বিষয়বস্তুতে চলুন

বিলাত ভ্রমণ (প্রথম ভাগ)/ভূমধ্যস্থসাগর ও মিশরদেশ

​

ভূমধ্যসাগর ও মিশরদেশ।

 বেলা চারিটার সময় আমরা সৈয়দ বন্দর ছাড়িলাম। এইবার আসিয়ার সহিত সকল সম্পর্ক ঘুচিল।

 ঠিক জাহাজখানি ছাড়িবার কালে একখানি মুসলমান তীর্থযাত্রীর জাহাজ বন্দরে আসিল। তাতে ঠিক ভেড়া বোঝায়ের মত সব ময়লা কাপড় পড়া নানাদেশের মুসলমান তীর্থযাত্রী মক্কা হইতে ফিরিয়া আসিতেছিল। আমাদের সীতাকুণ্ডের মত নিকটেই “মেজেস্‌এব কূপ” নামক একটি তীর্থ আছে, সেখানে অনেক যাত্রী যায়। সে দৃশ্য দেখে আমার আমাদের দেশের তীর্থ-যাত্রীদের কথা মনে হলো। কি অসহায় হইয়া এই সকল লোক পরের হাতে এত লাঞ্ছনা সহিতেছে। এসিয়াবাসীর এবংবিধ ও অন্যান্য নানাপ্রকার অব্যবস্থার কথা ভাবিতে ভাবিতে এবং আসিয়া ভূমিখণ্ডের দিকে শেষ দেখা দেখিতে দেখিতে আসিয়া ছাড়িয়া চলিলাম। ভূমধ্যস্থ সাগরের ভিতর দিয়া জাহাজ এইবার উন্নতিশীল ইউরোপের পথে চলিতে লাগিল।

 বন্দর হইতে বাহির হইবার কালে সকল জাহাজকে সে সমুদ্রভিতরকার পাথরের প্রাচীর ও লেসেপ্‌সের মূর্ত্তি ঘুরিয়া যাইতে হয়। সমুদ্র হইতে জমীর দৃশ্য অতি সুন্দর দেখায়। সহরের উঁচু উঁচু বাড়ীগুলি সব সারিদিয়া তীরে দাঁড়াইয়া আছে। তার মাথায় ব্যবসাদারদের কতরকমের সাইনবোর্ড আঁটা। কত হোটেল, কত দোকান, কত নাচ ঘর। সর্ব্বাপেক্ষা তারহীন টেলিগ্রাফের থামটি উঁচু। তার উপরে আকাশের বৈদ্যুতিক ঢেউ লইবার ও ঢেউ দিবার কত যন্ত্র আছে। সমুদ্র হইতে দেখিতে লেসেপ্সের ছবিটির আরও গম্ভীর মুর্ত্তি। বাস্তবিকই যেন সমুদ্রবক্ষে দাঁড়াইয়া বীরবর সাগরের উপর প্রভুত্ব করিতেছেন।

​ ক্রমে যত জাহাজ দূর হইতে দূরে যাইতে লাগিল, জমীর রেখাও তত ক্ষীণ হইতে লাগিল। ক্রমে সন্ধ্যা আকাশে মিশরের অস্পষ্ট ক্ষীণ রেখা যেন সুদূর অতীতের স্বপ্নরাজ্যের মত মনে হইতে লাগিল

 সে রাজ্য বাস্তবিকই স্বপ্নরাজ্য। পৃথিবীর যত রাজ্যের ইতিহাস জানা আছে—মিশরই সর্ব্বাপেক্ষা পুরাতন। এমন কি খৃষ্টপূর্ব্ব দশ সহস্র বৎসর পূর্ব্বেরও সংবাদ কিছু কিছু পাওয়া গিয়াছে। খৃষ্টের পরে আজ এখনও দু হাজার বৎসর হয় নাই। সে এত দিনের পুরাতন রাজ্য। সুদূর অতীতের আবরণ উন্মোচন করিয়া মিশরের যে সকল পুরাতত্ত্ব আবিষ্কৃত হইয়াছে—সেও অতি বিস্ময়কর কথা। সেই কারণেই স্বপ্নরাজ্যের সহিত তাহার তুলনা দেওয়া কিছু অন্যায় নহে।

