বিশ্বভারতী
শান্তিনিকেতন-বিদ্যালয়ের পঞ্চাশবর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত
৭ পৌষ ১৩৫৮
প্রকাশক শ্রীপুলিনবিহারী সেন
বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ,
৬।৩ দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন, কলিকাতা
মুদ্রাকর শ্রীগোপালচন্দ্র রায়
নাভানা প্রিন্টিং ওআর্কস লিমিটেড,
পি ১৬ গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ, কলিকাতা
শ্রীপুলিনবিহারী সেন কর্তৃক সংকলিত
বিশ্বভারতী
এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য বাংলা রচনা নিম্নোক্ত গ্রন্থগুলিতে পাওয়া যাইবে— শিক্ষা; আশ্রমের রূপ ও বিকাশ; প্রাক্তনী; প্রতিষ্ঠা দিবসের উপদেশ ও প্রথম কার্যপ্রণালী।
এতদ্ব্যতীত, শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক ও ছাত্রদিগকে আশ্রমের আদর্শ সম্বন্ধে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল হইতে আশ্রমগুরু জীবনের বিভিন্ন পর্বে যে অসংখ্য চিঠিপত্র লিখিয়াছেন তাহার কতক অংশ বিভিন্ন সাময়িক পত্রে বা গ্রন্থে প্রকাশিত হইয়াছে, অবশিষ্ট অংশ মুদ্রণ-অপেক্ষায় আছে।
যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্॥
পরিশিষ্ট
এই আশ্রমের গুরুর অনুজ্ঞায় ও আপনাদের অনুমতিতে আমাকে যে সভাপতির ভার দেওয়া হল তাহা আমি শিরোধার্য করে নিচ্ছি। আমি এ ভারের সম্পূর্ণ অযোগ্য। কিন্তু আজকের এই প্রতিষ্ঠান বিপুল ও বহুযুগব্যাপী। তাই ব্যক্তিগত বিনয় পরিহার করে আমি এই অনুষ্ঠানে ব্রতী হলাম। বহু বৎসর ধরে এই আশ্রমে একটা শিক্ষার কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এই ধরনের এডুকেশনাল এক্স্পেরিমেণ্ট দেশে খুব বিরল। এই দেশ তো আশ্রম-সংঘ-বিহারের দেশ। কোথাও কোথাও ‘গুরুকুল’এর মতো দু-একটা এমনি বিদ্যালয় থাকলেও, এটি এক নূতন ভাবে অনুপ্রাণিত। এর স্থান আর কিছুতে পূর্ণ হতে পারে না। এখানে খোলা আকাশের নীচে প্রকৃতির ক্রোড়ে মেঘরৌদ্রবৃষ্টিবাতাসে বালকবালিকারা লালিতপালিত হচ্ছে। এখানে শুধু বহিরঙ্গ-প্রকৃতির আবির্ভাব নয়, কলাসৃষ্টির দ্বারা অন্তরঙ্গপ্রকৃতিও পারিপার্শ্বিক অবস্থায় জেগে উঠেছে। এখানকার বালক বালিকারা এক পরিবারভুক্ত হয়ে আচার্যদের মধ্যে রয়েছে। একজন বিশ্বপ্রাণ পার্সনালিটি এখানে সর্বদাই এর মধ্যে জাগ্রত রয়েছেন। এমনিভাবে এই বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। আজ সেই ভিত্তির প্রসার ও পূর্ণাঙ্গতা সাধন হতে চলল। আজ এখানে বিশ্বভারতীর অভ্যুদয়ের দিন। ‘বিশ্বভারতী’র কোষানুযায়িক অর্থের দ্বারা আমরা বুঝি যে, যে ‘ভারতী’ এতদিন অলক্ষিত হয়ে কাজ করছিলেন আজ তিনি প্রকট হলেন। কিন্তু এর মধ্যে আর-একটি ধ্বনিগত অর্থও আছে—বিশ্ব ভারতের কাছে এসে পৌঁছবে, সেই বিশ্বকে ভারতীয় করে নিয়ে আমাদের রক্তরাগে অনুরঞ্জিত করে, ভারতের মহাপ্রাণে অনুপ্রাণিত করে আবার সেই প্রাণকে বিশ্বের কাছে উপস্থিত করব। সেই ভাবেই বিশ্বভারতীর নামের সার্থকতা আছে।
একটা কথা আমাদের স্মরণ রাখতে হবে। ভারতের মহাপ্রাণ কোন্টা। যে মহাপ্রাণ লুপ্তপ্রায় হয়ে এসেছে তাকে ধরতে গিয়ে আমরা যদি বিশ্বের সঙ্গে কারবার স্থাপন ও আদানপ্রদান না করি তবে আমাদের আত্মপরিচয় হবে না। Each can realize himself only by helping others as a whole to realize them selves এ যেমন সত্য, এর converse অর্থাৎ others can realize themselves by helping each individual to realize himselfও তেমনি সত্য। অপরে আমার লক্ষ্যের পথে, যাবার পথে যেমন মধ্যবর্তী তেমনি আমিও তার মধ্যবর্তী; কারণ আমাদের উভয়কে যেখানে ব্রহ্ম বেষ্টন করে আছেন সেখানে আমরা এক, একটি মহা ঐক্যে অন্তরঙ্গ হয়ে আছি। এ ভাবে দেখতে গেলে, বিশ্বভারতীতে ভারতের প্রাণ কী তার পরিচয় পেতে হবে, তাতে করে জগতের যে পরিচয় ঘটবে তার রূপে আত্মাকে প্রতিফলিত দেখতে পাব।
আমি আজ ভারতবর্ষ সম্বন্ধে কিছু বলতে চাই। আজ জগৎ জুড়ে একটি সমস্যা রয়েছে। সর্বত্রই একটা বিদ্রোহের ভাব দেখা যাচ্ছে—সে বিদ্রোহ প্রাচীন সভ্যতা, সমাজতন্ত্র, বিদ্যাবুদ্ধি, অনুষ্ঠান, সকলের বিরুদ্ধে। আমাদের আশ্রম দেবালয় প্রভৃতি যা-কিছু হয়েছিল তা যেন সব ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে। বিদ্রোহের অনল জ্বলছে, তা অর্ডার-প্রগ্রেসকে মানে না, রিফর্ম চায় না, কিছুই চায় না। যে মহাযুদ্ধ হয়ে গেল এই বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে তার চেয়ে বড়ো যুদ্ধ চলে আসছে, গত মহাযুদ্ধ তারই একটা প্রকাশ মাত্র। এই সমস্যার পূরণ কেমন করে হবে, শান্তি কোথায় পাওয়া যাবে। সকল জাতিই এর উত্তর দেবার অধিকারী। এই সমস্যায় ভারতের কী বলবার আছে, দেবার আছে?
