বিষয়বস্তুতে চলুন

বিলাত ভ্রমণ (প্রথম ভাগ)/ভূমধ্যস্থ সাগর (২)

​

ভূমধ্যস্থ সাগর।

 ভূমধ্যস্থ সাগরের আশ পাশের স্থানগুলির অনেক ইতিহাস বলিয়াছি। কি পুরাকালের হিসাবে, কি আধুনিক হিসাবে, এ স্থানটি এত প্রসিদ্ধ যে, উহাদের ইতিহাস সম্বন্ধে কিছু জানা বড়ই আবশ্যকীয়। পুরাকালে সভ্য জগতের ইহাই কেন্দ্রস্থান ছিল। ইহারই নিকটবর্ত্তী স্থানে সভ্যতার বিকাশ ও প্রচার হয়। বাণিজ্য হিসাবেও এই স্থানটি তখন সর্ব্বপ্রধান ছিল। মিশর, ফিনিসিয়, গ্রীক ও রোমান জাতিরা এই খানেই বাণিজ্য করিতেন। এই স্থানটিই আসিয়া ও ইউরোপের সন্ধি স্থান। ইহারই পূর্ব্বদিকে অবস্থিত মরুময় আরব দেশের পুণ্য ভূমিতেই পৃথিবীর দুইটি ধর্ম্মের স্থাপনা হয়। আর কোনও কোনও প্রত্নতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতের বিশ্বাস যে, এই পথ দিয়াই মধ্য আসিয়া হইতে আর্য্যজাতি ইউরোপ ও নিকটবর্ত্তী স্থানসমূহে ছড়াইয়া পড়েন, ও সভ্যতার আদি বিকাশ আসিয়াভূমেই হইয়া দেশে দেশে প্রচারিত হয়। কিন্তু এখন ইউরোপ প্রভৃতি স্থানই ক্ষমতা ও সভ্যতার পিঠস্থান হইয়াছে, এবং আমেরিকার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে আটলাণ্টিক মহাসাগরই বাণিজ্যের প্রধান স্থান হইয়াছে। অবস্থার পরিবর্ত্তনের সঙ্গে সঙ্গে সময়ে সকল জিনিষই স্থান পরিবর্ত্তন করে। একস্থানে অনেক দিন থাকিলে কোনও জিনিষেই জীবনী-শক্তি স্ফূর্ত্তি পায় না। তাই দোপাটি গাছের ফল সজোরে ফাটিয়া চারিদিকে বীচি ছড়াইয়া দেয়; তুলার হালকা ফলগুলি হাওয়াতে উড়িয়া গিয়া সুদূরে নিক্ষিপ্ত হয়; ও আম কাঁঠাল প্রভৃতি সুমিষ্ট ফলগুলি প্রাণিগণের দ্বারা সাদরে ভুক্ত ও দূরে নীত হওয়াতেই এই সকল গাছের বংশ বৃদ্ধি হয় ও শক্তি অক্ষুণ্ণ থাকে। বহু শতাব্দী ​হইতে এই এক স্থানে এক ভাবে থাকিয়া সমুদ্রযাত্রায় নিষিদ্ধ হইয়া আমাদেরও অধঃপতন এই কারণেই ঘটিয়াছে।

 সকলেই জানেন, ভূমধ্যস্থ সাগরটি প্রায় চারিদিকে জমি দিয়ে ঘেরা। ইহার উত্তরে ইউরোপ, দক্ষিণে আমেরিকা ও পূর্ব্বে আসিয়াভূমি বিদ্যমান। কেবল পশ্চিমে আটলাণ্টিক মহাসাগরের সহিত যোগ হইবার একটি অপ্রশস্ত প্রণালী আছে। জিব্রাল্টার নামক এই প্রণালীটি চারি পাঁচ মাইল মাত্র প্রশস্ত। এই প্রবেশস্থান আগুলিয়া একটি উঁচু পাহাড়ের উপর জিব্রাল্টারে ইংরাজের সুরক্ষিত দুর্গ বিরাজমান আছে। সেই কারণে এই স্থানে পূর্ব্বাঞ্চলে ব্যবসা করিবার পথ বলিয়া, ইংরাজের ক্ষমতাই প্রধান। তার প্রবেশের পথে জিব্রাল্টার, আধপথে মাল্টা দ্বীপ, তারপর মিশর ও এক কোণে সাইপ্রাস্ দ্বীপ ইংরাজেরই অধিকৃত।