 অথচ সে সকল আবিষ্কৃত তত্ত্বের যথার্থ ভাল ভাল প্রমাণও আছে সেগুলি নিতান্ত অলিক কথা নয়। মিশর দেশ আরবেরই মত একটি মরুভূমিময় দেশ। কেবল তার মধ্য দিয়া নীলনদী প্রবাহিত হইয়া তাহার সামান্য কতক অংশকে বাসোপযোগী করিয়াছে। বর্ষাকালে সেই নীল নদীতে বিপুল জল নিকাস হওয়ায় বন্যা হয় ও সেই জল প্লাবনেই চারিদিকের শস্যক্ষেত্রে জল পায়। চাষ করিবার উপযোগী জমী অত বড় দেশে অতি অল্প। তাই সেকালে জমীর অত আদর ছিল। এক সামান্য অংশও তাই এত হিসাবের উপর রাখা হইত বলিয়া এই দেশেই জ্যামিতি প্রথম আবিষ্কৃত হয়। সে শাস্ত্র আর কিছুই নয়—সূক্ষ্মভাবে জমী মাপিবারই শাস্ত্র।

 খৃষ্ট পূর্ব্ব দুই সহস্র বৎসর পূর্ব্বে নীলনদীর ধারে অনেক সমৃদ্ধিশালী ও সুসভ্য সহরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সঠিক খবর পাওয়া যায়। “কেরো” তার মধ্যে একটি প্রধান স্থান। এই সময়ে তার নিকটবর্ত্তী স্থানে অনেকগুলি পিরামিদ তৈয়ারী হয়। সেগুলি এখনও তেমনি ভাবে বিদ্যমান। সেগুলি সব ইজিপ্টের রাজাদের গোরস্থান ছিল। সব ​
মিশর দেশের কার্ণাক নামক পুরাতন স্থানের ভগ্নসমৃদ্ধি ও স্মৃতি-চিহ্ন।
​থান থান পাথরে মজবুত করিয়া গাঁথা, এত শতাব্দী পরেও পূর্ব্ববৎই আছে। তাতে বিস্তর রাজাদের গোর আছে। এক একটি তৈয়ারী করিতে হিসাবে ১ লক্ষ লোককে ২০ বৎসর খাটিতে হইয়াছে। এই সকল পিরামিদের ধারেই “ফিনিক্স”এর প্রকাণ্ড প্রস্তর মূর্ত্তি মরুভূমির বালুতে কতক প্রোথিত আছে। সে আবার পিরামিদ হইতেও পুরাতন। এটি একখানি প্রকাণ্ড কাল পাথরে খোদা মনুষ্য ও জন্তু মুর্ত্তি। পুরাতন মিশর দেশের প্রধান দেবতা সূর্য্যদেবেরই প্রতিমূর্ত্তি ছিল।

 এত পরিশ্রম ও খরচ করিয়া পিরামিদ নির্ম্মাণের কি আবশ্যক ছিল এ কথার উত্তর দিতে হইলে মিশরের পুরাতন ধর্ম্মবিশ্বাস সম্বন্ধে কিছু বলা উচিত। সকল পুরাতন জাতিরই মত তাঁহারাও পৌত্তলিক ছিলেন ও বহু দেবদেবীতে বিশ্বাস করিতেন। আর তাঁহাদের বিশ্বাস ছিল যে মৃত্যুর পর আত্মা দেহের নিকটেই ঘুরিয়া বেড়ায় ও আহার পানীয় ও ভোগবিলাসের আশায় সর্ব্বদা অস্থির হইয়া ফিরে; এবং সুদূর ভবিষ্যতে আবার সেই আত্মা সেই দেহেই ফিরিয়া আসিবে। এই আত্মার ফিরিয়া আসার আশাতেই মৃতের দেহরক্ষার উপর লোকের এত ঝোঁক পড়িল। সেই আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ আত্মার ভোগ বাসনা নিবৃত্তি করিবার জন্য সে কবরের ভিতর আহার্য্য বসন ভূষণ প্রভৃতি সকল দ্রব্যই দেওয়া হয়। আর সকল রকম সামাজিক ঘটনাবলিরও সেই পাথরের গোরের ভিতর দিকে ছবি চিত্রিত আছে। তার ভিতর নানারূপ চিত্র বিচিত্র করা মাটির ও ধাতুর তৈজসপত্রও থাকে। এই সকল ছবি হইতেই প্রাচীন মিশরের পুরাতত্ত্ব উদ্ঘাটিত হইয়াছে। এ আবিষ্কারগুলি কিছুই অন্যায্য বা অলীক কল্পনা নহে।

