বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র/দশ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

দশ

 সুভাষচন্দ্রের জীবন সংশয়াপন্ন; অথচ বিনাসর্ত্তে মুক্তি ভিন্ন অন্য কিছুতেই তিনি রাজী নহেন। অবশেষে সুভাষচন্দ্রের মৃত্যুর দায়িত্ব এড়াইবার জন্য গভর্ণমেন্ট তাঁহাকে ১৯২৭ সালের ১৫ই মে রেঙ্গুন হইতে কলিকাতায় লইয়া আসেন। ডায়মণ্ড হারবারের সন্নিকটে জাহাজ থামাইয়া লাট বাহাদুরের লঞ্চে সুভাষচন্দ্রকে তুলিয়া লওয়া হয়। লঞ্চে ডাঃ স্যার নীলরতন সরকার, ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, লেঃ কর্ণেল স্যাণ্ডস্‌ ও গভর্ণরের চিকিৎসক হাংষ্টন তাঁহাকে পরীক্ষা করেন। পরদিন প্রাতে ১৬ই মে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান কর্ত্তা সুভাষচন্দ্রের হস্তে ভগ্নস্বাস্থ্যবশতঃ বিনাসর্ত্তে মুক্তিদানের আদেশপত্রখানি অর্পণ করেন। যখন তাঁহাকে গ্রেফতার করা হয় তখন তিনি স্বাস্থ্যবান, বলবান ও অক্লান্ত পরিশ্রমী যুবক ছিলেন আর এখন তিনি মুক্তিলাভ করিলেন অস্থিচর্মসার রোগজীর্ণ দেহ লইয়া।

 মান্দালয়ের জেলখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভগ্নস্বাস্থ্য হইলেও সুভাষচন্দ্রের মনোবল ও আত্মবিশ্বাস অটুট ছিল। “দেশমাতৃকার উদ্ধার সাধনের যে মহৎ ব্রত তিনি গ্রহণ করিয়াছেন সেই ব্রত উদ্‌যাপিত না হওয়া পর্য্যন্ত তাঁহাকে অবিরাম সংগ্রাম করিয়া যাইতে হইবে। ভবিষ্যতের দিকে চাহিয়া সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করিতে হইবে।” কারামুক্তির পর তিনি লিখিয়াছিলেন, “দেশান্তরে কারাবাসে মাসের পর মাস যখন কাটিয়েছি তখন প্রায়ই এই প্রশ্ন আমার মনে উঠ্‌ত, কিসের জন্য, কিসের উদ্দীপনায় আমরা কারাবাসের চাপে ভগ্নপৃষ্ট না হয়ে আরও শক্তিমান হয়ে উঠছি? নিজের অন্তরে যে উত্তর পেতাম তার মর্ম এই:—

 ভারতের একটা Mission আছে, একটা গৌরবময় ভবিষ্যৎ আছে; সেই ভবিষ্যৎ ভারতের উত্তরাধিকারী আমরাই। নূতন ভারতের মুক্তির ইতিহাস আমরাই রচনা কর্‌ছি এবং এই বিশ্বাস আছে বলেই আমরা সকল দুঃখকষ্ট সহ্য করতে পারি, অন্ধকারময় বর্ত্তমানকে অগ্রাহ্য করতে পারি, বাস্তবের নিষ্ঠুর সত্যগুলি আদর্শের কঠিন আঘাতে ধূলিসাৎ করতে পারি।” দক্ষিণ কলিকাতার সেবক সমিতির সহসম্পাদক অনাথবন্ধু দত্তকে লিখিত এক পত্রে তিনি লিখিয়াছিলেন, “জেলে আছি তাতে দুঃখ নাই। মায়ের জন্য দুঃখভোগ করা সেত গৌরবের কথা!”