 এই স্থানে অতি সুমিষ্ট ফল পাওয়া যায়; এমন সুমিষ্ট, নরম ও রসাল কমলা লেবু কোথাও দেখি নাই। তার বীচি নাই; তার ছিব্‌ড়ে নাই। তার খোসা এত পাতলা যে ছাড়ান যায় না। আর মুখে দিলে সুগন্ধযুক্ত মধুর রস রসনার স্রোত বহিয়া যায়। আঙ্গুর ও আপেল প্রভৃতি ফল হইতে নানারূপ সুগন্ধ মদিরাও এই স্থানের একটি চিরপ্রসিদ্ধ উৎপন্ন দ্রব্য।

 কিন্তু এ সমুদ্রটি বড়ই অনিশ্চিত ও অস্থির। অতি অল্পক্ষণেই সমুদ্রের অবস্থা পরিবর্ত্তন ঘটে। তার কারণ আর কিছুই নহে—কেবল ঢেউগুলি চারিদিকের জমিতে প্রতিহত হইয়া বার বার ফিরিয়া আসে। সায়েদ বন্দর হইতে একদিন যাইয়া সন্ধ্যার পরই সমুদ্র অস্থির হইয়া উঠিল। অতি অল্পক্ষণের মধ্যে তরঙ্গগুলি প্রবলতর হইয়া জাহাজকে বিষম আলোড়িত করিতে লাগিল। সমুদ্রে উঁচু উঁচু ফেনাময় ঢেউ ও অতি প্রবল বাতাস ও আকাশে কাল কাল মেঘ একত্রে দেখিলে, অপার অনন্ত সমুদ্রের মাঝে জাহাজটিকে কতই অসহায় মনে হয়। একটি ​সামান্য বুদ্‌বুদের মত এক নিমিষে অনন্ত জলে তাহা বিলীন হইতে পারে। ক্রমে জাহাজ এত বেশী দুলিতে লাগিল যে, আর ডেকে থাকা অসম্ভব।

 প্রথমেই স্ত্রীলোকেরা বমি করিতে লাগিলেন। আমি তাঁহাদের মতনই স্বভাববিশিষ্ট। একেবারে শুইয়া অতি যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া নিদ্রাবিরহিত হইয়া দুই দিন কাটাইয়াছিলাম। সে অবস্থা বড়ই কষ্টকর। পা টলে, মাথা ঘুরে, গা বমি বমি করে, আর উঠে অতি কম; কেবলই বমির বেগ মাত্র। কিন্তু আশ্চর্য্য, সমুদ্র প্রশান্ত হইলেই, অতি অল্পক্ষণেই সকল বে-ভাব চলিয়া যায়। ঘুরপাক দিলে যে জন্য গা ঘুরে, এও সেই কারণেই উৎপন্ন হয়। মানববুদ্ধির কাছে ত কোনও বাধাবিপত্তিই বহুকাল দাঁড়াইতে পারে না, তাই এখন বিজ্ঞানের সাহায্যে এমন একরূপ ঝোলান বিছানা আবিষ্কৃত হইয়াছে, যাহাতে চড়িয়া থাকিলে আর সমুদ্রপীড়া হয় না।

