বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্বের উপাদান/ইলেক্‌ট্রন ও প্রোটন

উইকিসংকলন থেকে

ইলেক্‌ট্রন ও প্রোটন

 ১৮৫৩ সালে প্যারিস শহরে ম্যাসন নামে এক ব্যক্তি ব্যারোমিটারে পারদের উপরে যে শূন্যস্থান থাকে তাহার মধ্যে একটি শক্তিশালী আবেশকুণ্ডলী (induction coil) হইতে বৈদ্যুতিক ক্ষরণ (discharge) পাঠাইলেন। স্থানটি অভূতপূর্ব-সুন্দর আলোকে রঞ্জিত হইল। ১৮৫৯ সালে প্লকরও এইরূপ পরীক্ষা করিলেন। তাঁহাদের দেখাদেখি অনেকে নানা রকমের কাচের নল প্রস্তুত করিলেন, সেগুলির মধ্য হইতে বায়ু নিষ্কাষণ করিলেন, কেহ কেহ তন্মধ্যে খুব অল্প পরিমাণে নাইট্রোজেন হাইড্রোজেন অক্সিজেন প্রভৃতি গ্যাস ছাড়িয়া দিলেন; এইবার নলের মধ্যে রূম্‌কর্ফ্‌-কুণ্ডলী হইতে তড়িৎ-ক্ষরণ পাঠানো হইতে লাগিল; অদৃষ্টপূর্ব বিভিন্ন রঙের সুদৃশ্য আলোকরাশি নলগুলিকে ভরাইয়া দিন। বিভিন্নরকম নলে বিভিন্ন প্রকারের আলোক সম্পাতের সৃষ্টি করিয়া সর্বাপেক্ষা কৃতিত্ব দেখাইলেন জাইস্‌লার; আজও ঐ-সকল নল ‘জাইস্‌লারের নল’ নামে পরিচিত। এই-সকল পরীক্ষা নূতন সন্দেহ নাই এবং চমকপ্রদও বটে, কিন্তু ইহার মূলে যে কোনও সিদ্ধান্ত নিহিত আছে তাহা কেহ জানিল না। জানিল না, কিন্তু বর্তমান কালে পদার্থবিদ্যার যে নৃতন যুগ আসিয়াছে এই সব পরীক্ষাতেই তাহার সূচনা হইল।

 এক পরীক্ষা আর-এক পরীক্ষার পথ খুলিয়া দেয়। এইবার কাচের পাত্রের মধ্যে দুইদিকে দুইখানি ধাতব চাকতি প্রবেশ করাইয়া ধীরে ধীরে পাত্র হইতে বাতাস বাহির করিয়া লওয়া হইতে লাগিল এবং চাকতি দুইটি রূমকর্ফ-কুণ্ডলীর সহিত যোগ করিয়া দেওয়া হইল। তড়িৎ-ক্ষরণ হইতে লাগিল, এদিকে বাতপম্প (air pump) চলিতে লাগিল। কিছু পরে দেখা গেল, একটি সরু রক্তাভ আলোকরেখা কড়্‌কড়্‌ শব্দ করিতে করিতে এক চাকতি হইতে আর-এক চাকতি অবধি প্রবাহিত হইতেছে। বায়ু-বহিষ্করণ চলিতে লাগিল। আলোকরেখাটি এখন আর নিরবচ্ছিন্ন নহে, টুকরা টুকরা হইয়াছে; দুইদিকে দুইটি স্থান আলোকশূন্য। বায়ু আরও বাহির হইতে লাগিল; নলের মধ্যে এখন আর আলোক নাই, তবে কাচের পাত্রের উপর সবুজবর্ণের আলোক ছড়াইয়া পড়িয়াছে। এইসব দেখা গেল। দেখা তো গেল, কিন্তু এ সবের মূল কারণ কি?

