বিশ্বপরিচয়/ভূলোক

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


গ্রহলোক বেশি ব’লেই এর গড়পড়ত। ওজন আয়তনের তুলনায় এত কম । এর ভিতরের কঠিন অংশের ব্যাস ২৪ ০০০ মাইল, তার উপরে প্রায় ৬০ ০০ মাইল বরফ জমেছে—আর তার উপরে আছে ১৬০ ০০ মাইল হাওয়া । শনিগ্রহের পরের মণ্ডলীতে আছে য়ুরেনস নামক এক নতুন-খবর-পাওয়া গ্রহ । এ গ্রহ সম্বন্ধে বিশেষ বিবরণ কিছু জানা সম্ভব হয়নি । এর আয়তন পৃথিবীর ৬৪ গুণ বেশি। সূর্য থেকে ১৭৮ কোটি ২৮ লক্ষ মাইল দূর থেকে সেকেণ্ডে চার মাইল বেগে ৮৪ বছরে একবার তাকে প্রদক্ষিণ করে । এত বড়ো এর আয়তন কিন্তু খুব দূরে আছে বলে দুরবীন ছাড়া একে দেখা যায় না । যে জিনিসে এ গ্রহ তৈরি তা জলের চেয়ে একটু ঘন, তাই পুথিবী থেকে বহু গুণ বড়ো হোলেও, এর ওজন পৃথিবীর (; <이 지 | ১০ ঘণ্টা ৪৩ মিনিটে এ গ্রহ একবার ঘুরপাক খাচ্ছে । চারিটি উপগ্রহ নিজ নিজ পথে ক্রমাগত একে প্রদক্ষিণ করছে । যুরেনস আবিষ্কারের কিছুকাল পরেই পণ্ডিতের যুরেনসের বেহিসাবি চলন দেখে স্থির করলেন, এ গ্রহ পথের নিয়ম ভেঙেছে আর একটা কোনো গ্রহের টানে। খুজতে খুজতে বেরোল সেই গ্রহ। তার নামকরণ হোলে নেপচুন। সূর্য থেকে এর দূরত্ব ২৭৯ কোটি ৩৫ লক্ষ মাইল, প্রায় So S বিশ্বপরিচয় ১৬৪ বছরে এ সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে । এর ব্যাস প্রায় ৩৩,০০০ মাইল, য়ুরেনসের চেয়ে কিছু বড়ো । দুরবীনে শুধু ছোটো একটি সবুজ থালার মতো দেখায়। একটি উপগ্রহ ২ লক্ষ ২২ হাজার মাইল দূরে থেকে ৫ দিন ২১ ঘণ্টায় একে একবার ঘুরে আসছে। উপগ্রহের দূরত্ব এবং এই গ্রহের আয়তন থেকে হিসাব করা হয়েছে যে এর বস্তুপদার্থ জল থেকে কিছু ভারি, ওজনে এ প্রায় যুরেনসের সমান । কত বেগে এ গ্রহ মেরুদণ্ডের চারদিকে ঘুরছে তা আজও একেবারে ঠিক হয়নি । নেপচুনের আকর্ষণে যুরেনসের যে নূতন পথে চলার কথা তা হিসেব করার পরেও দেখা গেল যে যুরেনস ঠিক সে-পথ ধরেও চলছে না । তার থেকে বোঝা গেল যে নেপচুন ছাড়া এ গ্রহের গতিপথের বাইরে রয়েছে আরো একটা জ্যোতিষ্ক । ১৯৩০ সালে বেরিয়ে পড়ল নূতন এক গ্রহ । তার নাম দেওয়া হোলো প্লুটো । এ গ্রহ এত ছোটো ও এত দূরে যে, ছরবীনেও একে দেখা যায় না। ক্যামের দিয়ে ছবি তুলে নিঃসন্দেহে এর অস্তিত্ব প্রমাণ করা হয়েছে। এই গ্রহই সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরে, তাই আলে। উত্তাপ পাচ্ছে এত কম যে, এর অবস্থা আমরা কল্পনাও করতে পারিনে । ৩৯৬ কোটি মাইল দূর থেকে প্রায় ২৫০ বছরে এ গ্রহ সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে । 이 o গ্রহলোক প্লুটো গ্রহটির তাপমাত্রা হবে বরফগলা শৈত্যের ৪৪৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পরিমাপের নিচে । এত শীতে অত্যন্ত দুরন্ত গ্যাসও তরল এমন কি নিরেট হয়ে যায়। আঙ্গারিক গ্যাস, অ্যামোনিয়া, নাইট্রোজেন প্রভৃতি বায়ব পদার্থগুলো জমে বরফপিণ্ডে গ্রহটাকে নিশ্চয় ঢেকে ফেলেছে। কেউ কেউ মনে করেন সৌরলোকের শেষ সীমানায় কতকগুলো ছোটে। ছোটো গ্রহ ছিটিয়ে আছে, প্লটো তাদের মধ্যে একটি । কিন্তু এ মতের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, কখনো যাবে কি না বলা যায় না । এখনকার চেয়ে অনেক প্রবলতর দুরবীন ঐ দূরত্বের যবনিকা তুলতে যদি পারে তাহলেই ংশয়ের সমাধান হবে । ভূলোক অন্ত গ্রহের আকারের ও চলাফেরার কিছু কিছু খবর জমেছে, কেবল পৃথিবী একমাত্র গ্রহ যার শরীরের গঠনরীতি আমরা পুরোপুরি অনেকটা জানতে পেরেছি। গ্যাসীয় অবস্থা পেরিয়ে যখন থেকে তার দেহ আঁটি বেঁধেছে তখন থেকেই সর্বাঙ্গে তার ইতিহাসের নানা সংকেতচিহ্ন আক। পড়ছে । পৃথিবীর উপরকার স্তরে কোনো ঢাকা না থাকাতে সেই ভাগট। শীঘ্র ঠাণ্ডা হয়ে শক্ত হোলো, আর ভিতরের স্তর ক্রমশ নিরেট হোতে থাকল। তুধের সর ঠাণ্ড হোতে হোতে যেমন কুঁচকিয়ে যায়, পৃথিবীর উপরকার স্তর ঠাণ্ড হোতে হোতে তেমনি কুঁচকিয়ে যেতে লাগল। কুঁচকিয়ে গেলে দুধের সর যেটুকু অসমান হয় সে আমরা গণ্যই করিনে। কিন্তু কুঁচকিয়ে-যাওয়া পৃথিবীর স্তরের অসমানত তেমন সামান্ত ব’লে উড়িয়ে দেবার নয় । নিচের স্তর এই অসমানতার ভার বইবার মতো পাকা হয়নি । তাই ভালো নির্ভর না পাওয়াতে উপরের শক্ত স্তরটা ভেঙে তুবড়ে উচুনিচু হোতে থাকল, দেখা দিল পাহাড়পর্বত । বুড়োমানুষের কপালের চামড়া কুঁচকে যেমন বলি পড়ে, তেমনি এগুলো যেন পৃথিবীর উপরকার চামড়ার বলি। সমস্ত > 0 8 ভূলোক পুথিবীর বৃহৎ গভীরতার তুলনায় এই পাহাড়পর্বত মানুষের চামড়ার উপর বলিচিহ্নের চেয়ে কম বই বেশি নয় । প্রাচীন যুগের পৃথিবীতে কুঁচকে-যাওয়া স্তরের উচুনিচুতে কোথাও নামল গহবর, কোথাও উঠল পর্বত । গহবরগুলো তখনো জলে ভরতি হয়নি। কেননা তখনে পৃথিবীর তাপে জল ও ছিল বাপ হয়ে । ক্রমে মাটি হোলো ঠাণ্ডা, বাষ্প হোলো জল । সেই জলে গহবর ভরে উঠে হোলে৷ সমুদ্র । পৃথিবীর অনেকখানি জলের বাষ্প তো তরল হোলো ; কিন্তু হাওয়ার প্রধান গ্যাসগুলো গ্যাসই রয়ে গেল । তাদের তরল করা সহজ নয়। যতটা ঠাণ্ড হোলে তা’রা তরল হোতে পারত ততটা