বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র/চৌদ্দ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

চৌদ্দ

 স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারকল্পে ইউরোপে যাইবার জন্য সুভাষচন্দ্রকে মুক্তি দেওয়া হইলেও ভারতবর্ষের বাহিরে তাঁহাকে চলাফেরার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয় নাই। বিলাতের কমন্স সভায় এক প্রশ্নের উত্তরে স্যার স্যামুয়েল হোর জবাব দেন যে, সুভাষচন্দ্রকে অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হইবে না— তাঁহাকে জার্ম্মানী পরিদর্শনে অনুমতি দেওয়া হইবে না।

 ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দে ৮ই মার্চ্চ সুভাষচন্দ্র ভিয়েনায় পৌঁছিয়া স্বাস্থ্যনিবাসে অবস্থান করেন। সেই সময় অষ্ট্রিয়া নামেমাত্র সাধারণতন্ত্র ছিল। কার্য্যতঃ অষ্ট্রিয়ার রাজনীতি ক্ষেত্রে ফ্যাসিষ্টদেরই প্রাধান্য ছিল। ভিয়েনা নগরী কিন্তু সোস্যাল ডেমোক্রাটদের দ্বারা শাসিত হইত। তাঁহাদের সুশাসনে একবৎসরের মধ্যেই ভিয়েনা পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধিশালিনী ও সর্ব্বাপেক্ষা রমনীয়া নগরীতে পরিণত হইল। সেখানকার পৌরশাসনের সমাজতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা সুভাষচন্দ্রকে আকৃষ্ট করিল। সুভাষচন্দ্র সেখানকার মেয়ের কার্ল সিটজ (Karl Sietz) এর সহিত সাক্ষাৎ করেন এবং কলিকাতা ও ভিয়েনার শাসন ব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনা করেন। ভিয়েনার পৌরশাসনে সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা সুভাষচন্দ্রের অন্তরে এইরূপ গভীর রেখাপাত করিল যে তিনি উহা কলিকাতার শাসন ব্যবস্থায় প্রবর্ত্তন করিবেন সঙ্কল্প করিলেন। প্রবাসে থাকিয়াও ভারতবর্ষের উন্নতিই তাঁহার প্রধান চিন্তা ছিল।

 ভিয়েনাতে প্রবীণ রাজনীতিজ্ঞ পরলোকগত মিঃ বিটলভাই প্যাটেলের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হয়। মিঃ প্যাটেলও চিকিৎসার জন্য সেখানে অবস্থান করিতেছিলেন। সুভাষচন্দ্র ভগ্নস্বাস্থ্য লইয়াও মিঃ প্যাটেলের শুশ্রূষায় আত্মনিয়োগ করেন এবং মৃত্যু পর্য্যন্ত তাঁহার শয্যাপার্শ্বে ছিলেন।

 মিঃ বিটলভাই প্যাটেলের মৃত্যু হইলে সুভাষচন্দ্র তাঁহার শব ভারতে প্রেরণের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন এবং শবাধারের সহিত তিনি মার্সাই বন্দর পর্য্যন্ত আসিয়াছিলেন।

