বিষয়বস্তুতে চলুন

বিলাত ভ্রমণ (প্রথম ভাগ)/কলম্বো

​

কলম্বো।

 কলিকাতা হইতে সারাপথ জাহাজে করিয়া বিলাত যাইতে হইলে, প্রায় সমস্ত সিংহল বা লঙ্কাদ্বীপটি প্রদক্ষিণ করিয়া যাইতে হয়। লঙ্কাদ্বীপের রাজধানী কলম্বোতে পৌঁছিবার প্রায় দুই দিন পূর্ব্ব হইতে লঙ্কাদ্বীপের পাহাড় ডান দিকে দেখা যাইতে থাকে। সমুদ্রের ধারটি প্রায় সবই পাহাড়ময়। ২রা এপ্রিল প্রাতে ৭টার সময় আমরা কলম্বো বন্দরে পৌঁছিলাম। বন্দরে ঢুকিতেই একটি অতি বিস্তীর্ণ পাথরের প্রাচীর সমুদ্রজলের মধ্য হইতে গাঁথা আছে দেখা যায়। এইটিকে “ব্রেক্ ওয়াটার” (Breakwater) বলে। সমুদ্রের ঢেউ আসিয়া যাহাতে বন্দরের মধ্যস্থিত জাহাজে না লাগিতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে এই প্রাচীর গাঁথা। মলয় ও চীনদেশে কোন বন্দরে আমি এরূপ দেখি নাই। তাহার কারণ, সে সকল স্থানে বন্দরের ঠিক সামনেই অন্যান্য ছোট ছোট দ্বীপ থাকাতে বাহিরের ঢেউ আটকাইবার জন্য আর অন্য কিছু গাঁথিতে হয় না। বন্দরের নিকটবর্ত্তী অনেক স্থানে আলোক স্তম্ভ নির্ম্মিত আছে। বন্দরের ভিতর কত রকমের অর্ণবপোত ও ছোট বড় নৌকা ও ষ্টীমলঞ্চ থাকে। কিন্তু চীন ও মলয়ের মত এত যুদ্ধের জাহাজ এখানে দেখিলাম না। সেখানে অত রণতরীর থাকার কারণ বোধ হয় তখনকার রুষ-জাপানের যুদ্ধ! এখানকার দেশীয় নৌকাগুলি কলিকাতার পান্‌সি হইতেও পরিপাটি ও ক্যাম্বিশের ছাদ দিয়া ঢাকা। এখানে রৌদ্র বড় প্রখর বলিয়া ঐরূপ করিতে হয়। দূর হইতে বন্দরের বাড়ী-ঘরগুলি দেখা যাইতে লাগিল—তাহার অধিকাংশ একতোলা ও লাল খোলার ঢালু ছাদ যুক্ত।

 বন্দরে পৌঁছিবামাত্রই একটী অতি মনোহর সুরে বিদেশীয় ভাষায় গান শুনিলাম—“টারারারা ডম্ বি আই,”—“টারারারা ডম্ বি আই।”

​এর মানে কিছু জানি না, তবে ক্যাবিনের জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া দেখিলাম,—কতকগুলি কাল কাল নগ্নমূর্ত্তি ছেলে ছোট ছোট ভেলায় চড়িয়া ঐ গানটি গাইতে গাইতে এবং বগল বাজাইতে বাজাইতে আমাদিগের দিকে আসিতেছে। আশ্চর্য্য হইয়া দেখিতে দেখিতে শুনিলাম বলিতেছে—