ঠাণ্ডায় জল যেত জমে, আগাগোড়া পৃথিবী হোত বরফের বর্মে আবৃত । মাঝারি পরিমাপের গরমে-ঠাণ্ডায় অক্সিজেন নাইট্রোজেন প্রভূতি বাতাসের গ্যাসীয় জিনিসগুলি চলাফেরা করছে সহজে, আমরা নিশ্বাস নিয়ে বাচছি । পৃথিবীর ভিতরের দিকে সংকোচন এখনো একেবারে থেমে যায়নি। তাবি নড়নের ঠেলায় হঠাৎ কোথাও তলার জায়গা যদি নিচে থেকে কিছু সরে যায়, তাহলে উপরের শক্ত আবরণ ভেঙে গিয়ে তার উপরে চাপ দিয়ে পড়ে, দুলিয়ে দেয় পৃথিবীর স্তরকে, ভূমিকম্প জেগে ওঠে। আবার কোনো কোনো জায়গায় ভাঙা আবরণের চাপে নিচের তপ্ত তরল জিনিস উপরে উছলে ওঠে । > 0 (? বিশ্বপরিচয় পৃথিবীর ভিতরের অবস্থা জানতে গেলে যতটা খুড়ে দেখা দরকার এখনো ততটা নিচে পর্যন্ত খোড়া হয়নি। কয়লার খোজে মানুষ মাটির যতটা নিচে নেমেছে সে এক মাইলের বেশি নয়। তাতে কেবল এই খবরটা পাওয়া গেছে যে, যত পৃথিবীর নিচের দিকে যাওয়া যায় ততই একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় গরম বাড়তে থাকে। এই উত্তাপ বৃদ্ধির পরিমাণ সব জায়গায় সমান নয় স্থানভেদে মাত্রাভেদ ঘটে । একসময়ে একটা মত চলতি ছিল, যে, ভূস্তরটা ভাসছে পৃথিবীর ভিতরকার তাপে-গলা তরল ধাতুর উপরে। এখনকার মত হচ্ছে পৃথিবীটা নিরেট, ভিতরের দিকে তাপের অস্তিত্ব দেখা যায় বটে কিন্তু পৃথিবীর স্তরে যেসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ আছে, যথেষ্ট তাপ পাওয়া যাচ্ছে তাদের থেকে । তার অন্তঃকেন্দ্রের উপাদান লোহার চেয়ে নিবিড় । সম্ভবত সে-স্থানটি খুব গরম, কিন্তু এতটা নয় যাতে ভিতরকার জিনিস গ’লে যেতে পারে । আন্দাজ করা যাচ্ছে সেখানকার জিনিসটা লোহা অার নিকেল, তা’র আছে দুহাজার মাইল জুড়ে, আর তাদের বেড়ে আছে যে-একটা খোল, সে পুরু, হুহাজার মাইলের উপরে । পৃথিবীর সমস্তটাই যদি জলময় হোত তাহলে তার ওজন যতটা হোত, জলে স্থলে মিশিয়ে তার চেয়ে তার ওজন সাড়ে পাচগুণ বেশি । তার উপরকার তলার পাথর জলের চেয়ে তিনগুণ বেশি ঘন তাহলে তার ভিতরে S o \\ე ভূলোক আরো বেশি ভারি জিনিস অাছে ধরে নিতে হবে । কেবল যে উপরকার চাপেই তাদের ঘনত্ব বেড়ে গেছে তা নয় সেখানকার বস্তুপুঞ্জের ভার স্বভাবতই বেশি। পৃথিবীকে ঘিরে আছে যে বাতাস তার শতকরা ৭৮ ভাগ নাইট্রোজেন, ২১ ভাগ অক্সিজেন । আর আর যেসব গ্যাস আছে সে অতি সামান্য । অক্সিজেন-গ্যাস মিশুক গ্যাস, লোহার সঙ্গে মিশে মরচে ধরায়, অঙ্গারপদার্থের সঙ্গে মিশে আগুন জ্বালায়—এমনি ক’রে বায়ুমণ্ডল থেকে নিয়ত তার অনেক খরচ হোতে থাকে। এদিকে