বিশ্বের উপাদান/পজিট্রন, নিউট্রন, নিউট্রিনো, মিসোট্রন
পজিট্রন, নিউট্রন, নিউট্রিনো, মিসোট্রন
বিজ্ঞানীর পরীক্ষা চলিতে লাগিল। বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল হিসাবে শেষ অবধি এমন-সব বস্তু আসিতে লাগিল যাহাদের কথা পূর্বে কল্পনাতেও আনিতে পারা যায় নাই কিন্তু যাহাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে আর কোনও সন্দেহ রহিল না এবং যাহাদিগকে বিশ্বের মূল উপাদান বলিয়া পরিগণিত করিতে হয়।
পজিট্রন
১৯৩০ সালে ডিরাক ইলেক্ট্রন ও প্রোটনের সম্বন্ধ বিষয়ে একটি বিচার প্রকাশিত করেন। ইলেক্ট্রনের অস্তিত্ব স্বীকার করিয়া এবং কোয়ান্টম-বাদের উপর প্রতিষ্ঠিত বলবিদ্যার (mechanics) নিয়ম প্রয়োগ করিয়া ডিরাক প্রোটনের অস্তিত্ব সম্বন্ধে গণনা করিলেন। এই গণনায় এক অদ্ভুত ফল দেখা দিল; গণনায় একদল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদার্থ আসিল। যাহারা ইলেকট্রনেরই মত কিন্তু যাহাদের তড়িৎ নেগেটিভ নয়, পজিটিভ। ইহাদিগকে কল্পনায় আনিবার জন্য ডিরাক যে চিত্র ' দিলেন তাহা একদিকে যেমন উজ্জ্বল, অপর দিকে তেমনি দুঃসাহসিকতার পরিচায়ক। এ চিত্র উপলব্ধি করিবার জন্য একটি উপমার কথা চিন্তা করা যাইতে পারে।
একটি রঙ্গমঞ্চের প্রেক্ষাগৃহের কথা কল্পনা করা যাক। অচিরে অভিনয় আরম্ভ হইবে; দর্শকগণ তাহাদের আসনে উপবিষ্ট। দু-একজন বিলম্বে আগত দর্শক শূন্য আসন খুঁজিয়া বেড়াইতেছে, খালি আসন পাইলেই বসিয়া পড়িবে। ডিরাকের মতে, প্রেক্ষাগৃহের খালি আসনের ন্যায় ব্রহ্মাণ্ডের স্থানে স্থানে গর্ত আছে; এক-একটি গর্ত এক-একটি ইলেকট্রনের জন্য নির্দিষ্ট, ঠিক যেমন প্রেক্ষাগৃহের খালি আসন বিলম্বে আগত দর্শকের জন্য নির্দিষ্ট। প্রেক্ষাগৃহের শূন্য আসনের সংখ্যা অত্যন্ত অল্প, পূর্ণ আসনের সংখ্যা অনেক বেশী। ব্রহ্মাণ্ডেও অধিকাংশ ইলেকট্রন তাহাদের স্থান দখল করিয়াছে; ভবিষ্যতে শূন্যস্থানও পূর্ণ হইবে। প্রেক্ষাগৃহের যে-সব দর্শক আসন গ্রহণ করিয়াছে এবং যাহারা আসন অন্বেষণে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে তাহাদের মধ্যে পার্থক্য অনেক। সেইরূপ যে-সব ইলেকট্রন গর্তে আছে এবং যাহারা নাই তাহাদের মধ্যেও গুরুতর পার্থক্য। যাহারা গর্তের মধ্যে আছে তাহারা আমাদের নিকট একেবারে লুপ্ত; আমাদের কোনও ইন্দ্রিয়ের দ্বারা তাহাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে কোনও জ্ঞান লাভ করিতে পারি না। বাহিরে যে ইলেকট্রনের সহিত আমাদের পরিচয় তাহারা এখনও শূন্য স্থান অধিকার করে নাই। এক-একটি শূন্য স্থান হইল এক-একটি পজিটিভ ইলেকট্রন। একটি ইলেকট্রন যখন একটি শূন্য স্থান দখল করিবে, অর্থাৎ যখন পজিটিভ ইলেকট্রনকে নেগেটিভ ইলেকট্রন আলিঙ্গন করিবে তখনই উহাদের ধ্বংস। ধ্বংসের ফলে ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রশ্মি উৎপন্ন হইবে এবং উহা এই বিরাট ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে বিচরণ করিবে। যে-সব গর্ত খালি তাহারা পজিটিভ তড়িৎ-যুক্ত অথচ তাহারা প্রোটন নয়; পরবর্তী হিসাবে ডিরাক দেখিলেন যে, তাহাদের ভর ইলেক্ট্রনের ভরের সমান, প্রোটন হইলে ভর ইলেক্ট্রনের ১৮৪৬ গুণ হইত। ডিরাকের কল্পনা যেন স্বপ্নরাজ্য হইতে আনীত; ইহা একটি প্রদীপ্ত শিখা, কিন্তু দেখা গেল ভিতরে অগ্নিও আছে।
ডিরাকের হিসাব হইতে আর একটি কথা আসিল। একটি পজিটিভ ইলেকট্রনের জীবন অতি অল্পক্ষণস্থায়ী, এক সেকেণ্ডের প্রায় একশত কোটি ভাগের এক ভাগ মাত্র। জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে ব্যবধান যদি এইটুকুমাত্র সময় হয় তবে কিরূপে ইহা নিজেকে প্রকাশিত করিবে? কিন্তু ইহা তো প্রচণ্ড বেগে ধাবমান হয়; এই অত্যল্প সময়ের মধ্যেও ইহা প্রায় এক গজ পথ অতিক্রম করে। তবে তো সি. টি. আর. উইলসনের কক্ষে ইহা আপনার গতিপথ অঙ্কিত করিবে। ইহার পূর্ব হইতে কস্মিক রশ্মি সম্বন্ধে আলোচনা চলিতেছিল। এই রশ্মি পৃথিবীর সর্বত্রই পাওয়া যায়; সমুদ্রতটে, পর্বতশিখরে, গভীর হ্রদের মধ্যে, উপরে যতদূর অবধি উঠা যায়, পৃথিবীর সর্বত্র এই রশ্মি বিদ্যমান। এই কস্মিক রশ্মি-জনিত যে কণিকা পাওয়া যায়, দেখা যায়, তাহার শক্তি অসাধারণ। অত্যন্ত দ্রুত আল্ফা-রশ্মির শক্তি ৪০ লক্ষ ইলেক্ট্রন-ভোল্ট্, এই কণিকার শক্তি প্রায় ১০০ কোটি ইলেক্ট্রন-ভোল্ট্। শক্তি এত বেশী হওয়ায় যে-চুম্বক দ্বারা ইহার গতিপথ বাকিয়া যাইবে তাহাকে প্রচণ্ড শক্তিশালী হইতে হইবে। সহস্রাধিক অ্যাম্পিয়ারের তড়িৎ-স্রোত পাঠাইয়া চুম্বক প্রস্তুত হইল এবং উহা দ্বারা ঐ সব কণিকার গতিপথ কিরূপ বাঁকে সি. টি. আর. উইলসনের কক্ষে তাহার চিত্র লওয়া হইতে লাগিল। এইরূপ এক যন্ত্রে ১৯৩২ সালে ২রা আগস্ট অ্যাণ্ডার্সন একটি ফটোগ্রাফে যে-রেখা দেখিলেন তাহা নিঃসংশয়রূপে এক নূতন পদার্থের অস্তিত্ব প্রকাশিত করিল। ইলেক্ট্রনের মতই উহা ভারী, তড়িৎ-পরিমাণ ইলেক্ট্রনেরই মত, তবে সে তড়িৎ নেগেটিভ নয়, পজিটিভ।
ইহার নাম দেওয়া হইল পজিট্রন।
প্রকৃতিতে যখন এই ক্ষণজীবী নূতন পদার্থের সন্ধান মিলিল তখন অনুসন্ধান চলিল কৃত্রিম উপায়ে ইহা সৃষ্ট হইতে পারে কি না। ১৯৩৪ সালে ম্যাডাম কুরীর কন্যা ইরিন ও তাঁহার স্বামী জোলিও দেখিলেন যে, পলোনিয়ম হইতে নির্গত আল্ফারশ্মি যখন বোরন, ম্যাগনিসিয়ম বা অ্যালুমিনিয়মের উপর পড়ে তখন উহারা অস্থায়ীভাবে তেজস্ক্রিয় হয় এবং উহা হইতে পজিট্রন নির্গত হয়। ইহার পর বহু তেজস্ক্রিয় পদার্থের সৃষ্টি হইতে লাগিল যাহা হইতে পজিট্রনের নির্গম লক্ষিত হইল।