 মান্দালয়ে অবস্থান সম্বন্ধে সুভাষচন্দ্র বলিয়া ছিলেন, “আমার স্পষ্ট মনে আছে, এই সেই বন্দীখানা যেখানে প্রথমে লোকমান্য তিলককে ছয় বৎসরের জন্য ও পরে লালালাজপৎ রায়কে প্রায় এক বৎসরের জন্য বন্দী করিয়া রাখা হইয়াছিল। ইহা চিন্তা করিয়া আমরা সান্ত্বনা পাইতাম ও গর্ব্ব অনুভব করিতাম যে আমরা তাঁহাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া চলিয়াছি।”

 পূর্ব্বে বলিয়াছি সুভাষচন্দ্র যতদিন আলীপুর জেলে আবদ্ধ ছিলেন ততদিন কর্পোরেশনের কাজকর্ম্ম তিনি নিজেই দেখিতেন। মান্দালয়ে আসিয়াও তিনি তাঁহার নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান গুলির কথা এক মুহূর্ত্তের জন্য ভুলিয়া থাকিতে পারেন নাই। বিশেষ করিয়া দক্ষিণ কলিকাতা সেবা সমিতির চিন্তা অহরহই তাঁহার মনে উদয় হইত। সেবা সমিতির কর্ম্মীদিগকে তিনি সর্ব্বদা উৎসাহ ও উপদেশ দিয়া পত্র লিখিতেন। সমাজসেবা ও কুটিরশিল্প সম্বন্ধে সুভাষচন্দ্র ও সেবা সমিতির কর্ম্মীদের মধ্যে যে পত্রালোচনা হইত তাহা সুভাষচন্দ্রের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লব্ধ গভীর জ্ঞানের পরিচায়ক।

 একে ত জেলখানার আবহাওয়াটাই সাধারণতঃ এইরূপ যে মানুষকে তাহা অমানুষ করিয়া ফেলে। বদ্ধ, নিরানন্দ কারাজীবনে আত্ম-শক্তিতে আস্থা কমিয়া আসে। আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা ও অনুরক্তি শিথিল হইয়া যায়—চরিত্র-বল নষ্ট হয়। তাহার উপর মান্দালয় কারাগার সে যুগের জঘন্যতম কারাগারসমূহের অন্যতম। শ্রীযুক্ত দিলীপ কুমার রায়কে এক পত্রে তিনি লিখিয়াছিলেন, “আমার বিশ্বাস দীর্ঘ মেয়াদী বন্দীর পক্ষে সব চেয়ে বড় বিপদ এই যে আপনার অজ্ঞাতসারে তাকে অকালবার্দ্ধক্য এসে ধরে; তুমি ধারণাই করতে পারবে না কেমন করে মানুষ দীর্ঘকাল কারাবাসের ফলে ধীরে ধীরে দেহে ও মনে অকালবৃদ্ধ হয়ে যেতে থাকে।” মান্দালয়ের অভিজ্ঞতা সুভাষচন্দ্রকে এরূপ বিচলিত করে যে ভবিষ্যতে তিনি ভারতীয় বন্দীশালার অবস্থা ও শাসন প্রণালীর উন্নতি বিধান করিতে চেষ্টা করিবেন বলিয়া সঙ্কল্প করেন। শ্রীযুক্ত দিলীপকুমার রায়কে উক্তপত্রে তিনি লিখেন, “এতদিন জেলে বাস করার পর কারাশাসনের একটা অমূল্য সংস্কারের একান্ত প্রয়োজনের দিকে আমার চোখ খুলে গেছে এবং ভবিষ্যতে কারাসংস্কার আমার একটী কর্ত্তব্য হবে।” তিনি আরও লিখেন, “যতদিন জেলের মধ্যে স্বাস্থ্যকর ও সামাজিক বিধি-ব্যবস্থার বন্দোবস্ত না হয় ততদিন কয়েদীর সংস্কার হওয়া অসম্ভব এবং ততদিন জেলগুলি আজকালকার মত নৈতিক উন্নতির পথে অগ্রসর না হয়ে অবনতির কেন্দ্র হয়েই থাকবে।”

