বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/অতীতের আহ্বান

উইকিসংকলন থেকে

১২

অতীতের আহ্বান

১৭ই জানুয়ারি, ১৯৩১

 আড়াই হাজার বছর আগে পৃথিবীর চেহারাটা যেমন ছিল তার মোটামুটি একটা আন্দাজ আমরা পেয়েছি। খুব স্বল্পপরিসরের মধ্যে আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে হয়েছে। যে দেশগুলি অপেক্ষাকৃত উন্নত ছিল অথবা যাদের সম্বন্ধে ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্য নজির আছে, কেবল তাদের সম্বন্ধেই দু-এক কথা বলা হয়েছে। এই দেখো-না, মিশরের সভ্যতা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে কেবলমাত্র পিরামিড ও স্ফিংকস্-এর কথাই বললাম। আরও অনেক উল্লেখযোগ্য কথা ছিল যার সম্বন্ধে কিছুই বলা হয় নি। মিশরীয় সভ্যতা যে কত প্রাচীন তা একটা কথা থেকেই বুঝতে পারবে—আমরা যে সময়কার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করছি তখন মিশরের পড়তি অবস্থা, তার বহু আগেই ও দেশের গৌরবময় যুগের অবসান হয়ে গেছে। নোসসের সভ্যতায়ও তখন ভাঙন ধরেছে। আগের চিঠিতে তোমাকে চীন দেশের কথা বলেছি। সে যুগে চীনে খুব বড়ো বড়ো সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল; দীর্ঘকালের জন্য সমস্ত দেশকে একতাবদ্ধ করে এই সাম্রাজ্যগুলি চীনের প্রভূত উন্নতিসাধন করেছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ লিখনপদ্ধতির প্রবর্তন, রেশমের আবিষ্কার প্রভৃতির উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রাচীনকালে কোরিয়া ও জাপানের অবস্থা কেমন ছিল সে সম্বন্ধে ইতিপূর্বেই দু-এক কথা তোমাকে বলেছি। ভারতবর্ষের কথা বলতে গিয়ে এখানকার প্রাচীন সভ্যতার তিনটি স্তরের কথা উল্লেখ করেছি—প্রথমত সিন্ধু নদের তীরবর্তী মোহেঞ্জোদারো-যুগের সভ্যতা, দ্বিতীয়ত দ্রাবিড়সভ্যতা, ও তার পরবর্তী কালের আর্যসভ্যতা। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি আর্যদের লেখা কয়েকটি বিখ্যাত পুস্তকের কথাও বলেছি। আর্যরা কেমন করে প্রথম প্রথম উত্তর-ভারতে ছড়িয়ে পড়ে ও তার পর দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়দের সংস্পর্শে এসে ‘আর্য-দ্রাবিড়’ নামে একটা নূতন সংস্কৃতি ও সভ্যতা গড়ে তোলে—এ সবই তুমি শুনেছ। আর্য গ্রামগুলির প্রজাতান্ত্রিক ভিত্তি, গ্রাম থেকে কালক্রমে শহর ও রাষ্ট্রের উদ্ভব, তপোবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণতি—এইসব ঘটনার কথাও তোমাকে বলেছি। খুব অল্পের মধ্যে যদিও, তবু তোমাকে পারশ্য ও মেসোপটেমিয়ার বহু সাম্রাজ্যের উত্থানপতনের কথা এবং দারিয়ুস নামে পারশ্যের একজন রাজার সিন্ধুনদ অবধি রাজ্যবিস্তারের কথা বলেছি। প্যালেস্টাইনের কথা বলতে গিয়ে ইহুদিদের কথা এবং কেমন করে ছোট্ট একটি দেশের মুষ্টিমেয় লোক সারা জগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে—এ সবই তোমাকে জানিয়েছি। এই ইহুদিদের ডেভিড ও সলোমন নামে দুজন রাজার নাম বাইবেল গ্রন্থে আছে, ফলে তাঁরা এখনও স্মরণীয় হয়ে আছেন—যদিও তাঁদের চাইতে বড়ো বড়ো রাজার কথা লোকে ভুলে গেছে। নোসসের ধ্বংসস্তূপে নূতন আর্যসভ্যতার বনিয়াদ গঠন, গ্রীসের নগর-রাষ্ট্র, ভূমধ্যসাগরের ধারে ধারে গ্রীসের উপনিবেশ স্থাপন, রোমের ভাবী গৌরবের সূচনা, ইতিহাসের প্রাঙ্গণে রোমের প্রতিদ্বন্দীস্বরূপ কার্থেজ নগরের পদার্পণ—কোনো কথাই বাদ দিই নি।

