বিষয়বস্তুতে চলুন

বিলাত ভ্রমণ (প্রথম ভাগ)/স্যৈয়দ্‌ বন্দর

​

স্যৈয়দ্ বন্দর।

 জাহাজ হইতে কিনারা অতি সন্নিকট। কিন্তু সেই অল্প পথই নৌকায় করিয়া নামিতে হয়। তার ভাড়াও অনেক; এমন ভাড়া কোথাও দেখি নাই। দিনের বেলা প্রতি জনা পিছু তিন আনা লাগে আর রাত্রি বেলা ছয় আনা। পূর্ব্বে নাকি আরও বেশী ছিল। সুলতানের আমলে যা চাহিত তাই দিতে হইত। মাঝিরা নাকি নৌকা আধ পথে লইয়া গিয়া আর যাইব না বলিয়া, ভয় দেখাইয়া বেশী ভাড়া আদায় করিত। এখন ইংরেজের শাসন আমলে সবই নিয়মে বাঁধা।

 নামিবামাত্র একজন তুরস্কদেশীয় ভদ্রলোক হাত বাড়াইয়া আমাদিগকে উপরে উঠাইয়া লইল এবং বলিল—“আপনারা কি স্থানটি দেখিতে ইচ্ছা করেন? আমি একজনা প্রদর্শক। আমাকে দু-সিলিং দিলেই আমি আপনাদের সব স্থান দেখাইয়া আনিব।” আমরা সম্মত হইয়া একখানি ভাড়া ফিটন্‌ লইয়া দেশ দেখিতে চলিলাম। ফিটন্‌ খানি রবার টায়ার দেওয়া ও প্রতি ঘণ্টায় তার দুই শিলিং ভাড়া।

 সহরটি নূতন, রাস্তাগুলি চওড়া। বাড়িগুলি সারি সারি গাঁথা; তার নীচেতলা সবই দোকান। দোকানগুলি অতি সুসজ্জিত এবং দেশীয় ও বিদেশীয়; তাতে নানারূপ জিনিষ বিক্রয় হয়। অধিকাংশ দোকান ফরাসী জাতীর বা মুসলমানের হাতে। ইংরেজের হাতে অল্পই আছে। সবাই ফরাসী ভাষা কয়। অষ্ট্রীচ্-পালক, ইজিপ্‌টের প্রত্নতত্ত্বের ছবি, নানারূপ পরিধেয় দ্রব্য সামগ্রী ইত্যাদি। বড় রাস্তার ধারে ধারে ও সমুদ্রের তীরে বাঁধা রাস্তার উপর অনেক মদের দোকান। তাকে ফরাসী ভাষায় ‘কাফি’ বলে। অর্থাৎ সেইখানে মদ “কাফি-চা” ইত্যাদি পাওয়া যায়।

 এ দেশের কাফি অতি বিখ্যাত। ছোট পেয়ালা করিয়া দুধ চিনি ​বিহীন কাফি পান করা হয়; আর তার সঙ্গে মদ। অনেকগুলি বেকার বদমায়েস্ সেইখানে বসিয়া দিন রাত আড্ডা দেয়। সুবিধা পাইলে লোকদের ঠকায়। অনেকগুলি ইটালিয় বালিকা এখানে থাকিয়া—কনসট্ বাজাইয়া ও গান গাহিয়া লোকদের মনোরঞ্জন করে। সেটি একটি এখানকার প্রধান আকর্ষণ। কারে প্রকারে অনেক লোক দুষ্ট লোকের প্ররোচনার ফাঁদে পড়িয়া যান। নিকটেই জুয়া খেলা হচ্চে। অনিচ্ছুক বিদেশী হয় ত অনেক আপত্তির পর রাজী হইয়া এক দান খেলিলেন। বিস্তর জিত হইল; আবার খেলিলেন,—আবার জিত হইল। নেশা চড়িতে চড়িতে এত প্রবল হইয়া উঠিল যে, শেষে সর্ব্বস্ব সেই খানে দিয়া জাহাজে ফিরিয়া আসিলেন।

