বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র/পাঁচ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

পাঁচ

 ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে সুভাষচন্দ্র ব্যবহারিক মনােবিজ্ঞানে বিশ্ববিদ্যালয়ে এম, এ ক্লাশে ভর্ততি হন। কিন্তু কয়েক মাস পরে হঠাৎ একদিন তাঁহার পিতা তাঁহার নিকট আই, সি, এস (ভারতীয় সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষায় প্রতিযােগিতা করিবার জন্য বিলাত যাত্রার প্রস্তাব করেন। আই, সি, এস পড়িতে সুভাষচন্দ্রের মােটেই ইচ্ছা ছিল না—উহা দেশসেবার অন্তরায় হইবে কিনা, এই চিন্তা তখন তাঁহাকে ব্যাকুল করিয়া তুলিয়াছিল। তখনকার রাজনৈতিক অবস্থাও ঘাের সঙ্কটময়। রাওলাট আইন পাশ হইয়াছে—দেশবাসীর ন্যায্য অধিকারের সংগ্রামকে রক্তস্রোতে প্লাবিত করিয়া দিয়া জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হইয়াছে। দেশের মুসলমানেরাও তথন জাগ্রত। খিলাফৎ আন্দোলন পূর্ণোদ্যমে চলিতেছে। দেশের সর্ব্বত্র দারুণ অসন্তোষ। এই অবস্থায় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য বিলাত যাওয়া সুভাষচন্দ্রের ন্যায় দেশপ্রেমিকের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি কিছুতেই রাজী ছিলেন না—তাঁহার বন্ধু বান্ধবেরা বুঝাইলেন বিদেশে শিক্ষা লাভের এই সুযােগ ছাড়া উচিত নয়। একদিকে পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধবদের একান্ত ইচ্ছা, অন্যদিকে সিভিলিয়ান পদের প্রতি নিজের অশ্রদ্ধা—এই দোটানায় পড়িয়া সুভাষচন্দ্রকে কয়েকদিন “মানসিক ঝড়ের” মধ্যে কাটাইতে হইয়াছিল। যাহাই হউক, অবশেষে, সুভাষচন্দ্র অগত্যা নিজের অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিলাত যাত্রায় মত দেন এবং ১৯১৯ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর কলিকাতা পরিত্যাগ করেন। সুভাষচন্দ্র ভাবিয়াছিলেন যে, এত অল্প সময়ের মধ্যে আই, সি, এস পরীক্ষায় কৃতকার্য্য হওয়া সম্ভবপর হইবে না, তাই কেম্ব্রিজের ডিগ্রী লইয়া আসিয়া তিনি শিক্ষাদান ব্রত গ্রহণ করিবেন। বিলাতে গিয়া কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী লাভ করা তাঁহার নিজেরও একটা প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল। এইজন্যও তিনি বিলাত যাত্রার এই সুযোগ অবহেলা করা উচিত বিবেচনা করেন নাই।

 কেম্ব্রিজ হইতে এক পত্রে তিনি লিখিয়াছিলেন, “আমার মতলব আগামী বৎসর, ‘সিভিল সার্ভিস’ পরীক্ষা দেওয়া এবং পাশ করি বা ফেল করি Moral Science Tripos এর পরীক্ষা দেওয়া। এখানকার ডিগ্রী আমাকে লইতেই হইবে—কারণ ভবিষ্যতে আমার বিশেষ কাজে লাগিবে।” ‘সিভিল সার্ভিস’ পরীক্ষা সম্বন্ধে অপর একখানি পত্রে তিনি লিখেন, “এখনও বুঝিতে পারি নাই, আদর্শভ্রষ্ট হইয়াছি কিনা। আমি আত্মপ্রতারণা করিয়া নিজেকে বুঝাইতে চাই না যে সিভিল সার্ভিসের জন্য পড়াটা ভাল। চিরকাল ঐ জিনিষটাকে ঘৃণা করিতাম—এখনও বোধ হয় করি। এ অবস্থায় সিভিল সার্ভিসের জন্য চেষ্টা করা দুর্ব্বলতার নিদর্শন অথবা কোন দূরবর্ত্তী মঙ্গলের সূচক তাহা ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারি না।” সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা যে তাঁহার উদ্দেশ্য ও আদর্শের পরিপন্থী হইবে এই চিন্তা তাঁহাকে বস্তুতঃই ব্যাকুল করিয়া তুলিয়াছিল। বিদেশে শিক্ষালাভের ইচ্ছার বশবর্ত্তী হইয়াই তিনি বলাত গমনে স্বীকৃত হইয়াছিলেন—কিন্তু সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় কৃতকার্য্য হইলে তাঁহার মূল উদ্দেশ্য যে পণ্ড হইয়া যাইবে, এই ভয় প্রথম হইতেই তাঁহার মনে ছিল। এই সম্পর্কে তিনি এক বন্ধুকে লিখেন, “তবে একটা গুরুতর মুস্কিল এই, যদি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পাশ হইয়া যাই তাহা হইলে আমি উদ্দেশ্যভ্রষ্ট হইব।”

