বিষয়বস্তুতে চলুন

বিলাত ভ্রমণ (প্রথম ভাগ)/সুয়েজের খাল

​

সুয়েজের খাল।

 সন্ধ্যার সময় আমরা সুয়েজখালে ঢুকিলাম। তখন অন্ধকার হইয়াছে—তাই কেবল ক্ষীণ দীপালোকে আলোকিত চতুর্দ্দিকের দৃশ্য অস্পষ্ট ভাবে দেখা গেলমাত্র; ভাল করিয়া তেমন বুঝা গেল না।

 জাহাজ দিনরাতই চলে, তবে সুয়েজখালে অতি আস্তে আস্তে গিয়া থাকে, তার কারণ অপ্রশস্ত খালের দুই ধারই বালুময়। জোরে জাহাজ চালাইলে জলের বেশী আন্দোলনে দুই ধারের বালু পাছে ঝরিয়া যায়, এই আশঙ্কা। খালটি স্থানে স্থানে অতি অপ্রশস্ত ও অনতিগভীর। অনেক স্থানে এমন কি দুটি জাহাজ পাশাপাশি যাইতে পারে না। বড় জাহাজ বা চওড়া জাহাজ যে অনেক জল ভাঙ্গে সে সব জাহাজও এখান দিয়া আসিতে পারে না। তাই রুষ-জাপান যুদ্ধে এডমিরাল রুডোভিনস্কির জাহাজ “কেপ্ অব্ গুড্‌হোপ” ঘুরাইয়া আনিতে হইল। মাঝে মাঝে কতক বিস্তীর্ণ লোণা জলের হ্রদ আছে, খাল সেইগুলির সহিতই সংযুক্ত। একটি জাহাজ সেইখানে দাঁড়াইলে, অপরটি পাশ কাটাইয়া যায়। খালেও অপর এমন সকল স্থান আছে যেখানে পাশাপাশি যাইতে পারে। এখন অল্প অল্প করিয়া কাটিয়া খাল চওড়া করা হইতেছে।

 খালটি ১০০ মাইল লম্বা, তবে জাহাজ অত আস্তে যায় বলিয়া পার হইতে প্রায় দুইদিন লাগে। অল্প গভীর ও অল্প প্রশস্ত এই খালে জাহাজ ঢুকিলেই জলগুলি উপচাইয়া ধারের বালুর উপর উঠিয়া ফেনাইতে ফেনাইতে বাণডাকার মত ছুটে; তাতেই দেখা যায়— অনেক বালু ঝরিয়া পড়িতেছে, তাই এখন ধরেে ধারে ইটের ছোট প্রাচীরে বাঁধান হইতেছে। লোকজন খাল পরিষ্কার রাখিবার জন্য অনবরত মজুত আছে। তারা সব ​সেই দেশেরই লোক—কাল যণ্ডা ও নীল আলখাল্লা পরা। উটের পিঠে করিয়া কাটা বালি বোঝাই করিয়া দূরে ফেলিতেছে।

 এস্থানে এমন মরুভূমির স্থান যে, দুইধারে বালুময় মাঠ বই আর কিছুই দেখা যায় না। অনেক স্থানেই গাছপালার চিহ্নও নাই। এমন কি একটু শেওলা বা পানা বা ঘাসও দেখা যায় না। তবে আজকাল একরূপ অনেক শিকড়বিশিষ্ট লতান গাছ রোপণ করা হইতেছে। সে গাছগুলি পুরীর সমুদ্রধারের বালুময় স্থানগুলিতে বালু উড়া বন্ধ করিবার জন্য বিস্তর দেওয়া আছে—দেখা যায়। “কনভলভুলস্” শ্রেণীর গাছ। এক স্থান হইতে অল্পদিনেই চারিদিকে লতাইয়া জমিতে ঘন ঘন শিকড় চালায়—ও যত শুক্‌না জমি হউক না কেন তা হইতে রস শুষিয়া জীবন ধারণ করে। অতি অল্প দিনেই চারিদিকে ছড়াইয়া পড়াতে—ও অনেক স্থানে শিকড় আছে বলিয়া—এক স্থান মরিলেই অপর স্থান মরে না। আর প্রতি শিকড়গুলি অনেকগুলি বালুকে একত্র করিয়া রাখে, তাই বালিও ভাঙ্গে না। এইরূপ নানা সুবিধার জন্য এই গাছই এরূপ স্থানে এত উপকারী। যেমন ধান গম আমাদের খাদ্য জোগায় ও বাঁশ খড় শাল সেগুন আমাদের ঘর বাঁধিয়া দেয়, এবং কার্পাস শিমুল আমাদের বস্ত্র আনে,তেমনি এই সকল গাছও স্থান বিশেষে এত কাজে লাগে। সকল জিনিষেরই এমনি উপকারিতা আছে, বিজ্ঞানের সাহায্যে মানববুদ্ধি সেইগুলিকে অনুসন্ধান করিয়া নিজের কাজে লাগাইতেছে। যে এইরূপে প্রকৃতির বিভিন্ন দ্রব্যগুলিকে ও শক্তি সমূহকে বুদ্ধিবলে আপন কাজে লাগাইতে পারে সেই জয়ী—সেই কৃতকার্য্য—সেই রাজা।

