বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র/সাতাশ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

সাতাশ

 ফরওয়ার্ড ব্লক গঠনের দ্বারা বামপক্ষকে সংহত করিয়া সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সংগ্রামের এই আয়োজন দক্ষিণপক্ষের মনে স্বভাবতঃই আতঙ্কের সঞ্চার করিল। সুভাষচন্দ্রের সংগ্রামাত্মক পরিকল্পনাকে তাঁহারা যে বরদাস্ত করিবেন না, ইহা আদৌ বিস্ময়কর নহে। সুভাষচন্দ্র দ্বিতীয়বার কংগ্রেসের সভাপতি নির্ব্বাচিত হইলে কংগ্রেস নায়কগণ আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিলেন—The work of twenty years has been undone overnight (বিশ বৎসরের সাধনা রাতারাতি নষ্ট হইল)! তাঁহারা জানিতেন সুভাষচন্দ্র তাঁহার বিরাট ব্যক্তিত্ব ও বিপুল সংগঠন শক্তি প্রভাবে অচিরাৎ সকল কংগ্রেস কর্মী ও স্বাধীনতাকামী সমস্ত দেশবাসীকে আপন সুদক্ষ নেতৃত্ব ও পরিচালনাধীনে একই আদর্শ ও কর্মপন্থায় উদ্বুদ্ধ করিয়া সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সংঘবদ্ধ করিতে সমর্থ হইবেন। কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী নেতৃত্ব এতদূর আন্দোলনবিমুখ হইয়া উঠিয়াছিল যে পাছে এই সংগ্রামশীল শ্রেণী কোথাও সংগ্রাম আরম্ভ করিয়া দেয় এই ভয়ে মে মাসে বোম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস কমিটির সভায় দুইটি প্রস্তাব পাশ করাইয়া লয়। প্রথম প্রস্তাবে বলা হয়, প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির অনুমতি ব্যতীত কেহ সত্যাগ্রহ করিতে পারিবে না। দ্বিতীয় প্রস্তাবের দ্বারা প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সহিত কংগ্রেসী মন্ত্রীদলের সম্বন্ধ নির্দ্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হয়। শেষোক্ত প্রস্তাবের দ্বারা কংগ্রেস মন্ত্রিত্বকে কংগ্রেস কমিটির ঊর্দ্ধে স্থান দেওয়া হয়। সুভাষচন্দ্র সে সময়ে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি কর্ত্তৃক ঐ দুইটি প্রস্তাব গ্রহণের ফলে সুভাষচন্ত্রের সহিত কংগ্রেসের নেতৃস্থানীয়দের পুনরায় বিরোধ উপস্থিত হয়। সুভাষচন্দ্রের মতে ঐ প্রস্তাব দুইটি কার্য্যে পরিণত হইলে কংগ্রেস নিয়মতান্ত্রিকতার দিকে বেশীরকম ঝুঁকিয়া পড়িবে এবং নিখিলভারত কংগ্রেস কমিটিতে সাধারণ কংগ্রেস কর্মীর অধিকার ক্ষুন্ন হইবে। ‘These resolutions were calculated to strengthen the position of the Rightists and to take the Congress away from the path of mass struggle.’ ৯ই জুলাই সুভাষচন্দ্র নিখিল-ভারত প্রতিবাদ দিবস পালনের নির্দ্দেশ দিলেন। কংগ্রেস কর্ত্তৃপক্ষ ইহাকে দিদ্রোহ বলিয়া গ্রহণ করিলেন এবং সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে আর এক দফা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করিলেন।