আমরা এত কালের ধ্যানধারণা থেকে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছি তার দ্বারা এই সমস্যা পূরণ করবার কিছু আছে কি না। য়ুরোপে এ সম্বন্ধে যে চেষ্টা হচ্ছে সেটা পোলিটিকাল অ্যাড্মিনিস্ট্রেশনের দিক দিয়ে হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিক ভিত্তির উপর ট্রীটি, কন্ভেন্শন, প্যাক্ট্-এর ভিতর দিয়ে শান্তিস্থাপনের চেষ্টা হচ্ছে। এ হবে এবং হবার দরকারও আছে। দেখছি সেখানে মাল্টিপল্ অ্যালায়েন্স্ হয়েও হল না, বিরোধ ঘটল। আর্বিট্রেশন কোর্ট, এবং হেগ-কন্ফারেন্সে হল না, শেষে লীগ অব নেশন্স্-এ গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার অবলম্বন হচ্ছে limitation of armaments। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে, এ ছাড়া আরও অন্য দিকে চেষ্টা করতে হবে; কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে নয়, সামাজিক দিকে এর চেষ্টা হওয়া দরকার। Universal simultaneous disarmament of all nations-এর জন্য নূতন হিউম্যানিজ্মের রিলিজ্যস মুভ্মেণ্ট্ হওয়া উচিত। তার ফলস্বরূপ যে মেশিনারি হবে তা পার্লামেণ্ট বা ক্যাবিনেটের ডিপ্লোম্যাসির অধীনে থাকবে না। পার্লামেণ্টসমূহের জয়েণ্ট্ সিটিং তো হবেই, সেইসঙ্গে বিভিন্ন People-এর ও কন্ফারেন্স্ হলে তবেই শান্তির প্রতিষ্ঠা হতে পারে। কিন্তু একটা জিনিস আবশ্যক হবে—mass-এর life, mass-এর religion। বর্তমান কালে কেবলমাত্র individual salvation-এ চলবে না; সর্বমুক্তিতেই এখন মুক্তি, না হলে মুক্তি নেই। ধর্মের এই mass life-এর দিকটা সমাজে স্থাপন করতে হবে।
ভারতের এ সম্বন্ধে কী বাণী হবে। ভারতও শান্তির অনুধাবন করেছে, চীনদেশও করেছে। চীনে সামাজিক দিক দিয়ে তার চেষ্টা হয়েছে। যদি social fellowship of man with man হয় তবেই international peace হবে, নয় তো হবে না। কন্ফ্যুসিয়সের গোড়ার কথাই এই যে, সমাজ একটা পরিবার, শান্তি সামাজিক ফেলোশিপ-এর উপর স্থাপিত; সমাজে যদি শান্তি হয় তবেই বাইরে শান্তি হতে পারে। ভারতবর্ষে এর আর-একটা ভিত্তি দেওয়া হয়েছে, তা হচ্ছে অহিংসা মৈত্রী শান্তি। প্রত্যেক individual-এ বিশ্বরূপদর্শন এবং তারই ভিতর ব্রহ্মের ঐক্যকে অনুভব করা; এই ভাবের মধ্যে যে peace আছে ভারতবর্ষ তাকেই চেয়েছে। ব্রহ্মের ভিত্তিতে আত্মাকে স্থাপন করে যে peace compact হবে তাতেই শান্তি আনবে। এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় চীনদেশের সোশ্যাল ফেলোশিপ এবং ভারতের আত্মার শান্তি এই দুইই চাই, নতুবা লীগ অব নেশন্স্-এ কিছু হবে না। গ্রেট ওঅর-এর থেকেও বিশালতর যে দ্বন্দ্ব জগৎ জুড়ে চলছে তার জন্য ভারতবর্ষের পক্ষ থেকে বিশ্বভারতীকে বাণী দিতে হবে।
ভারতবর্ষ দেখেছে যে, রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষেত্রে যে State আছে তা কিছু নয়। সে বলেছে যে, নেশনের বাইরেও মহা সত্য আছে, সনাতন ধর্মেই তার স্বাজাত্য রয়েছে। যেখানে আত্মার বিকাশ ও ব্রহ্মের আবির্ভাব সেখানেই তাহার দেশ। ভারতবর্ষ ধর্মের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে এই extraterritorial nationality-তে বিশ্বাস করেছে। এই ভাবের অনুসরণ করে লীগ অব নেশন্স্-এর ন্যাশনালিটির ধারণাকে সংশোধিত করতে হবে। তেমনি আত্মার দিক দিয়ে extra-territorial sovereigntyর ভাবকে স্থান দিতে হবে। এমনিভাবে Federation of the World স্থাপিত হতে পারে, এখনকার সময়ের উপযোগী করে লীগ অব নেশন্স্-এ এই extra-territorial nationalityর কথা উত্থাপন করা যেতে পারে। ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় দিক দিয়ে এই বাণী দেবার আছে। আমরা দেখতে পাই যে, বৌদ্ধ প্রচারকগণ এই ভাবটি প্রচার করেছিলেন যে, প্রত্যেক রাজার code এমন হওয়া উচিত যা শুধু নিজের জাতির নয়, অপর সব জাতির সমানভাবে হিতসাধন করতে পারবে। ভারতের ইতিহাসে এই বিধিটি সর্বদা রক্ষিত হয়েছে, তার রাজারা জয়ে পরাজয়ে, রাজচক্রবর্তী হয়েও, এমনি করে আন্তর্জাতিক সম্বন্ধকে স্বীকার করেছেন।
