বিলাত ভ্রমণ (প্রথম ভাগ)/সৈয়দ বন্দর
সৈয়দ বন্দর।
দুই দিন ক্রমাগত যাওয়ার পর তৃতীয় দিন সন্ধ্যাবেলা সৈয়দবন্দর দেখা গেল। আরবের মরুভূমির একপ্রান্তে ভূমধ্যস্থসাগর ও সুয়েজ খালের সঙ্গম স্থলে সেই ছোট নূতন বন্দরটি অবস্থিত। খোলা স্থান ও মরুভূমির দেশ কিনা, তাই বহুদূর হইতে দূরের জিনিষ দেখা যায়। বন্দরের নূতন উচু উচু বাড়ীগুলি ও সব কল কারখানা, আকাশে চূড়া তুলিয়া পাশাপাশি দাঁড়াইয়া আছে। বন্দরে অসংখ্য নানাজাতীয় জাহাজের ভিড়। উচ্চ আলোকস্তম্ভ হইতে একটি প্রখর আলো চারিদিক জুড়িয়া সব জাহাজগুলিকে পর্য্যবেক্ষণ করিতেছে।
প্রবেশ করিয়াই বড় বড় থাম ও গম্বুজযুক্ত কষ্টম হাউসের বাড়ীটি প্রথমেই দেখা গেল। ইউরোপ ও এসিয়ার মধ্যে এই স্থানটিই এখন সঙ্গম স্থল হইয়াছে বলিয়া এখানে সকল বিষয়েই কড়াকড়ি। তার উপর আবার এস্থলে নানাজাতীয় লোকের একত্র বাস ও ক্ষমতা বিস্তর। ফরাসী জাতিরাই প্রথমে সুয়েজ খাল কাটেন ও এই বন্দরটি নির্ম্মাণ করেন। কিন্তু এটি তুর্কীর সুলতানের এলাকাভুক্ত। আবার উভয়ের ক্ষমতাকে অতিক্রম করিয়া ইংরেজই এখানে প্রবল। অনেক গ্রীক ও ইতালী দেশের লোক এখানে ব্যবসা বাণিজ্য করে। তবে মিশর দেশের অধিবাসীরাই অধিকাংশ কর্ম্মচারীর কাজ করে। বলা বাহুল্য, সকল বিষয়েই তত্ত্বাবধানের ভার ইংরেজেরই হাতে ন্যস্ত।
জাহাজ নঙ্গর করিবামাত্রই ডাক আসে ও টাকা ভাঙ্গাইবার ও জিনিষ পত্র বেচিবার জন্য লোক আসে। ভিন্ন ভিন্ন এজেণ্ট আফিসের দালালেরা আসিয়া যাত্রীদের উঠানাবা কার্য্যে সাহায্য করিতে সচেষ্ট হইয়া ঘুরে। দোকানদারদের ও হোটেলের লোকেরা কার্ড দিয়া দিয়া একবার যাইয়া তাদের দোকানপশার দেখিতে অনুনয় করে। তাহারা যে কত রকমের ভাষা জানে, তার অন্ত নাই। একজনের সঙ্গে ফরাসী ভাষায় কথা কহিয়াই অপর একজনের সঙ্গে তুর্কীতে কথা কহিল। অধিকাংশ লোকই ইংরেজী বুঝে, যদিও পূর্ব্বোক্ত দুইটি ভাষাই বেশী প্রচলিত। তাহাদের অনেকে হিন্দিও জানে। আমাদের কালো মুর্ত্তি দেখিয়া দেশ চিনিয়া বলে,—“কই জাগ্যা দেখনেকো যাইয়ে গা।” এ কথাটির মানে অনেক। সব শুনিয়া কাজ নাই। খবরের কাগজ ওয়ালারাও কাগজ বেচিতে আসে।
সে দেশের বিশেষ কিনিবার দ্রব্যসামগ্রীগুলি সব সুয়েজেরই মত। সেই মিশরের প্রত্নতত্ত্বের ছাপাবিশিষ্ট পোষ্টকার্ড, সুগন্ধ মধুর সিগারেট, বস্ত্রবক্ষে ছবি আঁকা কার্পেট্, কাঁচ ও প্রবালের হাড়, মিশরের জন্তুদেহবিশিষ্ট দেবমূর্ত্তির পদক, আর সেই ছোট ছোট ফুলের খাতা। সেগুলি এমন মনোহর যে ইচ্ছা হ’ল সিন্দুকে ভরিয়া লইয়া গিয়া দেশে আপনার লোকদের দিই। আবার কিনিলাম, আর বহুক্ষণ হাতে করিয়া তার সুন্দর রঙ্গবেরঙ্গের উজ্জ্বল রেখাগুলি অনিমেষে দেখিতে লাগিলাম। ফুলের স্বভাবজাত সুগন্ধ তখনও তাতে ভরা।
