বিশ্বের উপাদান/উপাদানের প্রকৃতি
উপাদানের প্রকৃতি
এই যে বিভিন্ন উপাদানের কথা বলা হইল ইহাদের স্বরূপ কি? ইলেক্ট্রনের কথাই ধরা যাক। কিন্তু সে আলোচনার পূর্বে একটু অন্য কথার অবতারণা করা যাইতেছে।
যে-সকল দূত বাহির হইতে এই পৃথিবীতে সংবাদ বহন করিয়া আনে আলোক তাহাদের মধ্যে প্রধান। আমরা মনে করি, আমরা দূরের কোনও বস্তু দেখিতেছি, তাহার রং এই, তাহার ঔজ্জ্বল্য এইরকম; কিন্তু আলোক চক্ষুমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া শুধু এই কথাগুলি আমাদিগকে জানাইতেছে, “আমি ঐ দিক হইতে আসিতেছি, আমার কম্পনসংখ্যা এই, আমি এইরূপ জোরে কাঁপিতেছি, আমার বেগের হার এক সেকেণ্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল, আমি বাহির হইবার পর আমার পিছনে কি কি ঘটিয়াছে আমি জানি না, তোমার চক্ষুর পিছনের পর্দায় গিয়া পৌঁছিলেই আমার মৃত্যু।”
আলোকের জন্ম হইল একস্থানে, মৃত্যু হইল অন্যত্র। জন্ম হইতে মৃত্যুর মধ্যে এই অল্প বা দীর্ঘ কাল আলোক কিরূপে যাপন করিল? সূর্য হইতে যে-আলোক নির্গত হইল ৮ মিনিট পরে তাহা পৃথিবীতে আসিয়া পৌঁছিল। সূর্য হইতে পৃথিবীর দূরত্ব ৯ কোটি মাইলেরও বেশি; আলোক এই দীর্ঘ পথ কি ভাবে অতিক্রম করিয়া আসিল? নিউটন বলিলেন, আলোকিত পদার্থ হইতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণিকা বাহির হইয়। প্রচণ্ডবেগে চারিদিকে ছুটিতেছে। ঐ কণিকা আসিয়া আমাদের চক্ষুর মধ্যে প্রবেশ করিয়া আমাদের দৃষ্টির অনুভূতি জাগাইতেছে। এই মতবাদকে শীঘ্রই পরিত্যাগ করিতে হইল। কারণ, দেখা গেল, বিশিষ্ট অবস্থায় দুই আলোক-রশ্মি আপনা-আপনি কাটাকাটি করে; দেখা গেল, আলোকের গতিপথ যে সোজা বলা হইয়াছিল তাহা ঠিক নয়, আলোক-রশ্মি বাঁকে, যদিও অতি অল্প পরিমাণে। এইবার কল্পনা করা হইল যে, আলোক তরঙ্গ দ্বারা প্রবাহিত হয়। তরঙ্গদৈর্ঘ্য যদি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে তবেই সেই তরঙ্গ আমাদিগের আলোকের অনুভূতি জাগায়; পৃথক পৃথক দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ ভিন্ন ভিন্ন রঙের চেতনা আনে। তরঙ্গদৈর্ঘ্য মাপিবার বিভিন্ন উপায় স্থিরীকৃত হইল। তরঙ্গ তো স্থির হইল, কিন্তু প্রশ্ন উঠিল কিসের তরঙ্গ? পৃথিবীর উপরে কিছুদূর অবধি গিয়া তো বায়ু শেষ হইয়াছে, তাহার পর শূন্য; কল্পনা করিতে হইল যে, যাবতীয় পদার্থ ব্যাপিয়া, সকল শূন্যস্থান ব্যাপিয়া, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া এরূপ কিছু আছে যাহার মধ্য দিয়া তরঙ্গ পরিচালিত হয়। ইহার নাম দেওয়া হইল ঈথর। এই ঈথর সম্বন্ধে শুধু এইটুকু ধরিয়া লওয়া হইল যে, উহা কাঁপে—কিন্তু ঐ অবধি, উহার আর কোনও খবর জানা রহিল না। আলোক সম্বন্ধে সকলরকম পরীক্ষা এই মতবাদকে সমর্থন করিল। ক্রমে দেখা গেল যে, এক্স্-রশ্মি, গামা-রশ্মি, তাপ-রশ্মি সবই ঈশ্বর-তরঙ্গ; যাহা দ্বারা বিনা তারে বার্তা প্রেরিত হয় তাহাও ঈথর-তরঙ্গ; সকলেই একজাতীয়, পার্থক্য যাহা-কিছু সে শুধু তরঙ্গদৈর্ঘ্যের।
বিজ্ঞানের ইতিহাসে দেখা যায় যে, এক-একটি মতবাদের প্রতিষ্ঠার এক-একটি যুগ আসে; বিজ্ঞানী উহাকে লইয়া খুব হৈ চৈ করেন; চারিদিকে উহার জয়জয়কার হয়; তাহার পর এমন-সব ঘটনা দেখা যায়, যাহার ফলে বিজ্ঞানী তাহার এই সাধের অট্টালিকাকে নিজ হাতেই চূর্ণ করেন। সুদীর্ঘ দুইশত বর্ষকাল ধরিয়া এই তরঙ্গবাদ আপনাকে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখিয়াছিল, তাহার পর এমন সব ঘটনা দেখা দিল যাহাতে বিজ্ঞানী বলিলেন,—‘তাই তো’।
মনে করা যাক, একটি মস্ত হ্রদ আছে। এপারে ২০ ফুট উঁচু হইতে জলের উপর একটি ঢিল ফেলা হইল। জলে তরঙ্গ উঠিল; তরঙ্গ অগ্রসর হইতে লাগিল, জলকণা প্রতি স্থানেই উঠানামা করিতেছে; কিন্তু তরঙ্গ যতই অগ্রসর হইতেছে জলকণার উঠানামা ততই ক্ষীণ হইয়া আসিতেছে। ওপারে যখন আসিয়া পৌঁছিল তখন উঠানামা খুবই অল্প হইয়া গিয়াছে। এইরূপ তরঙ্গ এখানে পৌঁঁছিরা একটি ঢিলের গায়ে লাগিয়া ঐ ঢিলটিকে ২০ ফুট উঁচুতে তুলিবে একথা কি বিশ্বাসযোগ্য? কিন্তু দেখা গেল, প্রকৃতিতে এই রকমের ব্যাপার ঘটিতেছে। একটা ঘটনার উল্লেখ করা যাইতেছে।
এক্স্-রশ্মির উদ্ভব এইভাবে হয়। প্রায় বায়ুশূন্য এক গোলকে ধাতব পদার্থের উপর কতকগুলি ইলেক্ট্রন প্রচণ্ডবেগে আসিয়া ধাক্কা দেয়; সংঘাতের ফলে এক্স্-রশ্মি বাহির হইয়া আসে। ঐ ইলেক্ট্রনের বেগ কত তাহা সঠিক ভাবে মাপা যায়। এক্স্-রশ্মি উদ্ভূত হইয়া চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল; যত অগ্রসর হইল রশ্মি ততই ক্ষীণতর হইয়া আসিতে লাগিল। খুব ক্ষীণ অবস্থাতেও ইহা যদি কোনও ধাতব পদার্থের উপর পড়ে তবে উহা হইতে ইলেক্ট্রন বাহির হয়। এই ইলেকট্রনের বেগ মাপা গেল; দেখা গেল কাচের গোলকে যে বেগে ইলেক্ট্রন আসিয়া এক্স্-রশ্মি উৎপন্ন করিয়াছিল, কোনও পদার্থের উপর এক্স্-রশ্মি আসিয়া পড়ায় তাহা হইতে ঠিক সেই একই বেগে ইলেক্ট্রন বাহির হইয়া আসিল। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, ঐ এক্স্-রশ্মি বাহির হইয়াই তীব্র অবস্থায় কিছুর উপর পড়ুক বা অনেক দূর যাইয়া মৃদু হইয়া তাহার উপ পড়ুক একই বেগে ইলেক্ট্রন ছিটকাইয়া বাহির হইবে; পার্থক্য এই, তীব্র অবস্থার সংখ্যায় বেশী ইলেক্ট্রন বাহির হইবে, মৃদু অবস্থায় কম ইলেক্ট্রন বাহির হইবে, এইমাত্র; নির্গত ইলেক্ট্রনের বেগ ঠিক থাকিবে। এই-রকমের বহু পরীক্ষা হইল। দেখা গেল, নীলরশ্মি, অতি-বেগুনি রশ্মি, এক্স্-রশ্মি, গামা রশ্মি যদি নির্দিষ্ট ধাতব পদার্থের উপর পড়ে তবে উহা হইতে ইলেক্ট্রন বাহির হয়। বহির্গত ইলেক্ট্রনের বেগ নির্ভর করে যে-ঈথর-তরঙ্গ পড়িতেছে তাহার কম্পনসংখ্যার উপর, তাহার ঔজ্জ্বল্যের উপর নয়; ঔজ্জ্বল্যের উপর নির্ভর করে সংখ্যায় কতগুলি ইলেক্ট্রন বাহির হইল। এক্স্-রশ্মির, গামা রশ্মির কম্পনসংখ্যা বেশী, সুতরাং উহাদের দ্বারা প্রক্ষিপ্ত ইলেক্ট্রন খুব বেশী বেগে বাহির হইবে; নীল আলোকের কম্পনসংখ্যা কম, উহা দ্বারা উত্থিত ইলেক্ট্রন অপেক্ষাকৃত কম বেগে বাহির হইয়া আসিবে। রশ্মির সাহায্যে ইলেক্ট্রন উৎপাদন ব্যাপারটার নাম দেওয়া হইল রশ্মিতড়িৎ-ক্রিয়া; বহু পরীক্ষাগারে অনেক বিজ্ঞানী এ সম্বন্ধে পরীক্ষা করিলেন। পরীক্ষায় কোনও ভুল নাই; কিন্তু ইহার মূল কারণ কি।
আইনস্টাইন ইহার কারণ নির্দেশ করিলেন। এজন্য তিনি বর্তমান কালের পদার্থবিদ্যার একটি বিপ্লবকারী মতবাদ গ্রহণ করিলেন। তাপ দৃশ্য আলোক, অতি-বেগনি আলোক, এক্স্-রশ্মি, গামা-রশ্মি, সবই তরঙ্গে প্রবাহিত হইতেছে; তরঙ্গের একটা অবিচ্ছিন্নতা, একটা ধারাবাহিকতা আছে, এই কথাই এতদিন বলা হইতেছিল। উত্তপ্ত কৃষ্ণবর্ণ পদার্থ হইতে যে-সব কিরণ নির্গত হয় তৎসম্বন্ধে অনুসন্ধান করিতে করিতে বর্তমান শতাব্দীর প্রারম্ভে প্লাঙ্ক দেখিলেন যে অনেকগুলি ঘটনা তরঙ্গবাদ দ্বারা মীমাংসিত হয় না। প্লাঙ্ক বলিলেন যে, তেজ বিচ্ছিন্নভাবে খণ্ড খণ্ড আকারে বাহির হইয়া যায়, অবিচ্ছিন্নতা নাই, ধারাবাহিকতা নাই, শক্তি এক-একটি গুচ্ছে, এক-একটি প্যাকেটে, এক-একটি বাণ্ডিলে বাহির হইয়া আসিতেছে। কিন্তু সর্বাপেক্ষা নূতন কথা এই যে, শক্তির একক, (unit) সর্বত্র ঠিক নাই, কম্পনসংখ্যা যেখানে কম বাণ্ডিলটা সেখানে ছোট, কম্পনসংখ্যা যেখানে বেশী বাণ্ডিলটা সেখানে বড়। শক্তির গুচ্ছকে লাল আলোর জন্য যদি ১ ধরা হয়, বেগনি আলোর পক্ষে উহা হইবে ২, অতি-বেগনির পক্ষে ৮ এবং এক্স্-রশ্মির পক্ষে ৮০০০, গমা-রশ্মির পক্ষে আরও বেশী। এই মতবাদ গ্রহণ করিয়া আইনস্টাইন বলিলেন যে, শুধু রশ্মি-নির্গম ব্যাপার নয়, রশ্মি যখন একস্থান হইতে অন্যস্থানে পরিচালিত হয় তখনও উহা বিচ্ছিন্নভাবে গমন