 আমি যে সব চীন জাহাজে গিয়াছি, সে সব জাহাজের বন্দোবস্ত হইতে বিলাতী জাহাজের বস্তোবস্ত আরও ভাল। শুনেছি নাকি, আমেরিকার জর্ম্মণ-হামবার্গ লাইনের জাহাজগুলি সর্ব্বাপেক্ষা বড় সুবিধাজনক। জাহাজে থাকিবার কালে বাড়ীতে থাকার সকল সুখ সম্ভোগ করিতে পারা যায়। ঘণ্টা বাজাইলেই কলের মত ভৃত্য আসিয়া আজ্ঞা পালন করে। আহার্য্য সামগ্রী এত বেশী যে, খাওয়া যায় না। নানারূপ উপাদেয় খাদ্যদ্রব্য প্রতি বন্দর হইতেই লওয়া হয়। কিন্তু সেগুলি ভালরূপে রাঁধা হয় না। এত লোকের একত্র রন্ধন বড় সোজা কাজ নয়। আর তা ছাড়া মাংস, ডিম, দুগ্ধ ইত্যাদি অনেক জিনিষই কোটায় করিয়া ও বরফের ঘরে অনেক দিন ধরিয়া রক্ষিত থাকে বলিয়া, তার স্বাদ কিছু কমিয়া যায়। যাহাই হউক, এইরূপে খাদ্যদ্রব্য বহুদিন ধরিয়া রাখিবার উপায় আবিষ্কৃত হওয়াতে পৃথিবীর কতই মঙ্গল হইয়াছে। যে দেশে যে, ​জিনিষ প্রচুর জন্মায় সেই দেশ হইতে সেই সকল দ্রব্য এইরূপ প্রকারে রক্ষিত হইয়া দেশ দেশান্তরে নীত হইতেছে। এ এক বড়ই লাভজনক ব্যবসা। আমেরিকা হইতে এইরূপে অনেক মাংস রপ্তানি হয়—অষ্ট্রেলিয়া হইতেও এইরূপ মাংস ও দুধ আসে। যুদ্ধক্ষেত্রে ও জাহাজেই এই সকল বেশী ব্যবহৃত হয়। শস্যের ত কথাই নাই; তাহা আরও সহজে বহুদিন রাখা যায়। সে শস্যের ভিতরকার খাদ্যগুলি শস্য-ভ্রূণের জন্যই রক্ষিত। আর এমন সুব্যবস্থার প্রকৃতিদেবী সে ভাণ্ডার সুন্দররূপে আবৃত করিয়া রক্ষা করিয়াছেন যে, বহু বৎসর ধরিয়াও তাহা নষ্ট হয় না। শত সহস্র বৎসর পরেও শস্য হইতে গাছ জন্মাইতে দেখা যায়।

 দুই দিন বিছানায় পড়িয়া থাকিবার পরদিন ভোরে সমুদ্র স্থির হইল। তখন সুদূরে পূর্ব্বাকাশ রঞ্জিত করিয়া সবে মাত্র আলো ফুটিতেছে। তাড়াতাড়ি বিছানা হইতে উঠিয়া ডেকের উপর গিয়া দেখি, নিকটেই ইতালীর সবুজ গাছপালা বিশিষ্ট জমি দেখা যাইতেছে। অল্পক্ষণ পরেই সিসিলী দ্বীপ দৃষ্টিপথে আসিল। সে দ্বীপটি পাথরবিশিষ্ট পাহাড়ে ভরা ও অনেক গাছপালাও আছে। “মেসিনা” প্রণালীর ভিতর দিয়া আমাদের জাহাজ চলিতে লাগিল। ইতালী ও সিসিলীর মধ্যে এই প্রণালীটি আছে। দুই ধারের জমিই অতি নিকট দেখা যায়। দু-ধারেই বসতিতে পরিপূর্ণ পাহাড়ের ভিন্ন ভিন্ন স্তরে সুন্দর সুন্দর রং করা পাথরের বাড়ী। চারিদিকে বাগান ও ঘন সবুজ গাছ। এমন কি দূর হইতে ফুল গাছও দেখা যাইতে লাগিল। সমুদ্রের ধারে ধারে ধোঁয়া উড়াইয়া রেলগাড়ী চলিতেছে। পাহাড়ের সর্ব্বোচ্চ চূড়ায় আলোকস্তম্ভ ও ধ্বজা পতাকা। একটী গাছপালাহীন চূড়ায় কামানের ঘুলঘুলিবিশিষ্ট কেল্লা প্রখর দৃষ্টিতে সমুদ্রের দিকে চাহিয়া আছে। ধারে ধারে অনেকগুলি নৌকা ও জাহাজ। ইটালীর মাঝিরা সব বর্ম্মার ও চীনের মত দাঁড়াইয়া দুই হাতে দুইটি দাঁড় টানে। কত ​নৌকাও প্রণালীর মধ্য দিয়া এ পার ও পার ফেরি করিতেছে। জাহাজের বাঁশীস্বরে দুইধারের পাহাড় প্রতিধ্বনিত হয়, বেশ শুনা যায়। ওই প্রসিদ্ধ সহরটি “মেসিনা।” সমুদ্রের ধারে উন্নত স্থানে সবুজ জায়গায় ওই স্থানটি কত স্বাস্থ্যকর, কি সুন্দর স্থান! আমাদের দেশের ক্লান্ত রুগ্ন লোকেরা কিছুদিন এই মত স্থানে থাকিলে কত সুস্থ হন।