 ক্রুক্‌স্ এ সম্বন্ধে আলোচনা আরম্ভ করিলেন। তিনি চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, ব্যাপারটি আলোকের ন্যায় কোনোরূপ ঈথর-তরঙ্গ দ্বারা ঘটিতেছে বা পদার্থের কণিকা এইরূপ ঘটাইতেছে। দুইশত বর্ষ পূর্বে হাইগেন্‌স্‌ ও নিউটনের নিকট অনুরূপ সমস্যা দেখা দিয়াছিল। কল্পনা ছাড়িয়া পরীক্ষা দ্বারা ক্রুক্‌স্‌ সত্য নিরূপণে অগ্রসর হইলেন। ক্রুক্‌স ভাবিলেন যে, যদি উহারা কণিকা হয় তবে ভীমবেগে ধাবিত হইয়া উহারা যদি কোনও পদার্থের উপর পড়ে তাহা হইলে সেই পদার্থকে গতিমান্ করিতে পারে। ইহারা কি সেইরূপ পারে? ক্রুক্‌স্‌ কাচের গোলকের মধ্যে সরু লাইন পাতিলেন এবং তাহার উপর পাখনাযুক্ত একটি চাকা বসাইলেন। গোলক হইতে বায়ু বহিষ্কৃত হইতে লাগিল; এদিকে বিদ্যুৎ-মোক্ষণ আরম্ভ হইল; দেখা গেল, ঢাকা ধীরে ধীরে ঘুরিতে ঘুরিতে চলিল এবং নেগেটিভ (ক্যাথোড) হইতে অপরদিকে গিয়া পৌছিল। আলোক ঈথরতরঙ্গ, তাপও ঈথরতরঙ্গে বিকিরিত হয়, কিন্তু উহারা তো ঐরূপ ভাবে চাকা ঘুরাইতে পারে না। ইহারা তবে কি? ক্রুক্‌স্ ইহাও লক্ষ্য করিলেন যে, চুম্বক দ্বারা ইহাদের গতিপথ বাঁকিয়া যায়। ক্রুক্‌স্ বলিলেন যে, কঠিন তরল ও গ্যাসীয় অবস্থা ব্যতীত পদার্থের একটি চতুর্থ অবস্থা আছে; গোলকমধ্যে এই অবস্থার পদার্থ উদ্ভূত হইতেছে এবং উহাই পাত্রের কাচের গায়ে আঘাত করিয়া উহাতে সবুজ রঙের প্রতিপ্রভার (fluorescence) সৃষ্টি করিতেছে। পদার্থের চতুর্থ অবস্থার কথাটা লোকের কাছে সেরূপ স্পষ্ট হইল না কিন্তুএটা অনেকে মানিল যে, একটা নূতন কিছুর উদ্ভব হইয়াছে এবং তাহাই কাচের উপর ঐ ব্যাপার ঘটাইতেছে। কাচের মধ্যস্থিত নেগেটিভ বা ক্যাথোড হইতে উদ্ভূত বলিয়া সমসাময়িক অনেক পদার্থবিৎ এই নবাবিস্তৃত পদার্থের নাম দিলেন ক্যাথোড রশ্মি, আর এ নাম এখনও চলিত আছে।

 ক্যাথোড-রশ্মি লইয়া পরীক্ষা করিতে করিতে লেনার্ড দেখিলেন যে, পাত্রের অপর দিকটা কাচের না হইয়া যদি পাতলা অ্যালুমিনিয়মের হয় তবে ক্যাথোড-রশ্মি অ্যালুমিনিয়ম ভেদ করিয়া তাহাদের কারাগৃহের বাহিরে আসিয়া উপস্থিত হয়। তিনি কিন্তু তখনও ঐগুলিকে ঈথরতরঙ্গ বলিয়া মনে করিতেন। কেম্‌ব্রিজে জে. জে. টম্‌সন এ সম্বন্ধে অনেক পরীক্ষা করিলেন; তাঁহার পরীক্ষা হইতে নিঃসন্দিগ্ধরূপে কয়েকটি তথ্য প্রমাণিত হইল। ইহারা কণিকা; ইহাদের ওজন আছে; প্রত্যেকের ওজন সর্বাপেক্ষা লঘু যে হাইড্রোজেন-পরমাণু সেই হাইড্রোজেন-পরমাণুর একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র; প্রত্যেকটি নেগেটিভ তড়িৎ-মণ্ডিত; ভীমবেগে ইহারা ক্যাথোড হইতে বাহির হইয়া আসিতেছে; চুম্বকের দ্বারা তড়িতের দ্বারা ইহাদের গতিপথ বাঁকিয়া যায়; বিভিন্ন পদার্থের ক্যাথোড হইতে ইহাদিগকে বাহির করা যায়; কিন্তু সর্বাপেক্ষা আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, যে-সকল পদার্থ হইতে ইহারা বাহির হইতেছে তাহারা বিভিন্ন হইলেও এই কণিকাগুলি হুবহু এক। জে. জে. টম্‌সনের পরীক্ষার মূল কথাগুলি ছিল এই। একটি কণিকার চলার পথের নিকটে একটি চুম্বক ধরিলে কণিকার গতিপথ কতটা বাঁকিয়া যাইবে তাহা নির্ভর করিবে চুম্বকের শক্তির উপর, কণিকার ওজনের উপর, উহাতে যে তড়িত আছে তাহার পরিমাণের উপর, উহা কি বেগে ছুটিতেছে তাহারও উপর। চুম্বকের পরিবর্তে তড়িৎ আনিলেও উহা বাঁকিয়া যায়, তবে পূর্বকার লম্ব দিকে বাঁকে এবং তাহাও আগেকার বিভিন্ন ব্যাপারের উপর বিভিন্ন রকমে নির্ভর করে। জে. জে. টম্‌সন আঁক কষিয়া এইসব হিসাব করিলেন, কণিকাগুলি কি পরিমাণে বাঁকে পরীক্ষায় নিরূপণ করিলেন; প্রতি কণিকার তড়িৎ-পরিমাণ ও ভর এই দুইয়ের ভাগফল বাহির হইল। জে. জে. টম্‌সন দেখিলেন যে, যে-পদার্থ হইতে কণিকা বাহির হোক না কেন, ঐ ভাগফল (e/m) একেবারে সমান এবং উহার পরিমাণ হইল প্রায় ১,৮০০০০০০। জলকে তড়িৎ দ্বারা বিশ্লেষণ করিয়া যখন হাইড্রোজেন পাওয়া যায় তখন দেখা যায় যে, হাইড্রোজেন-পরমাণুগুলি তড়িৎ-মণ্ডিত এবং প্রত্যেক হাইড্রোজেনপরমাণুর পক্ষে ঐ ভাগফল দাড়ায় ১০০০০; জে. জে. টম্‌সনের পরীক্ষায় একটি কণিকার ঐ ভাগফল দাঁড়াইল ইহার প্রায় দুই হাজার গুণ। ধরা যাইতে পারে যে, একটি অ্যাটম ও একটি কণিকা, উভয়ের তড়িতের পরিমাণ সমান; তাহা হইলে এই দাঁড়ায় যে, একটি কণিকার ওজন একটি হাইড্রোজেন-পরমাণুর ওজনের প্রায় দুই হাজার ভাগের একভাগ মাত্র। বিজ্ঞানী তো এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তে উপনীত হইলেন। এতদিন তাঁহার জানা ছিল যে, পৃথিবীতে একটি হাইড্রোজেন-পরমাণু সর্বাপেক্ষা ক্ষুদ্র, ইহার অপেক্ষা ক্ষুদ্র আর-কিছু থাকিতে পারে না। কিন্তু পরীক্ষায় বাহির হইয়া আসিল এমন-কিছু যাহা একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর প্রায় দুই হাজার ভাগের একভাগ, যাহা সকল পরমাণু ভাঙিয়া পাওয়া যায় এবং যে পরমাণু হইতে পাওয়া যাক না কেন যাহারা হুবহু সমান। তবে তো পরমাণুকে আর অবিভাজ্য বলা চলে না। এই সময়কার একটি কৌতুককর গল্প আছে। সুবিখ্যাত বিজ্ঞানী লর্ড কেল্‌ভিনের এক ছাত্র কেল্‌ভিনকে জিজ্ঞাসা করেন, “আপনি কি শুনিয়াছেন অ্যাটমকে ভাঙা হইয়াছে?” কেল্‌ভিন উত্তর করিলেন, “অ্যাটমকে ভাঙা? অসম্ভব! গ্রীক ভাষায় অ্যাটম মানে হইল যাহা ভাঙা যায় না।” উদ্ধত ছাত্র বলিয়া ফেলিল, “গ্রীক জানার বিপদ ঐ।”