যদিও এই পৃথিবীতে পজিট্রন দুলর্ভ ও ক্ষণস্থায়ী তথাপি নানা পর্যবেক্ষণ হইতে এই কথাটা জানা গেল যে, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপ্ত হইয়া বহুল পরিমাণে পজিট্রন বিরাজ করিতেছে এবং বিশ্বের উপাদান হিসাবে ইহা মোটেই নগণ্য নয়।
নিউট্রন ও নিউট্রিনো
১৯৩২ সালের প্রথম ভাগে স্যড্উইক বলিলেন যে, পরীক্ষায় তিনি এমন একটি পদার্থের অস্তিত্বের প্রমাণ পাইয়াছেন যাহার প্রোটনের মতই ভর আছে কিন্তু যাহা আদৌ তড়িৎ-যুক্ত নয়। ইহার নাম দেওয়া হইল নিউট্রন। অবিলম্বে বিভিন্ন পরীক্ষাগারে ইহার অনুসন্ধান চলিল এবং স্যড্উইকের কথা সমর্থিত হইল। যে ঘটনাবলী অনুসরণ করিয়া ইহা আবিষ্কৃত হয় তাহা এই।
১৯৩০ সালে বোটে এবং বেকার পলোনিয়ম হইতে নির্গত আল্ফা-রশ্মি লইয়া পরীক্ষা করিতে করিতে দেখিলেন যে, উহারা যদি বেরিলিয়ম বা বোরনের উপর পতিত হয় তবে ঐ বেরিলিয়ম বা বোরন হইতে একপ্রকার রশ্মি নির্গত হয় যাহার পদার্থ ভেদ করিবার ক্ষমতা অসাধারণ। রেডিয়ম ও তজ্জাতীয় তেজস্ক্রিয় পদার্থ হইতে উত্থিত গামা-রশ্মির এইরূপ ক্ষমতা থাকায় তখন উহা গামা-রশ্মি বলিয়া বিবেচিত হইল। কুরী জোলিও ও ওয়েবস্টার দেখিলেন যে, এই নূতন রশ্মির পদার্থের মধ্য দিয়া যাইবার ক্ষমতা গামা-রশ্মি অপেক্ষা অনেক বেশী। পরে কুরী জোলিও ও জোলিও লক্ষ্য করিলেন যে, এই রশ্মি যদি হাইড্রোজেন-যুক্ত কোনও পদার্থের উপর পড়ে তবে সেই পদার্থ হইতে প্রচণ্ডবেগে প্রোটন নির্গত হয়। বহু আলোচনার পর, স্থির হইল যে, ইহা একটি নূতন পদার্থ এবং সঙ্গে সঙ্গে ইহাও কল্পনা করিতে হইল যে, ইহা তড়িৎ-শূন্য। ঠিক করা হইল যে, একটি প্রোটন ও একটি ইলেকট্রনের সমাবেশে একটি নিউট্রন গঠিত। কিন্তু, একটি হাইড্রোজেন পরমাণু তো এইরূপই। ঠিক বটে, তবে পার্থক্য এই হইল যে, নিউট্রনে প্রোটন ও ইলেক্ট্রন খুব বেশী নিকটবর্তী হইয়া আছে; হাইড্রোজেন পরমাণুতে উহাদের মধ্যে যেব্যবধান এখানে ব্যবধান তাহার লক্ষ ভাগের একভাগ মাত্র। একটি পরমাণুর আকারের অনুপাতে নিউট্রন এত ক্ষুদ্র হওয়ায় ইহা স্বচ্ছন্দে সছিদ্র পরমাণুর মধ্য দিয়া চলিয়া যাইতে পারে; আর তড়িৎ শূন্য হওয়ায় ইহার গতিপথের উপর বাহিরের ইলেক্ট্রনের কোনও ক্রিয়া থাকে না। যেখানে একটি নির্দিষ্ট বেগের প্রোটন বায়ুর মধ্যে চলিয়া মাত্র এক ফুট যাইয়া থামিয়া পড়িবে, এই নিউট্রন সেখানে কয়েক মাইল পথ অতিক্রম করিয়া তবে তাহার শক্তি হারাইবে।
এইবার নিউট্রনের ভর বাহির করিবার জন্য বিবিধ পরীক্ষা হইল। নানা পরীক্ষা হইতে শেষ অবধি এই দাঁড়াইল যে, ইহার ভর প্রায় ১.০০৮৯৩৭ যেখানে হাইড্রোজেনের, ১.০০৮১৩। কিন্তু হাইড্রোজেন পরমাণু তো একজোড় প্রোটন-ইলেক্ট্রনের সমষ্টি। নিউট্রনও তাহাই। নিউট্রনে যে ভর কমিয়া গেল তাহার কারণ এই যে, নিউট্রন গঠনের সময় কিছুপরিমাণ ভরের হ্রাস হইয়াছিল এবং সেই কারণে ইহাদের বন্ধন খুব দৃঢ় হইয়া আছে। নিউট্রন তড়িৎ-শূন্য হওয়ায় উইলসন-কক্ষে জলবিন্দু উৎপন্ন করে না, কোনও চিত্র পাওয়া যায় না। ইহা যখন একটি অণুকে আঘাত করে তখন সেই অণু ধাক্কা খাইয়া পিছু হঠে এবং তাহা হইতে পরোক্ষভাবে আঘাতকারী নিউট্রনের অস্তিত্ব নির্ণীত হয়।