 ইহার অনতিদূরেই ঠিক জলের মধ্য হইতে মাঝ সমুদ্রে একটি আগ্নেয়গিরি উঠিয়াছে। তাহার দৃশ্য কি ভীষণ! আমরা যখন দেখিলাম তখনও তাহার উপর হইতে অগ্নি নিক্ষিপ্ত হইতেছে ও ধোঁয়া বাহির হইতেছে। সে গিরির উপর একটীও গাছপালা নাই, তার ধারে ধারে গলা পাথর পড়িবার দাগ। অগ্নি উৎপাতের সময় ওই গুলি দিয়া গলা ধাতু দ্রব্য গড়াইয়া পড়ে। এই পাহাড়টিকেই “ষ্ট্রম্বলী” বলে। এ স্থানের কি মহতী কি ভীষণা মূর্ত্তি!

 এই ইটালীদেশে মহা জ্যোতিষী গেলিলিওর জন্ম হয়। পৃথিবীই সূর্য্যের চারিদিকে ঘুরিতেছে, এই নুতন কথা বলাতে পুরাতন মতাবলম্বী তাঁহার দেশের লোক তাঁহার উপর বিরক্ত হইয়া তাঁহাকে কত নিগৃহীত করিয়াছেন। আর এই সিসিলির দ্বীপেই পদার্থবিদ্যাবিৎ আরকিমিডিসের জন্ম হয়। তিনি নানারূপ বৈজ্ঞানিক প্রণালীর দ্বারা আপনার মাতৃভূমি ছোট দ্বীপটিকে কত শত্রুর হস্ত হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন। বড় বড় আয়নার সাহায্যে সূর্য্যের রশ্মি ঘনীভূত করিয়া শত্রুর জাহাজ দূর হইতে দগ্ধ করিতেন। জ্ঞানচর্চ্চায় এতই মনোনিবেশ যে যখন শত্রু ঘরে অজানিত হইয়া প্রবেশ করিয়া তাঁহাকে হনন করিতে উদ্যত তখনও তিনি জীবন ভিক্ষা না করিয়া বলিলেন “অপেক্ষা কর, এই তত্ত্বটির মীমাংসা করি, ক্ষণেক পরে মারিও। ”

 এই স্থান হইতে কিছুদিনের পথে “কর্সিকা দ্বীপ।” যাইতে যাইতে তাহাও দেখা যায়। এইস্থানেই মহাবীর নেপোলিয়নের জন্ম হয়। ​সে দেশও তখন আমাদের দেশেরই মত ফরাসী দেশের পদানত ছিল। পরাধীন দেশের এই বালকই পরে ভুবন বিজয়ী হইয়াছিলেন। সমস্ত ইউরোপ ভূমি তাঁর প্রতাপে কাঁপিত।

 এই স্থান হইতে আর কিছুদূর যাইলেই ফরাসী দেশের দক্ষিণ দেশস্থ “মার্সেল” বন্দরে পৌঁছান যায়। সেই খান হইতেই রেলযোগে একদিনেই লণ্ডনে পৌছান যায়।