 এই সময়ে গান্ধীজী তাঁহার দ্বিতীয় আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করেন। এই আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার উপলক্ষে ১৯৩৩ সনের মে মাসে সুভাষচন্দ্র ও বিটলভাই ভিয়েনা হইতে এক যুক্ত বিবৃতি দান করেন। তাহাতে তাঁহারা ঘোষণা করেন যে, গান্ধীজী কর্ত্তৃক আন্দোলন প্রত্যাহার পরাজয় স্বীকার করা ভিন্ন অন্য কিছুই নয়। “আমাদের স্পষ্ট অভিমত এই যে গান্দীজী রাজনৈতিক নেতা হিসাবে ব্যর্থ হইয়াছেন। অতএব এখন নূতন উপায়ে ও নূতন মতবাদের ভিত্তিতে কংগ্রেসের আমূল সংস্কার সাধন করিবার সময় উপস্থিত হইয়াছে এবং ইহার জন্য একজন নূতন নেতারও অত্যন্ত প্রয়োজন। কেননা গান্ধীজী তাঁহার সমস্ত জীবনের বিশ্বাস, আদর্শ ও কর্ম্মপন্থার বিরুদ্ধে যাইবেন তাঁহার নিকট ইহা আশা করা অনুচিত। *** যদি সমগ্র কংগ্রেসকে এই ভাবে পুনর্গঠিত করা যায় তবেই সর্বোত্তম হইবে। নতুবা কংগ্রেসের অভ্যন্তরেই সমস্ত আমূলপরিবর্ত্তনপন্থী (radcial) উপাদানের সম্মেলনে এক নৃতন দল গঠন হইবে।” পরে যখন তাঁহাকে লণ্ডন প্রবাসী ভারতীয়দের এক সর্ব্বদলীয় সম্মেলনে সভাপতিত্ব করিতে আমন্ত্রণ করা হয় তখন তিনি এক লিখিত বাণী প্রেরণ করিয়া বলেন, “১৯৩১ সালের দিল্লী চুক্তি যদি ভ্রান্ত হইয়া থাকে তবে ১৯৩৩ সালের আত্মসমর্পণ এক বিরাট জাতীয় দুর্গতি। এই সঙ্কটময় মুহূর্ত্তে আইন অমান্য আন্দোলন বন্ধ করিয়া দেওয়ায় গত ১৩ বৎসরের জাতির সমস্ত ত্যাগস্বীকার ও দুঃখবরণ কার্য্যতঃ নিষ্ফল হইল।” বলা বাহুল্য, উক্ত সম্মেলনে যোগদানের জন্য সুভাষচন্দ্রকে ইংলণ্ডে যাইবার অনুমতি দেওয়া হয় নাই। সমুদ্র শুল্ক আইন অনুসারে ঐ অভিভাষণ ভারতে প্রেরণ নিষিদ্ধ হয়। এই সম্মেলনেই সুভাষচন্দ্র সর্ব্বপ্রথম “সাম্যবাদ সঙ্ঘ” স্থাপনের প্রস্তাব করেন। এই সংঘের আদর্শ ও উদ্দেশ্য প্রচারের জন্য ২২ জন সদস্য লইয়া একটি কমিটি গঠিত হয়।

 সুভাষচন্দ্রের বৈদেশিক প্রচারকার্য্যের দুইটি লক্ষ্য ছিল। এক, ইউরোপবাসীদিগকে ভারতবর্ষের প্রকৃত অবস্থার সহিত পরিচিত করা ও বৃটিশগভর্ণমেন্ট ও বৃটিশের প্রসাদপুষ্ট দলগুলির ভারতবিরোধী প্রচারকার্য্যের বিরোধিতা করা। দুই, ভারতবর্ষ ও ভারতবর্ষের রাষ্ট্রনৈতিক আশা-আশঙ্ক্ষার প্রতি উৎসাহশীল ও শ্রদ্ধাবান দেশ ও রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ঘোগাযোগ স্থাপন করা। সুভাষচন্দ্র একাধিকবার ঘোষণা করেন, ভারতবর্ষের পররাষ্ট্রনীতি কোন বৈদেশিক শক্তির পররাজ্যনীতির সহিত সংঘর্ষে প্রবৃত্ত হইবে না। ভারতবর্ষ পরম ঔদার্য্য ও সহিষ্ণুতার সহিত ও সম্পূর্ণ নির্লিপ্তভাবে বিভিন্নদেশের রাষ্ট্রিক মতবাদ ও চিন্তাধারার সহিত পরিচিত হইয়া বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের দ্বারা এক উদার ও সর্বজনগ্রাহ্য নীতির অনুসরণ করিবে। এই সময়ে ইউরোপে দুইটি মতবাদ বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে। একদিকে নব্য ইটালীর ফ্যাসিবাদ—মুসোলিনী পৃথিবীব্যাপী এক বিশাল রোমক সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্নে বিভোর; অপরদিকে নবীন রাশিয়ার কম্যুনিজম বা সাম্যবাদ। সকলের দৃষ্টিই এই দুই দেশের উপর নিবদ্ধ। ফ্যাসিবাদী ইটালীর সমৃদ্ধি ও জয়যাত্রা সুভাষচন্দ্রকে আকৃষ্ট করিলেও তিনি যেমন ফ্যাসীতন্ত্রকে সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করিতে পারেন নাই তেমনি কম্যুনিজমকেও তিনি নির্বিচারে গ্রহণ করার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। তিনি ঘোষণা করিলেন, ‘the next phase in world history will produce a synthesis between Communism and Fascism’—ভারতবর্ষে যে নীতি অনুসৃত হইবে তাহা হইবে ফ্যাসিজম্ ও কম্যুনিজম এর সংশ্লেষণ। এই দুই মতবাদের মধ্যে যে যে বিষয়ে মিল আছে তাহার উপর ভিত্তি করিয়াই এই সমন্বয় প্রক্রিয়া চলিতে থাকিবে। এই প্রক্রিয়াকেই তিনি “সাম্য” আখ্যা দিয়াছেন। এবং এই উদ্দেশ্যেই তিনি “সাম্যবাদ সংঘ” প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প করেন। তিনি “সাম্যবাদ সংঘের” নিম্নলিখিত দশবিধ কর্মপন্থার নির্দেশ দেন।