 “All right Mamma—2-anna bit, 4-anna bit Mamma—throw water little boy swim take”—অর্থাৎ দুয়ানি সিকি আপনারা মা জলে ফেলিয়া দিন, আমরা ছোট ছেলেরা সাঁতার দিয়ে তাহা তুলিয়া লইব।” অনেকে ফেলে দিতে লাগিলেন, আর তাহারা ডুব দিয়ে মাছের মত সাঁতার দিতে দিতে তুলে নিতে লাগিল; একটিও হারাল না। অনেকে জাহাজের মাস্তুলের উপর উঠে প্রায় একশত ফুট উঁচু থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে লাগিল। যা সিকি দুয়ানি পায়, মুখের ভিতর জিবের তলায় রাখে। তা ছাড়া আর ত সেখানে কোথাও ভাল রাখবার জায়গা নাই। তাদের এমন সুস্থ শরীর যে দেখলে পরে মনে হয় যেন কালো পাথর হতে খোদা প্রতিমূর্ত্তি। এই রকম দৃশ্য আমি মলয় দেশেও দেখিয়াছিলাম।

 বিদেশে বেড়াইতে আসিয়া পয়সার মায়া করিলে দেশ দেখা হয় না। যে যে দেখিবার জিনিষ আছে, তাহা অল্প সময়ের মধ্যে ভাল করিয়া দেখিয়া লইতে হইলে, “গাইড” বা পথ-দর্শক চাই। এইরূপ একজন লোক ও একখানি ঘোড়ার গাড়ী ভাড়া করিয়া আমরা চলিলাম।

 প্রথমেই পোষ্ট আফিসে গিয়া খানকতক চিঠি লিখিলাম। এখানে টাকা আধুলি সিকি অবধি চলে, দুয়ানি চলে না। তবে এখানকার প্রচলিত মুদ্রা টাকা ও সেণ্ট। একশত সেণ্টএ এক টাকা হয়। এইরূপ পাঁচ সেণ্টএ ডাকটিকিট ও তিন সেণ্টএ পোষ্টকার্ড পাওয়া যায়।

 বিলাত বা ইউরোপের অন্য কোন স্থান হইতে জাপান চীন মলয় বা ​অষ্ট্রেলিয়া প্রভৃতি যাইতে কলম্বো হইয়া যাইতে হয়। সেই কারণ এখানে অনেক বড় বড় জাহাজ লাগে ও সেইহেতু এই স্থানটি একটি বড় বন্দর। ডাঙ্গায় নামিয়া দেখিলাম, দোকানপাটে সমুদ্রের ধারের স্থানগুলি ভরা। রাস্তাগুলি চওড়া পরিষ্কার ও পাহাড়ে স্থানের মত উঁচু-নীচু। দুইধারে বড় বড় পাথরের বাড়ী অল্প সংখ্যক মাত্র আছে, অন্য সবগুলি একতোলা ও ঢালু ছাদের। গবর্ণরের প্রাসাদ ঠিক সমুদ্রের ধারেই একটি অনুচ্চ পাহাড়ে অবস্থিত। সহরের প্রায় চারিদিক হইতেই সমুদ্র দেখা যায়। সহরের ভিতরে মধ্যে মধ্যে বড় বড় মিষ্ট জলের হ্রদ আছে। সেগুলি আর কিছুই নয়—বড় বড় দীর্ঘিকার মতন। বর্ষার জল পাহাড়ের গাত্র হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া এ গুলিতেই আবব্ধ থাকে। জল লোনা নয় বলিয়া এই জলে দেখিলাম ধোপারা কাপড় কাচিতেছে, আর স্ত্রীলোকেরা কল হইতে কাজ করিয়া আসিয়া সাবান দিয়া গা ধুইতেছে।

 কলম্বো কলিকাতা হইতে অনেক ছোট সহর। বন্দর হইতে একটু ভিতরে যে সকল থাকিবার বাড়ী আছে, সেগুলি সব বাগানযুক্ত ও অনেকটা জমি লইয়া ঘেরা। সেই সকল স্থানই ধনীলোক ও সাহেবদের থাকিবার স্থান। ঠিক যেন কুঞ্জবনের মতন। এ সকল দেশে সব গাছই সতেজে জন্মায়। গাছগুলির ঘন পাতায় এমন সবুজ রঙ যে, আমাদের দেশে তেমন বড় একটা দেখা যায় না। আর তাদের ফুল ও ফল তেমনি বড় বড় ও সুন্দর! একটি সৌখীন লোকের বাগানে দেখিলাম, সমস্ত স্থান নানাপ্রকার ফুলে ভরা। সে পথ দিয়া গেলে, সুগন্ধে প্রাণ আমোদিত হয়, চোখ জুড়ায়। এইখানেই গাছের শীতল ছায়ায় বসিয়া মধুর স্বরে কত কি পাখী ডাকিতেছিল। আর সেখানে অবিরল ঝিল্লিরব শুনা যায়। তাতে সে নির্জ্জন স্থানে মনে এক অনির্ব্বচনীয় শান্তির ভাব আসিতেছিল। বড়ই ইচ্ছা হইতেছিল, আরও খানিক বসিয়া যাই।