করে। এই কোয়াণ্টাম্বাদ অনুসারে দাঁড়াইল যে, আলোক বা যে-কোনও রশ্মি কোথাও কদাচ মসৃণ তরঙ্গ নয়, সর্বত্রই উহা বিচ্ছিন্নভাবে, কাটাকাটা রকমে প্রবাহিত হইতেছে। ধাতব পদার্থের উপর রশ্মি নিপতিত হইলে যে ইলেক্ট্রন বাহির হয়, এই রশ্মি-তড়িৎ-ক্রিয়া আইনস্টাইন কোয়াণ্টমবাদ দ্বারা মীমাংসা করিলেন। রশ্মির এক-একটি প্যাকেটের নাম দেওয়া হইল ‘ফোটন’, ইহা যেন প্রোটন ইলেক্ট্রনের সহোদর। এক্স্-রশ্মি বাল্বের মধ্যে একটি ইলেক্ট্রন আসিয়া ধাক্কা খাইয়া যখন এক্স্-রশ্মি উৎপাদন করিল তখন এই ইলেক্ট্রনের সমস্ত শক্তি ফোটনে চালিত হইল। এই ফোটন আলোকের বেগে বাহির হইয়া আসিল; আসিয়া যখন আবার একটি ধাতব পদার্থের উপর পড়িল তখন উহা হইতে ইলেক্ট্রন বাহির হইল; এখানে ব্যাপারটা উলটাইয়া গেল, ফোটনের মৃত্যু হইল এবং ইলেক্ট্রনের জন্ম হইল, ফোটন তাহার সমগ্রশক্তি ইলেক্ট্রনকে দিয়া দিল। যুক্তির কোথাও কোনও গলদ রহিল না। এই কল্পনায় যেন বহুকাল পূর্বের নিউটনের কণাবাদ অন্যভাবে দেখা দিল।
এ সব তো হইল অনেক অবান্তর কথা। আসল কথা ছিল এই যে, বিশ্বের উপাদান বলিয়া যাহাদিগকে স্থির করা গেল তাহাদের স্বরূপ কি। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হয় যে, পদার্থ যেন কতকগুলি কণিকার সমষ্টিমাত্র। কিন্তু আলোকের যদি দুই মূর্তি হয় তবে পদার্থের উপাদান ইলেক্ট্রন কি দুইভাবে আপনাকে প্রকাশিত করিতে পারে না—কণিকা ও তরঙ্গ? ডি. ব্রগ্লি এই কথা ভাবিলেন, জটিল আঁকজোখের অবতারণা করিলেন, হিসাবে দেখাইলেন যে, একটি ইলেক্ট্রনের সহিত তরঙ্গ জড়িত আছে; প্রচণ্ডগতিযুক্ত ইলেক্ট্রনের পক্ষে তরঙ্গদৈর্ঘ্য এক্স্-রশ্মির তরঙ্গ-দৈর্ঘ্যের সমপর্যায়ে। ডি. ব্রগ্লি আরও বলিলেন যে, পরমাণুর মধ্যে ইলেক্ট্রনের ঘুরিবার কক্ষদৈর্ঘ্য সব সময় উহার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের গুণিতক। ক্রমে দেখা গেল যে, এক্স্-রশ্মি ও ইলেক্ট্রনদের মধ্যে আশ্চর্য সাদৃশ্য আছে। পরীক্ষায় ডেভিসন ও জার্মার ইহা প্রথম প্রতিপন্ন করিলেন; নিকেলের উপর ইলেক্ট্রন ফেলিয়া তাঁহারা দেখিলেন যে, উহার প্রতিফলন ব্যাপারটা দানাযুক্ত পদার্থের উপর এক্স্-রশ্মির প্রতিফলনের তুল্য। জে. জে. টম্সনের পুত্র জি পি টম্সন কেলাসিত (crystalline) পদার্থের ভিতর দিয়া ইলেক্ট্রন পাঠাইয়া এক চিত্র পাইলেন; বহু বৎসর পূর্বে ব্র্যাগ ঐ-সব পদার্থের মধ্য দিয়া এক্স্-রশ্মি পাঠাইয়া অনুরূপ চিত্র পাইয়াছিলেন। শেষ অবধি কি তরঙ্গ দাড়াইল পদার্থে, পদার্থ দাড়াইল তরঙ্গে?
