বিশ্বমানবের লক্ষ্মীলাভ (১৯৪০)/পঞ্চম পালা
পঞ্চম পালা
চতুর্বর্গের ফল-বিচার
ফলেন পরিচীয়তে
ফল দিয়ে শুধু গাছের নয়, বীজ থেকে আরম্ভ করে, মাটির, মালীর, মালিকের,—সকলেরই কিছু না কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। সেইজন্যে যত্ন করা হয়ে থাকলেও কোনো একটা উদ্দেশ্য সিদ্ধ না হলে প্রবচনের দোহাই দিয়ে “তবে দোষ কী?” বলে বসে থাকলে হয় না। বরং প্রবচনটার মানে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে, দোষটা কোথায়, মাঝের নানান ধাপের মধ্যে গলতিটা ঠিক কোনখানে ঘটেছিল, খুঁজে বার করার মজুরি পোষায়। বিজ্ঞানীদের সেই ত্রীন করবি[১] মন্ত্রই এ যুগের উপযোগী—try try try again
ফলের বিষয়ে ভাবার আরো কথা আছে। একই ফল ফলাতে অনেক উপকরণ লাগে, আবার একই আয়োজনে রকম বেরকমের ফল পাওয়া যায়,—বিশেষত যদি সমীকরণ যজ্ঞের মতো জটিল আয়োজন চলতে থাকে। তার মধ্যে কোন্ ফলটা ধরে গুণাগুণ যাচাই হবে, সেটা যাচনদারের নিজের ধাতের উপর অনেকটা নির্ভর করে।
য়ুরোপের এখন লড়াক্কে মেজাজ; USSR-এর ফৌজ, যুদ্ধ জাহাজ, এরোপ্লেন,—এ সবের চেকনাই দেখলে য়ুরোপীয় বিচারক খুশি না হোক, তার ভক্তি আসে। মার্কিন দেশে বস্তু বোঝে; USSR-এর কারখানার অশেষ মাল, খনির অফুরন্ত তেল, ক্ষেত্রের বাড়ন্ত ফসল, এ সবের রটনা কানে গেলে কেজো মার্কিন প্রশংসা না করুক, ভাগ বসাতে লালায়িত হয়ে খোশামোদ লাগায়।
এক এক দেশের নাম দিয়ে উদাহরণ দেওয়া হল বটে, কিন্তু সব দেশে নানা ভাবের লোক থাকে যারা বিচারে বসলে নিজের রুচিমতে পরদেশ সম্বন্ধে একতরফা রায় দিয়ে খালাস হয়। তাই নির্বিচারে পরের সম্বন্ধে লোকের কথা মেনে নিলে প্রায়ই ঠকতে হয়; এমন কি নিজের বিষয়ে যে যা বলে তাও বুঝেসুঝে নেওয়া ভালো। না দেখেশুনে পোকাধরা ফল চিবোতে চিবোতে আমি নিরামিষাশী বলে বড়াই করলে তো হয় না; অন্যদিকে পরের হিতের ভাবনায় যে পাগল, সে নিজেকে নাস্তিক বললে আমরা কি তা মানতে বাধ্য।
USSR-এর বস্তু ভালোই বাড়ছে, আরো বাড়বে বলে লক্ষণ দেখা যায়। তবে, বস্তু যে-দেশের সে দেশেই আগলানো থাকে, তাতে লোভ করে লাভ কী। কিন্তু ভাবের দেশকাল নেই, একার ভোগে তাকে আটকে রাখা যায় না। সেজন্যে আমরা চাই USSR-এর ভাব বুঝতে, লোভনীয় লাগলে আদায় করে নিতে।
ভাব কথাটাই বেশ রসে ভরা। ভাব হল মনের বাস্তুভিটে, বিশ্বরাজ্যের যে জায়গাটুকু আপনার করে নিয়ে মন গুছিয়ে বসেছে। “দু’জনে বড়ো ভাব”—মানে দু’জনের মন এক বাসায় থাকে, অন্তত পরস্পরের কাছে ঘন ঘন যাওয়া আসা করে। এমন কুনো মনও দেখা যায় যে নিজের বাড়ি ছেড়ে বেরতে পারে না; তার পক্ষে অন্যের ভাব বোঝা অসাধ্য। জনবৃষের বাচ্ছা বৃন্দাবনে গিয়ে পড়লে না জানি কী ঢঙে সেখানকার লীলা খেলত।
ভাবের পরীক্ষা সম্বন্ধে সাবধানে থাকার বিষয় এই, যার পরীক্ষা করা হয় আর যে পরীক্ষা করে, বিচারফলের মধ্যে দুজনেরই ভাব মিশে যায়। আবার রায় যে দেয় আর রায় যে শোনে, এদেরও ভাব মেশামেশি না হয়ে যায় না। ভাবের মতো সূক্ষ্ম জিনিস নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গেলে তা হবেই। কিন্তু তাতে দোষই বা কী। শেষে যে ভাব ফুটে ওঠে সেটা যদি উপাদেয় হয়, তাহলে কার মনে কতখানি ছিল তাই নিয়ে ঘোঁট না করে তাকে পরমানন্দে আত্মসাৎ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
চতুর্বর্গ বলতে কী বোঝায়, তাও আগে থেকে ঠিক করে নেওয়া মন্দ নয়। মান্ধাতার আমলের এইসব কথার আজকাল মা-বাপ নেই, যে যেমন খুশি ব্যবহার করে। তাই কথকের মানেটা শ্রোতার কাছে প্রথমেই গেয়ে রাখা ভালো; আখর দেওয়ার সময় তাহলে ভুল বোঝাবুঝির ভয় থাকবে না।
এই দেখো না কেন, আজকাল আমাদের দেশে বল, আর যে দেশেই বল, ধর্ম বলতে বোঝায় কাড়াকাড়ি করার, অন্তত মানুষ থেকে মানুষকে তফাত রাখার একটা ছুতো। সমীকরণের কথা ভালো মনে বলতে শুনতে বসে ধর্মের সে মানে নিয়ে আমরা কী করব। যাতে ধরে রাখে সেই ধর্ম—ভারতবর্ষে আগে চলতি এ মানে তো বেশ ছিল। কোন্ কোন্ ভাব USSR-কে বজায় রেখেছে, শক্তি যোগাচ্ছে, সে ভাব অন্তেরও কাজে লাগতে পারে কিনা, ধর্মের বর্গে তাই বোঝার চেষ্টা করা যাবে।
তার পর হল, অর্থ। এ কথাটা এমন হাত-পা ছড়িয়ে বসেছে, যাতে লাগাও তাতেই লাগে। আপাতত ওকে সম্পত্তির উপর আটকে রাখলে আমাদের কথার সুবিধে হবে। ব্যক্তির পক্ষে সম্পত্তি অনর্থের কারণ, সে বিষয়ে হিন্দু আচার্যের সঙ্গে USSR-এর একমত। এখন দেখতে হবে, USSR এর নববিধানে সমবায়ের হাতেও সম্পত্তি পরমার্থের ব্যাঘাত করছে কি না। এটাও দেখার বিষয়, ব্যক্তিকে সম্পত্তিছাড়া আর লক্ষ্মীছাড়া করা এক কথা হয়ে দাঁড়ায় কি না, ঐহিক উৎকর্ষ সাধনে তাকে উদাসীন করে তোলে কি না। লক্ষ্মীর মান রেখে বিচার করতে হলে, দেবীর বস্তুতান্ত্রিক স্থূল মূর্তি গড়লে চলবে না, আনন্দলাভ দিয়ে তাঁর প্রসাদকে মাপতে হবে।
তৃতীয়বর্গ, কাম। ব্যবহারের দোষে কথাটা যাচ্ছে-তাই হয়ে গেছে। আমাদের কথা গোড়ায়ও যা ছিল, শেষেও তাই,—মানুষের মূল ঐহিক কামনা হচ্ছে, জগতে লক্ষ্মীর প্রতিষ্ঠা। সেটা সম্ভব করতে হলে নরনারীর আপনাদিকে নারায়ণের, বিশ্বমানবের অংশ বলে বোঝা দরকার। সে বোধ অন্তত আমাদের দেশে এ পর্যন্ত হয়নি।
দেবী ব’লে হোক, আর রমণী-কামিনী বলেই হোক, হিন্দুর মন স্ত্রীজাতির ডাইনে বাঁয়ে ঘুরতে থাকে বটে, কিন্তু সেরেফ নারী বলে তাঁদিকে নিজের মহিমায় ফুটতে না দেওয়ায় বেচারীদের মন একেবারে গণ্ডিবদ্ধ হয়ে পড়েছে। দিদিমার বা বাড়ির পুরানো ঝির পরামর্শমতো এর পায়ে ওর পায়ে মাথা নোওয়াতে, পাণ্ডাপুরুতের ফরমাশ মতো এজলে ও-জলে মাথা চোবাতে তো শেখে, কিন্তু কালের উপযোগী কোনো ভাব কি আদর্শ শেখায় কে। আরো মুশকিল এই, যাঁদের শিক্ষার ত্রুটিতে হিন্দুনারীর এই দশা, তাঁরাই তাচ্ছিল্য করে তাদিকে ধর্ম-অর্থ উপার্জনের পথের কাঁটা বলেন।
বৃথা আক্ষেপ করার জন্যে এ কথা তোলা হয়নি। শাস্ত্রে বলে “নয়”কে বেশ করে’ চিনে ফেলাই “হয়”কে পাবার একটা উপায়। USSR-এর বিধানে নরনারীর যা সম্বন্ধ দাঁড়িয়েছে, সেখানকার বিপ্লবী সমাজে নারী যে স্থান পেয়েছে, তাতে আত্মোন্নতির সুবিধে অসুবিধে কেমন, তাই আমাদের এ পালায় বোঝার বিষয় হবে, সেজন্যেই এই তুলনামূলক সমালোচনা।
বাকি রইল মোক্ষ,—আকাশের মতো একটা মস্ত ফাঁকা কথা। পণ্ডিতী চালে আলোচনায় বসলে না-বোঝার অন্ধকার ঘনিয়ে আসার ভয়, তাই সাদা ভাবেই কথা পাড়তে হবে।
মানুষমাত্রেই মুক্তিপথের যাত্রী, পদে পদে পুরোনোর খোলসযুক্ত হয়ে তাজা জীবনে পা বাড়াতে না পারলে সে জেয়ান্তে মরা হয়ে থাকে। কিন্তু বাকির বছর দিয়ে নয়, কাজ দেখে বুঝতে হয় মুক্তির পথে কে কতটা চলতে পেরেছে। মুখে “বসুধৈব কুটুম্বকম্,”—কাজে একে ছুঁইনে, ওর পাশে বসিনে, তার হাতে খাইনে: চাই “মনের মানুষকে,”—সামনের মানুষের সুখদুঃখ মনে লাগে না; যাব আনন্দধামে,—বিধাতার নিত্যদানের রস তৃপ্তি ক’রে গ্রহণ করতে জানিনে, এই কি মুক্তির পথে এগোবার চেহারা।
USSR এর নরনারীরা নানা সমবায়ের মধ্যে সংঘবদ্ধ হওয়ায় তারা অদ্ভুত এক পত্তন “আমি, আমার”, থেকে “আমাদের” বড়ো কোঠার মধ্যে মুক্ত হয়েছে। এখন দেখার, ভাবার এইটুকু বাকি যে, সংঘে জড়িয়ে পড়ে, নিজত্ব হারিয়ে, ব্যক্তির চরম বিকাশের বাধা কিছু ঘটছে কি না। এই আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চতুর্বর্গের বিচারও সাঙ্গ হবে।
ধর্ম এব হতো হন্তি
বিপ্লবের আগে, রুশ ভক্তির দেশ, ভক্তের দেশ, ধন্যরাজার পুণ্যপ্রজার দেশ বলে য়ুরোপে তার নামডাক ছিল। Kiev-নগর ছিল রুশের কাশী, পাহাড়ে উপত্যকায় বনে-বাগানে মিলিয়ে অতি মনোরম স্থানে পত্তন করা। সেখানে কিবা মঠ মন্দির পাণ্ডা-পুরোহিতের ধুম, মন্দির-গির্জের ভিতরে সোনারুপো জহরতের বাহার, ঝলমলে ঝাপ্পাঝোপ্পা-পরা পূজারি-পাদ্রীদের সকালসন্ধ্যে মন্ত্র আওড়ানোর ঘটা, কঠোরতার নানাচিহ্নধারী গুহাবাসী[২] তাপসদের ভিড়, দেহরাখা সাধুসন্তদের সমাধিস্থানের ছড়াছড়ি, ব্যাধিহরা পুণ্যভরা জলের রকমারি আধার—সে দেশকালের ধারণামতো ধর্মের যা-কিছু তোড়জোড় দরকার, কোনোটারই ত্রুটি ছিল না।
আর তেমনি বিনয়ে-হেঁট-মাথা, যা-বল-তাই-সই-গোছের নিষ্ঠাবান্ প্রজার দল। তারাই মাথার-ঘাম-পায়ে-ফেলা রোজগারের ভাগ যুগিয়ে এই বিরাট ধর্মব্যাপার বজায় রেখেছিল। রোগশোক শান্ত করার প্রয়োজন বোধ করলে, কিম্বা লালদিনে[৩] পুণ্যসঞ্চয় করার ঝোঁক চাপলে, ছেলে-বুড়ো-স্ত্রীলোক মিলে তারা লাঠিহাতে বোঁচকাকাঁধে, পায়ে হাঁটতে হাঁটতে এই সব মঠ মন্দিরে লাখে লাখে গড় করতে যেত; ইষ্টমূর্তির সামনে বাতি চড়াত ও মৃতসন্তদের তুলে রাখা গায়ের কাপড়ে চুমো খেত; পাণ্ডাপাদ্রীর কাছ থেকে পবিত্র জল কিম্বা আশীর্বাদ কিনে আনত।
সেখানকার বিগ্রহদের পশুরক্তে রুচি ছিল না বটে, তবে তাদের কাছে বর আদায়ের আশায় ছোটোবড়ো মোমবাতি থেকে আরম্ভ করে দামী দামী গয়না পর্যন্ত মানত করা হত,—তা অপরকে ঠকানো, জব্দকরা, পীড়া দেওয়ার বর চাইলেও সে সব অমায়িক বিগ্রহবৃন্দের বিরক্তির কোনো লক্ষণ প্রকাশ পেত না।