 গাছপালা এত সহজে জন্মায় দেখিয়া আমার মনে হইতে লাগিল, বোধ ​হয় এখানে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশী হইবে। কিন্তু জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, তাহা নহে। কেন না পাথরের দেশ; আমাদের বঙ্গভূমির মত এ স্থান ভিজে মাটী নয়। সকল গাছগুলিই বড় বড় আকৃতিবিশিষ্ট—ছোট আগাছা নহে। এখানকার নারিকেল গাছগুলি খুব বড় ও ফলও তদুপযুক্ত। এমনি নারিকেল গাছ আমি পেনাঙ্গে দেখিয়াছিলাম। আম এখানে বারমাসই পাওয়া যায়। কলাও খুব বড় বড় হইয়া থাকে। পান গাছ যেখানে সেখানে দেখিতে পাওয়া যায়। সবই সুগন্ধযুক্ত ছাচি পান। “ব্রেডফুরুট” (Bread fruit) বলিয়া এক প্রকার গাছ আছে, শুনিলাম তাহার প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড লেবুর মতন বড় বড় ফলগুলি অতি সুখাদ্য। এমন আনারস ও পেঁপে কোথাও দেখি নাই। আমাদের দেশের ঐ ফলগুলির অপেক্ষা এ ফল অন্ততঃ তিন চারিগুণ বড় ও অনেক পরিমাণে সুমিষ্ট। বটগাছগুলি সব বহুদূরব্যাপী অসংখ্য মোটা মোটা জটা নামাইয়া অনেকটা স্থান জুড়িয়া দাঁড়াইয়া আছে। আর বাঁশ গাছের তো কথাই নাই—যেমন মোটা মোটা তেমনি সুন্দর ও সোজা তার পাপরিগুলি। এ সকল ছাড়া চা কফি প্রভৃতি অন্যান্য অনেক দ্রব্য এখানে বহু পরিমাণে জন্মায়। লিপটনের খুব একটি বড় চার কারখানা এই সহরের ভিতরেই আছে। তা ছাড়া একটি বড় “গ্রেফাইট” বা সীসার কারবার আছে। সেখানে অসংখ্য স্ত্রীলোক কাজ করে। আমরা যখন আসিতেছিলাম, তখন তাহারা ছুটি পাইয়া মলিন বসনে বাড়ী যাইতেছিল।

 এখানকার লোকেরা বড় গরীব, ও বড়ই অশিক্ষিত। অনেকে খৃষ্ট ধর্ম্মাবলম্বী। কিন্তু অধিকাংশ লোকই বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী। স্ত্রীলোকেরা লুঙ্গি পরে ও একটি গলা-ফাঁক “বডি” গায়ে দেয়। মাথায় ঘোমটা নাই, আর স্তনের উপরকার অংশ অর্দ্ধেকটা বাহির করিয়া রাখিতে ভালবাসে। তাহাদের হাসি বড়ই ম্লান। পুরুষদের এক অদ্ভুত বেশ। তারাও লুঙ্গি ​পরে, কোট গায়ে দেয়। দাড়ি গোঁপ রাখে, আবার মাথায় খোঁপা বাঁধে ও তাহাতে অর্দ্ধ চন্দ্রাকারে বাঁকা চিরুনি গুঁজিয়া রাখে। কেহই সবল সুস্থ বা হাসি মাখা মুখ নয়—কেন যে এমন কে জানে?