সামাজিক জীবন সম্বন্ধে ভারতবর্ষের মেসেজ্ কী। আমাদের এখানে গ্রুপ ও কম্যুনিটির স্থান খুব বেশি। এরা intermediary body between state and individual। রোম প্রভৃতি দেশে রাষ্ট্রব্যবস্থার ফলে স্টেট ও ইন্ডিভিজুয়ালে বিরোধ বেধেছিল; শেষে ইন্ডিভিজুয়ালিজ্মের পরিণতি হল অ্যানার্কিতে, এবং স্টেট, মিলিটারি সোশ্যালিজ্মে গিয়ে দাঁড়াল। আমাদের দেশের ইতিহাসে গ্রামে বর্ণাশ্রমে এবং ধর্মসংঘের ভিতরে কম্যুনিটির জীবনকেই দেখতে পাই। বর্ণাশ্রমে যেমন প্রতি ব্যক্তির কিছু প্রাপ্য ছিল, তেমনি তার কিছু দেয়ও ছিল, তাকে কতকগুলি নির্ধারিত কর্তব্য পালন করতে হত। Community in the Individual যেমন আছে তেমনি the Individual in the Communityও আছে। প্রত্যেকের ব্যক্তিজীবনে গ্রুপ পার্সনালিটি এবং ইন্ডিভিজুয়াল পার্সনালিটি জাগ্রত আছে, এই উভয়েরই সমান প্রয়োজন আছে। গ্রুপ পার্সনালিটির ভিতর ইন্ডিভিজুয়ালের স্বাধিকারকে স্থান দেওয়া দরকার। আমাদের দেশে ত্রুটি রয়ে গেছে যে, আমাদের ইন্ডিভিজুয়াল পার্সনালিটির বিকাশ হয় নি, co-ordination of power in the stateও হয় নি। আমরা ইন্ডিভিজুয়াল পার্সনালিটির দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, ব্যূহবদ্ধ শত্রুর হাতে আমাদের লাঞ্ছিত হতে হয়েছে।
আজকাল য়ুরোপে group principle-এর দরকার হচ্ছে। সেখানে political organization, economic organization, এসবই group গঠন করার দিকে যাচ্ছে। আমাদেরও এই পথে সমস্যাপূরণ করবার আছে। আমাদের যেমন য়ুরোপের কাছ থেকে স্টেটের centralization ও organization নেবার আছে তেমনি য়ুরোপকেও group principle দেবার আছে। আমরা সে দেশ থেকে economic organization-কে গ্রহণ করে আমাদের village community-কে গড়ে তুলব। কৃষিই আমাদের জীবনযাত্রার প্রধান অবলম্বন, সুতরাং ruralization-এর দিকে আমাদের চেষ্টাকে নিয়োগ করতে হবে। অবশ্য আমি সেজন্য বলছি না যে, town life-কে develop করতে হবে না; তারও প্রয়োজন আছে। কিন্তু আমাদের ভূমির সঙ্গে প্রাণের যোগ-সাধন করতে হবে। ভূমির সঙ্গে ownership-এর সম্বন্ধ হলে তবে স্বাধীনতা থাকতে পারে। কারখানার জীবনও দরকার আছে, কিন্তু ভূমি ও বাস্তুর সঙ্গে individual ownership-এর যোগকে ছেড়ে না দিয়ে large-scale production আনতে হবে। বড়ো আকারে energyকে আনতে হবে, কিন্তু দেখতে হবে, কলের energy মানুষের আত্মাকে পীড়িত অভিভূত না করে, যেন জড় না করে দেয়। সমবায়প্রণালীর দ্বারা হাতের কলকেও দেশে স্থান দিতে হবে। এমনিভাবে economic organization-এ ভারতকে আত্মপরিচয় দিতে হবে। আমাদের স্ট্যাণ্ডার্ড অব লাইফ এত নিম্ন স্তরে আছে যে, আমরা decadent হয়ে মরতে বসেছি। যে প্রণালীতে efficient organization-এর নির্দেশ করলাম তাকে না ছেড়ে বিজ্ঞানকে আমাদের প্রয়োজনসাধনে লাগাতে হবে। আমাদের বিশ্বভারতীতে তাই, রাষ্ট্রনীতি সমাজধর্ম ও অর্থনীতির যে যে ইন্ষ্টিট্যুশন পৃথিবীতে আছে, সে সবকেই স্টডি করতে হবে, এবং আমাদের দৈন্য কেন ও কোথায় তা বুঝে নিয়ে আমাদের অভাব পূরণ করতে হবে। কিন্তু এতে করে নিজের প্রাণকে ও সৃজনীশক্তিকে যেন বাইরের চাপে নষ্ট না করি। যা-কিছু গ্রহণ করব তাকে ভারতের ছাঁচে ঢেলে নিতে হবে। আমাদের সৃজনীশক্তির দ্বারা তারা coined into our flesh and blood হয়ে যাওয়া চাই।
ভিন্ন ভিন্ন জাতির স্কীম অব লাইফ আছে কিন্তু তাদের ইতিহাস ও ভূপরিচয়ের মধ্যেও একটি বৃহৎ ঐক্য আছে, এই বিভিন্নতার মধ্যেও এক জায়গায় unity of human race আছে। তাদের সেই ইতিহাস ও ভূগোলের বিভিন্ন environment-এর জন্য যে life values সৃষ্ট হয়েছে, পরস্পরের যোগাযোগের দ্বারা তাদের বিস্তৃতি হওয়া প্রয়োজন। এই লাইফ-স্কীমগুলির আদানপ্রদানে বিশ্বে তাদের বৃহৎ লীলাক্ষেত্র তৈরি হবে।