কয়েকটি করে গ্রাম মিলিয়ে একটা করে গির্জে, আর সেই সঙ্গে একটি পাদ্রীবাবাজি (batushka) বরাদ্দ ছিল—তাদেরও খরচ অবশ্য চাষাভুষোকেই বইতে হত। সাধারণ প্রজার তুলনায় থাকার বাড়িটা বাবাজি ভালোই পেতেন, আর লাগাও অনেকখানি জমি থাকত যাতে যজমানদের সাহায্যে বাবাজির পরিবারবর্গের ফলমূল-সবজির চাষ করে শৌখিন খাবারের যোগাড়টা হত। তাছাড়া অতিথি উপস্থিত হলে সেবার আয়োজন—দুধ ডিম পনীর মাংস—দেখলে মাসহারার হারটা মন্দ ছিল বলে মনে হত না। তার উপর রুশের প্রথামতো চৌপর দিন গরম চা তো চলতই।
বাবাজির কাজের মধ্যে গ্রামবাসীদের জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, নামকরণ উপলক্ষে ধর্মসংগত ক্রিয়াকর্ম তিনি চালিয়ে দিতেন; আর রবিবারে পর্ববারে সদুপদেশ দিতেন, বিধাতার খাতিরে নিজের হীনাবস্থা নির্বিবাদে মেনে নিতে, পরলোকের দিকে তাকিয়ে রাজার কর, ধর্মের বৃত্তি, যোগাবার ক্লেশ ভুলে থাকতে। শুধু মৌখিক উপদেশই বা কেন, বাবাজির সুখশান্তিময় জীবনযাত্রা দেখলে, ভগবান যা করেন ভালোর জন্যে সে বিষয়ে কি সন্দেহ থাকতে পারত।
হঠাৎ এসে পড়ল বিপ্লব। সর্বত্র যেমন দেখা যায়, এখানেও তাই,—পায়ের তলার মানুষের মাথা তোলার বিপক্ষে কর্মকর্তায় ধর্মকর্তায় একজোট হলেন। মোহন্ত পুরুত পূজারি যতরকমের পাদ্রী ছিল সকলে মিলে ভগবানের নামে ধর্মের ধ্বজা তুলে, ইহকাল পরকাল নাশের ভয় দেখিয়ে বিপ্লবীদের ঠাণ্ডা করার চেষ্টা পেলেন। কিন্তু তারা ভোলবারও নয়, ডরাবারও নয়, যেমন গোঁয়ার তেমনি ঠোঁটকাটা।
বিপ্লবীরা বলে বসল—দলে না থাকলেই শত্রু; কাজেও দেখাল তাই। মঠ মন্দির গির্জে সমাধি যার যার সম্পত্তি সব কেড়ে নিয়ে, পাদ্রীবাবাজিদের ছোটো বড়ো সবাইকে ইতরের কোঠায় নামিয়ে এনে, তাদেরই দেওয়া উপদেশ মতো পরকালের আসার আশে ইহকালের জ্বালা জুড়োবার সুযোগ পাইয়ে দিলে।
ধার্মিকেরা অবাক। ধর্মস্থানের ধর্মঅনুষ্ঠানের ধর্মযাজকের এ হেন অপমান, অথচ ভগবানের কোপের কোনো চিহ্ন নেই। ধরণী দ্বিধা হওয়া দূরে থাক একটুও কাঁপল না, কারো মাথায় বাজও পড়ল না। আর রুশের সেই ডাকসাইটে ধর্মপ্রাণ চাষীবৃন্দ,—তারাই বা কোন প্রাণে এই সর্বনাশ সয়ে গেল। এমন না যে তারা একেবারে মাটির মানুষ, রা কাড়তেই জানে না। খেতে না পেলে তারা কতবার খুনোখুনি কাণ্ড করেছে। কী সম্মোহন মন্ত্র জানে বিপ্লবীরা যে তাদিকে এমন কেঁচো বানিয়ে দিলে।
যাঁরা চোখ চেয়ে দেখলেন, তাঁরা কিন্তু এমন কিছু তাজ্জব হবার কারণ পেলেন না। শিখিয়েছ নির্বিবাদী হতে, হয়েছে নির্বিবাদী, তাতে আর আশ্চর্য কী। দিশাহারা হলে চাষারা যাদের কাছে বিধান নিত তাদের বিপদে এখন বিধান দেয় কে। কাজেই ধর্ম বলে যা জানত, এখন জানল তার উপর নির্ভর করা চলে না। গির্জের কর্তাই শ্রীহীন, কার খাতিরে গির্জেয় যাবে। কাজেই চাষায় নিজের পথ নিজে দেখতে লাগল।
দেখাশোনার লোক নেই, গির্জে ভেঙে পড়ছে, ভাঙা ইটকাঠ যে-যার বাড়ির কাজে লাগিয়ে নিলে। রবিবার এখন হল গ্রামবাসীর আরামের দিন,—বাড়ি বসে গৃহস্থালি তদারক, খোসগল্প, হাসিখেলা এই সবের অবসর পায়। এতে বিচলিত হবার কোনো কারণও দেখে না, ভগবানের অসন্তোষের লক্ষণ তো নেই; জীবনের সুখদুঃখ আগের মতোই, বরং করবৃত্তি উঠে যাওয়ায় অবস্থা হয়েছে সচ্ছল। এমন বিপ্লব মেনে নেওয়ার জন্যে কি কোনো মন্ত্রতন্ত্র লাগে।
তবে বিপ্লবী কর্তারা একটু কৌশলও খেলেছিলেন। জমির স্বত্ববদল নিয়ে তাঁরা চাষাদিকে অকালে ঘাঁটাননি। বিপ্লবের নতুন ধারা গা সওয়া হয়ে যাবার পর তবে সমবায়ে চাষাদের ডাক পড়ল, তখন কাজ হাসিল করতে বেশি বেগ পেতে হল না।
তার পর খ্রীস্টানমহলে রব উঠল—বিপ্লবী-পুঁথির কুশিক্ষায় চাষাদের ধর্ম নষ্ট করে তাদিকে নাস্তিক বানিয়েছে।
এ সিকায়তে আমরা কি সায় দিতে পারি। প্রথমত একটি বিশেষ খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের বিগ্রহে, ক্রিয়াকর্মে, আস্থা হারানোকে, বা তারা ভগবানের যে স্বরূপ প্রচার করে তার মাহাত্ম্য স্বীকার না করাকে, কেমন করে নাস্তিকতা বলা যায়।
তবে বিপ্লবীরা এমন কথা কেন বলে—“গরীবের তিন শত্রু,—“ধনী, শয়তান, আর ভগবান। ধনীকে তাড়িয়েছি, শয়তানে আর বিশ্বাস করি নে, এখন ভগবানকে বিদায় দিলেই হয়।” এ কথা শুনে ভক্তেরা কানে হাত দেবেন, আমাদের বদন কিন্তু অম্লান থাকে। এমন কি, জানতে ইচ্ছে করে, “ভক্তদের হাত থেকে বাঁচাও”——ভগবান কখনো এমন আক্ষেপ করেন কি না।
চাষারা যখন রাজ-আমলার আর জমিদারের নিষ্ঠুর নিষ্পেষণে জেরবার হয়ে পড়েছিল, দিনের পর দিন বছরের পর বছর সুখ দুরে থাক্ সোয়াস্তি কাকে বলে তাই জানত না, তখন ধর্মযাজকদের কাছে না মিলল ন্যায়ের প্রতীকার না প্রতিবাদ, পেতে পেল ফাঁকা উপদেশ —“সবই তাঁর ইচ্ছে, নিজের অবস্থায় সন্তুষ্ট না থাকা মহাপাপ।”
বিপ্লবের ঝাঁকানি খেয়ে তাদের বুদ্ধি যখন একটু খুলে গেল, তখন যাঁকে যন্ত্রণাময় অবস্থার মূল কারণ বলে বুঝিয়ে দিয়েছিল, তাঁকে “মিত্র” বললে ভাষার একটু উলটো প্রয়োগ হত না কি।
তার চেয়ে, আমাদের শাস্ত্রের উপদেশমতো তাদিকে যদি বোঝানো হত যে, “তাঁর শক্তি তোমার মধ্যেই; তাঁর ইচ্ছায় নয়, তাঁর অভাবে তোমরা হীন হয়ে আছ; আত্মশক্তি জাগাও, তাকেও পাবে।” তাহলে চাষার মনে ভগবানকে শয়তানের সঙ্গে এক কোঠায় বাস করতে হত না।
সাধে এক নাস্তিক বলেছিল—“আমরা তো ভগবানকে নিন্দে করিনে, যাকে মানিনে তার নিন্দেই বা কি প্রশংসাই বা কি। কিন্তু তোমরা ভক্তেরা তোমাদের মনগড়া ভগবানের বড়াই করতে গিয়ে তার রূপ যেরকম দেখাও, তাতে মানহানির অপরাধ আসে বই কি।”
বাস্তবিক অদ্ভুত ভাবে ভগবৎ-রূপ-ব্যাখ্যা মাঝে মাঝে করা হয় বলেই আমাদের আলোচনায় ভগবানের নাম আনতেই ভয় হয়, পাছে শ্রোতা অনবধানে আমাদের কথার সঙ্গে সেরকম ভাব জড়িয়ে ফেলেন।
যাই হোক, অনেকদিনের চাপা-পড়া আত্মশক্তি গতানুগতিকের বাধ ভেঙে যখন প্লাবনের মতো রুশে দেখা দিল, তাতে ‘আমরা আছি, আমরা থাকব’, ‘আমরা উঠব, আমরা ওঠাব’, চারদিকে এই সব ভরসার ধ্বনি শোনা যেত, এখনো যাচ্ছে। নাস্তিকতার ‘কেঁই কেঁই, নেই নেই’ বিলাপ তার মধ্যে কোথায়।
মানুষের প্রতি মানুষ স্বাভাবিক প্রীতি নিয়ে ধরায় আসে। রিপুর আক্রমণে সে-প্রীতি চাপা পড়ে যায় ব’লে ‘ভব’টা এত নিরানন্দ। বিপ্লবের ধাক্কায় রিপুগুলো একপত্তন সরে যেতে রুশবাসীর পরস্পরের প্রতি স্বাভাবিক টান ফুটতে পেয়ে তাদিকে সমবায়ে বেঁধে ফেললে। প্রীতির বাড়া কি ধর্ম আছে, ভালোবাসার চেয়ে জোর বাঁধন কি থাকতে পারে।
প্রীতির অভাবে ক্রিয়াকর্ম বল, মন্ত্রতন্ত্র বল, সে সব শুধু বৃথা নয় আফিমের নেশার মতো অনিষ্টকর,—প্রীতির অভাবের জ্বালা উপস্থিত মতো ভুলিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু বুদ্ধি রুচির অধঃপতন ঘটায়। দেশবাসীকে খাড়া করে তোলার জন্যে বিপ্লবী কর্তারা সেই আফিম বন্ধ করলেন, তাতে পুরোনো নেশাখোর যারা ছিল তাদের কিছু কষ্ট হল বটে, কিন্তু ধর্মনষ্ট হওয়ার অভিযোগটা আমাদের কানে কিছু অদ্ভুত শোনায়।
মানুষে মানুষে প্রীতির যোগসাধন হলে কর্মের কৌশল, কর্মের সুফল, কর্মের আনন্দ সবই বাড়ে তা শাস্ত্রেও লেখে, কাজেও দেখা যাচ্ছে। তবে ধর্মের বাকি থাকে কী। যদি বল ‘বাকি রইলেন ভগবান!’ তবে সে কথাটা একটু ভাবতে হয়
ভগবানকে ডাকার কত কৌশল মানুষে বার করেছে—মনে জপ, হাতে জপ, লিখে জপ, এমনকি তিব্বতী কায়দায় জলের স্রোতে কল ঘুরিয়ে জপ; মন্ত্র উচ্চারণের বিড়বিড়, গুনগুন, হুংকার ছাড়ার আওয়াজ, কাঁশর ঘণ্টার কানে-তালা-লাগানো আওয়াজ, ঢাকঢোলের আকাশ-ফাটানো আওয়াজ; কিন্তু এত করেও আমাদের মতো সিধে বুদ্ধির দর্শকের মনে সেই সন্দেহ জাগতে থাকে,—“ভগবানই বাকি রইলেন বুঝি।”
কোনো কল্পিত রূপকে সারাদিন চোখের সামনে ধরলে, মানুষের দেওয়া যে-কোনো নামকে অষ্টপ্রহর আওড়াতে থাকলে, তাতে তো ভগবানকে জবরদস্তি হাজিরও করা যায় না, তাঁকে আনার সামিলও হয় না। অনেক সময় দেখা যায়, তিনি যখন স্বয়ং নিজমূর্তি ধরে আসেন, আমরা চিনতেই পারিনে। তবে তাঁর আগমন সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হবার এক লক্ষণ ঋষি বাতলে দিয়েছেন,—“তাঁর সাক্ষাতের আনন্দ যিনি পেয়েছেন, তিনি কখনো কিছুতে ভয় পান না।”
রুশের বিপ্লবী গ্রামবাসীদের আমরা যেটুকু পরিচয় পেয়েছি, তাতে ওদের মধ্যে পরস্পর প্রীতির অভাব দেখা যায় না, আলগা আলগা থেকে ধ’সে পড়বার লক্ষণ কিছু নেই। দলে দলে ভেদ, জাতে জাতে ভেদ, বিচারে রুচিতে ভেদ,—এরকম ছন্নছাড়া হয়ে ধর্মকে মারলে ধর্মের পাল্টা মার কেমন ক’রে খেতে হয়, আমরা ভুক্তভোগী তা হাড়ে হাড়ে জানি।
ধর্মকে অন্যভাবে মেরে রুশের রাজপুরুষরা তাদের ধামাধরা ধর্মজীবীদিকে সঙ্গে জড়িয়ে ধর্মের মারে সমূলে ধ্বংস হল। কিন্তু ঐ রুশেরই প্রজারা ধর্মমারা পাপে লিপ্ত না থাকায়, বিপ্লবের দ্বারা তারা উদ্ধার পেয়ে গেল। তাদের মধ্যে আগে যারা জেগে উঠল, কিবা নর কিবা নারী, তারা নিজেকে ভুলে অন্য যারা মোহনিদ্রায় আধাঅচেতন, তাদিকে বাঁচিয়ে তুলতে প্রাণপাত করছে। ফলে রুশের জাগ্রত আত্মশক্তি রাষ্ট্রকে সমবায়ে সমবায়ে জড়িয়ে এমন অভেদ্য বর্ম পরিয়েছে যে যত পাশ্চাত্ত্য রাজতন্ত্রী আছে, তারা বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও ভয় দেখাতে পারেনি। ভয় পেতে অপর পক্ষরাই পাচ্ছে, এদের তেজ দেখে তাদের বিরুদ্ধতার ঝাঁজ আপনিই মরে আসছে।
