বিলাত ভ্রমণ (প্রথম ভাগ)/লোহিত সমুদ্র ও সুয়েজ বন্দর
লোহিত সমুদ্র ও সুয়েজ বন্দর।
এডেন বন্দর ছাড়িয়া কিছু দূর যাইলেই লোহিত সমুদ্রে পড়া যায়। সে স্থানটির কেন যে লোহিত সমুদ্র নাম হইল, তার কিছুই বুঝা যায় না। অন্য স্থানেরই মত সমুদ্র-জল নীল, তবে দুধারেই জমী নিকটে থাকায় একটু সবুজ মিশ্রিত নীল। মাঝে মাঝে ঈষৎ লাল এক রকম শেওলা জলে ভাসে, তাও বেশী নয়। এ ছাড়া আর কোনও কারণ দেখিলাম না।
এই শেওলাগুলিতে একটি অতি বিস্ময়জনক ঘটনা ঘটিয়া থাকে, তা অনেকেই জানেন না। অনেকগুলি লম্বা লম্বা দড়ির মত শেওলা একত্র মিলিয়াই ওই চাপ শেওলা হইয়াছে। প্রতি দড়িটি অনেকগুলি কোষ পাশাপাশি সন্নিবিষ্ট হইয়াই গঠিত। ওই এক একটি কোষ সজীব পদার্থ। তার প্রতিটির ভিতর কি একটি সজীব পদার্থ নড়িতে দেখা যায়। কোষের ভিতর হইতে হাত বাড়াইয়া তাহারা নিজেদের খাদ্যসামগ্রী ধরিয়া খায়। এবং অপর একটি কোষের সহিত মিলিত হইয়া সেই কোষটির গর্ভাধান ঘটায়। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এই সকল বিস্ময়কর পরিবর্ত্তন স্বচক্ষে দেখা যায়। প্রতি কোষ একা থাকিয়াও ভাগ হইতে পারে সত্য, কিন্তু (cell division) দুইটিতে মিলিত হইয়া যে নূতন কোষ হয়—সে আরও সুস্থ ও সতেজ হয়। তাই প্রকৃতির সর্ব্বত্রই এইরূপই নিয়ম।
চারিদিকে জমী থাকায় এ স্থানে সমুদ্র অন্যান্য সমুদ্র হইতে অনেক ধীর, যেন বড় পুকুরের মত। তাই জাহাজও বেশী দোলে না। আর আফ্রিকা ও আরব—উভয় দিকেই দারুণ উত্তপ্ত বালুময় মরুভূমি থাকায় স্থানটি বড়ই গরম। এই কারণে গরম কালে এখানে অনেক লোকের সর্দ্দিগর্ম্মী হয়। এই লোহিত সমুদ্রে তিন চারি দিন থাকিতে হয়।
জাহাজ যাইবার পক্ষে এ সমুদ্রটিও বড় ভয়ানক। জলে নিমজ্জিত পাহাড় আছে—তাহাতে জাহাজ লাগিলে সে জাহাজের আর রক্ষা নাই। তাই ঐ সকল বিপদ সঙ্কুল স্থানে আলোক স্তম্ভ নির্ম্মিত আছে। ভিন্ন ভিন্ন গতিতে নানা রঙের আলো ঘুরিয়া বিশেষ বিশেষ স্থান জানাইয়া দেয়। তার মধ্যে এক স্থানে কতকগুলি একত্র অবস্থিত পাহাড়ের নাম “সাত শিষ্য” (Seven apostle) আর এক স্থানের একটি অর্দ্ধ নিমজ্জিত পাহাড়ের নাম (Diadalus) “ডায়েডেলস্”, সবগুলিই ভয়ানক স্থান।
লোহিত সমুদ্র বেশী চওড়াও নয়। অনেক স্থলেই একদিককার বা অপর দিকের জমী ও পাহাড় দেখা যায়। অনেক স্থলে দুদিকেরই জমী দৃষ্টিগোচর হয়। ইহুদীরা যখন মিশর দেশ হইতে পলাইয়া আসিতেছিলেন, এই সকল অপ্রশস্ত স্থানের কোনও স্থান দিয়াই বোধ হয় তাঁহাদের যাইবার জন্য জলের মধ্য হইতে শুকনা পথ বাহির হইয়াছিল।
