বিলাত ভ্রমণ (প্রথম ভাগ)/ভূমধ্যস্থ সাগর (১)
ভূমধ্যস্থ সাগর।
যখন মিশরের সীমা-রেখা শেষ দৃষ্টিপথ হইতে চলিয়া গেল, তখন সন্ধ্যাও আসিয়াছিল। আকাশে আলোক থাকিতে থাকিতেই দূরে সে রেখা মিলাইয়া গেল। এইবার কেবল অনন্ত আকাশ ও চারিদিকের অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখিবার নাই।
আমার সর্ব্বাপেক্ষা দেখিতে ভাল লাগে—সান্ধ্য-গগন ও ঊষা। আর যখন রাত্রি ধরণীর দৃশ্যগুলিকে ঢাকিয়া দিয়া উপরের অনন্তপথ খুলিয়া দেখায় তখন একা একান্তে বসিয়া সেই দিকে চাহিয়া যা’তা’ ভাবা আমার চিরদিনেরই অভ্যাস আছে, জাহাজেও তাই করিতাম।
আজ আমার বার বার কেবলই এই ভূমধ্যস্থসাগর ও তার আসপাশের সব প্রসিদ্ধ স্থানেরই কথা মনে আসিতে লাগিল। এই স্থানটি পুরাকালিক কত ঘটনাবলীতে প্রসিদ্ধ। পুরাতন জগতের ইহাই কেন্দ্রস্থান বলিয়া বিবেচিত হইত। যত বাণিজ্য ব্যবসা তখন এই খানেই চলিত। এখন সে কেন্দ্র পরিবর্ত্তিত হইয়া ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যবর্ত্তী “আটল্যাণ্টিক” মহাসাগরে আসিয়াছে। যত পুরাকালের সভ্যতাও এই ভূমধ্যস্থ সাগরেরই চারিদিকে বিকশিত ছিল। এই সমুদ্রটিই এককালে গ্রীস রোম এবং অন্যান্য সমৃদ্ধিশালী দেশের লীলাভূমি ছিল। আধুনিক পুরাতত্ত্বের মতে মিশর হইতেই গ্রীসে প্রথম সভ্যতা আসে। পরে ফিনিসিয় দেশ হইতে “কেডমস্” নামক এক রাজা আসিয়াই গ্রীসে অনেক নূতন কথা শিখান। মিশর হইতে আনিয়া আঙ্গুরের চাষ ও লেখার প্রবর্ত্তন প্রথমে তিনিই এখানে করেন। এইরূপে বিভিন্ন দেশ হইতে আসিয়া একে একে কতকগুলি উপনিবেশ এ স্থানে স্থাপিত হইল। প্রথমে তাহারা পরস্পরের সহিত কতই কলহ করিত। যুদ্ধ বিগ্রহ বই আর কিছুই ছিল না। ক্রমে যত জ্ঞান ও সভ্যতা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল, সকলেই বুঝিলেন যে, একতা কত সুবিধার জিনিষ। এই জ্ঞান লাভ করিয়াই অনেকগুলি গ্রীক উপনিবেশ প্রতিনিধি পাঠাইয়া বৎসরে একবার একত্র মিলিত হইয়া পরস্পরের ভাল মন্দ সম্বন্ধে পরামর্শ করিতেন। একেই বলে “Amphictyonic Council” বা জ্ঞানী লোকের সভা, এই সামান্য সভা হইতেই পরে এথেন্সের স্বাধীন তন্ত্রের উৎপত্তি। সকল দেশেই এইরূপ হইয়া থাকে। একত্র বাস করিতে গেলেই পরস্পরের স্বার্থত্যাগ করিতে হয়। একত্র পরামর্শ করিয়াই রাজ্যের হিতাহিত স্থির করা হয়। আমাদের দেশের পঞ্চায়ত সভা ও বিলাতের পার্লামেণ্ট সভা অবধি এইরূপেই উৎপন্ন। একতাতে সকল বিষয়েই সুবিধা হয়, একতাই সকল জাতীয় শক্তির মূল। এই সময়ে দেশের এমন ক্ষমতা ও শ্রীবৃদ্ধি দেখিয়া—সে দেশের আদিমবাসী ও নিকটবর্ত্তী অন্যান্য স্থানের লোকেরাও গ্রীকদের সহিত সমান স্বত্ব দাওয়া করাতে, প্রথমে গ্রীস তাহা দেয় নাই। অনেক দাবীদাওয়া ও গোলমালের পর এই “হেলটরা” সে স্বত্ব পায়। এরূপ ইতিহাস সকল দেশেই সমান। স্বত্ব কখনই অমনি মিলে না।
