বিলাত ভ্রমণ (প্রথম ভাগ)/বিলাতি জাহাজে
বিলাতি জাহাজে।
যাবার সময় সমুদ্র দিয়াই যাইব ঠিক করিয়া টিকিট কিনিয়াছিলাম। কিন্তু ভূমধ্যস্থ সাগরে সমুদ্রপীড়ায় কাতর হইয়া ফরাসীদেশে মার্সেলে নামিয়া রেল গাড়িতেই উঠিতে হইল। ভূমধ্যস্থ সাগর হইতেও “বে অফ্ বিস্কে” আরও তুফানময় স্থান। আটলাণ্টিক মহাসাগরের যত ঢেউ এই পথে ঢুকিয়া জাহাজকে বড়ই বিধ্বস্ত করে। এই কথা লোকমুখে শুনিয়া পুনরায় ফরাসীদেশের ভিতর দিয়াই রেল যোগে আসিয়া ফিরিবার কালে মার্সেলে জাহাজে চড়িলাম।
পথে যতগুলি বন্দর আছে—একটি হইতে অপরটিতে পৌঁছিতে প্রায় চার পাঁচ দিন বা ততোধিক সময় লাগে। এই সময়ে অনন্ত সমুদ্রের উপর ভাসিয়া কাহারও কিছু বড় করিবার থাকে না। কেবল যথাসময়ে খাওয়া দাওয়া, সময়ে সময়ে একটু লেখা পড়া করা; তাহা ছাড়া একত্র ডেকে বসিয়া খেলাধূলা ও গল্পগুজব করাই কাজ। জাহাজে একলাটি সময় যেন আর কাটে না কাজেই পরস্পরে আলাপ করিবার স্পৃহা এখানে বড়ই বলবতী হয়।
কেবল খাবার ও শোবার সময় ছাড়া সকলেই প্রায় অন্য সময় ডেকের উপর থাকেন। কেহ কেহ বা সময়ে সময়ে সেলুন অর্থাৎ বৈঠকখানার ভিতর বসিয়া লেখেন পড়েন তাস খেলেন বা গীতবাদ্য করেন। কিন্তু অধিকাংশ জনতাই ডেকের উপর। কেহ কেহ বা এখানে এক একটি হালকা বেতের বা ক্যামবিসের চেয়ারের উপর বসিয়া থাকেন কেহ কেহ বা বেড়াইতে বেড়াইতে নানা বিষয়ের কথাবার্ত্তা কহেন। প্রাতর্ভোজনের পর খেলিবার সময় নির্দ্দিষ্ট আছে। তখন ডেকের ষ্টুয়ার্ড অর্থাৎ ডেকের খানসামা আসিয়া সব খেলিবার আসবাবগুলি যথাস্থানে সাজাইয়া রাখিয়া যায়। সে সব খেলাগুলিই এমন—যে জাহাজের অপ্রশস্ত স্থানের মধ্যেও অনেক চলা ফেরা ও লাফান ঝাঁপান হয়। স্বাস্থ্যের দিকে একান্ত লক্ষ্যশীল কর্ম্মঠ ইংরাজ জাতি বসিয়া খেলা বড় ভালবাসে না। আর সাধারণতঃ সব খেলাতেই মেয়ে পুরুষে যোগ দিয়া থাকেন।—তাহাতে কত আনন্দ। আর সে দৃশ্য দেখিতেই বা কি সুন্দর! উচ্চহাসি আনন্দের রোল ও আহ্লাদের ছুটাছুটিতে ডেক তখন ভরপুর হইয়া উঠে। „*কর্ডের রিং” ফেলা খেলাতে—রমণীগণ একটু নিকট হইতে রিং ছুঁড়িতে অধিকার পান—কেন না তাঁহাদের হাতে পুরুষদের মত তত তো বল নাই।
এই সব গোলমাল হইতে দূরে কোথাও বা ছোট টেবিলের চারি পাশে চারি জন বসিয়া—ব্রীজ খেলেন। সেগুলি সবই জুয়া খেলা। অনেকে বিপুল হারেন বা জেতেন। তাতেই সর্ব্বাপেক্ষা বেশী আনন্দ। দর্শকবৃন্দ তাহাদের চারিদিকে ঘিরিয়া দাঁড়ান। এই সকল খেলার জন্য চাঁদা উঠে ও কে হারিল কে জিতিল তাহার তালিকা জাহাজের নোটিসবোর্ডে লেখা থাকে।
জাহাজের দোলনাগুলিতে চড়িয়া দোলাও একরূপ খেলা। যেন সঙ্কীর্ণ জাহাজখানিতে আবদ্ধ থাকিয়াও শূন্যপথে—আকাশে উঠিতেছি মনে হয়। আর জাহাজখানি ঢেউতে বেশী দুলিলেও—দোলনায় বসিয়া থাকিলে ঢেউ বড় লাগে না।