 এত দিন যে নানা দেশীয় যাত্রীপূর্ণ জাহাজে একত্র থাকিয়া কতলোক কত ঘটনা অনবরত দেখিয়াছি সে কথা বড়ই বিস্ময়কর ও মনোহর।

 রাত্রি পোহাইবার পূর্ব্বেই জাহাজ মার্সেল বন্দরে পৌঁছিল। ভোরে উঠিয়া দেখি যে, বন্দরের জেটিতে জাহাজখানি বাঁধা রহিয়াছে। এবার আমরা এই প্রথম ইউরোপের ভূমিতে আসিলাম।

 তখনও লোকজন জেটিতে বেশী আসে নাই। ক্রমে ফরাসী কুলী ও জেটির কর্ম্মচারীরা আসিতে লাগিল। চা, রুটী ফেরীওয়ালা চা ফেরী করিতে আসিল। খবরের কাগজ বেচিবার জন্য কত ‘হকার’ আসিল। অতি কম দামের ছোট ছোট খবরের কাগজ। সে গুলিতে অল্প কথায় সহজ ভাবে দৈনিক সব খবর আছে। দামও অতি সস্তা। এক “সেন্‌টিম্” দু “সেন্‌টিম্” দাম, আমাদের আধ পয়সার সমান। সভ্য দেশের কুলিদেরও ভিতর প্রায় সকল লোকই এক একখানি কিনিল। যত নিচু অবস্থার লোক হোক না কেন—বা যত গরিব, যত ব্যস্তই হোক না কেন—দিনের মধ্যে এক সময় না এক সময় তাদের খবরের কাগজ পড়া চাই। নিজ দেশে ও অপরাপর দেশে কে কি করিতেছে তার মোটামুটি খবর রাখা চাই।

 সে সব দেশে সময় অতি মূল্যবান ও ঠিক সময়ে হাজির হওয়া ও কাজ আরম্ভ করা সর্ব্বত্রই নিয়ম। সকলেই আসিয়া এক এক পেয়ালা চা খাইয়া ও একবার খবরের কাগজে চোখ বুলাইয়া লইয়া নিজ নিজ ​কার্য্য আরম্ভ করিল। তারপর ডেকে আসিয়া দেখিলাম জেটিতে চীনের গুদাম ও মাল উঠিবার নামিবার বারান্দার চারিদিক ঘেরা। বন্দরটি জাহাজে পরিপূর্ণ। দূরে দূরে আলোক স্তম্ভ ও সাঙ্কেতিক ধ্বজা পতাকা দেখা যাইতেছে। অনতিদূরে জলের উপর ছোট ছোট পাহাড়। তার উপরে সুন্দর সুন্দর বাঙ্গালা নির্ম্মিত। মার্সেলের এই বন্দরটি ভূমধ্যস্থ সাগরের একটি প্রধান বন্দর।

 ইউরোপের দক্ষিণে কোনও স্থানে, বা আফরিকার উত্তরে বা এসিয়াতে কোন স্থানে যাইবার এইটিই পথ। কারণ ইউরোপের অনেক স্থান হইতে রেল আসিয়া এই স্থানে সংযুক্ত হইয়াছে বলিয়া যাতায়াত করিতে ও মালপত্র চালান দিবার এইটিই সুবিধার স্থান। আর ভারতবর্ষ হইতে বিলাত যাইবার তো এইটাই প্রশস্ত পথ। একদিনেই রেলযোগে ফরাসীদেশের ভিতর দিয়া, চেনেল পার হইয়া—লণ্ডনে পৌঁছান যায়।

 আমার বরাবর সমুদ্র দিয়া যাইবারই টিকিট ছিল, কিন্তু সমুদ্র পীড়ায় অতিশয় ভুগিয়াছি বলিয়া আর সমুদ্র দিয়া যাইতে সাহস হইল না। বিশেষ ‘বে অব বিস্কে' অতি ভয়ানক স্থান। আটলাণ্টিক মহাসাগরের যত ঢেউ ও কোণে আসিয়া প্রতিহত হইয়া সমুদ্রকে বড়ই তরঙ্গময় করিয়া তুলে। এই সাত পাঁচ ভাবিয়া আরও শতাবধি টাকা খরচ করিয়া রেলপথেই যাইতে মনন করিলাম।