 সুভাষচন্দ্র নীরবে ও নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করিয়া যাইতে ভালবাসিতেন। তাঁহার সহকর্ম্মীদের ও তিনি নিষ্কাম সেবাব্রতে দীক্ষা দিয়াছিলেন। আদর্শনিষ্ঠা সুভাষচন্দ্রের চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সুভাষচন্দ্র বলিতেন, “যে জাতির idealism (আদর্শ প্রীতি) আছে সে জাতি তার আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য যন্ত্রণা ক্লেশ সানন্দে বরণ করিয়া লইতে পারে। আদর্শের প্রতি আমাদের তেমন শ্রদ্ধা নাই বলিয়াই আমরা দলগত ক্ষুদ্র স্বার্থ লইয়া মাতিয়া থাকি—স্বীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মকলহে প্রবৃত্ত হই।” দেশের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে মতবিরোধ—কর্ম্মীদের মধ্যে প্রভুত্ব বা নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব সুভাষচন্দ্রকে বড় বেশী আঘাত দিত। দক্ষিণ কলকাতা জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রীযুক্ত ভূপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিকট এক পত্রে তিনি লিখিয়াছিলেন—“আজ বাঙ্‌লার সর্ব্বত্রই কেবল দলাদলি ও ঝগড়া এবং যেখানে কাজকর্ম্ম যত কম, সেখানে ঝগড়া তত বেশী···আমি শুধু এই কথা ভাবি—ঝগড়া করিবার জন্য এতলোক পাওয়া যায়—কিন্তু মিলাইতে পারে, মীমাংসা করিয়া দিতে পারে—এরকম একজন লোকও আজ সারা বাঙ্‌লার মধ্যে পাওয়া যায় না?···আজ বাঙ্‌লার সর্ব্বত্র কেবল ক্ষমতার জন্য কাড়াকাড়ি চলিতেছে। যার ক্ষমতা আছে—সেই ক্ষমতা বজায় রাখিতেই সে ব্যস্ত। যার ক্ষমতা নাই, সে ক্ষমতা কাড়িবার জন্য বদ্ধপরিকর। উভয় পক্ষই বলিতেছে—দেশোদ্ধার যদি হয় তবে আমার দ্বারাই হউক। নয় তো হইয়া কাজ নাই। এই ক্ষমতা-লোলুপ রাজনীতি-ব্যবসায়ীদের ঝগড়া বিবাদ ছাড়িয়া নীরবে আত্মোৎসর্গ করিয়া যাইতে পারে, এমন কর্ম্মী কি বাঙ্‌লায় আজ নাই?”

 “আজ বাঙ্‌লার অনেক কর্ম্মীর মধ্যে ব্যবসাদারী ও পাটোয়ারী বুদ্ধি বেশ জাগিয়া উঠিয়াছে। তাহারা এখন বলিতে আরম্ভ করিয়াছে, “আমাকে ক্ষমতা দাও—কর্ম্মচারীর পদ দাও—অন্ততঃপক্ষে কার্য্যকরী সমিতির সভ্য করিয়া দাও—নতুবা আমি কাজ করিব না।” আমি জিজ্ঞাসা করি নরনারায়ণের সেবা ব্যবসাদারীতে, contract এ কবে পরিণত হইল? আমি ত জানিতাম সেবার আদর্শ এই:—

“দাও দাও ফিরে নাহি চাও
থাকে যদি হৃদয়ে সম্বল।”

 যে বাঙালী এত শীঘ্র দেশবন্ধুর ত্যাগের কথা ভুলিয়াছে—সে যে কতদিনের আগেকার স্বামী বিবেকানন্দের ‘বীরবাণী’ ভুলিবে—ইহা আর বিচিত্র কি? দুঃখের কথা, কলঙ্কের কথা, ভাবিতে গেলে বুক ফাটিয়া যায়। প্রতিকারের উপায় নাই—করিবার ক্ষমতা নাই—তাই অনেক সময় ভাবি চিঠি পত্র লেখা বন্ধ করিয়া বাহ্যজগতের সহিত সকল সম্বন্ধ শেষ করিয়া দিই। পারিতো দেশবাসীর পক্ষ হইতে আমরা লোকচক্ষুর অন্তরালে তিলে তিলে জীবন দিয়া প্রায়শ্চিত্ত করিয়া যাইব। তারপর মাথার উপরে যদি ভগবান থাকেন, পৃথিবীতে যদি সত্যের প্রতিষ্ঠা হয়, তবে আমাদের হৃদয়ের কথা দেশবাসী একদিন না একদিন বুঝিবেই বুঝিবে। দেশের নামে এতবড় একটা প্রহসনের অভিনয় দেখিব—বিংশ শতাব্দীর বাঙ্‌লা দেশে যে ‘Nero is fiddling while Rome is burning’ কথার একটী নূতন দৃষ্টান্ত চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিবে ইহা কোনও দিন ভাবি নাই।”

