমাবস্য়ায় অন্ধকারময়ী ঘোরা রজনীতে নির্জ্জন ভীষণ শ্মশানে নির্ভয়ে একাকী উপবেশন করিয়া জপ করিতেন। ক্রমে শবসাধন করিয়া তিনি সিদ্ধিলাভ করেন। শেষাবস্থায় তিনি মৌনাবলম্বন করিয়াছিলেন, মধ্যে মধ্যে ‘মঞ্জুর’ এই শব্দটী মাত্র উচ্চারণ করিতেন।

 জামাতা শবসাধন করিয়া মৌনাবলম্বন করিয়াছেন, এই সংবাদ শ্রবণ করিয়া পঞ্চানন বিদ্যাবাগীশ মহাশয় করঞ্জী গ্রাম হইতে জামাতা রামকান্ত, দুহিতা গঙ্গামণি ও দৌহিত্রী লক্ষ্মী ও ভগবতীকে পাতুল গ্রামে আনয়ন করেন। ইহার কিছুকাল পরে বিদ্যাবাগীশ মহাশয় মানবলীলা সম্বরণ করেন। তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র রাধামোহন বিদ্যাভূষণ একজন সহৃদয়, সদাশয়, ধর্ম্মপরায়ণ, পরোপকারী ও সত্যনিষ্ঠ লোক ছিলেন। আত্মীয় স্বজনের পোষণ, গুণিজনকে উৎসাহদান, সাধুতার সমাদর, বিপন্নের বিপদুদ্ধার,—এই সকল যেন তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ ধর্ম্ম ছিল। যেখানে সৎসঙ্কল্প, সদনুষ্ঠান, সৎপ্রসঙ্গ, সেখানে তিনি বিদ্যমান থাকিতেন। কায়মনোবাক্যে পরপীড়নপরিবর্জ্জন, সকলের প্রতি অভিন্নপ্রীতি ও প্রিয়চিকীর্ষা, যথাশক্তি দান,—এই শাশ্বতব্রতে বাল্যকাল হইতেই তিনি দীক্ষিত ছিলেন। স্বাভাবিক ধৈর্য্য, সহিষ্ণুতা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও ঈশ্বরে একান্ত অনুরাগ প্রভৃতি গুণে তিনি বিভিন্নপ্রকৃতি লোকদিগকে লইয়া বহুতর লোকহিতকর কার্য্য করিয়াছিলেন। পিতার অবিদ্যমানতায় অন্যান্য সহোদর ও সহোদরা এবং তাঁহাদের সন্তানগণের লালন পালনের ভার গ্রহণ করিয়া পিতার সুনাম রক্ষার জন্য এক্ষণে তিনি যত্নবান্ হইলেন। তখন হিন্দুর একান্নবর্ত্তী পরিবারস্থ সকলে কিরূপ সুখস্বচ্ছন্দে দিনযাপন করিতেন, তাহার দৃষ্টান্ত এদেশে বিরল ছিল না। তখন লোকে অর্থোপার্জ্জন করিয়া তাহার সদ্ব্যয় করিতে জানিতেন। স্বীয় পুত্র, কন্যা ও পরিবারবর্গকেই সুখী করিয়া তাঁহারা ক্ষান্ত থাকিতেন না। আত্মীয় স্বজনের সেবা, জ্ঞাতিবর্গের যথাশক্তি সাহায্য, মৃত আত্মীয় স্বজনের অনাথ ও নিরাশ্রয় পুত্রকন্যাগণের ভরণপোষণ, ধর্ম্মালোচনা, দোল, দুর্গোৎসব প্রভৃতি বারমাসে তের পার্ব্বণ, ব্রাহ্মণ ভিক্ষুককে দান, স্বীয় ভবনে শাস্ত্রকথা, কথকতা ইত্যাদির ব্যবস্থাবিধান প্রভৃতি নিষ্ঠাবান্ হিন্দুগৃহস্থোচিত কার্য্য ছিল। এবং ইহাতেই তাঁহারা আত্মপ্রসাদ লাভ করিতেন। অপর দিকে গুরুজনের প্রতি ভক্তি ও বাধ্যতা ছিল; গৃহস্বামীকে সকলে দেবতার ন্যায় ভক্তি ও সম্মান করিতেন, সংসারের মধ্যে কেহ উপার্জ্জনে অপারগ হইলে, তিনি শারীরিক পরিশ্রম দ্বারা সংসারের কল্যাণসাধনে যত্নবান্ হুইতেন এবং গৃহস্বামীর অনুগত থাকিয়া সতত তাঁহার আজ্ঞা প্রতিপালন করিতেন। এইরূপে হিন্দুর এক একটা একান্নবর্ত্তী পরিবার সংসারমরুভূমির মধ্যে এক একটা মরূদ্যান ছিল, এক একটা শান্তিনিকেতন ছিল। সেই জন্য মনে হয়, বহু শতাব্দীব্যাপিনী পরাধীনতা ও কুশিক্ষায় বঙ্গসমাজকে তখন যদিও হীনবীর্য্য ও মৃতকল্প করিয়াছিল, কিন্তু প্রাণহীন বা হৃদয়বিহীন করিতে পারে নাই। কারণ, তখন দেশে ত্যাগস্বীকার ছিল, কর্ত্তব্য ও দায়িত্ব বুদ্ধিতে দেশ প্রবুদ্ধ ছিল। আলস্য ও জড়তার মস্তকে পদাঘাত করিয়া আত্মপ্রত্যয় ও আত্মনির্ভর বলে দেশের কল্যাণের জন্য সকলে প্রাণপণে চেষ্টা করিতেন। জীবনধারণ করা ‘আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’ এই মহামন্ত্র জ্বলন্ত অক্ষরে হৃদয়ে হৃদয়ে মুদ্রিত ছিল এবং স্বার্থত্যাগী হইয়া নিজের ও অপরের কল্যাণসাধনে সকলে যত্নবান্ হইতেন। ফলতঃ স্বার্থশূন্যতাই তাঁহাদের জীবনের প্রধান ধর্ম্ম ছিল। ফলের দিকে দৃষ্টি না রাখিয়া কর্ত্তব্যবুদ্ধিতে লোক-হিতের জন্য নিরন্তর কর্ম্ম করিতে হইবে,—এইরূপ কর্ম্মে যদি প্রাণ যায়, তাহাও পরম সৌভাগ্যের বিষয়, এইভাব তখন দেশের মধ্যে প্রবল ছিল এবং সকলে ইহাকে ধর্ম্মের প্রধান অঙ্গ বলিয়া মনে করিতেন। কিন্তু হায় সেকাল আর একাল! এখন দেশে সে স্বার্থত্যাগ কোথায়? সে ধর্ম্মভাব কোথায়? হিন্দুর সেই একান্নবর্ত্তী পরিবার সহানুভূতি ও ধর্ম্মভাবের অভাবে শতধা বিভক্ত হইয়া ক্রমশঃ শক্তিহীন ও হীনবীর্য্য হইয়া পড়িতেছে!

 বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বরচিত আত্মচরিতে তাঁহার মাতুলালয়ের যে উজ্জ্বল চিত্র অঙ্কিত করিয়াছেন, যে হৃদয়স্পর্শী বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, তৎপাঠে সকলে অবগত হইতে পারিবেন, কিরূপে হিন্দুর একান্নবর্ত্তী পরিবার গার্হস্থ্যধর্ম্ম প্রতিপালন করিয়া আত্মীয় স্বজন ও সমাজের প্রভূত কল্যাণসাধন করিতেন। তিনি লিখিয়াছেন:— “সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায়, একান্নবর্ত্তী ভ্রাতাদের অধিক দিন পরস্পর সদ্ভাব থাকে না, যিনি সংসারে কর্ত্তৃত্ব করেন, তাঁহার পরিবার যেরূপ সুখে ও স্বচ্ছন্দে থাকেন, অন্য অন্য ভ্রাতাদের পরিবারের পক্ষে সেরূপ সুখে ও স্বচ্ছন্দে থাকা ঘটিয়া উঠে না। এজন্য অল্পদিনেই ভ্রাতাদের পরস্পর মনান্তর ঘটে; অবশেষে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হইয়া পৃথক হইতে হয়। কিন্তু সৌজন্য ও মনুষ্যত্ব বিষয়ে চারি সহোদর সমান ছিলেন, এজন্য কেহ কখনও ইহাঁদের চারিজনের মধ্যে মনান্তর বা কথান্তর দেখিতে পান নাই। স্বীয় পরিবারের কথা দূরে থাকুক, ভগিনী ভাগিনেয়ী ও তাঁহাদের পুত্র কন্যাদের উপরও তাঁহাদের অণুমাত্র বিভিন্ন ভাব ছিল না। ভাগিনেয়ীরা পুত্র কন্যা সহ মাতুলালয়ে গিয়া যেরূপ সুখে সমাদরে কালযাপন করিতেন, কন্যারা পুত্র কন্যা লইয়া পিত্রালয়ে গিয়া সচরাচর সেরূপ সুখ ও সমাদর প্রাপ্ত হইতে পারেন না।”