গাছপালার বাতাসের অঙ্গারাম-গ্যাসের থেকে নিজের প্রয়োজনে অঙ্গার অাদায় ক’রে নিয়ে অক্সিজেনভাগ বাতাসকে ফিরিয়ে দেয় । এ না হোলে পৃথিবীর হাওয়া অঙ্গারায় গ্যাসে ভরে যেত, মানুষ পেত না তার নিশ্বাসের বায়ু । আকাশের অনেকট। উচু পর্যন্ত হাওয়ার বেশি পরিবর্তন হয়নি। যেসব গ্যাস মিশিয়ে হাওয়া তৈরি তাদের অনেকটাই আরো অনেক উচুতে পৌছয় না। খুব সম্ভব সবচেয়ে হালক। দুটো গ্যাস অর্থাৎ হেলিয়ম এবং হাইড্রোজেনে মিশোনে সেখানকার হাওয়া । বাতাসের ঘনত্ব কমতে কমতে ক্রমশই বাতাস অনেক উধেব উঠে গিয়েছে। বাহির থেকে পৃথিবীতে যে উল্কাপাত হয় পৃথিবীর হাওয়ার ঘর্ষণে তা জ্বলে ওঠে, তাদের অনেকেরই So 이 বিশ্বপরিচয় এই জ্বলন প্রথম দেখা দেয় ১২০ মাইল উপরে । ধরে নিতে হবে তার উধেবর্ণ অারে। অনেকখানি বাতাস আছে যার ভিতর দিয়ে আসতে আসতে তবে এই জলনের অবস্থা ঘটে । সূর্যের আলো ৯ কোটি মাইল পেরিয়ে আসে পৃথিবীতে । গ্রহ-বেষ্টনকারী আকাশের শূন্তত পার হয়ে আসতে তেজের বেশি ক্ষয় হবার কথা নয় । যে প্রচণ্ড তেজ নিয়ে সে বায়ুমণ্ডলের প্রত্যন্তদেশে পৌছয় তার আঘাতে সেখানকার হাওয়ার পরমাণু নিশ্চয়ই ভেঙেচুরে ছারখার হয়ে যায়—কেউ আস্ত থাকে না । বাতাসের সর্বোচ্চভাগে ভাঙা পরমাণুর যে স্তরের সৃষ্টি হয় তাকে নাম দেওয়া হয় এফ ২ ( F 2 ) স্তর । সেখানকার খরচের পর বাকি সূর্যকিরণ নিচের ঘনতর বায়ুমণ্ডলকে আক্রমণ করে, সেখানেও পরমাণুভাঙা যে স্তরের উদ্ভব হয় তার নাম দেওয়া হয়েছে এফ ১ ( F 1 ) স্তর । আরো নিচে আরো ঘন বাতাসে সূর্যকিরণের আঘাতে পঙ্গু পরমাণুর আরো একটা যে স্তর দেখা দেয়, তার নাম ই ( E ) স্তর । সূর্যকিরণের বেগনি-পারের রশ্মি পরমাণু ভাঙচুরের কাজে সবচেয়ে প্রধান উদ্যোগী । উচ্চতর স্তরে উপদ্রব শেষ করতে করতে বেগনি-পারের রশ্মি অনেকখানি নিঃস্ব হয়ে নিচের হাওয়ায় অল্প পৌছয় । সেটা আমাদের রক্ষে । বেশি হোলে সইত না । ভূলোক সূর্যকিরণ ছাড়া আরো অনেক কালাপাহাড় দূর থেকে আসে বাতাসকে অদৃশ্য গদাঘাত করতে । যেমন উল্কা, তাদের কথা পূর্বেই বলা হয়েছে । এরা ছুটে আসে গ্ৰহআকাশের ভিতর দিয়ে এক সেকেণ্ডে দশ থেকে একশো মাইল বেগে । হাওয়ার ঘর্ষণে তাদের মধ্যে তাপ জেগে ওঠে, তার মাত্রা হয় তিন হাজার থেকে সাত হাজার ফারেনহাইট ডিগ্রি পর্যন্ত ; তাতে করে বেগনি-পারের আলোর তীক্ষ বাণ তৃণমুক্ত হয়ে আসে, বাতাসের অণুগুলোর গায়ে পড়ে তাদের জালিয়ে চুরমার ক’রে দেয় । এছাড়া আর এক রশ্মিবর্ষণের কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। সে কসমিক রশ্মি । বিশ্বে সেই হচ্ছে সবচেয়ে প্রবল শক্তির বাহন । পৃথিবীর বাতাসে আছে অক্সিজেন নাইট্রোজেন প্রভৃতি গ্যাসের কোটি কোটি অণুকণা, তারা অতি দ্রুতবেগে ক্রমাগতই ঘোরাঘুরি করছে, পরস্পরের মধ্যে সংঘাত চলছেই । যারা হালক। কণা তাদের দৌড় বেশি । সমগ্র দলের যে বেগ তার চেয়ে স্বতন্ত্র ছুটকে অণুর বেগ অনেক বেশি । সেইজন্যে পৃথিবীর বাহির-আঙিনার সীমা থেকে হাইড্রোজেনের খুচরো অণু প্রায়ই পৃথিবীর টান কাটিয়ে বাইরে দৌড় দিচ্ছে । কিন্তু দলের বাইরে অক্সিজেন নাইট্রোজেনের অণুকণার গতি কখনো ধৈর্যহারা পলাতকার বেগ পায় না। সেই কারণে পৃথিবীর বাতাসে তাদের দৈন্ত 2 & ৯ বিশ্বপরিচয় ঘটেনি ; কেবল তরুণ বয়সে যে হাইড্রোজেন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে প্রধান গ্যাসীয় সম্পত্তি, ক্রমে ক্রমে সেটার অনেকখানিই সে খুইয়ে ফেলেছে । বড়ো বড়ো ডানাওয়ালা পাখি শুধু ডান ছড়িয়েই অনেকক্ষণ ধ’রে হাওয়ার উপরে ভেসে বেড়ায়, বুঝতে পারি পাখিকে নির্ভর দিতে পারে এতট। ঘনতা আছে বাতাসের । বস্তুত কঠিন ও তরল জিনিসের মতোই হাওয়ারও ওজন মেলে। আকাশ থেকে মাটি পর্যন্ত হাওয়া অাছে অনেক মাইল ধরে । সেই হাওয়ার চাপ একফুট লম্বা ও একফুট চওড়া জিনিসের উপর প্রায় সাতাশ মন । একজন সাধারণ মানুষের শরীরে চাপ পড়ে প্রায় ৪০০ মনের উপর । তবুও তা টের পাইনে। যেমন উপর থেকে তেমনি নিচের থেকে, আবার আমাদের শরীরের মধ্যে যে হাওয়া আছে তার থেকে সমানভাবে বাতাসের চাপ আর ঠেলা লাগছে ব’লে বাতাসের ভার আমাদের পীড়া দিচ্ছে না । পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল আপন আবরণে দিনের বেলায় সূর্যের তাপ অনেকটা ঠেকিয়ে রাখে, আর রাত্রিতে মহাশূন্যের প্রবল ঠাণ্ডাটাকেও বাধা দেয়। চাদের গায়ে হাওয়ার উড়নি নেই তাই সে সূর্যের তাপে ফুটন্ত জলের সমান গরম হয়ে ওঠে । অথচ গ্রহণের সময় যখনি পৃথিবী চাদের উপর ছায় ফেলে অমনি দেখতে দেখতেই সে ঠাণ্ড হয়ে যায়। হাওয়া থাকলে Σ Σ ο ভূলোক তাপটাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারত । চাদের কেবল এইমাত্র ক্রটি নয়, বাতাস নেই ব’লে সে একেবারে বোবা, কোথাও একটু শব্দ হবার জো নেই। বিশেষভাবে নাড়া পেলে বাতাসে নানা আয়তনের সূক্ষ্ম ঢেউ ওঠে, সেইগুলো নানা কাপনের ঘা দেয় আমাদের কানের ভিতরকার পাতল৷ চামড়ায়, তখন সেইসব ঢেউ নানারকম আওয়াজ হয়ে আমাদের কাছে সাড়া দিতে থাকে। আরো একটি কাজ আছে বাতাসের । কোনো কারণে রৌদ্র যেখানে কিছু বাধা পায় সেখানে ছায়াতেও যথেষ্ট আলো থাকে, এই আলে৷ বিছিয়ে দেয় বাতাস । নইলে যেখানটিতে রোদ পড়ত কেবল সেইখানেই আলো হোত । ছায়া ব’লে কিছুই থাকত না । তীব্র আলোর ঠিক পাশেই থাকত ঘোর অন্ধকার । গাছের মাথার উপর রোদর উঠত চোখ রাঙিয়ে আর তার তল৷ হোত মিশমিশে কালো, ঘরের ছাদে বা বা করত দুই পহরের রোদের তেজ, ঘরের ভিতর থাকত দুই পহরের অমাবস্যার রাত্রি । প্রদীপ জ্বালার কথা চিন্তা করাই হোত মিথ্যে, কেননা পৃথিবীর বাতাসে অক্সিজেন গ্যাসের সাহায্যেই সব-কিছু জ্বলে । গাছের সবুজ পাতায় থাকে গোলাকার অণুপদার্থ, তাদের মধ্যে ক্লোরোফিল ব’লে একটি পদার্থ আছে—তারাই সূর্যের আলে। জমা করে রাখে গাছের নানা বস্তুতে । তাদের > S > বিশ্বপরিচয় শক্তিতেই তৈরি হচ্ছে ফলে ফসলে আমাদের খাদ্য, আর গাছের ডালেতে গুড়ির কাঠ । পৃথিবীর বাতাসে আছে অঙ্গারাক্সিজেনী গ্যাস সামান্য পরিমাণে । উদ্ভিদবস্তুতে যত অঙ্গার পদার্থ আছে, যার থেকে কয়লা হয়, সমস্ত এই গ্যাস থেকে নেওয়া । এই অক্সিজেনী অtঙ্গারিক গ্যাস মানুষের দেহে কেবল যে কাজে লাগে না তা নয়, একে শরীর থেকে বের করে দিতে না পারলে আমরা মারা পড়ি । কিন্তু গাছ আপন ক্লোরোফিলের যোগে এই অক্সিজেনী আঙ্গারিকেও জলে মিশিয়ে ধানে গমে আমাদের জন্য যে খাবার বানিয়ে তোলে, সেই খাদ্যের ভিতর দিয়ে সূর্যতাপের শক্তিকে আমরা প্রাণের কাজে লাগতে পারি । এই শক্তিকে আকাশ থেকে নেবার ক্ষমতা আমাদের নেই, গাছের আছে। গাছের থেকে আমরা নিই ধার করে । পৃথিবীতে সমস্ত জন্তুরা মিলে যে অক্সিজেনমিশ্রিত অগঙ্গারিক বাপ নিশ্বাসের সঙ্গে বের করে দেয় সেটা লাগে গাছপালার প্রয়োজনে । আগুন জ্বালানি থেকে, উদ্ভিদ ও জন্তুদেহের পচানি থেকেও এই বাষ্প বাতাসে ছড়াতে থাকে। পৃথিবীতে কলকারখানায় রান্নার কাজে কয়লা যা পোড়ানো হয় সে বড়ো কম নয়। তার থেকে উদ্ভব হয় বহু কোটি মন আঙ্গারাক্সিজেনী গ্যাস । গাছের পক্ষে যে হাওয়ার ভোজের দরকার সেটা এমনি করে জুটতে থাকে ত্যাজ্য পদার্থ থেকে । S > २ ভূলোক বাতাসকে মৌলিক পদার্থ বলা চলে না, ওটা মিশল জিনিস। তাতে মিশেছে নানা গ্যাস কিন্তু মেলেনি, একত্রে অাছে, এক হয়নি । বাতাসে যে পরিমাণ অক্সিজেন তার প্রায় চারগুণ আছে নাইট্রোজেন । কেবলমাত্র নাইট্রোজেন থাকলে দম আটকিয়ে মরে যে তুম । কেবলমাত্র অক্সিজেনে আমাদের প্রাণবস্তু পুড়ে পুড়ে শেষ হয়ে যেত। এই প্রাণবস্তু কিছু পরিমাণ জ্বলে, আবার জ্বলতে কিছু পরিমাণ বাধা পায়, তবেই