 “অনেক কথা বলিয়া ফেলিলাম—হৃদয়ের আবেগ চাপিয়া রাখিতে পারিলাম না। আপনাদের নিতান্ত আপনার বলিয়া মনে করি, তাই এত কথা বলিতে সাহস করিলাম। আপনারা গঠনমূলক কাজে ব্যাপৃত— আশাকরি, আপনারা এই দলাদলির পঙ্কিল আবর্ত্তে আকৃষ্ট হইবেন না।”

 কাজ করিবার আগ্রহ যেখানে কম, কলহ সেখানেই বেশী। মূল লক্ষ্যের প্রতি স্থির দৃষ্টির অভাব হইলেই পথের পার্থক্য বড় হইয়া দেখা দেয়। এই জন্যই নিছক রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে সুভাষচন্দ্র গঠনমূলক কর্ম্মের উপরও জোর দিতেন। “দক্ষিণ কলিকাতা সেবা সমিতি”কে তিনি প্রাণের সহিত ভালবাসিতেন। উল্লিখিত পত্রে তিনি লিখিয়াছিলেন, “আমি কংগ্রেসের কাজ ছাড়িতে পারি তবুও সেবাশ্রমের কাজ ছাড়া আমার পক্ষে অসম্ভব। দরিদ্রনারায়ণের সেবার এমন প্রকৃষ্ট সুযোগ আমি কোথায় পাইব?” সেবা সমিতির অন্যতম কর্ম্মী শ্রীমান হরিচরণ বাগ্‌চীকে এক পত্রে তিনি লিখিয়াছিলেন, “রাজনীতির স্রোত ক্রমশঃ যেরূপ পঙ্কিল হইয়া আসিতেছে, তাহাতে মনে হয় যে, অন্ততঃ কিছু কালের জন্য রাজনীতির ভিতর দিয়া দেশের কোনও বিশেষ উপকার হইবে না। সত্য, ত্যাগ এই দুইটি আদর্শ রাজনীতিক্ষেত্রে যতই লোপ পায়, রাজনীতির কার্য্যকারিতা ততই হ্রাস পাইতে থাকে। রাজনৈতিক আন্দোলন নদীর স্রোতের মত কখনও স্বচ্ছ কখনও পঙ্কিল; সবদেশেই এইরূপ ঘটিয়া থাকে। রাজনীতির অবস্থা এখন বাঙ্‌লাদেশে যাহাই হোক না কেন, তোমরা সে দিকে ভ্রূক্ষেপ না করিয়া সেবার কাজ করিয়া যাও।”