 অহিংস উপায়ে যাহারাই স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করিয়া আসিতেছে দল বা প্রতিষ্ঠান নির্ব্বিশেষে কংগ্রেস এ যাবৎ সে সমস্তেরই মিলনক্ষেত্র বলিয়া পরিগণিত হইত। কিন্তু ত্রিপুরীর পরে একদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের ফল এই হয় যে, কংগ্রেসের গণতান্ত্রিক ও সর্ব্বজনীন রূপ বিলুপ্ত হয়। একদলীয় মন্ত্রিসভার প্রতি অবিচলিত আস্থা ও দ্বিধাবিহীন আনুগত্যই কার্য্যতঃ এখন কংগ্রেসকর্মী হইবার পক্ষে একটি প্রধান সর্ত্ত হইয়া দাঁড়াইল। জাতীয় মহাসভা একটি Totalitarian প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইল। একদলীয়ত্বের নীতি মন্ত্রিসভা হইতে দ্রুত সমস্ত কংগ্রেস সংগঠনের মধ্যে সংক্রামিত হইল। কংগ্রেস হাইকমাণ্ডের কর্ম্মপদ্ধতির প্রতি যাহাদের পরিপূর্ণ আস্থা নাই তাঁহাদিগকে অর্থাৎ সমস্ত বামপন্থীদের কংগ্রেস হইতে বিতাড়িত করাই এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য। অন্যায় ও অত্যাচারের প্রতিরোধের জন্য সত্যাগ্রহ করিবার অধিকার কংগ্রেসসেবী মাত্রেরই আছে। সুতরাং এই প্রস্তাবের দ্বারা সর্ব্বপ্রথম কংগ্রেস কর্মীর সেই মূল অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হইল। সর্ব্বাপেক্ষা বৃহত্তম ও প্রধানতম, ‘গণতন্ত্র ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার সুদৃঢ় ভিত্তি’র উপর প্রতিষ্ঠিত, জাতীয় প্রতিষ্ঠান কংগ্রেসের মধ্যে এই অনাচার নিবারণকল্পে চিরবিদ্রোহী সুভাষচন্দ্র মাথা তুলিয়া দাঁড়াইলেন।

 রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ অবিলম্বে কৈফিয়ৎ তলব করিয়া পাঠাইলেন। সুভাষচন্দ্র যে কৈফিয়ৎ দিলেন তাহাতে তিনি সুস্পষ্টভাবে জানাইয়া দিলেন, প্যাটেল প্রস্তাবের বিরোধিতা করিবার ও উহার বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করিবার ন্যায়সঙ্গত অধিকার তাঁহার আছে এবং সেই অধিকার সম্পূর্ণরূপে গণতান্ত্রিক ও কংগ্রেসের গঠনতন্ত্রসিদ্ধ অধিকার (Constitutional and democratic right)। উপসংহারে তিনি কংগ্রেস সভাপতিকে লিখিলেন—“If you decide to resort to disciplinary action, I shall, gladly face it for the sake of what I regard as a just cause. In conclusion, I have to request that if any Congressman is penalised in connection with the events of the 9th July, then you will also take action against me. If the observance of the All India Day of the 9th July is a crime, then I confess, I am the arch-criminal.”

 অবশেষে ওয়ার্কিং কমিটি ওয়ার্দ্ধায় অনেক শলাপরামর্শ করিয়া নিম্নলিখিত হুকুমনামা জারি করিলেন:—

 “কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছে যে, মিঃ সুভাষচন্দ্র বসু শৃঙ্খলাভঙ্গের গুরুতর অপরাধে বঙ্গীয় কংগ্রেস কমিটির সভাপতিপদের ও ১৯৩৯ সালের আগষ্ট মাস হইতে তিন বৎসর পর্য্যন্ত কোন নির্ব্বাচিত কংগ্রেস কমিটির সভ্যশ্রেণীভুক্ত হওয়ার অনুপযুক্ত বলিয়া ঘোষিত হলেন।”

 সুভাষচন্দ্র শান্তভাবে ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্ত শুনিলেন—তাঁহার উপর কংগ্রেসী বড় কর্ত্তাদের মনোভাব কাহারও অবিদিত নাই। সিদ্ধান্ত শুনিয়া তিনি কেবল বলিলেন—“Is that all?” ইহা অপেক্ষা গুরুতর শান্তির জন্য যেন তিনি পূর্ব হইতে প্রস্তুত হইয়াই ছিলেন! কিন্তু এই প্রস্তাবের দেশব্যাপী প্রতিক্রিয়া বড় গুরুতর হইয়া দেখা দিল। সর্ব্বত্র অসন্তোষ ও বিক্ষোভ ঘনাইয়া উঠিল। ২৫শে আগষ্ট বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভায় এই বিষয়ে যে প্রস্তাব গৃহীত হয় তাহার কিয়দংশ নিম্নে উদ্ধৃত হইল।

