বিশ্বের উপাদান/শক্তি ও তড়িৎ
শক্তি ও তড়িৎ
প্রথম যুগে বিজ্ঞানীরা স্থির করিলেন যে, বিশ্বের মূল উপাদান হইল বিভিন্ন রকমের পরমাণু। ইহারা বিভিন্ন গুণাবলির; ইহারা অবিভাজ্য। ইহাদের সংখ্যা দাঁড়াইল ১২টিতে।
তাহার পর পরীক্ষায় প্রমাণিত হইল যে, একটি পরমাণু হইতে বিযুক্ত হইয়া অতি ক্ষুদ্র কণিকা বাহির হয়; ইহারা নেগেটিভ তড়িৎযুক্ত। ইহাদের নাম দেওয়া হইল ইলেক্ট্রন। পজিটিভ তড়িৎযুক্ত ইহাদের জুড়িদারদের সন্ধান চলিল। সন্ধান মিলল। উহাদের নাম দেওয়া হইল প্রোটন। দেখা গেল, পরমাণুমাত্রই ইলেকট্রন-প্রোটনের সমষ্টি, অতএব পরমাণুকে আর বিশ্বের মূল বলা চলিল না। পরমাণুকে ভাগ করিয়া যাহা পাওয়া গেল সেই প্রোটন-ইলেক্ট্রন বিশ্বের মূল উপাদান বলিয়া পরিগণিত হইল।
পরে আর-কতকগুলি কণিকার সন্ধান মিলিল; তাহারা ইলেক্ট্রন প্রোটন নয়, অথচ ঐ জাতীয়। ইহারা বিশ্বে ছড়াইয়া আছে, তবে ইহাদের জীবিতকালের পরিমাণ অত্যন্ত কম, একটি সেকেণ্ডের অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। সেই কারণে পরীক্ষার বিপুল আয়োজন করিয়া ইহাদিগের সন্ধান মিলিল। ইলেক্ট্রন-প্রোটনের ন্যায় ইহাদিগকেও বিশ্বের উপাদান বলিয়া ধরা হইল।
ইহার পর অন্য একটি প্রশ্ন দেখা দিল। এই সব উপাদান তো অবিভাজ্য; কিন্তু ইহারা কি পরিবর্তনশীল? পজিট্রন প্রভৃতি তো প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হইতেছে, কিন্তু ইলেক্ট্রন প্রোটন? অন্য আর-কিছু হইতে কি ইলেক্ট্রন-প্রোটনের উৎপত্তি হইতেছে এবং অপর কিছুতে কি উহারা বিলীন হইয়া যাইতেছে? এ সম্বন্ধে বিজ্ঞানের সাক্ষ্য অনুসন্ধান করা যাক।
একটি পরমাণু যদি পূর্ণসংখ্যক ইলেক্ট্রন-প্রোটনের সমষ্টি হয় তবে ইহার আণবিক ওজন একজোড় ইলেক্ট্রন-প্রোটন অর্থাৎ একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর গুণিতক হইবে; উহাতে ভগ্নাংশ আসিতে পারে না। আচ্ছা, হিলিয়ামের আণবিক ওজন ধরা যাক, উহা ৪.০০৩৮৪। হাইড্রোজেনের আণবিক ওজন ১.০০৮১৩, হাইড্রোজেনের আণবিক ওজনের অর্থ একজোড় ইলেক্ট্রন-প্রোটনের ওজন। হিলিয়মে যদি ২ নিউট্রন + ২ প্রোটন + ২ ইলেক্ট্রন (বাহিরে) থাকে তবে হিলিয়মের আণবিক ওজন হওয়া উচিত ৪.০৩৪১৮; কিন্তু তাহা না হইয়া ৪.০০৩৮৪ হইল কিরূপে।
পদার্থ অবিনশ্বর, ইহার হ্রাসও নাই, বৃদ্ধিও নাই—বহু পূর্ব হইতে বিজ্ঞান এই মতবাদ গ্রহণ করিয়াছিল এবং ইহার উপর সে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। আইনস্টাইন বলিলেন, কথাটার একটু পরিবর্তন করিতে হইবে। তিনি বলিলেন যে, পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়; এতটুকু পদার্থের বিলোপে কত পরিমাণ শক্তির উদ্ভব হয় আইনস্টাইন তাহারও একটা হিসাব দিলেন। প্রচণ্ড এ শক্তি! ঠিক করা হইল যে, ইলেক্ট্রননিউট্রন-প্রোটন লইয়া হিলিয়ম-পরমাণু যখন প্রথম গঠিত হয় তখন একটুখানি পদার্থ (.০৩০৩২) বিনষ্ট হয়, সঙ্গে সঙ্গে বহুপরিমাণ শক্তি বাহির হইয়া যায়। হিসাবে দাঁড়াইল একটি হিলিয়ম-পরমাণুর উৎপত্তির জন্য পদার্থের বিলোপে যে শক্তির উদ্ভব হইবে, তাহা একটি তিন কোটি বিভবের (potential) তড়িৎ দ্বারা চালিত একটি ইলেক্ট্রনের শক্তির সমান।