 এই সকল হইতেই জানা যায় তাঁদের রীতি নীতি আচার ব্যবহার সভ্য জাতিরই মত ছিল। তাঁদের রাজা “ফেরোয়া” তাঁদের পুরোহিত ও দেবতা বলিয়া পূজিত হইতেন। আমাদের দেশের ব্রাহ্মণদের মত তাঁদের দেশেও এক শ্রেণীর পুরোহিত ছিল, তাঁদের পদ সাধারণ লোকের ​অপেক্ষা অনেক উচ্চ। তাঁদের দেশে, চীন দেশ ও পূর্ব্বেকার আমাদের দেশেরই মত, বিদ্বান লোকের বড়ই আদর ছিল। কিন্তু তাঁরা পুরোহিত হইতে এক স্বতন্ত্র জাতি ছিলেন। সরকলমে পেপিরস্ গাছের বল্কলে তাঁহারা বহুবিধ পুস্তক লিখিতেন। তখনকার জ্যোতিষ চিকিৎসাদি নানা বিদ্যায় তাঁহারা সুপণ্ডিত ছিলেন। তখনও সেথায় ধাতু দ্রব্যের প্রচুর ব্যবহার ছিল ও তাঁতি ছুতর কামার প্রভৃতি সকল শ্রেণীর কারীগরই বিদ্যমান ছিল।

 এই গেল পুরাণ মিশরের ইতিবৃত্ত। সেই স্থানের নিকট “চালডিয়া” দেশের রাজধানী “ব্যাবিলন্” দেশও অতি পুরাতন। পুরাতন মিশরে ছবি শিখিয়াই বর্ণমালার প্রথম উত্থান হয়, মানুষ বুঝাইতে একটি মানুষই লিখিতে হইত। ক্রমে সে দিন গিয়া অনেক পরিবর্ত্তনের পর আধুনিক হরফে দাঁড়াইয়াছে। বেবিলনে এই লেখা বিভিন্নদেশের বর্ণমালার জন্মদাত্রী। সোজা সোজা তীরের অক্ষরে খোদা হইত। এইটি আবার মিডিয়া দেশ দিয়া ভারতবর্ষে আসিয়া অশোক লিপির অক্ষর হয়। ইহা হইতে আমাদেরও সংস্কৃত ও বাঙ্গালা অক্ষরের উৎপত্তি।

 নিউরিয়া মিশরেরই দক্ষিণে। সে দেশের সহিত, প্রতিবাসীর সহিত যেমন হয়ে থাকে, মিশরের চিরবিবাদ ছিল। একটি রাজার গোরের ভিতর ছবি আঁকা আছে; তাতে একটি ছবি এই,—তাঁর কাছে যুদ্ধে হার মানিয়া নিউবিয়ার রাজা নানারূপ উপঢৌকন লইয়া তাঁহাকে ভেট দিতে আসিতেছে। ব্রিটিশ মিউজিয়মের তিনটি দালান এই সকল মিশরের পুরাতত্ত্বের দর্শনীতে পূর্ণ। সে এরূপ সুন্দররূপে সাজান ও বিস্ময়কর যে সে ঘরে ঢুকিয়া জিনিষগুলি দেখিলেই মানব জাতির আদি উৎপত্তির বিবরণ যেন স্বচক্ষে সুস্পষ্ট দেখা যায়। মানব আদিম বর্ব্বর অবস্থা হইতে ক্রমে সভ্য হইয়া আজকালকার সুসভ্য জাতিতে পরিণত হইয়াছে। নিচু হইতে উপর অবধি সবাই একটি অনন্ত শ্রেণীর এক একটি পদ বিশেষ। সে সকল শ্রেণীর সকলকেই অন্তরের সহিত নমস্কার করি।