 খ্রীস্টজন্মের ছয়শত বর্ষ পূর্বে মিলিটাসের থেল্‌স্‌ অ্যাম্বার (amber) ঘষিয়া একটি নূতন শক্তির উদ্ভব লক্ষ্য করেন। বহুযুগ পরে রানী এলিজাবেথের সময় ডক্টর গিলবার্ট গ্রীকভাষায় অ্যাম্বারের প্রতিশব্দ হিসাবে ঐ শক্তির নাম দিয়াছিলেন ‘ইলেক্‌ট্রিসিটি’। এখন এই কণিকা যখন আবিষ্কৃত হইল তখন উক্টর জনস্টন স্টোনি উহার নাম দিলেন ‘ইলেক্‌ট্রন’। ১৮৯৭ সালে ২৯শে এপ্রিল জে. জে. টম্‌সন তাঁহার এই নূতন আবিষ্ক্রিয়া সম্বন্ধে প্রথম বক্তৃতা করেন। গল্প আছে, বক্তৃতা শেষে একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী তাঁহার এক অবিজ্ঞানী বন্ধুকে সম্বোধন করিয়া বলেন, “ভায়া হে, তুমি যদি বিজ্ঞান কিছু না জান তবে তোমার অবস্থা আমার অপেক্ষা ভাল; কারণ আমার পক্ষে প্রথম দফার যাহা জানি তাহা ভুলিতে হইবে, তাহার পর আবার নূতন করিয়া পাঠ লইতে হইবে।”

 ইলেক্‌ট্রন আবিষ্কারের পর তড়িৎ সম্বন্ধে অনেক কথা নূতন ছাঁচে প্রকাশ করিবার প্রয়োজন হইল। একটা উদাহরণ দেওয়া যাইতেছে। একটি দণ্ড ঘষা হইল, উহাতে পজিটিভ তড়িৎ উৎপন্ন হইল এবং যাহা দিয়া ঘষা গেল তাহাতে নেগেটিভ তড়িৎ হইল। এ ব্যাপারটি এখন এই ভাবে দেখা হইল। দণ্ডটি ঘষিলে উহা হইতে ইলেকট্রন বাহির হইয়া যাহা দিয়া ঘষা হইলে তাহার গায়ে গিয়া পড়িল। ইলেকট্রনরা নেগেটিভ তড়িৎযুক্ত হওয়ায় যাহার গায়ে গিয়া উহারা জমা হইল তাহা হইল নেগেটিভ তড়িং-যুক্ত, এবং যে দণ্ড হইতে উহারা চলিয়া গেল তাহা পূর্বে তড়িৎ-শূন্য থাকায় এবং নেগেটিভ তড়িৎ-যুক্ত ইলেকট্রন চলিয়া যাওয়ার উহা পজিটিভ তড়িৎ-যুক্ত হইল।

