বিশ্বমানবের লক্ষ্মীলাভ (১৯৪০)/টিপ্পনী
টিপ্পনী
ঋণস্বীকার
পালা সাজাবার জন্যে পাঁচ জায়গা থেকে নানা রসের কথা কুড়িয়ে এনে ধরে দেওয়া গেছে। যেখানে সবই পরের কাছে পাওয়া— সেখানে বিশেষ করে কার ঋণ স্বীকার করা যায়। যে শ্রোতার যা ভালো লেগে যায়, সে যাতে ইচ্ছেমতো মূলে গিয়ে তৃপ্তি পেতে পারে, তার উপায় রাখলেই হল।
USSR-এর সমীকরণ যজ্ঞকে উপলক্ষ্য করে, ভবলীলার আকার প্রকার বোঝা ছিল আমাদের আসল উদ্দেশ্য, যাতে সমজদার হয়ে পরের ভালো খেলা তারিফ করতে পারি, খেলায় পটু হয়ে নিজেরাও আনন্দ দিতে নিতে অপারক না হই।
খেলার দুটো দিক আছে। এক হল নিয়মকামুন,— যা মেনে অন্তত বাঁচিয়ে না চললে খেলা দাঁড়ায় হুটোপাটিতে, আমোদ লাগার চেয়ে চোট লেগে যাবার সম্ভাবনা থাকে বেশি। আর হল ভাব, যার লক্ষণ হচ্ছে পরস্পরের সুবিধে-অসুবিধে বুঝে চলা, নিজের ভালো চালে পরের ভালো চালে সমান খুশি হওয়া, মনে রাখা যে, সকলে মিললে তবেই হয় খেলা, নিজে বাহাদুরি নেবার মোহে না পড়া,— যে ভাবকে ইংরেজিতে বলে স্পোর্টস্ম্যান্লাইক (sportsmanlike)।
ভবলীলারও সে রকম দুইদিক আছে। একপক্ষে খেলুড়েকে প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলতে হয়; তবে জীবের মধ্যে মানুষ সৃষ্টি করার ক্ষমতা পেয়েছে বলে সে নিয়মকে কতক এড়িয়ে কতক বদলে চলতে পারে। আর খেলুড়েকে ভাবও ঠিক রাখতে হয়, সাথীদের সঙ্গেও বটে, খেলানেওয়ালাদের সঙ্গে তো বটেই, নইলে তাঁর সঙ্গে যোগ ছুটে গিয়ে, তলিয়ে বা পথ ভুলে, খেলাটা হারে না শেষ হয়।
প্রথম দিক থেকে বিচার করার সময় প্রত্যক্ষদর্শীদের কথা নিয়ে আমরা আখর দিয়েছিলাম। পাশ্চাত্ত্য ভাষায় বিজ্ঞানের বা ভ্রমণের বইয়ের অভাব নেই, সেগুলি দরকার মতো পড়তে পাওয়াও শক্ত নয়; তাই বিশেষ স্থল ছাড়া আলাদা করে কোনো বইলেখকের নাম করা হয়নি।
ভাবের কথা আশ মিটিয়ে পেতে হলে যেতে হয় বেদ-উপনিষদে, যার মধ্যে আমাদের চিরনমস্য ঋষিদের বাণী ধরা আছে। সেখান থেকেও আমরা দরকারমতো চুনে নিতে ছাড়িনি, কিন্তু ফী হাতে গ্রন্থের নাম শ্লোকের নম্বর দিলে বিশেষ সুবিধে হত না। এক তো, ঋষিদের বচন পড়া আজকালকার ফেশান নয়, তা ছাড়া বই আনিয়ে খুঁজে পেতে বার করলেও দেখা যাবে, ভাষ্যকারেরা যে-কালের উপযোগী ব্যাখ্যা করে গেছেন, সেকাল থেকে এ কালটা এত তফাত হয়ে পড়েছে যে, নিজের নিজের টিপ্পনী না কাটলে মানেটা কানেই থেকে যায়, ভিতরে পৌঁছয় না।