 “কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে নির্ব্বাচিত সভাপতিকে বিধিবিরুদ্ধভাবে, জবরদস্তিপূর্বক ও সম্পূর্ণ যুক্তিহীনতার সহিত পদচ্যুত করিয়া যে প্রস্তাব গ্রহণ করিয়াছেন, এই সভা তাহার তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করিতেছে।”

 “এই সভা শ্রীযুক্ত বসুর প্রতি পূর্ণ আস্থা জ্ঞাপন করিয়া দৃঢ়তার সহিত এই মত ব্যক্ত করিতেছে যে, এই প্রদেশে কংগ্রেসের কার্য্যকলাপ সাফল্যের সহিত সুনির্ব্বাহ করিতে হইলে তাঁহার নেতৃত্ব অপরিহার্য।”

 উক্ত প্রস্তাবে ইহাও উল্লেখ করা হয় যে, “যেহেতু বিদায়ী সভাপতির (সুভাষচন্দ্রবসুর) পদত্যাগ নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি কর্ত্তৃক গৃহীত হইবার পূর্বেই নূতন সভাপতি (ডাঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদকে) মনোনয়ন দ্বারা নিয়মতন্ত্রবিরুদ্ধ কাজ করা হইয়াছে, যেহেতু বর্ত্তমান ওয়ার্কিং কমিটি অধিক সংখ্যক প্রতিনিধির সমর্থন পাইবে কিনা সে বিষয়ে সন্দিহান হইয়া নূতন সভাপতিকে সমগ্র প্রতিনিধিমণ্ডলীকর্ত্তৃক যথারীতি নির্ব্বাচিত হইবার সুযোগ দেন নাই এবং যেহেতু তৎকালীন সভানেত্রী শ্রীযুক্তা সরোজিনী নাইডু প্রারম্ভেই ঘোষণা করেন যে তিনি গঠনতন্ত্রবিরোধী কাজ করিতে যাইতেছেন ও সভানেত্রীর এই ঘোষণার পরে সভাপতি নির্ব্বাচিত হইয়াছে সেই কারণে বর্ত্তমান ওয়ার্কিং কমিটির শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বনের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে কিনা বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি সে বিষয়ে গভীর সন্দেহ পোষণ করে।” পরিশেষে বঙ্গীয় কংগ্রেস কমিটি ওয়ার্কিং কমিটিকে তাহার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে পুনর্ব্বিবেচনা করিতে অনুরোধ করিয়া জানাইয়া দেয় যে, ওয়ার্কিং কমিটির নিকট হইতে উত্তর না আসা পর্য্যন্ত বঙ্গীয় কংগ্রেস কমিটির সভাপতির পদ অপূর্ণ থাকিবে ও শ্রীযুক্ত সুভাষচন্দ্র বসুর নির্দ্দেশক্রমেই কমিটির কাজ চলিতে থাকিবে।

 সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বিত হওয়ায় সমস্ত দেশে তুমুল বিক্ষোভ দেখা দিলেও মহাত্মাজী বিন্দুমাত্র বিচলিত হন নাই। এই প্রসঙ্গে তাঁহার যে মনোভাব প্রকাশ পাইয়াছে তাহা এই—“In my opinion the action taken by the Working Committee was the mildest possible.” পরে অবশ্য প্রকাশ পায়, গান্ধীজীর নির্দ্দেশক্রমেই সুভাচন্দ্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বিত হইয়াছে। গান্ধীজীর উক্তি—“I must confess that the Subas Babu resolution was drafted by me (সুভাষবাবু সম্পর্কিত প্রস্তাবের খসড়া যে আমিই প্রস্তুত করিয়াছি, ইহা আমি অবশ্যই স্বীকার করি)।”