 1. The party will stand for the interest of the peasants, workers, etc., and not for the vested interests, that is, the landlords, capitalists, and money-lending classes.

 2. It will stand for the complete political and economic liberation of the Indian people.

 3. It will stand for a Federal Government for India as the ultimate goal but will believe in a strong Central Government with dictatorial powers for some years to come, in order to put India on her feet.

 4. It will believe in a sound system of state planning for the reorganization of the agricultural and industrial life of the country.

 5. It will seek to build up a new social structure on the basis of the village communities of the past, that were ruled by the village 'Panch' and will strive to break down existing social barriers like caste.

 6. It will seek to establish a new monetary and credit system in the light of the theories and the experiments that have been and are current in the modern world.

 7. It will seek to abolish landlordism and introduce a uniform land tenure system for the whole of India.

 8. It will not stand for democracy in the midVictorian sense of the term, but will believe in Government by a strong party bound together by military discipline, as the only means of holding India together and preventing a chaos, when Indians are free and are thrown entirely on their own resources.

 9. It will not restrict itself to a campaign inside India but will resort to international propaganda also in order to strengthen India's cause for liberty and will attempt to utilise the existing international organisations.

 10. It will endeavour to unite all the radical organisations under a national executive so that whenever any action is taken there will be simultaneous activity on many fronts.

 বিলাতের রক্ষণশীল দলের নেতৃবর্গ ও তাহাদের সংবাদপত্রগুলি এই সাম্যবাদ সংঘের বিরুদ্ধে তীব্র প্রচারকার্য্য চালান ও নানারূপ বিরুদ্ধ সমালোচনা করিতে থাকেন। প্রতিপক্ষীয়দের সমালোচনার উত্তরে সুভাষচন্দ্র জেনেভা হইতে নিম্নোক্ত বিবৃতি প্রচার করেন। এই বিবৃতির দ্বারা সুভাষচন্দ্রের মনোভাবের ঔদার্য্য ও দৃষ্টির ব্যাপকতাই প্রমাণিত হয়। “ইয়োরোপে আসিয়া অবধি আমি এই মত আরও দৃঢ়তার সহিত পোষণ করিতেছি যে, আমাদিগের পক্ষে যেমন দেশবিদেশের নানা আধুনিক আন্দোলনের সহিত পরিচিত থাকা আবশ্যক, আবার আমাদের অতীত ইতিহাস তথা বর্ত্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজন অনুযায়ী ভারতবাসীর ভবিষ্যৎ উন্নতি-পথ নির্ণয় করাও তেমনি আমাদের পক্ষে সমান ভাবেই প্রয়োজন। শতশত বৎসর ধরিয়া বহির্জগৎ হইতে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও চিন্তারাজ্যেও স্বতন্ত্র হইয়া থাকার ফলে ভারতবর্ষের পক্ষে সহানুভূতিপূর্ণ সমালোচনার দৃষ্টিতে অন্যান্য জাতি ও দেশকে বিচার করা সহজ সাধ্য। আমাদের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র নীতির পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়া রাখা বিশেষ দরকার। আমাদের আভ্যন্তরীন নীতি নির্ণয় কালে এ-কথা বলা মারাত্মক ভ্রম হইবে যে, ভারতবাসীকে কম্যুনিজম ও ফ্যাসিজমের মধ্যে যে কোন একটা বাছিয়া লইতে হইবে। মানবের জ্ঞানরাজ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাপারে কোন বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি বা মতবাদই একেবারে চূড়ান্ত বা শেষ কথা বলিয়া গ্রহণ করা যায় না।