 জে. জে. টম্‌সনের পরীক্ষায় একটি ইলেক্‌ট্রনের তড়িতের পরিমাণ এবং উহার ওজন, এই দুইয়ের ভাগফল (e/m) বাহির হইয়াছিল। মিলিক্যান এক উপায় উদ্ভাবন করিলেন যদ্দ্বারা একটি ইলেক্‌ট্রনের তড়িতের পরিমাণ সঠিকভাবে মাপা যায়। পরমাণু হইতে ইলেক্‌ট্রন বাহির করিবার কি উপায় আছে? গোলকমধ্যে তড়িৎস্ফুরণ দ্বারা ইহা হইতে পারে; কিন্তু দেখা গেল, নিকটে একস্-রশ্মি, রেডিয়ম বা তজ্জাতীয় দ্রব্য আনিলেও পদার্থ হইতে ইলেক্‌ট্রন নির্গত হইতে থাকে। মিলিক্যানের একটি পরবর্তী পরীক্ষা এইরূপ: তিনি একটি বদ্ধ কাচের পাত্রমধ্যে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তৈলকণা উৎপাদন করিলেন। নিকটে একটি অণুবীক্ষণ রাখিয়া তাহার মধ্য দিয়া একটি কণিকাকে নিরীক্ষণ করা হইতে লাগিল; ধীরে ধীরে উহা নামিতে থাকিল। গোলকমধ্যে উপরের দিকে একটি ধাতব পাত্র ছিল; এখন উহাকে এইরূপ শক্তির তড়িৎ দেওয়া হইল যাহাতে কণিকাটি আর নামে না, ধীর-স্থির হইয়া দাড়াইয়া থাকে। এইবার পাত্রের বাহিরে এক্‌স্‌-রশ্মি-সম্পাতে ভিতরে ইলেক্‌ট্রনের সৃষ্টি হইল। যেই একটি ইলেক্‌ট্রন ঐ তৈলকণার গায়ে আসিয়া তাহার নেগেটিভ তড়িৎ দিয়া দিল অমনি তৈলকণাটি আর স্থির থাকিল না, নড়িতে লাগিল; কিন্তু তৎক্ষণাৎ উপরের ধাতব পাত্রে তড়িতের পরিমাণ পরিবর্তন করা হইল যাহাতে তৈলকণাটির নড়াচড়া বন্ধ হয়, উহা আবার স্থির হইয়া দাঁড়ায়। এজন্য ধাতব পদার্থে কতটা পরিমাণ তড়িতের পরিবর্তন করিতে হইল লক্ষ্য করিয়া ইলেক্‌ট্রনে নিবদ্ধ তড়িতের পরিমাণ মাপা হইল। পূর্বে জে. জে. টম্‌সনের পরীক্ষা হইতে ইলেক্‌ট্রনে তড়িতের পরিমাণ ও উহার ভর এই দুইয়ের ভাগফল বাহির হইয়াছিল; মিলিক্যানের পরীক্ষায় তড়িতের পরিমাণ নির্দিষ্ট হইল; সুতরাং একটি ইলেক্‌ট্রনের ভর সঠিকভাবে বাহির হইয়া গেল। জে. জে. টম্‌সন ও মিলিক্যানের পরীক্ষার কৌশল উন্নতি লাভ করিল, অন্য উপায়েও ঐসব সংখ্যা নির্ধারিত হইল; শেষ অবধি বিজ্ঞানী সঠিকভাবে জানিল যে, একটি ইলেক্‌ট্রনের ওজন একটি হাইড্রোজেন-পরমাণুর ওজনের ১৮৪৬ ভাগের একভাগ মাত্র। আরও দাঁড়াইল, একটি ইলেক্‌ট্রনে যে পরিমাণ তড়িৎ আছে তদপেক্ষা স্বল্প পরিমাণের তড়িৎ কোথাও থাকিতে পারে না এবং যেখানে যেরূপ ভাবে তড়িৎ উৎপাদিত হোক সর্বত্র তাহা এই মাত্রা তড়িতের গুণিতক। জে. জে. টম্‌সনের পরীক্ষা হইতে গোলকমধ্যে ইলেক্‌ট্রনের বেগ বাহির হইল। কি প্রচণ্ড এই বেগ! সেকেণ্ডে বহু হাজার মাইল হিসাবে। গোলকে বায়ুর অভাব যত হয় এবং তড়িং-বিভব (potential) যত বেশী হয় এই বেগ তত বাড়ে। আলোকের বেগ সেকেণ্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। কাচের গোলকের মধ্যে ইলেক্‌ট্রনের বেগ প্রায় তাহার দশ ভাগের একভাগ অবধি গিয়া দাড়াইল।