 “অতিথির সেবা ও অভ্যাগতের পরিচর্য্যা এই পরিবারে যেরূপ যত্ন ও শ্রদ্ধা সহকারে সম্পাদিত হইত, অন্যত্র প্রায় সেরূপ দেখিতে পাওয়া যায় না, বস্তুতঃ এই অঞ্চলের কোন পরিবার এ বিষয়ে এই পরিবারের ন্যায় প্রতিপত্তি লাভ করিতে পারেন নাই। ফলকথা এই, অন্নপ্রার্থনায় রাধামোহন বিদ্যাভূষণের দ্বারস্থ হইয়া কেহ কখনও প্রত্যাখ্যাত হইয়াছেন, ইহা কাহারও নেত্রগোচর বা কর্ণগোচর হয় নাই। আমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছি যে অবস্থার লোক হউক, লোকের সঙ্খ্যা যাই হউক, বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের আবাসে আসিয়া সকলেই পরম সমাদর, অতিথিসেবা ও অভ্যাগতপরিচর্য্যা প্রাপ্ত হইয়াছেন।”

 "বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের জীবদ্দশার এই মুখোপাধ্যায়পরিবারের স্বগ্রামে ও পার্শ্ববর্ত্তী বহুতর গ্রামে আধিপত্যের সীমা ছিল না। এই সমস্ত গ্রামের লোক বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের আজ্ঞানুবর্ত্তী ছিলেন। অনুগত গ্রামবৃন্দের লোকদের বিবাদভঞ্জন, বিপন্মোচন, অসময়ে সাহায্যদান প্রভৃতি কার্য্যই বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের জীবনযাত্রার সর্ব্বপ্রধান উদ্দেশ্য ছিল। অনেক অর্থ তাঁহার হস্তগত হইয়াছিল; কিন্তু সেই অর্থের সঞ্চয় অথবা স্বীয় পরিবারের সুখ সাধনে প্রয়োগ, একদিন একক্ষণের জন্যেও তাঁহার অভিপ্রেত ছিল না। কেবল অন্নদান ও সাহায্যদানেই সমস্ত নিয়োজিত ও পর্যয়বসিত হইয়াছিল। বস্তুতঃ প্রাতঃস্মরণীয় রাধামোহন বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের মত অমায়িক, পরোপকারী ও ক্ষমতাপন্ন পুরুষ সর্ব্বদা দেখিতে পাওয়া যায় না।”

 “রাধামোহন বিদ্যাভূষণ ও তদীয় পরিবারবর্গের নিকট আমরা অশেষ প্রকারে যে প্রকার উপকার প্রাপ্ত হইয়াছি, তাহার পরিশোধ হইতে পারে না। আমার যখন জ্ঞানোদয় হইয়াছিল, মাতৃদেবী পুত্র কন্যা লইয়া মাতুলালয়ে যাইতেন, এবং এক যাত্রায় ক্রমান্বয়ে পাঁচ ছয় মাস বাস করিতেন, কিন্তু একদিনের জন্যও স্নেহ, যত্ন ও সমাদরের ত্রুটি হইত না। বস্তুতঃ ভাগিনেয়ী ও ভাগিনেয়ীর পুত্র কন্যাদের উপর এরূপ স্নেহ প্রদর্শন অদৃষ্টচর ও অশ্রুতপূর্ব্ব ব্যাপার। জ্যেষ্ঠা ভাগিনেয়ীর মৃত্যু হইলে, তদীয় একবর্ষীয় দ্বিতীয় সন্তান, বিংশতি বৎসর বয়স পর্যন্ত অবিচলিত স্নেহে প্রতিপালিত হইয়াছিলেন।”