আমাদের জাতীয় চরিত্রে কী কী অভাব আছে, কী কী আমাদের বাইরে থেকে আহরণ করতে হবে। আমাদের মূল ত্রুটি হচ্ছে, আমরা বড়ো একপেশে—ইমোশনাল। আমাদের ভিতরে will ও intellect-এর মধ্যে, সব্জেক্টিভিটি ও অব্জেক্টিভিটির মধ্যে চিরবিচ্ছেদ ঘটেছে। আমরা হয় খুব সব্জেক্টিভ, নয়তো খুব য়ুনিভার্সাল। অনেক সময়েই আমরা য়ুনিভার্সালিজ্মের বা সাম্যের চরম সীমায় চলে যাই, কিন্তু differentiation-এ যাই না। আমাদের অব্জেক্টিভিটির প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও পূর্ণ বিকাশ হওয়া দরকার। অব্জার্ভেশনের ভিতর দিয়ে মনের সত্যানুবর্তিতাকে ও শৃঙ্খলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আমাদের intellect-এর character-এর অভাব আছে, সুতরাং আমাদের intellectual honesty-র প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে। তা হলেই দেখব যে, কর্তব্যবোধ জাগ্রত হয়েছে। অন্য দিকে আমাদের moral ও personal responsibilityর-বোধকে জাগাতে হবে, Law, Justice ও Equality-র যা লুপ্ত হয়ে গেছে তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে—এসকল বিষয়ে আমাদের শিক্ষা আহরণ করতে হবে। আমাদের মধ্যে বিশ্বকে না পেলে আমরা নিজেকে পাব না। তাই বিশ্বরূপকে প্রতিষ্ঠিত করে আমরা আত্মপরিচয় লাভ করব এবং আমাদের বাণী বিশ্বকে দেব।
এ দেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু সেখান থেকে cast iron ও rigid standardized product তৈরি হচ্ছে। শান্তিনিকেতনে naturalness-এর স্থান হয়েছে, আশা করি বিশ্বভারতীতে সেই spontaneityর বিকাশের দিকে দৃষ্টি থাকবে। য়ুনিভার্সিটিকে জাতীয় প্রতিষ্ঠান বলা যেতে পারে। এশিয়ার genius য়ুনিভার্সাল হিউম্যানিজ্ম্-এর দিকে, অতএব ভারতের এবং এশিয়ার interesteএ এরূপ একটি য়ুনিভার্সিটির প্রয়োজন আছে। পূর্বে যে সংঘ ও বিহারের দ্বারা ভারতের সার্থকতা-সাধন হয়েছিল, তাদেরই এ যুগের উপযোগী করে, সেই পুরাতন আরণ্যককে বিশ্বভারতী রূপে এখানে পত্তন করা হয়েছে।
বিশ্বভারতী পরিষদ্-সভার
প্রতিষ্ঠা-উৎসবে
সভাপতির অভিভাষণ
গ্রন্থপরিচয়
১৩০৮ সালের ৭ পৌষ শান্তিনিকেতন ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপিত হয়; ১৩২৮ সালের ৮ পৌষ বিশ্বভারতী পরিষদ্ সভার প্রতিষ্ঠা।
আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হইবার বহু পূর্ব হইতেই শান্তিনিকেতনে ‘সর্বমানবের যোগসাধনের সেতু’ রচনার কল্পনা রবীন্দ্রনাথের মনকে ক্রমশ অধিকার করিতে থাকে; শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক ও ছাত্রদিগকে লিখিত কোনো কোনো পত্রে তাহার আভাস পাওয়া যায়।
‘সিকাগো। ৩ মার্চ [ ১৯১৩ ]। · ·এখানে মানুষের শক্তির মূর্তি যে পরিমাণে দেখি পূর্ণতার মূর্তি সে পরিমাণে দেখতে পাই নে। · ·মানুষের শক্তির যতদূর বাড় হবার তা হয়েছে, এখন সময় হয়েছে যখন যোগের জন্যে সাধনা করতে হবে। আমাদের বিদ্যালয়ে আমরা কি সেই যুগসাধনার প্রবর্তন করতে পারব না? মনুষ্যত্বকে বিশ্বের সঙ্গে যোগযুক্ত করে তার আদর্শ কি আমরা পৃথিবীর সামনে ধরব না? · ·মানুষকে তার সফলতার সুরটি ধরিয়ে দেবার সময় এসেছে। আমাদের শান্তিনিকেতনের পাখিদের কণ্ঠে সেই সুরটি কি ভোরের আলোয় ফুটে উঠবে না?’ · · · ·তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা বৈশাখ ১৩২০। প্রবাসী জ্যৈষ্ঠ ১৩২০, কষ্টিপাথর।
‘লস এঞ্জেলস্। ১১ অক্টোবর ১৯১৬। · ·তার পরে এও আমার মনে আছে যে, শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়কে বিশ্বের সঙ্গে ভারতের যোগের সূত্র করে তুলতে হবে—ঐখানে সার্বজাতিক মনুষ্যত্বচর্চার কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে—স্বাজাতিক সংকীর্ণতার যুগ শেষ হয়ে আসছে— ভবিষ্যতের জন্য যে বিশ্বজাতিক মহামিলনযজ্ঞের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে তার প্রথম আয়োজন ঐ বোলপুরের প্রান্তরেই হবে। ঐ জায়গাটিকে সমস্ত জাতিগত ভূগোলবৃত্তান্তের অতীত করে তুলব এই আমার মনে আছে—সর্বমানবের প্রথম জয়ধ্বজা ঐখানে রোপণ হবে।’—‘চিঠিপত্র’ ২।