 এখন কথা হইল যে, একটি পরমাণু যখন তড়িৎ-শূন্য এবং পরমাণুর মধ্যে বাস করে ইলেক্‌ট্রন যাহা নেগেটিভ তড়িৎ-যুক্ত তখন পরমাণুর অপর একটি অংশ থাকা চাই যাহা পজিটিভ-তড়িৎ-মণ্ডিত। অবশ্য এ অংশ আছে এবং প্রতি পরমাণুতেই আছে। প্রতি পরমাণু পজিটিভ ও নেগেটিভ তড়িতের সমষ্টিমাত্র। এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যাইতেছে। প্রথম বার্ষিক শ্রেণীতে স্থিরবিদ্যুৎ পড়ানো হইতেছিল। একটি ছাত্রকে কাচের পায়াযুক্ত টুলের উপর দাঁড় করাইয়া তড়িৎ-উৎপাদক যন্ত্র হইতে তাহার দেহে তড়িৎ সঞ্চারিত হইতে লাগিল। কয়েকরকম পরীক্ষার পর ছাত্রটিকে নামিয়া যাইতে বলা হইল। ছাত্রটি যাইবার সময় জিজ্ঞাসা করিল তাহার দেহে তখনও তড়িৎ আছে কি না? তখন তাহাকে এ কথা বলা চলিল না যে, তাহার দেহটি সকল সময়েই পজিটিভ ও নেগেটিভ তড়িতের সমষ্টিমাত্র। আর শুধু তাহার দেহ নয়— তাহার, তাহার সহপাঠিগণের, তাহার শিক্ষকের, সকলের দেহ—সেই ঘরের টেবিল বেঞ্চ ইট কাঠ, বাহিরের গাছপালা, দূরের অট্টালিকা, যাহা কিছু সে দেখিতেছে, জগতের সকল পদার্থের মধ্যে আছে পজিটিভ ও নেগেটিভ তড়িৎ। একথা তখন তাহাকে বলিতে যাইলে সে মনে করিত, পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাসে শিক্ষকমহাশয় বোধ হয় কোনও দার্শনিক তত্ত্বের আলোচনা করিতেছেন।

 এখন, পরমাণুর মধ্যে পজিটিভ তড়িৎ কোথায় কি ভাবে বিদ্যমান? জে. জে. টম্‌সন কল্পনা করিলেন যে, পরমাণুর সমস্ত অবয়ব ব্যাপিয়া পর্জিটিভ তড়িৎ আছে এবং তাহার মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ইলেক্‌ট্রনগুলি বিদ্যমান, ঠিক যেমন কেকের মধ্যে কিশমিশ অবস্থিত। জে জে টম্‌সনের এ কল্পনা কিন্তু শীঘ্রই পরিত্যক্ত হইল। পরিত্যক্ত তো হইল, কিন্তু দাঁড়াইল কি? সে আলোচনার পূর্বে অন্যান্য কয়েকটি বিষয় স্মরণ করিতে হইবে।

 ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে পদার্থ বিদ্যার ইতিহাসে এক নবযুগ আরম্ভ হয়। সেইসময় ইলেক্‌ট্রনের পরিচয় মিলিল, সেইসময় রঞ্জনরশ্মি আবিষ্কৃত হইল, সেইসময় বিনা তারে বার্তা প্রেরিত হইল, সেইসময় নবাবিষ্কৃত রেডিয়মের গুণাবলি বিজ্ঞানীর বহুদিন-পোষিত চিস্তার ধারাকে আলোড়িত করিল।

 রঞ্জনরশ্মি সম্বন্ধে বিভিন্ন পরীক্ষা হইতে প্রমাণিত হইল যে, রঞ্জন-রশ্মির প্রকৃতি আলোকরশ্মির অনুরূপ, উভয়েই ঈথর-তরঙ্গ, তবে রঞ্জনরশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য আলোকের তরঙ্গদৈর্ঘ্য অপেক্ষা অনেক ছোট। দৃশ্যমান আলোকের তরঙ্গদৈর্ঘ্য সব সমান নয়; লাল আলোকের একরকম, পীত আলোকের আর-একরম, বেগুনি আলোকের ভিন্নরকম। রঞ্জনরশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য কি সমান? মোস্‌লে এ সম্বন্ধে পরীক্ষা আরম্ভ করিলেন। বাল্‌বের মধ্যে যে ধাতব পদার্থের উপর ইলেক্‌ট্রন আঘাত করিয়া রঞ্জনরশ্মি—এক্‌স্‌-রশ্মি—উৎপাদন করে, মোস্‌লে এক এক করিয়া তাহা পরিবর্তন করিতে লাগিলেন। প্রতিবারে যে এক্‌স্‌-রশ্মি বাহির হইল তাহার দৈর্ঘ্য মাপিলেন। পরীক্ষার ফলাফল হইতে মোস্‌লে যে-সিদ্ধান্তে উপনীত হইলেন তাহা বিজ্ঞানীর চিন্তাধারাকে এক নূতন রূপ দিল। এই তরুণ বিজ্ঞানী ১৯১৪ সালের ইয়ুরোপীয় মহাসমরে তাঁহার দেশের পক্ষ হইতে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরিত হন এবং ডার্ডেনেলিসে শত্রুর গুলির আঘাতে মৃত্যুমুখে পতিত হন। কিন্তু পঁচিশ বৎসর বয়সে তিনি যে উচ্চধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেন তাহা তাঁহাকে অমরত্ব দান করিয়াছে।