সূর্যের এত তেজ কোথা হইতে আসিতেছে। এখনকার সিদ্ধান্ত এই, বস্তুর রূপান্তরে সূর্যের এই তেজ। হাইড্রোজেনের প্রোটন হিলিয়মে রূপান্তরিত হইতেছে, ফলে কিছু পদার্থ শক্তির রূপ লইতেছে।
এখন, সূর্যে যাহা হইতেছে পৃথিবীতে অনুরূপ ব্যাপার ঘটানো কি সম্ভব নয়? বিজ্ঞানী অ্যাটম বোমার সৃষ্টি করিলেন, বিশেষ রকমের অল্প একটু পদার্থ প্রচণ্ড শক্তি রূপে দেখা দিল।
এখন অন্য এক প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা যাক। পদার্থ শক্তিতে রূপান্তরিত হইতেছে, কিন্তু ইহার বিপরীত প্রক্রিয়া কি সম্ভব যে, শক্তি অন্তর্হিত হইতেছে এবং সেই অনুপাতে পদার্থের জন্ম হইতেছে? তাহাও হইতেছে; প্রমাণ মিলিল।
একজোড়া পজিট্রন-ইলেক্ট্রনের যে ভর তাহার তুল্যমূল্য রশ্মির শক্তি হইল দশ লক্ষ ইলেক্ট্রন-ভোল্ট। তাহা হইলে অন্তত এই পরিমাণের শক্তি না হইলে একজোড় পজিট্রন ইলেক্ট্রনের উদ্ভব সম্ভব নয়। কোথায় মিলিবে এ শক্তি? দেখা গেল, থোরিয়ম C” হইতে নির্গত গামা রশ্মির শক্তি ২৬ লক্ষ ইলেক্ট্রন-ভোল্ট। উইল্সনের কক্ষমধ্যেই এই গামা-রশ্মি নির্গত হইতে লাগিল এবং সঙ্গে সঙ্গে বিবিধ ফটোগ্রাফ লওয়া হইল। ফটোগ্রাফ হইতে দেখা গেল যে, পজিট্রন ও ইলেক্ট্রনের সৃষ্টি হইতেছে এবং শুধু তাহা নয়, গণনাটি আর একদিক হইতে বিস্ময়কররূপে মিলিয়া গেল। ২৬ লক্ষ ইলেক্ট্রন-ভোল্ট শক্তির ১০ লক্ষ যদি পজিট্রন-ইলেক্ট্রনের উৎপত্তিতে ব্যয়িত হয়, তবে অবশিষ্ট ১৬ লক্ষ ইলেক্ট্রন-ভোল্ট শক্তি ঐ পজিট্রন ইলেক্ট্রনের মধ্যে বণ্টন হইবে। পরীক্ষায় ইহাও প্রতিপন্ন হইল।
পদার্থ যদি শক্তির অভিব্যক্তি হয় তবে বিশ্বের মূল হিসাবে আর ইলেক্ট্রন প্রভৃতিকে ধরা কেন, কেবল শক্তিকেই তো বিশ্বের মূল উপাদান বলা চলে। অবশ্য, উহার উপর যোগ করিতে হয় তড়িৎ। শেষ অবধি তাহাই দাঁড়াইল।
এই ব্রহ্মাণ্ডের বিশালত্ব সম্বন্ধে একটা আখ্যান আছে। এক দেবদূত মানবকে ব্রহ্মাণ্ডের মধ্য দিয়া লইয়া যাইতেছিল। যতই অগ্রসর হয় সম্মুখে ততই সীমাহীন পথ দেখিয়া সেই যাত্রী থামিয়া পড়িল, কাঁদিতে কাঁদিতে দেবদূতকে বলিল, “আর আমি অগ্রসর হইব না; সম্মুখে কোনও সীমা দেখিতেছি না, এই সীমাহীনতা আমার মনকে পীড়া দিতেছে, আমার দেহ অবসন্ন হইয়া আসিতেছে, এই খানেই আমার যাত্রা শেষ করিব।” দেবদূত তখন অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিল, “ভগবানের এ রাজত্বের শেষ নাই, আবার দেখো, আরম্ভও নাই।”
এই ব্রহ্মাণ্ড! কিন্তু ইহা যতই বিরাট হোক, যতই কল্পনাতীত হোক, ইহার মূলে রহিল মাত্র দুইটি কথা—শক্তি ও তড়িং। পদার্থ শক্তির রূপান্তরিত অবস্থা মাত্র, কিন্তু শক্তির হ্রাসও নাই বৃদ্ধিও নাই; শক্তি অবিনশ্বর। আর তড়িৎও অবিনশ্বর।
এই অবিনশ্বরের পর্যায়ে অন্য দুইটা কথা আসিয়া পড়ে, তাহা হইল ভরবেগ (momentum) এবং কৌণিক ভরবেগ (angular momentum)।