‘· ·বিশ্বভারতীর উদ্যোগ। গত [ ১৩২৫ ] ৮ই পৌষে তাহার সূচনা হয় এবং গত বৎসরই চিত্র, সংগীত প্রভৃতি কলা এবং সংস্কৃত, পালি, ইংরেজি প্রভৃতি সাহিত্যের অধ্যাপনার কাজ আরম্ভ হয়।’ ‘গত বৎসর [ ১৩২৫ ] ৮ই পৌষে আশ্রমের বার্ষিক উৎসবের দিনে বিশ্বভারতী স্থাপিত হয়, এবং বর্তমান বৎসরের [ ১৩২৬ ] ১৮ই আষাঢ় ইহার নিয়মানুযায়ী কার্যের আরম্ভ হয়।’ ‘বিগত ২৩ ডিসেম্বর [ ১৯২১ ] ৮ পৌষ [ ১৩২৮ ] · ·বিশ্বভারতীর সাংবংসরিক · ·সভায় বিশ্বভারতী পরিষদ্ গঠিত হয় এবং বিশ্বভারতীর জন্য যে সংস্থিতি (constitution) প্রণীত হইয়াছে তাহা গৃহীত হয়’—এই তারিখই বর্তমানে বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠা দিবস বলিয়া স্বীকৃত; এই দিন ‘সর্বসাধারণের হাতে তাকে সমর্পণ’ করা হয়।
বিশ্বভারতীর সূচনা হইবার পর, রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে নিমন্ত্রিত হইয়া The Centre of Indian Culture প্রভৃতি প্রবন্ধে শিক্ষার সম্বন্ধে তাহার আদর্শ ব্যাখ্যা করেন (১৯১৯)। ‘আমাদের দেশে শিক্ষার আদর্শ কী হওয়া উচিত সে সম্বন্ধে আমার প্রবন্ধ আমি কলিকাতায় এবং অন্য অনেক শহরে পাঠ করিয়াছি। বিষয়টি এত বড়ো যে আমাদের এই ছোটো পত্রপুটে তাহা ধরিবে না। সংক্ষেপে তাহার মর্মটুকু এখানে বলি।’ এই ‘মর্ম’ শান্তিনিকেতন পত্রের ১৩২৬ বৈশাখ সংখ্যায় ‘বিশ্বভারতী’ নামে প্রকাশিত হয়; উহাই বর্তমান গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ।
‘শিক্ষাকে কেমন করিয়া সত্য এবং প্রাণের জিনিস করা যায়’ এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নানা চিন্তা এই সময় শান্তিনিকেতন পত্রে · ·ধারাবাহিক প্রকাশিত হইতে থাকে—বিশ্বভারতী প্রসঙ্গে ইহার কোনো কোনো রচনা অংশতঃ উদ্ধৃত হইল—
‘আমাদের দেশে বর্তমানে দুই রকমের ভীরুতা দেখা যায়। কাহারও ভীরুতা দেশী প্রকৃতিকে রক্ষা করিতে; কাহারও ভীরুতা য়ুরোপীয় শিক্ষা গ্রহণ করিতে। যাঁহারা এই দুই ভীরুতাকেই অতিক্রম করিয়াছেন তাঁহারাই ভারতবর্ষকে বাঁচাইবেন। মৈসুরের রাজাসন এই দুই ভয়কেই ছাড়াইয়া উঠিয়াছে।
‘এইজন্যই যখন মৈসুরের নূতন বিশ্ববিদ্যালয় দেখিলাম সেটা এতই বেসুরা বোধ হইল। ইহার মধ্যে আমাদের আপন কিছুই নাই, ইহা একেবারেই নকল। ইহাতেই বুঝিলাম, বিদ্যা সম্বন্ধে ভারতবর্ষ আপন সাহস একেবারেই হারাইয়া ফেলিয়াছে। যে বিদ্যালয়কে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় বলিয়া থাকি তাহার মধ্যে ভারতবর্ষকে বড়ো জায়গা দিতে আমরা কুণ্ঠিত। যেন বিদ্যাশিক্ষা সম্বন্ধে য়ুরোপের বাহিরে বিশ্বই নাই। যেন বিশ্বের মধ্যে ভারতবর্ষ বলিয়া পদার্থের অস্তিত্বই মেলে না, অথবা অণুবীক্ষণের সাহায্যে ধূলিকণার মধ্যে তাহাকে খুঁটিয়া পাওয়া যায়; সেইজন্য মৈসুরের মতো স্থানেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঁঁটকাঠ, তাহার চৌকিটেবিল, তাহার পুঁথিপত্র, তাহার বিষয় ও আশয়ের মধ্যে ভারতবর্ষ নিতান্তই সংকুচিত ও প্রচ্ছন্ন হইয়া আছে। বিদ্যাগারের মধ্যে ভারতবর্ষের প্রতি এই আস্থার অভাব, এই সম্মানের অভাব যে কিরূপ গভীরভাবে আমাদের মনকে আত্ম অবিশ্বাসের মধ্যে চিরদিনের মতো মজ্জিত করিয়া দিতেছে সেকথা ভালো করিয়া বুঝিয়া দেখিবার পর্যন্ত শক্তি আমরা হারাইয়াছি। মৈসুরে আমাদের ভরসার বিষয় অনেক দেখিয়াছি তাই এখনও এই আশা মনে রাখিলাম যে একদিন মৈসুরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পশ্চিমের বাণীর সঙ্গে আমাদের ভারতীর একাসনে মিলন ঘটিবে—কিন্তু সেই আসনটি হইবে ভারতীরই আসন।’— মৈসুরের কথা, শাস্তিনিকেতন বৈশাখ ১৩২৬।
‘ভারতবর্ষের নানা স্থানেই নূতন নূতন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের চেষ্টা চলিতেছে। ইহাতেই বুঝা যায় শিক্ষা সম্বন্ধে আমাদের মনে একটা অসন্তোষ জন্মিয়াছে।
‘বর্তমান শিক্ষাপ্রণালীটাই যে আমাদের ব্যর্থতার কারণ, অভ্যাসগত অন্ধ মমতার মোহে সেটা আমরা কিছুতেই মনে ভাবিতে পারি না। ঘুরিয়া ফিরিয়া নূতন বিশ্ববিদ্যালয় গড়িবার বেলাতেও প্রণালী বদল করিবার কথা মনেই আসে না, তাই নূতনের ঢালাই করিতেছি সেই পুরাতনের ছাঁচে। নূতনের জন্য ইচ্ছা খুবই হইতেছে অথচ ভরসা কিছুই হইতেছে না। কেননা ঐটেই যে রোগ, এতদিনের শিক্ষা-বোঝার চাপে সেই ভরসাটাই যে সমূলে মরিয়াছে।’—অসন্তোষের কারণ, শান্তিনিকেতন জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬।