​ মিশর পূর্ব্বে বহু পরাক্রান্ত রাজ্য ছিল। নিকটবর্ত্তী অন্য সকল স্থানে ক্ষমতা বিস্তার করিয়া পরে ইহুদীজাতিকেও জয় করিয়াছিল। তাঁহারা মিশরে অনেক দিন বন্দী ছিলেন। পরে মোসেস্ তাঁহাদিগকে সেস্থান হইতে উদ্ধার করিয়া আনেন। সেই সময়ে মিশরের উপর ঈশ্বরের ক্রোধ সূচনা করিয়া মিশরে কত দৈব উৎপাত হয়। আমাদের দেশেরই মত Plague বা মহামারী ঘটিয়াছিল। সবাইকার ঘরে সর্ব্বের বড় ছেলেদের সব মৃত্যু হইতে লাগিল; জলপ্লাবনে দেশ রাখা দায় হইল; পঙ্গপাল আসিয়া ক্ষেত্রের পাকাশস্য ছারখার করিয়া দিল। এই উৎপাতের সুযোগেই ইহুদীরা ঈশ্বর অনুগ্রহে প্রকাশিত লোহিত সমুদ্রের জলের মধ্যে শুকনা পথ দিয়া সর্ব্বশক্তিমান ঈশ্বরেরই সাহায্যে পলাইয়া আসিতে পারিয়াছিলেন।

 এইস্থান হইতেই প্রথমে গ্রীসে সভ্যতা যায়, কিন্তু পরে গ্রীকরা আসিয়াই আবার মিশর জয় করিয়া তথায় নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করেন। মিশরের রাজা টলেমী ও রাণী ক্লিওপ্যাট্রা এই বংশেরই লোক। রাণী ক্লিওপ্যাট্রার ইতিহাস সর্ব্বজনবিদিত, তবুও অতি বিস্ময়কর কথা বলিয়া আমি পরে তাহা সবিস্তারে বলিতেছি।

 গ্রীক্‌দের পরে রোমানরা মিশর জয় করেন। পরে রোমরাজ্যের ধ্বংসের সময় মিশর আবার একরূপ স্বাধীন হইয়াছিল। মুসলমান ধর্ম্ম প্রচার হইবার সময় মুরযুদ্ধে মুসলমানেরা মিশর জয় করেন, ও অন্যান্য মন্দির ও দেবমূর্ত্তি ভাঙ্গার সঙ্গে সঙ্গে মিশর দেশের অনেক দিনের বিখ্যাত লাইব্রেরীটিও পুড়াইয়া দেন। সেই হতেই ইউক্লিডের কয় বই জ্যামিতি ধ্বংস হইয়া গেল। এখন মিশরদেশের শাসনকর্ত্তা খেদিবের তত্ত্বাবধানে সুলতানের অধীনে ও ইংরেজদেরই ক্ষমতাধীনে মিশর শাসিত! ইউরোপের এত নিকটে থাকায় ও কতকটা গরম ও বেশ স্বাস্থ্যকর স্থান বলিয়া ইউরোপীয় সকল জাতীয় লোকেরই এইটি বেড়াইবার স্থান। ভারতে ​যাবার আসবার পথ সুয়েজ কেনেলের ধারে বলিয়াই ইংরাজ ইহা দখল করিয়া বসিয়াছেন। ভারতবর্ষ জয় করিবার অভিলাষ করিবার সময় নেপোলিয়নেরও এই ইজিপ্ট দখল করিবার ইচ্ছা ছিল। নাইলের যুদ্ধে নেলসনের হাতে সে আশা ভাঙ্গে।

