বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র/ছয়

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

ছয়

 বিলাতে থাকিয়া সুভাষচন্দ্র ভারতবর্ষের কথা ভুলিতে পারেন নাই। তাঁহার কলিকাতাস্থ বন্ধুদের নিকট পত্র লিখিয়া তিনি সর্ব্বদা দেশের খবর লইতেন এবং দেশসেবার কার্য্যে তাঁহাদের উৎসাহিত করিতেন। দেশে রাজনৈতিক আন্দোলন সম্বন্ধে তাঁহার কৌতুহলের সীমা ছিল না। বিলাতে ভারতীয়দের যেসব প্রতিষ্ঠান ছিল, সেই সব প্রতিষ্ঠানে তিনি নিয়মিত উপস্থিত থাকিয়া প্রবাসী ভারতীয়দের সহিত আত্মীয় সম্বন্ধ স্থাপন করিয়াছিলেন। মিঃ ওটেন সংক্রান্ত ব্যাপারে সুভাষচন্দ্রের যে পরিচয় পাইয়াছি এখানেও তাহার ব্যতিক্রম হয় নাই। শাসক বলিয়া ইংরেজ জাতির যে মিথ্যা দম্ভ তাহা তিনি কিছুতেই সহ্য করিতে পারিতেন না। পরাধীন হইলেও শিক্ষা-দীক্ষা, শৌর্য্য-বীর্য্য ও মনুষ্যত্বের দিক হইতে কোন ভারতীয় যে স্বাধীন দেশের যে কোন অধিবাসীর তুলনায় হীন নহে, সুভাষচন্দ্রের চাল-চলন, কথা-বার্ত্তা, আলাপ-ব্যবহার, আদব-কায়দা অনুক্ষণ এই কথাই স্মরণ করাইয়া দিত। ভারতবর্ষে ইংরেজের হৃদয়হীন শাসন, ভারতীয়ের প্রতি দুর্ব্ব্যবহার, শ্বেতকায় বলিয়া অসঙ্গত অহমিকাবোধ পূর্ব্ব হইতেই তাঁহাকে ইংরেজ জাতির প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ করিয়া তুলিয়াছিল। বিলাতের এক চিঠিতে তিনি লিখিয়াছিলেন, “আমার সব চাইতে বেশী আনন্দ হয় যখন দেখি শ্বেতাঙ্গ আমার পরিচর্য্যা করিতেছে ও জুতা সাফ করিয়া দিতেছে।” দেশাত্মবোধ ও স্বজাতিগৌরবে সুভাষচন্দ্র আপন বৈশিষ্ট্য সযত্নে রক্ষা করিয়া চলিতেন। ভারতবর্ষের গৌরবময় ঐতিহ্য ও অতীত তাঁহার নিকট গর্ব্বের বস্তু ছিল—নিজের জীবনেও সুভাষচন্দ্র সেই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের ধারা অক্ষুন্ন রাখিয়াছিলেন। বিলাতে কোন ভারতীয়ের সুখ্যাতির পরিচয় পাইলে তিনি গর্ব্ব অনুভব করিতেন। বিলাতের একখানি পত্রে তিনি লিখিয়াছিলেন, “সেদিন ভারতীয় মজলিসের বাৎসরিক ভোজ হইয়া গেল। Mr. Horniman আমাদের অতিথি হইয়া আসিয়াছিলেন। এখানকার বিদেশীয় বন্ধুগণ কেহ কেহ আসিয়াছিলেন। মিসেস রায় গত রবিবারের মজলিসের সভায় Rights of the Indian Mother সম্বন্ধে বক্তৃতা দিলেন। বাস্তবিক কবে আবার ভারত-রমণীবৃন্দ সমাজের শিক্ষাদাত্রীরূপে আসন গ্রহণ করিবেন? না জাগিলে ভারত-ললনা, এ ভারত কভু জাগিবে না। যেদিন Mrs. Sarojinee Naidu এখানে বক্তৃতা দিয়াছিলেন, সেদিন আনন্দে বুক দশ হাত ফুলিয়া উঠিয়াছিল। সেদিন দেখিলাম ভারতরমণীর আজও এমন শিক্ষা, দীক্ষা, গুণ, চরিত্র আছে যে পাশ্চাত্য জগতের সম্মুখে দাঁড়াইয়া আত্ম-পরিচয় দিতে পারেন।”

 লণ্ডনে মিসেস মিত্রের সঙ্গে আলাপ হয়। দেখিলাম মিঃ মিত্র (ডাঃ মৃগেন মিত্র) moderate in Politics (নরমপন্থী) কিন্তু মিসেস মিত্র Extremist (চরমপন্থী)। আনন্দে বুক ভরে গেল। মিসেস ধর ও Extremist। এসব দেখে মনে হয় যে, যে দেশে রমণীর আদর্শ এত উচ্চ, সে দেশের উন্নতি না হয়ে পারে না। এ দেশে যে সকল ভারত মহিলারা আসেন, আমার বিশ্বাস তাঁদের প্রাণে গভীর স্বদেশ-প্রেমের উদ্রেক হয়—কারণ মাতৃহৃদয় বড় গভীর ও কোমল।”

সাত

 সুভাষচন্দ্র যেদিন বোম্বাই পৌঁছেন, সেইদিনই অপরাহ্ণে ‘মণিভবনে’ গান্ধীজীর সহিত সাক্ষাৎ করেন। তাঁহার ইচ্ছা ছিল গান্ধীজীর নিকট হইতে তাঁহার পরিকল্পনা ও কর্ম্মপন্থা সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেন। একঘণ্টাকাল গান্ধীজীকে নানারূপ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি যে উত্তর পাইলেন তাহা তাঁহার মনঃপূত হইল না। গান্ধীজীর সহিত সুভাষচন্দ্রের