বিষয়বস্তুতে চলুন

বিলাত ভ্রমণ (প্রথম ভাগ)/মার্সেল

​

মার্সেল।

 সব জিনিষ-পত্র গুছাইয়া কাষ্টমের পরীক্ষা সাঙ্গ করিয়া নামিতে প্রায় ৮টা বাজিল। কাষ্টমের পরীক্ষার ব্যবস্থা ফরাসীদেশে বড়ই অসুবিধাজনক; তার কারণ, আমরা তাদের ভাষা জানি না। ইউরোপ শুদ্ধ সকল লোকই ফরাসী ভাষা জানে বলিয়া, ফরাসীরা প্রায় বড় একটা অন্যদেশের ভাষা শিখে না। সর্ব্বত্রই ইংরাজী জানা প্রদর্শক পাওয়া যায়, তাহাদের সাহায্যে দেশ বেড়ান প্রভৃতি কার্য্যে কোনই অসুবিধা হয় না।

 আমরা নামিবামাত্র একটি খোঁড়া প্রদর্শক আসিয়া বলিলেন যে, তিনি ১০ শিলিংএর বিনিময়ে আমাদের সারাদিন সহর দেখাইয়া বেড়াইবেন। ৬ শিলিংএ মিটমাট করিয়া আমরা তাঁহাকে সঙ্গে লইলাম। তিনি আধাবয়সী লোক। এক উচ্চ স্থান হইতে পড়িয়া গিয়া দুই বৎসর পূর্ব্বে পা খোঁড়া হইয়া গিয়াছে। বাড়ী “সুইটজারল্যাণ্ডে।” আর কেহই সাহায্য করিবার নাই তাই নিজেই এখন এই কাজ করিয়া চালান। তিনি দেখিতে ভদ্রবংশীয় ও অনেকগুলি ভাষা জানেন। খোঁড়া বলিয়া যে চলিবার বা কোন কাজ করিবার অভাব হয় তা নয়। সুস্থ সবল দেহে অতি দূরূহ কাজও তিনি সেই খোঁড়া পায়ে করিতে পারেন।

 জোট হইতে বাহির হইবার পথে অনেকগুলি ভাড়া-গাড়ী দাঁড়াইয়া ছিল। তার অধিকাংশই দু’চাকার গাড়ী কতকটা টমটমের মত। গাড়োয়ানগুলি অতি সুগঠন ও বলিষ্ঠ, বেঁটে বেঁটে লাল্‌চে রংযুক্ত ও মাংসল। ঘোড়াগুলি সব “নরম্যাণ্ডি পনী।” মোটা সোটা ও উঁচু, ঘাড়ে ও পায়ে অনেক বড় বড় লোমবিশিষ্ট। তাদের সাজ এক রকম। বৃষদের পিঠে যেমন “ককুদ” বা কুজের মত উঁচু অংশ থাকে সাজে ঘোড়ার ​পিঠেও তেমনি অনুকরণ করা হইয়াছে। এরূপ কিন্তু আর কোথাও দেখি নাই। তবে এডিনবরাতেও এইরূপ ঘোড়ার সাজ। এত দূরে দূরে দুটি স্থানে এরূপ বিষয়ে এরূপ মিল কি করিয়া হইল বুঝা যায় না। আমাদের দেশের অনেক স্থানের মত এখানকার গাড়োয়ানেরা যাত্রী লইয়া কাড়াকাড়ি করে। অবসর পাইলে তারা সবাই খবরের কাগজ পড়ে।

 আমরা একখানি গাড়ী লইয়া মোটমাট বোঝাই করিয়া হোটেলের দিকে চলিলাম। সেই জেটি হইতে বাহির হইয়া সহরের রাস্তায় চাহিয়া দেখি, গাড়ী ঘোড়ার অন্ত নাই। এমন একটি প্রসিদ্ধ বন্দরে যে এত ভীড় হইবে, তা কিছুই আশ্চর্য্য নয়। গাড়ীগুলি যেরূপ স্তূপাকার মাল বোঝাই লইতেছে তা দেখিলে অবাক হইতে হয়। মালগুলি যেন স্তূপীকৃত এক একটি পাহাড়ের মত গাড়ীর উপর সঞ্চিত। ঘোড়াগুলি যেমন বলিষ্ঠ, মানুষগুলিও তেমনি বলবান। তাতে কেবল একজন মাত্র চালক—তার সহিস নাই। সেই একলা ঘোড়াকে তদ্বির করে, গাড়ী হাঁকায়, মাল বোঝাই করে ও নাবায়। এদেশের লোকের যোগ্যতা আমাদের তুলনায় এত বেশী যে, অতি গুরুতর কার্য্যের ভার তাহাদের উপর দিয়াও সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকা যায়। সকলেই লেখাপড়া জানে ও দেশের নিয়ম ও খবরাখবরে সুশিক্ষিত বলিয়া—সকল কার্য্য সুন্দররূপে ব্যবস্থা করিয়া করিতে পারে। আর স্বাস্থ্য এত ভাল ও মন এত প্রফুল্ল বলিয়া কাজ করিয়া আলে না।

 গাড়ীগুলি এত বড় ও মাল এত বেশী বলিয়া অনেকগুলি ঘোড়া জুতিয়া গাড়ী চালাইতে হয়। এমন কি, এক একখানি গাড়ীতে ছয় কি সাতটি ঘোড়া অবধি দেখিয়াছি। আমাদের দেশে যেমন ঘোড়া পাশাপাশি জুতে, তাদের দেশে সব সামনা-সামনী; তাতে যে কি সুবিধা হয় তা জানি না; তবে এইরূপ লম্বা ঘোড়ার সারটি দেখিতে বড় বিস্ময়কর মনে হয়। অত ভীড়েও রাস্তায় সব সুব্যবস্থা।