 এখন সকল ইংরাজরাজত্বের মধ্যে এইখানেই সর্ব্বাপেক্ষা ভাল তূলা জন্মে বলিয়া ম্যানচেষ্টারএর কতকটা ভরসা। নয় ত তাদের আমেরিকার হাতে সম্পূর্ণরূপেই যেতে হতো। ঋণগ্রস্ত খেদিবএর কাছ হইতে যে সময় ভূতপূর্ব্ব রাজসচিব ডিসরেলি বিলাতের লোকদের না জানাইয়া ও পার্লামেণ্টের পরামর্শ না লইয়াই সুয়েজ কেনেলের সেয়ার কিনিয়া লইয়াছিলেন, সেই সময় হইতেই ইংরেজের ক্ষমতা এখানে এত বেশী হইয়াছে। পরে আরবী পাশার বিদ্রোহে জেনারেল গর্ডনের প্রাণনাশ; লর্ড কিচেনারের সে বিদ্রোহ দমন, ও সুশাসনে মাধির সৈন্য বিধ্বস্ত করার পর হইতে দেশটি এখন কতক সুশৃঙ্খল হইয়াছে। লর্ড ক্রোমারের সুশাসনে সে দেশে এখন এত সুফল ফলিয়াছে বলিয়া সম্প্রতি তিনি রাজভাণ্ডার হইতে প্রভূত পরিমাণে পারিতোষিক পাইয়াছেন। কিন্তু মিশর দেশের লোক অনেকেই অসন্তুষ্ট। “প্যান ইসলামিক দল” বা যে দল মুসলমান রাজ্যের হিতাকাঙ্ক্ষায় দেশের জন্য গঠিত হইয়াছে সে দল আজকাল বড়ই বাড়িতেছে।

 আমি মিশরের সমস্ত ইতিহাস মোটামুটি সংক্ষেপে বলিয়াছি। যে দেশ পুরাকালে ও অধুনা এত প্রসিদ্ধ সে দেশের পার্শ্ব দিয়া যাইবার কালে তার কথা না বলিলে একান্তই অসম্পূর্ণ হয়। বিশেষ যখন তাদের পুরাকালের সমাজ ও ধর্ম্ম অনেকটা আমাদেরই সমাজ ও ধর্ম্মের মত ছিল। আর যখন ইংরাজের ভারতে আসিবার এক প্রান্তের দ্বারের মত সে পথটি এত আবশ্যকীয়।

 কিন্তু মিশর সম্বন্ধে একটি বলিবার কথা বলি নাই। সে মনোহর কথা ​শেষে সবিস্তারে বলিব বলিয়া রাখিয়া দিয়াছিলাম, সেটি মিশরেরই পূরাকালের রাণী ক্লিওপ্যাট্রার কথা! এই রমণীর ইতিবৃত্ত এত প্রসিদ্ধ যে কি ইতিহাস লেখক কি কবি কি চিত্রকর কিম্বা ভাস্কর সকলেই তাঁহার মধুর মূর্ত্তি ও নারীজীবনের অলৌকিক ইতিহাস নানাপ্রকারে লিপিবদ্ধ করিয়াছে। মার্সেলের “লুই ডি প্যালে” আর্ট গ্যালারীর সামনেই তাঁহারই সর্পবিষে জর্জ্জরিত শিথিল দেহের কাল প্রস্তর নির্মিত প্রতিকৃতি স্থাপিত আছে। কলিকাতার আসিয়াটিক্ সোসাইটির ঘরেও সে চিত্র রক্ষিত আছে। আর ইউরোপে এমন গ্যালারী নাই যেখানে তাঁহার মূর্ত্তি বা সে চিত্র রক্ষিত হয় নাই।