অনেকগুলি উৎসব ও অন্যান্য প্রথা লইয়াই গ্রীসে এই একতাবন্ধন এত দৃঢ় হইয়া আসিয়াছিল। তার মধ্যে একটি তাদের Olympic Game, অর্থাৎ অলিম্পিয়া পাহাড়ে বাৎসরিক উৎসবের আড়াআড়ি খেলা। তাহাতে ব্যায়াম ও কলাবিদ্যার পরীক্ষা হইত। বৎসরের মধ্যে একবার গ্রীসের সকল রাজ্য হইতে লোক আসিয়া একত্র মিলিত হইয়া নানারূপ ব্যায়াম ও ক্রীড়া করিত। কে কত শীঘ্র দৌড়াতে পারে, কত দূর লাফাইতে পারে, কত বেগে ঘোড়া চড়িয়া যাইতে পারে, বা তীর ছুড়িতে পারে ইত্যাদি লইয়া পরস্পরে আড়াআড়ি হইত। এইরূপ সকল বিষয়েই খেলা ছিল। বর্ষা লইয়া, তলওয়ার লইয়া, গদা লইয়া এই খেলা হইত,—এই খেলা দর্শকবৃন্দকে কতই আনন্দ দিত। উৎসবের কয়দিন লোকে লোকারণ্য। আর যিনি যে যে বিষয়ে শ্রেষ্ঠ হইতেন, তাঁহার পারিতোষিক কি—সোণা নয়, রূপা নয় একটি “অলিভ” পাতার মুকুট। সেরূপ সম্মান আর কেহ কোথাও পায় না—মধ্যযুগের Tournament যুদ্ধ খেলাও এইরূপ খেলা তাতে জেতার পুরস্কার,—একটি রমণীর স্নেহদৃষ্টি ও সম্মান। অধুনা সোণা রূপার “কাপ” উপহার দেওয়া প্রথা হইয়াছে। কিন্তু গ্রীসে সুধুই অলিভ পাতা। স্পার্টার আইনকর্ত্তা লাইকারগসের কঠোর নিয়মানুসারে স্পার্টার শ্রেষ্ঠ উপাদেয় খাদ্য ছিল Black broth, সে একরূপ তরকারীর ডালনা মাত্র। এই সামান্য উপলক্ষ করিয়াই তখন তাঁহারা কত বড় হইতে পারিয়াছিলেন।
এই গেল একতা বন্ধনের একটি উপলক্ষ। আর একটি উপলক্ষ Delphic oracle “ডেলফি” মন্দিরের ভাগ্যগণনা। সে স্থান একটি ভাগ্যগণনার স্থান মাত্র; তীর্থযাত্রার মত সবাই সে স্থানে যাইয়া ভাগ্য পরীক্ষা করিতেন। একটি ছোট বালিকাকে একটি বেদীতে বসাইয়া তাঁহার চারিদিকে ধূপ ধুনার ধোঁয়া দেওয়া হইত। ক্ষণেক পরেই বালিকাটি অজ্ঞান হইয়া পড়িতেন। তখন তাঁহাকে যা জিজ্ঞাসা করা হইত, তার তিনি যথাযথ উত্তর দিতেন। সে ভবিষ্যৎ বাণী অধিকাংশ সময়েই না কি ঠিক হইত।