​ ফরাসী দেশের সব রাস্তাগুলিই অতিশয় প্রশস্ত, ভাল করিয়া বাঁধান, ও গাছ পালা দিয়া সাজান এবং দুধারে সুন্দর সুন্দর বড় বাড়ী ও দোকান দ্বারা শোভিত। রাস্তার মাঝ দিয়া দ্রুতগামী ট্রাম চলিয়াছে। সে সবগুলিই আমাদের দেশের ট্রামের মত বৈদ্যুতিক বলে চলে। কতকগুলির তার মাথার উপর দিয়া যায়—আর কতকগুলির মাটির নিচে দিয়া নীত। একটি লম্বমান যন্ত্র, তাতে ঠেকিয়া তাহা হইতে শক্তি লয়। চওড়া রাস্তার মাঝ দিয়া ফুটপথ—আমাদের দেশের মত দুই ধার দিয়া নহে। সে ফুটপথ বা পদব্রজে চলিবার পথগুলি সব বেড়াইবার স্থান। গাছপালা ও ফুলফলে ঢাকা। তলায় সুন্দর বেঞ্চী। তাতে বসিয়া শ্রান্ত পথিক ও বিলাসীজনেরা—আরাম করেন। সে অতি সুন্দর স্থান। আমাদের কলিকাতার রাস্তা দেখিয়া তাহার কিছুই বুঝা যায় না।

 রাস্তার ধারে ধারে মাঝে মাঝে প্রশস্ত বাগান আছে—সে বাগানগুলি যে কি সুন্দর, তা বলা যায় না। সকল জিনিষই যেন হাত দিয়া গড়া। গাছগুলি ছাটা ছোটা, জমীটি কেওয়ারী করা। তাতে কিছুই বনের বন্য শোভা নাই। প্রকৃতির নিজ হাতের কিছুই রাখা হয় নাই। ফরাসী দেশের লোকেরা কৃত্রিম সৌন্দর্য্যের বড়ই পক্ষপাতী। তাহারা যেমন নিজের মনের মতন করিয়া দাড়ি ছাটেন ও গালে রং লাগান তেমনি গাছপালারও বেশব্যিাস করেন। প্রায় সব বাগানের গাছগুলিই কাটাছাটা ও খর্ব্বাকৃতি। আমাদের চোখে সে দৃশ্য বড় ভাল লাগে না। সে দৃশ্য ইংরাজ জাতিরও বড় প্রিয় নহে। তাঁহারাও আমাদের মত প্রকৃতির সহজ সৌন্দর্য্য বড়ই ভালবাসেন। লণ্ডনের আশে পাশে সব বন-বাদার বন্য ভাবেই রক্ষিত। প্রকৃতির স্বাভাবিক সৌন্দর্য্যই সেখানকার লোকে ভালবাসে। “গোলডার্স গ্রীন” পাহাড়ের নিকট “স্পানিয়ার্ড” নামক ছোট ছোট কাঁটা গাছের ঝোপগুলিও সেইরূপ ভাবেই রক্ষিত আছে। তাঁরা তার ভিতরকার অপ্রশস্ত পথ দিয়া বেড়াইয়া অশেষ আনন্দ লাভ করেন। ​কিন্তু ফরাসী দেশের সৌন্দর্য্যের আদর্শ অন্যরূপ অথচ ইউরোপের সকল জাতিই ফরাসীদের সৌন্দর্য্য আদর্শ করিয়া তাহারই অনুকরণ করেন।

 এদেশের রাস্তাঘাট যেমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘরবাড়ীগুলিও তেমনি মাপা জোপা করে গাঁথা। সবগুলিই প্রায় একরূপ দেখিতে, একই ফ্যাসানে গড়া। তাতে সামঞ্জস্য হওয়ায় অতি সুন্দর দেখায়। দোকান ঘরগুলি অতি পরিপাটী। রাস্তার দিকের বড় বড় সব জানালাগুলি কেবল কাচ দিয়াই ঢাকা। তার ভিতরেই সব দোকানের ভাল ভাল জিনিষগুলি সুন্দরভাবে সাজান থাকে। বাহির হইতে সবই দেখা যায়। ভাল ভাল দোকানে সব জিনিষগুলির দামও সঙ্গে সঙ্গে লেখা আছে। লণ্ডনে সকল দোকানেই দাম লেখা পদ্ধতি, এখানে সর্ব্বত্র তা নাই। তবে ভাল ভাল দোকানে জিনিষ কিনিতে কিছুই দেরী হয় না—ও কোনরূপ দর দস্তুরও করিতে হয় না।

 এদেশে ফুলের এমন আদর যে, রাস্তায় রাস্তায় ফুলের দোকান ও ফুলের ফেরী হয়। বালিকারাই ফুল বেচেন। আর কেহও ফুল বেচিলে অমন শোভা হয় না। জল সেচন করা তাজা তাজা ফুলগুলি কেমন সুব্যবস্থায় সাজান। কত রকমই বা তার রং, কত রকমই বা আকৃতি। আর কোনও কোনও ফুল একেবারে সুগন্ধে ভরা। সতেজ কেশরগুলি সব প্রাণের আকুলতা লইয়া জাগিয়া আছে। আর ছিন্ন হইলেও, সমান আগ্রহে মধুকর আসিয়া তাদের মুখে মুখ দিয়া আদর করে।