 ওয়ার্কিং কমিটির প্রস্তাব সম্পর্কে সুভাষচন্দ্র নিম্নোক্ত বিবৃতি প্রচার করেন:—

 “কার্য্যতঃ আমাকে তিন বৎসরের জন্য কংগ্রেস হইতে বহিষ্কৃত করিয়া ওয়ার্কিং কমিটি যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছেন আমি সেই সিদ্ধান্ত সাদরে অভ্যর্থনা করিয়া লইতেছি। গত কয়েক বৎসর যাবৎ দক্ষিণ পক্ষকে সংহত করিবার যে প্রচেষ্টা চলিতেছে মন্ত্রিত্ব গ্রহণের ফলে যাহা অধিকতর বৃদ্ধি পাইয়াছে এই সিদ্ধান্ত তাহারই ফল। ওয়াকিং কমিটির এই কার্য্যে কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ও সেই দলের কার্য্যকলাপের স্বরূপ প্রকাশ পাইয়াছে। আমার উপর যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বিত হইয়াছে তাহা তাঁহাদের দৃষ্টির সম্পূর্ণ সমীচীনই হইয়াছে। নিয়মতান্ত্রিকতা ও সংস্কারপন্থার দিকে কংগ্রেস যে ক্রমশই বেশী ঝুঁকিয়া পড়িতেছে তাহার বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সতর্ক করিয়া দিয়া, জনগণের বৈপ্লবিক চেতনাকে নষ্ট করিবার অভিপ্রায়ে কংগ্রেস যে প্রস্তাব গ্রহণ করিয়াছে তাহার বিরোধিতা করিয়া, বামপক্ষকে সংহত করিবার উদ্দেশ্যে ব্যাপক প্রচারকার্য্য চালাইয়া এবং সর্বোপরি দেশকে আগামী আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হইতে ক্রমাগত আবেদন জানাইয়া দক্ষিণপস্থীদের বিচারে আমি এমন এক অপরাধ করিয়াছি যাহার জন্য আমাকে শাস্তি পাইতেই হইবে। আমার উপর এই দণ্ডাদেশ আমার দেশবাসী অনেকের মনে আঘাত দিয়া থাকিলেও আমি ইহাতে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হই নাই— এবং এই দণ্ডাজ্ঞা আমার নিকট অপ্রত্যাশিতও নহে। নিয়মতান্ত্রিকতা ও গণআন্দোলন এই দুইয়ের প্রকৃতিগত বিরোধের সম্পূর্ণ যৌক্তিক পরিণতি ইহাই। আমাদের রাজনৈতিক বিবর্ত্তনধারার ইহা একটি ক্রম। এই জন্য আমার মনে কিছুমাত্র তিক্ততা বা বিদ্বেষের ভাব নাই। আমার শুধু এই ভাবিয়া দুঃখ হইতেছে যে, ওয়ার্কিং কমিটি এখন ইহা বুঝিতে পারিতেছে না যে এই ধরণের কার্য্যে আমার চেয়ে তাহারাই অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত হইবে।

 ফরওয়ার্ড ব্লকের সভ্যগণ, সকল বামপন্থী ও আপামর জনসাধারণকে এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও সম্পূর্ণ শান্ত থাকিয়া ক্রমবর্দ্ধমান সহিষ্ণুতা ও অধ্যবসায়ের সহিত কাজ করিয়া যাইতে অনুরোধ করিতেছি। আমি দণ্ডিত হইলে কি আসে যায়? এখন আমি অধিকতর নিষ্ঠার সহিত কংগ্রেসের কাজে আত্মনিয়োগ করিব ও জাতির দীনসেবক হিসাবে অবিরত দেশ ও কংগ্রেসের কাজে লাগিয়া থাকিব। সকলের নিকট আমার অনুরোধ, আপনারা দলে দলে ফয়ওয়াড ব্লকের সভ্য হউন। আমরা সংঘবদ্ধ হইলেই অগণিত কংগ্রেস কর্মীদের আমাদের মতানুবর্ত্তী করিতে পারিব ও বর্ত্তমান নিয়মতান্ত্রিকতা ও সংস্কারপন্থী মনোভাবের পরিবর্ত্তন সাধন করিতে পারিব—আমাদের সংঘবদ্ধ ও সম্মিলিত শক্তি স্বাধীনতার যুদ্ধে নিয়োজিত করিতে পারিব।