এখানকার শেষ প্রশ্ন এইটুকু—এমন ভাবে অভয়ে প্রতিষ্ঠিত যারা, তারা ভগবানের কোনো বিশেষ নাম উচ্চারণ করে না বলে তাদের কি ধর্ম নেই। কানাই বিনা খেয়ানৌকো তো টলতে টলতে চলে—যদি নৌকোটা বেশ সোজা চলতে থাকে তাহলে চর্মচোখে দর্শন না পেলেও, মন কি বলে না যে, হালে কানাই ঠিক আছেন। রুশের দেশে কলির শেষে বোধ হয় জয়দেব কবির কথা আর খাটছে না,—হরির নাম বাদ দিয়েই তাঁদের গতি হয় বা।
একটা ছড়া কেটে ধর্মের কাহিনী শেষ করে আনা যাক:
নরের মিলন হলে মেলে নারায়ণ।
ফাঁকা নাম হাঁকে তাঁর দূরে পলায়ন।
ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা
ব্যক্তির হাতে সম্পত্তি রাখা নয়, কিছুতেই নয়, এই হল USSR-এর প্রধান নিষেধ। সম্পত্তি বলতে তাঁরা বোঝেন আবশ্যকের অতিরিক্ত জমানো মূলধন[৪] যা দিয়ে পরকে খাটিয়ে নিজের বিলাস বাড়ানো যায়। সংসারে কারো অতিরিক্ত কারো অভাব হয়েই থাকে। যার যা উদ্বৃত্ত সবই থাকা উচিত সমবায়ের হাতে, যার যা অভাব পুরিয়ে সামঞ্জস্য রাখার জন্যে। দরকারের বেশি ধনে লোভ না রাখলে ঝঞ্ঝাট চিন্তা অনেক বেঁচে যায়, অতিরিক্ত উৎপন্ন মাল গতাবার গোলামচোরের খোঁজে ফিরতে হয় না। প্রত্যেকে অতিরিক্তের লোভ ত্যাগ করে সকলের সম্ভোগের বিধিমতো ব্যবস্থা করা, এই হল আদর্শ।
USSR দেখে শুনে বুঝে সাব্যস্ত করেছেন, মূলধন এক জনের হাতে জমতে দিলেই তাতে রিপুর বীজ এসে বসে, স্বার্থপরতার সার পেয়ে বেড়ে ওঠে, শেষটা সমাজকে গ্রাস করে। মূলধনের জড় মেরে দিলে, ধনী-দরিদ্রের ভেদ; প্রবল-দুর্বলের আহার-বিহারের ভেদ; স্ত্রীপুরুষের আর্থিক অবস্থার ভেদ,—এ সব ঘুচে গিয়ে সমাজ পরিষ্কার হয়ে যাবে; দলে, দলে, জাতে জাতে, মানুষে মানুষে আর ঝগড়া লাগবে না, মানবহৃদয়ের যে স্বাভাবিক মৈত্রী তাই বিরাজ করবে।
ক্ষমতা অনুসারে[৫] সকলকেই শ্রম করতে বাধ্য হওয়ায় শরীর মন তো সুস্থ থাকবেই; তাছাড়া, পরের চাপে কি নিজের লোভে অতিরিক্ত খাটুনিতে শরীর না ভাঙলে, অনিশ্চিত অন্নের দুশ্চিন্তায় শুখিয়ে যেতে না হলে, পরস্পরের সুখ বাড়াবার চেষ্টায় নতুন জ্ঞান লাভ, নতুন নতুন সম্পদ দৃষ্টি করার যথেষ্ট অবসর থাকবে।
এ আদর্শ, এ মতামত মানলে, আজকাল যাকে পাশ্চাত্ত্য সভ্যতা বলে, যার মধ্যে আমরাও জড়িয়ে পড়েছি, তার গোড়ায় কুডুলের ঘা পড়ে; সেজন্যে য়ুরোপের মার্কিনদেশের লোকে, আর তাদের এ দেশের চেলারা তো USSR-এর উপর এত খাপ্পা। কিন্তু আমাদের দেশের সনাতন ভাবের তরফ থেকে এতে আপত্তি করার কারণ পাওয়া যায় না। ভোলানাথ অন্নপূর্ণার অর্ধনারীশ্বর মূর্তি ভারতে প্রসিদ্ধ। সম্পত্তিতে রিপুর আবির্ভাবের ভয় সম্বন্ধে আমাদের দেশ বরাবরই সচেতন। সেজন্যে ধনীকে সমাজের মাথায় বসানো হত না, ত্যাগীর উপদেশের বেশি মূল্য দেওয়া হত।
সুখভোগের স্বাভাবিক কামনা সকলের মধ্যে চারিয়ে দিলে তাতে অশান্তির সৃষ্টি হয় না, লোকহিতে রত থাকলে ক্ষুদ্রতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, ভূমার মধ্যেই আনন্দ, এ ভাবের অনেক কথা আমাদের শাস্ত্রের মধ্যে ছড়িয়ে আছে, কিন্তু সেগুলি সংসারের কাজের মধ্যে দানা বেঁধে উঠতে পারেনি। আমাদের দেশে না-ধর্মি অহিংসার এক সময় চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত দেখা গিয়েছিল, কিন্তু প্রাণ-দিয়ে মানব-সাধারণের ঐহিক ইষ্টসাধনের কোনো হাঁ-ধর্মি পন্থা এ পর্যন্ত কেটে বার করা হয়নি; প্রজাপতির সন্তানমাত্রকে এক ডোরে বাঁধবার কোনো মহামন্ত্র উদ্ভাবন হয়নি।
বর্ণাশ্রম ধর্ম-অবলম্বন করায় প্রত্যেক বর্ণের নিজের নিজের গুণকর্ম চর্চার সুযোগ হয়েছিল বটে, কিন্তু পরস্পরের মধ্যে বেড়া ক্রমে শক্ত হয়ে ওঠায় এক আশ্রম থেকে অন্য আশ্রমে আসাযাওয়ার পথ খোলসা রইল না। দেখা গেল যে, অধিকারভেদ মেনে বসে থাকলে ভেদটাই টিঁকে যায়, অধিকার আর বাড়ে না। ক্রমশ বর্ণভেদেৱ জায়গায় জাতিভেদ চেপে বসল, গুণকর্মের বদল হলে যে ভেদটা বাধা হত না, সেটা জীবন থাকতে পার হবার উপায় বন্ধ হল।
তখন ধর্মের গায়ে লাগল আঘাত,—শুধু কর্তৃপক্ষের জবরদস্তির আঘাত নয়,শুধু ধর্মযাজকের ফরমাশি আঘাত নয়, ভেদের পর ভেদ বিনা প্রতিবাদে মেনে চলায় জাত-কে-জাত নিজের হাতে-দেওয়া আঘাতের অপরাধে লিপ্ত হওয়ায় সকলে মিলে সাজা পেলও তেমনি। কারো সঙ্গে মিলিনে মিশিনে করতে করতে হিন্দু জাতটাই হল একঘরে; যারা পরের ভালো দেখতে পারল না, এখন তাদের ভালো কেউ দেখতে পারে না।
পরস্পর প্রীতি যে-পরম-ধর্ম তাকে চিনতে না পারায়, ত্যাগের দ্বারা ভোগ করার যে সনাতন উপদেশ, আমাদের দেশের লোক তার ঠিক তাৎপর্য পেল না। সম্পত্তি ত্যাগ করার মানে দাঁড়াল সম্পত্তি ছেড়ে পালানো। যে-রোগীর ওষুধ-পথ্যির খরচ জুটছে না, তাকে চেঞ্জে পাঠালে সে যেমন ধনেপ্রাণে মারা পড়ে, এতেও সে ধরনের ফল হল। বিষয়কে বিষময় যেমন বোঝা ওমনি স্ত্রীপুত্রকে তার মধ্যে ফেলে, গেরুয়া পরে গৃহস্থ দে পিট্টান, তাতে অন্য গৃহস্থদের গলগ্রহ হয়ে তাদের বিষাক্ত বিষয়ের ভাগ নিতে হয়, সে খেয়াল নেই। ভারতবর্ষেরই মধ্যযুগের সাধকদের জীবনে দেখা যায়, ঐহিক জীবিকার চেষ্টা পারত্রিক উন্নতি সাধনের বিঘ্ন নয়—তবে জীবিকা অর্জনে সন্তুষ্ট থাকা, আর লাভের লোভে মাতোয়ারা হওয়া, দুটো জিনিস আলাদা। শেষেরটা ত্যাগ করে প্রথমটা রাখলে নিজের জোরে থাকা যায়, কারও গলগ্রহ হতে হয় না।
পরের কাঁধে চাপার এ সহজ উপায়টি জাহির হওয়ায় মেকী-ও চলছে বিস্তর; বিষয়ে যারা মোটেই বিরাগী নয়, তারাও ভেখ নিয়ে রোজগারের দায় এড়ায়। কুম্ভমেলার সময় একজন গেরুয়াধারীর নিজের এষ্টিমেট শোনা গিয়েছিল—লাখে একজন সাচ্চা মেলে না। এতে দেশের অবস্থা যদি কাহিল হয়ে থাকে, তাতে আশ্চর্য হবার কী আছে।
আবার বলি, মিছে আক্ষেপ করার জন্যে এসব কথা তোলা হচ্ছে না। একজনের ফেল হবার কারণ বোঝা থাকলে অন্যের পাস হবার সম্ভাবনা যাচাই করা সহজ হয়।
“যে যার কর্মফল ভোগ করবে, আমি তার করব কী।—নিজের শান্তির চেষ্টা দেখি।”—এ ধারার নাম আর যাই হোক, একে প্রেমের পথ বলা যায় না। এর উলটো ভাব হচ্ছে USSR-এর। “যে যেমন ক’রেই ধরায় এসে থাকি, আমরা সকলেই ভবলীলার খেলুড়ে। এসো তবে, সকলে যাতে ভালো করে খেলতে পারি, পরস্পরকে সাহায্য করা যাক, খেলাটা ভালো করে জমিয়ে সকলে মিলে আনন্দ করা যাক।” একে অন্তত নিরানন্দের পথ বলা যায় না।
তবে নাম নিয়ে তো নয়, পরিণাম নিয়ে কথা। যে পথে লাখে একজন উচ্চ অবস্থা পেলেও পেতে পারে, আর বাকি সকলে দ’য় মজে, তার বিষম পাকের চেহারা তো আমরা চারিদিকেই দেখছি—গোড়ায় পুষ্টির অভাবে বলক্ষয়; বলহীনের বুদ্ধিনাশ, ঐহিক পারত্রিক উন্নতির পথ বন্ধ; শেষে রিক্ত আত্মার আরো বলক্ষয়। অন্যদিকে, ইহলীলা ভালো করে খেললে তাতেই শরীর মনের পুষ্টি, সেকথা কে না মানবে। ভালো করে খেলা মানে ভালোবেসে খেলা। প্রেমের গতি কেন্দ্রাতিগ; বাড়ার দিকেই চলে। আশেপাশের প্রেম উপরের প্রেমকে টেনে আনে, উপর থেকে প্রেম নামলে বিশ্বময় ছড়ায়। খেলা জমে উঠলে খেলানেওয়ালাকে দলে টেনে নিয়ে শেষে আরো বড়ো খেলা ফাঁদবার আশা থাকে না কি। অন্তত এইটুকু জোর করে বলা চলে,—লীলাময়ের দেওয়া খেলা ফুর্তি করে খেললে তাঁর সঙ্গে ঝগড়ার কারণ হতেই পারে না।
আপত্তি করতে পার,—এসব ভারতবর্ষী ভাব রুশদেশ সম্বন্ধে খাটবে না। আচ্ছা বেশ, ওদেরই পাঁচজনের কথা একজনের জবানিতে, আমাদের সেই প্রবাসীর টোঁকা থেকে শুনিয়ে দেওয়া যাক। এক বিপ্লবী সমবায়-সম্পাদক বলছেন,—“মার্কিন দেশ থেকে যারাই আমাদের বিপ্লবের খবর করতে আসে, তারা জিজ্ঞেস করে—ওহে, তোমরা যে এত ভাবছ, এত খাটছ, যতই অসুবিধে হোক ভালো মনে সয়ে যাচ্ছ, এ কোন্ সম্পদ পাবার আশায়। তোমাদের নিজেদের পাওনা-থোওনা তো কোনো ব্যবস্থাই দেখছিনে।
“আমাদের উত্তর এই—তোমরা যে সব বিলাসের উপকরণকে সম্পদ বল, তা আমরা পাব না বটে, পাবার শখও নেই; পরের ঘাড়-ভাঙার যে ক্ষমতাকে তোমরা খ্যাতি-প্রতিপত্তি বলে থাক, তাও পাব না, পেলে নিতাম না; কিন্তু আমার গ্রামের ফসল বাড়ুক, আর হাজার মাইল দূরে খাল কেটে জলদানের ব্যবস্থা হোক, আমার পাড়ার কারখানা ভালো চলুক, আর অন্য প্রদেশের খনি থেকে রত্ন উঠুক, সর তা’তে আমার মনপ্রাণ ঝংকার দিয়ে ওঠে, কারণ আমি জানি, এ সর কোনো সম্পদ একজনের বা একদলের নয়, সমৃদ্ধি সকলেরই; আর সে ‘সকলের’ মধ্যে আমিও আছি, সুতরাং আমারই। এত বড়ো লাভের জন্যে যে কর্তৃত্বটুকু ছাড়তে হয়েছে, সে ত্যাগে কাঁটা নেই, তাতে সমবেত সম্ভোগের যে ফুল ফোটে তার রাষ্ট্রজোড়া সৌরভে আমরা নিশিদিন মাতোয়ারা। সোনায় গিল্টি করা লাগে না, ফুলে রং দিতে হয় না, আমাদের আনন্দের লজ্জত বাড়াবার জন্যে সেকেলে ধর্মজীবীদের বাসী-বচনের পালিশ আবশ্যক নেই।”
আমরা গোড়ায় প্রশ্ন তুলেছিলাম—সমবায়ের হাতে সম্পত্তি থাকায় ব্যক্তিগত আর্থিক ঔদাসীন্য, পারমার্থিক উন্নতির বাধা হয় কি না। সম্পাদকের কথা যা শোনা গেল, তাতে বেশ বোঝা যায়, নিজের উন্নতির সঙ্গে সকলের উন্নতি জড়িয়ে গেলে ব্যক্তির উৎসাহ কম পড়ে না। যদি বল এ তন্ত্রে মার্কিন দেশের মতো অত বড়ো বড়ো কারখানা জন্মায় না, তার উত্তরে বলতে হয় USSR-এর সব কারখানাই তো এক প্রকাণ্ড কারখানার শাখা, সুতরাং আয়তনের দিক থেকে ধরলেও একদল নেতার হাতে এত বড়ো আয়োজন আর কোথাও দেখা যায় না।