 আধুনিক জাতিসমূহের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক মতবাদ ও প্রতিষ্ঠানসমূহ তাহাদের বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক ধারা, পরিবেশ ও প্রয়োজনের ফলমাত্র। মানব জীবনের মতই ইহারা পরিবর্ত্তন বা বিকাশের অধীন। অধিকন্তু ইহাও স্মরণ রাখিতে হইবে যে, বর্ত্তমান সময়ের কোন কোন অতিশয় চিত্তাকর্ষক প্রতিষ্ঠানগুলির এখনও পরীক্ষাকাল উত্তীর্ণ হয় নাই। এই সব প্রতিষ্ঠানকে সফল ও সার্থক বলিবার পূর্বে আরও কিছুকাল অপেক্ষা করিতে হইবে। ইত্যবসরে আমাদিগকে স্বাধীনভাবে বুদ্ধিবৃত্তির চালনাদ্বারা সব কিছু পরীক্ষা করিয়া দেখিতে হইবে। আমার ব্যক্তিগত অভিমত এই যে, বর্ত্তমানকালের বিভিন্ন আন্দোলনগুলির মধ্যে যাহা যাহা উপাদেয় ও হিতকর তাহাদের সমন্বয় সাধন করাই ভারতের কর্ত্তব্য। তাই, ইয়োরোপ ও আমেরিকায় যে সব আন্দোলন ও পরীক্ষা চলিতেছে সহানুভূতির সহিত তাহাদের পর্য্যালোচনা ও সমালোচনা করা আমাদের উচিত। কোন প্রকার পূর্ব সংস্কার বা পক্ষপাতের বশে কোন আন্দোলন বা পরীক্ষাকে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখা আমাদের নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক হইবে।”

 সুভাষচন্দ্রের পক্ষে ইংলণ্ড, জার্ম্মানী ও রাশিয়া যাওয়া নিষিদ্ধ হওয়ায় তিনি দক্ষিণ ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি পরিভ্রমণ করেন। ১৯৩৩ সালের জুলাই মাসে তিনি চেকোশ্লোভেকিয়ার রাজধানী প্রাগ পরিদর্শনে আসিয়া সেখানে দশদিন অবস্থান করেন। প্রাগে তাঁহার রাজকীয় অভ্যর্থনার ব্যবস্থা হয়—সেখানকার লর্ড মেয়র স্বয়ং তাঁহাকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করেন। পররাষ্ট্রসচিব ডাঃ বেনেসের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হয়। প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়ও তিনি পরিদর্শন করেন। সেখান হইতে ফিরিয়া তিনি জেনেভাতে অবস্থান করেন এবং তৎপরে কিছু সময়ের জন্য ফ্রান্স পরিভ্রমণে যান। ইটালীতে তিনি এশিয়াবাসী ছাত্রদের এক সম্মেলনে যোগদান করেন। সিনর মুসোলিনী ঐ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। এই সময়েই তিনি কয়েকদিন রোমে থাকিয়া সেখানকার ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র সংগঠন পর্য্যবেক্ষণ করেন।