 বিলাতযাত্রার আট নয় মাস পরেই তিনি আই, সি, এস পরীক্ষা দেন। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া তিনি চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। এই পরীক্ষায় তিনি ইংরেজী রচনায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। পাশ করিয়া, তিনি তাঁহার বন্ধুকে লিখিলেন, “তুমি শুনে দুঃখিত হবে যে আমি আই, সি, এস পাশ করে ফেলেছি এবং চতুর্থস্থান অধিকার করেছি। এখন উপায়?” সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পাশ করিয়া তিনি সুখী হইতে পারেন নাই; কেননা, তিনি জানিতেন এখন তাঁহার উপর চাকুরি গ্রহণের চাপ আসিবে এবং তাহা অগ্রাহ্য করাও শক্ত হইবে। অথচ সিভিল সার্ভিসে যোগদান করিলে সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণযন্ত্রের অন্যতম চালক হইতে হইবে। পূর্ব্ব হইতেই বন্ধুর সঙ্গে কথা ছিল, যদি পাশ করেন তাহা হইলে I. C. S. পদ পরিত্যাগ করিয়া চাকুরিপ্রিয় বাঙালীর সম্মুখে নূতন আদর্শ স্থাপন করিবেন। তখন ১৯২০ সাল। নাগপুর কংগ্রেসে অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব গৃহীত হইয়াছে। দেশ তখন আসন্ন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হইতেছে। সুভাষচন্দ্রের অন্তরেও এই আহ্বান পৌঁছিয়াছে। তিনি তাঁহার কর্ত্তব্য স্থির করিয়া ফেলিলেন। সেই সময় তাঁহার সম্মুখে সিভিল সার্ভিসের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ—কিন্তু শৃঙ্খলিতা মাতৃভূমির আহ্বানে ভারতসচিব মিঃ মন্টেগুর অশেষ অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি সিভিল সার্ভিস পদে ইস্তফা দিলেন। ভারতের জাতীয় আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করিবার জন্য সুভাষচন্দ্র আর কালবিলম্ব না করিয়া ভারতবর্ষে রওনা হইলেন। ইতিমধ্যে তিনি কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হইতে দর্শনে অনার্সসহ বি, এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আই, সি, এস, পদ ছাড়িবার পূর্ব্বেই তিনি দেশবন্ধুর সহিত পত্রালাপ করেন। দেশবন্ধু তাঁহাকে National College ও তাঁহার পরিচালিত সাময়িকপত্র পরিচালনার ভার দিবেন বলিয়া পত্র লিখিয়াছিলেন। ১৯২১ সালের ১৬ই জুলাই সুভাষচন্দ্র বোম্বাই পৌঁছিয়া মণিভবনে মহাত্মা গান্ধীর সহিত সাক্ষাৎ করেন। সুভাষচন্দ্র সিভিল সার্ভিস পদ পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ বর্ণনা করিতে গিয়া লিখিয়াছেন যে, একই সময়ে দুই প্রভুর অর্থাৎ বৃটিশ সরকার ও দেশের সেবা করা তাঁহার পক্ষে সম্ভবপর হইবে না বিবেচনা করিয়াই তিনি ঐ পদে ইস্তফা দেন এরং জাতীয় আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করিবার জন্য সত্বর ভারতবর্ষে প্রত্যাবর্ত্তন করেন।