 এই সব দেশে স্ত্রীলোকেরাই বেচা কেনা করেন। সেখানে তাঁহারা পুরুষ মানুষের মতই স্বাধীন অথচ—পুরুষেরাও তাঁহাদিগকে যথেষ্ট সম্মান ও আদর যত্ন করেন। কাজ কর্ম্ম তো সকলেরই করা চাই। তাই তাহাদের হাতেই এইরূপ অল্প আয়াসসাধ্য দোকানে বসিয়া কাজ বেশ মানিয়াছে। ছেলের যত্নের মত জিনিষের যত্ন হয়। আর জিনিষ পছন্দ ও সাজানর সৌন্দর্য্য বিচার তাঁহাদেরই জাতিগত শক্তি, সেই কারণে ​
ফরাসী দেশের সমুদ্রের মাঝে দ্বীপ। এই কেল্লায় নেপোলিয়ন থাকিতেন।
​তাঁহারাই সব সভ্যদেশে এই কাজের উপযোগী হইয়াছেন। ছেলেপুলের বা সংসার পর্য্যবেক্ষণেরও তাতে কোন হানি হয় না। সময় মত সকল কাজ করিলেই সকল কাজ সুচারুরূপে করা যায়। ন্যাতা জোবড়া হইয়া এক কাজ লইয়াই সারাদিন বসিয়া থাকিলে কাজ ভাল হয় না।

 এখানে নিম্ন শ্রেণীর রমণীরা সর্ব্বদা মাথায় টুপি দিয়া রাস্তা চলেন না। বিলাতে কিন্তু এই প্রথা সর্ব্বত্র। ইহাদের স্বাস্থ্য ও গঠন অতিশয় প্রশংসনীয়। মোটা মোটা গোল গোল হাত পা গুলি অনেকদূর অবধি খোলা। ঘাগরাটি ছোট, কামিজটির হাতকাটা, বিনানিটি মাথার ঊর্দ্ধদেশে বিন্যস্ত। সব সুন্দর। গলাটি অনেকটা নীচে অবধি দেখা যায়। চোখ কাল, চুল কাল, রং সাদা সাদা, আর সদা ব্যস্ত ভাব। দুষ্ট হাসির ভিতর এমন এক মধুর ভাব আছে যে, ইচ্ছা হয় দূর হইতে অনেকক্ষণ ধরিয়া দেখি।

 পথে যাইতে যাইতে সমুদ্রধারের একটি অনুচ্চ পাহাড়ের উপর একটি কেল্লা দেখিলাম। “নেপোলিয়ন” যখন মার্সেলে আসিয়া থাকিতেন, তখন তিনি এই প্রাসাদটিতেই বাস করিতেন। এখন সে নেপোলিয়নও নাই, সে ফরাসীদেশও তেমন নাই। এখন এই স্থানে একটি হাসপাতাল হইয়াছে।

 ফরাসীদেশের সকল গ্রাম ও নগরের অলিতে গলিতে ‘কাফে’ বা মদ্য পান করিবার আড্ডা। রাস্তার ধারের দোকানের বারান্দায় ছোট ছোট পরিপাটি টেবিল ও চেয়ার সাজান আছে। দুটি তিনটি লোকের এক টেবিলে বসিয়া গল্প করা চলে। আগন্তুকদের আবশ্যকীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করিবার জন্য রমণীরাই নিযুক্ত। এই সকল স্থান অতিশয় জনতাময়। বিশেষতঃ দিনের কাজ শেষ হইলে সন্ধ্যাবেলা ভিড়ের সীমা নাই। সকলেই আড্ডা দিতে এইখানে খানিকক্ষণ কাটান। সেটি এমন আনন্দের স্থান যে, খানিকক্ষণ সেই স্থানে বসিলে মনের সকল দুশ্চিন্তা ​চলিয়া যায়। সকলের সঙ্গে হাসির কথা কহিতে ইচ্ছা যায়। এমন কি, সবাইকার দেখাদেখি লাল লাল একটু সুধাও চুমুক দিতে মন চায়।

 এই সকল স্থান হইতে খানিকদূর মাত্র গিয়া, আমরা আমাদের গন্তব্যস্থান Hotel de Continental “হোটেল ডি কণ্টিনেণ্টালে’, পৌঁছিলাম।

 হোটেল কণ্টিনেণ্টালে পৌঁছাইলে পর একজন সুবেশী পুরুষ আসিয়া আমাদের অভ্যর্থনা করিয়া বসিবার ঘরে লইয়া গেল। মোট পত্রের ভাবনা আমাদের আর কিছুই ভাবিতে হইল না।

 হোটেলটি একটি প্রশস্ত রাস্তার উপর অবস্থিত। চারিতলা বাড়ী ও ঘরদ্বারগুলি অতি পরিপাটীরূপ সুসজ্জিত। তার আশে পাশে মদ্যপান করিবার ও জুয়া খেলিবার “কাফে” ও একটি বৃহৎ থিয়েটার অবস্থিত। চারিপাশে রাস্তায় লোকে লোকারণ্য। অথচ কাচের দরজাগুলি বন্ধ করিয়া দিলে কিছুই গোলমাল নাই।

 বসিবার ঘর নানারূপ আসবার ও ছবিতে সাজান। দেওয়ালে অনেকগুলি মানচিত্র আছে। ভিন্ন ভিন্ন স্থানে যাইবার পথ ও তাহার ভাড়ার কথা তাহাতেই লেখা আছে। Oriental Royal Mail নামক যে সব জাহাজ অষ্ট্রেলিয়া হইতে ডাক লইয়া কলম্বো হইয়া বিলাতে যায়, সেই জাহাজগুলি অতি বড় ও দ্রুতগামী। সেই জাহাজটিই ভারতবর্ষ হইতে বিলাত যাইবার পক্ষে সর্ব্বাপেক্ষা সস্তা। এমন কি তার তৃতীয় শ্রেণী অন্য জাহাজের দ্বিতীয় শ্রেণীর মত। তাহাতে ৫০০ টাকায় কলিকাতা হইতে বিলাতে যাওয়া আসা চলে।