কিন্তু আমরা সাবধান করে দিয়েছিলাম যে, লক্ষ্মীর প্রসাদ বড়ো মজার জিনিস, তাকে ওরকম স্থূলভাবে মাপলে ঠকা হয়। তুলনা করতে হলে একদিকে রাখো প্রত্যেক সমবায়ীর কাছে সকলের আনন্দের যে ভাগ পৌঁছয়; অন্যদিকে রাখো সেই সমবায়ীর নিজের শ্রমের ক্লেশ। দাঁড়িপাল্লা তুলে ধরলেই মজাটা বেরিয়ে পড়বে। প্রথম দিকে দেখবে আনন্দকে ভাগাভাগি করে নিলে গণিতের নিয়ম মানে না, কমে না গিয়ে বেড়ে যায়। অন্যদিকে সুস্থ সবল শরীর দুশ্চিন্তারহিত মন দিয়ে যে শ্রম করা যায় তাতে তো ক্লেশই থাকে না, সেও আনন্দের পাল্লায় গিয়ে বসতে চায়।
এ চমৎকার ব্যাপার দেখো আর মনের আনন্দে জয়জয়কার করো। কার জয়? যে আনন্দ দিচ্ছে, যে আনন্দ পাচ্ছে, তোমার আমার মতো যারা সে আনন্দদৃশ্য দেখছে, সব উপরে যিনি আনন্দের মূল উৎস সকলেরই জয়।
পারমার্থিক উন্নতির কথা আর বেশি বাকি কি। বোঝাই তো গেল, সংঘের কারণে ঘটা দূরে থাক্, বাধা আসে অভাব থেকে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির রাজ্যে যে কৃতী তার একমাত্র লক্ষ্য সম্পত্তি বাড়িয়ে চলা,—ছেলে থাকলে বাড়াও, ছেলে না থাকলে বাড়াও, ছেলে ব’কে যাচ্ছে তবুও বাড়াও, ধুঁক্তে ধুঁক্তে বাড়াও, মরতে মরতে বাড়াও—এ অবস্থায় আত্মার খবর সে কী রাখবে। আর যে অকৃতী, সে তো শুখোচ্ছে, আশায় আশায় শুখোচ্ছে, নিরাশায় শুখোচ্ছে, প্রবলের চাপে শুখোচ্ছে, অভাবে ক্ষীণ হয়ে শুখোচ্ছে—ঠাকুরদেবতার নাম ধ’রে আর্তনাদ করলে, কী হবে, আত্মার সন্ধান তো দুর্বলে পায় না। বাড়তি কম্তি এই দুই বিষম অবস্থা থেকে সমবায়ে যে মুক্তি পেয়েছে, সে তো বেঁচে গেছে।
অতএব, সংঘের ভারে মানুষকে তরীর মতো উপরে ভাসিয়ে তোলে, জড়পিণ্ডের মতো তাকে তলিয়ে দেয় না,—এই রায় দিয়ে তৃতীয় বর্গের আলোচনায় বসা যাক।
স্বে মহিম্নি
অন্য সভ্য সমাজের তুলনায় USSR-এর বিধানে স্ত্রীজাতির অবস্থা ভালোমন্দ কেমন দাঁড়িয়েছে, সে খবর শ্রোতার কাছে ধ’রে দেওয়ার আগে যাকে বলে “নর-নারী সমস্যা” সেটা নিয়ে আপোশে একটু বোঝাপড়া করে নেওয়া মন্দ না। বাস্তবিকই যত সব সমাজের উপর এ সমস্যাটা যেন ঝোড়ো অন্ধকারের মতো চেপে আছে, সমাজ নেতারা কুলকিনারা ঠাওর পাচ্ছেন না। কিন্তু বলে রাখি, আমরা ভয়ভাবনায় মন ভার করে আলোচনায় বসছিনে।
শুধু মানুষের নয়, অনেক শ্রেণীর জীবের মধ্যে সন্তান উৎপাদন-লালন-পালনের ভার স্ত্রীপুরুষের উপর ভাগ করে দেওয়া আছে। প্রকৃতির নিজের জন্মটা কিনা আনন্দ থেকে, তাই তিনিও সন্তানদের জীবনযাত্রায় আহারে বিহারে ব্যায়ামে বিরামে, পদে পদেই আনন্দের ব্যবস্থা করেছেন। বংশবৃদ্ধি কাজটা জীবনের ধারা চালাবার পক্ষে যেমন দরকারী, স্ত্রী-পুরুষের আনন্দের বরাদ্দটাও তেমনি বেশি।
যে কাজের সঙ্গে যে আনন্দ দেওয়া আছে, পশুরা তাই সাদাসিধে ভাবে উপভোগ করে। যেমন আহ্লাদ করে খায় দায় লাফায় ঝাঁপায় ঘুমোয়, তেমনি স্ফূর্তি করে যথাকালে জোড় বাঁধে, বাচ্ছা দেয়, তাদিকে খোরাক যোগায়, লায়েক হলে সংসারে ছেড়ে দিয়ে জীবনের এক পরিচ্ছেদ খতম করে।
লোভ মানুষকে পেয়ে বসায় তার এমন বদ অভ্যেস হয়ে গেছে যে, পরিচ্ছেদ ছেড়ে সে জীবনের কোনো প্যারাগ্রাফকে ফুরোতে দিতে চায় না। প্রকৃতিমায়ের দেওয়া আনন্দ যেখানে যা পাবার, এমন কি যেখানে নাও পাবার, ক’চলে বেশি করে আদায় করতে গিয়ে, জীবনটাই বিস্বাদ ক’রে ফেলে। ফলে দুর্ভোগী আর ফাঁকা-ত্যাগী দুই দলে সমস্বরে ফুকরে উঠে—“সবি ইঃ আর উঃ আর আঃ, জীবনটাই কিছু নাঃ।”
আহারের ব্যবস্থা দেখলে মানুষ জাতের ভাবটা পাওয়া যায়। মুখে যেই খাবার ভালো লাগা, অমনি বুদ্ধি এসে বাতলায়—“একা জিভটার উপর সব চাপানো কেন, চোখ-রুচি সাজাও, নাক-রুচি গন্ধ লাগাও, কান-রুচি হাপুস্-হুপুস্ও যেন বাদ না যায়, তবে তো ষোলো আনা মজা পাবে।’ সেই সঙ্গে রিপু জুটে ফোস্লায়,—“খিধের কমতি থাকলে চাটনি; পেট ভার করলে হজমীগুলি।” রোমানরা ছিল বড়ো পাকা জাত। ভোজে একপ্রস্থ নতুন ব্যঞ্জন পরিবেশনের যোগাড় দেখলে, উঠে গিয়ে বমি ক’রে জায়গা খালি ক’রে আসত! এমন জাত কলির শেষে মুষলিনী প্রসব করলে কেন, যদুবংশের ইতিহাসে তার নজির পাওয়া যেতে পারে।
এই সবই বুদ্ধির আড়ালে আদি-রিপু লোভের কেরামতি। রিপুটির ছদ্মবেশ ভেদ করে চিনে নিতে পারলে তার জারিজুরি আর খাটে না। জঠরের আগুন ওস্কাতে গিয়ে চিতার আগুনটা অকালে টেনে আনা না হয়, নিজের দাঁত দিয়ে নিজের গোর না খোঁড়া হয়, সে বিষয়ে মানুষে সাবধান হয়ে আসছে। আগে আগে ব্যায়ামে-বাড়ানো শরীরের বহর দেখিয়ে লোকে আস্ফালন করতে ভালোবাসত, এখন বুঝেছে মাংসপেশী ফোলাতে গিয়ে হৃৎপিণ্ড ফেল্ পড়তে পারে। প্রভুত্ব যতই মিষ্টি লাগুক, আজকাল বিপ্লবের ছায়া যেখানে-সেখানে যেরকম উঁকিঝুঁকি মারছে, তাতে যা রয়সয় তারি মধ্যে কর্তারা নিজেকে সংবরণ করতে শিখছে।
কিন্তু নরনারী-সমস্যা সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তো বাড়ছেই,—তার মানে ওটা একা রিপুর পাকানো ফ্যাসাদ নয়, ওতে মিত্রেরও হাত আছে। এ রকম জটিল জিনিসকে ছাড়িয়ে দেখা দরকার, নইলে জটের প্যাঁচে বুদ্ধিটাও জড়িয়ে যেতে পারে। হ’লে কী হবে, এ সমস্যার কথা উঠলে লোকে হয় গদ্গদ, নয় জড়সড়, নয় আগুন হয়ে ওঠায় ওর খেইগুলো আলাদা ক’রে ধরাই যায় না। আচ্ছা, হয় না তো কী হয়েছে, আমরাই ঠাণ্ডা মনে বিচার করলেই তো চুকে যাবে।
রিপুর হাত কোথায় ভাবতে গেলে দেখা যায়, নারীকে নরের সম্পত্তি বানিয়ে দিয়ে সে এক আঁচড়েই কর্ম সারা করেছে। এখন সমাজের যে স্তরেই দেখ, সেই অঘটনের ক্রিয়া চলছে।
আসুরিক স্তরে পুরুষটা প্রণয়িনীকে ঘাড়ে ধরে নিজের আড্ডায় টেনে নিয়ে যায়, সেখানে তাকে দিয়ে দাসীগিরি, রাঁধুনি-গিরি, মা-গিরি সব করায়। স্ত্রীলোকটা ভর্তার কাছে পেটভাতা পায়, তাছাড়া সে এটাও বোঝে যে, ছুটো থেকে পশুপতির থাবা খাওয়ার চেয়ে মানুষপতির চড়টা চাপড়টা মন্দের ভালো, তাই চুপচাপ না থাকলেও, তার ঘরে টিঁকে থাকে ঠিক।
পৈশাচিক সমাজে শৌখিন নর-পুঙ্গব তার অর্থ-সামর্থ্যে যে পর্যন্ত কুলোয়, ততগুলি রমণীরত্ন সে সংগ্রহ করে। অবলা মানুষ নিরাশ্রয় থাকলে পাঁচ জনের মন যুগিয়ে তাকে চালাতে হত, তার চেয়ে এক জনকে খুশি করে যদি খাওয়াপরা সাজসজ্জা আরামে পাওয়া যায় মন্দই বা কী, তাই এ অবস্থায়ও সে পোষ মেনে থাকে, এমন কি কামিনীগিরি প্র্যাক্টিস ক’রে কিছু সুবিধেও ক’রে নেয়।
আসল বাঁধন ধর্মের ফাঁদে। শাস্ত্রে আইনে মিলে ইহকাল পরকাল জড়ানো শিকল বার করেছে। তন্ত্রমতো মন্ত্র একবার আওড়ে ফেললে কনের আর ছাড়ন-ছোড়ন নেই। গৃহকর্তা বেঁচে থাকতে তার ঘরের, তার কুলের, তার শখসাধের প্রসঙ্গ নিয়েই জীবন, পতিদেবতা মারা গেলেও নিজেকে ভুলে তার ধ্যানে মশগুল থাকতে হয়। পুরস্কার কী,—না “সতী” খেতাব। আর পায় কে? ধর্মের সিঁদকাঠির মতো উঁচু অঙ্গের মন চুরী করার উপায় আর নেই, স্বাধীন বিচারের মাথা ঐখানেই খাওয়া গেল। জীবন উৎসর্গ তো তুচ্ছ কথা, সতী বললে পতিব্রতা আগুনেও ঝাঁপ দিতে রাজি।
আজকালকার রুচিতে এ সব অবস্থার কোনোটাই যদি ছেলেমেয়েদের মনে না ধরে, তাতে তাদের অপরাধ কী। যে ভাবে হোক ভয় দেখিয়ে, ঘুষ খাইয়ে, বোকা বুঝিয়ে—স্ত্রীজাতিকে মানিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু তা’তে তার হালটা কী দাঁড়ায়। নিজেকে কেন্দ্র করে তার চারদিকে স্ত্রীকে ঘুরিয়ে যে পুরুষ সন্তুষ্ট থাকে, তার সেই সংকীর্ণ মনের মাপে সেই ঘরের বউ, সেই কুলবধূকে খাটো হয়ে থাকতে হয়। তারপর সেইমতো ছাঁটাই নারীকে শক্তিরূপিণী বলে হাজার খোশামোদ করলেও, সে কোনো বড়ো কাজ করার শক্তি পাবে কোত্থেকে।
ছেলেকে মেষ না করে মানুষ করা, সংসারকে গারদ না করে লীলাঘর করা, আগামী কতযুগ আবাহনের আয়োজন করা,—নরনারী নিজ নিজ মহিমায় মিললে তবেই এ সবের আশা থাকে, কিন্তু আমরা যতগুলি সম্পত্তি-পাগল সমাজ জানি তার মধ্যে সে সম্ভাবনা কোথায়।
বলা হয়েছিল নরনারী সমস্যার মধ্যে মিত্রেরও হাত আছে। সে রহস্যটাও এবার খুলে দেখার চেষ্টা দেখা যাক।
প্রারম্ভে শ্রোতাকে সেই খাঁটি প্রেমের কথা মনে করিয়ে দিই, আনন্দলোকের সঙ্গে যে প্রেম মানুষকে যোগ ক’রে রাখে, যার ধারা একেবারে ছেড়ে গেলে মানুষ ঘোর অন্ধকারে তলিয়ে যায়। এ প্রেমের প্রকার বা ক্রিয়া এ বর্গের মধ্যে আলোচনা হতে পারে না, তবে আমাদের কথাটা ফোটাবার জন্যে যেটুকু দরকার তাই বলা যাক।
বিশুদ্ধ স্বাধীন ভাবই খাঁটি প্রেমের বিশেষ লক্ষণ। সংসারের কাজে এ প্রেম আমাদের সহায় নয়; এর প্রভাবে মা-বাপ সন্তানকে কোলেপিঠে নেয় না, দম্পতি সোহাগ করে না, সন্তান মাবাপের নেওটো হয় না। স্নেহ মমতা ভক্তির সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই,—এক নিছক সখ্যের মধ্যে সংসারে একে দৈবাৎ পাওয়া যায়। গুরু-শিষ্য, জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ, নর-নারী এ সব ভেদে এ প্রেমের বাধা ঘটে না, বড়ো জোর রং বা সৌরভের কিছু রকমারি হতে পারে। প্রয়োজন বা সম্বন্ধের দাবি এর অন্তরায়। এর আকর্ষণে মানুষ মানুষকে টানে কিন্তু বাধে না। আপাতত আমরা যদি মেনে নিই যে, এ রকম প্রেম কদাচ লাভ হলেও, এ ধন জগতে আছে, তাহলেই এ বর্গের আলোচনার কাজ চলে যাবে।
যেখানেই পাঁচরকম সাংসারিক ভালোবাসার সঙ্গে এই মুক্ত প্রেমকে গুলিয়ে ফেলা হয়, সেখানেই বুদ্ধিবিপাকে পড়ে একটা না একটা সমস্যা পাকিয়ে উঠতে চায়। তাই এক পত্তন সাংসারিক ভাবগুলিকে ছাড়িয়ে ছুড়িয়ে সাদা বুদ্ধির আলোতে তুলে ধরে, মাথাটা ভাষাটা পরিষ্কার করে নেওয়া যাক। বাঁধি গৎ নিয়ে গ’লে থাকলে চলে না। খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে কোনো ভাবের অপ্রচলিত চেহারা বেরিয়ে পড়লেও তাতে ভয় পাবার কিছু নেই।
প্রথমে ধরো স্নেহ। এ কথাটা বেশ। যে ভাব মায়ের বুকে দুধ টেনে আনে, যেভাবে ছেলেকে কোল ধরে মা-বাপে আদর করেন, সাজান গোজান, খেলেন খেলান,—স্নেহ তার উপযুক্ত নাম। অপর পক্ষে, স্নেহের বিনিময়ে যে মিষ্টি রস মা-বাপ আদায় করে নেন, ছেলেকে পালন করার পরিশ্রমের তাই তাঁদের পুরস্কার,—বড়ো হয়ে ছেলে কৃতজ্ঞ হবে তার অপেক্ষা দুনিয়াদারির অভ্যেসে মা-বাপ করতে পারেন, কিন্তু স্নেহতে তা করায় না। এই পুরস্কার প্রাণ ভরে উপভোগে কোনো দোষ নেই যদি মনে রাখা যায় স্নেহের স্বাভাবিক আয়ু শিশুকালের সীমার মধ্যে পরিমিত। শিক্ষাদীক্ষার সময় এলে স্নেহের জায়গায় মিত্রতা আসার দরকার, নইলে বুড়ো ছেলেকে আঁচল-বাঁধা করলে, কিংবা নিজের মনের মতো তার স্বভাবকে মোচড়াবার চেষ্টা করলে, না ছেলের না মা-বাপের পক্ষে ভালো।
সে যাই হোক; আমরা যে বন্ধনহীন প্রেমের কথা বলছিলাম, পরিমিত বাৎসল্যবৃত্তি সে প্রেম নয়। তবে স্নেহভক্তির জঞ্জাল যথাকালে কাটিয়ে উঠতে পারলে, মা-বাপ ছেলেমেয়ের মধ্যে সেই অহেতুকী প্রেমের সঞ্চার হতে পারে না, এমন কোনো কথা নেই।
ভক্তি জিনিসটা কিন্তু অদ্ভুত। শ্রদ্ধাতে ভক্তিতে তফাত এই যে, সত্যিকার কোনো গুণ অনুভব করলে, অন্যদোষ দেখা সত্ত্বেও শ্রদ্ধা আপনি আসে, তার জন্যে ঢাকঢাক গুড়গুড় লাগে না। গুণ আরোপ করে, দোষ চাপা দিয়ে তবে ভক্তি আনতে হয়; বিগ্রহে যেমন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে, স্তবস্তুতি দিয়ে বাড়িয়ে না তুললে তার পুজো চলে না। এইজন্যে মা-বাপ সম্বন্ধে ছেলেপিলের যে স্বাভাবিক ভাব, তার নাম “ভক্তি” দিতে আমরা নারাজ। যাঁদের আত্মসম্ভ্রমবোধ আছে এমন কোন্ মা-বাপ ছেলেদের কাছে মেকি দেবতা সেজে থাকতে চান। পাকা বুদ্ধি বা উদার হৃদয়ের গুণে কোনো মা-বাপ যদি ছেলেদের শ্রদ্ধা পান, ভালোই; না পেলেই বা কী। নিজেদের দোষে না খোয়ালে, সব মা-বাপ নিশ্চয়ই ভালোবাসার অধিকারী। ভালোবাসায় যার কুলোয় না, ভালোবাসা কী সে তা জানে না।
এত কথার পর বলাই বাহুল্য আমরা যে প্রেমের কথা বলছিলাম, ভক্তির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
এবার আসল কথায় আসা যাক। যে স্বাভাবিক টানে যুবকযুবতী প্রজনার্থ পরস্পরকে চায়, তার নাম দেওয়া যাক প্রণয়। এই প্রণয়ের সহজ রাস্তায় সকারণে অকারণে মানুষ নানা বাধাবিঘ্ন এনে ফেলেছে,— সমাজের বিধিনিষেধ, দুই পক্ষের মা-বাপের ইচ্ছে অনিচ্ছে, টাকাকড়ি নিয়ে টানাটানি, আরও কত কী। ফলে, সমাজের মধ্যে স্বাভাবিক প্রণয় অনুসারে পরিণয় বড়ো একটা ঘটে না, বিয়ের পর যেটুকু প্রণয় গজায় তাই নিয়েই দম্পতিকে ঘর করতে হয়। প্রণয়ের স্বাভাবিক স্থান গৃহের মধ্যে, ওর স্বাভাবিক আয়ু গৃহস্থাশ্রমেই শেষ। স্বস্থানে ওকে না রাখলে এক পত্তন ফ্যাসাদের সৃষ্টি হয়; তার উপর ওকে ফেনিয়ে ফাঁপিয়ে ওর মধ্যে যা নেই তা আদায়ের চেষ্টা করলে, শরীর মনের স্বাস্থ্য তো নষ্ট হয়ই, তার উপর যেটা ছিল মাত্র ফ্যাসাদ সেটা সমস্যা হয়ে ওঠে।
প্রকৃতির জীবধারা-রক্ষার উপায় যে দৈহিক প্রণয়, আর মানবাত্মার মহাযাত্রার পাথেয় যে বিদেহী প্রেম, এ দুইয়ের মধ্যে মানুষের মনে অনেককাল থেকে যেন একটা গোল পাকিয়ে রয়েছে।
কবি যখন বিলাপ করলেন—লাখো যুগ ধরে হিয়ায় হিয়া রেখে জুড়োনো গেল না, তখন এ সহজ কথাটা তিনি কি ভুলেছিলেন যে, হিয়ার মিলনের আনন্দের রেশ ক্ষণ-কয়েকের বেশি থাকে না?—তা তো সম্ভব নয়, তবে কী ভেবে তিনি তাতে যুগ ভরা আশের কথা তুলেছিলেন। মনে হয় তাঁর প্রিয়া তাঁর সঙ্গে এক আধ্যাত্মিক স্তরে ছিলেন না, তাই কাছাকাছি আসার কারণে আত্মায় আত্মায় যে স্বাভাবিক আকর্ষণ অনুভব করতেন, সেটা সত্যিকার প্রেমের মিলন পর্যন্ত পৌঁছতে পেত না,—না পেলেও কী-যেন-হলে-হতে-পারত, কী-যেন-হয়েও হল-না এ রকমের অস্ফুট আক্ষেপ কবির গভীরে রয়ে যেত।
যবন-দার্শনিক Plato এই বিদেহী প্রেমকে আলাদা করে চিনেছিলেন বলে মনে হয়। কিন্তু সে দেশেরই হোক, এ দেশেরই হোক, সেকেলে কবিরা সম-স্তরের সঙ্গীসঙ্গিনী না পাওয়ায়, বা যে কারণেই হোক, তাঁদের আদিরসের গুণগান দেহের বন্ধন ছাড়িয়ে উঠত না। অথচ আসল প্রেমের আকাঙ্ক্ষা তাঁদের ছিল নিশ্চয়ই, তাঁদের রচনাশক্তির তো কথাই নেই, তাই তাঁদের সোনার কাঠির পরশে তাঁরা প্রণয়কেই গিল্টি করে দিয়ে গেছেন। তাঁদের আধুনিক জাতভাইরাও অনেকে সেই কাজে লেগে আছেন।
ফলে, সাহিত্যজগতে প্রণয়কে যে রং চড়িয়ে রাখা হয়েছে, তাতে মানুষের বাস্তব জীবনে অনেক অলীক সাধবাসনা জেগে ওঠে, যার তৃপ্তির উপায় সাহিত্যেও দেখানো নেই, ভুল পথে খুঁজে পাঠকরাও পায় না, কাজেই হতাশ হয়, হা হুতাশ করে, নানা জালে জড়ায়। প্রণয়কে অতি উঁচুতে তুলতে গিয়ে গোলটা বেধেছে ব’লে তাকে মিত্রের বার বলা হয়েছিল।
তবে কি না, মিত্রের উপর রাগ করা দূরে থাক্, আমরা রিপুকেও বন্ধু করে নেওয়ার পক্ষপাতী। সব ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে আহারের ব্যাপারটা পরিপাটী করে আনা, সে তো সভ্যতার একটা উজ্জ্বল কীর্তি। রিপুকে ভয় করার কোনো কারণ থাকে না, যদি রুচিকে হামেশা বুদ্ধির সাথী করে রাখা যায়। হাজার চমৎকার পশমী কাপড় যেমন ভাবুনে মহিলারও গরমী কালে গায়ে চড়াবার শখ হয় না, তেমনি খাবার বিষয়ে অখাদ্যে সহজ অরুচি বুদ্ধির সাহায্যেও চর্চা করা যায় না কি।
প্রণয় সম্বন্ধে ভাবুকের ভুলটা বুঝে চলতে পারলে তার দোষও আপনি কেটে যাবে।
নন্দনকাননে যুগল ভ্রমণ, চাঁদনীর লজ্জত, পাখির তান, ফুলের সুবাস, দখিনে বায়, দুঁহু দোঁহার পানে চাওয়া, এসবে যার প্রাণ না মাতে, এর এককণা রস যে বাদ দিতে চায়, তাকে তো আকাট বেরসিক বলি। ওদিকে, এক বাসা, এক জীবিকা, একই সন্তানসন্ততি আত্মীয়কুটুম্ব নিয়ে ঘর করেও যে-দম্পতির মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বা অন্তত রফারফি না হয়ে যায়, তাদিকে বেধড় বদমেজাজী বলি। কিন্তু কথক হলেই কথা নিয়ে পিটপিটে হতে হয়, তাই আপত্তি করি, যতই চমৎকার হোক, এসবকে প্রেম বলা কেন।
তবে কি প্রণয়ীদের মধ্যে প্রেম হয়ই না। ধাপে ধাপে উঠতে পারলে হতে পারে বইকি।
প্রজনার্থ প্রণয় (দেহের মিলনে ইন্দ্রিয়সুখ-বিনিময়)।
সহবাসে ভাব (মনের মিলে চিত্তবৃত্তির বাণী বিনিময়)।
সহধর্মে প্রেম (আত্মার একীকরণে সত্তার আনন্দবিনিময়, যার ভাষা কবি শেলি দিয়েছেন: সত্তায় সত্তা মিশে যাওয়া (in one another’s being mingle)—যদিও পাশ্চাত্ত্য পাঠকরা এ ভাষার সে মানে ধরেন কিনা সন্দেহ)।
এই ধাপ ধরে উঠলে প্রণয়ীযুগল চরম অবস্থায় পৌঁছতে না পারবে কেন। কিন্তু বিয়ের মন্ত্র পড়াগোছের কোনো কৃত্রিম তুকতাকে প্রেম হয় না; তাছাড়া, না হতেই হয়েছে মনে করায় বা বলায় লাভই বা কী। তাতে উলটে প্রেমের পথে বাধা পড়ে।
এই ভূমিকার পর নরনারীসমস্যা আর একটু খুটিয়ে দেখা যেতে পারে।
প্রকৃতির নির্দেশমতো বরকনের মিলনের পথে জাতকুলমেল যত রকমের বাধা ছিল, তার মধ্যে ক্রমশ প্রধান হয়ে দাঁড়াচ্ছে টাকা। তার প্রথম ফল এই যে, যে-ছেলে সুবিবেচক, দূরদর্শী, সে বিয়ে করছে না, যারা ছ্যাবলা, কাণ্ডজ্ঞানরহিত, তারাই নিখাকী বংশ বৃদ্ধি করে অশেষ যন্ত্রণার সৃষ্টি করছে। সমাজের গতি তাতে নিচের দিকেই চলেছে।
যথাকালে উপযুক্ত পাত্রপাত্রীর বিয়ে না হওয়ায়, প্রকৃতির তাড়নায় নানা সামাজিক উপসর্গও দেখা দিচ্ছে। কিন্তু সামান্য ত্রুটির সোজাসুজি সংশোধন না করে তার উপর মহাপাতকের বোঝা চাপিয়ে প্রণয়ঘটিত অপরাধের এমন ভীষণ মূর্তি খাড়া করা হয় যে, সাহায্য করতে কেউ এগোয় না, খালি সাজার কথাই ভাবে। কিন্তু যতই রাগ হোক, সমাজ তো শক্তের বাঘ হতে সাহস পায় না, কাজেই যে অবলা আইনের আশ্রয় পায়নি, যে শিশু বিনামন্ত্রের আমন্ত্রণে ধরায় এসে পড়েছে, চোটপাটটা তাদের উপরেই গিয়ে গড়ে। নরনারীসমস্যা তো নয়, অবলা শিশুসমস্যাই বলতে হয়। সমাজের ক্ষয়ের এই অপর কারণ।
সমাজবৃদ্ধেরা কপাল চাপড়ান, পাহারা কড়া করেন, সাজা বাড়াতে বসেন,—অপরাধের জড়-মারার ভাবনা ছাড়া আর সবই ভাবেন। জড় মারার উপায় করছেন USSR-এর বিপ্লবীরা।
এক বিষে, এক ভুলে যদি নরনারী-সম্বন্ধ অসুস্থ হয়ে থাকে, তাহলে এক ওষুধেই বা স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে পারা যাবে না কেন—ব্যক্তির হাতে সম্পত্তি থাকায়, মানুষের সমানভাবে খাওয়া-পরার, স্বাভাবিকভাবে মেলামেশার যেসব অন্তরায় হয়ে থাকে, সমবায়ের হাতে সম্পত্তি এনে ফেলায় এক বিধানে সে সব উড়ে গেল। নারীও আর সম্পত্তির কোঠায় রইল না, সে হল সব বিষয়ে নরের সম-অধিকারী।