 ভগবতী দেবী শৈশবকালে মাতুলালয়ে লালিত পালিত হইয়াছিলেন। বাল্যকালে তাঁহার কোন অধীত বিদ্যালাভ হয় নাই। কারণ দেশে তখন স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন ছিল না। স্ত্রীলোকদিগকে শিক্ষা দিলে সমাজের অত্যন্ত অনিষ্ট হইবে, স্ত্রীলোকেরা স্বামীকে ভক্তি করিবে না, গৃহকর্ম্মে উপেক্ষা করিবে, স্ত্রীজনোচিত লজ্জা ও ধীরতায় জলাঞ্জলি দিয়া প্রগল্‌ভা ও অশান্তপ্রকৃতি হইবে, এইরূপ অনিষ্টপাতের সকলে আশঙ্কা করিতেন। দেশের স্ত্রীলোকগণ তাঁহাদের কর্ত্তব্য ও দায়িত্ব বুদ্ধিতে প্রবুদ্ধা হউন, তাঁহারা মাতৃস্থানীয়া,যাহাতে পূর্ব্বতন ঋষিপত্নীগণের দৃষ্টান্ত দর্শনে প্রতিভাশালিনী ও তত্ত্বদর্শিনী হইতে পারেন, যাহাতে তাঁহারা আধ্যাত্মিক জগতে মৈত্রেয়ী, গার্গী ও উভয় ভারতীর অনুসরণ করিতে পারেন, জ্ঞান-জগতে খনা ও লীলাবতীর সদৃশী হন, যাহাতে তাঁহারা বুঝিতে পারেন যে, পুরুষের ন্যায় তাঁহাদেরও অধ্যাত্মবিদ্যায় অধিকার আছে, তাঁহারাও বেদের অর্থবোধ ও মন্ত্র দর্শনে সমর্থা এবং তাঁহারা সেই সচ্চিদানন্দময়ীর শক্তির বিকাশমাত্র,—এই দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় লাভ করিয়া নিজ নিজ চরিত্রবলে যাহাতে তাঁহারা তাঁহাদের সন্ততিগণের চরিত্রগঠনে সহায় হন, এরূপ ভাবে কোন অধীত বিদ্যা শিক্ষা দিবার প্রণালী তখন লোকচিন্তার অতীত ছিল। সুতরাং ভগবতী দেবীর ভাগ্যে বাল্যকালে এরূপ ভাবের কোন শিক্ষালাভ ঘটে নাই। কিন্তু তাঁহার মাতুলালয়ে আদর্শ হিন্দু পরিবারে প্রতিদিন যে ধর্ম্মকর্ম্মের অনুষ্ঠান দেখিতেন, তাঁহার সম্মুখে যে জ্বলন্ত আদর্শ বিদ্যমান ছিল, তদ্বারা তাঁহার যে কোন শিক্ষালাভ হয় নাই, এ কথা আমরা স্বীকার করিতে পারি না। কারণ, ইন্দ্রিয়, মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের পূর্ণতা লাভই যথার্থ শিক্ষা; চক্ষুঃ কর্ণাদি ইন্দ্রিয়গণের উপযুক্ত ব্যবহার ও বিষয়পরিচালনাই যথার্থ শিক্ষা। ইন্দ্রিয়গণ যথাযথ সংযত হইলে, উহাদের দ্বারা সূক্ষ্ম বিষয়ের অনুভূতি হয়, মন ও বুদ্ধির স্ফুরণ হয় ও চিত্তের উদারতা সম্পাদিত হয়। মাতুলালয়ে আদর্শ হিন্দুপরিবারের মধ্যে লালিত পালিত হওয়ায়, কিরূপ করিয়া ধর্ম্মকর্ম্মের অনুষ্ঠান করিতে হয়, লোকের কল্যাণচিন্তা করিতে হয়, কিরূপ করিয়া লোকের সহিত ব্যবহার করিতে হয়, কেমন করিয়া দেখিতে হয়, বলিতে হয়, চলিতে হয়, বসিতে হয় প্রভৃতি অশেষ কল্যাণকর অত্যাবশ্যক শিক্ষালাভ ভগবতী দেবীর বাল্যকালেই পূর্ণমাত্রায় হইয়াছিল। সুশীলতা, ভব্যতা, ঔদার্য্য, বিনয়, শিষ্টাচার ও সৌজন্য প্রভৃতি সদগুণ যে সামাজিক বন্ধনের প্রধান উপায়, এ শিক্ষার বীজ তাঁহার বাল্যহৃদয়েই অঙ্কুরিত হইয়াছিল।

 আলস্য ও জড়তা তাঁহার দেহে কখনও স্থান পায় নাই। তিনি প্রত্যূষে শয্যা পরিত্যাগ করিয়া প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিতেন। পুষ্পচয়ন, পুষ্পপাত্রসম্মার্জ্জন, ও বিবিধ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গৃহকর্ম্মে তিনি অনুক্ষণ লিপ্ত থাকিতেন। এ সম্বন্ধে কেহ কখন তাঁহাকে শ্রমবিমুখ হইতে দেখে নাই। তিনি শ্রমেই শান্তিলাভ করিতেন, এবং শ্রমেই বিশ্রামসুখ অনুভব করিতেন। আমরা এ স্থলে তাঁহার শৈশব—জীবনের দুই একটী ঘটনার উল্লেখ করিয়া এই অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি করিব।