এই অল্প আয়তন স্থান দিয়া, এসিয়া হইতে ইউরোপ যাইবার অধিকাংশ জাহাজকেই যাইতে হয় বলিয়া এখানে অনেক জাহাজের সহিত দেখা হয়। সবাই তখন সকল কাজ ফেলিয়া এক দৃষ্টে পরস্পরকে দেখে—ও আনন্দের ধ্বনি তুলিয়া পরস্পরের শুভবার্ত্তা জানায়। পথে জাহাজ দেখিলেই তার নাম ধাম ও পথের খবর লইয়া পরবর্ত্তী বন্দরে গিয়া খবর দিতে সকল জাহাজই বাধ্য। এই নিয়ম থাকাতেই অকূল সমুদ্রে জাহাজের খবরাখবর হয়।
পুরাতন ভূগোল লেখক পণ্ডিত টলেমী আরব দেশকে নানা ভাগে বিভক্ত করিয়াছিলেন। যথা—“মরুময় আরব”, “প্রস্তরময় আরব,” ও “সুখের আরব”। চারিদিকের সমুদ্র ধারের জমীগুলি কতক বা উর্ব্বরাক্ষেত্র কতক বা প্রস্তরময় কিন্তু ভিতরকার সব অংশ মরুভূমি। এখানে অতি সামান্য বৃষ্টি পড়ে বলিয়া এই সমস্ত দেশে একটিও বড় নদী নাই।
পুরাতন ইতিহাসে এই সকল স্থান প্রসিদ্ধ স্থান ছিল। বাম ধারে “অবিসিনিয়া,” “নিউবিয়া” ও “মিশর।” যত দেশের পুরাতত্ত্ব জানা আছে, তার মধ্যে মিশর দেশই সর্ব্বাপেক্ষা পুরাতন। খৃষ্টপূর্ব্ব পাঁচ হাজার বৎসরের আগেও তাহাদের সভ্যতার খবর পাওয়া যায়। এই খানেই রাণী “ক্লিওপেট্রা”র রাজ্য ছিল। এইখানেই এখনও সেই সকল পুরাতন পিরামিড্ বর্ত্তমান আছে। আর ডান দিকে আরবদেশে মুসলমানধর্ম্মের সংস্থাপক মহম্মদের জন্ম। মক্কা ও মেদীনাই তাঁহার লীলাভূমি ছিল। সে সকল দেশ লোহিত সমুদ্রের খুব ধারে ধারে। সুয়েজে ঢুকিবার পথেই ডান দিকে “সাইনে পর্ব্বত”। এই পুণ্য ভূমিতেই “মোসেস্” প্রথমে ঈশ্বর কথিত দশটি আজ্ঞা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।
খৃষ্টধর্ম্মের উৎপত্তিস্থান “পেলেষ্টাইন” এখান হইতে কতক দূরে। মরুময় আরব দেশেই কেন যে এই দুইটি ধর্ম্মের উৎপত্তি হইয়াছিল, বুঝা যায় না। যেখানে গাছ পালা ফুল ফল ও জীবনের অন্যান্য ভোগ্যবস্তু কম, সেইখানেই কি ইহসংসারের উপর বিরাগ আপনিই আসে। তাহলে শস্য-শ্যামলা ভারতবর্ষেই বা কেন হিন্দুধর্ম্ম ও বুদ্ধধর্ম্মের আবির্ভাব হলো। সমস্ত পৃথিবীই হয় আরবদেশের নয় ভারতবর্ষের ধর্ম্মেই দীক্ষিত। অন্য কোথাওতো এমন ধর্ম্ম প্রচারকগণ জন্মেন নাই।
সুয়েজের কাছে যাইয়াই আবার সমুদ্র বিষম তরঙ্গময় হইয়া উঠিল। অতি তেজে হাওয়া বহিতে লাগিল। জাহাজ অত্যন্ত অস্থির হইল। সুতরাং সেদিন বৈকালে বন্দরে নোঙ্গর করিলেও কেহ তীরে নামিতে পারিলেন না, বা তীর হইতেও কেহ জাহাজে আসিতে পারিলেন না। কেবল আমরা জাহাজের উঁচু ডেকে দাঁড়াইয়া দুই ধারের বালুকাময় ও কাল কাল পাহাড়যুক্ত জমীর, ও বড় বড় তরঙ্গপূর্ণ সমুদ্রজলের, ও দূরস্থ সুয়েজ বন্দরের অপূর্ব্ব ভীষণ শোভা দেখিতে লাগিলাম।