 অমন স্থানে কিনারায় থাকিবার তো জায়গা নাই; তাই জলের উপরেই একরূপ দোতালা বাড়ীর মত বোট আছে, সেইখানে কর্ম্মচারীরা থাকে। তবে মাঝে মাঝে সুন্দর সুন্দর ইষ্টিসনও দেখা যায়। জলের ধারেই নূতন বাংলা গাঁথা। সেগুলি অতি সুন্দর স্থান। ভীষণ স্থানের ​পাশে থাকিয়া আরও সুন্দর হইয়াছে। সেখানে অনেক গাছ পালা দেখা যায়। ওদিককার প্রসিদ্ধ ঘন পাতাযুক্ত খেজুর গাছ তো আছেই তা ছাড়া বিস্তর ফুল গাছও দেখা যায়। কর্ম্মচারীরা অতি যত্ন করিয়া টবে করিয়া সেগুলিকে রক্ষা করে। অনেকগুলিতে ফুল ফুটা ছিল—দেখে চোখ জুড়াল। লোক অতি কম—তবে অনেকগুলি সে দেশীয় ছেলেদের খেলা করিতে দেখিলাম। অন্য দেশের ছেলের মত তারাও মরুভূমির মাঝে নেচে হেসে খেলা করচে। আবরু প্রথা সকল মুসলমান দেশেই এত প্রচলিত বলিয়া, এ সকল স্থানে স্ত্রীলোক বড় একটা দেখা যায় না, তাই এ সকল স্থান আরও ভীষণ মরুভূমি বলিয়া মনে হয়। তবে একটি স্থানে দুটি আরব রমণী দেখিলাম। তার মধ্যে একজন অর্দ্ধাবগুণ্ঠিতা, আর এক স্থানে একটি অতি সুন্দর দৃশ্য দেখিলাম—ফরসা ইউরোপীয় রং বিশিষ্ট ও আরবের মুখশ্রী লইয়া একটি শিশু তীরে দাঁড়াইয়া ছিল। দুটি জাতির মাধুর্য্যের একত্র সমাবেশ—কি সুন্দর হইয়াছে—এইরূপ সুন্দর দৃশ্য আমি চীনেও দেখিয়াছি। সমাজের কঠিন নিয়ম তুচ্ছ করিয়া এ মরুভূমেও মানবপ্রকৃতি আপনার আধিপত্য দেখাইয়াছে।

 এই সকল দেশ একরূপ ভোজবাজীর দেশ, চারি পাশে মরুভূমির বালুর উপর সব ছায়া দেখা যায়। যেন জলেরই প্রতিবিম্ব। একেই মিরাজ বা “মরীচিকা” বলে। মরুভূমির তপ্ত বালুর উপরকার বালুস্তর বিভিন্ন রূপে উত্তপ্ত হইয়া এইরূপ ছবি দেখায়। ইহাই “মৃগতৃষ্ণা”, এইরূপ প্রতিবিম্বকেই জল হইতে প্রতিবিম্ব মনে করিয়া শুষ্ককণ্ঠ মৃগ চারিদিনে জলপান আশায় ছুটে। প্রতি দিনকার মানব হৃদয়েরই অতৃপ্ত বাসনার সঙ্গে তার অনেক সৌসাদৃশ্য আছে।