 মহাপুরুষ বা নারীরত্নরূপে যাহারা জন্মপরিগ্রহ করেন, তাঁহাদিগের সহিত সাধারণ মনুষ্যের প্রভেদ এই দেখিতে পাই যে, তাঁহারা যাহা বলেন, তাহা করিতে পারেন ও করেন। তাঁহাদের উক্তিই তাঁহাদের যথার্থ জীবনী। সাধারণ মানব বহু শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন করিয়া অনেক সারবান্ উপদেশ দিতে পারেন, কিন্তু সেগুলি স্বীয় জীবনে প্রতিফলিত করিতে পারেন না। মহাপুরুষ জগতের কল্যাণসাধনে সতত সচেষ্ট। তিনি মানবজাতির উন্নতির নূতন নূতন পথের আবিষ্কার করেন; সাধারণ মানবের ন্যায় তিনি সুখ দুঃখ বা হাস্যক্রন্দনের মধ্য দিয়া স্বীয় বহুমূল্য জীবন অতিবাহিত করেন না। জীবনের প্রথম অংশেই আত্মীয়স্বজনের দুঃখ ও অভাব দর্শনে তিনি বিমর্ষান্বিত হন ও জগতেরও এই প্রকার অবস্থা কি না জানিবার জন্য চঞ্চল হইয়া উঠেন। তাঁহার বিশাল হৃদয়, বিশালতর হইয়া ক্রমে সমগ্র জগৎ ব্যাপিয়া যায়,— কোন বিশেষ কেন্দ্রে আবদ্ধ থাকিতে পারে না। এক কথায় তিনি জগৎকে আপনার হৃদয় দিয়া ভালবাসেন, আপনার বলিতে জগৎ ভিন্ন তাঁহার অপর কিছু থাকে না।