মানুষ হল অর্ধ পশুদেব; এই জোড়া স্বভাবের দোটানায় পড়ে তার যত গোল বাধে। যেসব দেহসুখ পশুরও আছে মানুষেরও আছে, একদিকে সেগুলো সাদাভাবে ভোগ না করে বুদ্ধির জোরে জবরদস্তি বাড়াবার যেসব দুর্ভোগ, তার কথা তো আগেই বলা হয়েছে। অন্যদিকে মানুষ পেয়েছে ডেপুটিস্রষ্টার পদ, সৃষ্টিকাজেই তার মানুষের উপযুক্ত উঁচুদরের আনন্দ পাবার উপায়, সৃষ্টির নব নব উন্মেষে তার ব্রহ্মাস্বাদের ভূমানন্দ পর্যন্ত পাবার উপায় আছে।
কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের উপর চলছে যে-আধুনিক সভ্যতা, তার হুড়োহুড়ির চোটে শ্রান্ত-ক্লান্ত গৃহস্থের সৃষ্টি কাজের অবসর কোথায়। তাই সে নিশিদিন অবসাদে ডুবে থাকে, তাই জলে-পড়া লোক যেমন কুটোটা-কাটাটা আঁকড়ে ধরে, সে-ও তেমনি সহজে-পাওয়া-যায় যে-ইন্দ্রিয়সুখ, সময়ে-অসময়ে স্থানে-অস্থানে তাই নিয়ে টানাটানি করে। অহরহ অন্নচিন্তার জ্বালা থেকে সে যদি নিস্তার পায়, উচ্চ-আনন্দলাভের আস্বাদ পায়, সে কি সস্তা সুখের শান্তিভোগের ধার দিয়ে আর যেতে ইচ্ছে করবে।
যা হোক, একে একে দেখাই যাক না, সংঘবদ্ধ হলে প্রকৃতির দেওয়া স্বাভাবিক সম্বন্ধগুলোর কী অবস্থা দাঁড়ায়।
আমরা তো দেখেছিলাম, পরিবারের মধ্যে বদ্ধ থাকলে স্নেহের স্বাভাবিক আয়ু ফুলের মতো অল্পকাল স্থায়ী, টেনে রাখতে গেলে ফল খারাপ হয়। সমবায়ের হাতে পড়ে, আয়ু ঠিক রেখেও, পরিসর বাড়িয়ে স্নেহকে বিরাট করে তোলা হয়েছে। যে নারীর যেমন মাতৃভাবের জোর, সে ধাপে ধাপে নিজের ছেলেদের মা, সমবায়ের ছেলেদের মা, রাষ্ট্রের ছেলেদের মা হয়ে উঠতে পারে,—তার জন্যে শুধু যে দরজা খোলা তা নয়, সত্যিকার মায়ের সন্ধান পেলে রাষ্ট্রনেতারা তাঁকে আদর করে ডেকে নিয়ে বড়ো করে তোলেন।
সর্বঐশ্বর্যসম্পন্ন ভগবানকে তাঁর দেওয়া ভোগ্যবস্তু ফিরে নিবেদন করার যথার্থ তাৎপর্য কী হতে পারে। যে মানুষ প্রসাদের অধিকারী, সে অনধিকারীকে নিজের আসনে তুলে নিয়ে ভাগ দেবার চেষ্টা করলে সেটা বরং বেশ দিলারাম দৃশ্য হয়। তেমনি, মা-বাপকে সন্তান প্রতিদান কিবা দিতে পারে। মা-বাপের কাছে পাওয়া যা কিছু ভালো জিনিস, সুদসুদ্ধ সেগুলো তার নিজের ছেলেপিলেকে বুঝিয়ে দিয়ে তবেই তার পিতৃমাতৃঋণ শোধ হতে পারে।—বিপ্লবী বিধানের এই ভাব।
আর ভক্তি?—রাষ্ট্রপতিদের উপর ভক্তির চর্চা যেভাবে চলে চলুক, কিন্তু USSR-এর সমাজে আপনা-আপনির মধ্যে তার জায়গা কোথায়। যেখানে মাথা খাড়া রেখে নরনারী পরস্পরের চোখের দিকে সোজা চাইতে শিখেছে সেখানে সব দৃষ্টিই শুভদৃষ্টি, সেখানে কামভীতু লক্ষণদেওরের মতো ভাজের পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকা লাগে না; সাধ্বী -নাম-পিপাসী সহধর্মিণীকে পতির দেবত্ব তল্লাশে কপালে চোখ ওঠাতেও হয় না। বিপ্লবীসমাজে পুরুষকে পতি খাড়া করা হয়ই না, ছেলেকে মানুষ করে তোলাই মনে করে সাধু-সাধ্বী উভয়েরই ধর্ম।
বিপ্লবী ছেলেমেয়েরা মা-বাপের পায়ের ধুলো চায় না, চায় অনেক-সওয়া চিত্তের সরসতা, অনেক জানা মগজের সার, মা-বাপেও তাদিকে তাই দিতেই ভালোবাসেন। যখন জরা এসে তাঁদের পায়ে ধরে, তাঁরা তখন নবীনের হাতে হাল ছেড়ে দিয়ে দ্রষ্টার আসনে নেমে এসে শোভা পান। সে শোভা যে দেখে সে খুশি হয়, ভক্তির কোনো প্রসঙ্গই ওঠে না।
শেষ কথা, এ সমাজে প্রণয়ের অবস্থা কী রকম।—খুব সোজা! নারীর দিক থেকে দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যাবে
প্রকৃতির ঠেলায় নারী তো যথাকালে ছেলের বাপ পছন্দ করে নেবে। এ বিষয়ে কোনো বিধিনিষেধের হাঙ্গাম, বা ভরণপোষণের ভাবনার চাপ না থাকায়, তার লুকোচুরি রংঢং কিছুই করা লাগে না, পছন্দটা স্বেচ্ছায় স্বচ্ছন্দচিত্তে করতে পারে; তার জন্যে কারো সঙ্গে যেচে আলাপও করতে হয় না, কারণ কর্মসূত্রে সমবায়ী নরনারীদের নিয়মিত দেখাশুনো মেলামেশা চলতেই থাকে। শেষে যাকে নির্বাচন করে তার সঙ্গে শিষ্টালাপ করে, মিষ্টালাপ করে, বন্ধুত্ব করে, সোহাগ করে; কিন্তু তাকে স্বর্গের দেবতা মনে ক’রে, বা তার সঙ্গে জন্মজন্মান্তরের সম্বন্ধ কল্পনা ক’রে, নিজেকে ভোলায় না।
পরের পছন্দে বিয়ে করতে হলে যে সকল ভুলভ্রান্তি আকছার হয়ে থাকে, এক্ষেত্রে সেগুলো থেকে দম্পতি অনেকটা রেহাই পায়; তবে নিজের কাঁচা বয়সের বাছাইতেও মাঝে মাঝে গলতি থেকে যায়। তাতে ভয় কী। পর্বতপ্রমাণ ভুল হলেও স্বীকার করলে শুধরে নেওয়া যায়। যার বাইরের চিকনচাকন দেখে মনে ধরেছিল, ঘর করার বেলা যদি তার ভিতরের খড় বেরিয়ে পড়ে, তবে মুখ ভার না করে ভালো মনে আবার আলাদা হওয়াই তো ভালো। “প্রাণ যায়, তবু ধরেছি তো সেঁপ্টে থাকি।” এ ভীষণ পণে বাহাদুরি থাকতে পারে, সুমতির পরিচয় পাওয়া যায় না। বিশেষত ছেলেদিকে সামলে দেবার জন্যে যেখানে সমবায় রয়েছে।
নারীর দিক থেকে যা যা বলা গেল, নরের দিকে সবই খাটে। নির্বাচন তরুণ-তরুণী পরস্পরকে করে,—এক হাতে তো তালি বাজে না।
এ সম্পর্কে USSR-এর সমবায়-নেতার কথাটা এই:
“শোনো, ছেলেমেয়েরা! তোমরা কে কার সঙ্গ কর, বা ছাড়, সে বিষয়ে তোমরা স্বাধীন। কিন্তু খবরদার। ছেলে যদি জন্মায়, তার যেন স্বাস্থ্যের, শিক্ষার, আনন্দের ব্যাঘাত না হয়, সে বিষয়ে যদি ত্রুটি ধরা পড়ে, তবে পঞ্চায়েৎ ঘাড়ে ধরে তোমাদিগকে সায়েস্তা করবে।”[৬]
স্ত্রী-পুরুষের এ ভাবের মিলনে অনেকে আপত্তি করেন—“ভগবানকে তো সাক্ষী করা হয় না।” ভগবানকে সাক্ষী না ক’রে কেউ কোনো কাজ করতে পারে, আস্তিকের পক্ষে এ কল্পনাটা আমাদের একটু অদ্ভুত লাগে।
আঁদ্রে গীদ্ ব’লে একজন বিখ্যাত ফরাসী কবি এই শেষ যুদ্ধের আগে রুশ দেশে গিয়ে তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে শ্রমিকদের সম্বন্ধে মন্তব্য প্রকাশ করেছেন। লোকে বলে তিনি আগে যত USSR-এর পক্ষপাতী ছিলেন, এখন তা নন। লোকের কথায় কী হবে, তিনি নিজে যা বলেছেন চুম্বকে কিছু বলি শোনো। “কারখানায়, মাঠে, কাজের সময় হোক; আর, ছুটির সময় বাগানে বেড়াতে গিয়ে হোক; USSR-এর শ্রমিকের দলে যেখানে অন্তরঙ্গ ভাবে মিশেছি,—কবি ভাইদেরও শ্রমিকের দলেই ধরছি,—আমার মনে এক অভাবনীয় আনন্দের ঢেউ উঠেছে। তাদের মুক্ত জীবনের ছোঁয়া পেয়ে, আমার মধ্যেও কী যেন একটা বাধা সরে গেল, দরদের ফোয়ারা ছুটল, কখনো বা চোখে আনন্দের জল ঠেলে উঠল। তাই দেখতে পাবে আমার রুশে-তোলা ছবিতে এমন একটা দিলদরিয়া হাসি ফুটে আছে, দেশের ছবিতে যার লেশও নেই।
“আর ছেলেদের আড্ডায়,—হঠাৎ তাদের একটা চড়িভাতিতে গিয়ে পড়েছিলাম—কী আনন্দের জেল্লা তাদের মুখ আলো করে ছিল। সুস্থ পুষ্ট পরিচ্ছন্ন শরীর, তাদের বিশ্বাস-ভরা অসংকোচ চাউনি যেন নিজের আনন্দের ভেট আমায় দিতে এগিয়ে এল। তাদের ভাষা জানিনে, জানার দরকারও বোধ করিনি। তারা আমায় বন্ধু ব’লে চিনলে, তাতেই আমার মন কেড়ে নিলে, তার উপর কথায় বলার কী থাকতে পারে।
“তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও সেই সরল হাসি, সহজ আনন্দ। প্রমোদ উদ্যানে গিয়ে দেখি তারা নানা আমোদে মেতেছে, কিন্তু কী শ্লীলতা, কী সংযম। ইতরতা নেই, ছ্যাবলামি নেই; হাসিতে নিছক ফুর্তি, খোঁচার ভাব, বিদ্রূপের ভাব, কারো মনে কষ্ট হতে পারে এমন কোনো ভাবই নেই। খেলার আয়োজন, ব্যায়ামের আয়োজন, নাচের আয়োজন, এসর তো আছেই, তার উপরে জায়গায় জায়গায় ইতিহাস, ভূগোল, সাধারণ বিজ্ঞানের বিষয়ে বক্তৃতাও চলেছে; যারা শুনছে পুরো মন দিয়ে শুনছে, যারা অন্য আমোদ চায়, তারা অশিষ্টতা ক’রে রসভঙ্গ করছে না। সকলের জায়গা যেখানে নাও কুলোচ্ছে সেখানে ঠেলাঠেলি নেই, পালায় পালায় ঢোকার জন্যে প্রসন্ন মনে বাইরে অপেক্ষা করছে। তাই, লোকারণ্য হলেও হট্টগোল নেই। উৎসব থেকে যেন একটা প্রশান্ত আনন্দ উঠে আকাশ ভরে রেখেছে।”
একজন ফরাসী বন্ধু টিপ্পনি কেটেছিলেন—“এত অকাল-গাম্ভীর্য কি ভালো। ছেলেমেয়েদের মধ্যে ফচকেমি নেই, টিটকারি নেই, কথা-কাটাকাটি নেই,বয়স হলে এরা কি স্বাধীন বিচার করতে পারবে, না ধামাধরার দল তৈরি হবে।”
তার উত্তরে লেখক বলছেন,—“এদের অকাল বার্ধক্য নয় গো অকাল-যৌবন। যাদিকে তরুণ-তরুণী বলছি তারা যে-বয়সে যৌবনের ফুর্তি টেনে রেখেছে, তাতে আমাদের দেশে বুড়িয়ে বসে যেত।” বাস্তবিকই সত্যিকার গাম্ভীর্য যৌবনানন্দেরই জিনিস, জরার শিথিলতায় তাকে পাওয়া তো যায় না।
আমাদের আরো মন্তব্য এই—সমাজবৃদ্ধেরা সর্বদা আশঙ্কা করেন, নারীকে নেপথ্য গারদের বাইরে ছাড়া রাখলে, ইচ্ছেমতো চলতে ফিরতে দিলে, সমাজ লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে।—ইচ্ছেকে তাঁরা কত ভয় করেন “যাচ্ছে তাই” কথাটার দুর্দশা থেকেই মালুম দেয়। কিন্তু কই—USSR এ-তা তো হল না। হবেই বা কেন। ননী খাওয়ার মানা না থাকলে ছেলে তো ননীচোরা হয় না। আমরাও এককালে ছেলেমানুষ ছিলাম,—মনে পড়ে, বারণ না থাকলে দুষ্টুমিও বোদা লাগত।
যারা বন্ধুত্বের তাজা রস চাইলেই পায়, কামের পচা ভোগ তাদের রুচবে কেন। যারা দুশ্চিন্তামুক্ত, সারাদিন হিত কাজে রত, শয়তান হোক শনি হোক, তাদিকে বদবুদ্ধি দেবার ফাঁকই পায় না।
এ বর্গের শেষ প্রশ্ন এই—স্বাভাবিক বৃত্তি আশ মিটিয়ে খেলাবার সুবিধে পেয়ে, তাদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণ ঘুচে গেলে, তখন কি USSR-এর নরনারীর মধ্যে বিদেহী প্রেমের চলাফেরার পথ পরিষ্কার হবে;—যে প্রেম গাঢ় হয়ে এলে নারায়ণকে সুদ্ধ টেনে আনবে?