আরও কত রকমের আনন্দ আছে। নাচ গান উৎসব প্রায় রাত্রির আহারের পরই হইয়া থাকে। যদিও সেই সময়েই সর্ব্বাপেক্ষা শীত ও ঠাণ্ডা তবুও রমণীগণ সেই সময়ে অর্দ্ধোন্মুক্ত বক্ষ ও মনোহর পরিচ্ছদে সুসজ্জিত হইয়া প্রকাশিত হইতেন।
পিয়ানোর পরদার উপর সরু সরু আঙ্গুল চালাইয়া একজন রমণী কোমল মধুর কণ্ঠে গান গাহেন। আর মধ্যে মধ্যে আরো অনেকগুলি মেয়ে পুরুষে নানা রকম গলা মিশাইয়া তাঁহার গানের ‘কোরস’ গাহিতে থাকেন। একবার সুর উচ্চ হইতে উচ্চে উঠে আবার ধীরে নামিয়া মিলাইয়া যায়—আবার উঠে আমার নামে যেন ঢেউয়ের খেলা চলে। কিন্তু কে জানে কেন—আমাদের দেশের সঙ্গীতের মত সে সঙ্গীত আমাকে তত আনন্দ দিত না। সুরে যেন সেরূপ তানের আবেশ নাই—সে গিটকিরী, গমক, ঋঙ্কার, রেশ, কিছুই নাই। সুরগুলি তীরের মত যেন সোজা সোজা চলে, দূর হইতে সেকহ্যাণ্ড করে—কোলাকোলি করে না; প্রাণমনে মেশে না; যেন “সবাই স্বাধীন সবাই প্রধান, দাসত্ব করিতে করে হেয় জ্ঞান”। এই বই কোনওরূপ আত্মহারা ভাব নাই
তার পর নাচ আরম্ভ। পিয়ানোর বাজনাটি তখন এত মধুর হয়—যে তার সঙ্গে তালে তালে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আপনিই বিদ্রোহী হইয়া নাচিতে চায়। একটি পুরুষ একটি রমণীর কোমর ধরিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া নাচাকেই ওয়ালস্ নাচ বলে। সে নাচে মাধ্যাকর্ষণের গ্রহ উপগ্রহের একত্রে ঘোরার সহিত অনেকটা সৌসাদৃশ্য আছে। পলকা প্রভৃতি নাচগুলিও প্রায় ঐ রকম, কেবল তালের তফাতে নামের তফাৎ হইয়াছে মাত্র। আমাদের মত দুর্ব্বল লোকের পক্ষে সব নাচগুলিই প্রায় ক্লান্তিকর।
আমাদের সহিত একজন আসামের চা-কর সাহেব দেশে যাইতেছিলেন। তাঁর সঙ্গে একটি পনর ষোল বৎসরের ছেলে ছিল। তাহার বর্ণ আমাদের মতই শ্যামবর্ণ। পরে জানিতে পারিলাম—সে ছেলেটি উঁহারি পুত্র, এবং একটি দেশীয় স্ত্রীলোক উহার মাতা। ছেলেটি জন্মাইবার পর হইতেই তিনি তাহাকে দারজিলিঙ্গে রাখিয়া দিয়াছিলেন, ও পরে সেই স্থানে রোমান ক্যাথলিক কলেজে ১৫ বৎসর অবধি শিখাইয়া এখন তাহাকে বিলাতে ইন্জিনিয়ারীং পড়াইবার জন্য লইয়া যাইতেছেন। সে ছেলেটিকে তিনি ঠিক নিজের ছেলের মতই যত্ন করিতেন—এক কেবিনেই রাখিয়াছিলেন। পরে কলিকাতায় ফিরিয়া আসার পর আমাদের একজন ডাক্তারের নিকট তাহাদের সব ইতিবৃত্ত শুনিয়া বড়ই চমৎকৃত হইলাম। তার মা একটি কুলী রমণী ছিলেন। সাহেবের সুনজরে পরিবার পর হইতেই তাহাকে সে অবস্থা হইতে সরাইয়া লইয়া তিনি একটি ছোট বাড়ী করিয়া দেন ও তাহার শিক্ষার জন্য এক মেম রাখেন। আমাদের ‘রিজিড্ হিন্দু’ স্বদেশী সিভিলিয়ান সাহেবের ব্যবহারের তুলনায় এ ব্যবহারটি কতই সুন্দর।
