বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র/ত্রিশ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

ত্রিশ

 সম্প্রতি উত্তমচাঁদ কর্ত্তৃক সুভাষচন্দ্রের ভারত ত্যাগ বিবরণ প্রকাশিত হইয়াছে। অনেকেই এই বৃত্তান্ত সত্য ঘটনা হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। আবার এই বিষয়ে অন্যরূপ বহু গুজব ও জনশ্রুতিও সংবাদপত্র মারফৎ প্রচারিত হইয়াছে। সে যাহাই হউক, একমাত্র সুভাষচন্দ্র ব্যতীত এই রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান কেহই করিতে পারিবেন না। দেশবাসী স্বয়ং নেতাজির মুখ হইতেই তাঁহার দুঃসাহসিক অভিযানের রোমাঞ্চকর কাহিনী জানিতে পারিবে—এই আশায় আমরা এই বিষয়ে আলোচনায় ক্ষান্ত রহিলাম।

 উত্তমচাঁদ বর্ণিত সুভাষচন্দ্রের ভারত ত্যাগের বৃত্তান্ত পড়িয়া আমরা জানিতে পারি যে, রাশিয়া যাওয়াই তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল। উত্তমচাঁদ ও সুভাষচন্দ্রের মধ্যে এই বিষয়ে যে আলােচনা হয় তাহা নিম্নে উদ্ধৃত করিলাম:—

 একদিন কথা প্রসঙ্গে বােসবাবুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তাঁহার মস্কো যাইবার আসল উদ্দেশ্য কী? তদুত্তরে তিনি বলিলেন—‘বর্ত্তমান সময়ে রাশিয়া ও জার্মানী পরস্পর অনাক্রমণ চুক্তিতে আবদ্ধ। জার্মানী বৃটেনের সহিত যুদ্ধে লিপ্ত। রাশিয়াও বৃটেনের শত্রু। মস্কো যাইয়া ভারতের স্বাধীনতার জন্য প্রচারকার্য চালাইবার এখনই উপযুক্ত সময়।’

 আমি কহিলাম, রাশিয়ার সহিত জার্মানীর বর্ত্তমানে চুক্তি রহিয়াছে বটে কিন্তু উহাদের মধ্যে আদর্শগত মিল আদৌ নাই। বন্ধুত্বের আড়ালে এখনই যে উভয় দেশে যুদ্ধের আয়ােজন চলিতেছে না, সে কথাই বা কে বলিতে পারে? সেক্ষেত্রে রাশিয়ানরা কি আপনাকে ব্রিটীশের বিরুদ্ধে প্রচারকার্য্য চালাইতে দিবে? উত্তরে বােসবাবু বলিলেন, ‘হয়ত জার্মানী ও রাশিয়ার মধ্যে মিত্রতা দীর্ঘকাল স্থায়ী হইবে না; হয়ত তাহাদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধিবে। ···জার্মানী ও রাশিয়ার মধ্যে ভিতরে ভিতরে একটা বৈরীভাব থাকিলেও ইংরাজরাও তাে কিছু রাশিয়ার বন্ধু নয়। কাজেই আমার নিশ্চিত বিশ্বাস, রাশিয়ানরা আমাকে ইংরাজদের বিরুদ্ধে প্রচারকার্য্য চালাইতে দিবে।’

 আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি কি মনে করেন, শুধু প্রচারকার্য্যের দ্বারাই ভারতবর্ষ স্বাধীনতা অর্জ্জন করিতে পারিবে? বােস বাবু বলিলেন, ‘আমার নিজের দৃঢ় বিশ্বাস যে, রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের দ্বারা ইংরাজদের তাড়াইয়া না দিলে তাহারা কখনই ভারতবর্ষ পরিত্যাগ করিয়া যাইবে না। তাহারা কখনই কোন দেশকে শান্তভাবে স্বাধীনতা দেয় নাই। আয়ারল্যাণ্ডের কথাই ভাবুন না কেন? মনে রাখিবেন আইরিশরা ইংরাজদের জ্ঞাতি। তথাপি, সাত শত বৎসর সংগ্রাম ও দুঃখ ভোগের পর আয়ারল্যাণ্ড যখন স্বাধীনতা অর্জ্জন করিল, তখনও ইংরাজরা আয়ারের কিয়দংশ নিজেদের জন্য রাখিয়া দিল। কাজেই তারা স্বেচ্ছায় ভারতবর্ষ ছাড়িয়া যাইবে কিরুপে? একথা সত্য যে বিদেশে ব্রিটিশবিরোধী প্রচার কার্য্যের দ্বারাই স্বাধীনতা লাভ হইবে না। কিন্তু এক্ষণে তাহারা জীবন মরণ সংগ্রামে লিপ্ত—আমার প্রচারকার্য্য নিশ্চয়ই তাহাদের প্রভূত ক্ষতি সাধন করিবে।’ আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, কিন্তু তাহ’লে আপনি কি মনে করেন যে আয়রল্যাণ্ডে যেরূপ বিপ্লব হইয়াছিল ভারতবর্ষে সেরূপ বিপ্লব ঘটিতে পারে না? তিনি কহিলেন—‘ইংরাজরা ভারতবর্ষের যে অবস্থা করিয়াছে তাহাতে ঐরূপ বিপ্লব সম্ভব নয়। তাহাদের ভারতবর্ষ হইতে বিতাড়িত করা যাইতে পারে এরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করাও দুঃসাধ্য। আবার, কোন বৈদেশিক শক্তির সাহায্য ব্যতিরেকে ঐরূপ বিপ্লব সৃষ্টি করাও সম্ভব নয়। এমন কি রুশ বিপ্লবের পশ্চাতেও ছিল জার্মানরা—ফরাসীদের সহায়তায়ই আমেরিকা স্বাধীনতা অর্জ্জন করিয়াছে।’

 আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনার কথার তাৎপর্য্য কি ইহাই যে, আপনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য রাশিয়ার সাহায্য সংগ্রহ করিতে যাইতেছেন? বোসবাবু বলিলেন-“হ্যাঁ, ইহাই আমার আসল উদ্দেশ্য। রাশিয়ানরা যাহাতে আমাদের সাহায্য করিতে সম্মত হয়, তাহার জন্যই আমি চেষ্টা করিব। এই চেষ্টা ব্যর্থ হইলেও ইংরাজদের বিরুদ্ধে সব সময়ই আমি প্রচারকার্য্য চালাইয়া যাইতে পারিব। কিন্তু আমি যদি ভারতে পড়িয়া থাকিতাম তাহা হইলে যতদিন যুদ্ধ চলিত সরকার ততদিন আমাকে কারাগারে আবদ্ধ করিয়া রাখিত। আমার স্থির বিশ্বাস দেশের বড় বড় নেতারা সকলেই কারারুদ্ধ হইবেন। জেলখানায় বসিয়া পচা অপেক্ষা দেশের গ্রাধীনতার জন্য যতটুকু পারি তাহার জন্য পলায়ন করাই আমি ভাল মনে করিলাম।’ আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, এখান হইতে যদি আপনাকে সরাসরি মস্কো যাইতে না দেওয়া হয় তবে আপনি কি করিবেন? তিনি বলিলেন, ‘যাইবার পথে প্রথমেই আমি মস্কোতে নামিয়া সেখানে থাকিয়া যাইবার জন্যই চেষ্টা করিয়া দেখিব। যদি না পারি বার্লিন ও রোমের রুশদূতের মারফৎ ব্যবস্থা করিব। ঐ সকল স্থানে দূতাবাসের সহিত সহজেই যোগাযোগ স্থাপন করা যায়। কাজেই ভরসা হয়, কোন-না-একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই করিয়া উঠিতে পারিব। যে ভাবেই হোক, শীঘ্রই মস্কোয় পৌছিতে পারিব বলিয়া আশা করি।’