আমরা তুই বাড়াবাড়ির মাঝখানে থেকে বাচতে পারি। সমস্ত বায়ুমণ্ডল জলে স্যাৎসেঁতে । যে জল থাকে মেঘে, তার চেয়ে অনেক বেশি জল আছে হাওয়ায় । উপরকার বায়ুমণ্ডলে ভাঙা পরমাণুর বৈদ্যুত স্তরের কথা পূর্বে বলেছি। সে ছাড়া সহজ বাতাসের হুটো স্তর আছে। এর যে প্রথম থাকটা পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে, তার বৈজ্ঞানিক নাম troposphere, বাংলায় একে ক্ষুব্ধ স্তর বলা যেতে পারে। পাচ থেকে দশ মাইলের বেশি এর চড়াই নয়। সমগ্র বায়ুমণ্ডলের মাপে এই ক্ষুব্ধ স্তরের উচ্চতা খুবই কম, কিন্তু এইটুকুর মধ্যেই আছে বাতাসের সমস্ত পদার্থের প্রায় ৯০ ভাগ। কাজেই অন্য স্তরের চেয়ে এ স্তর অনেক বেশি ঘন। পৃথিবীর একেবারে গায়ে লেগে আছে ব’লে এই স্তরে সর্বদা পৃথিবীর উত্তাপের ছোয়াচ লাগে। সেই উত্তাপের কমায় বাড়ায় হাওয়া এখানে >)○ বিশ্বপরিচয় ক্রমাগত ছুটোছুটি করে । এই স্তরেই তাই ঝড়বৃষ্টি । এর আরো উপরে যে স্তর, পৃথিবীর তাপ সেখানে ঝড় তুফান চালান করতে পারে না । তাই সেখানকার হাওয়া শান্ত । পণ্ডিতেরা এ স্তরের নাম দিয়েছেন stratosphere, বাংলায় আমরা বলব স্তব্ধ স্তর । আদি সূর্য থেকে যেমন পৃথিবী বেরিয়ে এসেছে তেমনি বাষ্পদেহী আদিম পৃথিবী থেকে বেরিয়ে এসেছে চাদ । তার পরে কোটি কোটি বৎসরে পৃথিবী ঠাণ্ডা হয়ে শক্ত হোলো, চাদও হোলো তাই । ২ লক্ষ ৩৯ হাজার মাইল দূরে থেকে ২৭ দিনে চাদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করছে। সেই প্রদক্ষিণের কালে কেবল একটা পিঠ পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে রেখেছে। এর ব্যাস প্রায় ২১৬০ মাইল, এর উপাদান জল থেকে ৩০ গুণ ভারি। অন্যান্ত গ্রহনক্ষত্রের তুলনায় পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব খুবই কম বলে একে এত উজ্জল ও আয়তনে এত বড়ো দেখায়। আশিটি চাদ একসঙ্গে ওজন করলে পৃথিবীর ওজনের সমান হবে । তুরবীনে চাদকে দেখলে স্পষ্টই বোঝা যায় পৃথিবীর মতোই শক্ত জিনিসে এ তৈরি। ওর উপরে আছে বড়ো বড়ো গহবর আর বড়ো বড়ো পাহাড় । পৃথিবীর টানে চন্দ্র পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে। এক পাক ঘুরতে তার এক মাসের কিছু কম লাগে। গড়পড়তায় Ꮌ Ꮌ8 ভূলোক তার গতিবেগ এক সেকেণ্ডে আধ মাইলের বেশি নয়। পৃথিবী ঘোরে সেকেণ্ডে উনিশ মাইল । আপন মেরুদণ্ডের চারদিকে ঘুরতে চাদের একমাসের সমানই লাগে । তার দিন আর বৎসর চলে একই রকম ধীর মন্দ চালে । «]} চাদের ওজন থেকে হিসেব করা