 ইনি মিশরের রাজকন্যা। খৃষ্টপূর্ব্ব শতাব্দীর অবসানের দিনেই ইহার আবির্ভাব হয়। অতি শিশু অবস্থাতেই ইঁহার পিতৃবিয়োগ ঘটে। নিজেরই অপর দুইটি ছোট ভাইদের সঙ্গে একত্রে রাণী হইবেন এইরূপ ঠিক ছিল। তখন মিশরে এক অদ্ভুত প্রথা প্রচলিত ছিল। রাজবংশে ভাই বুনে বিবাহ হইত। বর্ম্মা দেশেও এইরূপ প্রথা ছিল শুনিয়াছি। নিজ ভ্রাতার সহিতই বিবাহিতা হইয়া দু’জনে সিংহাসনে বসিলেন। সেক্ষপিয়ার বলিয়াছেন,—“Beauty provoketh thieves sooner than gold—অর্থাং সুরূপে যত শত্রু আনে আর সোনাতেও তত আনে না। তাই মিশর রাজ্যে তাঁহার রাজ্যারোহণে নানা গোলমাল উঠায় তিনি রাজ্য ছাড়িয়া পালান। তখন রোমরাজ্যের প্রধান সেনাপতি জুলিয়স্ সীজর পম্পেকে পরাস্ত করিয়া তাঁহার পশ্চাৎ ধাবন করিয়া কার্থেজে আসিয়াছিলেন। বুদ্ধিমতী রমণী এই সুযোগ দেখিয়া তাঁহারই শরণাপন্ন হইলেন। এ রমণীকে যিনি একবার দেখিয়াছেন তিনি আর ভুলেন নাই। এত রূপের মাধুর্য্য ও এত মধুর আলাপের ক্ষমতা ছিল যে যার সহিত একবার সাক্ষাৎ হইত সেই মুগ্ধ হইয়া পড়িত। বীর সীজারও সেইরূপ হইলেন। মিশর রাজ্য জয় করিয়া ক্লিওপ্যাট্রার হাতেই দিলেন ও তাঁর ​স্বামীকে হত্যা করিয়া ও অপর ভাইটিকে বিষপ্রয়োগে মারিয়া ফেলিয়া নিষ্কণ্টক হইয়া তাঁহারা দু’জনে একত্রে রোমনগরে ফিরিয়া গেলেন। সেখানে তাঁহার একটি পুত্র সন্তান হয়। পরে যখন রোম রাজ্যের বিবাদ বিসম্বাদে সীজার হত হন, তখন ক্লিওপ্যাট্রাকে মিশরে ফিরিয়া আসিতে হইল। তারপর অনেক গোলমালের পর সীজারের হন্তা ব্রূটাসকে সাহায্য করিয়াছিলেন এইরূপ দোষারোপ করিয়া এণ্টনী ক্লিওপ্যাট্রাকে সাজা দিবেন বলিয়া বিচারালয়ে ডাকিয়া পাঠান। চতুরা রাণী তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন। রাণী যাবেন বলিয়া নানারঙ্গে সুরঞ্জিত সুন্দর নৌকাখানি জলে ভাসিল। কাঠের দাঁড়ের পরিবর্ত্তে তার রূপার দাঁড় চলিতে লাগিল। পুরুষ দাঁড়ি দাঁড় টানিবার পরিবর্ত্তে সুরূপা যুবতী রমণীগণ দাঁড় টানিতে লাগিলেন। মধুর সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে তালে তালে নৌকা চলিতে লাগিল। সে জাহাজের পাল মোটা ক্যাম্বিসের নহে লাল পাতলা রেশম দিয়া নির্ম্মিত। মৃদুমন্দ হাওয়ার নানারূপ সুগন্ধ দ্রব্যের সৌরভ সুদূর অবধি চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িতে লাগিল। তারই মাঝে ক্লিওপ্যাট্রা সুসজ্জিতা হইয়া এণ্টনীর কাছে বিচারের জন্য চলিলেন