 ১৯৩৪ সালের এপ্রিল মাসে তিনি বল্কান দেশগুলি পরিভ্রমণ করেন। বুদাপেষ্ট, বুখারেষ্ট, সোফিয়া, বেলগ্রেড প্রভৃতি রাজধানীগুলিতে তিনি বক্তৃতা প্রদান করেন এবং ভারতবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম ও ভারতে সাম্রাজ্যবাদী নিপীড়নের কথা ইউরোপের জনগণের নিকট প্রচার করেন। ইউরোপে প্রবাসজীবন যাপন কালে তিনি “ভারতীয় সংগ্রাম ১৯২০-৩৪” (Indian Struggle—1920-1934) নামে একখানি উৎকৃষ্ট গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি বামপন্থীর দৃষ্টি লইয়া ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন এবং বৃটিশ স্বেচ্ছাতন্ত্র কি জঘন্য ষড়যন্ত্র ও নির্মম নির্য্যাতনের দ্বারা এই আন্দোলন ও গণজাগরণ দলন ও দমন করিতেছে, তাহার মর্মস্পর্শী বর্ণনা প্রদান করেন। এই গ্রন্থে তাঁহার ইউরোপ পর্য্যটনের অভিজ্ঞতাও বর্ণিত হইয়াছে। এই পুস্তকখানি ইংলণ্ডে প্রকাশিত হয় ও বহু মণীষী ইহার ভূয়সী প্রশংসা করেন। স্যার স্যামুয়েল হোর এই গ্রন্থের ভারত-প্রবেশ নিষিদ্ধ করিয়া দেন। কারণ তাঁহার মতে এই পুস্তক সন্ত্রাসবাদের প্রশ্রয় দেয়। সম্প্রতি এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হইয়াছে বলিয়া প্রকাশ।

 এদিকে ১৯৩৪ খৃষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে সুভাষচন্দ্রের পিতা জানকীনাথ অসুস্থ হইয়া পড়েন এবং তাঁহার অবস্থা ক্রমশঃই বিশেষ আশঙ্কাজনক হইয়া দাঁড়ায়। পিতৃদেবেকে শেষ দেখা দেখিবার জন্য সুভাষচন্দ্র ভারতে আসিবার অনুমতি প্রার্থনা করেন। অবশেষে ভারত সরকার তাঁহার প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। ৪ঠা ডিসেম্বর তিনি তাঁহার পিতাকে দেখিবার জন্য ভারতে আগমন করেন। কিন্তু ২রা ডিসেম্বরেই তাঁহার পিতৃবিয়োগ ঘটে। ৩রা ডিসেম্বর সুভাষচন্দ্র বিমানযোগে করাচী পৌঁছিলে শ্রীযুক্ত জামসেদ মেটার নিকট তাঁহার পিতার মৃত্যু সংবাদ শোনেন।

 বিমান হইতে করাচী অবতরণ করিবামাত্র শুল্ক বিভাগের জনৈক কর্ম্মচারী ও একজন গোয়েন্দা তাঁহার মালপত্র খানাতল্লাশ করিয়া “ইণ্ডিয়ান স্ট্রাগল” এর একখানি টাইপ-করা কপি হস্তগত করেন। সেখান হইতে সুভাষচন্দ্র বিমান যোগেই কলিকাতা আসেন। দমদম বিমানঘাঁটিতে সংশোধিত ফৌজদারী আইন অনুসারে তাঁহার উপর এক আদেশ জারী করা হয়। এই আদেশ অনুসারে তাঁহাকে তৎক্ষণাৎ সরাসরি ৩৮।২নং এলগিন রোডের বাড়ীতে যাইতে এবং পুনরাদেশ পর্য্যন্ত সেখানেই অবস্থান করিতে বলা হয়। উক্ত আদেশ অনুযায়ী তিনি ঐ বাড়ীর বাহিরে যাইতে বা কাহারও সহিত দেখা সাক্ষাৎ করিতে পারিবেন না। তাঁহার পরিবারস্থ লোক যাহারা ঐ গৃহে অবস্থান করিতেছে তাহারা ছাড়া কাহারও সহিত পত্রব্যবহার, আলাপ-আলোচনা ও সংবাদ আদানপ্রদান করিতে পারিবেন না। তাঁহার নামের চিঠি-পত্র, টেলিগ্রাম প্রভৃতি সমস্তই না খুলিয়া পুলিশের হস্তে সমর্পণ করিতে হইবে। অর্থাৎ নিজের বাড়ীতেই তাঁহাকে বন্দী করিয়া রাখা হয়। সাতদিনের মধ্যে দেশত্যাগ করিবার নির্দ্দেশ দিয়া তাঁহার উপর আর একটি আদেশ জারী করা হয়। তাঁহাকে যেন একমাস থাকিতে দেওয়া হয় এই অনুরোধ জানাইয়া তিনি গভর্ণমেন্টের নিকট একখানি পত্র লিখেন। ঐ পত্রে তিনি লিখেন যে বিদশে মুক্ত অবস্থায় থাকার চেয়ে স্বদেশে বন্দী অবস্থাই তাঁহার নিকট অধিকতর কাম্য। অবশেষে পিতার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান পর্য্যন্ত তাঁহাকে ভারতে থাকিবার অনুমতি দেওয়া হয়। ১৯৬৫ সালের জানুয়ারী মাসে সুভাষচন্দ্র পুনরায় ইউরোপ যাত্রা করেন।