 উপসংহারে আমি সকলকে স্মরণ করাইয়া দিতে চাই, আজ যাহা ঘটিয়াছে তাহা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি মাত্র। কয়েকবৎসর পূর্বেও একবার বামপন্থীদিগকে কংগ্রেস হইতে বিতাড়িত করা হইয়াছিল; কিন্তু, অনতিকাল পূর্বেই তাঁহারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করিয়া কংগ্রেসকে তাঁহাদের নীতিও কর্মপন্থা মানিয়া লইতে বাধ্য করে। আমার কোনও সন্দেহ নাই যে, আমরা বামপন্থীরা যে আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করি তাহা ন্যায্য এবং ন্যায্য বলিয়াই ওয়ার্কিং কমিটির প্রতিকূলতার দ্বারাই ইহা সমধিক পুষ্টি লাভ করিবে। ভারতবর্ষের একপ্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্য্যন্ত ফরওয়ার্ড ব্লকের সমর্থনে যে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গিয়াছে তাহাতে আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়াছে যে, অনতিবিলম্বেই আমরা কংগ্রেসকে সম্পূর্ণ নূতন ভাবে গড়িয়া বিপ্লবাত্মক কর্মপন্থায় ফিরাইয়া আনিতে সক্ষম হইব ও কংগ্রেসের নামে পুনরায় সংগ্রাম শুরু করিতে পারিব।”

 ফরওয়ার্ড ব্লক ও বামপন্থীদের প্রতি কংগ্রেস কর্ত্তৃপক্ষের মনোভাব নির্লজ্জ আকারে প্রকাশ পাইল। কংগ্রেসের প্রধান নেতারা মায় মহাত্মা গান্ধী পর্য্যন্ত প্রকাশ্যভাবে ইহাদের বিরুদ্ধে প্রচারকার্য্য চালাইতে লাগিলেন। পণ্ডিত জওহরলাল ফরওয়ার্ড ব্লককে ‘an evil’ ও বামপন্থীদের ‘a group of opportunists and disgruntled elements’ বলিয়া অভিহিত করিলেন। করাচী হইতে ফৈজপুর পর্য্যন্ত পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু যে সংগ্রামশীল ও প্রগতিমুখী মনোভাবের পরিচয় দিয়াছিলেন তাহাতে পণ্ডিতজীর এই রূপান্তর (metamorphosis) তৎকালে দেশবাসীর মনে গভীর বিস্ময় উৎপাদন করিয়াছিল। মহাত্মাগান্ধী হরিজন পত্রে The Congressman নামক প্রবন্ধে বামপন্থী দলগুলির সম্পর্কে মন্তব্য করিলেন—“I am afraid that these groups contain in themselves the seeds of the decay of the Congress.” (এই দলগুলির মধ্যে কংগ্রেস ধ্বংসের বীজ বর্ত্তমান)।

 এদিকে ইউরোপীয় মহাযুদ্ধ দাবানলের মত চতুর্দ্দিকে ছড়াইয়া পড়িতেছে। বল্কান রাজ্যগুলি একে একে জার্মানীর পদানত হইয়া পরাধীনতার নিগড় পায়ে পড়িতেছে। ভারতীয় জাতীয় মহাসভা কিন্তু ইয়োরোপের এই সংকটকালে বামপন্থীদলগুলিকেই তাহাদের প্রধান শত্রু বলিয়া জানিলেন ও বর্দ্ধিত উৎসাহে বামপন্থীদলনে লাগিয়া গেলেন। ২৫শে নভেম্বরের ফরওয়ার্ড ব্লক পত্রে “Whom They Fight?” শিরোনামায় এক সম্পাদকীয় প্রবন্ধে সুভাষচন্দ্র লিখিলেন, “for the Rightists, British Imperialism is a lesser enemy than Indian leftism. You can compromise with the former, bnt in the case of the latter, war to the bitter end. And perhaps if British Imperialism strikes at Indian Leftism, our Rightist friends will have no cause for regret.”