সুয়েজ বন্দরটি অতি ছোট বন্দর। যে স্থানে সে দেশীয় লোকের বাস, সে স্থান এখান হইতে অনেক দূরে। গাধায় চড়িয়া যাইতে হয়, অন্য কোনও যান পাওয়া যায় না। বন্দরে সব পাথরের উচু উচু বাড়ীগুলি সমুদ্রের ধারে ধারে নির্ম্মিত; তাহার অধিকাংশই সওদাগরদের মাল রাখিবার গুদাম—বড় একটা লোকবাসের নহে। অনেক কল কারখানাও আছে। স্থানটি দুটি অংশে বিভক্ত। সুয়েজের খাল এই দুটির মধ্য দিয়া কাটা। তার উপর দিয়া এক চওড়া পাথরের প্রাচীর গাথা—ইহারই উপর সুয়েজের রেল চলে। এইখানেই বিলাতী মেল জাহাজ হইতে এই রেলে দেওয়া হয়—ও সেই রেলযোগে সুয়েজ খালের ধার দিয়া সে ডাক এলেকজান্দ্রায় পৌঁছায়, সেখান হইতে আবার জাহাজে করিয়া বৃন্দিসি বন্দরে যায়, আবার রেলযোগে ও ষ্টীমারে ইটালী ফ্রান্স ও ইংলিশ চ্যানেল পার হইয়া বিলাতে পৌঁছায়। সে সাত সমুদ্র তের নদীর পথ। এত দূর হইতেও ইংরেজ আসিয়া,—ত্রিশ কোটী লোককে শাসন করেন। এর কারণ কি? কারণ আর কিছুই নহে, তাঁহাদের বুদ্ধির বল, সুব্যবস্থা, ও সতত উন্নতির চেষ্টা। আর আমাদের নিশ্চেষ্ট হয়ে নানারূপ সূক্ষ্ম বিচার ও পরচর্চায় মূল্যবান্ সময় কাটান।
জাহাজ নোঙ্গর করিলে অনেক মিশরবাসী নানারূপ দেশী ও বিদেশী দ্রব্যাদি লইয়া জাহাজে বেচিতে আসিল। তারা আমাদের দেশের লোকের অপেক্ষা অনেক ঢেঙা, অনেক বলিষ্ঠ ও ফরসা রং বিশিষ্ট। তাহারা ঢলঢলে ইজেরের উপরে পা অবধি লম্বা একটি আলখেল্লা পরে। তাতে বেশ সুসভ্য ও সুশ্রী দেখায়। মাথায় একটি রঙ্গিন কাপড়ের পাগড়ী। আরব দেশের লোকেরা এইরূপই পোষাক করে। আমাদের অপেক্ষাও গরম দেশ, কিন্তু তবুও লম্বা সুসভ্য পোষাক পরা তাহাদের দেশের বিধি। আমাদের বাঙ্গালা দেশের কি স্ত্রী কি পুরুষ সকলেরই নিত্যকার পোষাক সম্বন্ধে অনেক কথা শিখিতে আছে। তাহারা অতিশয় বলিষ্ঠ; জিনিষ পত্র হাতে লইয়াই নৌকার মাস্তুল বহিয়া জাহাজে উঠিতে লাগিল। তাহাদের মুখের ভাব কিন্তু একটুও মধুর নহে। যেন তাতে কুবাসনা ও দস্যুবৃত্তি সর্ব্বদাই জাগিয়া আছে। আরব দস্যুর কথা তো সকলেই জানেন, তাহারা বড়ই ভয়ানক; উটে চড়িয়া পথে পথে ধনলুণ্ঠন, দল সংগ্রহ ও নরহত্যা করে। মিশরের রাণী ক্লিউপেট্রার চরিত্র হইতেই যেমন দেখা যায়—তাদের হাব ভাব এই হিসাবে বড়ই হীন।
আরব ও মিশরে জিনিষ পত্র ইউরোপবাসীরা প্রবাস হইতে বাড়ী ফিরিবার কালে বড়ই আদর করিয়া কেনে। আসিয়া আফ্রিকা এই সকল দেশই ইউরোপের খুব নিকটবর্ত্তী। মিশরেই কিন্তু কথায় কথায় তাঁহারা শীতকালে পরিবর্ত্তনে আসেন। যত কিছু পুরাতত্ত্ব মিশর লইয়াই গঠিত। অন্যান্য সকল পুরাতন দেশের সঙ্গে তুলনায় তারাই সর্ব্বাপেক্ষা পুরাতন জাতি বলিয়া সাব্যস্থ হইয়াছে। সেই খানেই অতি বিস্ময়কর পিরামিড আছে ও অন্যান্য নানা প্রকার প্রত্নতত্ত্বের স্থান। সেই কারণেই মিশর ও মিশরদেশীয় যা কিছুর এত আদর। বাড়ী ফিরিবার কালে সবাই বৈঠকখানা সাজাইবার ও বন্ধু বান্ধবদের উপহার দিবার জন্য এখানকার জিনিষপত্র কিনেন। আমিও কিছু কিছু কিনিয়াছি; যখনই সেগুলি দেখি সেই স্থানের ও সেই দেশের কথা অহরহ মনে পড়ে। এই সকল দ্রব্যের কতকগুলির সংক্ষেপে বর্ণনা করিতেছি।