পূর্ব্বোক্ত লাইকারগসের কঠোর নিয়ম পালন করিয়া অল্প দিনেই স্পার্টা অতিশয় প্রতাপান্বিত হওয়ায় যখন এথেন্স ও স্পার্টার যুদ্ধ বাধে—তখন এথিনিয়নরা ভীত হইয়া এই স্থানে পরামর্শ লইতে যাইলেন। ভবিষ্যৎ বাণী হলো—“তোমরা তিন চোখোকে সৈন্যাধ্যক্ষ কর, যুদ্ধে জয় হইবে।” তিন চোখো কে তা ঠিক করিতে না পারিয়া তাঁহারা এক চোক কাণা এক গুরু মশাইকে ঘোড়ায় চড়িয়া যাইতে দেখিয়া ঠিক করিলেন, যে ইনিই “তিন চোখো”। তিনি সৈন্যাধ্যক্ষ হইয়া ওজস্বিনী ভাষায় কবিতা রচনা করিয়া সৈন্যদের উৎসাহিত করিতে লাগিলেন। তাতে তাহারা মাতিয়া উঠিয়া এমন সাহস ও নিপুণতার সহিত যুদ্ধ করিল যে, তাদেরই জয় হইল।
ফরাসী দেশেও এইরূপ এক আশ্চর্য্য ঘটনা ঘটিয়াছিল। বহুদিন পূর্ব্বে যখন ইংলণ্ড প্রায় ফরাসী দেশের সকল অংশ জয় করিয়াছিলেন, তখন অনন্যোপায় দেখিয়া ফরাসীদেশের সকল লোক হতাশ্বাস হইয়া পড়িলেন। এই সময়ে এক অষ্টাদশবর্ষীয়া কৃষক কন্যা তাহার বাসভূম লোরেনে এই বার্ত্তা শুনিয়া সর্ব্বদা প্রান্তরে একা মেষ চরাইতে চরাইতে মনে করিতেন যে, কে যেন আকাশপথ হইতে তাঁহাকে বলিতেছে, “তুমিই তোমার জন্মভূমি রক্ষা করিতে পারিবে।” বালিকা বর্ম্ম পরিয়া নিজ দেশের রাজার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন ও তাঁহার সৈন্যের নেতা হইয়া যুদ্ধ চালাইতে লাগিলেন। সৈন্যগণ তাঁহার কথায় এত উৎসাহিত হইল যে, তাহারা এখন যেখানে যায় সেখানে জিতে। ক্রমে সকল স্থানে কৃতকার্য্য হইয়া শেষ যুদ্ধে সেই অমানুষিক বালিকা শত্রুদের হাতে ধরা পড়েন। তাহারা তখন তাঁহাকে ডাইনী বলিয়া পুড়াইয়া মারে। তবে তিনি যে কার্য্যের জন্য অবতীর্ণা হইয়াছিলেন, সে কার্য্য সমাধা করিয়া গেলেন,—ফরাসী দেশ স্বাধীন হইল।
গ্রীসদেশে পূর্ব্বোক্ত এই দুটি উপায়েই দিন দিন জাতীয়তা বন্ধন বাড়িতে লাগিল। তখন এক হইয়া গ্রীসের প্রতাপ দেখে কে? এই সময়ে পার্শিয়ার সম্রাট “ডোরায়স্” মহা প্রতাপান্বিত রাজা ছিলেন। তিনি অসংখ্য সৈন্য লইয়া সমুদ্র পার হইয়া গ্রীস আক্রমণ করিলেন। কিন্তু এমন একতাবন্ধনে বলীয়ান জাতিকে কেমন করিয়া জয় করিবেন, তিনি পরাজিত ও বিধ্বস্ত হইয়া বিতাড়িত হইলেন। তার কিছু বৎসর পরে তাঁরই পুত্র জেরেকসিস্ আরও বিপুল আয়োজন করিয়া পুনরায় গ্রীসের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিলেন। সেবারও যা ঘটিবার নয় তাহাই ঘটিল। স্পার্টার সৈন্যাধ্যক্ষ লিউনিডস্ কেবলমাত্র ২০০ জন সৈন্য লইয়া এক পর্ব্বতের পাশে ৫০০০০ সৈন্যের পথ আগলাইলেন। এমন যুদ্ধ কেহ কখন দেখে নাই। সেই ২০০ সৈন্যে ৫০০০০ সৈন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হইয়া একটিও দেশে ফিরেন নাই!