 টেবিলেও অনেক ভাষার অনেকগুলি বই ছিল, তার মধ্যে অধিকাংশই ভ্রমণবৃত্তান্ত। আমার এই বিষয় পড়িতে বড়ই ভাল লাগে। একখানি ফরাসী ভাষায় লিখিত ভ্রমণবৃত্তান্তের কথা কেবল ছবি দেখিয়াই কতকটা বুঝিয়া লইলাম। দেওয়ালে আরও অনেকগুলি সুন্দর সুন্দর ছবি ছিল। তার মধ্যে একটিতে শিশু কোলে কুমারী মেরী অবস্থিতা। তাঁর সরল মুখের ​ভাবে মাতৃভাব কি সুন্দর চিত্রিত হইয়াছে! তার পাশের ছবিখানিতে কাঁটাগাছের মুকুট পরা খৃষ্টের প্রশান্ত মুখ, তার ভিতর হইতে এক অপূর্ব্ব জ্যোতিঃ চারিদিকে বিকীর্ণ হইতেছে। ইহারই পাশে ‘এণ্ডোমিডা’র নগ্ন মূর্ত্তি সমুদ্র ধারে পর্ব্বতগুহার নিকট শিকল দিয়া বাঁধা। ভীষণ বেগে তরঙ্গগুলি আসিয়া সেইস্থানে আঘাত করিতেছে। জলদস্যুর আহারের জন্যই সেই নিরীহ বালিকা সেই স্থানে উৎসর্গীকৃত হইয়াছিলেন। তিনি লজ্জায় অবনতমুখী ও ভয়ে কম্পমানা। দেখিতে দেখিতে জলদস্যু তাঁহার দিকে ধাবিত হইল। আর ঠিক সেই মুহূর্ত্তে এক উজ্জ্বল বীরমূর্ত্তি উপর হইতে নামিয়া দস্যুকে বধ করিয়া রমণীকে উদ্ধার করিলেন। এই ভাবের চিত্র।

 ঠিক সময়ে আমাদের আহারের জন্য ঘণ্টা বাজিল। ইতঃপূর্ব্বেই আমাদের মুখ হাত ধুইয়া পোষাক পরিয়া প্রস্তুত হইতে বলিবার জন্য আরও একবার ঘণ্টাধ্বনি হইয়াছিল।

 কতদিন ধরিয়া জাহাজের বাসি খাবার খাইয়া সে খাবারে অরুচি হইয়া গিয়াছিল। আজ এখানে ফরাসী দেশের সুন্দর মুখরোচক রান্না খাইয়া মুখ জুড়াইল। খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা এখানে অতি পরিপাটী। রান্নাও নানারূপ, রকমারী ও সুস্বাদু। সমস্ত সভ্য জগৎ এই রান্নার অনুকরণ করে। ইংরেজী রান্নায় কখনও দুটি জিনিস একত্র মিশাইয়া রাঁধিবে না। আমাদের দেশের মত এখানে কিন্তু সেরূপ খুবই চলে। দুটী তিনটী জিনিস দিয়া একটী তরকারী। তাতে মসলা দেওয়া অথচ আমাদের দেশের মত বেশী নয়। শাক সবজি খুবই প্রচলিত। ভাতও পাওরা গেল। আলুভাজাও পাওয়া গেল। ইংরাজদের দেশে ভাজা নাই, সবই বিনা মসলায় সিদ্ধ করা, মসলা দিয়া খাইতে হয়। সব খাবারগুলিই মুখে সুমধুর লাগিল ও তৃপ্তির সহিত খাইলাম।

 এ সকল স্থানে এবং অন্যত্রও সেই সেই দেশের ও অন্যান্য বিষয়ের ছবি ​ছাপা পোষ্টকার্ড পাওয়া যায়। সে গুলিতে নাম ও ঠিকানা লিখিয়া বন্ধুবান্ধবদের পাঠান যায়, তাতে সংবাদ দেওয়াও হইল, আর ছবি উপহার দেওয়াও হইল। যাঁহারা নানা দেশ বেড়াইয়াছেন এমন সব লোক এই প্রথার উপকারিতা বুঝেন। চার পয়সা করিয়া এক একখানি কার্ড ও চার পয়সা তার মাশুল, তা পৃথিবীর যে স্থানেই থাক না কেন।

 আহারান্তে কিছুক্ষণ এইরূপ পোষ্টকার্ড ডাকে পাঠাইয়া খানিকক্ষণ বিশ্রাম করিতে লাগিলাম। এক রমণী পাশের ঘরে পিয়ানো বাজাইতে লাগিলেন। পরে গাইড আহার করিয়া আসিলে সবাই একত্রে পদব্রজে তার সঙ্গে দেশ দেখিতে বাহির হইলাম।