আমাদের বিবেচনায়, অবস্থা সব রকমে স্বাধীন রাখতে পারলে সে প্রেম লাভ হবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা,—তবে যদি ইতিমধ্যে বাইরের রাজশক্তির আক্রমণে অন্তরের শান্তি ভঙ্গ হয়ে বিপ্লবের তৈরি অনুকূল অবস্থাটাই ওলট-পালট হয়ে যায়,—সে কথা আলাদা।
ন হি কল্যাণকৃৎ দুর্গতিং গচ্ছতি
মোক্ষের বিষয়ে সাদা করে ভাবতে গেলে প্রথমেই কথা ওঠে—কোথা হতে কিসের মধ্যে মুক্তি।
যে ক্লান্ত-ক্লিষ্ট আত্মা ভবের পালায় ফাঁকি দিয়ে সরে পড়তে ব্যস্ত, সে হয়তো শূন্যের মধ্যেও আরামের না হোক, বিরামের কামনা করতে পারে; কিন্তু যে আনন্দ-মনে খেলছে, সে খেলার এক ধাপ থেকে পরের ধাপে এগোতে এগোতে খেলার শেষে—হারের নয়, জিতে যে শেষ, তাতে পৌঁছতে চায়।
খেলাটা তাহলে কী রকমের।
আনন্দলোকের আলো থেকে তো খেলুড়েরা নেমে এসেছে, ইহলোকের অন্ধকারে তো ডুব মেরেছে, আবার আলোর আনন্দে ফিরে যাওয়াটাই হল খেলার বাকি পালা। এক কথায় বলতে গেলে, আসার সময় ডুবুরির মতো এক ঝাঁপে তলানো, ফেরায় সময় নিয়ম বজায় রেখে, নানা ভয়-বিপত্তি কাটিয়ে, তবে ওঠা। অন্ধকারে তলিয়ে গিয়ে না উঠতে পারাটা ভয়ংকর হার, মনে করলে গা ছমছম করে; মাঝের আবছায়ায় পথ ভুলে ঘুরে বেড়ানো, সে-দুর্ভোগও হারেরই সামিল। সব বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে আনন্দে ফেরার শিহরণটাই জিত।
মানব-লীলার ভূমিকা (ইংরেজীতে যাকে বলা যায় play ground) সেটা কেমন।
রামধনুর মধ্যে ক’টি রং। এর উত্তর নানা রকমে দেওয়া যায়। চুল-চেরা বিচারক বলবে অসংখ্য—পাশাপাশি কোনো দুই রং ঠিক এক নয়; য়ুরোপের লোকে যে সময় উত্তর দেয়, তখনকার চলতি নামমতো সাত রং বলেছিল; মোটামুটি তিন রকমের রং-ও বলা যায়,—উপরের দিকে নীল জাতীয়, নিচের দিকে লাল-জাতীয়, মাঝে হারা-হারা। মানবাত্মার খেলাভূমি সম্বন্ধে তেমনি একভাবে দেখলে অসংখ্য লোক বলা যায়,—এই যে ইহলোক, এর মধ্যেই খেলুড়ে কখনো জড়ের টানে অন্ধকারে ঘুরে মরে, কখনো মেঘের একটি রং, গানের একটি সুর মনের একটি সুভাব, তাকে কোন্ উঁচু চুড়োয় তুলে নিয়ে উপরের আলো দেখিয়ে দেয়। শাস্ত্রে বলে সপ্তলোক। মোটামুটি তিনটি নিয়ে আমাদের কথা চলতে পারবে,—উপরে তেজোময় অমৃতময় আনন্দলোক, নিচে অন্ধ তমসাবৃত মৃত্যুলোক, মাঝে আলো-ছায়া মেশানো রং-বেরঙে মনোহর বৈচিত্র্যলোক।
আর যে খেলুড়ে, তারি বা চেহারা কী রকমের।
সে তো ব্যক্তির উর্দি পরে খেলায় নেমেছে। সে আবরণের ভিতরেও তার সত্তার তিন স্তর—নিচে জড়তার, যার দরুন সে এক পত্তন তলিয়েছে। উপরে আনন্দের তেজ, যার টানে সে আবার স্বস্থানে ফিরতে পারে; মাঝে বুদ্ধিবৃত্তির খেলা, যা তাকে তোলপাড় করে ঘুরিয়ে বেড়ায় ডুব দেবার সময় কিন্তু আদিস্থানের সঙ্গে তার যোগ ঠিক থাকা চাই, সেটা ছেড়ে গেলে আর ওঠার উপায় থাকে না, তলিয়ে হার হয়ে যায়।
একটা নকশার সাহায্যে আমাদের কথাটা আর একটু ফোটাবার চেষ্টা করা যাক।
ছেলেদের খেলার বেলুনের মতো খেলুড়েকে কল্পনা করা যাক। সে বেলুনের চামড়া ইলাস্টীক, যত গ্যাস পোরা যায় তত বাড়ে, বাড়লে হালকা হয়ে উপরে উঠতে চায়, গ্যাস কমে গেলে চুপসে মাটিতে পড়ে। বেলুনে শুধু গ্যাস থাকলে তো সে উড়েই যেত, তৈরির সময় কিছু বাজে আবর্জনা থেকে যায় বলে সে ধরায় থাকে। গ্যাসের আধারের সঙ্গে আমাদের এ বেলুনের নল দিয়ে যোগ রাখা আছে, গ্যাসের চাপ বাড়লে কানা যেখানে নলের সঙ্গে আঁটা আছে তার ফাঁক দিয়ে গ্যাস উথলে রেয়োয়। বেশি আঁটা থাকলে তা হয় না, কিন্তু তাহলে নতুন গ্যাস পোরাও যায় না। খেলুড়ে এ রকম সজীব বেলুনের মতো এইটুকু মনে রাখলেই আমাদের নকশার কাজ হবে।
এক পক্ষে খেলুড়ে নিজের বুদ্ধিবৃত্তি খেলিয়ে এমনভাবে বাড়তে পারে যে আনন্দলোকের সঙ্গে যে যোগধারা আছে তাতে শোষণের টান পড়ে। অপর পক্ষে আনন্দলোকে এমন ঢেউ উঠতে পারে—সৃষ্টির গোড়ায় একবার তরঙ্গ উঠেছিল, আর ওঠে না, এমন তো নয়—যার প্রেরণায় স্রোত খেলুড়ের ভিতর চলে আসতে পারে। যে উপায়েই হোক, খেলুড়ের ভিতরে আনন্দ বেড়ে গেলে সে বড়ো হয়, উপরে ওঠে। সেই সঙ্গে তার পাওয়া আনন্দধারার ভাগ আশেপাশে উথলে পড়ে।
এ অবস্থায় যে যে ঘটনাগুলি ঘটে, একটি একটি করে বুঝে দেখা যাক।
যে মানুষের উপরে ওঠার অবস্থা হয়েছে সে যদি বেলুনের মুখ কষে বাঁধার মতো নিজের অবস্থা করে, আশেপাশে খেলুড়ে থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে, তাহলে তার উপরে ওঠার বাধা না হলেও পথের আনন্দ থেকে সে বঞ্চিত থাকে। মনে পড়ে সেই ইংরেজকে যে পাহাড়ে-চড়ার গাড়িতে বসে, জানলার দিকে পিঠ ঘুরিয়ে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে পথের সময়টা কাটিয়ে, উপরে পৌঁছে একেবারে হোটেলানন্দে বিলীন হল।
শুধু বঞ্চিত হওয়া নয়, এতে ভয়ও আছে। পরমার্থকে একা উপভোগের বাসনা স্বার্থের মতোই দিশাহারা করে দিতে পারে। অবস্থার একটি তিব্বতী বর্ণনা আছে। সংঘত্যাগী সাধক অভীষ্ট লোকের সন্ধানে বেরিয়েছে। পুবদিকে জলাশয়ের চিহ্ন দেখে স্নানের ইচ্ছায় সেদিকে চলল; পথে উত্তরদিকে ধোঁয়া দেখে গৃহস্থের আতিথ্যের লোভে সেদিকে ফিরল; মাঝের জঙ্গলে বিভীষিকা দেখে ভয়ে দক্ষিণে দৌড়ল; পথিকের কাছে পশ্চিমদেশের গুণবর্ণনা শুনে অবশেষে পশ্চিমেই যাত্রা করল,—এই রকম লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় তার ভ্রমণ। আমাদের ধারণা এই, আধা-আলোর জায়গায় এসে খেলুড়ে যদি মনে করে কেল্লা মেরে দিয়েছি, তাতে তার আবেগ মিটে গিয়ে তেজও টানতে পারে না, আর উপরে উঠতেও পারে না, পাঁচরঙা লোকে ঘুরে বেড়াতেই থাকে,—যে অবস্থাকে হারের সামিল বলা হয়েছিল।
আনন্দটানার ক্ষমতা থাকায় যে উঠতে পারে, সে যদি আনন্দ বিলবার কারণে কনিষ্ঠ সাথীদের স্তরে থেকে যায়, তাহলে মাঝপথে আনন্দ আদান প্রদানের একটা উপরি খেলা চলে। এ রকম খেলুড়ের ভার বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বরের মতো, যিনি বলেছিলেন—“যতক্ষণ না সবাইকে সঙ্গে নিতে পারব, ততক্ষণ মোক্ষ পাবার অধিকারী হলেও আমি তা নেব না।”
ঘটনাক্রমে এ রকম জ্যেষ্ঠ যাত্রীর উদ্বৃত্ত আনন্দের সঙ্গে কনিষ্ঠের আনন্দধারার যদি যোগ হয়ে পড়ে, তাহলে গুরু-শিষ্য সম্বন্ধ দাঁড়ায়। শিক্ষার আসনে অনেকে বসেন, তাঁদের শিষ্যও জুটে থাকে, কিন্তু আনন্দ আদান-প্রদানের সম্বন্ধ না হলে গুরুকে সদ্গুরু বা শিষ্যকে সৎশিষ্য বলা যায় না।
সৎশিষ্যের আগ্রহ আনন্দধারায় দেয় টান, তার আনন্দের খোরাক যোগাতে হয় গুরুকে। ব্যায়ামের গুণে খিধে বাড়ার মতো, শিষ্যকে আনন্দ যোগাবার এই প্রয়োজনই গুরুর উপর-থেকে আনন্দশোষণে ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। আনন্দ দানই আনন্দ পাবার উপায়, আনন্দ পাওয়া আরো আনন্দ দানের উপায়, গুরুর লাভ হয়, এই চক্রবৃদ্ধি আনন্দধারা।
শিষ্যের দিক থেকে দেখলে, তার নিজের ক্ষমতায় যেটুকু সম্ভব হত, গুরুর কাছ থেকে তার চেয়ে প্রবল স্রোতে আনন্দ পাওয়ায়, শিষ্য বেড়ে ওঠে। শেষে ঐ চক্রবৃদ্ধিস্রোতে পুষ্ট হতে হতে শিষ্য গুরুর সমান পদবী পেয়ে যায়, তখন গুরুশিষ্য সম্বন্ধ ঘুচে গিয়ে আসে নিছক মিত্রতা, যার মধ্যে প্রেমের সবচেয়ে বিশুদ্ধ ভাব পাওয়া যায়।
গুরু যতক্ষণ উপর-থেকে তেজ টেনে শিষ্যকে যোগাচ্ছেন ততক্ষণ আনন্দলোকের যিনি অধিপতি, আর তাঁরই আনন্দ বিতরণের উপলক্ষ্য যে গুরু, আনন্দদাতা আর আনন্দবাহক, এ দুজনের মধ্যে ভেদজ্ঞান শিষ্যের উপস্থিতমতো লোপ পেতে চায়। আসলেও কোনো ভেদ থাকত না যদি সোজাসুজি পাওয়ার, আর গুরুর রঙে রঙিয়ে পাওয়ার প্রভেদটা না থেকে যেত। কলকাতার নলের জলে আর গঙ্গার জলে যেমন তফাত থাকত না, যদি মাঝে ফলতা জল-কলের পাঁচরকম কেরামতি না এসে পড়ত।
সমান পাত্রের মধ্যে আনন্দধারার যোগ-স্থাপন হলে দুজনের আনন্দ চালাচালি নানা রকমে হতে পারে,—একজনের বেশি দেওয়া, একজনের বেশি পাওয়া, চাকার মতো দেওয়া নেওয়ার ঘোরাফেরা; কিন্তু যতই রকমারি হোক, দুজনের মধ্যে প্রেমের আদানপ্রদান শুরু হলে, মূল উৎস থেকে দুজনেরই তেজ-টানা বেড়ে যায়, দুজনেরই আনন্দ বেশি বেশি উদ্বৃত্ত হয়, ফলে দুজনেই প্রেমের আলোয় দুনিয়া সুন্দর দেখে প্রেমর ভাগ জগৎকে বিলোয়। এর বিপরীত অবস্থা হলে সন্দেহ হয়, সত্যিকার প্রেম হয়েছে, না কোনো প্রয়োজন বা প্রবৃত্তি বা মোহের ঝোঁকে দুজনে কাছাকাছি এসেছে মাত্র।
