বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/অতীতের স্মৃতি
১২৩
অতীতের স্মৃতি
১৯শে জানুয়ারি, ১৯৩৩
সম্প্রতি দুখানা বই পড়লাম, ভারি ভালো লাগল এবং বড়োই ইচ্ছে হচ্ছিল তুমিও তার একটু ভাগ নাও। দুটি বইই একজন ফরাসি ভদ্রলোকের লেখা, এঁর নাম René Grousset (রেনে গ্রুসে), প্যারিসে Musée Guimet (মিউসে গুইমে)-এর ইনি সংরক্ষক বা তত্ত্বাবধায়ক। প্রাচ্য, বিশেষ করে বৌদ্ধ-শিল্পকলার এই চমৎকার যাদুঘরটি তুমি কি দেখেছ? আমার সঙ্গে তুমি গিয়েছিলে বলে তো মনে পড়ছে না। মঁসিয়ে গ্রুসে প্রাচ্যদেশের অর্থাৎ এশিয়ার দেশগুলোর সভ্যতা নিয়ে একটি আলোচনা লিখেছেন। বইটির চারটি খণ্ড; এক-একটি খণ্ডে যথাক্রমে ভারতবর্ষ, মধ্য-প্রাচ্য (অর্থাৎ পশ্চিম এশিয়া ও পারশ্য, চীন ও জাপানের কথা বলা হয়েছে। শিল্পকলাতেই তাঁর উৎসাহ; শিল্পকলার বিভিন্ন ধারা কীভাবে পরিণতি লাভ করল সেই দিক থেকেই প্রধানত তিনি আলোচনা করেছেন; অনেকগুলো সুন্দর সুন্দর ছবিও দিয়েছেন বইয়ে। যুদ্ধবিগ্রহ আর রাজারাজড়াদের কূটচক্রের গল্প মুখস্থ করার চেয়ে এই রকমের ইতিহাস পড়ার আনন্দও অনেক বেশি, শিক্ষাও এতেই বেশি হয়।
আমি এখন পর্যন্ত বইটির মোটে দুটি খণ্ড পড়েছি, ভারতবর্ষ এবং মধ্য-প্রাচ্য নিয়ে লেখা খণ্ডদুটি। আমার খুবই ভালো লেগেছে পড়ে। চমৎকার সব প্রাসাদ, অপূর্ব প্রস্তরমূর্তি, আশ্চর্য সুন্দর প্রাচীরচিত্র, আর ছবি—এদের প্রতিলিপি দেখতে দেখতে দেরাদুন জেল ছেড়ে বহু দূরে চলে গেছি আমি, বহু দূরের দেশে, বহু দূর অতীত কালে।
অনেক দিন হল তোমাকে উত্তর-পশ্চিম-ভারতে সিন্ধু নদের উপতাকায় আবিষ্কৃত মহেঞ্জোদারো আর হরপ্পার কথা লিখেছিলাম; এরা যে প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ সে বেঁচে ছিল পাঁচ হাজার বছর আগে। দূর অতীতের সেই দিনে, যখন মহেঞ্জোদারোতে জীবন্ত মানুষ বাস করত, কাজ করত, খেলা করে বেড়াত, পৃথিবীতে তখন আরও অনেকগুলো সভ্যতার উদয় হয়েছিল। এদের সম্বন্ধে আমাদের প্রায় কিছুই জানা নেই; আমরা মাত্র দেখি কতকগুলো ধ্বংসস্তূপ, এশিয়া আর মিশরের বিভিন্ন স্থানে এগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে। হয়তো আরও বেশি জায়গাতে আরও বেশি করে খুঁড়লে আমরা এইরকম আরও অনেক ধ্বংসস্তূপের সন্ধান পাব। কিন্তু এটুকু আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি, তখনকার দিনেও বড়ো বড়ো সভ্যতার প্রতিষ্ঠা পৃথিবীতে হয়েছিল—মিশরে নীলনদের তীরে; ক্যাল্ডিয়াতে (মেসোপটেমিয়া); সেখানে এলাম-রাজ্যের রাজধানী ছিল সুসা; পূর্ব-পারশ্যের পার্সিপোলিসে; মধ্য-এশিয়ার তুর্কিস্তানে; চীনে পীত-নদ বা হোয়াঙ-হো’র তীরভূমিতে।