 পথের বর্ণনা পূর্ব্বেই করিয়াছি। প্রশস্ত পথে জনতার সীমা নাই। দু’দিকে সুন্দর সুন্দর দোকান। স্থানে স্থানে ‘পার্ক’ বা সুন্দর সুন্দর বাগিচা। কোনও কোনও স্থানে অতি সুন্দর পাথরের ছবি আছে। তার মধ্যে অনেকগুলিই ফরাসী দেশের ঘটনাপূর্ণ ইতিহাসেরই ঘটনাবলী লইয়া কল্পিত। এক একটি পাথরের ছবি আমাদের কল্পনায় অতি সুমিষ্ট ভাবমাখা স্মৃতি আনিয়া দেয়। একটি ছবি অতি সুন্দর দেখিলাম। সেটি ফরাসী দেশের “সাধারণ তন্ত্রের” ছবি। জর্ম্মণীর সহিত ফ্রাঙ্কো-জর্ম্মণ যুদ্ধে হারিয়া যখন ফরাসীরা রাজাকে নির্ব্বাসিত করিয়া পুনরায় সাধারণ তন্ত্র স্থাপিত করিল সেই সম্বন্ধে ছবি। “সাধারণ তন্ত্র” অস্ত্র শস্ত্র হাতে করিয়া উচ্চ প্রস্তর স্তম্ভের উপর দাঁড়াইয়া আছেন। আর তার নীচে চারিদিকে অসংখ্য ছাত্রবৃন্দ সশস্ত্র হইয়া তাঁহাকে ঘেরিয়া আছে। এখানেও ছাত্রেরা রাজনৈতিক আন্দোলনে এত সংশ্লিষ্ট। ফরাসী জাতিকে পরাস্ত করিয়া জর্ম্মণী যখন ফরাসী সৈন্যের পশ্চাদ্ধাবন করিতেছিল, সেই সময়ে, দক্ষিণের এই স্থান অবধি আসিয়া তাহাদের গতিরোধ হয়। ছাত্রবৃন্দের প্রবল বিক্রমে ও ইটালীর রক্ষাকর্ত্তা সাধারণ তন্ত্রের পক্ষপাতী মহাপুরুষ ‘গারীবল্‌দীর’ সাহায্যে, জর্ম্মণ সৈন্যের পথ এই স্থানেই রুদ্ধ হইয়াছিল। ​তাই এই প্রস্তরস্তম্ভটী গঠিত হইয়াছে। সেই স্তম্ভেরই চারিদিকে ঘেরা জমিতে সেই যুদ্ধে বিনষ্ট বীরদিগের সম্মানের জন্য অনেকগুলি “উইলো” তরু ও “ভায়োলেট” গাছ রক্ষিত আছে। উইলো গাছের পাতাগুলি সব নীচু, যেন শোকার্ত্তের বিনত মস্তকের মত। আর ঐ সুগন্ধযুক্ত ছোট ছোট ভায়োলেট ফুলের সরলতা ও পবিত্রতা ত সর্ব্বজনবিদিত।

 এই স্থান হইতে কিছুদূর যাইলেই মার্সেলের প্রধান ব্যবসার স্থান “বার্স” “burse’দেখা যায়। সে স্থানটী এমন জনতার পরিপূর্ণ যে লোক ঠেলিয়া চলা যায় না, অথচ প্রায় সকলেরই ক্ষিপ্রগতি। সকলেরই মনে গম্ভীর চিন্তার ভাব। সম্মুখের এই অট্টালিকাতে টাকা কড়ি আদান প্রদান অনবরত চলিতেছে। কাহারও ভাগ্যচক্র নিমেষে তরঙ্গের উপর উঠিতেছে আবার কাহারও বা নিমেষে অতল জলে ডুবিয়া যাইতেছে।

 এই স্থান হইতে আমরা খানিকদূর গিয়া “প্যানেডিলঙ্‌চেম্পে” পৌঁছিলাম। সেটি মার্সেলের একটি প্রসিদ্ধ চিত্র ও ভাস্করবিদ্যার আলয়। কত ভাল ভাল চিত্র ও মূর্ত্তি সেখানে রক্ষিত আছে। বড় বাড়ীটি অনেক তলা অবধি উঁচু, সামনেই অনেকগুলি প্রস্তরমূর্ত্তি সজ্জিত, ঠিক মধ্যস্থলেই মুকুটপরা বর্ষা হাতে সুন্দর একটি স্ত্রী-মূর্ত্তি। সেইটিই যেন ফরাসী দেশের স্বাধীন তন্ত্রের অধিদেবতা। তাঁর পাশেই দুই ধারে দুই স্ত্রী মূর্ত্তি কলাবিদ্যার প্রতিনিধি হইয়া দাঁড়াইয়া আছেন। তার পাশে অনেকগুলি দীর্ঘকায় মাংসপেশীবহুল পুরুষের মূর্ত্তি। মধ্যের ছবিটী ছাড়া সবগুলি উলঙ্গ। তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি তাতে সুন্দর দেখা যাচ্ছে। সেই মূর্ত্তিগুলির সামনেই একটি কৃত্রিম জলপ্রপাত। অনেক উঁচু হইতে স্তরে স্তরে রাশিকৃত জল তুমুল বেগে শব্দায়মান হইয়া নীচে পড়িতেছে। বাড়ীটির চারিদিকে ঘাসবিশিষ্ট সব্‌জে মাঠ। তার উপর ঘাসের শিষের মাঝে মাঝে অনেকগুলি “ডেজী” ও “পান্‌সী” ও “মেরীগোল্ডফুল” ফুটে রয়েছে। এ মিউজিয়মটির কথা বর্ণনা করিতে গেলে অনেক সময় লাগিবে। তার ​ভিতর অনেক সুন্দর সুন্দর প্রস্তর-মূর্ত্তি ও চিত্র আছে। সামনেই রাণী। ক্লিওপ্যাট্রার সর্পবিষে মুমূর্ষু দেহ। রাণী ক্লিওপ্যাট্রার কথা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। অন্য ছবি গুলির কথা স্থানান্তরে বলিব।

 এই বাড়ীটির পাশের রাস্তা দিয়া যাইলে একটি সুন্দর বাগানে পৌঁছান যায়। তাতে নানা জাতীয় জীব জন্তু রক্ষিত আছে, সে স্থানটি অতি মনোহর স্থান। অনেক গুলি গাছপালায় ছায়াযুক্ত ও সুন্দর সুন্দর উঁচুপথ চারিদিকে চলিয়াছে। আশে পাশে ফুলগাছ, তাতে যথাসময়ে আপনিই কলে গাছগুলির তলায় জল দিতেছে। মধ্যে মধ্যে ছোট ছোট বিশ্রাম করিবার ও জলযোগ করিবার ঘর আছে। অনেক লোক গাছের তলায় বেড়াইতেছে, অথবা বসিয়া আরাম করিতেছে। ইহারা কখনও, কাজ না থাকিলে, ঘরের ভিতর বসিয়া থাকিতে পারে না। আর তাদের সে ঘরগুলিও, কাচের দরজা বন্ধ থাকিলে, এত ঘুপসি যে তাহাতে অনেকক্ষণ থাকিলে প্রাণ হাঁপাইয়া উঠে।