 ভগবতী দেবীর মাতুলালয়ের গ্রামে ক্ষত্রিয়, রাজপুত, কায়স্থ, নাপিত প্রভৃতি অনেক ব্রাহ্মণেতর জাতির বাস ছিল। তাঁহার মাতুলালয়ের সন্নিকটে অনেক দরিদ্র তেওর ও বাগ্দী বাস করিত। ভগবতী বাল্যকালে এই সকল জাতীয় সমবয়স্কা বালিকাদিগের সহিত ক্রীড়া করিতেন। ক্রীড়ার মধ্যে তাঁহার এক বিশেষত্ব এই দেখিতে পাওয়া যায় যে, এই সকল সমবয়স্কা বালিকারা তাঁহাকে ক্রীড়া করিবার জন্য আহ্বান করিলে, তিনি বলিতেন, “তোমরা সকলে আমাদের বাটীতে এস, আমরা এক সঙ্গে খেলা করিব।” এই সকল বালিকাদিগের প্রত্যেকের সহিত মকর, সই প্রভৃতি মৈত্রীবন্ধনে তিনি আবদ্ধ হইয়াছিলেন। তাঁহার কি এক আশ্চর্য্য শক্তি ছিল, তাঁহার ভালবাসার কি এক অদ্ভুত প্রগাঢ়তা ছিল যে, যে তাঁহার সংস্পর্শে আসিত তিনি তাহাকে আপনার করিয়া ফেলিতেন। এই সকল সমবয়স্কা বালিকারা তাঁহার এতদূর বাধ্য ও অনুগত হইয়াছিল যে, ক্ষণকালের জন্য তাঁহার অদর্শন তাহারা সহ্য করিতে পারিত না। তিনি তাহাদিগকে লইয়া ধূলাখেলা করিতেন না। কারণ,বালিকারা সাধারণতঃ যেরূপ ধূলাখেলা করে, সেরূপ ক্রীড়ায় তাঁহার মন ছিল না। তিনি তাহাদিগের সহিত ব্রতকথা বলিতেন, মাতামহীর নিকট যে সকল উপদেশপূর্ণ গল্প বা পৌরাণিক আখ্যায়িকা শ্রবণ করিতেন, সেই সমুদয় গল্পচ্ছলে বলিতেন। তাহাদের অভাব অভিযোগ মন দিয়া শুনিতেন এবং অভাবনিরাকরণের যথাসাধ্য চেষ্টা করিতেন। তাহাদের মধ্যে কাহারও কাহারও বেশবিন্যাস করিয়া দিতেন। এ বিষয়ে তিওর, বাগ্দী প্রভৃতি জাতিবিচার তাঁহার ছিল না। ঐ সকল সমবয়স্কা বালিকারা খেলা করিবার জন্য একত্র হইলে, কখন কখন তিনি তাহাদিগকে সুমিষ্ট খাদ্য দ্রব্য ভোজন করাইয়া পরম তৃপ্তিলাভ করিতেন। সময়ে সময়ে তিনি তাহাদিগের কোন অমঙ্গল সংবাদ বা দুঃখকাহিনী শ্রবণ করিয়া এরূপ আত্মহারা হইয়া পড়িতেন, তাঁহার হৃদয় এরূপ বিগলিত হইত যে, তাঁহার রক্তোৎপলনিভ গণ্ডস্থল বহিয়া প্রবলবেগে অশ্রুধারা নিপতিত হইত। সঙ্গিনীদিগের মধ্যে কেহ পীড়িতা হইলে, তিনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া জাতিধর্ম্মনির্বিশেষে তাহার পরিচর্য্যা করিতেন। ইহাতে তিনি সুখ ও আনন্দ অনুভব করিতেন। তাঁহার এই সকল বাল্যলীলা পর্য্যালোচনা করিলে মনে হয়, তিনি শৈশবকাল হইতেই সেবাধর্ম্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। শৈশবেই যেন তিনি বুঝিয়াছিলেন, এই সেবাধর্ম্মই প্রকৃত হিন্দুধর্ম্ম। মনুষ্য মাত্রেই পরমাত্মার মুর্ত্তিস্বরূপ; ব্রহ্মের বিকাশই মানুষ। এই মনুষ্যের সেবাই হিন্দুর পরম ধর্ম্ম। প্রকৃত বৈদান্তিক সমস্ত বস্তুতেই ব্রহ্মদর্শন করেন, সেই ব্রহ্মের সেবার নিমিত্ত নরসেবায় নিযুক্ত থাকেন, আমরা সেই ব্রহ্মের স্বরূপ জানিয়া যদি প্রত্যেক মানবের সেবায় নিযুক্ত থাকি, তাহা হইলে মুসলমান, বৌদ্ধ প্রভৃতি পার্থক্য কোথায় থাকিবে? সেই সেবায় মুগ্ধ হইবে না এমন মানবদেহধারী কে থাকিতে পারে? অহিন্দু বলিয়া ঘৃণা করিলে পার্থক্য জন্মিবে, কিন্তু সেবাধর্ম্মে পার্থক্য কোথায়? এই সেবাধর্ম্মে ঘৃণা বিদ্বেষ তিরোহিত হইবে। যিনি সেবাধর্ম্ম গ্রহণ করিবেন, তিনি বুঝিতে পারিবেন যে, তিনি মনুষ্য—ব্রহ্ম তাঁহাতে বিরাজমান; সেই ব্রহ্ম প্রত্যক্ষ করিয়া অপরের সেবা করিবেন ও সেবা দ্বারা সেই সেব্য ব্যক্তিরও ব্রহ্ম উদ্দীপিত হইবেন।

 বাল্যকাল হইতেই ভগবতী দেবী মিতাচারিণী ছিলেন। সামান্য পদার্থকেও তিনি তুচ্ছ জ্ঞান করিতেন না। এবং সেই সকল দ্রব্যের তিনি সদ্ব্যবহার করিতেন। বাল্য জীবনেই যেন তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ লইয়াই এই সংসার। যেন তিনি প্রাণে প্রাণে বুঝিতে পারিয়াছিলেন,—নিখিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যাঁহার সম্পদ, অনন্ত হইতে অনন্ত যাঁহার সঞ্চয়, একটী শুল্ক পত্র, চ্যুত পুষ্প, বিন্দুমাত্র জল, অথবা কণাপরিমাণ মৃত্তিকা যখন তাঁহার নিকট তুচ্ছ নহে এবং তিনি এই সকল বস্তুর মিতব্যয়ের বিধান করিয়া রাখিয়াছেন, তখন আমরা ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র মানব কোন্ সাহসে ও কি অহঙ্কারে সামান্য বস্তুকে তুচ্ছ জ্ঞান করিয়া তাঁহার উচ্চ দানের অবমাননা করিব! এই মহান্ ভাব তাঁহার বালিকাহৃদয়ে উদ্দীপিত হইয়াছিল বলিয়াই বোধ হয়, তিনি সামান্য ভগ্ন মৃন্ময় পাত্রটী পর্য্যন্ত ফেলিয়া দিতে গেলে, বাধা দিয়া কাড়িয়া লইতেন এবং যত্ন করিয়া তুলিয়া রাখিতেন, বিশ্বাস ইহা দ্বারা জগতের কোন মঙ্গল কার্য্য সাধিত হইবে।