 মোস্‌লের গবেষণার মূল কথাগুলি এই মৌলিক পদার্থগুলিকে আণবিক ওজন অনুসারে সাজানো হইল। অক্সিজেনের আণবিক ওজন ১৬, এই অনুপাতে হাইড্রোজনের আণবিক ওজন ১.০০৮, হিলিয়মের ও লিথিয়মের ৬.৯৪, বেরিলিয়মের ৯.১, এইরকম বরাবর গিয়া ইয়ুরেনিয়মের আণবিক ওজন ২৩৮.২। দেখা যাইতেছে যে, পর পর মৌলিক পদার্থগুলির মধ্যে আণবিক ওজনের ব্যবধানের কোনও স্থিরতা নাই; ব্যবধান কোথাও কোথাও একেরও কম, কোথাও চারেরও বেশী। মোস্‌লে মৌলিক পদার্থগুলিকে আণবিক ওজন অনুসারে সাজাইলেন, সাজাইয়া তাহাদিগকে ক্রমিক সংখ্যা দিলেন। হাইড্রোজেনের সংখ্যা হইল ১, হিলিয়ম ২, লিথিয়ম ৩, বেরিলিয়ম ৪, বরাবর যাইয়া সোনার সংখ্যা দাড়াইল ৭৯, পারদ ৮০, অনাবিষ্কৃতদের জন্য স্থান ছাড়িয়া রাখিয়া ইয়ুরেনিয়মের সংখ্যা পড়িল ৯২। একে একে ইহাদের অনেকগুলিকে এক্‌স্‌-রশ্মির বাল্‌বের মধ্যে দিয়া এবং ইহাদের প্রত্যেকের সহিত সংঘাতে উত্থিত এক্‌স্‌-রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য মাপিয়া মোস্‌লে এক বিস্ময়কর সিদ্ধান্তে উপনীত হইলেন। পর পর আণবিক ওজনের ব্যবধান সমান নয়, কিন্তু ইহাদিগের হইতে উত্থিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মধ্যে এক শৃঙ্খলা আছে। কেন এমন হইল? কল্পনা করা হইল যে, আণবিক গুরুত্ব অনুসারে সাজানো পরমাণুর অভ্যন্তরে এমন কিছু আছে যাহা ধাপে ধাপে সর্বত্র সমানভাবে বাড়িয়া চলিতেছে। কিন্তু, কি সে যাহা সমান হারে বাড়িয়া চলিতেছে? অভ্যন্তরস্থ তড়িৎ কি? যাহাই হোক, এটা ঠিকভাবে জানা গেল যে, একটা মৌলিক পদার্থের পরিচয় দিতে হইলে আণবিক ওজনের পরিবর্তে আণবিক সংখ্যা হইবে উহার যথাযথ পরিচায়ক।

 মোস্‌লে যখন এই-সব পরীক্ষা করিতেছিলেন তাহার অল্প কিছু পূর্ব হইতে রাদারফোর্ড, একটি পরমাণুর পূর্ণচিত্র উদ্ঘাটনে ব্যাপৃত ছিলেন। পূর্বকথাগুলি আর-একবার স্মরণ করা যাক। পরমাণু হইতে ইলেক্‌ট্রন বাহির হইল। ইলেক্‌ট্রন নেগেটিভ-তড়িৎ-যুক্ত, কিন্তু সমস্ত পরমাণুটি তড়িৎ-শূন্য। তাহা হইলে পরমাণুর একটি অংশ নিশ্চয়ই আছে যাহা পজিটিভ তড়িৎ-যুক্ত এবং সেই পজিটিভ তড়িতের পরিমাণ ইলেকট্রনের নেগেটিভ তড়িতের সমান। পরমাণুর মধ্যে কোথায় এই পজিটিভ-তড়িৎ আছে? জে. জে. টম্‌সন কল্পনা করিলেন যে, সমস্ত পরমাণুটি ব্যাপ্ত হইয়া পজিটিভ তড়িৎ আছে, মধ্যে মধ্যে ইলেক্‌ট্রনগুলি ছড়াইয়া আছে। ইহার মূলে কোনো পরীক্ষালব্ধ সত্য নাই। সঠিক সংবাদ পাইতে হইলে পরমাণুর অভ্যন্তরে কাহাকেও পাঠাইতে হইবে এবং আকারে উহা পরমাণুর অপেক্ষা বড় হইলে চলিবে না। সে যেন ফিরিয়া আসে, ভিতরের সংবাদ বহন করিয়া আনে; তজ্জন্য তাহাকে প্রভূত শক্তিমান হইতে হইবে, ভিতরে আটক পড়িয়া না যায়। যে ছট্‌রা পাঠানো হইবে তাহা পরমাণুর মত ক্ষুদ্র হইবে, অথচ প্রচণ্ড বলশালী হইবে।