একতায় গ্রীসের এমন ক্ষমতা বৃদ্ধি। তারপরে অতি বৃদ্ধিতে প্রায়ই যাহা ঘটিয়া থাকে, তাই ঘটিতে লাগিল। দুই ক্ষমতাশালী দেশ এথেন্স ও স্পার্টাতে মহা রেষারেষী আরম্ভ হইল। এইরূপে পরস্পরে ঘরাও যুদ্ধ করিয়া গ্রীক জাতির কত শক্তি ক্ষয় হইতে লাগিল। আর সে একতা বন্ধন নাই। তারপরই আবার থীব্স্এর সঙ্গেও বিবাদ বাধিল; সেও অন্যতম একটি গ্রীসের রাজ্য। যখন ক্রমে ক্রমে এইরূপ ঘরাও বিবাদ বিসম্বাদ ঘটিয়া উঠিল, তখন আর বাহিরের শত্রুর কি ভয়? মেসিদন রাজ্য গ্রীসেরই উত্তরে —এখন এই রাজ্যই তুর্কির রাজ্য হইয়াছে। সেখানকার রাজা ফিলিপ আসিয়া অনায়াসে গ্রীস জয় করিয়া ফেলিলেন। ইহারই পুত্র জগৎ বিখ্যাত দিগ্বিজয়ী আলেকজান্দর। তিনি ভারতবর্ষেও জয়পতাকা আনিয়াছিলেন।
গ্রীসের এইরূপ ঘরাও বিবাদ ও অধঃপতন হইবার কালে “ডিমস্থিনিস্” নামক এক এথিনিয়ন ওজস্বিনী বক্তৃতায় নিজ দেশের লোকদের চেতনা জাগাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। তাহারা তখন কতই ভোগবিলাসী ও অকর্ম্মণ্য হইয়া পড়িয়াছিল। কাজেই তাঁর এত চেষ্টাতেও নিয়তিকে বারণ করা গেল না। এই বাগ্মিবরের জীবনীও অতিশয় বিস্ময়কর কথা। চেষ্টায় যে সকল বাধা ও বিপত্তি অতিক্রম করা যায়, তাহারই একটি ভাল উদাহরণ। তিনি বড় তোতলা ছিলেন—সেই দুরারোগ্য দোষটি অতিক্রম করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইয়া প্রত্যহ সমুদ্রতীরে গিয়া মুখে পাথর দিয়া পরিষ্কার কথা কহিবার অহরহঃ চেষ্টায় শেষে কৃতকার্য্য হইয়াছিলেন। তারপর ইঁহার বক্তৃতার এমন উত্তেজনা শক্তি ছিল যে, যে শুনিত সেই পাগল হইয়া শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে ছুটিত।
ইহার কিছু দিন পূর্ব্বেই এই দেশে বিজ্ঞবর Socratesএর জন্ম হয়। তিনিও নিজ দেশের দুরবস্থা দেখিয়া নানা উপায়ে তাহাদের শিখাতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। তখনকার লোকে—বড়ই বিবাদপ্রিয় হইয়াছিল আর সামাজিক ও ধর্ম্ম সম্বন্ধীয় অনেক কুপ্রথায় দেশের লোকের শক্তি একেবারে জর্জ্জরিত হইয়াছিল। তিনি তাদের সৎশিক্ষা দিবার জন্য—অল্পবয়স্ক বালকেরাই নুতন উপদেশ শিক্ষা করিবার বিশেষ উপযুক্ত বিবেচনা করিয়া তাদেরই এই সকল উপদেশ দিতেন। তাতে তাঁহার শত্রুরা ছেলেদের কুশিক্ষা দিয়া বিগড়াইয়া দিতেছেন এই অভিযোগে তাঁহাকে দণ্ডিত করিল। হেমলক