 বাঙ্‌লাদেশকে তিনি যে কত গভীরভাবে ভালবাসিতেন মান্দালয় জেল হইতে লিখিত পত্র পড়িলেই তাহা সম্যক অনুভব করা যায়। বাঙ্‌লার প্রতিটি ধূলি-কণাকে তিনি নিজের জীবনের চেয়েও অধিক ভালবাসিতেন। কারবাসকালে বাঙ্‌লার নিরুপম সৌন্দর্য্য তাঁহাব কবি-চিত্তে অপূর্ব্ব মনোরম হইয়া ফুটিয়া উঠিত। শ্রীযুক্ত অনাথবন্ধু দত্তের এক পত্রের উত্তরে তিনি লিখিয়াছিলেন, “আপনি লিখেছেন, “দেশ ও কালের ব্যবধান আপনাকে বাঙ্‌লাদেশের নিকট আরও প্রিয় করিয়া তুলিয়াছে।” কিন্তু দেশের ও কালের ব্যবধান সোনার বাঙ্‌লাকে আমার কাছে কত সুন্দর, কত সত্য করে তুলেছে তা আমি বলতে পারি না। ৺দেশবন্ধু তাঁর বাঙ্‌লার গীতিকবিতায় বলেছেন, বাঙ্‌লার জল, বাঙ্‌লার মাটির মধ্যে একটা চিরন্তন সত্য নিহিত আছে। এ উক্তির সত্যতা কি এমনভাবে বুঝতে পারতুম, যদি এখানে এক বৎসর না থাকতুম? “বাঙ্‌লার ঢেউখেলানো শ্যামল শস্যক্ষেত্র, মধু-গন্ধবহ মুকুলিত আম্রকানন, মন্দিরে মন্দিরে ধূপ-ধুনা-জ্বালা সন্ধ্যার আরতি, গ্রামে গ্রামে ছবির মত কুটীর প্রাঙ্গন” এ সব দৃশ্য— কল্পনার মধ্যদিয়াও কত সুন্দর। প্রাতে অথবা অপরাহ্ণে খণ্ড খণ্ড শুভ্রমেঘ যখন চোখের সামনে ভাসতে ভাসতে চলে যায়, তখন ক্ষণেকের জন্য মনে হয় মেঘদূতের বিরহী যক্ষের মত তাদের মারফৎ অন্তরের কথা কয়েকটি বঙ্গ-জননীর চরণপ্রান্তে পাঠিয়ে দিই। অন্ততঃ বলে পাঠাই, বৈষ্ণবের ভাষায়—

‘তোমারই লাগিয়া কলঙ্কের বোঝা
বহিতে আমার সুখ।’

সন্ধ্যার নিবিড় ছায়ার আক্রমণে দিবাকর যখন মান্দালয় দুর্গের উচ্চপ্রাচীরের অন্তরালে অদৃশ্য হয়, অন্তগমনোন্মুখ দিনমণির কিরণজালে যখন পশ্চিমাংশ সুরঞ্জিত হয়ে উঠে এবং সেই রক্তিম রাগে অসংখ্য মেঘখণ্ড রূপান্তর লাভ করে দিবালোক সৃষ্টি করে—তখন মনে পড়ে সেই বাঙ্‌লার আকাশ, বাঙ্‌লার সূর্য্যাস্তের দৃশ্য। এই কাল্পনিক দৃশ্যের মধ্যে যে এত সৌন্দর্য্য রয়েছে তা কে পূর্ব্বে জানত!

 প্রভাতের বিচিত্র বর্ণচ্ছটা যখন দিঙ্‌মণ্ডল আলোকিত ক’রে এসে নিদ্রালস নয়নের পর্দ্দায় আঘাত করে বলে, ‘অন্ধ জাগো’—তখনও মনে পড়ে আর একটা সূর্য্যোদয়ের কথা, যে সূর্য্যোদয়ের মধ্যে বাঙ্‌লার কবি, বাঙ্‌লার সাধক বঙ্গজননীর দর্শন পেয়েছিল।”

 পরলোকগত ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টেপোধ্যায়ের নিকট এক পত্রে তিনি লিখিয়াছেন, “এখানে না এলে বোধ হয় বুঝতুম না সোনার বাঙ্‌লাকে কত ভালবাসি। আমার সময়ে সময়ে মনে হয়, বোধ হয় রবিবাবু কারারুদ্ধ অবস্থা কল্পনা করেই লিখেছেন,—

“আমার সোনার বাঙ্‌লা! আমি তোমায় ভালবাসি,—
“চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস
আমার প্রাণে বাজায় বাঁশী”

যখন ক্ষণেকের তরে বাঙ্‌লার বিচিত্ররূপ মানস চক্ষের সম্মুখে ভেসে উঠে, তখন মনে হয় অন্ততঃ এই অনুভূতির জন্যও কষ্ট করে মান্দালয় আসা সার্থক হয়েছে। কে আগে জানত ‘বাঙ্‌লার মাটি, বাঙ্‌লার জল’ বাঙ্‌লার আকাশ, বাঙ্‌লার বাতাস এত মাধুরী আপনার মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে।”