 নামিবার সময় যে গোলমাল, যে ভিড়। সবই সুনিয়মে বাঁধা বলিয়া এত লোকের জনতায়ও তত কিছু বেবন্দোবস্ত হয় না। আগে হতেই সবাই খবর দিয়া নিজেদের নামিবার কথা জাহাজের অধ্যক্ষকে জানাইয়া রাখিবে; মোট ঘাট বন্দোবস্ত করিয়া বাঁধিয়া রাখিবে। কুক্ কোম্পানী ও হেন্‌রি এস্‌কিউ, ও গ্রীনলে Cook Co. Henry Skieu, Grindlay প্রভৃতি আফিসের লোকেরা আসিয়া সকলকে সাহায্য করিয়া নামাইয়া দেয়।

​ এতদিন যে সকল লোকের সঙ্গে একত্র বাস করিতেছিলাম, তাঁহারা সবাই বিদায় নিলেন; বিদায় লইবার কালে কতই কষ্ট হয়। অন্য কোনও কাজ নাই, এমন অবস্থায়, সুখে, এতদিন ধরিয়া, একত্র যাহাদের সঙ্গে কত অন্তরের কথা কহিয়া অহরহঃ আনন্দ করিয়াছি, তাহাদের সঙ্গ ছাড়িতে হইল—আর হর ত ইহজীবনেও দেখা হবে না। বিদায় লইবার সময় পরস্পরের ঠিকানা ও কার্ড পরিবর্ত্তন করা হয়। তখন মনে হয় ইহাদের সহিত বরাবর চিঠিপত্র লেখা সম্বন্ধ রাখিব। পরে কর্ম্মক্ষেত্রের দারুণ নিষ্পেষণে কিছুই আর মনে থাকে না।

 “ডরোথী” নাম্নী একটি দ্বাদশ বর্ষীয়া বালিকা তার মা ও বাবার সঙ্গে বাড়ী ফিরিয়া যাইতেছিল। তাহারা ইয়র্কসায়ারের অধিবাসী। সঙ্গে দুটী ছোট বোন ছিল। সবাই যেন এক একটি মোমের পুঁতুল। জাহাজে ছেলেরা ছোট ফ্রক প’রে থাকে ও শুধু পায়ে, শুধু মাথায় হেসে হেসে চারিদিকে দৌড়াদৌড়ী খেলা করিয়া বেড়ায়। তাতে যে তাদের কি সুন্দর দেখায় তা না দেখিলে বুঝান যায় না। আর ইউরোপের ও অন্যান্য সভ্যদেশের সকল স্থানেই মেয়েদের বড় আদর। আমাদের দেশেই কেবল তাহা নাই। তাই অত যত্নে ও আদরে লালিত পালিত হইয়া সে দেশের ছেলে মেয়েগুলি যেমন সুস্থ, সবল, তেমনি মিষ্টভাষী ও সুসভ্য। জাহাজে থাকিতে ডরোথী প্রায়ই আমার কাছে আসিয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া গল্প করিত। তার নিজের কথা, তার ঘরের কথা, তার বাপ-মার কথা,—আর বয়স বার বছর হইলেও যেন শিশুর মত তার সরল ভাব; আসিবার সময় সে আমার সঙ্গে সঙ্গে আসিয়া জমি অবধি নামাইয়া দিয়া জাহাজে ফিরিয়া গেল।

 এই সকল স্থানে ‘কাষ্টম্‌সে’র ব্যাপার বড়ই কড়াকড়ি। পাছে কেহ লুকাইয়া কোনও পণ্যদ্রব্য লইয়া গিয়া ফরাসী সরকারের শুল্ক ফাঁকী দেয়, এই আশঙ্কায় সকলেরই সিন্দুক তোরঙ্গ খুলিয়া পরীক্ষা করা হয়। ​সর্ব্বাপেক্ষা তামাক, সাবান, এসেন্স, মদ ও অন্যান্য খোস পোষাকের জিনিষের উপরই বেশী সন্দেহ। ব্যবহার করিবার মত অল্প ছাড়া বেশী থাকিলেই তার উপর শুল্ক দাবী করা হয়।