 উটগুলি এই মরুভূমিরই জন্তু; এই মরুভূমিতে থাকিবার উপযুক্ত করিয়াই তারা সৃষ্ট হইয়াছে। তপ্ত বালুর উপর বেড়াইবার জন্য পায়ের তলাগুলি চেপ্টা ও নরম। সে স্থানের হাওয়া উত্তপ্ত বালুকণামিশ্রিত ​বলিয়া—তাদের চোখ নাক ও কানের জন্য চামড়ার আবরণ আছে, টানিয়া দিয়া বন্ধ করা যায়। দাঁতগুলি মরুভূমির দগ্ধ শুক্‌না ও শক্ত ঘাস উপড়াইয়া খাইবার অনুরূপ। নীচে পাটীর সামনের চেপ্টা দাঁতের উপর—শক্ত মাড়ীর স্তর। পিটে উচু কুব্জের মত থাকে—সেগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোষদ্বারা গঠিত। অনেক দিন মরুভূমে খাদ্য ও জলহীন হইয়া থাকিতে হয় বলিয়া এই সকলের ভিতর উট জল পান করিয়া ও আহার করিয়া জল ও খাদ্য রস ভরিয়া রাখে। এই গুলি হইতে সার রস শোষণ করিয়া বহুদিন ধরিয়া উপবাসী উট মরুভূমে বাঁচিয়া থাকে। বীজের ভিতর যেমন শস্য ভ্রুণের আহার্য্য থাকে এ সকল জীবও আহার সঙ্গে রাখিয়াই বাঁচিয়া থাকে।

 বোঝাই লইবার কালে উট আপনিই বসে, ও বাঁশি বাজাইলে চলিয়া যায়। এ সকল দেশে উষ্ট্রই গৃহ পালিত পশু। আমাদের দেশের গরুর মত কত উপকারে লাগে। মোট বয়, দুধ দেয়, ও শরীরের মাংস দিয়া আরব দেশের লোককে খাওয়ায়। তার আর একটী আদরের নাম “Ship of the desert” অর্থাৎ মরুভূমির জাহাজ। দলে দলে সুশিক্ষিত এই সকল উট ইঙ্গিতে মানবের হিতকর এই সকল কার্য্য করিতেছে দেখিলে এক অপূর্ব্ব ভাব মনে আসে।

 এ ছাড়া কতকগুলি মিউল বা অশ্বতরও দেখিলাম। সেগুলি গাধা ও ঘোড়ায় দো-আসলা জাতি। খর্ব্বাকৃতি কিন্তু বড়ই কষ্টসহিষ্ণু। দো-আসলা জাতির এই গুণ চিরপ্রসিদ্ধ। তাহারা মরিয়াও মরে না—অতি হীন অবস্থায় জীবন রক্ষা করিতে পারে। যে দুইটী জাতি মিশ্রিত হইয়া তাহারা হইয়াছে সেই দুটি জাতিরই কষ্ট সহিবার ক্ষমতা লইয়া জন্মায়। তাই তারা এত কর্ম্মঠ। তাই প্রকারান্তরে পশুপালকেরা পশুর শক্তি ও ক্ষমতা জন্মাইবার জন্য এইরূপ নিয়মের সময়ে সময়ে সাহায্য লয়। অশ্বতরেও বিশেষ উপকারিতা এই কারণে এরূপ পশুর দোষ এই যে ইহারা ফলবান হয় না—অর্থাৎ ইহাদের বংশরক্ষা করিবার ক্ষমতা নাই।

​ এ ছাড়া আরব দেশে সুন্দর সুন্দর ঘোড়া আছে—সে ঘোড়া পৃথিবীর সকল স্থানে আদরণীয়। তাহারই সঙ্গে দো-আসলা করিয়া পৃথিবীর অনেক শ্রেণীর ভাল ভাল ঘোড়া হইয়াছে। আরব ঘোড়া কত বুদ্ধিমান্ কত প্রভুভক্ত। তার অনেক দৃষ্টান্ত সকলেই জানেন। প্রভুর কাজে তারা মরিতেও কুণ্ঠিত হয় না।

 এই জায়গায় এক স্থানে একটি আরবদেশের ফকিরকে দেখিয়াছিলাম। তাদের “সুফী” বলে। তারা অনেকটা আমাদের দেশের সাধুদেরই মত। বেদান্তের মত মত ও খিষ্টিকদের মত ধর্ম্ম বিশ্বাস। আসন-পিড়িতে বসিয়া ধ্যান করে। তাদের কথা বারান্তরে বলিব।