 স্ত্রীলোকেরা বসিয়া হয় সেলাই করিতেছেন নয় নভেল পড়িতেছেন। পুরুষরা খবরের কাগজ পড়িতেছেন। কথাবার্ত্তা বড় একটা নাই। এ সব দেশে পাখী অতি কম। শুনিয়াছি লোকে পাখী মারিত বলিয়া সব পাখী ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। এখন এত দিন বাদে গুলি করিয়া পাখী মারা বারণ হইয়াছে। তবুও দুই একটি ছোট পাখী গাছের ছায়ায় থাকিয়া সুন্দরভাবে গান করে। এখন সবে বসন্তকাল আসিয়াছে, তাই কতকগুলি গাছের পাতা বিরল ও অপরগুলিতে ছোট চক্‌চকে নূতন পাতা গজাইতেছে।

 একটি নব-বিবাহিত যুবা সৈনিক পুরুষ তার নববধূকে সঙ্গে লইয়া বেড়াইতে আসিয়াছিলেন, তাঁহাদের পরস্পরের সহিত স্বাধীন ব্যবহার দেখিয়া বড়ই চমৎকৃত হইলাম। রমণীর হস্ত হ’তে সুগন্ধমাখা ছোট রুমালখানি মাটীতে পড়ে গেল, তাহার প্রিয়জন তখনই তাহা সসম্ভ্রমে ​কুড়ায়ে দিলেন। আবার তাঁর চলিতে চলিতে জুতার ফিতা খুলিয়া গেল, বীরপুরুষ হাঁটু পেতে বসে সে ফিতাটি সযত্নে বেঁধে দিলেন। কত মধুর স্বরে কত মধুর ভাবে হাত ধরাধরি করিয়া তাঁহারা কথাবার্ত্তা কহিতে লাগিলেন। ফরাসী ভাষা বলিয়া আমি কিছুই বুঝিলাম না। তবে অবশ্য হাব-ভাবে স্পষ্টই বুঝিতে পারিলাম, তাঁহারা যেন পরস্পরকে পাইয়া কৃতার্থ হইয়াছেন।

 সে বাগানে উত্তর মেরু দেশ হইতে আনীত একটি সাদা ভালুক আছে (polar bear)। অমন শীতের দেশে যার বাস, সে এমন গরম দেশে কেমন করিয়া থাকিবে। তাই তার ঘরে চাঁই চাঁই বরফ দিয়ে ঠাণ্ডা করা। আবার গরম দেশের ফেজেণ্ট পাখীও সেখানে দেখিলাম। তারা এত কৃশ হয় নাই। সুন্দর রঙ্গের কালো কালো পাখাগুলি ও তাদের লম্বা ন্যাজ এখনও বেশ সতেজ রয়েছে। তার পাশেই একটি ময়ূর ময়ূরীকে দেখে পেকম ধরে নৃত্য কর্‌চে। ময়ূরীর পুচ্ছ নাই। তার গলার স্বর ময়ুরের স্বর অপেক্ষাও কর্কশ। তার শরীরে কোনরূপ আকর্ষণই দেখি না। তবুও তার ময়ূরের ডাকে অমনোযোগ। তার পাশে আর একটি ঘরে একটি ধূর্ত্ত শেয়াল। ধূর্ত লোকের মত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাদের দিকে চাচ্ছিল। ইংরাজরা যাকে “জেকল” বলে ফরাসীরা তাকে বলে “সেকল”। ফরাসী ভাষার সকল কথাই অমনি মিষ্ট।

 এখান হইতে কিছু জলযোগ করিয়া আমরা নিকটবর্ত্তী একটি স্থানে পাহাড়ের উপর একটি ধর্ম্মমন্দির দেখিতে চলিলাম। পাথরে বাঁধান পথটি ক্রমশঃ ঢালু হইয়া উচ্চে উঠিয়াছে। পাথরে বাঁধান সরু গলির ভিতর দিয়া ভারী ভারী ঘোড়ার গাড়ী বিকট শব্দে প্রতিধ্বনিত হইয়া ছুটিতেছে। আশে পাশে ছুতর কামার ও অন্যান্য বিষয়ের ছোট ছোট দোকান। ধোপানীরা হাত গুটাইয়া টেবিলের উপর কাপড় ইস্ত্রী করিতেছে। মদ তৈয়ারী করিবার আড্ডায় সে স্থানটি পরিব্যাপ্ত। অনেকগুলি দীনহীন ​ভিখারী ভিক্ষা করিতেছিল। একটী অতি গরীব স্ত্রীলোক দুটি ছেলে নিয়ে পথের ধারে বসে আছেন। অনাহারে তাঁর দেহ এত ক্ষীণ যে তাঁহার বক্ষস্থল হইতেও শিশুর জন্য স্তন্য দুগ্ধ শুখায়ে গেছে। তাই শিশুটিও বড় রোগা। তারই অপর ছেলেটি ৪ বছরের, সে টুপী পাতিয়া আমাদের কাছে ভিক্ষা করিতে আসিল। সকলেই কিছু কিছু দিলাম। দূর হইতে তার মার কৃতজ্ঞতামাখা মুখ দেখিতে গিয়া অনবধানে পিছু হাঁটিতে হাঁটিতে আমি পড়িয়া গেলাম। সে দেশের সভ্য লোক উচ্চ হাসি হাসিয়া আমায় লজ্জা দিল না।