 হয় তো একজন সুবেশী ছোট ছেলে এসে বল্লে—“মহাশয়, গান শুনবেন তো আমার সঙ্গে আসুন।” যদি কোনও মূঢ় তাদের সঙ্গে যায়, তো নিমেষে কুট্‌কচালে পথ দিয়ে এমন স্থানে নিয়ে গিয়ে ফেলে, যেখান থেকে ইজ্জত নিয়ে ফিরে আসা দায়। হয়ত সে বাড়ির সিড়ির পংক্তিগুলি সরু, অন্ধকার ও আকা-বাঁকা। তার উপরে সুসজ্জিত বড় বড় আয়না বিশিষ্ট ও নানারূপ চিত্তবিকারী ছবি দিয়ে সাজান প্রকোষ্ঠ। আলবোলায় তাওয়া দিয়ে তামাক সাজা; আতর দানে আতর প্রভৃতি দেখা যায়। নূতন মখমলের সোফার উপর বসিয়া কেহ হয় ত অনন্য ভাবে ধূমপান করিতেছেন। সেই খানেই আবার কত রকমের তাস্ ও ছবি বিক্রয় হয়,—তা অমনি দেখিলে এক রকম; আবার রোদে দেখিলে আর এক রকম। ইত্যাদি নানারূপ বিপদ-সঙ্কুল স্থানে সে বন্দরটি পরিপূর্ণ।

 যেমন করে থাকি, প্রথমেই পোষ্টাপিসে গেলাম। সেখানে ইজিপটিও ষ্ট্যাম্পই প্রচলিত—তার দাম একপেনীর কিছু উপর। অন্যান্য দেশের ও ষ্ট্যাম্প পাওয়া যায়; সে আরও দাম। প্রতি বিভিন্ন দেশের ষ্ট্যাম্প লইয়া ​সেই দেশেরই পোষ্ট বাক্সে ফেলিতে হয়। অঙ্গের অন্য দেশের বাক্সে ভুলিয়া দিলেও চিঠি পৌঁছাবে। তবে সেখানে দুনা দাম দিয়া লইতে হইবে। ঠিক এইরূপ চীন দেশের এময় সহরেও দেখিয়াছি। যেখানেই বিভিন্ন জাতির পাঁচ জনের একত্র ক্ষমতা বিস্তার, সেখানেই এইরূপ হইয়া থাকে।

 পূর্ব্বেই বলিয়াছি, এ সকল আব্রুর দেশে রাস্তায় প্রায়ই স্ত্রীলোক দেখা যায় না। যে দুই একটি দেখা যায়, তাহাদের মুখের নীচেটি ঘোমটায় আবৃত। আমাদের দেশের ঘোমটায় চোখ ঢাকা থাকে বলিয়া হুচট খাওয়ার ভয়। তাদের মুখের নীচে ঢাকা কিন্তু চোখ খোলা। সে ছবি গেল বারে “আরব রমণীর” ছবিতে দেখাইয়াছি। অঙ্গের অন্য কোনও জায়গাই ফাঁক নাই বলিয়াই ইহারা নাকের উপরই যা কিছু গহনা পরিবার আছে তাই পড়েন। বলা বাহুল্য যে স্বাভাবিক সৌন্দর্য্য ঘোমটায় ঢাকিয়া জহরতের সৌন্দর্য্যের বিকাশ করা সে চেষ্টা মিথ্যা চেষ্টা।