স্রডিংগার এই মতবাদকে আর-এক ধাপ উপরে তুলিলেন। তিনি বলিলেন, স্থূল ইলেক্ট্রনকে বাদ দেওয়া যাক; শুধুই তরঙ্গ আছে, আর কিছু নয়। কিন্তু, নলে যে ক্যাথোড রশ্মি বাহির হয়, তেজস্ক্রিয় পদার্থ হইতে যে বিটা-রশ্মি বাহির হয়, উহারা তো ইলেক্ট্রন। স্রডিংগার বলিলেন, না, উহারাও তরঙ্গ। কেন্দ্রের চারিদিকে ইলেক্ট্রন ঘুরিতেছে, বোর এই কল্পনা করিয়াছিলেন। স্রডিংগার ব্যাপারটিকে এইভাবে দেখিলেন। কেন্দ্রের চারিদিকে তড়িৎ বিস্তৃত হইয়া আছে; এই তড়িতের প্রাচূর্য নির্দিষ্টহারে বাড়িতেছে কমিতেছে; ইহার ফলে তরঙ্গের উৎপত্তি হইতেছে। ইলেক্ট্রন লাফাইয়া পড়িতেছে বলিয়া বোর উহার উৎপত্তি কল্পনা করিয়াছিলেন। স্রডিংগার তরঙ্গবাদের উপর স্থাপিত করিয়া এক নূতন বলবিদ্যা গঠিত করিলেন। বোরের কল্পনা অনুসারে যে-সব ব্যাপার নির্ণীত হইতেছিল এই নৃতন তরঙ্গ-বলবিদ্যা দ্বারা তাহা তো হইলই, অধিকন্তু ইহা আরও ব্যাপক হইল। বর্ণালিরেখার ঔজ্জ্বল্যও ইহার দ্বারা সুমীমাংসিত হইল।
স্রডিংগার যখন তাঁহার এই মতবাদ প্রচার করিলেন তাহার কিছু পূর্ব হইতে হাইসেনবার্গ, কোয়াণ্টাম্বাদের উপর স্থাপিত বলবিদ্যাকে এক নূতন রূপ দিলেন। ইহাতে পরমাণুর চিত্রের কোনও কল্পনা নাই; ইহাতে আছে কতকগুলি আঁকজোখ, কতকগুলি হিসাব, কতকগুলি ব্যবস্থাপত্র যদ্দ্বারা প্রাচীন বলবিদ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত ঘটনাসমূহ নিখুঁত ভাবে মীমাংসিত হইতে পারে। হাইসেনবার্গের যুক্তির ধারা পদার্থবিদ্যাকে দর্শনশাস্ত্রের কিনারায় লইয়া গেল। যুক্তির মধ্যে যন্ত্রপাতির কোনও স্থান নাই, থাকিতে পারে না; ইহার একমাত্র সম্বল হইল মানবের অন্তরস্থ বুদ্ধি। যুক্তির ধারা মোটামুটি এই। মনে করা যাক, দূরে একখানা পাথর রহিয়াছে, আমি উহাকে দেখিব, উহার মাপজোখ লইব। দেখিবার জন্য উহার উপর আলোক ফেলিলাম। আলোক পাথরের উপর পড়িয়া উহাকে স্থানচ্যুত করিবে না, সুতরাং আমার মাপজোখে কোনও ভুল হইবে না। তারপর কোনও বস্তুর যদি গোড়াকার অবস্থা জানা থাকে এবং উহার চলিবার নিয়মকানুন যদি জ্ঞাত হওয়া যায় তবে পরে যে-কোনও সময় উহার অবস্থিতি আমরা নির্ধারণ করিতে পারি। হাইসেনবার্গ্ বলিলেন যে, পরমাণুর সম্বন্ধে এ-সব নিয়ম