প্রতি বন্দরে বন্দরে লোক বা মালপত্র নামাইবার আগে বন্দরের ডাক্তার আসিয়া লোকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে। তখন নাম অনুসারে সবাইকে সার দিয়া দাঁড়াইতে হয়; আর তিনি দেখিয়া যান। জাহাজের উপর এ সব নিয়ম ঠিক যুদ্ধক্ষেত্রেরই মত কড়া। প্লেগ প্রভৃতি রোগ এক দেশ হইতে পাছে অন্য দেশে কেহ লইয়া যায়, এই আশঙ্কায় এত কড়া ব্যবস্থা। আর অত লোকের একত্র পরীক্ষার এতটা সুনিয়ম থাকায় এত অল্প সময়ের মধ্যে এত কাজ সমাধা হয়। ইহা দেখিলে, সুনিয়ম ও সুব্যবস্থার, কার্য্যের অল্পকালের মধ্যে সম্পাদন ও সিদ্ধি সম্বন্ধে কত যে প্রয়োজনীয়তা তা বুঝা যায়। ইউরোপের সকল জাতির ভিতর এইরূপ সুব্যবস্থা আছে; আমাদেরই নাই তাই আমরা অব্যবস্থিত ও হীনবল।
মিশরের একজন গণৎকার আসিয়া লোকের ভাগ্য গণনা করিল। সবাই তাহাকে হাত দেখাইবার জন্য ব্যস্ত; তার অধিকাংশই অল্পবয়সী রমণী। কতক্ষণ পরে হাসিতে হাসিতে এক সুহাসিনী তাঁর হাত বাড়াইলেন। গণক বলিল,—“বাঁ হাত দেখাও।”—“আমাকে কেহ কি ভালবাসে”? এই কথার উত্তরে গণক বলিল,—‘অন্ততঃ ছয় জন তোমার প্রণয়ার্থী।’ তিনি তাহাকে একটি শিলিং দিলেন। আর এক যুবা সওদাগর হাত দেখাইলে গণক বলিল—“তোমার মালপত্র সব অগ্নিতে ভস্মসাৎ হইবে।” তিনি তাহাকে কিছুই দিলেন না। আর একজন ম্লানমুখী রমণীকে গণক বলিল—“তোমার প্রিয়জন অন্য রমণীতে অনুরক্ত”—তাঁর মুখ আরও বিষণ্ণ হইল।
একজন বাজীকর আসিয়া বাজী দেখাইল। এক সাহেবের ও এক মেমের নিকট হইতে এক একটি আংটী লইয়া গিলিয়া ফেলিল, পরে সেই আংটা দুইটি আবার তাহাদেরই আঙ্গুলে দেখা গেল—বদলা বদলী হইয়াছে। আর অমনি হাসির রোল।
নীচে জলের উপর ছোট বোটে করিয়া দুইটি ইটালীয় বালিকা ও দুইটি পুরুষ সেতার বেহালা ও ব্যান্জো বাজাইয়া গান শুনাইতে আসিল। যাত্রীরা তাহাদের মধুর গানে মুগ্ধ হইয়া জাহাজের উপর হইতেই তাহাদের ছোট ছোট রৌপ্যমুদ্রা ছুড়িয়া দিতে লাগিল। তাহারা ছাতা খুলিয়া সেইগুলি ধরিতে লাগিল, কিন্তু অনেকগুলি জলে পড়িয়া লোকসান হইল। তাহারা প্রায় আমাদেরই মত কালো। সাহেবদের ও মেমদের মত পোষাক পরা ও আমাদের দেশের মত কাল ঝাকড়া ঝাকড়া চুলবিশিষ্ট। আর সে মেয়ে দুটি কি ঠিক আমাদের বাঙ্গালী মেয়ের মত—তেমনি বড় বড় ভাব মাখান চোখ, তেমনি মুখের মধুর ভাব। ইংরাজ প্রভৃতি ইউরোপিয়ানদের রমণীর মত উজ্জ্বল বর্ণও নহে বা মুখের অমন স্বাধীন প্রদৃপ্ত ভাবও নহে। আর তাদের গানগুলিও অতি মধুর আমাদেরই গানের মত ভাবাতিশয্যে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ও কাঁপান সুর গিট্কিরী ও গমকবিশিষ্ট। ইংরেজী গানের মত নির্লিপ্ত ও সোজা সোজা সুর নয়। সুরগুলি পরস্পরের সহিত কোলাকুলি করে—গাহিতে গাহিতে গায়কের ও শ্রোতার মুখের ভাব পরিবর্ত্তন হয় ও চোখে জল আসে। আর সে যন্ত্রের সঙ্গীতগুলিও কি মধুর ও সুশ্রাব্য। সবগুলিই তারের যন্ত্র, একটিও বাঁশী বা কোনওরূপ বায়ুযন্ত্র নাই। তারের যন্ত্রগুলির আওয়াজ স্বভাবত আরও নরম ও কোমল এবং চুপে চুপে কথা ও গুমরে কাঁদার মত অস্পষ্ট। বাঁশীর স্বর উচ্চ ও আকুলতা মাখা। রমণী হৃদয়ের মত অস্ফুট ভাবমাখা বলিয়া স্ত্রীকণ্ঠের সহিত গাহিতে পূর্ব্বটি আরও উপযুক্ত হয়। স্বর যত অনুচ্চ হয় ততই মধুর। তাই প্রতিধ্বনির অস্পষ্ট রব ও হৃদয়ের ভিতরকার নিস্তব্ধ সঙ্গীতকল্পনার বিপুল বিস্তার সহায়তা করে বলিয়া সর্ব্বাপেক্ষা মধুর।