এই সময়ে তামার ব্যবহার প্রথম শুরু হয়েছে; মাজা-পাথরের অস্ত্রশস্ত্রের যুগে চলে যাচ্ছে। মিশর থেকে চীন অবধি বিস্তৃত এইসমস্ত স্থানগুলোতেই সভ্যতা সম-স্তরে উন্নীত হয়েছিল বলে মনে হয়। বাস্তবিক আগাগোড়া সমস্ত এশিয়া জুড়েই একটামাত্র বিশেষ রকমের সভ্যতা ছড়িয়ে আছে দেখলে বিস্ময় লাগে; এ দেখে বোঝা যায়, সভ্যতার এই বিভিন্ন কেন্দ্রগুলো মোটেই স্ব-সর্বস্ব ছিল না, এরা সকলেই ছিল পরস্পর সম্পৃক্ত। কৃষিব তখন খুব আদর, গৃহপালিত পশু রাখা হত, কিছু কিছু বাণিজ্যও চলত। লেখার বিদ্যা তখন আবিষ্কৃত হয়েছে, কিন্তু সেসব প্রাচীন চিত্রলিপির পাঠোদ্ধার আমরা এখনও করতে পারি নি। বহু দূর-দূরে বিস্তৃত সব অঞ্চলে একই প্রকারের যন্ত্রপাতি পাওয়া গেছে; তাদের শিল্পকলার সৃষ্ট বস্তুগুলোও আশ্চর্য রকম এক প্রকারের। বিশেষ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তখনকার চিত্রিত হাঁড়িকুড়ি এবং নানারকম নক্শা আর কারুকার্যশোভিত সুন্দর সুন্দর পাত্র। এই চিত্রিত হাঁড়িকুড়ি এত বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে যে, এই সমগ্র যুগটিরই নাম দেওয়া হয়েছে ‘চিত্রিত পাত্রের সভ্যতা’। এ ছাড়া, সোনা-রূপোর গয়না ছিল, শ্বেতপাথর আর মর্মর পাথরের পাত্র ছিল, এমনকি সূতি-কাপড়ও ছিল। মিশর থেকে সিন্ধু নদের তীর এবং চীন পর্যন্ত ছড়ানো প্রাচীন সভ্যতার এই কেন্দ্রগুলির প্রত্যেকটিরই নিজস্ব কিছু-না-কিছু একটা বিশেষত্ব ছিল। প্রত্যেকে এরা স্বাধীন ভাবেই নিজের জীবনযাত্রা নির্বাহ করছিল, তবু একটি সার্বজনীন এবং পরস্পর সম্পৃক্ত সভ্যতার সূত্র এদের সকলকে যেন একত্র গেঁথে রেখেছিল।
এ হচ্ছে মোটামটি প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগেকার কথা। কিন্তু এ কথা স্পষ্টই বোঝা যায়, এই-যে সভ্যতা, এটা অনেকখানি উন্নত ধরনের জিনিষ, এবং পরিণত হয়ে এই রূপ পেতে এর নিশ্চয়ই কয়েক হাজার বছর লেগেছিল। নীল-উপতাকা এবং ক্যাল্ডিয়ার সভ্যতার ইতিহাস অন্তত আরও দু হাজার বছর আগে থেকে পাওয়া যায়; স্থানগুলির সভ্যতার বয়সও খুব সম্ভবত এদের মতোই ছিল।
মহেঞ্জোদারোর কাল প্রায় খৃষ্টপূর্ব তিন হাজার বছরের মতো। প্রথম তাম্রযুগের সেইসমস্ত একরূপ অথচ বহুদূরবিস্তৃত সভ্যতার মধ্যে প্রাচ্যের চারটি সভ্যতার প্রকৃতি আলাদা, এগুলো পৃথক রূপেই গড়ে উঠেছিল। এই চারটি হচ্ছে মিশর, মেসোপটেমিয়া, ভারতবর্ষ ও চীনের সভ্যতা। এই শেষোক্ত সময়েই মিশরের বিখ্যাত পিরামিডগুলো এবং গিজের বিরাট স্ফিঙ্কস্ মূর্তি তৈরি হয়। তারও পরে এল মিশরে থিব্সের যুগ, যখন থিব্সের সাম্রাজ্য বড়ো হয়ে উঠল। সেটা হচ্ছে খৃষ্টপূর্ব ২০০০ সন এবং তার পরের