 স্থানটি যেমন ছোট তেমনি এখানে দেখিবার জিনিষও অতি অল্পই আছে। ভিক্‌টোরিরা পার্কের ঘাসযুক্ত খোলা ময়দানটি ঠিক যেন সবুজ সতরঞ্চি পাতা। সেখানে ছোট ছোট গাছ নাই, মাঝে মাঝে বড় বড় গাছ আছে। জমিটি উঁচু-নিচু। সেখানকার জলনিকাশ হইয়া মাঝে মাঝে এক একটি মিষ্ট জলের বড় বড় দীর্ঘিকা হইয়াছে। সেখানেও সেই পাখীর গান—সেখানেও সেই অবিশ্রান্ত ঝিল্লিরব। চারিদিকের দৃশ্যে কেমন একটু নির্জ্জন মধুর ভাব আছে।

 অনতিদূরেই কলম্বোর মিউজিয়ম। সেখানে আশেপাশে অনেকগুলি গবর্ণরের শ্বেতপ্রস্তর মূর্ত্তি আছে। সে সকল গুলিরই দেখিলাম তেজঃপূর্ণ উদ্দীপ্তভাব। একটিরও দয়া দাক্ষিণ্য বা কোমলতা মাখান ভাব নহে। যেন তাদের পদতলে পড়িয়াই সিংহলবাসীর অমন ম্লান মুখশ্রী হইয়াছে।

 মিউজিয়মের ভিতর নীচের তলায় প্রত্নতত্ব ও স্থানীয় শিল্প-বাণিজ্যের অনেক জিনিষ সুব্যবস্থায় সাজান আছে। ঘরে ঢুকিয়াই নানা প্রকার নৌকা ও তদুপযোগী দ্রব্যাদির প্রতিকৃতি একধারে সাজান আছে। সে যে কত রকমের, তা বলা যায় না। কোন কোনটি বা কেবল কতকগুলি সোজা সোজা কাঠ দিয়া প্রস্তুত—ঠিক যেন ভেলার মত। কোনটি বা আরও ভাল রকমের কামরাওয়ালা নৌকার মতন। সবগুলি সরু ও দ্রুতগতির উপযুক্ত। নানারকমের পাল, নানা রকমের দাঁড় ও লগি এবং মাছ ধরিবার জাল। আর একধারে সিংহলে মুক্তা তোলার ছবি সাজান আছে। কাল কাল নগ্ন মানুষগুলি ঝুড়ি লইয়া দড়ি ধরিয়া, জলে ডুব দিতেছে। কোনটী বা মুক্তা কাঠিবার অবস্থা, কোনটি বা উঠিবার অবস্থা, সব গুলিই অতি সুন্দর রচিত।

​ তার আর এক পাশে তাল ও নারিকেল গাছ হইতে যত রকম দ্রব্য হইতে পারে সেই সব রক্ষিত। গাছের গুড়ি হইতে নানারূপ কাঠের দ্রব্য ডোঙ্গা ও বরগা। পাতা হইতে কত রকম ঠোঙ্গা, চ্যাটাই, ছাতা, টোকাও লিখিবার তালপাতা। ছোবরা হইতে দড়ি ম্যাটিং বুরুষ ইত্যাদি। নারিকেল পাতার কাটি হইতে ঝাটা ঝারন। খোলা হইতে হুকা ও নানা প্রকার পাত্র। শাঁশ হইতে নানা প্রকার মিষ্টান্ন, তেল হইতে বাতি, সাবান ইত্যাদি। তালের রস হইতে গুড়, চিনি, মিছরি ও মদিরার মত নানা জাতীয় পানীয় প্রস্তুত রহিয়াছে।

 আর এক পাশে মালদ্বীপ প্রভৃতি স্থানের যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র ও তাহাদের পূজা করিবার দেবতা। সে দেবতাগুলি অতি ভীষণ দর্শন। অনেকেরই মুখ জলজন্তুর মত। কেহ কেহ বা আস্ত মানুষ ধরিয়া খাইতেছে। সে মনুষ্যজাতির শৈশব অবস্থার ভীষণ কল্পনার ছবিগুলির কথা ভাবিলে এখনও অবধি মনে ভয় হয়।

