বিশ্বপরিচয়/উপসংহার

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


ভূলোক আসে। এসব প্রমাণ থেকে বলা যায় যে, আগ্নেয়গিরির ছাই ঢেকে রেখেছে চাদের প্রায় সব জায়গা । চাদ পৃথিবীর কাছের উপগ্রহ । তার টানের জোর প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করি পৃথিবীর সমুদ্রগুলোতে, সেখানে জোয়ারভাটা খেলতে থাকে ; আর শুনেছি আমাদের শরীরে জরজারি বাতের ব্যথাও ঐ টানের জোরে জেগে ওঠে। বাতের রোগীরা ভয় করে অমাবস্যা-পূর্ণিমাকে । আদিকালে পৃথিবীতে জীবনের কোনো চিহ্নই ছিল না । প্রায় সত্তর আশি কোটি বছর ধরে চলেছিল নানা আকারে তেজের উৎপাত । কোথাও অগ্নিগিরি ফুসছে তপ্ত বাষ্প, উগরে দিচ্ছে তরল ধাতু, ফোয়ার ছোটাচ্ছে গরম জলের । নিচের থেকে ঠেলা খেয়ে কাপছে ফাটছে ভূমিতল, উঠে পড়ছে পাহাড় পর্বত, তলিয়ে যাচ্ছে ভূখণ্ড । পৃথিবীর শুরু থেকে প্রায় দেড়শো কোটি বছর যখন পার হোলো তখন অশান্ত আদিযুগের মাথা-কুটে-মরা অনেকটা থেমেছে। এমন সময়ে স্থষ্টির সকলের চেয়ে আশ্চর্য ঘটনা দেখা দিল । কেমন করে কোথা থেকে প্রাণের ও তার পরে ক্রমশ মনের উদ্ভব হোলো তার ঠিকান পাওয়া যায় না । তার আগে পৃথিবীতে স্থষ্টির কারখানাঘরে তোলাপাড়া ভাঙাগড়া চলছিল প্রাণহীন পদার্থ নিয়ে । তার উপকরণ ছিল মাটি জল লোহা পাথর প্রভৃতি ; আর সঙ্গে সঙ্গে ছিল > > ግ বিশ্বপরিচয় অক্সিজেন হাইড্রোজেন নাইট্রোজেন প্রভৃতি কতকগুলি গ্যাস । নানারকমের প্রচণ্ড আঘাতে তাদেরই উলটপালট ক’রে জোড়াতাড়া দিয়ে নদী পাহাড় সমুদ্রের রচনা ও অদলবদল চলছিল । এমন সময়ে এই বিরাট জীবহীনতার মধ্যে দেখা দিল প্রাণ, আর তার সঙ্গে মন । এদের পূর্ববর্তী পদার্থরাশির সঙ্গে এর কোনোই মিল নেই । নক্ষত্রদের প্রথম আরম্ভ যেমন নীহারিকায় তেমনি পৃথিবীতে জীবলোকে প্রথম যা প্রকাশ পেল তাকে বলা যেতে পারে প্রাণের নীহারিক । সে একরকম অপরিস্ফুট ছড়িয়ে-পড়া প্রাণপদার্থ, ঘন লালার মতো অঙ্গবিভাগহীন,— তখনকার ঈষৎ-গরম সমুদ্রজলে ভেসে বেড়াত। তার নাম দেওয়া হয়েছে প্রটোপ্লাজম । যেমন নক্ষত্র দানা বেঁধে ওঠে আগ্নেয় বাম্পে, তেমনি বহুযুগ লাগল এর মধ্যে মধ্যে একটি একটি পিণ্ড জমতে । সেইগুলির এক শ্রেণীর নাম দেওয়া হয়েছে অমীবা ; আকারে অতি ছোটো ; অণুবীক্ষণ দিয়ে দেখা যায়। পঙ্কিল জলের ভিতর থেকে এদের পাওয়া যেতে পারে। এদের মুখ চক্ষু হাত পা নেই । আহারের খোজে ঘুরে বেড়ায় । দেহপিণ্ডের এক অংশ প্রসারিত ক’রে দিয়ে পায়ের কাজ করিয়ে নেয়। খাবারের সম্পর্কে এলে সেই সাময়িক পা দিয়ে সেটাকে টেনে নেয়। পাকযন্ত্র বানিয়ে নেয় দেহের একটা অংশে । নিজের সমস্ত দেহটাকে ভাগ ))br ভূলোক করে করে তার বংশবৃদ্ধি হয়। এই অমীবারই আর এক শাখা দেখা দিল, তা’র দেহের চারিদিকে আবরণ বানিয়ে তুললে, শামুকের মতো । সমুদ্রে অাছে