 রাদারফোর্ড্‌ দেখিলেন, এইরূপ ছট্‌রা তো প্রকৃতির রাজ্যেই রহিয়াছে। রেডিয়ম বা ঐজাতীয় তেজস্ক্রিয় (radio-active) পদার্থ হইতে যে আল্‌ফা-রশ্মি নির্গত হয় তাহার প্রকৃতি এইরূপ। একটি আল্‌ফা-রশ্মি হইল পজিটিভ তড়িৎযুক্ত একটি হিলিয়ম পরমাণু, ইলেক্‌ট্রনে যে পরিমাণ তড়িৎ থাকে ইহাতে তড়িতের পরিমাণ তাহার দ্বিগুণ। তেজস্ক্রিয় পদার্থ হইতে যখন বাহির হয় তখন ইহার বেগ সেকেণ্ডে ২০ হাজার মাইল বা ঐ ধরনের। একটি আল্‌ফা-রশ্মি যখন পরমাণুর ভিতরে প্রবেশ করিয়া আবার বাহির হইয়া আসিবে তখন উহার গতিপথ দেখিয়া ভিতরের অনেক সংবাদ সংগ্রহ করা যাইতে পারে। পরমাণু হইতে বাহির হইয়া উহা যদি জিঙ্ক্‌-সলফাইড পর্দার উপরে পড়ে স্থানটি হইতে স্ফুলিঙ্গ বাহির হইবে; যদি সি. টি. আর. উইলসনের কক্ষমধ্যে পরিপৃক্ত জলীয় বাষ্পের ভিতর দিয়া যায় তবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা দ্বারা উহার গতিপথ অঙ্কিত করিবে। এইরূপ কক্ষস্থিত গ্যাসের মধ্যে আল্‌ফা-রশ্মি পাঠাইয়া এবং বিবিধ ফটোগ্রাফ লইয়া রাদারফোর্ড্‌ দেখিলেন যে আল্‌ফা-রশ্মির পথ সোজা গিয়া মাঝে মাঝে হঠাৎ একেবারে বাঁকিয়া গিয়াছে।

 এই সব দেখিয়া রাদারফোর্ড, একটি পরমাণুর আভ্যন্তরিক চিত্র এইরূপ আঁকিলেন। পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে পজিটিভ তড়িৎ অবস্থিত; পদার্থের প্রায় সমস্ত ভর সেইখানেই সংহত হইয়াছে; এই ভর অতি অল্পপরিসর স্থানে সীমাবদ্ধ; ইলেক্‌ট্রন অপেক্ষাকৃত দূরে অবস্থিত; ইহাদের মধ্যের স্থান শূন্য। এইরূপ গঠনের পরমাণুর মধ্যে আল্‌ফা-রশ্মি প্রবেশ করিল। এখন পরমাণুর কেন্দ্রে আছে পজিটিভ-তড়িৎ, আল্‌ফা-রশ্মিও পজিটিভ-তড়িৎ-যুক্ত; উভয়ে যদি খুব কাছাকাছি আসিয়া পড়ে তবে উহাদের মধ্যে প্রবল বিকর্ষণ হইবে, ফলে আল্‌ফা-রশ্মির পথ বাঁকিয়া যাইবে। আল্‌ফা-রশ্মির ভর, উহার তড়িৎ-পরিমাণ, জানা আছে। মনে করা যাক, উহা একটি সোনার পরমাণুর নিকট দিয়া যাইতেছে। এই পরমাণুরও ভর জানা আছে; ইহার অভ্যন্তরস্থ তড়িতের একটা পরিমাণ যদি ধরিয়া লওয়া যায় তবে আল্‌ফা-রশ্মি উহার কতট| নিকট দিয়া যাইলে উহা কতটা পরিমাণে বাঁকিবে রাদারফোর্ড আঁক কষিয়া ঠিক করিলেন। রাদারফোর্ড্‌, গাইগার এবং মার্স্‌ডেন ও স্যাড্‌উইক পরীক্ষা করিলেন। পরীক্ষায় প্রমাণিত হইল যে, একটি সোনার পরমাণুর আভ্যন্তরিক তড়িতের পরিমাণ একটি ইলেকট্রনের তড়িতের পরিমাণের ৭৯ গুণ। স্মরণ রাখিতে হইবে, সোনার আণবিক সংখ্যা হইল ঐ ৭৯। অন্যান্য পদার্থ লইয়াও পরীক্ষা হইল; সাধারণ ভাবে ইহা প্রতিষ্ঠিত হইল যে, প্রতি পরমাণুর অভ্যন্তরস্থ তড়িতের পরিমাণ উহার আণবিক সংখ্যার উপর নির্ভর করিতেছে। এই-সব পরীক্ষার ফলাফল নির্ণয়ে অঙ্কশাস্ত্রের একটি বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করিতে হইল। একটিমাত্র পরমাণু লইয়া পরীক্ষা করা যায় না; এতটুকু পদার্থ লইলেও তাহার মধ্যে অসংখ্য পরমাণু থাকে, অতএব হিসাবের মধ্যে গড় হিসাব প্রয়োগ করা হইল।