একটী যুবা পুরুষ তিনি ভারতবর্ষ বেড়াইতে আসিয়া এখন দেশে ফিরিতেছেন। তাঁহার হাতে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে একজন পর্য্যটকের লেখা একখানি বই দেখিলাম। সে পুস্তকখানিতে ভারতবর্ষের লোকদের—বিশেষ বাঙ্গালীকে লইয়া বিস্তর নাড়াচাড়া আছে। যেমন হইয়া থাকে ইহার মধ্যে অনেক সত্য কথাও আছে অনেক মিথ্যা কথাও আছে। আমাদের সামাজিক অনেক দোষের কথা উল্লেখ করিয়া লেখক বলেন যে ভারতবাসী এখনও স্বায়ত্ব শাসনের (Self Government) উপযুক্ত হয় নাই। একটি কারণ—দেশের স্ত্রী জাতির উপর তাহারা নিষ্ঠুর ও অন্যায় ব্যবহার করে। দ্বিতীয় কারণ—নিম্নশ্রেণীর জাতিদের উপর তাহাদের দারুণ ঘৃণা ও অত্যাচার। যে ভদ্রলোকটির হাতে এই পুস্তক খানি ছিল তিনি আমাকে তাহা পড়িতে দিয়া বলিলেন, আমি আপনাদের দেশের সম্বন্ধে কিছুই জানি না—আপনি এই বইখানি পড়িয়া— আপনার মন্তব্য আমাকে বলিবেন। তাঁহার দেখিলাম ভারতবর্ষ সম্বন্ধে জানিতে বড়ই আগ্রহ। লর্ড কার্জ্জন সম্বন্ধেও তাঁহার সহিত অনেক কথা হইল। তাঁহার ধারণা কার্জ্জন খুব কার্য্যদক্ষ হইলে ও একগুঁয়ে (Self-willed) লোক ছিলেন।
অনেক লোকের সঙ্গেই প্রায় ভারতবর্ষের কথা হইত। অধিকাংশ লোকই দেখিতাম রাজনীতি ও ব্যবসা সম্বন্ধে কথা বলিতে ভালবাসেন। সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন বা ধর্ম্মশাস্ত্র সম্বন্ধে নহে। অধিকাংশ লোকেরই দেখিলাম মত যে—ভারতবাসী লেখা পড়া শিখিয়া বড়ই রাজদ্রোহী হইয়াছে। তারা নিজেদের দেশে ব্যবসাবাণিজ্য উন্নতি করিতে চেষ্টা না করিয়া রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা করে কেন! মনে হলো তাঁহারা সকলেই প্রায় উচ্চশিক্ষার বিরোধী। অনেকেরই ইচ্ছা আমরা চিরদিনই নিম্ন স্তরে থাকি।
অপর দুই চার জন অন্য ভাবের লোকও ছিলেন। তাঁহারা ভারতবর্ষের কথা—বিশেষ পুরাতন হিন্দু জাতির কথা হিন্দুদর্শনের ও কাব্যের কথা শুনিতে আগ্রহ প্রকাশ করিতেন। বৌদ্ধধর্ম্মের কথা সংস্কৃত ভাষার কথা আমিও যতটা পারি তাঁহাদের জানাইতাম। মনে হইত তাঁহারা তন্ময় হইয়া শুনিতেছেন। ক্রমে আমার দল বাড়িতে লাগিল। এই প্রসঙ্গ লইয়া অনেকেই আমার সহিত আলাপ আরম্ভ করিলেন। হিন্দুধর্ম্মের তত্ত্ব আধুনিক রকমে বুঝাইতে পারিলে দেখিলাম উচ্চশ্রেণীর ইংরাজগণের নূতন কথার মত বড়ই হৃদয়গ্রাহী হয়। তাঁহারা মন্ত্র-মুগ্ধের মত শুনেন।
আসিবার সময় আমাদের সহিত তিনটি ইংরাজ যুবক ছিলেন তাঁহারা এইবার সিভিল সার্ভিসে পাশ হইয়া কাজে যোগ দিতে আসিতে ছিলেন। তার মধ্যে একজনের সংস্কৃতের প্রতি বড়ই অনুরাগ। তিনি পরীক্ষাতেও সংস্কৃত লইয়াছিলেন; সংস্কৃত কিছু জানেন ও শ্লোক বলিলে বুঝিতে পারেন। তিনি আমাকে সংস্কৃত শ্লোক আবৃত্তি করিবার জন্য অনুরোধ করিতেন। বলিতেন আমাদের মুখ থেকে সংস্কৃত শ্লোক শুনিতে বড়ই ভাল লাগে। আর একজন