 এত কাজ করিতে করিতে অনেক বেলা হইয়া পড়িল। ইহার মধ্যে আরও কত লোক ফেরীওয়ালা, ভিখারী, গায়ক, নর্ত্তক ও দর্শক সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইল। একত্রে কত দেশের কত রকমের লোকই এখানে দেখা যায়। এ সকল দেশের লোকের রং বড় বেশী ফরসা নহে। তা ছাড়া ইটালী, স্পেন, পর্ত্তুগ্যাল ইত্যাদি নানা দেশের লোক আসিয়া বসবাস ও ব্যবসা বাণিজ্য করে বলিয়া এখানেও অনেক শঙ্কর জাতি উৎপন্ন হইয়াছে। তাহাদের রং মাটো ও চুল ও চোখের তারা কাল। তবে স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য্য এ দেশেরই লোকের মত ভাল।

 এ সকল সুনিয়মে প্রতিষ্ঠিত সুসভ্য দেশে ভিখারীরা রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করিয়া বেড়াইতে পারে না। তাহা করিলে পুলিশে তখনই ধরিয়া তাহাদের সাজা দেয় ও “ওয়ার্ক হাউসে” পাঠায়। সেখানে কাজ করিবে ও খাইতে পাইবে তার ব্যবস্থা আছে। বসিয়া খাওয়ান সে দেশের নিয়ম নয়। ভিক্ষা করিতে হইলেই কিছু বেচার ভাণ করিতে হইবে। হয় ত কোথাও ভিখারী দেশলাইয়ের বাক্স বা জামার বোতাম বা জুতার ফিতা হাতে করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। তাহার নিকট হইতে সামান্য কিছু একটা জিনিস লইয়া তাহাকে যা কিছু দাও। অপর একটি ভিখারী হয়ত নাচিতেছে বা গাহিতেছে বা অন্য কিছু তামাসা দেখাইতেছে, তাহাকে তুমি কিছু দিলে। অনেক গরীব পরিবার সপরিবারে ছেলে পিলে লইয়া নাচাইয়া গাওয়াইয়া পয়সা উপায় করিতেছে। একরূপ বাজনা আছে, তাহা হাত দিয়া ঘুরাইলেই নানারূপ সঙ্গীত ও গত্ বাহির হয়। অনেকে সেরূপ বাজনা বাজাইয়া ভিক্ষা করে। শুনেছি নাকি সে একটি বড় লাভজনক ব্যবসা। যন্ত্রের দোকান হইতে দোকানদারেরা ​তাদের যন্ত্র ভাড়া দেয় আর তাতে বেশ সুদ পায়; সর্ব্বত্রই কতরূপ ফন্দী করিয়া আইনের কঠোর নিগড় হইতে নিষ্কৃতি পাওয়া যাইতে পারে। যেমন চাপ তেমনি সে চাপ কাটাইবার উপায় উদ্ভাবিত হইতে পারে। সকল জীবেরই এই ক্ষমতাটুকু আছে বলিয়াই জীবের মানসিক ও দৈহিক অভিব্যক্তি হইতেছে। তাই পাখীর ডানা গজায়, মাছের সাঁতার দিবার উপযুক্ত পাখনা বাহির হয় ও ভূচরের পা জন্মায়। বাধা হইতেই সকল জীবের উন্নতি।