‘আমাদের দেশে বিদ্যাসমবায়ের একটি বড়ো ক্ষেত্র চাই, যেখানে বিদ্যার আদান প্রদান ও তুলনা হইবে, যেখানে ভারতীয় বিদ্যাকে মানবের সকল বিদ্যার ক্রমবিকাশের মধ্যে রাখিয়া বিচার করিতে হইবে।
‘তাহা করিতে গেলে ভারতীয় বিদ্যাকে তাহার সমস্ত শাখা-উপশাখার যোগে সমগ্র করিয়া জানা চাই। ভারতীয় বিদ্যার সমগ্রতার জ্ঞানটিকে মনের মধ্যে পাইলে তাহার সঙ্গে বিশ্বের সমস্ত বিদ্যার সম্বন্ধনির্ণয় স্বাভাবিক প্রণালীতে হইতে পারে। কাছের জিনিসের বোধ দূরের জিনিসের বোধের সহজ ভিত্তি।
‘বিদ্যার নদী আমাদের দেশে বৈদিক, পৌরাণিক, বৌদ্ধ, জৈন, প্রধানত এই চারি শাখায় প্রবাহিত। ভারত-চিত্তগঙ্গোত্রীতে ইহার উদ্ভব। কিন্তু, দেশে যে নদী চলিতেছে, কেবল সেই দেশের জলেই সেই নদী পুষ্ট না হইতেও পারে। ভারতের গঙ্গার সঙ্গে তিব্বতের ব্রহ্মপুত্র মিলিয়াছে। ভারতের বিদ্যার স্রোতেও সেইরূপ মিলন ঘটিয়াছে। বাহির হইতে মুসলমান যে জ্ঞান ও ভাবের ধারা এখানে বহন করিয়া আনিয়াছে সেই ধারা ভারতের চিত্তকে স্তরে স্তরে অভিষিক্ত করিয়াছে, তাহা আমাদের ভাষায় আচারে শিল্পে সাহিত্যে সংগীতে নানা আকারে প্রকাশমান। অবশেষে সম্প্রতি য়ুরোপীয় বিদ্যার বন্যা সকল বাঁধ ভাঙিয়া দেশকে প্লাবিত করিয়াছে; তাহাকে হাসিয়া উড়াইতেও পারি না, কাঁদিয়া ঠেকানোও সম্ভবপর নহে।
‘অতএব, আমাদের বিদ্যায়তনে বৈদিক, পৌরাণিক, বৌদ্ধ, জৈন, মুসলমান ও পার্সি বিদ্যার সমবেত চর্চায় আনুষঙ্গিকভাবে য়ুরোপীয় বিদ্যাকে স্থান দিতে হইবে।
‘সমস্ত পৃথিবীকে বাদ দিয়া যাহারা ভারতকে একান্ত করিয়া দেখে তাহারা ভারতকে সত্য করিয়া দেখে না। তেমনি যাহারা ভারতের কেবল এক অংশকেই ভারতের সমগ্রতা হইতে খণ্ডিত করিয়া দেখে তাহারাও ভারতচিত্তকে নিজের চিত্তের মধ্যে উপলব্ধি করিতে পারে না।· ·
‘ভারতে সেই চিত্তের ঐক্যকে পোলিটিকাল ঐক্যের চেয়ে বড়ো বলিয়া জানিতে হইবে; কারণ, এই ঐক্যে সমস্ত পৃথিবীকে ভারতবর্ষ আপন অঙ্গনে আহ্বান করিতে পারে। অথচ, দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের বর্তমান শিক্ষা এমন যে, সেই শিক্ষার গুণেই ভারতীয় চিত্তকে আমরা তাহার স্বরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিতেছি না।
‘ভারতের হিন্দু বৌদ্ধ জৈন মুসলমান শিখ পার্সি খৃস্টানকে এক বিরাট চিত্তক্ষেত্রে সত্যসাধনার যজ্ঞে সমবেত করাই ভারতীয় বিদ্যায়তনের প্রধান কাজ—ছাত্রদিগকে কেবল ইংরেজি মুখস্ত করানো, অঙ্ক কষানো, সায়ান্স শেখানো নহে।· ·―বিদ্যাসমবায়,[১] শান্তিনিকেতন আশ্বিন-কার্তিক ১৩২৬
‘গত [ ১৩২৬ ] ১৮ই আষাঢ় আশ্রমের অধিপতি শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের সভাপতিত্বে প্রারম্ভোৎসব সমাধা করিয়া বিশ্বভারতীর কার্য আরম্ভ করা হইয়াছে।’ এই কার্যারম্ভের দিনে রবীন্দ্রনাথ যে বক্তৃতা দেন তাহার সারসংকলন বর্তমান গ্রন্থের দ্বিতীয় প্রবন্ধরূপে মুদ্রিত হইল; প্রথমে ইহা শান্তিনিকেতন পত্রের ১৩২৬ শ্রাবণ সংখ্যায় ‘বিশ্বভারতী’ নামে প্রকাশিত হইয়াছিল।
‘বিগত ২৩ ডিসেম্বর [ ১৯২১ ] ৮ পৌষ [ ১৩২৮ ] বোলপুরে শান্তিনিকেতন-আশ্রমের আম্রকুঞ্জে শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের নূতন শিক্ষার কেন্দ্র বিশ্বভারতীর সাংবৎসরিক সভার অধিবেশন হয়। সেই সভায় বিশ্বভারতী পরিষদ্ গঠিত হয় এবং বিশ্বভারতীর জন্য যে সংস্থিতি (constitution) প্রণীত হইয়াছে তাহা গৃহীত হয়। ডাক্তার ব্রজেন্দ্রনাথ শীল মহাশয় সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। সভায় শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য সিল্ভ্যাঁ লেভি, ম্যাডাম লেভি, রাজগুরু ধর্মাধার মহাস্থবির, ডাক্তার মিস্ ক্রামরিশ্, শ্রীযুক্ত উইলিয়াম পিয়ার্সন, শ্রীযুক্তা স্নেহলতা সেন, শ্রীযুক্তা হেমলতা দেবী, শ্রীমতী প্রতিমা দেবী, শ্রীযুক্ত নেপালচন্দ্র রায়, স্যর নীলরতন সরকার, দিল্লির সেণ্ট স্টিফেন কলেজের প্রিন্সিপ্যাল শ্রীযুক্ত এস্ কে রুদ্র, শ্রীযুক্ত মহিমচন্দ্র ঠাকুর, শ্রীযুক্ত প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, ডাক্তার শিশিরকুমার মৈত্র প্রমুখ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।· · সর্বপ্রথমে শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় ডাক্তার ব্রজেন্দ্রনাথ শীল মহাশয়কে সভাপতিত্বে বরণ করিবার প্রস্তাব করেন· ·।’―