লতার রস পান করিলে শরীর ক্রমে ক্রমে অবশ হইয়া মৃত্যু ঘটে। রাজদণ্ড অনুসারে এই রস পান করিয়াই সক্রেটিসের মৃত্যু হয়। তিনি কখনও পলাইবেন না জানিয়া খোলা কারাগারেই তাঁহাকে রাখা হইয়াছিল, মনে করিলেই তিনি পলাইতে পারিতেন—অনেকে সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়াও সক্রেটিসের অপ্রীতিকর হইয়াছিলেন। শেষ সময়ে—তিনি প্রভূত ছাত্রবৃন্দ দ্বারা পরিবৃত হইয়া সেই বিষ পান করিতে করিতে আত্মার অবিনশ্বরতার কথা বলিতে ও তাহাদিগকে সদুপদেশ দিতে লাগিলেন। ছেলে কোলে করিয়া তাঁর স্ত্রীও তাঁর সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছিলেন, তিনিও কাঁদিতে কাঁদিতে চলিয়া গেলেন। ক্রমে বিজ্ঞবরের দেহ বিষে জর্জ্জরিত হইয়া শিথিল হইয়া আসিতে লাগিল। বহুকাল নির্ব্বাক ও নিশ্চেষ্ট থাকিয়া সেই মহাপুরুষ ধরাধাম পরিত্যাগ করিলেন।
আমি যখন মেডিকেল কলেজে প্রথম ভর্ত্তি হই—ক্লাসে কোনেয়ম বা হেম্লকের কথা শুনিয়া আমার চোখে জল আর থাকে নাই। এখনও সে মহাপুরুষের কথা অহরহঃ আমার মনে হয়। এমন জ্ঞানী তত্ত্বদর্শী ও পবিত্র জীবন লোক ইহসংসারে আর হয় নাই।
গ্রীসের তারপরের ইতিহাস অতি শোচনীয়। ক্রমে রোম আসিয়া গ্রীস জয় করিল; ক্রমে মুসলমান ধর্ম্ম প্রচারের সঙ্গে মুরযুদ্ধে সমগ্র গ্রীস তুর্কির পদানত হইয়া পড়িল। তারপর আবার সে দিন মাত্র স্বাধীনতা অপর জাতির সাহায্যে পুনঃপ্রাপ্ত হইয়া এখনও গ্রীস কোনরূপে দাঁড়াইয়া আছে মাত্র।
এই গেল সংক্ষেপে গ্রীসদেশের ইতিবৃত্ত। ইহা বলিবার মানে আর কিছুই নয়, কেবল বোঝানো যে,—সে রাজ্য যাহার ইতিহাসের কথা এখন সংক্ষেপে বলিব তাহার সঙ্গে এ সকল দেশের ইতিহাসে কত মিলে। শুধু রোমের সঙ্গে কেন—ইংলণ্ডের ইতিহাসের ও আমাদের ভারতবর্ষের ইতিহাসের সঙ্গেও তার অনেক মিল আছে। মোটামুটী ধরিতে গেলে সকল দেশের ইতিহাসই সমান। তার মধ্যে এই কয়টি কথা বিশেষ করিয়া বলিবার আছে।
আদিমবাসীর সহিত নবাগত সভ্যজাতির সর্ব্বত্রেই চিরবিবাদ। ভারতবর্ষে বিষম জাতিভেদ সূত্রে তারা আলাহিদা একশ্রেণী হইয়াই চিরকাল রহিয়া গেল। কিন্তু অন্যান্য দেশে তাহারা বহু রক্তপাতের পর মিলিয়া এক হইয়াছে। এইরূপে অনেক শ্রেণীর একত্র মিলনের পর হইতেই দেশের শ্রীবৃদ্ধি হইতে থাকে। ক্রমে উচ্চপদে চড়িলে সচেষ্টভাব অনেক কমিয়া যায় ও দম্ভ আপনিই আসিয়া পড়ে। এই দম্ভই পতনের মূল। ঘরে ঘরে বিবাদ সেই দম্ভ হইতেই উৎপন্ন হয়। তাতেই দেশটি শেষে ছারখারে গিয়া নূতন জাতির পদানত হইয়া পড়ে। আমাদের দেশে সকলগুলি হইয়াছে কেবল গোড়ার মিলটি হয় নাই, তাই আমাদের পতন আরও এত অতল ও এত দুর্নিবার্য্য।