বলা বাহুল্য মিশর একটি বিখ্যাত তামাকপাতা ও সিগারেটের দেশ। সেই সকল বহু পরিমাণে এখান হইতে রপ্তানি হয়। ছোট ছোট বাক্স করিয়া সেই সকল সিগারেটও জাহাজে বেচিতে আনে। সে কৌটাগুলির অনেকগুলির সামনে নগ্ন স্ত্রীমূর্ত্তি আঁকা। ছেলে বুড়া সবাই বাছিয়া বাছিয়া সেই কোঁটাগুলিই কিনে।
আর একটি কিনিবার জিনিষ—কাঁচ ও পলাকাটি নির্ম্মিত গলার হার। সেগুলিতে বহু রকমের রং বিন্যস্ত আছে। গলায় পর বা হাতে জড়িয়ে রাখ, অতি সুন্দর দেখায়। দেখিলেই কিনিতে ইচ্ছা হয়। যত রমণীর সেই দিকে আকর্ষণ—সেই দিকেই সর্ব্বাপেক্ষা জনতা। অনেকে অসম্ভব দাম দিয়া লইলেন। আর যে সকল পুরুষের ঘরেও হার পরাবার লোক আছেন, তাহারাও অনেকগুলি কিনিলেন। প্রথম এক জনা যে দামে নেন শেষে সে দাম কমিয়া কমিয়া সিকি হইল।
সুন্দর সুন্দর কার্পেটও পাওয়া যায়। তাতে নানারূপ ভাল ভাল মিশর দেশ ও সমাজের ছবি লেখা। তার অধিকাংশেই সোফায় বসিয়া গৃহস্বামী ধূম পান বা চা পান করছেন,আর সামনে নর্তকী নৃত্য করিতেছে। আবার কতকগুলিতে উটের গোল হাওদায় চড়িয়া কোমলদেহা পরদানসীন রমণীরা স্থানান্তরে যাইতেছেন—আর তাঁহাদের স্বামী নিজে উট চালাইয়া পদব্রজে যাইতেছেন। মিশর দেশের প্রায় সকল চিত্রপটেই স্ত্রীলোক, উট ও তাল গাছের চিত্র থাকে।
ছবি আঁকা পোষ্টকার্ড বিক্রয় এখানে একটি প্রসিদ্ধ লাভের ব্যবসা। এখানকার প্রত্নতত্ত্ব সম্বন্ধে যত জিনিষ আছে সবেরই সুন্দর সুন্দর ছবি বিক্রয় হয়। মরুভূমিতে পিরামিড্, ফিন্কস্, ও ভাঙ্গা দেবমন্দির ও অট্টালিকার নানারূপ মূর্ত্তি খোদিত দেওয়ালের ছবি আঁকা। আমি তার অনেক ছবি সঙ্গে আনিয়াছি; বারান্তরে বলিব।
আর একটি কিনিবার জিনিষ—সে দেশের দস্তার পদক। সেগুলিতে নানারূপ জীবজন্তুর মাথা বিশিষ্ট নরমূর্ত্তি বিভিন্ন ভাবে খোদিত আছে। সেগুলি সব সেই দেশেরই দেবতা।
শেষ যেটি কিনিলাম, পূর্ব্বে কিনিয়াও আবার কিনিলাম—সে কতকগুলি ছোট ছোট ফুলের খাতা। প্যালেষ্টাইনের ফুল বলিয়া অনেক খৃষ্টানেরা আগ্রহের সহিত কিনেন। একজন ভারতবর্ষেরই পাদরী মেম বিস্তর কিনিয়া নানা লোককে উপহার পাঠাইলেন, আমিও অনেকগুলি কিনিলাম। ছোট ফুলের এমন সৌন্দর্য্য কোথাও দেখি নাই। খাতাখানি এত ছোট যে বুকের পকেটে রাখা চলে। আর খুলিয়া দেখিলেই মোটা পাতে আলো করা পুণ্যভূমির সেই ফুলগুলি দেখা যায়। পাতলা পাতা দিয়া চাপা। কি দিয়া যে ফুলের মত এত সুন্দর এত নশ্বর জিনিষকে এমন করিয়া ঠিক রাখিয়াছে, তাহা জানি না। মনুষ্য দেহ তো এমন করিয়া রাখা যায় না। কিন্তু এ ফুলগুলি এমন সুরক্ষিত যে, এক বৎসর পরে এখনও খুলিলে যেন সদ্য তাজা মনে হয়—ও ফুলপ্রিয় একজনের মধুর স্মৃতি মনে জাগাইয়া প্রাণ আনন্দে মাতাইয়া তুলে।