তাই আমাদের ভাব ঋষিকথায় শ্রোতার মনে পৌঁছে দিতে হলে, নিজের বোঝা মানেটা প্রকাশ করে বলতে হয়। দুএকটা নমুনা দিলেই যথেষ্ট হবে, তাতে যদি শ্রোতার ঋষিবচনের মধ্যে স্বাধীনভাবে বেড়াবার শখ হয়, সে তো খুব ভালো কথা।
খেলার ভাব
ঋগ্বেদে যে বিষ্ণুমন্ত্র আছে, যা আমাদের সব ক্রিয়ার আরম্ভে আওড়ানো হয়, অনেক সময় মানের দিকে দৃকপাত না করে, তাতে ভবের খেলার পদে পদে যে ভাব বদলে চলতে হয়, তার ইশারা পাওয়া যায়। মন্ত্রটি এই;
তদ্ বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ
দিবীব চক্ষুঃ আততং।
কথার পিঠে কথা নিয়ে সাদা বাংলায় এর মানে দাঁড়ায় এই রকম:
সূরীরা সেই বিষ্ণুর পরম পদ সদাই দেখেন,
চোখ দিয়ে আলোয় মেলা জিনিসের মতো।
চোখের সামনে আলোয় ধরে দেওয়া জিনিসের মতো— উপমা তো বেশ পরিষ্কার। কিন্তু সেই বিষ্ণুর পরমপদ কাকে বলে।
ঈশোপনিষদের প্রথম শ্লোকে বোঝা যায়, সেই বিষ্ণু হচ্ছেন যিনি ঈশা হয়ে লোকের মধ্যে যতলোক সব ছেয়ে আছেন। তিনি সৃষ্টির সব স্তরেই বিরাজ করেন, এক এক স্তরে বা লোকে তাঁর এক এক রকমের পদ দেখা যায়, আনন্দলোকে তাঁর চরম প্রকাশ। আনন্দ দেওয়া নেওয়াই তো প্রেম, সেই প্রেমের আবেগে নিচের লোক থেকে উপরের লোকে যেমন ওঠা যায়, তাঁর নিম্নপদ উচ্চপদ হয়ে দেখা দেয়, অবশেষে পুর্ণপ্রেমে তাঁর পরম পদের দর্শন লাভ হয়।
ফুল কেজো লোকের হিসেবে ফলের সূচনা, শৌখিনের পক্ষে ঘরবাগানের সাজ, ভাবুকের চিত্তে তার মহিমা অপার। মুনীব যাকে বলে চাকর, বিজ্ঞানীর সংজ্ঞায় সে নর, প্রেমিকের সে আপনার। ছেলেতে মা দেখেন স্নেহের পুতুল, জনসেবক দেখেন দেশের আশা, সূরী দেখেন বিশ্বরূপ। যশোদা-মার প্রেমের আলো যেবার স্নেহের টান ছাড়িয়ে উঠেছিল, তিনিও তাই দেখেছিলেন।
সূরীদের বলে জ্ঞানী; তার মানে প্রেমের আলোয় যা দেখা যায়, তাই সত্যি সত্যি জানা যায়। ধ্যানে জানতে হলেও সেই আলো চাই। গায়ত্রী মন্ত্রে বলে সেই সবিতার বরেণ্য তেজ ধ্যান করতে। কোন্ সবিতা। যিনি আনন্দলোকের অধিপতি। তাঁর তেজ বা প্রকাশকে বরেণ্য বলে সেই সূরী বোঝেন, যাঁকে প্রেম দিয়ে বরণ করা হয়েছে। নিচের আকিঞ্চন আর উপরের প্রেরণা, দ্বি-ধর্মী বৈদ্যুতের মতো পরস্পরের অপেক্ষা করে, পরম্পরকে টানে; শেষে প্রেমের ঝিলিকে উভয়ের মিলনানন্দের উচ্ছ্বাস। এ মিলন দৈব সুপ্রসন্ন হলে ঘটে, বলাও যা, আর ঘটনাটা রহস্যময় স্বীকার করাও তাই।