 পাশের ঘরে একদিকে পুরাকালের ও আধুনিক নানাজাতীয় মুদ্রা সাজান আছে। অতি প্রাচীনকালের মুদ্রাগুলি কেবল এক একটি লোহার বা তাঁবার খণ্ডমাত্র। তার অনেক পরে সুগঠন ও ছাপামারা ধাতু মুদ্রা আসিয়াছে। মুদ্রাগুলি সাজানতে যেন মনুষ্যজাতির সভ্যতার ক্রমবিকাশ বা অভিব্যক্তি স্পষ্টাক্ষরে লেখা আছে।

 তাহার পাশেই পাথরের, হাতীর দাঁতের, ও চন্দন কাঠের খোদাই কাজ। এ সকল দ্রব্যই সিংহলে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। সকল গুলিতেই বুদ্ধপ্রাণ সিংহলবাসীরা বুদ্ধদেবের মূর্ত্তি নানা ভাবে খুদিয়াছে। আর নানা স্থানের বুদ্ধলিপি খোদিত পুরান পাথরগুলিও ইংরেজ রাজ সযতনে রক্ষা করিয়াছেন।

 যেমন নীচের তলায় প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কীয় জিনিষ রক্ষিত আছে, তেমনি উপর তলায়ও মৃত জীব জন্তুদেহ সবই জীবন্তের মতন সাজান আছে। ​তার মধ্যে জলজ প্রাণী সর্ব্বাপেক্ষা বেশী। তা হবেই ত—সিংহল সমুদ্রতীরের দেশ কি না, তাই এখানে যত প্রকার নৌকার প্রতিকৃতি জলজ প্রাণীদেহের বাহুল্য দেখা যায়। ছোট বড় নানা আকৃতির ও নানা বর্ণের কত প্রকার মাছ। বিদ্যুৎ উৎপাদক “রে” ও “টরপেডো” সূচিমুখ মৎস্য বিশেষ ও লম্বা ল্যাজযুক্ত শঙ্কর মাছ। “ডিউডঙ্গ” শুশুকেরই জাতীয়—তাহারা মৎস্য নয়, সন্তানকে দুগ্ধপান করায়। বৃহদাকার একটি ঐ জন্তু ও তাহার এক ছানা একত্র রক্ষিত রহিয়াছে। আর তার তলায় লেখা যে, ছানাটিকে ধরাতে মাও আসিয়া আপনি ধরা দিল। এ রকম অধম জীবেরও এত সন্তান স্নেহ। তা ছাড়া নানা জাতীয় “কোয়াল” “স্পঞ্জ” ও “হাইড্রয়েট”ও আছে; একটি কফি গাছের উপর একটি প্রজাপতি এমন সুন্দরভাবে বসেছে—ঠিক যেন কফিগাছেরই পাতার মত। কে তাকে চিনবে প্রজাপতি ব’লে।—দেখিলাম পাখা দুখানি যেন কফিপাতা, আর ধড়টি যেন বোঁটা, আর গায়ের রঙ্গ ঠিকই কফিপাতারই মত। প্রাণীরা শত্রুর চক্ষে এমনি করিয়া ধূলা দিয়াই এই বিপদ সঙ্কুল জগতে আত্মরক্ষা করে। এইরূপ অনুকরণই (mimicry) ডারউইনএর অভিব্যক্তিবাদের মহা পরিপোষক। অর্থাৎ অবস্থানুসারে নিজেকে গড়িয়া লইতে না পারিলে মরিতে হয়।—কি প্রাণীর বেলা, কি মনুষ্যজাতির বেলা এ নিয়ম সকলের পক্ষে সমান প্রযুজ্য।