 উৎকৃষ্ট অশন, বসন ও ভূষণে তাঁহার আদৌ স্পৃহা ছিল না। সামান্য গ্রাসাচ্ছাদনেই তিনি পরিতুষ্ট হইতেন। তিনি যেন বাল্যজীবনেই উপলব্ধি করিয়াছিলেন যে, লালসারূপ বহ্ণিশিখা কোন ক্রমেই প্রশমিত হয় না, নির্ব্বাণ প্রাপ্ত হয় না,—উত্তরোত্তর উপচীয়মান হওয়াই ইহার ধর্ম্ম। সেই জন্য তিনি আত্মসুখ বিনিময়ে পরের সুখস্বচ্ছন্দ বিধান করিয়া সন্তোষরূপ পরমধন লাভ করিতে সতত যত্নবতী হইতেন।

  বাল্যজীবনে তাঁহার আর এক বিশেষত্ব—তাঁহার দীন ভাব। অহঙ্কার যেন ক্ষণেকের তরে তাঁহার চরণ পর্য্যন্ত স্পর্শ করিতে পারে নাই। প্রত্যুতঃ দীনতা মানব-চরিত্রের অত্যুজ্জ্বল অলঙ্কার। সংসার জীবনেও ইহার অদ্ভুত প্রভাব দৃষ্ট হয়। অহঙ্কারীকে সকলেই দ্বেষ করে; দীনতা সর্ব্বত্র জয়লাভ করে। আচণ্ডাল সকলে তাঁহার দীন চরিত্রে মোহিত হয়। ধর্ম্মজগতের ত কথাই নাই। পৃথিবীতে এ পর্য্যন্ত যত ধর্ম্মমত প্রচারিত হইয়াছে, তাহার মূলে দীনতা ও তৎসহচর সৎসাহস ও ঈশ্বরনির্ভরতাই রাজত্ব করিতেছে। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ সর্ব্বভূতনিয়ামক হইয়াও যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে ব্রাহ্মণের পদপ্রক্ষালনে আপনাকে নিয়োজিত করিয়াছিলেন। ভগবান্ মহম্মদ একচ্ছত্র সম্রাট হইয়াও আপনাকে কূপজলোত্তলনরূপ দাস্যকর্ম্মে নিয়োজিত করিয়া পরিবার প্রতিপালন করিয়াছিলেন। ভগবান্ বুদ্ধ মহারাজচক্রবর্ত্তী হইয়াও দীনহীন সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করিয়া জগতের পূজ্য হইয়াছিলেন। ভগবান্ শ্রীচৈতন্যদেবের দীনতা ও অভিমানশূন্যতা আজিও আবঙ্গ-উৎকলে বিঘোষিত হইতেছে।

 দীনতা ভক্তিসাধনার প্রধান অঙ্গ; অথবা দীনতা ভক্তিসাধনার পরিপক্ব ফল। দীন ভক্ত যে ঈশ্বরানুগৃহীত, তাহার পর্য্যাপ্ত প্রমাণ এই যে, জীবমাত্রই তাঁহার প্রতি প্রগাঢ় প্রেম প্রকাশ করে। দীন ভক্তের পদচালনে পৃথিবী পবিত্রা হয়, সাধারণ স্থল মহাতীর্থে পরিণত হয়, তাঁহার সঙ্গিগণ নবজীবন প্রাপ্ত হয়। বায়ু মণ্ডলের কুভাব তরঙ্গ প্রশমিত করিয়া তিনি শান্তির মৃদুমন্দ সমীরণ প্রবাহিত করেন। তাঁহার চিত্তাকর্ষক চরিত্রে জীবমাত্রই বশীভূত হইয়া পড়ে। তাঁহার সকলের প্রতি সমদৃষ্টিতে, তাঁহার চরিত্রের মধুরতায়, তাঁহার মিষ্টবাক্যে ও বিনয়নম্র দৃষ্টিতে কুপথগামী জনগণ নবজীবন প্রাপ্ত হইয়া থাকে।

