বিশ্বের উপাদান/উপসংহার
উপসংহার
প্রসঙ্গক্রমে কথাটা উঠিয়াছে যে, পদার্থ হইল শক্তির রূপান্তরিত অবস্থা। মানব ঔৎসুক্যের সহিত প্রশ্ন করিতেছে, আজও কি পদার্থের জন্ম হইতেছে এবং যদি হয় তবে কোথায় কিভাবে হইতেছে। সম্পূর্ণ উত্তর সে আজও পায় নাই, তবে বর্তমান কালের বিভিন্ন পরীক্ষা হইতে মনে হয়, যেন তিমিরদুয়ার একটু একটু করিয়া খুলিয়া যাইতেছে। এইসব পরীক্ষার সামান্য একটু আভাস দেওয়া হইতেছে।
রেডিয়ম, এক্স্-রশ্মি যখন আবিষ্কৃত হয় সেই সময় হইতে দেখা গিয়াছিল যে, উহাদের চারিদিকের গ্যাস তড়িৎ-পরিবাহক হয়। বর্তমান শতাব্দীর প্রারম্ভে গাইটেল তেজষ্ক্রিয় পদার্থ হইতে কোনও রকম রশ্মি আসিতে না পারে এইরূপ বন্দোবস্ত করিয়াও দেখিলেন যে, বায়ুকে সম্পূর্ণরূপে তড়িৎপরিবাহকত্বহীন করা যায় না। তাহার পর গোকেল, হেম, কোল্হর্স্টার স্বর্ণপত্রযুক্ত তড়িৎ-নির্দেশক যন্ত্র (gold-leaf electroscope) খুব উচ্চে লইয়া গেলেন; তড়িৎপরিবাহকত্ব কমিল না বরং দেখা গেল, পাঁচ মাইল উচ্চে উহা সাতগুণ বাড়িয়া গিয়াছে। গাইটেলের পরীক্ষা সম্বন্ধে এতদিন রাদার্ফোর্ড্ বলিয়া আসিতেছিলেন যে, মাটির মধ্যে লুক্কায়িত কোনও তেজষ্ক্রিয় পদার্থ হইতে নির্গত রশ্মি দ্বারা ঐরূপ ঘটিতেছে। কিন্তু এখন আর সে কথা বলা চলিল না। মাটি হইতে যদি ঐ রশ্মি নির্গত হয় তবে পাঁচ মাইল পথ ভ্রমণ করিবার পর উহা হয় লুপ্ত হইবে না-হয় খুব কমিয়া যাইবে, বাড়িয়া যাইতে পারে না। নিশ্চয় পৃথিবীর বাহির হইতে আগত কোনও রশ্মি দ্বারা ঐরূপ ঘটিতেছে।
১৯১৪ সালে মিলিক্যান এ সম্বন্ধে গবেষণা আরম্ভ করিলেন, কিন্তু যুরোপীয় মহাযুদ্ধের জন্য কাজ বেশীদূর অগ্রসর হইল না। ১৯২১ সালে মিলিক্যান এ সম্বন্ধে আবার মনোনিবেশ করিলেন। পর্বতশিখরে, গভীর হ্রদে, আকাশে খুব উচ্চে এই রশ্মির তীব্রতা সম্বন্ধে মিলিক্যান অনুসন্ধান আরম্ভ করিলেন। তিনি একটি যন্ত্র নির্মাণ করিলেন যাহাতে উষ্ণতা, বায়ুর চাপ, তড়িৎ-নির্দেশক যন্ত্রে পাতা মুড়িবার হার, স্বতই লিখিত হয়। যন্ত্রটির প্রধান বিশেষত্ব এই যে, উহা ওজনে মাত্র সাত আউন্স্। ইহার সহিত দুইটি বেলুন যুক্ত করিয়া দেওয়া হইল, স্ফীত অবস্থায় প্রত্যেকটির ব্যাস ১৮ ইঞ্চি মাত্র। বেলুন দুটি হালকা গ্যাসে ভরিয়া দেওয়ায় উহারা উপরে উঠিতে লাগিল। খুব বেশী উঁচুতে উঠিয়া একটি ফাটিল; তখন আর একটি প্যারাসুটের ন্যায় কাজ করিল এবং সমস্তটি ধীরে ধীরে নামিতে লাগিল। একটি পরীক্ষার যন্ত্রটি প্রায় ১০ মাইল উর্ধ্বে উঠিল, সেখানে শৈত্য—৬০° ডিগ্রি সেণ্টিগ্রেড; উঠিতে সময় লাগিয়াছিল ১১৫ মিনিট, নামিতে ৭৬ মিনিট। এই দশ মাইলের মধ্যে পৃথিবীর উপরিস্থিত বায়ুর প্রায় ১০ ভাগের ৯ ভাগ আছে। পরীক্ষায় কয়েকটি ব্যাপার লক্ষিত হইল। যত উপরে উঠা যায় রশ্মির তীক্ষ্ণতা তত বাড়ে এবং যে হারে বাড়ে তাহাতে এই প্রমাণ হয় যে, এই রশ্মি বায়ু দ্বারা খুবই অল্প পরিমাণে শোষিত হয়। জলের মধ্য দিয়া যাইলেও রশ্মির তীব্রতা যে খুব অল্প পরিমাণে হ্রাস পায়, পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে নানা পরীক্ষা হইতে তাহা প্রমাণিত হইল। সকল পরীক্ষা হইতে এই সিদ্ধান্ত করা হইল যে, এই রশ্মির