 চক্রশক্তি তাঁহাকে মস্কো যাইতে দিবে কিনা সে বিষয়ে আমি সন্দেহ প্রকাশ করিলাম। চক্রশক্তি যদি এ সময়ে তাঁহার ন্যায় প্রভাবশালী কোন ভারতীয়কে পায় তবে তাঁহাকে রাশিয়ার কাজে লাগাইতে না দিয়া নিজেদের কাজে লাগাইবার চেষ্টাই করিবে। বোসবাবু বলিলেন—‘চক্রশক্তি যে আমাকে সহজে রাশিয়ানদের হাতে ছাড়িয়া দিবে না একথা আমিও জানি। তবুও আমি মস্কো যাওয়ার জন্যই যথাসাধ্য চেষ্টা করিব। বর্ত্তমান সময়ে একমাত্র রাশিয়াই ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা অর্জ্জনে সাহায্য করিতে পারে। অপর কোন দেশই আমাদিগকে সাহায্য করিবে না। এই জন্যই আমি মস্কো ছাড়া অন্য কোথাও যাইতে চাহি না। এই যুদ্ধের মধ্যেই যদি ভারতবর্ষ স্বাধীন হইতে না পারে তবে আর পঞ্চাশ বৎসরের মধ্যে স্বাধীনতা অর্জ্জন করিতে সমর্থ হইবে না। অবশ্য যদি তাঁহার পূর্বেই কোন সশস্ত্র বিপ্লব সংঘটিত হয়, তবে সে কথা স্বতন্ত্র।

 উত্তমচাঁদ বর্ণিত সুভাষচন্দ্রের অন্তর্দ্ধান কাহিনী হইতে আমরা জানিতে পারি, রাশিয়ান দূতাবাসের সহিত মস্কো যাইবার ব্যবস্থা করিয়া উঠিতে না পারায় অগত্যা সুভাষচন্দ্র ইতালিয়ান দূতাবাসের সহিত কথা-বার্ত্তা বলেন। শেষ মুহূর্ত্ত পর্য্যন্তও তিনি মস্কো যাইবার সঙ্কল্প পরিত্যাগ করেন নাই। প্রথমেই ভগৎরাম ওরফে রহমৎ খাঁর মুখে শুনিতে পাই—“আমরা চক্রশক্তির একটির সহিত যোগাযোগ স্থাপন করিয়াছি বটে কিন্তু বোসবাবু বার্লিন বা রোমে যাইতে ইচ্ছুক নহেন।” এই প্রসঙ্গ উঠিলেই সুভাষচন্দ্র বলিতেন—‘আমি মস্কো ছাড়া অন্য কোথাও যাইতে চাহি না।’ উত্তমচাঁদ যখন জিজ্ঞাসা করিলেন—যদি মস্কো যাওয়ার ইচ্ছাই থাকে তবে ইতালীয়ানদের শরণ লইলেন কেন? সুভাষচন্দ্র বলিলেন—‘মস্কো যাওয়ার ইচ্ছা আমি ছাড়ি নাই। বাধ্য হইয়াই ইতালীয়দিগের সহিত সংযোগ স্থাপন করিয়াছি।’ তিনি আরও বলিলেন—‘এখন এখান হইতে ইউরোপ যাইবার একটি মাত্র পথ রহিয়াছে, তাহা হইতেছে মস্কোর পথ। হয় আমি মস্কো নামিব, না হয় বার্লিন বা রোমস্থিত রুশ দূতের সহিত ব্যবস্থা করিয়া মস্কোতে ফিরিয়া আসিব। * * ইতালীয়ানদের সহিত সমস্ত ব্যবস্থা ঠিক হইয়া যাওয়ার পরও যদি রাশিয়ানরা আমাকে আশ্রয় দিতে রাজি হয় তাহা হইলে আমি আমার ব্যবস্থা বদল করিব।’ এমনকি বুখোর পথে আফগান সীমান্ত অতিক্রম করিয়া থাঙ্গো নদী পার হইয়া সর্বাপেক্ষা বিপদসঙ্কুল ও দুর্গম পথে মস্কো যাইতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন। অবশেষে যখন ইতালীয়ানরা সমস্ত ব্যবস্থা ঠিক করিয়া ফেলিয়াছে তখনও তিনি এই বলিয়া তাহাদের সাহায্য গ্রহণ করিলেন, ‘মস্কোতে যাওয়াই আমি সর্বাগ্রে কামনা করি; তবে এই স্থান অপেক্ষা রোম বা বার্লিন হইতে মস্কো যাওয়াই সহজ হইবে।’