 অতি অল্পদূর যাইয়াই গ্রীক দেশের গীর্জ্জায় ঢুকিলাম। তার সামনে একটি বাগানে একটি ইউরোপীয় রমণী নিজেই বাগান খুঁড়িতেছেন। তাঁহার শরীর যেমন সুস্থ, অঙ্গ প্রত্যঙ্গও তেমনি পরিপাটী। মুখে স্বাধীনতা ও আনন্দের ভাব। গীর্জ্জাটি অন্য গীর্জ্জারই মত উঁচু চূড়া বিশিষ্ট। তার উপর হইতে মধুরস্বরে উপাসনার ঘণ্টা বাজিতেছিল। সামনেই কতকগুলি প্রাচীনা রমণী দাঁড়াইয়া নতশির হইয়া, উপাসনায় রত হইলেন। একটি ভিক্ষুকও কান নাক ছুঁইয়া কুর্ণিস করার মত করিয়া পূজায় যোগ দিল। দূরেও যে যেখানে ছিল ঘণ্টার শব্দ শুনিয়া স্তম্ভিত হইয়া দাঁড়াইয়া চোখ বুজিল। ঘণ্টার রবে এমন কি অনির্ব্বচনীয় ক্ষমতা আছে যে, তাতে মনের কর্ম্মোন্মুখী ভাব ও শরীরের গতিবিধি সব তখনি তখনি একেবারে বন্ধ করিয়া দেয়। প্যারিশে লুভেয়ারের আর্ট্ গোলারীতে একটি ছবি দেখিয়াছিলাম—তাতেও এইরূপ ভাবের ছবি ছিল। চিত্রকর ​“মলিয়ারেরই” আঁকা। সবল হৃদয় কৃষক ও তাঁহার পত্নী মাঠে একত্রে কাজ করিতেছিলেন। এমন সময়ে দূরে নগরের ধর্ম্ম মন্দির হইতে সন্ধ্যা উপাসনার ঘণ্টা ধ্বনি উঠিল। যাই সেই মধুর বোল তাঁহাদের কানে পৌঁছিয়াছে অমনি যিনি যেমন অবস্থায় ছিলেন, ধ্যানস্থ হইয়া পড়িলেন। সে যে মুদিত নেত্রের ও নত মুখের মধুর ভাব, এমন কোথাও দেখি নাই। কবির তুলিকা রমণীর নত মুখের কপোলে অস্তমান সূর্য্যের একটি সুরঞ্জিত রশ্মি প্রতিফলিত করিয়া আরও স্বর্গের ভাব আনিয়াছেন। এই বিষয়েরই একটি ছোট ছবি আমি সঙ্গে আনিয়াছি।

 মন্দিরের ভিতর ঢুকিয়া দেখি, তাতে অধিকাংশই বৃদ্ধা স্ত্রীলোক। চারিটি মাত্র পুরুষ আছে। তাহারাও সব অতি বৃদ্ধ। সকল দেশেই এইরূপ ঘটে—ধর্ম্মের টানে সরল হৃদয়া স্ত্রীলোকেরাই বেশী আকৃষ্ট হয়েন। আর বৃদ্ধ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দৌর্ব্বল্যের অসহায় ভাব বৃদ্ধি পাওয়াতে সকল বিবেক ও ধর্ম্মভাব আরও ঘনীভূত হয়।