 ১৯৩৮ সালে কংগ্রেস সভাপতিরূপে সুভাষচন্দ্র আবেগময়ী ভাষায় বলিয়াছিলেন, ইয়োরোপে অর্থ নৈতিক রেষারেষির ফলে ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বন্টন বৈষম্যের ফলে যে অবস্থার সৃষ্টি হইয়াছে তাহাতে জোর করিয়া বলা যাইতে পারে যে, আগামী ছয়মাসের মধ্যে ইয়োরোপে সাম্রাজ্য বাদী লড়াইয়ের পৈশাচিক তাণ্ডব-নৃত্য সুরু হইবে; সুতরাং, এই যুদ্ধের পূর্ণ সুযোগ আমাদের গ্রহণ করিতে হইবে। তাই তিনি বৃটিশ গভর্ণমেন্টকে ছয়মাসের সময় দিয়া চরমপত্র দিবার প্রস্তাব করেন, কিন্তু কংগ্রেস তখন ত এই সংগ্রামশীল নীতি গ্রহণ করেনই নাই, এমন কি বৃটেন যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার এক মাসের মধ্যে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটিতে অক্টোবর মাসে যুদ্ধ সম্পর্কিত যে প্রস্তাব গৃহীত হয় তাহাতে বলা হইল —“The A. I. C. C. however does not wish to take any decision precipitately and without giving opportunity for the war and peace aims of the British Government to be clarified with particular reference to India.” কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দলের নেতা শ্রীজয়প্রকাশ নারায়ণ ‘India cannot accept any settlement of freedom issue which pledges in advance her support in the war.’—এই মর্ম্মে যে সংশোধন প্রস্তাব আনয়ন করেন তাহাও অগ্রাহ্য হয়। বৃটিশগভর্ণমেণ্ট ভারতীয় জনগণের সম্মতি ব্যক্তিরেকেই ভারতকে যুদ্ধলিপ্ত দেশ বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। তথাপি কংগ্রেস কোন স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছিতে কিম্বা কর্ত্তব্য নির্দ্ধারণ করিতে পারিলেন না। কংগ্রেস নেতৃত্বের এই শোচনীয় ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করিয়া সুভাষচন্দ্র বলিয়াছিলেন—“The whole world prepared itself for the crisis but not the Indian National Congress.” অবশেষে যখন দেখা গেল যে ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দেওয়া ত দূরের কথা ব্রিটিশ গভর্ণমেন্টের নিকট হইতে নির্ভরযোগ্য কোন আশ্বাস বাণীও পাওয়া গেল না— দিল্লীতে ভারতের মহামান্য রাজপ্রতিনিধি ও দেশ নায়কদের দীর্ঘ আলোচনা অক্টোবর মাসে এক ঘোষণার দ্বারা চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইল তখনও কংগ্রেসী মন্ত্রিমণ্ডলীর পদত্যাগ ভিন্ন অপর কোন পন্থাই কংগ্রেস কর্ত্তৃপক্ষ ভাবিয়া পাইলেন না। প্রথমে জনসাধারণ এই ভাবিয়া আশান্বিত হইয়াছিল যে, মন্ত্রিমণ্ডলীর পদত্যাগের পরে কংগ্রেস নিশ্চয়ই কোন সক্রিয় ও সংগ্রামমূলক কর্ম্মপন্থা গ্রহণ করিবেন; কিন্তু, গান্ধিজীর উক্তি শীঘ্রই সব আশা নির্ম্মূল করিয়া দিল। এই সময়কার হরিজন পত্রে “Causes” নাম দিয়া এক প্রবন্ধে মহাত্মা স্পষ্টরূপেই জানাইয়া দিলেন—“There is no question of civil disobedience for there is no atmosphere for it—at any rate there is no question of civil disobedience in the aggressive sense as we launched in 1930 and 1932.”

 বামপন্থীরা কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির ‘মন্ত্রিত্ব ত্যাগ রূপ’ এই তথাকথিত ‘Big step’এর সিদ্ধান্তকে আনন্দের সঙ্গেই গ্রহণ করেন—অবশ্য পদ্ধতি সম্বন্ধে কংগ্রেস নেতৃবর্গের সহিত তাহাদের মতভেদ ছিল। সুভাষচন্দ্রের অভিমত ছিল,—‘In the prevailing atmosphere the decision was good so for as it went but was not in keeping with what we regard as sound tactics. Instead of throwing up the sponge, the Congress Ministers should have stuck to their posts, should have gone on implementing the Congress programme and should have invited dismissal while discharging their legitimate duties.’