‘আমি ইচ্ছা করি আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল মহাশয় কিছু বলুন। আমাদের কী কর্তব্য, এই বিশ্বভারতীর সঙ্গে তাঁর চিত্তের যোগ কোথায়, তা আমরা শুনতে চাই। আমি এই সুযোগ গ্রহণ করে আপনাদের অনুমতিক্রমে তাঁকে সভাপতির পদে বরণ করলুম।’
এই উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ যে বক্তৃতা করেন তাহা এই গ্রন্থের তৃতীয় প্রবন্ধ রূপে মুদ্রিত হইল—পূর্বে তাহা শান্তিনিকেতন পত্রের ১৩২৮ মাঘ সংখ্যায় ‘বিশ্বভারতী পরিষদ্-সভার প্রতিষ্ঠা’ নামে প্রকাশিত হইয়াছিল।
সভাপতিরূপে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের অভিভাষণের ‘সংক্ষিপ্ত ও অসম্পূর্ণ প্রতিবেদন’ শাস্তিনিকেতন পত্রের ১৩২৮ মাঘ সংখ্যায় প্রকাশিত পূর্বোল্লিখিত বিবরণ হইতে পরিশিষ্টে মুদ্রিত হইল।
৪-সংখ্যক রচনাটি ‘আলোচনা: বিশ্বভারতীর কথা’ নামে ১৩২৯ ভাদ্র ও আশ্বিন সংখ্যা শান্তিনিকেতন পত্রে প্রকাশিত হয়—‘গত ২০শে ফাল্গুন বিশ্বভারতীর কয়েকটি নবাগত ছাত্র আচার্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের নিকট বিশ্বভারতীর আদর্শ সম্বন্ধে কিছু শুনিতে চাহিলে তিনি যাহা বলিয়াছেন তাহার মর্ম।’ এই আলোচনার পরিশেষে রবীন্দ্রনাথ বলেন,
‘আমি চাই, তোমরা বিশ্বভারতীর নূতন ছাত্রেরা খুব উৎসাহ ও আনন্দের সঙ্গে এখানকার আদর্শকে সমর্থন করে কাজ করে যাবে, যাতে আমি তোমাদের সহযোগিতা লাভ করি। আমার অনুরোধ যে, তোমরা এখানকার তপস্যাকে শ্রদ্ধা করে চলবে, যাতে এই প্রাণ-দিয়ে-গড়ে-তোলা প্রতিষ্ঠানটি অশ্রদ্ধার আঘাতে ভেঙে না পড়ে।’
‘বিশ্বভারতীর আদর্শ প্রচার-কল্পে কলিকাতায় বিশ্বভারতী সম্মিলনী নামে যে একটি সভা স্থাপিত হয়’, ১৩২৯ সালে তাহার একটি অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীর আদর্শ ব্যাখ্যা করেন, ৫-সংখ্যক রচনা সেই বক্তৃতার অনুলিপি; ‘বিশ্বভারতী সম্মিলনী : লেভি-সাহেবের বিদায়-সম্বর্ধনার পরে আলোচনাসভা’ নামে ইহা শান্তিনিকেতন পত্রের ১৩২৯ পৌষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
১৯২২ সালের ২১ অগস্ট রবীন্দ্রনাথ কলিকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে ছাত্রসভায় বিশ্বভারতী সম্বন্ধে যে বক্তৃতা দেন, ৬-সংখ্যক রচনা তাহার অনুলিপি। Presidency College Magazine-এ (VOL IX, NO I, September 1922) তাহা ‘বিশ্বভারতী’ নামে প্রকাশিত হয়। ঐ সংখ্যায় WELCOME, RABINDRANATH শীর্ষক রচনায় এই বক্তৃতার আনুষঙ্গিক বিবরণ মুদ্রিত আছে।
৭-সংখ্যক রচনা, ১৩৩০ সালের নববর্ষে শান্তিনিকেতন মন্দিরে নববর্ষের উৎসবে আচার্যের উপদেশ; ১৩৩০ ভাদ্র সংখ্যা শান্তিনিকেতন পত্রে ‘নববর্ষে মন্দিরের উপদেশ’ আখ্যায় প্রকাশিত হয়।
৮-সংখ্যক প্রবন্ধ শান্তিনিকেতন-মন্দিরে ৫ বৈশাখ ১৩৩০ তারিখে কথিত আচার্যের উপদেশের অনুলিপি—শান্তিনিকেতন পত্রের ১৩৩০ অগ্রহায়ণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এই রচনাটি প্রবাসীর ১৩৩০ মাঘ সংখ্যায় কষ্টিপাথর-বিভাগে ‘তীর্থ’ নামে অংশত মুদ্রিত হয়।
৯-সংখ্যক রচনা ‘বিশ্বভারতী’ নামে ১৩৩০ পৌষ সংখ্যা শান্তিনিকেতন পত্রে প্রকাশিত হয়।
১৩৩০ সালে শান্তিনিকেতনে ৭ পৌষের উৎসবে রবীন্দ্রনাথ যে উপদেশ দেন তাহা এই গ্রন্থের ১০-সংখ্যক প্রবন্ধ রূপে প্রকাশিত হইল। প্রথমে উহা শান্তিনিকেতন পত্রের ১৩৩০ মাঘ সংখ্যায় ‘৭ই পৌষ: দ্বিতীয় ব্যাখ্যান’ আখ্যায় মুদ্রিত হয়।
১১-সংখ্যক রচনা, ‘দক্ষিণ আমেরিকা যাইবার জন্য কলিকাতায় আসিবার পূর্ব-রাত্রে (১৭ ভাদ্র ১৩৩১) শান্তিনিকেতন আশ্রমে কথিত’ ‘যাত্রার পূর্বকথা’ নামে ১৩৩১ কার্তিক সংখ্যা প্রবাসীতে মুদ্রিত হয়।