 সে ধর্ম্মমন্দির আমাদেরই ধর্ম্মমন্দিরের মত, তাতে নানারূপ প্রতিমূর্ত্তি রক্ষিত ও পূজিত। যীশু খৃষ্টের নানা অবস্থার মূর্ত্তি আছে। মাতৃকোলে শিশু অবস্থারই মুর্ত্তি সর্ব্বাপেক্ষা সুন্দর দেখায়, আর ক্রুশে বিদ্ধ তাঁহার শিথিল দেহই সর্ব্বাপেক্ষা পূজিত। কেথলিক চার্চ্চে কুমারী মেরীর খৃষ্ট অপেক্ষাও আদর। প্রচারক সন্ন্যাসী পলের প্রস্তুর মূর্ত্তির বৃদ্ধ অঙ্গুষ্ঠ উপাসকদের চুম্বনের ঘর্ষণে একেবারে খইয়া গিয়াছে। চারিদিকে মোমবাতি জ্বলিতেছে—ও নানা রঙের কাপড় দিয়া সাজান। ফুলও আছে—ধূপ ধূনাও জ্বলিতেছে। জর্ডন্ নদীর পবিত্র জল স্পর্শ করিয়া যাত্রীরা উপাসনায় রত হয়। সবই প্রায় আমাদের দেশেরই মত। এও একরূপ নূতন মূর্ত্তি পূজা। ঈশ্বরের কল্পনা মানবের আদি অবস্থায় এইরূপ স্বরূপভাবেই আবির্ভাব হইয়াছে। ক্রমে নিরাকার কল্পনায় প্রবর্ত্তিত হইয়াছে। খৃষ্টিয় সম্প্রদায়ের ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর গীর্জ্জা দেখিলে তাহা স্পষ্ট বুঝা যায়। রোমান ​কেথলিকদের এ সব সবজ্ঞম ইহা হইতেও কম। Protestant Church এর আবার আরও কম। মুসলমান ধর্ম্মে আবার আরও বিরল। এমন কি, তাঁহাদের বৈঠকখানার ঘরে তাঁরা ছবি অবধি থাকিতে পারে না পাছে প্রতিমা পূজায় প্রবৃত্তি আসে। গীর্জ্জায় ঘণ্টা বাজান অবধি নিষিদ্ধ। মানুষে মসজিদের উপর হইতে চীৎকার করিয়া সেই কাজ করে থাকে। অথচ সকল সম্প্রদায়েরই বিধান মতে অপরের প্রণালী ঠিক নহে বলিয়া বিবেচিত।

 এখান হইতে গাইড্ আমাদের একটি মুসলমান মসজিদে লইয়া গেল। জুতার উপর একটি নেকড়ার জুতা পরিয়া তবে তাতে প্রবেশ করিতে হয়। মোল্লার বেদী দেখিলাম। কতকগুলি ছোট ছেলে কোরাণদানে বই রাখিয়া পড়িতেছিল। কোরাণসরীফ ও দেখিলাম, মহম্মদের নিজ হাতের তরবারিও দেখিলাম। মহরমের বিষম লম্বা ধ্বজাও দেখিলাম। একজন মোল্লা ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দিতে আমাদের মহম্মদের জীবন বৃত্তান্ত ও এই মন্দিরটির উৎপত্তি সম্বন্ধে অনেক কথা বলিলেন। তাহারা বড় গরীব। আসিবার সময় আমরা কৃতজ্ঞতা জানাইয়া তাদের হাতে গুটিকতক রৌপ্য মুদ্রা দিলাম—সেই অল্পেই তারা কত সন্তুষ্ট।

 তিনি যে মহাম্মদের জীবন বৃত্তান্ত আমাদের বলিলেন, তাহা আমার কাছে সম্পূর্ণ নূতন কথা ও আমার অতিশয় বিস্ময়জনক বলিয়া মনে হইল। সেই মহাত্মার পুণ্য জীবন কাহিনী সম্বন্ধে দুই একটি কথা নিম্নে বলিতেছি।