 সুভাষচন্দ্র লিখিয়াছিলেন “সাধারণতঃ একটা দার্শনিক ভাব বন্দীদশায় মানুষের অন্তরে শক্তির সঞ্চার করে।” কারাবাসের দীর্ঘ দুই বৎসরকাল তিনি নিজকে ভবিষ্যতের কঠিনতর সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করিয়াছেন, আত্ম-শক্তির উদ্বোধন করিয়া তিনি অজেয় হইয়া উঠিয়াছেন। দুঃখের অন্তরে যে শক্তির উৎস সেই উৎস হইতেই তিনি শক্তি সংগ্রহ করিয়াছেন। জেলের নির্জ্জনতার মধ্যে তিনি এই শক্তির সাধনা করিয়াছেন। শ্রীযুক্ত অনাথবন্ধু দত্তকে ১৯২৬ সালের ডিসেম্বরে এক পত্রে তিনি লিখিয়াছিলেন, “আমার প্রার্থনা শুধু এই—‘তোমার পতাকা যারে দেও, তারে বহিবারে দাও শকতি।’ যখনই জেল হইতে মুক্তির কল্পনা করি তখন আনন্দ যত হয়, তার চাইতে বেশী হয় ভয়। ভয় হয়, পাছে প্রস্তুত হতে না হতে কর্ত্তব্যের আহ্বান এসে পৌঁছায়। তখন মনে হয়, প্রস্তুত না হওয়া পর্য্যন্ত যেন কারামুক্তির কথা না উঠে। আজ আমি অন্তরে-বাহিরে প্রস্তুত নই, তাই কর্ত্তব্যের অহ্বান এসে পৌঁছায় নাই। সেদিন প্রস্তুত হব সেদিন এক মুহূর্ত্তের জন্যও আমাকে কেহ আট্‌কে রাখতে পারবে না।”

 ১৯২৭ সালের ৬ই এপ্রিল ইন্‌সিন্ জেল হইতে “আত্মশক্তি” সম্পাদক শ্রীযুক্ত গোপাল লাল সান্যালকে লিখেন, “জীবন প্রভাতে এই প্রার্থনা বুকে লইয়া কর্ম্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছিলাম, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।’ ভবিষ্যতের কথা মানি না, তবে এখন পর্যন্ত ভগবান সে প্রার্থনা সফল করিয়া আসিতেছেন। তাই আমি বড় সুখী—সময়ে সময়ে মনে হয়, আমার মত সুখী জগতে আর কয়জন আছে? এখন এই বৃত্তাকার উন্নত প্রাচীরের বাহিরে যাইবার আশা যে পরিমাণ সুদূরপরাহত হইতেছে, সেই পরিমাণে আমার চিত্ত শান্ত ও উদ্বেগশূন্য হইয়া আসিতেছে। অন্তরের মধ্যে বাস করা ও অন্তরের আত্মবিকাশের স্রোতে জীবনতরী ভাসাইয়া দেওয়ার মধ্যে পরম শান্তি আছে এবং বেশী দিন কারারুদ্ধ অবস্থায় বাস করিতে হইলে অন্তরের শান্তিই একমাত্র সম্বল, তাই সুদীর্ঘ কারাবাসের সম্ভাবনায় আমি এক অপূর্ব্ব শান্তি পাইতেছি। Emerson বলিয়াছেন, “we must live wholly from within”—একথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য এবং এই সত্যের উপর আমার বিশ্বাস দিন দিন দৃঢ়তর হইতেছে।”