১৩৩২ সালের ৯ পৌষ শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী পরিষদের বার্ষিক সভায় রবীন্দ্রনাথ যে বক্তৃতা দিয়াছিলেন ১২-সংখ্যক রচনা তাহার অনুলিপি। ১৩৩২ ফাল্গুন সংখ্যা শান্তিনিকেতন পত্রের ক্রোড়পত্ররূপে, পরে স্বতন্ত্র পুস্তিকাকারে ইহা প্রচারিত হয়।
১৩-সংখ্যক রচনা ১৩৩৩ জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ভারতীপত্রে প্রকাশিত হয়, ও ১৩৩৩ শ্রাবণ সংখ্যা প্রবাসীতে কষ্টিপাথর-বিভাগে (‘ভিক্ষা’) উদ্ধৃত হয়।
১৪-সংখ্যক রচনা একটি আলোচনার অনুলিপি; প্রথমে ১৩৩৭ জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা বিচিত্রায় ‘কর্মের স্থায়িত্ব’ নামে প্রকাশিত হয়।
১৩৩৯ সালের ৯ পৌষ শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর বার্ষিক পরিষদ্-সভায় রবীন্দ্রনাথের অভিভাষণ ১৫-সংখ্যক প্রবন্ধ রূপে মুদ্রিত হইল। ইহা প্রথমে VISVA-BHARATI NEWS-এর January 1933, Paush Utsav Number-এ ‘আচার্যদেবের অভিভাষণ’ আখ্যায় প্রকাশিত হয়।
১৩৪১ সালের ৮ পৌষ শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর বার্ষিক পরিষদ্ সভায় আচার্যের অভিভাষণ বর্তমান গ্রন্থের ষোড়শ প্রবন্ধ। ইহা পূর্বে ১৩৪১ ফাল্গুন সংখ্যা প্রবাসী পত্রে ‘ধারাবাহী’ প্রবন্ধের দ্বিতীয় অংশ রূপে প্রকাশিত হইয়াছিল।
বিশ্বভারতীর বার্ষিক পরিষদে ১৩৪২ সালের ৮ পৌষ তারিখে রবীন্দ্রনাথ যে বক্তৃতা দেন তাহা এই গ্রন্থের সপ্তদশ রচনা। এই বক্তৃতার অন্য একটি অনুলিপি ‘বিশ্বভারতী বিদ্যায়তন’ নামে বিশ্বভারতী পত্রিকার ১৩৪৯ ভাদ্র সংখ্যায় প্রকাশিত হইয়াছে।
১৮-সংখ্যক রচনা, ১৩৪৫ সালের ৮ পৌষ তারিখে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর বার্ষিক পরিষদে প্রতিষ্ঠাতা-আচার্যের অভিভাষণ—পূর্বে ১৩৪৫ মাঘ সংখ্যা প্রবাসীতে ‘বিশ্বভারতী’ নামে মুদ্রিত হইয়াছিল।
১৩৪৭ সালের ৮ শ্রাবণ তারিখে শান্তিনিকেতন-মন্দিরে সাপ্তাহিক উপাসনায় রবীন্দ্রনাথ যে উপদেশ দেন এই গ্রন্থের ঊনবিংশ রচনা তাহার অনুলিপি; ইহা ১৩৪৭ ভাদ্র সংখ্যা প্রবাসীতে ‘আশ্রমের আদর্শ’ নামে প্রকাশিত হইয়াছিল।
- ↑ ‘অসন্তোষের কারণ’ ও ‘বিদ্যাসমবায়’ প্রবন্ধ দুইটি শিক্ষা গ্রন্থের পরিবর্ধিত সংস্করণে (১৩৫১ চৈত্র। পুনর্মুদ্রণ ১৩৫৭ আষাঢ়) সম্পূর্ণ মুদ্রিত হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে ‘বিদ্যার যাচাই’ (শান্তিনিকেতন আষাঢ় ১৩২৬। শিক্ষা ১৩৫১।৫৭) প্রবন্ধও দ্রষ্টব্য।
বিজ্ঞপ্তি
এই গ্রন্থে সংকলিত অভিভাষণগুলি বক্তৃতার তারিখ অনুযায়ী নিবিষ্ট হইয়াছে। যে ক্ষেত্রে সে তারিখ পাওয়া যায় নাই সে ক্ষেত্রে প্রকাশের তারিখ অনুযায়ী সাজানো হইয়াছে, রচনা-শেষে তারিখটি ‘প্র’ চিহ্নিত। ৫ সংখ্যক বক্তৃতার তারিখ, ভাদ্র-আশ্বিন ১৩২৯ সংখ্যা শান্তিনিকেতন পত্রে ‘আশ্রম-সংবাদে’ প্রকাশিত সিলভ্যাঁ লেভি সম্পর্কিত বিবরণ হইতে অনুমিত।
গ্রন্থপরিচয়ে বিশ্বভারতীর সূচনা কার্যারম্ভ প্রভৃতি সংক্রান্ত যে সকল তারিখ ও বিবরণ উদ্ধৃত হইয়াছে সেগুলি শান্তিনিকেতন পত্রে প্রকাশিত বিশ্বভারতী বার্ষিক প্রতিবেদন, ও অন্যান্য বিবরণী হইতে গৃহীত।
গ্রন্থপরিচয়ে উল্লিখিত হইয়াছে যে, এই গ্রন্থের অধিকাংশ রচনাই রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতার অনুলিপি। তন্মধ্যে ৬, ১০, ১৫, ১৮ শ্রীপ্রদ্যোতকুমার সেনগুপ্ত কর্তৃক; ১৬, ১৭ শ্রীপুলিনবিহারী সেন কর্তৃক; ১২ শ্রীইন্দ্রকুমার চৌধুরী কর্তৃক; ১৪ শ্রীঅমিয় চক্রবর্তী কর্তৃক; ১৯ শ্রীনির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক অনুলিখিত, সাময়িক পত্রে বা অন্যত্র এইরূপ উল্লেখ দেখা যায়। এই অনুলিপিসমূহের অনেকগুলি, বক্তা কর্তৃক সংশোধিত ও অনুমোদিত, সাময়িক পত্রে এইরূপ উল্লেখ আছে।
এই গ্রন্থে প্রকাশিত সিলভ্যাঁ লেভি ও রবীন্দ্রনাথের চিত্র শ্রীশান্তিদেব ঘোষের সৌজন্যে প্রাপ্ত।
পরিচ্ছেদ (মূল গ্রন্থে নেই)
সূচীপত্র
এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।