 সে পাহাড়ে খানিক দূর উঠিয়া আর উঠা যায় না। তার উপর অংশ এত ঢালু যে কেহ টানিয়া না তুলিলে উঠা অসম্ভব। এইজন্য এই স্থানে একটি অতি বিস্ময়কর পাহাড়ে চড়িবার রেল আছে। প্রায় খাড়াভাবেই গাড়ীখানি মোটা তারের দ্বারা টানিয়া উঠান হয়। যখন একটি উঠে তখনই আর একটি নামে। তার ভাড়া প্রতি লোক পিছু এক ফ্র্যাঙ্ক বা দশ আনা।

 ক্রমে ক্রমে উঠিবার সময় চারিদিকের দৃশ্য অতি মনোহর দেখায়। অল্পে অল্পে সহরের দৃশ্যপট চোখের সাম্‌নে জাগিয়া উঠিতে থাকে। সর্ব্বের উপরে উঠিলে সমস্ত সহরটী এক নিমেষে দেখা যায়।

 সেখান হইতে নামিয়া আবার খানিকটা পাহাড়ে চড়িলে তবে সেই উপরকার মন্দিরে পৌঁছান যায়। সেটি রোমান কেথলিকদের ধর্ম্মমন্দির। সহরের সকল লোকের চাঁদা দিয়া নির্ম্মিত। মন্দিরের শিরোদেশে কুমারী মেরী শিশু যিশু খৃষ্টকে কোলে করিয়া বসিয়া আছেন। মূর্ত্তিগুলি সোণার রঙ্গে গড়া। রোমান কেথলিক ধর্ম্মে খৃষ্ট অপেক্ষাও মেরীর উচ্চ পদ। প্রোটেষ্টাণ্ট ধর্ম্মে তাহা কেহ স্বীকার করিতে চান না। কি সুন্দর কল্পনা! “Madona” নামে যে ‘মার কোলে শিশু” সম্বন্ধে চিত্র, সে চিত্র কত দেশে কত চিত্রকরই সযত্নে লিখিয়াছেন। ইউরোপের সকল চিত্রশালাতেই ​তা দেখা যায়। সকল মানুষের মনেই স্বতঃই ভগবান সম্বন্ধে যেরূপ ধারণা, তাহা এই সম্বন্ধ দিয়াই সর্ব্বাপেক্ষা সহজে, আমাদের ঈশ্বরের সহিত সম্বন্ধ ভাল করিয়া বুঝান যায়। ভাই বা বোনের সঙ্গে, স্ত্রী বা পুত্র কন্যার সঙ্গে, এমন কি পিতার সঙ্গেও সে ভাব এতটা নাই। পিতার কথা মনেও আসিলে যেন কতকটা ভয় মাখান গুরু মহাশয়ের কথা মনে আসে। কিন্তু মার কথা মনে হলে, অসহায় শিশু অবস্থার মত কেবলই ভালবাসা ও ভক্তি। সেই ভাবই যথার্থ ধর্ম্মভাব আর সব ভাবই কেবল যাজকের লোকঠকান বিধান।

 মন্দিরের নীচের তলার ঘরে বিবি সন্ন্যাসিনীরা নানারূপ পূজার উপযোগী জিনিস বেচিতেছেন। পিতলের বা রূপার ক্রুস, বা নাম জপ করিবার স্ফটিকের মালা, মন্দিরে জ্বালাইবার জন্য, মোমের বাতি বা ধূপ-ধুনা। দোতালাতে মন্দির। তার সিংহদ্বার খুলিয়া ভিতরে ঢুকিলেই ধোঁয়ার গন্ধ পাওয়া যায়। তাতে অনেক রকম ধূপ ধুনা ও বাতি জ্বলে। উপরে খিলানের উপর খিলান চড়িয়া ছাত নির্ম্মাণ করিয়াছে। তার সব স্থানেই মূর্ত্তি চিত্রিত। দেয়ালেও নানারূপ বাইবেল সম্বন্ধীয় চিত্র আঁকা। কোণে কোণে প্রস্তরমূর্ত্তি। সম্মুখেও আবার সেই “শিশু যিশু কোলে কুমারী মেরী” উপবিষ্টা; ফুল ও মালা দিয়া শোভিতা। সামনেই বেদী, সেই স্থান হইতেই পুরোহিত স্তব পাঠ করেন। আর যজমানেরা দূরে দূরে থাকিয়া হাঁটু গাড়িয়া, জোড়হাত করিয়া স্তোত্র পড়িতে পড়িতে পূজা করেন। দেওয়ালে রঙ্গিণ কাঁচের জানালার ভিতর দিয়া নানা রঙ্গের আলো আসিয়া কি গম্ভীর ভাব আনে।

 মন্দিরের বাহির হইতে চারিদিকে দেখিলে এক অপূর্ব্ব দৃশ্য দেখা যায়। এক ধারে অপার জলধি বিস্তৃত, অপর দিকে কেবলই উঁচু নীচু জমিযুক্ত গাছপালা ও তার মাঝে ঢালু ছাতের বাড়ীর সারি, কলকারখানা ও ভজনালয়ের উঁচু চূড়া। গেলবারকার প্রবন্ধে যে দ্বীপটিতে ​নেপোলিয়ন বাস করিতেন বলিয়াছিলাম, সে দ্বীপটিও বেশ দেখা যায়। এই স্থানে বহু পূর্ব্বে গ্রীস্ দেশের উপনিবেশ ছিল। “মণ্টিকৃষ্ট” নভেলের লীলাভূমি সেই দ্বীপটিও এখান হইতে নীল জলের উপর ভাসমান দেখা যায়। নিকটেই একটি উঁচুসাঁকো, সেটির উপর দিয়া সোজা পথে গাড়ী নৌকা লোক জন ইত্যাদি পারাপার করে। বহুদূরে “প্যালেডিলঙ্গ চম্পের” উচ্চ বাড়ীটিও দেখা যায়।