কথা। এই সময়ে অনেক আশ্চর্য-সুন্দর প্রস্তরমূর্তি এবং প্রাচীরচিত্র তৈরি হয়। শিল্পকলার এটা ছিল খুব বড়ো একটা পুনরুজ্জীবনের যুগ। এরই কাছাকাছি সময়ে লাক্সরের বিরাট মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল। থিব্সের ফ্যারাওদের অন্যতম ছিলেন তুতানখামেন; এঁর নামটা মনে হয় যেন সবাইই জানে, এঁর সম্বন্ধে আর-কিছু না জানলেও।
ক্যাল্ডিয়ার দুটি জায়গাতে বেশ পরাক্রান্ত এবং সুসংহত রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল, এদের নাম—সুমের আর আক্কাদ। ক্যাল্ডিয়ার বিখ্যাত শহর ছিল উর, মহেঞ্জোদারোর যুগেই এখানে শিল্পকলার অতি সুন্দর সব বস্তু তৈরি হচ্ছিল। প্রায় সাত শো বছর আধিপত্য করবার পর উরের পতন হয়। এবার নূতন রাজা হল বেবিলোনীয়রা—এরা জাতে সেমিটিক (অর্থাৎ, ইহুদি বা আরবদের জাত ভাই), সিরিয়া থেকে এসেছিল। বাবিলন-শহরকে কেন্দ্র করে এবার একটি নূতন সাম্রাজ্য গড়ে উঠল, বাইবেলে এর বহু উল্লেখ পাওয়া যায়। এই সময়ে সাহিত্যের একটা নূতন প্রেরণা আসে; অনেক মহাকাব্য রচিত ও প্রচারিত হয়। এই মহাকাব্যগুলোতে সৃষ্টির আরম্ভ এবং বিরাট একটা জলপ্লাবনের বর্ণনা আছে। অনেকে মনে করেন, এদের এই গল্পগুলোকে অবলম্বন করেই বাইবেলের গোড়ার কটি অধ্যায় লেখা হয়েছিল।
তার পর বাবিলনেরও পতন হল। বহু শতাব্দী পরে (প্রায় খৃষ্টপূর্ব ১০০০ সন এবং তার পর থেকে) আসিরীয়দের আবির্ভাব হল। এরা একটি সাম্রাজ্য স্থাপন করল, তার রাজধানী হল নিনেভে। বড়ো আশ্চর্য জাতি ছিল এরা। বর্বরতা আর নিষ্ঠুরতার এদের সীমা ছিল না। এদের সমস্ত শাসনকার্যটাই চলত নিছক বিভীষিকার জোরে; হত্যা এবং ধ্বংসলীলার দ্বারা এরা সমস্ত মধ্য-প্রাচ্য জুড়ে একটা বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। এরাই ছিল সেই যুগের সাম্রাজ্যবাদী। অথচ এই বন্য পশুর মতো হিংস্র জাতিটাই আবার অনেক দিকে ছিল অত্যন্ত সভ্য! নিনেভে-শহরে প্রকাণ্ড একটি পুস্তকাগার করেছিল এরা, সেখানে তখনকার দিনের সমস্তরকম জ্ঞানবিজ্ঞানেরই বই এনে জড়ো করা হয়েছিল। সে পুস্তকাগারে কাগজের তৈরি পুঁথি ছিল না, এ কথা অবশ্য বলাই বাহুল্য; আজকাল আমরা বই বলতে যা বুঝি তাও কিছু ছিল না সেখানে। তখনকার যুগে বই লেখা হত শিলা-ফলকের উপর। নিনেভের সেই প্রাচীন পুস্তকাগার থেকে সংগ্রহ করা এই রকমের হাজার হাজার শিলালিপি এখন লণ্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়মে এনে রাখা হয়েছে। এর অনেকগুলো পড়তে রীতিমতো গা শিউরে ওঠে; রাজারা তাতে জ্বলন্ত বর্ণনা দিচ্ছেন, শত্রুর উপর কীরকম নিষ্ঠুর অত্যাচার চালিয়েছেন এবং তাই দেখে তিনি কী বিপুল আনন্দ পেয়েছেন!