প্রাচীন সিভিলিয়ান—তিনি আমার নিকট হইতে অনেকগুলি সংস্কৃত পুস্তকের নাম ও প্রাপ্তির ঠিকানা লিখিয়া লইলেন—তার ভিতর একখানি গীতা ও অপর খানি অভিজ্ঞান শকুন্তলা। আবার এমনও দুএকজন লোক দেখিলাম Easotoric Hindu ধর্ম্মে অর্থাৎ হিন্দুধর্ম্মের গূঢ় তত্ত্বের প্রতি তাঁহাদের বড়ই অনুরাগ। তাঁহাদের কাহারও কাহারও সঙ্গে ইংরাজিতে তরজমা করা গীতা আছে—ও চৈতন্য দেবের বৈষ্ণব ধর্ম্মের (Ethics of Chaytanya) অনেক পুস্তকও দেখিলাম। আরও দেখিলাম বুদ্ধদেবের প্রশান্ত ধর্ম্মের সুবাতাস ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় অনেক লোকেরই মনে লাগিয়াছে। কেবল জাহাজে নহে, ইহা বিলাতেও দেখিয়াছি।
আমাদের দেশ সম্বন্ধে এই কথাগুলি এত বিস্তারিতরূপে বলিলাম তাহার কারণ, অন্য লোকে আমাদের বিষয় কিরূপ ভাবে দেখে এ খবর আমাদের খুবই জানা উচিত।
জাহাজে বসিয়া আমি আর একটি এই জ্ঞান লাভ করিয়াছি যে, আমাদের সঙ্গীতের বিশেষ বিশেষ কতকগুলি সুর ইউরোপের লোকদের খুব ভাল লাগে। আমাদের ভিতরেই একজন মধ্যে মধ্যে পিয়োনাতে দেশীয় গৎ বাজাইতেন। আর চারিদিক হইতে লোকেরা বিশেষতঃ রমণীগণ সেই মধুর সঙ্গীত শুনিতে ছুটিয়া আসিতেন। তাঁহারা বার বার সেই গত শুনাইতে অনুরোধ করিতেন। সংস্কৃত শ্লোক ও ভারতীয় দর্শনের কথার ন্যায় ভারতের সঙ্গীতও যে পাশ্চাত্য দেশের উচ্চতর শ্রেণীর লোকদের মুগ্ধ করিতে পারে—ইহা আমি আগে জানিতাম না।
বস্তুতঃ দেশভেদে, লোকভেদে, শিক্ষাভেদে বিভিন্ন গুণের অভিব্যক্তি। আমাদের এ দেশের এই গান এই শ্লোক এই দর্শনের বিশিষ্ট গুণেই আমরা সমৃদ্ধিশালী। অন্য প্রকারে অশেষ রকমে হীন হইলেও এই হিসাবে ভারত বিশিষ্ট। তবে যে এই সামান্যটুকুতে আমাদের যে সহজেই দম্ভ আনে এই আমাদের স্বভাবের বিষম দুর্ব্বলতা।
এখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আদান প্রদানের সাধারণ নিয়মানুসারে অন্য যে সকল বিষয়ে আমরা হীন তাহা অন্য হইতে আমাদের লইতে হইবে আর সঙ্গীত ও দর্শনাদির ন্যায় যে সকল দ্রব্য সামগ্রী আমাদের দিবার আছে তাহা অন্যকে দিব। পৃথিবীর অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের এই উদার সম্বন্ধ হওয়া উচিত।
জাহাজে এই সব প্রচার করিবার যেমন সুন্দর অবসর এমন আর কোথাও নাই। এই অবসরের সদ্ব্যবহার করিতে পারিলে অনেক কাজ হয়। আমার মনে হয় আমরা চেষ্টা করিলে বিলাতে গিয়া এ সকল বিষয়ে সহজে প্রতিষ্ঠালাভ করিতে পারি। সেখানে এক লণ্ডনেরই অল্প আয়তনের মধ্যে যে ৪৮টি থিয়েটার আছে—তাহাতে বিদেশী আসিয়াই অধিক অর্থ উপায় করিয়া লইয়া যায়। একটা নূতন কিছুর নাম শুনিলেই তাহা দেখিতে আমোদপ্রিয় লোকেরা প্রথমে ছুটে। সেই উপলক্ষ করিয়াই ভারতের নাট্যাভিনয় ইতিবৃত্ত ও অবস্থা বিলাতে সহজেই প্রচার করা যায়। পলিটিক্যাল বা সারগর্ভ দার্শনিক বক্তৃতায় যত না হইতে পারে—অতি শীঘ্র এই প্রকারে তামাসায় তাহা সম্ভব হইতে পারে। এবং এইরূপে সে দেশের সাধারণ লোককে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে জ্ঞান দিতে পারিলে অনেক উপকার আছে।