উৎপত্তি পৃথিবীর কোথাও নয়, কোনও নির্দিষ্ট দিক হইতে ইহা আসিতেছে না, ইহা ছায়া ফেলে না। মিলিক্যান বলিলেন পৃথিবী হইতে দূরে, বহুদূরে, সরল মৌলিক পদার্থ হিলিয়ম, কার্বন, সিলিকন প্রভৃতিতে পরিণত হইতেছে; তজ্জনিত যে শক্তির উদ্ভব তাহারই কিছু ঐ রশ্মিরূপে পৃথিবীতে আসিয়া পৌঁছিতেছে। ইহার নাম দেওয়া হইল কস্মিক রশ্মি। পরে প্রমাণিত হইল, এই কস্মিক রশ্মি ইলেক্ট্রন, প্রোটন, পজিট্রন ও মেসন-এর সমষ্টি, কিছু ফোটন থাকাও সম্ভব। ষাট হাজার কোটি ভোল্ট শক্তিযুক্ত ইলেক্ট্রন মিলিল।
পদার্থের ধ্বংসে এই শক্তির উৎপত্তি। কিন্তু উৎপত্তির স্থান কোথায়, কত দূরে? কিছু কিছু অনুমান হইতেছে, সঠিক সংবাদ মিলে নাই, তবে এটা ঠিক যে, উহারা লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ অতিক্রম করিয়া আসিতেছে। বিজ্ঞানীর পরীক্ষা শেষ হয় নাই; আজও গাইগারের কক্ষে বিজ্ঞানী উহাদের আগমন লক্ষ্য করিতেছে, বায়ুস্তরে বেশীরকম প্রবেশ করিয়া পরমাণুকে ক্ষতিগ্রস্ত করিবার পূর্বে আজও বেলুন পাঠাইয়া উহাদিগকে ধরা যাইতেছে। কিন্তু উহাদের সম্বন্ধে কত সংবাদ এখনও জানিতে বাকী! এই মুহূর্তে একটি মানবদেহে কত কণিকা আসিয়া পড়িতেছে? মিনিটে হয়তো ৩০টি, ঘণ্টায় ১৮০০, দিনে ৪৩২০০, বৎসরে ১৫৭৬৮০০০। উহারা আমাদের অনিষ্ট করে না উপকার করে, না কিছুই করে না? উহাদের অভাবে আমরা নির্জীব হইয়া আসি না উহাদের সম্বন্ধে আমরা সম্পূর্ণ নির্বিকার? এসব কথা বিজ্ঞানী এখন ও জানে না। কিন্তু সৃষ্টির রহস্যজাল উদ্ঘাটনে বিজ্ঞানী চিরদিনই অসাধ্যসাধন করিয়া আসিতেছে, বন্ধুর পথে সে যাত্রা করিতেছে, নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে না। এ সম্বন্ধে একটি দুঃসাহসিকতার কাহিনী এইরূপ। উর্ধ্বে এ সম্বন্ধে পরীক্ষা করিবার জন্য পিকার্ড্ নামে এক বিজ্ঞানী এক নূতন ধরনের বেলুন নির্মাণ করিলেন এবং তাহাতে নিজে চড়িলেন। বেলুন উপরে উঠিতে লাগিল। সূর্যাস্তের পরে পিকার্ড যাত্রা করিলেন; উঠিতে উঠিতে রাত্রি শেষ হইল, সূর্যকিরণ দেখা দিল; সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি এত তীব্র যে চোখে পড়িলে মুহূর্তের মধ্যে অন্ধ করিয়া দিবে। এরোপ্লেন পূর্বে সর্বোচ্চ ৪৭৫৭২ ফুট অবধি উঠিয়াছিল, পিকার্ড্ তাহারও উপর আরও ৬০০০ ফুট উঠিলেন বেলুন আর উঠিল না, তাই পিকার্ড্কে সেখানে থামিতে হইল এবং ২০ ঘণ্টা পরে সেখানকার অনেক সংবাদ সংগ্রহ করিয়া ফিরিয়া আসিলেন।
বিজ্ঞানী মনে করেন যে, কস্মিক রশ্মি সম্বন্ধে যখন আরও অনেক পরীক্ষা হইবে তখন মানব পদার্থের সৃষ্টি ও ধ্বংস সম্বন্ধে অনেক তথ্য আহরণ করিবে। তবে কবি যে প্রশ্ন করিতেছেন—
অবশিষ্ট অমেয় আলোকধারা
পথহারা
আদিম দিগন্ত হতে
অক্লান্ত চলেছে ধেয়ে নিরুদ্দেশ স্রোতে।
সঙ্গে সঙ্গে ছুটিয়াছে অপার তিমির-তেপান্তরে
অসংখ্য নক্ষত্র হতে রশ্মিপ্রার্থী নিরন্ত নির্ঝরে
সর্বত্যাগী অপব্যয়,
আপন সৃষ্টির ’পরে বিধাতার নির্মম অন্যায়।
কিংবা এ কি মহাকাল কল্পকল্পান্তের দিনে রাতে
এক হাতে দান ক’রে ফিরে ফিরে নেয় অন্য হাতে।
সঞ্চয়ে ও অপচয়ে যুগে যুগে কাড়াকাড়ি যেন,
কিন্তু কেন।
এ ‘কেন’র উত্তর কিন্তু বিজ্ঞানের নিকট হইতে কোনও দিন মিলিবে না।