 কিন্তু এ দেখা নিতান্তই উপর-উপর দেখা। এ ছাড়া আমি অন্য অন্য দেশের কথাও হয়তো বলতে পারতাম—এই যেমন উত্তর-ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব-এশিয়ার কয়েকটা দেশ। সেই প্রাচীন যুগেও দক্ষিণ ভারতের নাবিকেরা বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে মালয় প্রভৃতি দেশে গিয়েছিল। কত কথাই তো বলা যায়, কিন্তু সব কথা বলতে গেলে আর এগোনো যাবে না।

 ইতিপূর্বে যেসব দেশের কথা বলেছি সেগুলি সবই বহু প্রাচীন। সেই সুদূর অতীতে এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের যোগাযোগ ছিল খুবই কম; পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব বেশি হলে তো কথাই নেই। যারা একটু দুঃসাহসী তারা সাগর পার হয়ে বিদেশে যেত, আবার কেউ কেউ দেশদেশান্তর অতিক্রম করে চলে যেত ব্যবসাবাণিজ্যের উদ্দেশ্যে। এটা অবশ্য কালেভদ্রেই ঘটত, কারণ বিদেশে বিভুঁয়ে যাবার বিপদ ছিল ঢের। বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক সংস্থান সম্বন্ধে লোকের ধারণা খুব পরিষ্কার ছিল না। লোকের বিশ্বাস ছিল যে পৃথিবী একটা বিস্তীর্ণ সমতলভূমি—পৃথিবী যে গোল সে কথা আবিষ্কৃত হয় অনেককাল পরে। গ্রীসের লোকেরা চীন বা ভারত সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানত না, তেমনি আবার চীন ও ভারতের লোকেরাও ভূমধ্যসাগরের দেশগুলি সম্বন্ধে একপ্রকার অজ্ঞই ছিল।

 প্রাচীন কালের পৃথিবীর একটি মানচিত্র যদি সংগ্রহ করতে পারো তো খুব ভালো হয়। সে সময়কার পৃথিবী ও দেশবিদেশের বিবরণ প্রাচীন লেখকরা কিছু কিছু লিখে গেছেন। এইসব লেখায় বিভিন্ন দেশের আকার ও আয়তন সম্বন্ধে অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত কথা আছে। অতীতের পৃথিবীর যেসব মানচিত্র আজকাল তৈরি হয়, সেগুলি অতীতের ইতিহাস বোঝার পক্ষে খুবই দরকারি। হাতের কাছে এরকম মানচিত্র রাখা উচিত। মানচিত্র ছাড়া ইতিহাস বোঝা একপ্রকার অসম্ভব বললেই হয়। কেবল মানচিত্র কেন, পুরাতন কালের ঘরবাড়ি ভগ্নাবশেষ প্রভৃতির ছবি যা পাওয়া যায় সব-কিছুই ইতিহাস বোঝার পক্ষে বিশেষ প্রয়োজন। এই ছবিগুলিই এক হিসাবে ইতিহাসের জীর্ণ কঙ্কালকে রূপায়িত জীবন্ত করে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে। ইতিহাস থেকে সত্যকার শিক্ষা পেতে হলে অতীতের ঘটনাপ্রবাহকে দেখতে হবে চলচ্চিত্রের ছবির মতো—যেন মনে হবে সব চোখের উপর ভাসছে। ইতিহাস যেন একটা রোমাঞ্চকর অভিনয়ের মতো। এ অভিনয় একবার দেখতে বসলে চোখ ফেরানো যায় না। কখনও মিলনান্ত কখনও-বা বিয়োগান্ত নাটক অভিনীত হচ্ছে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে। যাঁরা অভিনয় করছেন তাঁরা হলেন প্রাচীন কালের ইতিহাসপ্রসিদ্ধ পুরুষ ও নারী।