আমাদের জাহাজের দ্বিতীয় অধ্যক্ষ ক্ষীণজীবী লোক ছিলেন। তাঁহার হাবভাব দেখিলেই মনে হইত তিনি যেন মনোকষ্টে আছেন। কে জানে কেন—এইরূপ লোকের সহিত আমার অতি সহজেই ভাব হইয়া যায়। আমি যেন তাঁহাদের সহজেই চিনিতে পারি আর তাঁহারাও কি আকর্ষণে আমার কাছে আপনিই আসেন। অল্প আলাপের পরই তিনি আমাকে অতি বিশ্বস্ত বন্ধুর মত কত কথাই যে বলিলেন। শুনিলাম তাঁহার একটি রমণীর সহিত বড়ই ভালবাসা হইয়াছে। তাঁহারও অবস্থা ভাল নয় বলিয়া আজ এগার বৎসর তাঁহাদের অপেক্ষা করিতে হইতেছে, ইচ্ছা আরও কিছু জমাইয়া বিবাহ করিবেন। কিন্তু রমণীটি গত মেলে চিঠি লিখিয়াছেন—
“জন তুমি আর অপেক্ষা করিও না। যত শীঘ্র পার চলিয়া এসো। আশা করি আমরা একত্র হইলে দুইজনের চেষ্টায় কোনোরূপে খাওয়া পরা চালাইতে পারিব। আমার সে সাহস আছে, তুমি দ্বিধা করিও না।”
আমাদের দেশে হইলে খাবার পরবার চিন্তায় আগেই বিচ্ছেদ হয়ে যেত।
এই জাহাজে জাপান দেশের একটি ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি আমেরিকার যুক্তরাজ্য সাঁফ্রানসিস্কোতে ফুলের কারবার করেন। এখন জাপানীদের বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সেখানে ভয়ানক বাদানুবাদ চলিতেছে। তাঁহার সহিত এ সম্বন্ধে কথা হইল। খর্ব্বাকৃতি লোকটি তেজে পরিপূর্ণ। এত সাহস এত প্রতিভা যেন একাকী একশত জনের মত বীর্য্যবান; তিনি উদ্ধতভাবে ইয়োরোপ ও আমেরিকাবাসীদের সর্ব্ব সমক্ষে প্রকাশ্যে নিন্দাবাদ ও তৃণজ্ঞান করিতে লাগিলেন। স্বাধীনতার তেজ এমনিই অসীম!
তাঁর সহিত একটি জাপানী রমণী ছিলেন। নানা রঙে ঢলঢলে ফুলপাখী প্রজাপতি আঁকা কিমোনো পরা, গোল গাল গড়ণ—অতিশয় খর্ব্বাকৃতি, মাথার উপর নানা ভাবে বিন্যস্ত ফাঁপান খোপা, এই কারণ মুখখানি খুব বড় দেখায়; উচ্চ চিবুক, এবং ক্ষুদ্র চক্ষু তাতেই তাঁহাকে বড়ই সুন্দর দেখাইত। এমন আনন্দময় জীবন আর কোনও দেশের রমণীর নাই। বর্ত্তমান জাপানসম্রাট ৩০ বৎসর পূর্ব্বে রাজ্যের সংস্কারকালে নূতন আখ্যা নূতন প্রথা প্রবর্ত্তন-কল্পে রাজ্যের লোকের সহিত একত্রে যে আটটি প্রতিজ্ঞা করেন তাহার মধ্যে “স্ত্রীজাতির স্বাধীনতা ও সমানাধিকার” একটি প্রধান। তৎপূর্ব্বে প্রায় আমাদের দেশেরই মত তাঁহাদের অনেক হীনতা ও নির্য্যাতন সহ্য করিতে হইত। কিন্তু সেই দিন হইতেই জাপানে ভাগ্য-শ্রী ফিরিয়াছে। হে ভারতবাসি! তোমরা দেশের উন্নতির জন্য এত প্রকারে চেষ্টা করিয়া বিফল হইতেছ। মানব সমাজের উন্নতির এই প্রধান উপায় একবারও ভাবনা।