 সেখান হইতে নামিয়া আসিয়া আমরা সমস্ত সহরটি প্রদক্ষিণ করিবার মানসে বৈদ্যুতিক ট্রাম গাড়ীতে চড়িলাম। এখানে ট্রামভাড়া বড়ই সস্তা, দু’ পয়সা খরচ করিলেই সমুদ্রের ধার দিয়া সমস্ত পথটি ঘুরা যায়। তার যে কি শোভা তা বর্ণনায় বুঝান যায় না। চওড়া চওড়া পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তার একধারে সুন্দররূপে সাজান গাড়ীগুলি যেন ছবির মত সারি দিয়া দাঁড়াইয়া আছে, অপর দিকে সমুদ্র। রাস্তার মাঝে ও রাস্তার ধারে সুন্দর গাছ পালায় সুশোভিত বাগান। মধ্যে মধ্যে থিয়েটারের রঙ্গমঞ্চ, সেগুলি সব গ্রীষ্মকালে বন্ধ থাকে, শীত কালেই তার জনতা। আর অনেকগুলি ষাঁড়ের লড়াই করিবার আড্ডা আছে। সে নিষ্ঠুর খেলা—ইংলণ্ডে আইন বিরুদ্ধ, কিন্তু ফরাসী ও স্পেন প্রভৃতি দেশে তাহা এখনও প্রচলিত আছে। সমুদ্রের ধারে ধারে অবগাহন করিবার ও সাঁতার শিখিবার ঠাঁই। সমুদ্রে পাঁচির দিয়া খানিক ঘেরা আছে,—তার ভিতর ঢেউ কম ঢুকে। সেইখানেই সাঁতার দিবার স্থান। প্রায় উলঙ্গের মত ছোট ছোট পাজামা পরিয়া নামিতে হয়। সাঁতার শিখিবার জন্য নৌকা মোতায়ান আছে। সাঁকোতে শিকল আছে। সোলানির্ম্মিত ভাসিবারও যন্ত্র আছে। আড়াআড়ি দিয়া বাছ খেলিবার বোট আছে। পাশেই ঘেরা, কাপড় পরিবার ঘর ও জলপান করিবার জায়গা। মেয়ে পুরুষে একত্র স্নান করে। তাই জনতার সীমা নাই।

 এই মনোরম স্থানেরই উঁচু উঁচু পাহাড়ের উপর ভাল ভাল হোটেল ​নির্ম্মিত। এ সকল স্থান বিলাসী ধনবান্ লোকের উপভোগ করিবার স্থান। শীতকালে এই সকল স্থানে লোকে লোকারণ্য হয়। খরচও অসম্ভব। আমাদের বর্ত্তমান রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড এই সকল স্থানে প্রায়ই গিয়া থাকেন। তিনি যে হোটেলে থাকেন, সেটিও দেখিলাম। সমুদ্রের ধারে একটি উঁচু পাহাড়ের উপর অবস্থিত। ফরাসী জাতীয় লোকেরা তাঁহাকে যারপরনাই ভালবাসে ও শ্রদ্ধা-ভক্তি করে। ইংলণ্ডের সহিত ফরাসী দেশের যে চির-বিবাদ ছিল, তাহা ইঁহার রাজত্ব আরম্ভ হইবার পর হইতে মিটিয়া গিয়াছে। শুধু ফরাসী দেশের সঙ্গে কেন, এখন ইউরোপের সকল দেশের সহিতই ইংলণ্ডের সদ্ভাব। সুস্থ ও সবল দেহ মন লইয়া ইনি বেড়াইতে ভালবাসেন। রাজ্যে রাজ্যে বেড়াইয়া এইরূপ সদ্ভাব আনিয়াছেন। তাঁর দেশের ও অন্য সব দেশের লোকেরাও তাঁহাকে বড়ই ভালবাসে বলিয়া তিনি সর্ব্বজনপ্রিয় রাজা। তাই তাঁর অন্যতম নাম হইয়াছে—

“Edward the peace-maker”

অর্থাৎ—“সর্ব্বত্রে শান্তিস্থাপক রাজা এডওয়ার্ড”।

 প্রজার স্বেচ্ছাপ্রদত্ত এ উপাধি বড় সোজা উপাধি নয়। “Edward the Confessor” or “Richard Cour de Lion” অর্থাৎ ধার্ম্মিক এডওয়ার্ড বা সিংহের মত সাহসিক রিচার্ড, এ “শান্তিস্থাপক” পদবী হইতে বড় নয়। কেন না রাজ্য শাসনে শান্তির বাড়া জিনিষ নাই।

 সুয়েজ বন্দরের মত এ স্থানটিও একটি মহাপাপের স্থান। সকল বন্দরেই অল্প বিস্তর এইরূপ হইয়া থাকে। যেখানেই ধনবান্ বিলাসী মানুষ অনেক ধন লইয়া অস্থায়ীভাবে থাকে, সেইখানেই এইরূপ প্রবৃত্তি জাগে। আসিয়া ও ইউরোপের যত সুন্দরী স্ত্রীলোকেরা অর্থ উপায় করিতে এখানে আসেন। তাঁহাদের নিমিত্ত আলাহিদা বস্তি আছে। সেই স্থানে লাইসেন্স লইয়া থাকিতে হয়। সবাই একত্রে থাকেন। রাজ্যের স্বাস্থ্যরক্ষার ​জন্য তাঁহাদের নিয়মিত পরীক্ষার উপর রাখা হয়, এইটি একটি সুন্দর প্রথা। প্রতি হোটেলেও গুপ্তভাবে তাঁহারা যাতায়াত করেন এবং দালালের স্বরূপ তাঁহাদের অনেক গুপ্তচরও আছে, তাহারা অলক্ষিতে শীকার উদ্দেশে ঘুরিয়া বেড়ায়।