 বলিতে গেলে ১৯৩৩ হইতে ১৯৩৬ সাল পর্য্যন্ত সুভাষচন্দ্র একাদিক্রমে ইউরোপে প্রবাস যাপন করেন। এই সময় তিনি কেবলমাত্র নিজের স্বাস্থ্যোদ্ধারেই ব্যস্ত ছিলেন না। প্রবাসে তিনি কংগ্রেসের দূত হিসাবে বহির্জগতে ভারতবর্ষ ও ভারতবাসীর পক্ষ হইয়া প্রচারকার্য্য চালান। সুভাষচন্দ্রের পূর্ব্বে কেহ রাজনীতিক্ষেত্রে বহির্জাগতিক প্রচারের উপর তেমন গুরুত্ব দেন নাই অথচ ইহার প্রয়োজনীয়তা যে কতখানি তাহা যতই দিন যাইতেছে ততই আমরা বেশী করিয়া উপলব্ধি করিতেছি। ব্রিটীশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতীয় সংস্কৃতি ও শিল্পকে একদিকে ব্যঙ্গ করিয়া ও অপরদিকে বৃটিশ শাসনাধীনে ব্রিটিশশাসিত ভারতের সর্ব্বাঙ্গীন উন্নতির জয়ডঙ্গা বাজাইয়া ভারতের জাতীয় আন্দোলনকে বিদেশীর চোখে হেয় প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা করিতেছে। প্রবাস জীবনে সুভাষচন্দ্র সর্ব্বপ্রথম সাম্রাজ্যবাদের এই কুৎসা প্রচারের বিরুদ্ধে অভিযান আরম্ভ করেন। এই কার্য্যে তাঁহার প্রধান সহায় ছিলেন প্রবীণ দেশকর্ম্মী বিটলভাই পাটেল। মৃত্যুকালে বিটলভাই বৈদেশিক প্রচারকার্য্য চালাইবার জন্য সুভাষচন্দ্রের নাম ১লক্ষ টাকা লিখিয়া দেন। পরে অবশ্য আইনগত ত্রুটির সূত্র ধরিয়া তাঁহাকে ঐ অর্থ হইতে বঞ্চিত করা হয়। বিদেশে সাম্রাজ্যবাদী অপপ্রচার, কুৎসামূলক ছবি ও ছায়াচিত্রের সাহায্যে ইহাই প্রচার করা হয় যে, ভারতীয়গণ অতিশয় অসভ্য ও বর্ব্বর। এই অসভ্য ভারতীয়গণের উন্নতির জন্য শ্বেতাঙ্গগণ আপ্রাণ চেষ্টা করিতেছে। ভারতবর্ষকে সভ্য করিবার মহান কর্ত্তব্যবোধে ঈশ্বরপ্রেরিত এই শ্বেতাঙ্গগণ নিঃস্বার্থভাবে ভারতশাসনের দায়িত্ব নিজেদের ঘাড়ে লইয়াছে। সুভাষচন্দ্র এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করিতে আরম্ভ করেন। সুভাষচন্দ্র একটি প্রবন্ধে ইউরোপে সাম্রাজ্যবাদী শাসকবর্গের ভারতবর্ষ সম্বন্ধীয় অপপ্রচারের কিঞ্চিৎ নমুনা দেন। “While we are quite indifferent to this question, missionaries and other civilizing agencies are not inactive for several decades. They have painted India as a land where widows are burnt, girls are married at the age of five or six and people are virtually unacquainted with the art of dressing. I remember vividly that, when I was in England in 1920, I was one day passing a lecture hall in front of which there was a pictorial advertisement of a lecture to be delivered by a missionary about India. In that advertisement, there were pictures of some half naked men and women of the blackest complexion, possessing the ugliest features. Ostensibly the lecturer wanted to raise funds for his ‘civilizing work’ in India and was, therefore, painting India in this light without the slightest compunction. Towards the end of 1933 a German journalist who claimed to have visited India recently, wrote in a Munich paper that she had seen, widows being burnt in India and dead bodies lying uncared for in the streets of Bombay. Recently in a Vienna pictorial paper (Wiener Bilder, dated the 30th June) a picture of a dead body covered with insects was printed and there was a footnote saying that it was the corpse of a Sadhu which could not be removed for several days because of the Hindu belief that the dead body of a Sadhu should not be removed by ordinary men. What surprises me is the careful selection of pictures about India made by propagandists in Europe with a view to depicting India in the worst colours possible.”