 মিউজিয়ম হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া সেই স্থানের বাজার দেখিতে চলিলাম। কেনা-বেচার জায়গায় লোকের আবশ্যক অনাবশ্যকের জিনিষ দেখিলে সেখানকার লোকের প্রকৃতি বুঝা যায়। এই জন্যেই আমি যে দেশেই বেড়াতে যাই না কেন, দেশের বাজার ও স্থানীয় লোকদের বসতিস্থান না দেখিয়া ফিরি না। যাইতে যাইতে দেখিলাম, পথে পানওয়ালীরা পান বেচিতেছে—আস্ত আস্ত পান ও খানকতক করে সুপারি দেওয়া। দোকানে দোকানে নারিকেল, আম, কলা, পেঁপে, আনারস ​প্রভৃতি সুন্দর ফল বিক্রয় হইতেছে। সে রকম আকৃতিবিশিষ্ট ও সে রকম মিষ্ট ফল আর কোথাও দেখি নাই। অনেকগুলি কিনিয়া জাহাজে আনিলাম ও আনিবার সময় আমাদের বাড়ীর ছেলেদের কথা মনে হইতে লাগিল। পিপাসা হওয়াতে ডাব খাইলাম। সে হলদে হলদে ডাবগুলিকে তাহারা “রাজার ডাব” (King Coconut) নাম দিয়াছে। তাতে ছোবড়া নাই—এত নরম যে পেনকাটা ছুরি দিয়া কাটা যায়। এক একটিতে একটি গ্লাস ভরে জল। আর কি যে সুমিষ্ট, তা বলে বুঝান যায় না। তৃপ্তির সহিত আকণ্ঠ পান করিয়া দাম জিজ্ঞাসা করিলে বলিল,—এক একটি চারি আনা।

 এখানে অনেক রকম যানবাহন দেখিলাম। মানুষে টানা রিক্‌স গাড়ী আছে, তাহা ঠিক দ্বিচক্র ছোট হালকা বগি গাড়ীর মত ও খুব দ্রুত চলে। দু চাকার ঘোড়ার গাড়ী ও চার চাকার ঘোড়ার গাড়ী অসংখ্য পাওয়া যায়—তাদের সব কলিকাতার গাড়িভাড়া হইতে ভাড়া সুবিধা। ছতরিওয়ালা গরুর গাড়ী আছে, সে আরও সস্তা ও গরু গুলি অনেক সুস্থ ও সবল। তা ছাড়া বৈদ্যুতিক ট্রাম চলে, তার এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্য্যন্ত ১০ সেণ্ট মাত্র ভাড়া। তবে মোটের উপর কলিকাতা হইতে লোকসংখ্যা ও গাড়ী যাতায়াত কম বলিয়া রাস্তাগুলিও ভাল থাকে।

 এখান হইতে সে স্থানের আদৎ দেশীয় লোকেরা যে পাড়ায় বাস করে, সেই স্থান দেখিতে চলিলাম। সেই সকল স্থান আমাদের কলিকাতার রাস্তার মতন অপরিষ্কার নয়। পূর্ব্বেই স্ত্রীলোকদের ও পুরুষদের বেশভূষার কথা বলিয়াছি। তাহারা খুবই গরীব ও খুবই দুরবস্থাগ্রস্থ বলিয়া মনে হইল। কিন্তু যে কারণেই হউক, আমাদের থেকে খুব পরিষ্কার।

 এখান হইতে আসিতে আসিতে ওলন্দদের রাজধানীর ভগ্নাবশেষ দেখা গেল। সেখানে এখন আর সে সময়ের সমৃদ্ধির কিছুই নাই। ​কেবল একটি ধ্বংসপ্রায় সমাধিক্ষেত্র ও একটি বৃহৎ ঘণ্টা উচ্চে টাঙ্গান আছে। পূর্ব্বে এ সব অঞ্চলে ওলন্দাজদের প্রাধান্য ছিল; এখনও তাহারা যব প্রভৃতি দ্বীপের রাজা। সিংহল দ্বীপে মৃতজনের অস্থি ছাড়া আর তাঁহাদের এখন কিছুই নাই।