 সুভাষচন্দ্রের মান্দালয় বাসকালে বাংলাদেশকে অন্ধকার করিয়া ১৯২৫ সালের ১৬ই জুন বাঙ্‌লার গৌরব-রবি দেশবন্ধু অস্তমিত হন। এই উপলক্ষে সাহিত্যাচার্য্য শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সহিত সুভাষচন্দ্রের যে পত্র বিনিময় হয়, তাহা হইতে দেশবন্ধুর প্রতি সুভাষচন্দ্রের ঐকান্তিক শ্রদ্ধা ও ভক্তির পরিচয় পাই। “দেশবন্ধু করিতেন দেশের কাজ, আমরা করিতাম দেশবন্ধুর কাজ। দ্বিধাবিহীন চিত্তে কায়মনোবাক্যে তাঁহার আদেশ পালন করিয়া যাওয়াই ছিল আমাদের একমাত্র কাজ।” দেশবন্ধুর মৃত্যুতে সাহিত্যচার্য্য শরৎচন্দ্র মাসিক বসুমতীতে ‘স্মৃতিকথা’ লিখেন। শরৎচন্দ্রের স্মৃতি কথা পড়িয়া সুভাষচন্দ্র তাঁহাকে লিখেন, “যাঁহারা তাঁর অন্তরঙ্গ ছিল তাঁদের মনের মধ্যে কতগুলি গোপন ব্যথা রয়ে গেল। আপনি সে গোপন ব্যাথার কয়েকটির উল্লেখ করে শুধু যে সত্য প্রকাশ করবার সহায়তা করেছেন তা নয়, আপনি আমাদের মনের বোঝাটাও হালকা করেছেন। বাস্তবিক “পরাধীন দেশের সবচেয়ে বড় অভিশাপ এই যে মুক্তি সংগ্রামে বিদেশীয়দের অপেক্ষা দেশের লোকদের সঙ্গেই মানুষকে লড়াই করিতে হয় বেশী।” এই উক্তির নিষ্ঠুর সত্যতা তাঁর অনুগামী কর্ম্মীরা হাড়ে হাড়ে বুঝেছে এবং এখনও বুঝছে।” আপনি এক জায়গা লিছেন —“লোক নাই, অর্থ নাই, হাতে একখানা কাগজ নাই, অতি ছোট যাহারা তাহারা ও গালি গালাজ না করিয়া কথা কহে না। দেশবন্ধুর সে কি অবস্থা!” সেদিনকার কথা এখনও আমার মনে স্পষ্ট অঙ্কিত আছে। আমরা যখন গয়া কংগ্রেসের পর কলিকাতায় ফিরি তখন নানাপ্রকার অসত্যে এবং অর্দ্ধসত্যে বাঙ্‌লার সংবাদপত্রগুলি ভরপুর। আমাদের স্বপক্ষে ত কথা বলেই নাই, এমন কি আমাদের বক্তব্যও তাদের কাগজে স্থান দিতে চায় নাই। তখন স্বরাজ্য-ভাণ্ডার প্রায় নিঃশেষ। যখন অর্থের খুব প্রয়োজন তখন অর্থ পাওয়া যায় না। যে বাড়ীতে একসময়ে লোক ধরত না, সেখানে কি বন্ধু, কি শত্রু কাহারও চরণধূলি আর পড়ে না। কাজেই আমরা কয়েকটা প্রাণী মিলে আসর জমাতুম। পরে সখন সেই বাড়ীর পূর্ব্বগৌরব ফিরে এল, বাহিরের লোক এবং পদপ্রার্থীরা যখন এসে আবার সভাস্থল দখল করল, তখন আমরা কাজের কথাও বলবার সময় পাই না। কত পরিশ্রমের ফলে, কি রকম হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে ভাণ্ডারে অর্থ সঞ্চয় হল, নিজেদের ঘরের কাগজ প্রকাশিত হল এবং জনমত অনুকূলদিকে ফেরানো হল তা বাহিরের লোক জানে না, বোধ হয় কোনদিন জানবেও না। কিন্তু এই যজ্ঞের যিনি ছিলেন হোতা, ঋত্বিক, প্রধান পুরোহিত, যজ্ঞের পূর্ণ সমাপ্তির আগেই তিনি কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ভিতরের আগুন, বাহিরের কর্ম্মভার এই দুয়ের চাপ তাঁর পার্থিব দেহ আর সহ্য করতে পারল না।” দেশবন্ধুর জীবনচরিত প্রণেতা শ্রীযুক্ত হেমেন্দ্রনাথ দাসগুপ্তকে তিনি লিখেন, “মন্ত্র বা সাধয়েয়ম্ শরীরং বা পাতয়েয়ম্” এই বাণী দেশবন্ধুর হৃদয়ের মধ্যে গাথা ছিল। তিনি দুর্ব্বার বিক্রমে যখন যে পথে চলিতেন কেহ তাঁহাকে রোধ করিতে পারিত না। সমুদ্রের তরঙ্গায়িত জলরাশির ন্যায় সকল বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করিয়া আপনার বেগে আপন আদর্শের পানে ছুটিতেন। প্রিয়জনের আর্ত্তনাদ অথবা অনুচরবর্গের সাবধান বাণীও তাঁহাকে ফিরাইতে পারিত না। এই দিব্যশক্তি দেশবন্ধু কোথা হইতে পাইলেন? সে শক্তি কি সাধনার দ্বারা লভ্য?