 বৃটেনের ঔপনিবেশিক অধিকার হস্তচ্যুত করিবার কোন সদিচ্ছাই যে নাই ভারতবর্ষের নজির তুলিয়া নাৎসী নায়ক হিটলার নিজ স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে তাহা প্রচার করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন—“If Britain started granting her Empire full liberty by restoring the freedom of India, we should have bowed before her.” কিন্তু, কংগ্রেসী বড় কর্ত্তাদের চৈতন্যোদয় হওয়া ত দূরের কথা তাঁহারা সকলকে পরিষ্কাররূপেই জানাইয়া দিলেন—“The Working Committee will continue to explore all means of arriving at an honourable settlement even though the British Government have banged the door in the face of the Congress.” অধিকন্তু, যুদ্ধের সূচনা হইতেই মহাত্মা গান্ধী বিনাসর্ত্তে ব্রিটিশ গভর্ণমেন্টকে সাহায্য দানের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিয়া আসিতেছেন। মহাত্মাজী অপূর্ব মহানুভবতার শিখর দেশ হইতে ঘোষণা করিলেন—“The Congress must not embarrass them (Government) in its (war’s) prosecution”. “I will resist civil disobedience unless I find the Country prepared for it.” এই প্রস্তুতির পরিমাপ হিসাবে এইবার কংগ্রেস স্বাধীনতার সল্পবাক্যে চরকা-খাদি ও হরিজন সম্বন্ধীয় দুইটি নূতন সর্ত্ত যোজনা করিয়া দিল এবং গান্ধীজী চরকা ও অহিংসাকে স্বরাজ-লাভের একমাত্র অস্ত্র বলিয়া মত প্রকাশ করিলেন। ‘Charka is the yardstick for gauging the Nation’s preparedness for struggle.’ শুধু তাই নয়, গান্ধীজী অহিংসার উপরেও অভূতপূর্ব গুরুত্ব আরোপ করিলেন। “I connot identify with any civil disobedience unless I am convinced that Congressmen believe in nonviolence with all its implications”. হরিজন আন্দোলন ও অনুরূপ সমাজ-সংস্কার মূলক কাজই এখন কংগ্রেসের কর্মতালিকায় প্রাধান্য পাইল। কংগ্রেস নায়কগণ এই অজুহাতও দেখাইলেন যে, আইন অমান্য আন্দোলন আরম্ভ করিলে হিন্দু-মুসলমানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিবার সম্ভাবনা রহিয়াছে। এই সময়কার ওয়ার্কিং কমিটির এক প্রস্তাবে বলা হহইয়াছে—The Working Committee desire to make it clear that the true test of preparedness for C. D. lies in Congressmen themselves spinning and promoting the cause of Khadi to the exclusion of Mill-cloth and deeming it their duty to establish harmony between the Communities by personal acts of service to those other than members of their own community and individual Hindu Congressmen seeking an occasion for fraternising with Harijans as often as possible. The Congress organisations and Congressmen should therefore prepare for future action by promoting this programme.” গান্ধীজী “স্বরাজের জন্য সূতা কাটুন” এই slogan তুলিলেন। এই সকল গঠনমূলক কাজের প্রতি অস্বাভাবিক গুরুত্ব আরােপ করাকে বামপক্ষ কংগ্রেসের সংগ্রাম বিমুখতার পরিচায়ক বলিয়া ধরিয়া লইলেন। তাঁহাদের অভিমত এই যে, এই সময় রচনাত্মক কর্মক্রমের উপর অতিমাত্রায় গুরুত্ব প্রদান আমাদিগকে মূল লক্ষ্য পথ হইতে সরাইয়া লইয়া যাইবে। লক্ষৌয়ে ছাত্রদের এক সভায় সুভাষচন্দ্র বলেন—“Swaraj cannot be achieved through the plying of Charka and by using Khadi. It would come only through mass organisations and sacrifices”