প্রেম বিদেহী হলেও, দেহের নামরূপটা বাদ রাখা চলে না। শিষ্য বেচারী সদানন্দের খোঁজে বেরিয়ে চিদানন্দের কাছে গিয়ে পড়লে, তাঁর সঙ্গে তার বাঞ্ছিত সম্বন্ধ নাও ঘটতে পারে। তাছাড়া কণ্ঠস্বরের, মুখচোখের ভাবের, সাহায্য ছাড়া গুরুর মর্ম সব সময়ে হৃদয়ংগম নাও হতে পারে। আসল কথা, বোঝার সুবিধের জন্যে, স্থূল দেহ, সূক্ষ্মশরীর, প্রাণমন চিত্তবুদ্ধি, আত্মার এ সব ভাবকে আলাদা করে দেখি বটে, কিন্তু সবই তো একের ভিন্ন স্তরে প্রকাশ, কোথায় একটার শেষ অন্যটার আরম্ভ ধরাই যায় না। স্থূল দেহের মধ্যে মাদক ঢোকাও, সূক্ষ্ম বুদ্ধিবৃত্তি যাবে গুলিয়ে। ওদিকে আত্মার উন্নত অবস্থা শরীরের জেল্লায় প্রকাশ পায়। তবু বলতে হয়, প্রেমের খেলা আধ্যাত্মিক স্তরেই চলে।
নরনারী ভেদে বিদেহী প্রেমের কিছু রসভেদ হয় কি না, সেকথা মাঝে মাঝে ওঠে। নরনারীর দেহযন্ত্র নিয়ে অবশ্য একথা উঠতেই পারে না, তবে সূক্ষ্মস্তরেও নরনারী ভেদ স্বীকার করতে হয়। বীরাঙ্গনাকে বলা যায়, সে দেহে নারী, মনে পুরুষ। মহাপ্রভুর রাধাভাবে আরাধনা মানে তাঁর আধ্যাত্মিক নারীরূপ নেওয়া। খ্রীস্টান সাধকেও বলেন, যিশুকে জীবনের নিয়ন্তারূপে পেতে হলে আত্মাকে নারীপদবীতে তুলে তবে সমর্পণ করতে হয়। আমরা এইটুকু বুঝি, প্রেমিকের দেহের অবস্থা যাই হোক, যার আনন্দস্রোত বহির্মুখী তার পুরুষভাব, যে অন্তরে গ্রহণ করে তার নারীপ্রকৃতি। এই দেওয়া-নেওয়ার পৃথক রসকে কি নিগমানন্দ আর আগমানন্দ বললে দোষ হয়। যাই হোক, আলাদা নাম চলতি না থাকলেও রসভেদটা অনুভবে ধরা পড়ে।
একটি অবস্থার কথা বাকি। দৈবাৎ কখনো অনেকে মিলে পরস্পরের সঙ্গে আনন্দধারার যোগে বেঁধে পড়ে একটা প্রেমচক্র তৈরি হয়। একেই আদর্শ সংঘ বলা যায়। প্রত্যেকের বহির্মুখী ধারা অপরের অন্তরে প্রবেশ করায় এ রকম চক্রের অসীম শক্তি জন্মায়, যার সমবেত টানটা ঊর্ধ্বমুখী। ফলে, চক্রের প্রত্যেকে পথের আনন্দও যেমন পুরো আদায় করে, তাদের উপরে ওঠাও তেমনি জোরে এগোয়। এ রকম ঘটনা মনে করে দয়াল দাদু বলে থাকবেন—“জলের ফোঁটা একা চললে পথে শুখিয়ে যেতে পারে, অন্যের সঙ্গে মিলে ধারা বাঁধতে পারলে নদী হয়ে সমুদ্রে পৌঁছে যায়।” সব সাচ্চার মেকী থাকে, সংঘ বা চক্রে ও তাই। যার গরজ সে অনায়াসে প্রেমের লক্ষণ দেখে আসল চিনে নিতে পারবে।
প্রেমের লক্ষণ দিয়ে যাচাই করলে অনেক হেঁয়ালির উত্তর পাওয়া যায়, অনেক সমস্যার মীমাংসা হয়। দু একটা নমুনা দেখা যাক।
এ ভাবনা হওয়া স্বাভাবিক যে শিষ্য তো অজ্ঞান অবস্থায় গুরু খোঁজে, তখন সদ্গুরু চিনবে কী করে। প্রেমানন্দই পথ দেখায়। সেটা পেলে কে না বোঝে। তবে ভুল হওয়ারও কারণ আছে। গুরুবাদ সম্বন্ধে লৌকিক অলৌকিক এত রকম গল্পগুজব চলতি আছে, যারা কানপাতলা তাদের অবস্থা সেই বুড়ির মতো হতে পারে, যে ছেলের আলিফ-বে-তে ফারসী বর্ণমালা আওড়ানো শুনে ঠাকুরদেবতার নাম হচ্ছে মনে করে নয়নজলে বয়ান ভাসাল। অবশ্য মোহের নকল আনন্দ টেঁকসই হয় না, তাই শিষ্যের মেজাজ ক্রমশ রুক্ষ হচ্ছে বা নির্বিচারে মানুষকে মানুষ বলে ভালোবাসতে পারছে না, দেখলে, বোঝা যায় গুরুকরণে গলতি হয়েছে, পরশমণির ছোঁয়া পায়নি।
আমাদের ধারণা অনুসারে গুরুর দেওয়া মন্ত্র ক দিয়ে আরম্ভ কি হ দিয়ে আরম্ভ তাতে কিছু আসে যায় না, কোনো মন্ত্র না দিলেও লোকসান নেই; নিজে প্রেম টানতে পারলেই সদ্গুরু শিষ্যকে বাঞ্ছিত ধন দিতে পারবেন।
সাধনা তো রকম ব্রেকমের হয়ে থাকে. কিন্তু আনন্দ পাওয়া দেওয়ার যে প্রেমের অবস্থাকে সিদ্ধি বলা যায়, সে কি আর এক বৈ দুই হতে পারে। গীতার কথা ধরলে সে-সিদ্ধি যেন সাধনার উপর নির্ভরই করে না। যার যেমন ভাবনা তার সে পর্যন্ত সিদ্ধির দৌড়, আমরা তো এভাবে গীতার উপদেশ বুঝেছি। ভাবনা বলতে মাথা বকানোও নয়, কল্পনা খেলানোও নয়; এখানে “ভাবনা” মানে “হওয়া।” যে যত প্রেমিক হতে পেরেছে তার সিদ্ধি-লাভ ততটাই। বিনা প্রেমে গুরুর পক্ষে নন্দলালকে পাইয়ে দেবার চেষ্টা বৃথা। অপর পক্ষে প্রেম থাকলে সৎশিষ্য গুরুকে উপলক্ষ করে নিজের আবেগের জোরে নিজের কাজ হাসিল করতে পারে।
শ্রদ্ধায় যে প্রশ্ন তার মনে জন্মায়, উত্তর তার মধ্যেই নিহিত থাকে, গুরু-দর্শনের আনন্দে আপনিই প্রকাশ হয়ে পড়ে। এক রসিক বলেছিল শিষ্য গুরুকে বলে “মন-তোর-দে,” গুরু শিষ্যকে বলেন “মন-তোর-নে।” শিষ্য নিজেরই সাধনের ধন গুরুপ্রেমের আলোয় দেখতে পায়।
আর এক সমস্যা হচ্ছে, সব সদুপদেশই বলে লোকের হিতে রত থাকতে। মুশকিল এই তো নিজেরই হিতাহিত বুঝে ওঠা দায়, পরের হিত তো দূরের কথা। তাড়াতাড়ি হিত করতে গেলে রোগীর যে-দাঁতে ব্যথা নেই সেটা তুলে দেবার মতো বিপরীত না হয়। এখানেও পথ দেখায় প্রেম। যাকে আনন্দ দিতে পারা গেল, তার হিত করা হল সে বিষয়ে কি সন্দেহ থাকতে পারে। এই প্রথম ধাপে পা দিলে দ্বিতীয় ধাপ তখন আপনিই দেখা দেবে। আনন্দ দিলেই তো আনন্দ পাওয়া যায়। তার মানে কল্যাণ করতে গিয়ে কল্যাণ লাভ হয়। ঊর্ধ্বগতিই কল্যাণের লক্ষণ, তাই এ বর্গের মাথায় গীতার কথা তুলে দেওয়া হয়েছে—কল্যাণকারীর দুর্গতি হতে পারে না।
খেলায় জিতের চেহারাটা কী, এখন কতক বেরিয়ে পড়েছে। পরস্পরের সঙ্গে প্রেমের যোগের আনন্দে ভরপুর হয়ে, বড়ো হতে হতে যখন ব্যক্তিত্বের আবরণ স্বচ্ছ সূক্ষ্ম হয়ে যাবে, তার ভিতরকার আবর্জনার জড়তা খসে যাবে, তখন আনন্দলোকে উঠে যাবার আর বাধা থাকবে না, সেখানকার আলো ভিতরে বাইরে সমান প্রকাশ পাবে; তখনকার আবরণ সে বিঘ্ন নয়,—“আমার এই স্বস্থান, এতে ফিরে এসে আনন্দের প্রেম-রূপ লাভ করলাম”—এই চৈতন্য সজাগ রাখার জন্যে যেটুকু ব্যবধান নইলে নয়, তাই খেলার শেষ পর্যন্ত থাকবে।
USSR-এর মোক্ষলাভ সম্বন্ধে অবস্থা আমাদের বিচারের বিষয় ছিল। তাঁদের নিজেদের মধ্যে সদ্ভাবের পরিচয় তো পাওয়া গেছে; সংঘের ঠাটটাও তাঁরা বেশ গড়ে তুলেছেন। তার মধ্যে বিদেহী প্রেমের সুর উঠেছে কিনা, সে খবর কে দিতে পারে।
যে সব পাশ্চাত্ত্য পর্যটকেরা রুশে যাতায়াত ক’রে ঝুড়িঝুড়ি মন্তব্য ছড়িয়ে বেড়ায়, তারা তো সব ধনলোভী, প্রেমের লক্ষণ তারা কী জানে। তারাই তো প্রণয়কে নিজের যথাস্থান থেকে তুলে দিয়ে, নভেলে নাটকে সিনেমায় তাকে মানবজীবনের একমাত্র সম্বল বলে ঢাক-পেটানোর চোটে পৃথিবীময় নরনারীর সহজ সুন্দর সম্বন্ধটা মাটি করবার যোগাড় করে এনেছে। বিদেহী প্রেমের খেলা দেখলেও তাদের পক্ষে চেনা সম্ভব হয় না; মনের মধ্যে আভাস পেলেও প্রকাশের ভাষা জোটে না।
এক যদি এ দেশ থেকে প্রেমধন নিয়ে কোনো সাধক রুশে যান, USSR-এর সমবায়ীদের সঙ্গে সম্বন্ধ পাতান, তিনি তাঁদের মুক্তির রাস্তায় প্রগতির কথা বলতে পারবেন। সেখানে সমাজের যে ভূমিকা গড়ে উঠেছে, তাতে না করে সহকর্মী নারীকে “কামিনী” জ্ঞান, না করে কাঞ্চনে নিজের জন্যে লোভ,—এমন স্থান সাধক পছন্দ তীর্থ না হবে কেন।
আমাদের কথা তো ফুরল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বিপদও ঘনিয়ে এল। যুগল-মিলন না ঘটিয়ে কথা শেষ করলে নেহাতই বেদস্তুর হবে, কথককে শ্রোতারা দুয়ো দেবে। অথচ যতবার ধুয়োয় এসে খোঁজ নেওয়া গেছে,—নারায়ণ বলেন লক্ষ্মীর প্রতিষ্ঠা না হলে তিনি ধরা দেবেন না; লক্ষ্মী বলেন যেখানে নারায়ণের দর্শন নেই সেখানে তিনি স্থির হয়ে থাকতে পারেন না।
এখন উপায়?
কবিরা বিপদ গনলে বাণীকে ডাক দেন; আমরাও তবে ভারতীর শরণাপন্ন হই; তিনি আমাদের ভোঁতা বুদ্ধিবৃত্তিতে ধার দিয়ে, যে সব গাঁঠ পড়ে আমাদের সত্তা টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, সেগুলো কেটে ফেলে আস্ত মানুষ হয়ে ওঠবার উপায় করে দিন। তিনি ছাড়া আর কে বুঝিয়ে দিতে পারবে যে, নরনারী লক্ষ্মীনারায়ণ সবই একমেবাদ্বিতীয়ম্।
- ↑ শ্রোতাকে সাবধান করে দিতে হয়; সংস্কৃতশাস্ত্র মন্থন করলে এ নামের মন্ত্র মিলবে না।
- ↑ মাটির তলার সুরঙ্গের মধ্যে অসংখ্য গুহা ছিল, যেখানে তাপসেরা কালক্ষেপ করত; তাকে জীবনযাপন বলা যায় কি না সন্দেহ।
- ↑ সন্তদের আবির্ভাব তিরোভাবের পর্বদিন খ্রীস্টান পাঁজিতে লাল অক্ষরে লেখা।
- ↑ নিজের বা পরিবারবর্গের দরকারী জিনিস ভাঁড়ারে জমা রাখতে মানা নেই।
- ↑ পালোয়ানকে দিয়ে কলার চর্চা, কিম্বা ভাবুককে দিয়ে লাঙল চালানো, কাজের এমন অদ্ভুত বাঁটোয়ারা হবে না, বলাই বাহুল্য
- ↑ মাবাপের ছাড়াছাড়ি হলে পঞ্চায়তে ঠিক ক’রে দেয় কোন্ পক্ষ ছেলেকে কাছে রাখবে, কোন্ পক্ষকে খরচের কত ভাগ দিতে হবে।