 মহম্মদের ইতিবৃত্ত সেই মোল্লার মুখ হইতে আমি নিবিষ্টচিত্তে শুনিয়াছি ও একান্ত কৌতূহলবশত, দু-একখানি পুস্তক হইতেও পরে পড়িয়াছি। তাঁর জন্মিবার কিছুদিন পূর্ব্বেই তাঁর পিতা আবদুল্লা মারা যান। তাঁর মাতা “আমিনা” তাঁকে সুস্থ ও বলিষ্ঠ করিবার জন্য “হমিনা” নাম্নী এক ধাত্রীর কাছে মানুষ করিতে দিলেন। পূর্ব্বেই বলিয়াছি ইনি বুডীন্‌ জাতীয়া স্ত্রীলোক; মরুভূমেই ইহাঁদের বাস। মহম্মদ এই স্থানেই জীবনের প্রথম ৫ বৎসর থাকিয়া এত সুস্থ ও দেহ মনে বলিষ্ঠ হইয়াছিলেন। ​কিন্তু ছেলেবেলায় তাঁহার ফিট বা মুচ্ছা হইত। কিছুদিন পরে তাঁর মাতাও মারা যান। তখন তাঁহার মামা “আবুতালিপ্” তাঁহার ভরণ-পোষণের ভার লয়েন। এই সময়ের সকল ছেলেই যেমন সেকালে সে দেশে করিয়া থাকিত, এই বয়সে তিনি মরুভূমির মাঝে পাহাড়ে পাহাড়ে মেষ চরাইয়া বেড়াইতেন। সেই ভীষণ স্থানেই প্রকৃতির ভীষণ শোভা দেখিয়া তাঁর ভাবুক মনে ধর্ম্ম ভাব আসে। সে সময়ে আরব দেশের সমাজ ও ধর্ম্ম অতিশয় উচ্ছৃঙ্খল ছিল। সকলেই মুর্ত্তি পূজা করিত। স্ত্রীলোকের অবস্থা অতিশয় হীন ছিল। মানবহিতব্রতে ব্রতী হইয়া এই সকল কুপ্রথার সংস্কারসাধনে তিনি বদ্ধপরিকর হইলেন। অনন্যমনে এই সকল নির্জ্জন প্রদেশে আহার নিদ্রা ভুলিয়া তখন অহরহ এই চিন্তাই করিতেন। এক সময় তাঁহার মনের অবস্থা এমন বিশৃঙ্খল হইয়াছিল যে, তিনি পাহাড়ের চূড়া হইতে পড়িয়া আত্মহত্যা করিতে যাইতেছিলেন; এমন সময় স্বর্গীয় দূত “গেব্রীয়েল” তাঁহাকে বাঁচাইলেন। এই ঘটনাগুলি অনেকটা যিশুখৃষ্টের জীবনীর মত (Jeasus in the wilderness)। মহাপুরুষদের জীবনে অমনি একদিন দারুণ পরীক্ষার দিন আসে। পূর্ব্বাক্ত এই ঘটনাগুলি হইতেই তাঁহার ভবিষ্যতের যাবতীয় কার্য্যপ্রণালী সব বুঝা যায়।

 তাঁহার যৌবনের আর একটি মহৎ ঘটনা “খাদিজা” নাম্নী এক রমণীর সহিত তাঁর বিবাহ। ইনি একজন ধনী বিধবা রমণী ছিলেন। এবং ইঁহারই কাছে মহম্মদ্ চাকরী করেন। পরে তিনি প্রীত হইয়া মহম্মদকে বিবাহ করেন। তিনি বয়সে ১৫ বৎসরের বড় থাকিলেও সারা জীবন মহম্মদের সঙ্গে অতি সুখে একত্র বাস করিয়াছিলেন। মহম্মদ ইহাকে বড়ই মান্য করিতেন ও তিনিও মহম্মদকে বড়ই ভক্তি করিতেন। তিনটি মেয়ে ও দুটি ছেলে হয়। ছেলে দুটি মারা যায় এবং ছোট মেয়ের বংশধরেরাই মহম্মদের বংশ রক্ষা করে; ইহার ছেলেদের নামই “হাসেন্” ও “হুসেন্”। ইহাদের মৃত্যুর জন্য আক্ষেপ করিয়াই মহরম্ উৎসব হয়।

​ খাদিজার মৃত্যুর পর মহম্মদ আরও দশবার বিবাহ করিয়াছিলেন। কাহারও সন্তান হয় নাই। তবে তাঁর অতি বৃদ্ধ বয়সে “মেরি” নামক এক খৃষ্টান রমণীর গর্ভে একটি ছেলে হইয়াছিল। মহম্মদ সে ছেলেটিকে বড়ই ভাল বাসিতেন। কিন্তু সেও বাঁচে নাই। একটিও পুত্র সন্তান না থাকায় কে তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার কার্য্যের ভার লইবে এই চিন্তায় মহম্মদ বড়ই কাতর থাকিতেন।