এদের কোটি কোটি সূক্ষ্ম দেহ। এদের এই দেহপঙ্ক জমে জমে পৃথিবীর স্থানে স্থানে খড়িমাটির পাহাড় তৈরি হয়েছে। বিশ্বরচনার মূলতম উপকরণ পরমাণু ; সেই পরমাণুগুলি অচিন্তনীয় বিশেষ নিয়মে অতি সূক্ষ্ম জীবকোষৰূপে সংহত হোলো। প্রত্যেক কোষটি সম্পূর্ণ এবং স্বতন্ত্র, তাদের প্রত্যেকের নিজের ভিতরেই একটা আশ্চর্য শক্তি আছে যাতে করে বাইরে থেকে খাদ্য নিয়ে নিজেকে পুষ্ট, অনাবশ্বককে ত্যাগ ও নিজেকে বহুগুণিত করতে পারে । এই বহুগুণিত করার শক্তি দ্বারা ক্ষয়ের ভিতর দিয়ে মৃত্যুর ভিতর দিয়ে প্রাণের ধারা প্রবাহিত হয়ে চলে । এই জীবাণুকোষ প্রাণলোকে প্রথমে একলা হয়ে দেখা দিয়েছে । তারপরে এরা যত সংঘবদ্ধ হোতে থাকল ততই জীবজগতে উৎকর্ষ ও বৈচিত্র্য ঘটতে লাগল। যেমন বহু কোটি তারার সমবায়ে একটি নীহারিকা তেমনি বহুকোটি জীবকোষের সমাবেশে এক-একটি দেহ । বংশাবলীর ভিতর দিয়ে এই দেহজগৎ একটি প্রবাহ সৃষ্টি করে নূতন নূতন রূপের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়ে চলেছে । আমরা এতকাল নক্ষত্ৰলোক সূর্যলোকের কথা আলোচনা ক’রে এসেছি। তার ১ ১৯ বিশ্বপরিচয় চেয়ে বহুগুণ বেশি আশ্চর্য এই প্রাণলোক । উদাম তেজকে শাস্ত করে দিয়ে ক্ষুদ্রায়তন গ্রহরীপে পৃথিবী যে অনতিক্ষুব্ধ পরিণতি লাভ করেছে সেই অবস্থাতেই প্রাণ এবং তার সহচর মনের আবির্ভাব সম্ভবপর হয়েছে এ-কথা যখন চিন্ত৷ করি তখন স্বীকার করতেই হবে জগতে এই পরিণতিই শ্রেষ্ঠ পরিণতি । যদিও প্রমাণ নেই, এবং প্রমাণ পাওয়া আপাতত অসম্ভব তবু এ-কথা মানতে মন যায় না যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এই জীবনধারণযোগ্য চৈতন্যপ্রকাশক অবস্থা একমাত্র এই পৃথিবীতেই ঘটেছে, যে এই হিসাবে পুথিবী সমস্ত জগৎধারার একমাত্র ব্যতিক্রম । >ミo উপসংহার একদা জগতের সকলের চেয়ে মহাশ্চর্য বার্তা বহন ক’রে বহুকোটি বৎসর পূর্বে তরুণ পৃথিবীতে দেখা দিল আমাদের চক্ষুর অদৃশ্য একটি জীবকোষের কণা। কী মহিমার ইতিহাস সে এনেছিল কত গোপনে । দেহে দেহে অপরূপ শিল্পসম্পদশালী তার সৃষ্টিকার্য নব নব পরীক্ষার ভিতর দিয়ে অনবরত চলে আসছে। যোজনা করবার, শোধন করবার, অতিজটিল কৰ্মতন্ত্র উদ্ভাবন ও চালনা করবার বুদ্ধি প্রচ্ছন্নভাবে তাদের মধ্যে কোথায় অাছে, কেমন করে তাদের ভিতর দিয়ে নিজেকে সক্রিয় করেছে, উত্তরোত্তর অভিজ্ঞতা জমিয়ে তুলছে, ভেবে তার কিনারা পাওয়া যায় না । অতিপেলববেদনাশীল জীবকোষগুলি বংশাবলীক্রমে যথাযথ পথে সমষ্টি বাধছে জীবদেহে, নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ; নিজের ভিতরকার উদ্যমে জানি না কী ক’রে দেহক্রিয়ার এমন আশ্চর্য কর্তব্য বিভাগ করছে। যে কোষ পাকযন্ত্রের, তার কাজ একরকমের, যে কোষ মস্তিষ্কের, তার কাজ একেবারেই অন্তরকমের । অথচ জীবাণুকোষগুলি মূলে একই । এদের দুরূহ কাজের ভাগ Σ & Σ. বিশ্বপরিচয় বাটোয়ার হোলো কোন হুকুমে এবং এদের বিচিত্র কাজের মিলন ঘটিয়ে স্বাস্থ্য নামে একটা সামঞ্জস্য সাধন করল কিসে । জীবাণুকোষের দুটি প্রধান ক্রিয়া আছে, বাইরে থেকে খাবার জুগিয়ে বাচা ও বাড়তে থাকা, আর নিজের অনুরূপ জীবনকে উৎপন্ন ক’রে বংশধারা চালিয়ে যাওয়া । এই আত্মরক্ষা ও বংশরক্ষার জটিল প্রয়াস গোড়াতেই এদের উপর ভর করল কোথা থেকে । অপ্রাণ বিশ্বে যেসব ঘটনা ঘটছে তার পিছনে অাছে সমগ্র জড় জগতের ভূমিকা। মন এই সব ঘটনা জানছে, এই জানার পিছনে মনের একটা বিশ্বভূমিকা কোথায় । পাথর লোহা গ্যাসের নিজের মধ্যে তা জানার সম্পর্ক নেই । এই দুঃসাধ্য প্রশ্ন নিয়ে বিশেষ একটা যুগে প্রাণ মন এল পৃথিবীতে—অতি ক্ষুদ্র জীবকোষকে বাহন করে। পৃথিবীতে সৃষ্টি-ইতিহাসে এদের আবির্ভাব অভাবনীয় । কিন্তু সকল কিছুর সঙ্গে সম্বন্ধহীন একান্ত আকস্মিক কোনো অভু্যুৎপাতকে আমাদের বুদ্ধি মানতে চায় না। আমরা জড়বিশ্বের সঙ্গে মনোবিশ্বের মূলগত ঐক্য কল্পনা করতে পারি সর্বব্যাপী তেজ বা জ্যোতিঃপদার্থের মধ্যে । অনেককাল পরে বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে যে আপাতদৃষ্টিতে যে-সকল স্থল পদার্থ জ্যোতিহীন, তাদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন আকারে নিত্যই জ্যোতির ক্রিয়া চলছে । এই মহাজ্যোতিরই সূক্ষ্ম বিকাশ છે. રસ્વ উপসংহার প্রাণে এবং আরো সূক্ষ্মতর বিকাশ চৈতন্তে ও মনে । বিশ্বস্থষ্টির আদিতে মহাজ্যোতি ছাড়া আর কিছুই যখন পাওয়া যায় না, তখন বলা যেতে পারে চৈতন্তে তারই প্রকাশ । জড় থেকে জীবে একে একে পদ। উঠে মানুষের মধ্যে এই মহাচৈতন্তের আবরণ ঘোচাবার সাধনা চলেছে । চৈতন্তের এই মুক্তির অভিব্যক্তিই বোধ করি স্থষ্টির শেষ পরিণাম । পণ্ডিতেরা বলেন, বিশ্বজগতের আয়ু ক্রমাগতই ক্ষয় হচ্ছে এ-কথা চাপা দিয়ে রাখা চলে না । মানুষের দেহের মতোই তাপ নিয়ে জগতের দেহের শক্তি । তাপের ধর্ম ই হচ্ছে যে, খরচ হোতে হোতে ক্রমশই নেমে যায় তার উষ্মা । সূর্যের উপরিতলের স্তরে যে তাপশক্তি আছে তার মাত্রা হচ্ছে শূন্য ডিগ্রির উপরে ছয় হাজার সেন্টিগ্রেড । তারই কিছু কিছু অংশ নিয়ে পৃথিবীতে বাতাস চলছে, জল পড়ছে, প্রাণের উদ্যমে জীবজন্তু চলাফেরা করছে। সঞ্চয় তো ফুরোচ্ছে, একদিন তাপের শক্তি মহাশূন্যে ব্যাপ্ত হয়ে গেলে আবার তাকে টেনে নিয়ে এনে রূপ দেবার যোগ্য করবে কে । একদিন আমাদের দেহের সদাচঞ্চল তাপশক্তি চারিদিকের সঙ্গে একাকার হয়ে যখন মিলে যায়, তখন কেউ তো তাকে জীব-যাত্রায় ফিরিয়ে আনতে পারে না । জগতে যা ঘটছে যা চলছে, পি পড়ের চলা থেকে আকাশে নক্ষত্রের দৌড় পর্যন্ত সমস্তই তো বিশ্বের হিসাবের খাতায় খরচের অঙ্ক ফেলে ゞミも বিশ্বপরিচয় চলেছে। সে সময়ট। যতদূরেই হোক একদিন বিশ্বের নিত্য খরচের তহবিল থেকে তার তাপের সম্বল ছড়িয়ে