 ইতালীদেশের ছোট ছোট মেয়েরা আসিয়াও অতি সুন্দর নাচিয়া গাহিয়া অনেক পয়সা উপায় করে। আমাদের দেশের মেয়েদেরই মত তাদের মাটো রং, কাল চুল, কাল চোখের তারা, ও সরল নম্রভাব মাখান মুখশ্রী; ছোট ঘাগরা পরিয়া করতালি দিয়া যন্ত্রের সঙ্গীতের সঙ্গে ঘুরিয়া ঘুরিয়া তাহারা অতি সুন্দর নাচে। তাকে কি নাচ বলে জানি না।—কিন্তু কতকটা আমাদের দেশের মতই নাচ। সিঁথা কাটা খালি মাথা হইতে পিঠে লম্বা বিনানী দোদুল্যমান। আর গোল গোল হস্তগুলি কখনও বা কোমরে বিন্যস্ত, কখনও বা নানাভাবে চারিদিকে উৎক্ষিপ্ত হইয়া নানারূপ বিভ্রম দেখায়। ক্ষিপ্র পা গুলি যখন সঙ্গীতের মধুরতায় তালে তালে পড়িয়া নাচিতেছে—হস্তগুলিও তখন প্রতি হাতে এক একটী খঞ্জনী মুষ্টির ভিতর লইয়া সুন্দর তাল দিতে থাকে। আর ঘুরিয়া ঘুরিয়া নাচিবার সময় যখন ছোট ঘাগরাটি বৃত্তাকারে ছড়াইয়া পড়িয়া উর্দ্ধে উৎক্ষিপ্ত হয়, তখন দর্শকবৃন্দ অতিশয় প্রীত হইয়া—ছোট ছোট রৌপ্য মুদ্রা ছুড়িয়া তাহাদের প্রভূত পারিতোষিক দেন।

 যাঁহারা বৃদ্ধ, জরাজীর্ণ, কাণা খোঁড়া, তাহারা ইউনিয়ন বীণা বাজাইয়া—অনুচ্চ গম্ভীরস্বরে গান করেন। সে বীণাটী ত্রিকোণ আকৃতি, অনেকগুলি তার বিশিষ্ট ও সাম্‌নে রাখিয়া দুই হাতেই তাড়না করিতে হয়। এই বীণাই পুরাকালে গ্রীসের বীণা ছিল। তাহার স্বর নম্র মধুর ও গম্ভীর, বিজ্ঞ ​ভাবুকের অন্তরের উচ্চভাবগুলির সঙ্গে ঠিক সুন্দর মিলান। আমাদের বীণাপাণির হাতের বীণা হইতে অল্পই প্রভেদ। তাহাদিগকে সেইরূপ অবস্থায় দেখিয়া আমার গ্রীক কবি হোমারের কথা মনে হইতে লাগিল। এক সময়ে তিনিও পেটের দায়ে বীণা বাজাইয়া দরজায় দরজায় ভিক্ষা করিয়া বেড়াইতেন। লণ্ডন হইতে অনতিদূরে কাঁচনির্ম্মিত “এলেকজান্দ্রা পেলেসের” “Alexandra palace” এক স্থানে পাথরে খোদা একটি ছবি আছে। সেটি বড়ই সুন্দর দেখিতে। মহাকবি এক রাজার সভায় বীণা বাজাইয়া নিজেরই রচিত “ইলিয়ড” কাব্যের গান সকলকে শুনাচ্ছেন। লণ্ডনের University Collegeএরও বড় হলে ঐরূপ একটি ক্যাম্বিসের বুনা ছবি আছে। তাতে মূর্ত্তিগুলি সব উলঙ্গ। গ্রীক বীরদের সুগঠিত দেহের রেখাগুলি দেখাইবার জন্মই সে উলঙ্গ মূর্ত্তিগুলির কল্পনা। তাহাতে সৌন্দর্য্য আরও বাড়িয়াছে। অন্ধ কবির বীণার গানে তাঁহারা সবাই মুগ্ধ হইয়া শিথিলদেহ হইয়া পড়িয়াছেন। আমাদের দেশে বাল্মীকির রামায়ণ গানের সঙ্গে ইহার বড় সৌসাদৃশ্য আছে।

 যে গানগুলি সেখানে শুনিলাম, সে গানগুলি অতিশয় মধুর। ইতালীর বালিকাদের নাচা সুরে গান অপেক্ষা অনেক বিভিন্ন। তাতে সরল গভীর শোকের ভাব মাখান আছে। যেন অভাব ও নৈরাশ্যের কাতরোক্তির মত—তাই অত মিষ্ট।