 যখন প্রচলিত ধর্ম্মের নিন্দাবাদ করাতে দেশের লোক তাঁহার উপর খড়্গ হস্ত হইল, তখন তাঁহাকে মক্কা ছাড়িয়া মদীনায় পলাইতে হইল। একেই “হিজরী” বলে। ক্রমাগত যুদ্ধ বিগ্রহেই তাঁহার সময় কাটিত, তারই কিঞ্চিৎ অবসরকালে তিনি “কোরাণ” বলিতেন। ৬৪ বৎসর বয়সে ১৫ দিনের জ্বরে তাঁহার মৃত্যু হয়। তাঁহার প্রিয়তমা স্ত্রী “আয়েষার” ঘরেই তিনি দেহত্যাগ করেন। পরে “কোরাণ সরিফ্” লেখা ইহারই ঘরে পাওয়া যায়।

 মহম্মদের জীবিত অবস্থাতেই মুসলমানধর্ম্ম বহুদূর অবধি বিস্তৃত হইয়াছিল। তাঁহার ধর্ম্মকে ‘ইসলাম্’ ধর্ম্ম বলা যায়। এই ইসলাম শব্দের অর্থ “ঈশ্বরের ইচ্ছায় সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করা।” তাঁহার ধর্ম্মের মূলমন্ত্র এই যে—“ঈশ্বর এক; আর মহম্মদ তাঁহার প্রেরিত (তত্ত্ববক্তা)।” এ ধর্ম্মের নিয়মানুসারে জাতিভেদ নাই। সকল মানুষই সমান, পরে মহম্মদের মৃত্যুর পর অল্পকাল মধ্যেই এই ধর্ম্ম চারিদিকে প্রচার হইয়া পড়িল। এখন পৃথিবীর ভূভাগের চার ভাগের এক ভাগ লোক এই ধর্ম্মাবলম্বী।

 এই মসজিদ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া সেখানকার হাঁসপাতাল দেখিতে গেলাম। ছোট বাড়ী কিন্তু ফুলবাগানে ভরা। একজন আরমানী ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত। তিনি আমাদের কাফী পান করাইলেন ও পরে আপনিই সঙ্গে করিয়া সেখানকার সকল স্থান দেখাইলেন। ​সেখানে অল্পসংখ্যক মাত্র রোগী বিনা বেতনে থাকিতে পায়। অপর সকলকেই টাকা দিয়া থাকিতে হয়। প্রথম শ্রেণীতে ১০ ডলার প্রতিদিন দেয়। স্নান করিবার, কাপড় কাচিবার, রাঁধিবার, ও রোগীদের রাখিবার সুন্দর ব্যবস্থা। স্ত্রীলোকেরা যেখানে থাকেন, সে স্থানটি দুই ভাগে বিভক্ত—এক ভাগে গৃহস্থ মেয়েরা থাকেন, ও অপরটীতে সাধারণ কুশীলা স্ত্রীলোকদের স্থান। তাদেরও অনাবৃত মুখের ভাবে স্ত্রীলোকের স্বভাবসিদ্ধ সঙ্কোচ মর্য্যাদাও সারল্য আছে। আমাদের হাসপাতালে এ দেশে এমন সুন্দর ব্যবস্থা এ বিষয়ে নাই।

 এখান হইতে তিন মাইল দূরে “অরব পল্লী” দেখিতে গেলাম। সে সহরের বাহিরে স্থান তত পরিষ্কার নহে। ছোট ছোট কুঁড়ে ও অপ্রশস্ত রাস্তা ময়লায় ভরা। গরীব স্ত্রীলোকেরাও ময়লা পোষাক পরা ছেলেপিলে চতুর্দ্দিকে দেখা গেল। স্ত্রীলোকদের প্রায় সবই অবগুণ্ঠিতা।