 সুদূর হইতে আহুত সুগন্ধ অনুভব করিয়াই এণ্টনী জানিতে পারিয়াছিলেন যে রাণী ক্লিওপ্যাট্রা আসিতেছেন। ক্রমে সঙ্গীতের রবও শুনা গেল ও আরও নিকটে আসিলে সাদা রূপার দাঁড়গুলিও সূর্যালোকে সুন্দর প্রতিভাত হইতে লাগিল। পরে যখন চারচোখে এক হয়— তখনকার কথা আর বলিবার কি আছে। চিরকাল ভীষণ যুদ্ধবিগ্রহ প্রিয় ও একান্ত উচ্চাভিলাষী এণ্টনিও এখন হইতে একটি রমণীর ক্রীতদাস হইলেন। একান্ত মুগ্ধ হইয়া এণ্টনী ক্লিওপ্যাট্রার সহিত নিজ রাজ্য ছাড়িয়া মিশরে গিয়া বসবাস করিতে লাগিলেন। ইত্যবসরে তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী অকটেভিয়স্ তাঁহাকে এত দুর্ব্বল দেখিয়া তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিলেন। এণ্টনী ও ক্লিওপ্যাট্রা দু’জনের পক্ষেই ছেড়ে ​
মিশর দেশের মন্দিরে খোদিত প্রতিমূর্ত্তি ও ছবি-আঁকা ভাষা।
​থাকা এত অসহ্য হইল যে, সে যুদ্ধে ক্লিওপ্যাট্রাও এণ্টনীর সঙ্গে সঙ্গেই যুদ্ধে গেলেন। যুদ্ধ সমাপ্ত হইবার পূর্ব্বেই ক্লিওপ্যাট্রার জাহাজ ভয়ে ত্রস্থ হইয়া পলাইতে লাগিল, এণ্টনীও অনুধাবন করিলেন। যুদ্ধে হার হইলে এণ্টনী নিজে লজ্জায় আত্মহত্যা করিলেন। ক্লিওপ্যাট্রাকে এখন অসহায়া দেখিয়া অকটেভিয়স তাঁহাকে রোমে ডাকিয়া পাঠাইলেন। কিন্তু রোমানদের হাতে অবমাননার ভয়ে ভীত হইয়া—ক্লিওপ্যাট্রাও আত্মহত্যা করিতে বদ্ধপরিকর হইলেন। সে দেশে একরূপ অতিশয় বিষধর সর্প আছে তাহার বিষে অতি শীঘ্র মৃত্যু হয় অথচ কোনও কষ্ট নাই। এইরূপ সর্পের দ্বারা নিজ হস্তে বুকে দংশিত হইয়া রাণী ক্লিওপ্যাট্রা এ মর্ত্তাভূমি ছাড়িলেন।

 আশ্চর্য্য যে—সে সব বীরত্বের দিনে আত্মহত্যার কথা সচরাচরই শুনা যাইত। যে কেহ অপমানের ভয় করিতেন তিনিই আত্মহত্যা করিতেন। সীজারের প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রূটস ও কেসিয়াস যুদ্ধে হারিয়া এইরূপ করেন। এণ্টনীও তাই করিলেন। রাণী ক্লিওপ্যাট্রাও তাই করিলেন। আর কষ্টহীন উপায়ে সহজে আত্মহত্যা করিবার উপায় জানা থাকিলে কত লোকই যে এইরূপ করিতে আজও প্রস্তুত আছে তার ইয়ত্তা নাই। এই কারণেই আজকালকার দিনেও আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে শতকরা বার আনা লোক পুলিশের সম্প্রতিকার তালিকা অনুসারে আফিম খাইয়াই আত্মহত্যা করে।

 এইরূপ জীবনের ঘটনাবলীর কথা শুনিয়া সকলেরই ইচ্ছা হয় ক্লিওপ্যাট্রার রূপ ও গুণ বর্ণনার কথা শুনেন। আমিও এ সম্বন্ধে অনুসন্ধিৎসা মিটাইতে অনেকগুলি পুস্তক পড়িয়াছি। তিনি বড়ই সুগঠন ছিলেন—রং কিন্তু তত উজ্জ্বল ছিল না। আর এত যে আকর্ষণ করিবার ক্ষমতা ছিল তা তাঁহার মানসিক গুণেরই কারণে। তিনি অতি বুদ্ধিমতী, সুচতুরা ও মধুরভাষিণী ছিলেন। মিষ্ট কথার মত তো এত আর কোনও ​আকর্ষণই নাই। সেই মিষ্ট ভাষা ও মিষ্ট ব্যবহারের গুণেই তিনি এমন দিগ্বিজয়িনী ছিলেন!