 পরীক্ষা হইতে একটি পরমাণুর গঠন যেরূপ দাঁড়াইল তাহা আর-একবার দেখা যাক। একটি পরমাণুর ভরের প্রায় সবটাই কেন্দ্রে খুব অল্পপরিসর স্থানে সংবদ্ধ। সমস্ত পরমাণুটি পজিটিভ ও নেগেটিভ তড়িৎ-যুক্ত পদার্থের সমষ্টি; নেগেটিভ তড়িৎ-যুক্ত ইলেকট্রনরা চারিদিকে ছড়াইয়া আছে, আর সমস্ত পজিটিভ তড়িৎ কেন্দ্রস্থিত ভরে আবদ্ধ। পরমাণুর আণবিক সংখ্যা যত বাহিরের ইলেকট্রনের সংখ্যা তত; আর বাহিরে বিক্ষিপ্ত সমস্ত ইলেক্‌ট্রনে যতটা নেগেটিভ তড়িৎ কেন্দ্রস্থ পজিটিভ তড়িৎ সেই পরিমাণের।

 এই হিসাবে একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর গঠন কিরূপ দাঁড়ায় এইবার দেখা যাক। সর্বাপেক্ষা হালকা হাইড্রোজেন-পরমাণুর গঠন সর্বাপেক্ষা সরল ধরা হইল। এই পরমাণুর বাহিরে আছে একটিমাত্র ইলেক্‌ট্রন। সমস্ত হাইড্রোজেন পরমাণুর ভর ধরা হইয়াছে ১.০০৮১, এই অনুপাতে ইলেক্‌ট্রনের ভর হইল .০০০৫৪৮৬, আর, হাইড্রোজেনের অবশিষ্ট অংশ, অর্থাৎ প্রায় সবটাই, কেন্দ্রে অবস্থিত; ইহার ভর দাঁড়াইল ১.০০৭৫৮; এখানে আছে পজিটিভ তড়িৎ, উহার পরিমাণ ইলেক্‌ট্রনের তড়িতের সমান। ১৯২০ সালে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের বাৎসরিক অধিবেশনে রাদারফোর্ড্‌ ইহার নাম দিলেন প্রোটন। সুতরাং কল্পনায় দাড়াইল যে, একটি হাইড্রোজেন পরমাণু একটি প্রোটন ও একটি ইলেকট্রনের সমষ্টিমাত্র, আর-কিছু ইহাতে নাই। অপেক্ষাকৃত ভারী পরমাণুতে ইলেক্‌ট্রনের ও প্রোটনের সংখ্যা বাড়িয়া চলে, এই মাত্র। বিভিন্ন পরমাণুর ভিন্ন ভিন্ন অট্টালিকা প্রোটন-রূপ ইট ও ইলেক্‌ট্রন-রূপ মসলা দ্বারা গ্রথিত। এই-সব অট্টালিকার রূপ ও প্রকৃতি বিভিন্ন, কারণ, ইটের সংখ্যা ও মসলার পরিমাণ এবং গাঁথিবার কৌশল বিভিন্ন। কিন্তু বিভিন্ন পরমাণুর মূল উপাদান হইল ঐ একই রকমের ইলেক্‌ট্রন এবং একই রকমের প্রোটন। রাদারফোর্ড্‌ পরমাণুর এইরূপ পরিকল্পনা করিলেন, তবে নিউট্রন আবিষ্কারের পর তাহার পরিকল্পনাকে পরিবর্তন করিবার প্রয়োজন হইল।

 বিশ্বের মূল উপাদান হইল ৯২ রকমের বিভিন্ন পরমাণু, বিজ্ঞানীর এ ধারণা এখন ধূলিসাৎ হইল। এখন দাঁড়াইল এই যে, আমাদের দৃষ্টির গোচর এবং অগোচর সকল বস্তুর মূলে, এই পৃথিবীর মূলে, সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের মূলে আছে মাত্র দুইটি বস্তু—এক নেগেটিভ তড়িৎ-যুক্ত ইলেক্‌ট্রন এবং আর-এক পজিটিভ তড়িৎ-যুক্ত প্রোটন, মাত্র এই দুইটি, আর-কিছু নয়।