 ভগবতী দেবীর বাল্যজীবনে তেজস্বিতারও বিশেষ পরিচয় পাওয়া যায়। দীনতার সহিত তেজস্বিতার সম্মিলন মণিকাঞ্চনসংযোগবৎ তাঁহার বালিকা-হৃদয়ে পরম রমণীয় ভাব ধারণ করিয়াছিল। তাঁহার মাতুলালয়ের সন্নিকটে যে সকল দরিদ্র তেওর ও বাগদীরা বাস করিত, তাহাদিগকে মধ্যে মধ্যে তিনি তণ্ডুলাদি আহার্য্য দ্রব্য এবং বস্ত্রাদি বিতরণ করিতেন। পাছে, ইহা দেখিয়া পরিবারবর্গের মধ্যে কেহ অসন্তুষ্ট হন, এই ভয়ে তাঁহার মাতা এক সময়ে তাঁহাকে নিষেধ করিয়াছিলেন। তদুত্তরে ভগবতী দেবী বলিলেন, “মামা কখন ইহাতে রাগ করিবেন না। যদি রাগ করেন,তাঁহাকে একটী চরকা নির্ম্মাণ করিয়া দিতে বলিব। সেই চরকায় সূতা কাটিব এবং সূতা বিক্রয় করিয়া যে পয়সা পাইব, তদ্বারা তণ্ডুল ও বস্ত্রাদি ক্রয় করিয়া উহাদিগকে বিতরণ করিব”। “ক্রমে এই কথা রাধামোহন বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের কর্ণগোচর হয়। তিনি এই কথা শুনিয়া পরম আনন্দিত হইলেন। তিনি তাঁহার এই বালিকা ভাগিনেয়ীর কার্য্যকলাপে কি যেন এক স্বর্গীয় ভাব দেখিতে পাইতেন। তিনি এই কথা শুনিয়া ভগবতী দেবীকে ক্রোড়ে করিয়া মুখচুম্বন করিতে করিতে বলিতে লাগিলেন—“মা, আমার সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা! মা তোমার যত ইচ্ছা তুমি গরিবকে দান করিও। যদি তোমাকে কেহ কিছু বলে, তুমি বলিও এ দান তোমাদের জন্য তোলা রহিল। গরিবকে এক গুণ দিলে ভগবান্ দশ গুণ দিবেন। গরিবকে দান করিলে কি কখন অপব্যয় করা হয়?” শাস্ত্রে আছে,—

“দাতব্যমিতি যদ্দানং দীয়তেহনুপকারিণে।
দেশে কালে চ পাত্রে চ তদ্দানং সাত্ত্বিকং স্ম্বতম্॥”

দান করিতে হইবে, ইহা মনে করিয়া দেশকালপাত্র বিবেচনায়, অপকারীকেও যে দান করা যায়, তাহাকে সাত্ত্বিক দান কহে। দানের জন্য অহঙ্কার প্রকাশে ভগবতী দেবীর আদৌ প্রবৃত্তি ছিল না। তিনি সুনামের জন্য কখন দান করিতেন না। দরিদ্রের সেবা এবং রুগ্নের শুশ্রূষা আজীবন তাঁহার নিষ্কামপ্রসূতা নিত্যক্রিয়া ছিল।

 আহা! এরূপ শিক্ষা দীক্ষার কথা মনে করিলে আনন্দাশ্রুসংবরণ করিতে পারা যায় না। সে কালের এক একটা একান্নবর্ত্তী পরিবার কি শান্তিনিকেতনই ছিল,কি পুণ্যের প্রস্রবণই সেখান হইতে প্রবাহিত হইত! ভগবতী দেবী, তুমিই ধন্য, যে এরূপ পুণ্যাশ্রম মাতুলালয়ে তুমি বাল্যকালে লালিত পালিত হইয়াছিলে। এরূপ মাতুলালয়ে তোমার বাল্যজীবন অতিবাহিত হইয়াছিল। এই আদর্শ হিন্দু গৃহের ক্রিয়াকলাপ, রীতিনীতি, ভাবভক্তি তোমার চরিত্রগঠনের প্রধানতম উপাদান হইয়াছিল। এবং উত্তরকালে তোমার গর্ভে বঙ্গের যে বিরাট্ মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তাঁহার যে অলৌকিক লোকসেবার মন্দাকিনীধারা প্রবাহিত হইয়া সমগ্র বঙ্গসমাজকে উর্ব্বর করিয়াছে, নবজীবন প্রদান করিয়াছে ও শক্তিশালী করিয়াছে, সেই অপ্রতিহত প্রবাহের উৎপত্তিস্থল, তোমার যে পবিত্র হৃদয়ে নিবদ্ধ দেখিতে পাই, সেই পবিত্র হৃদয় তোমার এই পুণ্যাশ্রম মাতুলালয়েই সংগঠিত হইয়াছিল।