 আমি পূর্ব্বেই বলিয়াছি যে, দেশবন্ধু শক্তির সাধক হইলেও তিনি তন্ত্রমতে শক্তির সাধনা করেন নাই। তাঁহার প্রাণ ছিল বড়; আকাঙ্ক্ষা ছিল বড়। ‘যো বৈ ভূমা তৎসুখং নাল্পে সুখমস্তি” এই কথা যেন তাঁহার অন্তরের বাণী ছিল। তিনি যখন যাহা চাহিতেন সমস্ত প্রাণ মন বুদ্ধি দিয়া চাহিতেন। তাহা পাইবার জন্য একেবারে পাগল হইয়া যাইতেন। পর্ব্বত প্রমাণ অন্তরায় ও তাঁহাকে ভীত বা পশ্চাৎপদ করিতে পারিত না। নেপোলিয়ান বোনাপার্ট যেরূপ এক সময়ে তাঁহার সম্মুখে আল্‌পস্ পর্ব্বত দেখিয়া বলিয়াছিলেন “There shall be no Alps”—আমার সম্মুখে আল্পস্ পর্ব্বত দাঁড়াইতে পারিবে না, দেশবন্ধুও সেইরূপ সকল বাধাবিঘ্নকে তুচ্ছ জ্ঞান করিতেন! কি সম্বল লইয়া তিনি ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকা প্রকাশে ও কাউন্সিলজয়ের চেষ্টায় হস্তক্ষেপ করিয়াছিলেন, এ সংবাদ যিনি জানেন তিনিই এই উক্তি সমর্থন করিবেন। আমরা কোনও প্রকার অসুবিধা বা বাধার কথা তুলিলে তিনি ধমক দিয়া বলিতেন—তোমরা একেবারে Pessimist (নৈরাশ্যবাদী)। আমারও কাজ ছিল যেখানে কোন বিপদ বা অসুবিধার আশঙ্কা—সেই কথাটি তুলিয়া ধরা, তাই তিনি প্রায়ই বলিতেন,—“you young old men”—ওহে অকালবৃদ্ধ যুবকবৃন্দ। যাঁহারা মনে করেন যে, দেশবন্ধু অন্তরে নরমপন্থী ছিলেন কেবল যুবকদের পাল্লায় পড়িয়া তিনি ইচ্ছার বিরুদ্ধে চরমপন্থীর ন্যায় কাজ করিতেন, তাঁহারা তাঁহার স্বভাব ও প্রকৃতির সম্বন্ধে কিছুই জানেন না। বস্তুতঃ তিনি ছিলেন চিরতরুণ। তিনি তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বুঝিতে পারিতেন, তাঁহাদের সুখ-দুঃখ অনুভব করিতে পারিতেন। তিনি তরুণদের সঙ্গ ভালবাসিতেন, তাই তরুণরাও তাঁহার পার্শ্ব ছাড়িতে চাহিত না। এই সব কারণে আমি পূর্ব্বে দেশবন্ধুকে “তরুণের রাজা” বলিয়াছি।”