হয়েছে যে কোনো জিনিসের গতিবেগ যদি সেখানে সেকেণ্ডে দেড় মাইল হয় তা হোলে চাদের টান অগ্রাহ ক’রে তা ছুটে বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে । চাদ যে-নিয়মে অতিমাত্রায় রোদ পোহtয় তাতে তার তেতে ওঠা পিঠের উপরে হাওয়া অত্যন্ত গরম হয়ে ওঠাতে চাদ তার বাতাসের অণুদের ধরে রাখতে পারেনি, তা’রা সবাই গেছে বেরিয়ে । যেখানে হাওয়ার চাপ নেই সেখানে জল খুব তাড়াতাড়ি বাষ্প হয়ে যায়। বাষ্প হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জলের অণু গরমে চঞ্চল হয়ে চাদের বাধন ছাড়িয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল । জল হাওয়া যেখানে নেই সেখানে কোনো রকমের প্রাণ টিকতে পারে বলে আমরা জানিনে । চাদকে একটা তালপাকানো মরুভূমি বলা যেতে পারে। রাতের বেলায় যাদের আমরা খসে-পড়া তারা বলি সেগুলো যে তারা নয় তা আজ আর কাউকে বলতে হবে না। সেই উল্কাপিণ্ডগুলো পৃথিবীর টানে দিনরাত লাখো লাখে। পড়ছে পৃথিবীর উপর। তার অধিকাংশই বাতাসের ঘোষ লেগে জ্বলে উঠে ছাই হয়ে যাচ্ছে । যেগুলো বড়ো আয়তনের, S SQ বিশ্বপরিচয় তা’র জ্বলতে জ্বলতে মাটিতে এসে পৌঁছয়, বোমার মতো যায় ফেটে, চারদিকে যা পায় দেয় ছারখার ক’রে । চাদেও ক্রমাগত এই উল্কাবৃষ্টি হচ্ছে। ওদের ঠেকিয়ে ছাই ক’রে দেবার মতো একটু হাওয়া নেই, অবাধে ওরা ঢেলা মারছে চাদের সর্বাঙ্গে । বেগ কম নয়, সেকেণ্ডে প্রায় ত্রিশ মাইল, সুতরাং ঘা মারে সর্বনেশে জোরে । চাদে বড়ো বড়ো গর্তের উৎপত্তি একদা উৎসারিত অগ্নিউৎস থেকেই । যে গলন্ত পদার্থ ও ছাই তখন বেরিয়ে এসেছিল, হাওয়া জল না থাকায় এত যুগ ধরেও তাদের কোনো বদল হোতে পারেনি। ছাইঢাকা অাছে ব’লে সূর্যের অালো এই আবরণ ভেদ ক’রে খুব বেশি নিচে যেতে পারে না, আর নিচের উত্তাপও উপরে আসতে পারে না । চাদের যেদিকে সূর্যের আলো পড়ে তার উত্তাপ প্রায় ফুটন্ত জলের সমান, আর যেখানে আলো পড়ে না, তা এত ঠাণ্ডা হয় যে বরফের শৈত্যের চেয়ে তা প্রায় ২৫০ ফারেনহাইট ডিগ্রি নিচে থাকে। চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথিবীর ছায়। এসে যখন চাদের উপরে পড়ে তখন তার উত্তাপ কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রায় ৩৪৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট কমে যায়। হাওয়া না থাকায় ও ছাইয়ের আবরণ থাকায় সূর্যের আলো নিচে প্রবেশ করতে পারে না ব’লে সঞ্চিত কোনে। উত্তাপই চাদে নেই ; তাই এত তাড়াতাড়ি এর উত্তাপ কমে >>や