পূর্বে মনে করা হইত, পরমাণুর কেন্দ্রে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রোটন ও ইলেক্ট্রন আছে। এখন ধরা হইল, কেন্দ্রে ইলেক্ট্রন থাকে না, থাকে নিউট্রন ও প্রোটন। হাইড্রোজেনের কেন্দ্রকে (nucleus) মাত্র একটি প্রোটন আছে, লিথিয়ম কেন্দ্রকে দুটি প্রোটন দুটি নিউট্রন—এইরূপ বরাবর চলিয়া গিয়াছে।
এই সময় বিটা-রশ্মি লইয়া পরীক্ষা করিতে করিতে কতকগুলি ঘটনা দেখা গেল যাহা কোনও রকমে মীমাংসিত হয় না। এজন্য কোনও কোনও বিজ্ঞানী আর-একটি মূল পদার্থের অস্তিত্ব কল্পনা করিলেন এবং তাহার নাম দিলেন নিউট্রিনো। চিন্তা করা হইল যে, এই নিউট্রিনো তড়িৎ-শূন্য এবং ইহার ভর নাই বলিলেই হয়।
মিসোট্রন (মেসন)
সম্প্রতি আর-একটি মূল পদার্থ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে। পজিট্রনের ন্যায় ইহার প্রথম আবির্ভাব বিজ্ঞানীর কল্পনালোকে, খাতায় কলমে। গণনাটা এইরূপে দাঁড়াইল।
নিউট্রন আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীকে পরমাণুর গঠন সম্বন্ধে তাঁহার পূর্বধারণা পরিবর্তন করিতে হইল। অনেকরকম পরীক্ষা হইতে দেখা চারিটি প্রধান উপাদান।
![]()
ইলেকট্রন ও পজিট্রনের সৃষ্টি হইয়াছে; ইলেকট্রন একদিকে এবং পজিট্রন বিপরীত দিকে বাঁকিয়াছে।
![]()
নিউট্রন অক্সিজেন-অ্যাটমকে ভাঙিয়াছে। ডানদিকের লম্বা রেখা সম্বভত হিলিয়ম-অ্যাটমের জন্য এবং বামদিকের ছোট রেখাটি কার্বন-অ্যাটমের গতিরেখা।
![]()
একটি কস্মিক-রশ্মিকণা হইতে প্রায় দুই শত নূতন কণার সৃষ্টি; ইহারা ইলেকট্রন ও মিসট্রোন।
![]()
কসমিক-রশ্মি-নিউট্রনের আঘাতে একটি কেন্দ্রক চার টুকরা হইয়াছে।
বসু-বিজ্ঞান-মন্দিরের পরীক্ষায় প্রাপ্ত চিত্র
অধুনা কস্মিক রশ্মি লইয়া অনুসন্ধানে এমন সব রেখা মিলিন যাহা এইরূপ পদার্থ ভিন্ন অন্য কিছু দ্বারা ঘটিতেছে বলিয়া কল্পনা করা যায় না। মোটামুটি হিসাবে দেখা গেল, উহা একটি ইলেক্ট্রনের প্রায় ১৫০ গুণ ভারী। ইহার নাম দেওয়া হইল মিসোট্রন (মেসন)। ইহা ক্ষণজীবী আবার দেখা গিয়াছে, সব মেসন এক রকমের নয়— কম ভরের আছে, বেশি ভরেরও আছে; নেগেটিভ তো আছেই আবার পজিটিভও আছে, তড়িৎ-শূন্যও আছে। বিজ্ঞানী নিঃসংশয়রূপে আর-একটি মূল পদার্থের সন্ধান পাইলেন।
অতএব শেষ অবধি বিশ্বের মূল উপাদান হইল—ইলেক্ট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, পজিট্রন, মিসোট্রন (যেমন) এবং সম্ভবত নিউট্রিনো। কিন্তু এই কি শেষ কথা? ভবিষ্যৎ তাহার উত্তর দিবে। আর, বিজ্ঞানে শেষ কথা বলিয়া কিছু নাই। তবে ইহাদের সম্বন্ধে অন্য একটু কথা আছে।