খাটিতে পারে না; পরমাণুর পূর্ব অবস্থা তো আমরা রশ্মির সাহায্যে নির্ধারণ করিব। রশ্মি পরমাণুর মধ্যে যদি ক্রিয়া চলে তবে মাপজোখ হইবে কিরূপে? অতএব দেখা যাইতেছে যে, বাহ্যজগৎ সম্বন্ধে যে-সব যুক্তির ধারা গৃহীত হইয়াছে পরমাণুজগতে সে-সব যুক্তি চলে না। বিজ্ঞানের দৃঢ় ভিত্তি তবে কি একেবারে চূর্ণ হইয়া গেল? তবে কি বিজ্ঞান ভবিষ্যতের অবস্থা সম্বন্ধে কিছুই বলিতে পারে না, এবং যদি পারে তো গোড়াকার অবস্থা সম্বন্ধে কিছু না জানিয়া একেবারে ভবিষ্যদ্বাণী করে? হাইসেনবার্গের মতে শেষ অবধি কি এই দাঁড়াইল যে, পরমাণু-জগৎ সম্বন্ধে আমরা কোনও দিন কোনও জ্ঞানলাভ করিতে পারিব না? এ কথা কোনও নির্দ্দিষ্ট পরমাণু সম্বন্ধে ঠিক; তবে আমরা সোজাসুজি একটা সমষ্টিগত হিসাব পাইব। প্রাচীন পদার্থবিদ্যায় যে গড় হিসাব লওয়া হয় তাহার সহিত পার্থক্য এই যে, সেখানে প্রত্যেকটির উপর নিয়ম খাটাইয়া ফলাফলের একটা গড় লওয়া হয়; এখানে সমষ্টিগত হিসাব সোজাসুজি আসে, প্রত্যেকটির অবস্থা সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান নাই।
পরীক্ষামূলক ঘটনায় তরঙ্গবলবিদ্যা প্রয়োগে দুইটি আপত্তির কারণ দেখা দিল। ইলেক্ট্রনের আবর্তন হইতেছে ধরিয়া যে-সব ঘটনা মীমাংসিত হইয়াছিল ইহা সে সব ব্যাপার নির্ণয় করিতে অসমর্থ হইল। তাহা ছাড়া প্রাচীন বলবিদ্যা ইহার ভিত্তি হওয়ায় আপেক্ষিকতাবাদ হইতে যে-সব সিদ্ধান্ত আসে সে-সব এখানে খাপ খায় না।
১৯২৮ সালে ডিরাক একসঙ্গে এই দুই আপত্তিরই খণ্ডন করিলেন। স্রডিংগারের গণনাসমূহে ডিরাক যে পরিবর্তন আনিলেন তাহাতে উহা সত্যে পৌঁছিবার পথে আরও কতকদূর অগ্রসর হইল।
কিন্তু পূর্ণসত্য কতদূরে? যত দিন যাইতেছে ততই মানব বিশ্ব সম্বন্ধে নব নব জ্ঞান, গভীরতর জ্ঞান আহরণ করিয়া চলিয়াছে বটে, কিন্তু ততই সে তাহার অজ্ঞানতার অন্ধকার উপলব্ধি করিতেছে। বহুকাল পূর্বে নিউটন বলিয়াছিলেন, “আমি বেলাভূমি হইতে উপলখণ্ডের সংকলন করিতেছি মাত্র, জ্ঞান-মহার্ণব পুরোভাগে অক্ষুণ্ন রহিয়াছে।” নিউটনের পর দীর্ঘ দুই শতাব্দী অতিবাহিত হইয়াছে, বিজ্ঞানের অগ্রগতি দেখিয়া সাধারণ মানব আজ স্তম্ভিত, কিন্তু বিজ্ঞানী তবুও আজ নিউটনের ঐ বাক্য একই ভাবে উচ্চারণ করিতেছেন।