 সুভাষচন্দ্র যখন ইউরোপ পরিভ্রমণে আসেন সেই সময় ‘ইণ্ডিয়া স্পীকস্’, ‘বেঙ্গলী’ প্রভৃতি ছায়াচিত্রের ভিতর দিয়া সাম্রাজ্যবাদী প্রচার পূর্ণোদ্যমে চলিতেছিল। ‘বেঙ্গলী’ ছবিতে ভারতে বৃটিশ শাসনের অপার মহিমা কীর্ত্তিত হয়। এতদ্ভিন্ন ‘সকলেই সঙ্গীত ভালবাসে’ নামে আর একখানি ছবিতে দেখান হয় ভারতের গণ-নায়ক গান্ধীজী কৌপিন পরিয়া এক ফিরিঙ্গী মেম সাহেবের সহিত নৃত্য করিতেছেন। ভারতবর্ষ এবং তাহার শ্রদ্ধেয় নেতৃবর্গকে মসীচিত্রিত করিবার উদ্দেশ্য-কল্পিত কুৎসিত চিত্রের প্রচারের বিরুদ্ধে সুভাষচন্দ্র ভিয়েনা হইতে তুমুল আন্দোলন আরম্ভ করেন। ফলে, ভিয়েনার ‘বেঙ্গলী’ প্রভৃতি ছবির প্রচার বন্ধ হইয়া যায়। সুভাষচন্দ্রের ইউরোপে থাকাকালে নাৎসীপতি হিটলার এক বক্তৃতায় সদম্ভে ঘোষণা করেন যে, “কৃষ্ণকায়দের শাসন করা শ্বেতকায় জাতিসমূহের কর্ত্তব্য।” পরাধীন ভারতবর্ষের পক্ষ হইতে সুভাষচন্দ্র এই ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন। নাৎসীরা উক্ত বিবৃতিটি ধামাচাপা দিবার জন্য বলে যে, ইহা ভারতবর্ষ বা জাপানের পক্ষে প্রযোজ্য নয়।

 পিতৃশ্রাদ্ধের পরে ইউরোপে ফিরিয়া গিয়া তিনি প্রথমে নেপল্‌সে পদার্পণ করেন। সেখান হইতে রোমে যান এবং প্রায় একসপ্তাহ কাল রোমে কাটাইয়া ভিয়েনায় আসেন। রোমে অবস্থানকালে আফগানিস্থানের ভূতপূর্ব্ব আমীর আমানুল্লার সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হয়। তৎপর তিনি জেনেভায় গিয়া স্বর্গগত প্যাটেলের মর্ম্মর মূর্ত্তির আবরণ উন্মোচন করেন। পরে জেনেভা হইতে প্যারিসে যান। ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে ডাবলিনে পোঁছেন এবং আইরিশ জননেতা ডি, ভ্যালেরার সহিত সাক্ষাৎ করেন। সুভাষচন্দ্র ডি, ভ্যালেরার সহিত আয়ার্‌ল্যাণ্ড ও ভারতের অবস্থা সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেন,—এই সময়ে উভয়ের মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়। এই দুই নির্য্যাতিত দেশের মধ্যে গভীর যোগসূত্র স্থাপনের উদ্দেশ্যে সুভাষচন্দ্র প্রস্তাব করেন, যে কতিপয় ভারতীয় অধ্যাপককে আয়ার্‌ল্যাণ্ড পরিদর্শনের সুযোগ ও ভারতীয় ছাত্রদিগকে আয়ার্‌ল্যাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিবার সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হউক। ডি, ভ্যালেরা এই প্রস্তাবে আগ্রহের সহিত সম্মতি দান করেন।