 গেল বারের আরব দস্যুর ছবিতে যে দস্যুদের প্রতিমূর্ত্তি দেখান হইয়াছে তারা সব “বুডিন” জাতীয় আরব। দস্যুবৃত্তিই তাদের অধিকাংশ লোকের পেশা। ইহারা আরবের সেনা স্থানে থাকিয়া কঠিন পরিশ্রম করে বলিয়া ইহাদের শরীর বড়ই পটু ও মাংসপেশী শক্ত ও দৃঢ়। মুসলমান ধর্ম্মের সংস্থাপক মহম্মদ এই জাতীয় ধাত্রীর হাতেই লালিত পালিত হন। তাঁহার মাতা ছেলেকে সবল ও সুস্থ করিবার জন্য তখনকার প্রথা অনুসারে বুডিন জাতীয়া এক ধাত্রীর হাতে তাহার লালন পালন ভার দিয়াছিলেন। পাঁচ বৎসর পরে যখন ধাত্রী ছেলেকে ফিরাইয়া দিতে আসিল মা ছোট ছেলের দৃঢ় গঠন দেখিয়া তাহাকে আরও দৃঢ় করিবার মানসে ধাত্রীকে ছেলে ফিরাইয়া পূর্ব্বস্থানে লইয়া যাইতে বলিলেন। এমন মা ও এমন ধাত্রী ছিল বলিয়াই মহম্মদ এমন কর্ম্মবীর হইয়াছিলেন। এই বুড়িন জাতীয় আরবেরা অতি সুপুরুষ ও বন্দরে ও এই সকল স্থানে অনেক দেখা যায়।

 এই খালের এক প্রান্তে যেমন সুয়েজ—তেমনি অপর প্রান্তে “সৈয়েদ্” বন্দর বর্ত্তমান; আর এ দুইয়ের মাঝে অর্থাৎ কেনালের অর্দ্ধ পথে ইসলামিয়া সহর অবস্থিত। এ স্থানটি ছোট ও দেখিতে যেন ছবির মত, ​একটি লোনা হ্রদের উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু স্বাস্থ্যের পক্ষে এমন কদর্য্য স্থান আর ছিল না। ম্যালেরিয়া প্রভৃতি কীটাণুজ রোগের এত প্রাদুর্ভাব ছিল যে ইউরোপবাসী যে এখানে আসিত সেই মরিত। অথচ স্থানটি ব্যবসা বাণিজ্যের পক্ষে বড়ই সুবিধাজনক। কোনওরূপে দাঁড় করান চাই। এইরূপ স্বার্থের চেষ্টায় প্রণোদিত হইয়া কতরূপ পরীক্ষাই চলিতে লাগিল। এই সময়েই “রসেব” (Mosquito malaria theory) মশাও ম্যালেরিয়া রোগের সহিত যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আছে সেই আবিষ্কার প্রচার হয়। মশা কামড়েই এক রোগী হইতে অপর রোগীতে ম্যালেরিয়া রোগ যায়। অতএব মশা হনন করিলেই সে রোগ থামিবে। এখন মশা মারা তো সোজা নয়। কি করে মশাকে নির্ব্বংশ করা যায়, এই অনুসন্ধান করিতে করিতে জানা গেল যে মশার বীজ প্রথমে জলে থাকে তাই জল জমা বন্ধ করিয়া ও জলের উপর কেরাসীন্ তেল ঢালিয়া আগুন দিয়া মশার বীজ মারাতে এখন ম্যালেরিয়া এখানে অনেক কমিয়াছে। এমন মারীভয় ছিল বলিয়া সেখানে কেহ যাইতে চাহিত না। জমির দাম ছিল না। কতক স্বাস্থ্যকর হওয়াতে এখন তাহার কত দাম বাড়িয়াছে।

 বুদ্ধি বলে মানুষ কিনা করিতে পারে? সেই বুদ্ধির সাহায্যে ক্ষুদ্র মানব প্রকৃতির বিশাল রাজ্যে দিন দিন কিরূপ ক্ষমতা বিস্তার করিতেছে। সাগর বাঁধিয়াছে, পাহাড় কাটিয়া সুরঙ্গ করিয়া পথ করিয়াছে, জলস্রোত হাওয়া তার ভৃত্যের মত কাজ করে, আর স্বয়ং অগ্নি কল চালাইয়া তাকে সাহায্য করে; এমন ব্রহ্মাণ্ড প্রসারী মহতী মানববুদ্ধিকে আমি শতবার নমস্কার করি।