 শেষে পিয়ারে “লেসেপ্স” এর (Ferdinand Lesseps) প্রতিমূর্ত্তি দেখিতে গেলাম। সেই স্থানটিই সর্ব্বাপেক্ষা মনোরম। সহরের জমী হইতে বড় বড় পাথরে গাঁথা প্রাচীরটি সমুদ্রের ভিতর ১ মাইল অবধি গিয়াছে। সেই স্থানে সহরের যত লোক হাওয়া খাইতে যান। সমুদ্রের ভীষণ তরঙ্গ যাহাতে বন্দরে ঢুকিতে না পারে, সেই জন্য এই প্রাচীর গাঁথা। ভীষণ তরঙ্গ আসিয়া অহরহ তাহাতে আঘাত করিতেছে। আর সে জলকল্লোল কি ভীমনাদ। ঢেউ চলিয়া গেলে, শুভ্র ফেনাগুলি যেন সাদা ফুলের মত বেলাভূমিতে পড়িয়া থাকে। আর শত শত জলজ উদ্ভিদ ও সজীব শেওলা সেই স্রোতে অনবরত পাথরের উপর আহত হইতেছে। “জেলি মাছই” বা কত—তারা নানা রঙ্গের রঞ্জিত বিচিত্র ছাতা খুলিয়া জলের নীচে সাঁতার দিতেছে। ঢেউগুলির তুমুল আলোড়ন যেন জলদস্যুদের আক্রমণের মত মনে হয়। যেন প্রবলবেগে পাথরের প্রাচীরটি ভাঙ্গিয়া ​দিয়া বড় বড় ঢেউগুলি দেশটি জলপ্লাবনে নষ্ট করিতে চায়। দ্বারিকা ধ্বংসের কালে এইরূপ দৃশ্যই বোধ হয় বর্ণিত আছে।

 এই পাথরের প্রাচীরের সমুদ্র প্রান্তে “লেসেপ্স্” এর প্রতিমূর্ত্তি এক উঁচু থামের উপর অবস্থিত। এক হাতে চাবী ও অপর হাতে সুয়েজ খালের ম্যাপ হাতে করিয়া কর্ম্মবীর সমুদ্রের দিকে বিস্ফারিত নেত্রে চাহিয়া আছেন। খাল কাটিয়া সাগর বাঁধিয়া যেন তিনি সেখানে দাঁড়াইয়া ভীষণ সমুদ্রের উপর প্রভুত্ব করিতেছেন। ইনি একজন ফরাসী দেশীয় এন্‌জিনিয়র্। কত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করিয়া মরুভূমির উপর দিয়া ছোট ছোট হ্রদ গুলিকে একত্র করিয়া এই অসম্ভব কাজ সম্ভব করিয়াছেন। যে স্থানে যাইতে পূর্ব্বে তিন মাস লাগিত, এখন এক মাস লাগে। এখন ব্যবসা বাণিজ্যের কত সুবিধা হইয়াছে ও ইউরোপের সহিত কত ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ স্থাপিত হইয়াছে। তার ফল, এক হিসাবে ভীষণ হইয়াছে। অনেক আসিয়াবাসী এই দারুণ জীবনসংগ্রামে মরিতেছে। তবে তাদের মধ্যে অল্পসংখ্যক যাহারা বাঁচিয়া থাকিতে পারিবে, তাহারা নূতন অবস্থার আলো পাইয়া ও তদ্দ্বারা আরও বলীয়ান হইয়া, সুদূর ভবিষ্যতে হয়ত দুই শক্তির সংমিশ্রণে অনেক খেলা খেলিতে পারিবে—আশা করা যায়।

 ইহারই নিকট জমীর উপর Maconigraph মার্কনীর তারবিহীন টেলিগ্রাফের স্তম্ভ। প্রতি বন্দরেই এরূপ ব্যবস্থা আছে। শীঘ্র খবরাখবরে ইহা বড়ই সুবিধাজনক। খবর পাঠাইবার কালে আকাশে যে বৈদ্যুতিক ঢেউগুলি হয়, সেগুলি চারিদিকের ঘোষণাস্থান দিয়া ছড়াইয়া পড়ে বলিয়া খামের মাতার উচু স্থানই যন্ত্ররক্ষার পক্ষে সুবিধাজনক।