যাই হোক, আমরা এইটুকু বুঝেছি, ভবলীলার আরম্ভে, মাঝে, শেষে, সর্বত্র সেই প্রেম। হৃদয়ে প্রীতি নিয়ে আসা হয়, প্রীতি করতে থাকলে প্রেম বেড়ে চলে, প্রেম পূর্ণ হলে পাওয়া যায় নন্দলালকে।
খেলার উৎপত্তি
ঈশোপনিষদের এক শ্লোকে উৎপত্তির কথা আমরা যে ভাবে পেয়েছি তাই দেখাই—
স পর্যগাৎ শুক্রম্ অকায়ম্ অব্রণম্ অস্নাবিরং শুদ্ধম্ অপাপবিদ্ধং কবিঃ মনীষী পরিভূঃ; স্বয়ম্ভূঃ যাতাতথ্যতঃ অর্থান্ ব্যদধাৎ শাশ্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ। “
এর মানে আমাদের কাছে এই ভাবে আসে—
তিনি বেরিয়ে এলেন,— সেই নিরাকার নির্বিকার অবস্থা ছেড়ে— এবং যিনি আপনাতে আপনি ভরপুর (স্বয়ম্ভূ) ছিলেন তিনি লোক সকলের অধ্যক্ষ (পরিভূ) হয়ে, কবি-মনীষী-ভাবে (শাশ্বতীর) চিরকালের ও (সমার) কালের পর কালের পক্ষে উপযোগী ব্যবস্থা করলেন।
সর্বব্যাপী রইলেন সর্বব্যাপী, তবে স্বষ্টির কারণে একাকার অবস্থা স্তরে স্তরে লোকে লোকে ভাগ হয়ে গেল, তাতে তিনিও বহুখণ্ডিত হয়ে আলো থেকে অন্ধকারে, সূক্ষ্ম হতে স্থূলে, পরিধানে (adventure-এ) বেরলেন, ভ্রমণে নয়, রমণ করতে। বেরিয়ে পড়া তো সহজ; পুনর্মিলনে ফেরার, নিজের মহিমায় পুনঃ প্রবেশের পথই বাধা বিঘ্নে বন্ধুর, পদে পদে সৃষ্টিছাড়া মৃত্যুলোকে পড়ার ভয়ে বিপদসংকুল। তাই উপযুক্ত ব্যবস্থা আবশ্যক। কবি-মনীষী-ভাবে যে ব্যবস্থা করা হয়েছে তার মর্ম বোঝা যায় না, বুদ্ধি(intellect) ও বৃত্তি (emotion) দুয়ের সমঞ্জস (harmonious) উৎকর্ষ (culture) না হলে। ইংরেজি কথাগুলো দিয়ে দেখানে গেল যে ঋষিবাক্য একেলেভাবে আলোচনা করার অসুবিধে কিছু নেই।
ভয় ভাবনা, আশা ভরসা
উপনিষদে মাঝে মাঝে যে প্রার্থনা আছে তার দু-একটা দেখলে, আমরা যে-ভাবে মানে করেছি তার সায় পাওয়া যাবে।
অসতো মা সদ্ গময়
তমসো মা জ্যোতিঃ গময়, মৃত্যোঃ মা অমৃতং গময়।
অসৎ থেকে সতে নিয়ে চল;
অন্ধকার হতে আলোয়, মৃত্যু হতে অমৃতে নিয়ে এস।
সৃষ্টির মধ্যে অসৎ বলে কী থাকতে পারে? যা কিছু আছে তাই তো সৎ। অসৎ বলতে হলে, সৃষ্টির নিরাকার নিরঞ্জন পূর্বাবস্থা, যার সম্বন্ধে কোনো বাক্যই যখন খাটে না, তখন সৎও বলা যায় না, তাকেই অসৎ বলতে হয়। ওঁ তৎসৎ বলে নিজেকে এইটুকু মনে করিয়ে দিতে হয়, আমরা যে ইন্দ্রিয়গ্রাহ সদানন্দ জীবন চালাচ্ছি এটা সেই বাক্য-মন অতীতেরই প্রকাশ। তবে কি না, ‘এটা নয়’ ‘ওটা নয়’ করা ছাড়া যার বর্ণনাই চলে না, সে অসৎ-অবস্থা রমণীয় নয়, তাই খেলার সাধ মেটানোর জন্যে সৃষ্টির প্রার্থনা এইভাবে উঠলো—