পড়বে শূন্তে । এই নিয়ে বিজ্ঞানী গণিতবেত্তা বিশ্বের মৃত্যুকালের গণনায় বসেছিল । আমার মনে এই প্রশ্ন ওঠে সূর্য নক্ষত্র প্রভৃতি জ্যোতিষ্কের আরম্ভকালের কথাও তো দেখি অঙ্ক পেতে পণ্ডিতেরা নির্দিষ্ট করে থাকেন। অসীমের মধ্যে কোথা থেকে আরম্ভ হোলো । অসীমের মধ্যে একান্ত অাদি ও একান্ত অন্তের অবিশ্বাস্ত্য তর্ক চুকে যায় যদি মেনে নিই আমাদের শাস্ত্রে যা বলে, অর্থাৎ কল্পে কল্পান্তরে সৃষ্টি হচ্ছে, আর বিলীন হচ্ছে, ঘুম আর ঘুম ভাঙার মতো । সৌরলোকের বিভিন্ন জ্যোতিষ্কের গতি ও অবস্থিতির ভিতর রয়েছে একটা বিরাট শৃঙ্খলা ; বিভিন্ন গ্রহ, চক্রপথে প্রায় একই সমক্ষেত্রে থেকে, একটা ঘূর্ণিটানের আবর্তে ধর। প’ড়ে একই দিকে চ’লে, সূর্যপ্রদক্ষিণের পালা শেষ করেছে । স্বষ্টির গোড়ার কথা যারা ভেবেছেন তারা এতগুলি তথ্যের মিলকে আকস্মিক ব’লে মেনে নিতে পারেননি । যে-মতবাদ গ্রহলোকের এই শৃঙ্খলার সুস্পষ্ট কারণ নির্দেশ করতে পেরেছে তাই প্রাধান্ত পেয়েছে সবচেয়ে বেশি । যেসব বস্তুসংঘ নিয়ে সৌরমণ্ডলীর স্বষ্টি তাদের ঘূর্ণিবেগের মাত্রার হিসাব একটা প্রবল অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে এসব মতবাদকে >S8 উপসংহার গ্রহণযোগ্য করার পক্ষে । হিসাবের গরমিল যেখানে মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে সেই মতকেই দিতে হয়েছে বাতিল করে । ঘূর্ণিবেগের মাত্রা প্রায় ঠিক রেখে যে একটি মতবাদ এতকাল টিকে ছিল তাদের বিরুদ্ধেও নূতন বিস্তু এসে উপস্থিত হয়েছে । আমেরিকার Princeton বিশ্ববিদ্যালয়ের xtanfo food Henry Norris Russell Hoffs জনস ও লিটলটনের মতবাদের যে-বিরুদ্ধ সমালোচনা করেছেন তাতে মনে হয় কিছুদিনের মধ্যেই এদের ও বিদায় নিতে হবে গ্রহণযোগ্য মতবাদের পর্যায় থেকে, পূর্ববর্তী বাতিল-করণদের পাশেই হবে এদের স্থান । নক্ষত্রের সংঘাতে গ্রহলোকের সৃষ্টি হোলে জ্বলন্ত গ্যাসের যে-টানাসূত্র বের হয়ে আসত তার তাপমাত্রা এত বেশি হোত যে এই বাষ্পপিণ্ডের বিভিন্ন অংশ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত । কিন্তু অতিদ্রুত তাপ ছড়িয়ে দিয়ে এই টানাসূত্র ঠাণ্ড হয়ে একটা স্থিতি পেতে চাইত। এই দুই বিরুদ্ধশক্তির ক্রিয়ায়, মুক্তি আর বন্ধনের টানাটানিতে কার জিত হবে তাই নিয়েই Henry Russell আলোচনা করেছেন । আমাদের কাছে দুর্বোধ্য গণিতশাস্ত্রের হিসাব থেকে মোটামুটি প্রমাণ হয়েছে যে টানাসূত্রের প্রত্যেকটি পরমাণু তেজের প্রবল অভিঘাতে বিবাগী হয়ে মহাশূন্যে বেরিয়ে পড়ত, জমাট বেঁধে গ্রহলোক স্থষ্টি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হোত না । যে-বাধার কথা Σ S & বিশ্বপরিচয় তিনি আলোচনা করেছেন তা জিনস ও লিট্‌লটনের প্রচলিত মতবাদের মূলে এসে কঠোর আঘাত ক’রে তাদের আজ ধূলিসাৎ করতে উদ্যত হয়েছে। SS \ు