 ছবি ও মানচিত্র দেখলে ইতিহাসের ঘটনাবলীর শোভাযাত্রা সবন্ধে আমাদের খানিকটা চোখ খুলে যায়। প্রত্যেক ছেলেমেয়ের হাতে এগুলি দেওয়া উচিত। এর চেয়ে অনেক ভালো হয় যদি তারা চক্ষে অতীতের ধ্বংসাবশেষগুলি দেখে আসতে পারে। সব-কিছু দেখা সম্ভব নয়, কারণ এগুলি ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু একটু নজর দিলে আমাদের নাগালের মধ্যেই কিছু কিছু দেখতে পাওয়া যেতে পারে। তা ছাড়া বড়ো বড়ো যাদুঘরেও এই ধরনের জিনিষ কিছু কিছু সংগ্রহ করে রাখা থাকে। অতীতের সাক্ষ্যস্বরপ অনেক ধ্বংসাবশেষ ভারতে দেখা যায়। খুব প্রাচীন কালের নিদর্শন অবশ্য মোহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা ছাড়া অন্য কোনো জায়গায় এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নি। এমনও হতে পারে যে এই গ্রীষ্মপ্রধান দেশের প্রচণ্ড তাপের ফলে অনেক কিছুই শুকিয়ে গুঁড়ো হয়ে ধুলো হয়ে গেছে। এ ধারণাটা কেবল আংশিকভাবে সত্য। প্রাচীন কালের চিহ্নস্বরূপ অনেক-কিছু জিনিষ এখনও মাটির তলায় আত্মগোপন করে আছে; সেগুলি আজ পর্যন্ত খুঁড়ে বার করা হয় নি। এইসব ধ্বংসাবশেষ অনুশাসন ইত্যাদি খুঁড়ে বার করা হলে পর দেখবে আমাদের দেশের প্রাচীন ইতিহাসের বই যেন পাতার পর পাতা খুলে যাচ্ছে। ইঁটপাথরের পাতায় দেখতে পাবে আমাদের পূর্বাপুরুষদের কীর্তিকাহিনী।

 তুমি তো দিল্লি শহরের আশেপাশে কিছু কিছু পুরোনো ঘরবাড়ি প্রভৃতির ধ্বংসাবশেষ দেখেছ। আবার যখন দিল্লি গিয়ে এগুলি দেখবে তখন বিগত দিনের কথা ভেবে দেখো—মনে হবে যেন সেই প্রাচীন কালে ফিরে গেছে। এই ধ্বংসাবশেষগুলি যে-কোনো ইতিহাসের বইয়ের চাইতে অনেক বেশি শিক্ষা দিতে পারে। সেই মহাভারতের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত দিল্লি শহরে বা তার আশেপাশে কত মানুষ বসবাস করে এসেছে। কত লোক কত নামে ডেকেছে এই শহরকে: ইন্দ্রপ্রস্থ, হস্তিনাপুর, তুঘ্‌লকাবাদ, শাজাহানাবাদ এবং আরও কত নামে। শোনা যায়, যমুনা নদীর ধারার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সাত-সাতটা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় এই একই দিল্লি শহর পত্তন করা হয়। আজ যে নূতন দিল্লি বা রায়সিনা শহর দেশের বর্তমান শাসনকর্তাদের হুকুমে নির্মিত হয়েছে, এক হিসাবে তাকে অষ্টম দিল্লি বলা চলে। কত সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল এই দিল্লি শহর, কত সাম্রাজ্যের উত্থানপতন ঘটেছে এই দিল্লিতে!

 এ দেশের প্রাচীনতম শহর বারাণসী বা কাশীতে গিয়ে একবার তার অস্ফুট কথাগুলি কান পেতে শুনো দেখি। কাশী তোমাকে স্মরণাতীত কালের খবর দেবে। বলবে, তার চোখের সামনে কত সাম্রাজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, তবু সে টিঁকে আছে। বলবে, বুদ্ধ এসেছিলেন বারাণসীতে তাঁর নূতন ধর্মের বাণী নিয়ে। আর বলবে লক্ষ লক্ষ লোকের কথা—যারা যুগে যুগে পুণ্যধামে এসেছে শান্তি ও সান্ত্বনার আশায়। পলিতকেশা, ন্যুব্জদেহা জীর্ণচীরপরিহিতা বৃদ্ধা এই কাশী—যুগযুগান্তের সঞ্চিত শক্তিতে এখনও শক্তিমতী এই প্রাচীনা নগরী। এখনও মানুষের মনোহরণ করে এই আশ্চর্য কাশী, তার চোখে যেন প্রাচীন ভারত জ্বল্‌জ্বল্ করে, তার গঙ্গার কলধ্বনি যেন অতীতের বিস্মৃত কণ্ঠের সংগীত যুগ যুগ বহন করে নিয়ে চলেছে।

 অত দূরে নাই-বা গেলে, আমাদের এলাহাবাদ অথবা প্রয়াগ নগরীর অশোকস্তম্ভের উপর যে অনুশাসন খোদাই করা আছে তার সামনে একটিবার দাঁড়াও—মনে হবে যেন দু হাজার বছরের ব্যবধান থেকে প্রিয়দর্শীর কণ্ঠ ভেসে আসছে।