 ইহারই অনতিদূরে এক বিস্তীর্ণ সরোবরের তীরে একটি ছোট বৌদ্ধমন্দির দেখিতে গেলাম। সে মন্দিরটি লোকালয় হইতে দূরে এক নিভৃত স্থানে, চারিদিকের বড় বড় গাছের দ্বারা আচ্ছাদিত। বহুদিনের পুরাতন প্রাচীরগুলি ভাঙ্গা ও মন্দিরটি অযত্নে রক্ষিত। সেখানে অনেকগুলি ছাঁচি পানের গাছ আছে। যাঁহারা মন্দির দেখিতে যান, তাঁহারা স্বেচ্ছায় এক একটি পাতা ছিঁড়িয়া দেবতার প্রসাদ মনে করিয়া মুখে দেন। তা ছাড়া সে বৌদ্ধমন্দিরের ভিতর নৈবেদ্য বা শঙ্খ ঘণ্টা কিছুই নাই। ছেঁড়া গেরুয়া বসন পরিহিত সেখানকার বৌদ্ধপুরোহিতেরা অতিশয় গরিব। তাঁহারা তাঁহাদের ইষ্টদেবকে তাল পাতার পুথি পড়িয়া পূজা করেন। বুদ্ধদেবের জন্মবৃত্তান্ত, গোপার পদ্মপত্র হইতে আবির্ভাব, বুদ্ধের ধ্যানস্থ প্রতিমূর্ত্তি ভক্তেরা তাঁদের দেবতার মূর্ত্তি কত বিভিন্নরূপেই কল্পনা করিয়াছেন।

 মন্দিরের সামনেই একটি ধর্ম্মপ্রচার করিবার স্থান। তার চারিদিকেই শ্রোতারা বসেন, আর মধ্যের এক উচ্চ বেদীতে পুরোহিত বসিয়া ধর্ম্ম-উপদেশ দেন। তার পাশেই একটি ভগ্ন উচ্চ মন্দিরচূড়ায় একটি বড় ঘণ্টা ঝুলান আছে—সন্ধ্যা-উপাসনার সময় এই ঘণ্টার রবই দূর হইতে সকলকে আহ্বান করে। আর তার পাশেই এক উচ্চ স্থানে আলো দিবার ব্যবস্থা। সে আলোটি এখন অযত্নে অতিশয় নিস্প্রভ। বিশ্বভুবন যে আলোয় আলোকিত হইয়াছে, তারই একটি ছোট মিটমিটে প্রতিকৃতি।

 আমিও সেই প্রসাদ তরুর তলায় দিয়া আসিবার সময় একটী পানপাতা ছিঁড়িয়া মুখে দিলাম। আর ফিরিবার কালে পালিভাষায় লেখা সেই ​তালপাতার পুথি হইতে একটি পাতা সঙ্গে আনিলাম। তার সার মর্ম্ম আর একটি কাগজে ইংরাজিতে তর্জ্জমা করিয়া ছাপা ছিল—তা এই,—

“এই বুদ্ধের ধর্ম্ম—এই প্রভুর আজ্ঞা।”

 ১। “জীব হত্যা করিও না—যে প্রাণ দিতে পার না সে প্রাণ নিও না।”

 ২। “দুটী দ্রব্য একান্ত বর্জ্জনীয়—অসত্য ও হিংসা।”

 ৩। “উনি আমার নিন্দা করিয়াছেন, উনি আমার উপর অন্যায় আচরণ করিয়াছেন, উনি আমার ক্ষতি করিয়াছেন—এইরূপ প্রকার রাগের কথাগুলি যদি লোকে নিজের অন্তরে অন্তরে পুষিয়া রাখে, মনুষ্যদ্বেষ সংসার হইতে কখনই দূর হইবে না।

“এই বুদ্ধের ধর্ম্ম—এই প্রভুর আজ্ঞা”

 কেবল এই কয়টি কথা, আর কিছুই লেখা নাই। বোধ হয় তার মানে এই কটিতেই পৃথিবীর জাতীয় ধর্ম্মতত্ত্ব নিহিত আছে।