 রোমের যত বীর কুল সীজার এণ্টনী অকটেভিয়স সকলেই তাঁর রূপে গুণে মুগ্ধ ছিলেন। এণ্টনীর যে তাহাকে দেখিয়া অবধি চরিত্রের কি দারুণ পরিবর্ত্তন হইয়াছিল—তাহা Shakespearএরই একটি কথা হইতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হইবে—

Cleo.  “If it be love indeed
Tell me how much”
Ant.  “There is beggary in the love
That can be reckoned.”
Cleo.  “I would fain know
How far it is to be beloved.”
Ant.  “Then you must find
New Heaven, New Earth."

 ক্লিওপ্যাট্রা জিজ্ঞাসা করিলেন—‘তুমি যদি যথার্থই ভালবাস, তো আমাকে বুঝাইয়া দাও কতটা ভালবাস।” জন্ম

 এণ্টনী বলিলেন “যে ভালবাসা বলে বুঝান যায়, সে ভালবাসা অতি সামান্য।”

 নারীসুলভ অনুসন্ধিৎসা বশতঃ রাণী আবার জিজ্ঞাসা করিলেন,

 “তবুও আমি জানতে চাই কতটা ভালবাসার পাত্র হওয়া যাইতে পারে।”

 এণ্টনী তার উত্তরে বলিলেন,—

 “তা হলে তুমি আর একটি পৃথিবী ও আর একটি আকাশ খুঁজিয়া বার কর, কারণ আমার ভালবাসা তো একটিতে কুলাবে না।”

 এইরূপ কর্ম্মনাশা মধুর কথা লইয়া অহরহ তাঁহাদের সময় কাটিত।

​ এখন সেই এণ্টনী রোম নগরের নাম শুনিলে বলিয়া উঠিতেন— “Grates me” অর্থাৎ ও কথা আমার কাণে বড়ই কর্কশ লাগে। রাণী ক্ষণে ক্ষণে কত রকমেই ভাব পরিবর্ত্তন করিতেন। কখনও সরস মধুর ভাব, কখনও বা রুদ্রমূর্ত্তি; কার্য্যসাধনে সর্ব্বদা ঠিক সময়ে ঠিক ভাবই আসিত।

 রাণী যখন এণ্টনীর সহিত প্রথম সাক্ষাতে বিচারে জয়লাভ করিয়া দেশে ফিরিতে চাহিলেন, বিচারপতিকেও সঙ্গে লইবার জন্য বীরাঙ্গনা কাব্যের নিম্নোক্ত ভাবেই মধুর সম্ভাষণ করিয়াছিলেন—

“কায়মন প্রাণ আমি সঁপিব তোমারে
ভুঞ্জ আসি রাজভোগ দাসীর আলয়ে।”

 আবার রোমরাজ্য হতে কোন লোক এণ্টনীর সঙ্গে দেখা করতে আসবে ইহা তাঁর একান্ত ইচ্ছা নয়। সেই নিমিত্ত সেখান হইতে কোনও দূত আসিলেই এণ্টনীকে গঞ্জনা দিয়া বলিতেন—

 “ওই বুঝি তোমার স্ত্রী ঝগড়াপ্রিয়া “ফুলভিয়া” (Fulvia) তোমাকে ফিরায়ে নিয়ে যাবার জন্য রোম থেকে লোক পাঠাইয়াছেন।”

 এরূপে সরল ও দৃঢ়ভাবে এণ্টনীর আকর্ষণ আরও দৃঢ়তর হইত।

 ক্লিওপ্যাট্রার অপ্রিয় জানিয়া তিনিও স্বদেশী লোক দেখিলে জ্বলিয়া উঠিতেন। রোম হইতে কোনও দূত যদি রোমের দুরবস্থার কথা এণ্টনীকে বলিতে আসিত তিনি অমনি বিরক্ত হইয়া বলিতেন—“এ কথা এখন দারুণ অপ্রিয় লাগে। রোমনগর টাইবার নদীর অতল জলে ডুবিয়া যাক তাতেও আমার এতটুকু ক্ষতি বৃদ্ধি নাই।”

 “Let Rome in Tiber melt.”