বিষয়বস্তুতে চলুন

বিলাত ভ্রমণ (প্রথম ভাগ)/বিলাতের পথে

​

বিলাত ভ্রমণ।

বিলাতের পথে।

 সাতবৎসর পূর্ব্বে যখন চীন ভ্রমণে যাই তখন হইতেই বাসনা ছিল যে সর্ব্বাপেক্ষা দেখিবার ও শিখিবার স্থান সুদূর ইউরোপও একদিন দেখিব। দেশ ভ্রমণের যে কি আনন্দ ও কি শিক্ষা তা আমাদের দেশে অনেকেই জানেন না, তাই আত্মীয় বন্ধুরা বাধা দিতেন। সেই কারণে কতবার যাইবার উদ্যম করিয়াও বাহির হইতে পারি নাই। এবার কতক সুবিধা বুঝাতে বিলাত যাত্রা করিতে দৃঢ়সংকল্প হইয়া, কাহাকেও সে কথা ঘুণাক্ষরে না জানাইয়া দিনস্থির ও জাহাজ ঠিক করিলাম।

 তখন গ্রীষ্মকাল। সে সময়ে সকল ইংরাজ কর্ম্মচারীরা ছুটী লইয়া ও ভ্রমণকারীরা বিদেশ পর্য্যটন করিয়া বাটি ফিরেন বলিয়া জাহাজে স্থান পাইতে বড়ই দেরী হয়। অতি কষ্টে একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর “স্থান” ঠিক করিয়া “পি এন ও কোম্পানীর” “শীমলা” নামক জাহাজে উঠিলাম। ২৮শে মার্চ্চ তারিখে প্রাতে ছয়টার সময় হাইকোর্টের ঘাটে জাহাজে চড়ি। এবং চড়ায় লাগিবার ভয়ে জাহাজ নদীর ভিতর অতিশয় আস্তে আস্তে ও সাবধানে চলে বলিয়া সে দিন সারাদিনই ভাগীরথীর বক্ষে ভাসিয়া পরদিন প্রত্যূষে সমুদ্রসঙ্গমে পৌঁছাই।

 ক্রমেই নদীটি প্রশস্ত হইয়া এখন দুকুল আর দেখা যায় না। ​এখনও ঘোলা-নদীর ময়লা মাটী আসিয়া নীল সমুদ্রজলে পড়িতেছে বলিয়া জলের রঙ সবুজ। ক্রমে বঙ্গোপসাগরের আরও বাহিরের দিকে অপার অনন্ত জল কেবলই ঘোর নীল। চারিদিকে সে নীলিমা সুদূর নীল আকাশ অবধি প্রসারিত।

 এখান হইতে কলোম্বো পৌঁছাইতে ছয় দিন লাগে, এই কয়দিন জল ও আকাশ ছাড়া বাহিরে আর কিছুই দেখিবার নাই। তবে জাহাজের ভিতর দেখিবার অনেক আছে। সে সংকীর্ণ স্থানে লোকে লোকারণ্য। কেবল রাত্রিকালে নিজ নিজ কেবিনে ও তিন বার আহারের সময় ভোজনস্থলে যাওয়া ছাড়া সর্ব্বদাই সকলের সঙ্গে ডেকের উপর দেখা হয়। সেখানে সবাই পাশাপাশি আরাম কেদারা পাতিয়া বসিয়া থাকে, বা পরস্পরের সহিত গল্পগুজব বা পড়াশুনা করে। এক একবার উঠে পায়চালি চলে। অত সংঙ্কীর্ণ সেই স্থানেও সুব্যবস্থায় কতটা লাফালাফিও চলিতে পারে। তা ছাড়া পড়িবার ঘরও আছে। সেখানে কাগজ ও বই আছে ও লিখিবার সরঞ্জাম সব সাজান। তবে পিয়ানো সংযোগে গান বাজনা নাচা ইত্যাদি আমোদ সর্ব্বাপেক্ষা সকলেরই প্রিয়। প্রায় প্রতিদিন ৭টার সময় সন্ধ্যা ভোজনের পর সেইরূপ আমোদ হইত।

 সকল লোকেই সেখানে আলাপ করিতে ব্যস্ত, আলাপও সেখানে সহজেই হইয়া যায়। রমণীদের এইরূপ জনতার স্থানেই সাজসজ্জাও বিভ্রমের উপযুক্ত সময়। দিনে দিনে কত রকমেরই বেশ পরিবর্ত্তন হইত। ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলি সব সেখানে সুধুপায়ে থাকে। সকলেরই দেখা যায় স্বাধীন আনন্দময় ভাব। সকল রকম দুশ্চিন্তা ও অশান্তি অমন জনতায় ও আনন্দের মাতামাতির স্থানে ভুলিয়া যাইতে হয়। আর উন্মুক্ত নির্ম্মল বায়ু সেবন করিয়া শরীরে কত স্বাস্থ্য আসে। সুনিদ্রার তো কথাই নাই। এঞ্জিনের অস্পষ্ট মধুর শব্দ শুনিয়া ও ঢেউয়ের ​বশে দোদুল্যমান জাহাজ খানিতে শুইয়া যেন মার কোলে দুলিতে দুলিতে স্বর্গের ঘুম আসে। সে নির্ব্বিকার স্বপ্নহীন ঘুম।

 এইরূপে—

“ধূধূধূধূ বারিরাশি হুহুহুহু গান।
তারই মাঝে হারায়ে ফেলে মুগ্ধ সবল প্রাণ॥”

 পাঁচদিন অতিবাহিত করিয়া আমরা ছয় দিনের দিন প্রত্যূষে কলম্বো বন্দরে পৌঁছাইলাম।