আমাদিকে সেই neutral অবস্থা থেকে positive সত্তার মধ্যে নিয়ে চলো,— তাতে দেহ ধরে মোদনীয়কে নিয়ে খেলা করব, যে বিপদ আসতে পারে তার রোমা যত পাব, ভয়-তরার উল্লাস জানব, শেষে স্থাবর আনন্দের বদলে জঙ্গম প্রেমের শিহরণ লাভ হবে।
প্রার্থনাটা কিন্তু ভয়ে ভয়ে করা,— মোহবশে আলোর সঙ্গে যোগ ছুটে যেতে দিলে তো অনন্দালোকে পড়ে আত্মহত্যা করা হবে,— তাই পিঠ পিঠ আবদার—
নিচের অন্ধকার থেকে পথ দেখিয়ে আবার আলোয়, মৃত্যুলোক হতে বাঁচিয়ে আবার অমৃতময়লোকে ফিরিয়ে এনো।
এ কথাটাই অন্য অন্য জায়গায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা আছে—
আবিঃ আবীঃ ম এধি।
তুমিই তো আলো, তোমার সেই আলো আমাদিকে দেখালেই ফিরে যাবার পথ ঠিক পাব।
রুদ্র যৎ তে দক্ষিণং মুখং তেন মাং পাহি নিত্যম্।
মৃত্যুলোকের রুদ্রমূর্তি খেলাচ্ছলে চকিতে দেখে নেওয়ার পর, আর সারা রাস্তা তোমার সেই উজ্জ্বল প্রকাশ দেখিয়ে পথে রেখো।
সত্যাগ্রহ সংকল্প
শ্রুতিবাক্য শোনানো হলে সকলে মিলে শাস্তিপাঠ করা প্রথা। কিন্তু আমরা যে ভাবে বুঝেছি বুঝিয়েছি তাতে সে প্রথা মানা চলে না। এইসবের আগেকার নিষ্ক্রিয় অবস্থা শান্তিময়ই ছিল। তাতে মন উঠল না বলেই তো খেলতে বেরনো। খেলার শেষে হয়তো আবার শান্তি আসবে, যদি ভূমানন্দের সে নাম দেওয়া অন্যায় না হয়। কিন্তু মাঝপথে শান্তি চাওয়া মানে তো বিপদ ডেকে আনা, ঝিমোতে ঝিমোতে আবছায়া লোকে ঘুরে মরা, হারেরই মতো stalemate-এ খেলা শেষ করা।
স্থিতপ্রজ্ঞ না হলে ভালো খেলোয়াড় হয় না, তা খুব মানি। যে স্থিতপ্রজ্ঞ সে ভবের ছবি, লীলার নিয়ম, মনে এমনি বসিয়ে নিয়েছে যে, তাকে পথ খোঁজার জন্যে আঁকুবাঁকু করতে হয় না। উপরের আলো-কে সে কখনো চোখের আড়াল হতে দেয় না, এগিয়ে না চললে পিছতে হবে তা সে কখনো ভোলে না। কিন্তু সে চঞ্চল নয় বলে মোটেই শান্ত নয়। সে জানে আবেগ শান্ত হলেই সব মাটি, কাজেই শান্তির প্রার্থনা করে না, সে চায় আবেগ, তীব্র আবেগ, যাতে যত শীঘ্র সম্ভব জিতে উঠে যেতে পারে।
অতএব এসো, আমরাও আগ্রহ কামনা করি, আগ্রহের চর্চা করি, সত্যাগ্রহে খেলায় মাতি, তাহলে স্বয়ং লীলাময়, যাঁর নাম সত্য, তিনি নিশ্চয় সঙ্গে সঙ্গে থাকবেন—জিত হবেই হবে।
সত্যমেব জয়তে।