 এই সময়ে কংগ্রেস একদিকে গঠনমূলক কর্মপন্থার দিকে ঝুঁকিয়া পড়িলেন, অপরদিকে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি হইতে সরিয়া গিয়া গণপরিষদের Constituent Assembly দাবি করিলেন। কংগ্রেস নেতৃত্বের এই আপােষমুখী মনােভাবের কারণ অত্যন্ত স্পষ্ট। “ভারত যদি স্বাধীন হয় তবে আমাদের দ্বারাই হইবে, নতুবা হইয়া কাজ নাই”—কংগ্রেসের কর্ণধারগণের মনােগত ভাব ইহাই। সংগ্রাম আরম্ভ করিলে পাছে ক্ষমতা জনগণের হাতে চলিয়া যায় এই ভয়েই তাঁহারা সংগ্রামকে অনির্দ্দিষ্টকালের জন্য পিছাইয়া দিতে চাহিতেছেন ও বিক্ষুব্ধ জনগণকে গঠন মূলক কাজের ভাওতা দিয়া সংগ্রামের পথ হইতে সরাইয়া লইতে চাহিতেছেন।

 কংগ্রেসের এই সময়কার কর্ম্মধারা এবং এমতাবস্থায় বামপন্থীদলের কর্ত্তব্য কি সুভাষচন্দ্র ফরওয়ার্ড ব্লক পত্রে ‘The Correct Line’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয় প্রবন্ধে তাহা বিবৃত করেন। অদ্যকার মন্ত্রীমিশন প্রস্তাবিত Constituent Assembly (গণপরিষদ) গঠন সংক্রান্ত আলোচনায় সুভাষচন্দ্রের মতামত বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। প্রয়োজনবোধে এই প্রবন্ধটি আমরা বিস্তৃতাকারে উদ্ধৃত করিলাম—

 “To examine how the Congress Working Committee has so far succeeded in resisting mass pressure would be indeed an interesting study. Having suspended the fight with Imperialsm, it has been conducting a ruthless and continuous drive against the Left and particularly against the Forward Block. This serves to divert public attention from the path and the duty that lie ahead of us. To bewilder the public and thereafter scare it away from the path of struggle, bogeys have been created from time to time. Before the war, we were told that a forward move was impossible, because there was corruption within the Congress and because a forward move, when launched, would lead to an outbreak of violence. Since September last thay have had a brainwave and and we are now told that if the Congress starts a Satyagraha compaign, Hindu Muslim riots will inevitably follow. We are awaiting the invention of fresh argument for desisting from a dynamic policy. The tragedy that has overtaken the upper ranks of Congress leadership is due primarily to demoralisation that followed in the wake of office acceptance. The demoralisation was altogether unexpected. Who had ever expected that even those who have fought for years for India's freedom and who have braved the rigours of prison life would thus fail us in the most fateful hour of our history?

 The latest stunt which has been devised to stave off struggle and which may in time prove to be the greatest fraud perpetrated on the Indian people by their own leaders is the proposal of a Constituent Assembly under the aegis of an Imperialist Government. We have made some serious study of history and polities, and in our view, a Constituent Assembly, if it is not a misnomer, can come into existence only after the seizure of power. If for instance the Congress and British Government are engaged in struggle over the Indian problem, the Congress will first have to come out victorious and form a Provisional Government to take over power. Only such a Provisional National Government can summon a Constituent Assembly for framing a detailed constitution for India. The Assembly that is now being proposed by the Congress Working Committee may be a glorified All-Party Conference but it certainly not a Constituent Assembly. It will meet with the fate of the Irish Convention, which was the creature of Mr. Lloyd George. The Indian people should have nothing to do with such an Assembly the only purpose of which would be to sidetrack us from our principal task, as the Harijan Movement did in 1932 and 1933.

 Our own path is clear. We are now passing through the anti-imperialist phase of our movement. We have to rally all uncompromisingly anti-imperialist elements for the next move. The problem to-day is not merely to force the hands of the Congress Working Committee. That we must do. But even if we succeed therein, with Mahatma Gandhi at our helm, there will always be the danger of another Chauri-Chura, or another Harijan Movement or another Gandhi-Irwin Pact. For that danger we must prepare in advance, so that we may be able to meet it successfully when the time comes.