আর একটি উদাহরণের মত এইবার রোমের কথাও বলিতেছি। সে রাজ্যের উত্থান আবার গ্রীসের কতকগুলি লোক যাওয়াতেই ঘটিল। ক্রমে ক্রমে লোক আসিয়া সাতটি পাহাড় লইয়া রোমরাজ্য প্রতিষ্ঠিত করিল। তাদের পার্শ্বস্থিত ইট্রাস্কান্ প্রভৃতি লোকেরাও সমান স্বত্ব দাবী করায় সাধারণ লোক বা “প্লীবিয়ন” ও বড়লোক বা “পেট্রিসিয়নদের” মধ্যে কত রক্তপাত হয়। জল যেমন সমতল খোঁজে, সকল শ্রেণীও একত্র থাকিলে তেমনই সাম্যভাব স্থাপিত হয়,—সে প্রকৃতির চেষ্টা অনিবার্য্য। ক্রমে নীচ শ্রেণীর লোকদের স্বত্ব-স্বামিত্ব দেখিবার জন্য রোমে Tribune নামক কর্ম্মচারী নিরূপিত হইল। ক্রমে সবাই সমান হইয়া রাজ্যের অসীম ক্ষমতা বাড়িল। এককালে সমস্ত ইউরোপ তাহাদের পদতলে ছিল। পরে দম্ভ, পাপপ্রবেশ, জাতিভেদ ও পতন। মহা মহা দেশের ভাগ্যচক্রের এই পরিবর্ত্তনগুলি সকল লোকেরই জানা উচিত।
আর একটি বিশেষ জানিবার বিষয়—ক্ষমতার যুগে যুগে স্থান পরিবর্ত্তন। আর্য্যজাতি মধ্য এসিয়াতেই ছিলেন—সে স্থান হইতে দলে দলে তাঁহারা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িলেন। নিজেদের কথা বলিয়া কাজ নাই কিন্তু এসিয়া এককালে অতি সমৃদ্ধিশালী রাজ্য ছিল। এসিয়া মাইনরে “সিরিয়া” প্রভৃতি রাজ্যও কত প্রতাপশালী ছিল। মিশর কত পুরাতন। ক্রমে মিশর হইতে গ্রীসে, গ্রীস হইতে রোমে, ও রোম হইতে সমগ্র ইউরোপের স্পেন ফ্রান্স প্রভৃতি দেশে সভ্যতা ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। পুর্ব্বদেশে অবস্থিত এসিয়া ও আফরিকা হইতে উৎপন্ন সে স্রোত ক্রমে ক্রমে যেন ঠিক পা ফেলিয়াই—ইউরোপের পশ্চিম দিকে গিয়াছে—এখন সেখানেই তার কেন্দ্রস্থান; আবার সেখান হইতেও ক্রমশঃ পশ্চিমে সরিয়া গিয়া আমেরিকাতে তাহার পিঠস্থান করিয়াছে। আবার প্রশান্ত সমুদ্র পার হইয়া এসিয়ারই এক প্রান্তে সুদূর জাপানে উদয়। তার পরও কি মনে হয় না যে সেই সূর্য্য আবর্ত্তনের পূর্ব্ব পথে চলিয়াই আবার পূর্ব্বস্থানে ফিরিয়া আসিবেন? সেই দিন নিশ্চয়ই আমাদের দেশে আনা যায়,—সেইরূপ যদি সকল জাতি সকল ধর্ম্মের লোক আবার একত্র মিলে।