ভারতবর্ষে আর্যরা আসেন মহেঞ্জোদারো যুগের পরে। এঁদের সেই প্রথম যুগের কোনো ধংসস্তূপ বা প্রস্তরমূর্তি আজও আবিষ্কৃত হয় নি; কিন্তু এঁদের সবচেয়ে বড়ো স্মৃতিস্তম্ভ হচ্ছে এঁদের প্রাচীন পুঁথিগুলো— বেদ ইত্যাদি। সেই পুঁথি থেকেই আমরা ভারতবর্ষের সমতলভূমিতে আগন্তুক এই ভাগ্যবান যোদ্ধাদের মনোবৃত্তির নিগূঢ় পরিচয় পাই। এই বইগুলো খুব জোরালো প্রাকৃতিক-কাব্যে ভরা; এদের দেবতারা পর্যন্ত প্রকৃতি-দেবতা। এদের শিল্পকলার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তার উপরে প্রকৃতির প্রতি এই আকর্ষণের প্রভাব গভীর হয়ে পড়বে, এটা খুবেই স্বাভাবিক। এদের শিল্পকলার যেসব ধ্বংসাবশেষ তাবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ক’টির মধ্যে একটি হচ্ছে, সাঁচির তোরণদ্বার। এটি ভূপালের কাছে অবস্থিত। এটি নির্মিত হয়েছিল প্রথম বৌদ্ধযুগে; এই তোরণস্তম্ভের উপরে যেসব সুন্দর ফুল পাতা আর জীবজন্তু খোদাই করা রয়েছে তা দেখলেই বোঝা যায়, এটি যাদের তৈরি সেই শিল্পীরা প্রকৃতিকে কতখানি ভালোবাসতেন, কতখানি মন দিয়ে উপলব্ধি করতেন।
তার পর এল উত্তর-পশ্চিম থেকে গ্রীকদের প্রভাব। তোমার মনে আছে, আলেকজাণ্ডারের কালে গ্রীকদের সাম্রাজ্য একেবারে ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত এসে পৌঁচেছিল। তার পরে আবার সীমান্ত-প্রদেশে আবির্ভূত হল কুশানদের সাম্রাজা, এরও উপরে গ্রীকদের প্রভাব খুব স্পষ্ট ছিল। বুদ্ধ ছিলেন মূর্তিপূজার বিরোধী। তিনি কখনও নিজেকে দেবতা বলে জাহির করেন নি বা পুজো পেতে চান নি। পুরোহিতবৃত্তির ফলে সমাজে যেসমস্ত অন্যায়ের প্রাদুর্ভাব হয়েছে, তিনি চেয়েছিলেন তার হাত থেকে সমাজকে মুক্ত করতে; তিনি সংস্কারক; তাঁর চেষ্টা ছিল, পতিত এবং দুর্গতকে তিনি টেনে তুলবেন। বারাণসীর কাছে ইসিপতন বা সারনাথে তিনি তাঁর প্রথম ধর্মোপদেশ দেন; সে দিন তিনি বলেছিলেন, “আমি এসেছি জ্ঞানহীনকে জ্ঞান দ্বারা তৃপ্ত করতে...... প্রকৃত মানুষের নাম সার্থক হবে শুধু তখনই যখন সে প্রাণীর কল্যাণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করবে, দুস্থকে সান্ত্বনা দান করবে।...... আমার ধর্ম করুণার ধর্ম; এইজন্যই জগতের সুখী ব্যক্তিরা একে কঠিন বলে মনে করে। মুক্তির পথ সকলের জনাই মুক্ত রয়েছে। চণ্ডালের সম্মুখে মুক্তির পথ ব্রাহ্মণ বন্ধ করে রেখেছে, সেই চণ্ডালের মতোই সেও কি নারীর গর্ভজাত নয়? হস্তী যেরূপ তৃণনির্মিত কুটির ভেঙে ফেলে, সেইরূপে তোমার প্রযুক্তিগুলোকে ধ্বংস করো....... অন্যায়ের একমাত্র প্রতিকার হচ্ছে—ধীর স্থির বাস্তব চেতনা।” এমনি করে বুদ্ধ সদাচরণের এবং জীবনের পথের নির্দেশ দিয়ে গেলেন, কিন্তু মূর্খ শিষ্যের রীতিই হচ্ছে, তারা গুরুর কথার প্রকৃত অর্থ বোঝে না; বুদ্ধেরও অনেক শিষ্য তাঁর বর্ণিত আচরণের বাইরের নীতিগুলোকেই পালন করতে লাগল, তার মধ্যের অর্থ তলিয়ে দেখলে না। বুদ্ধের উপদেশ তারা পালন করল না, তাঁকেই দেবতা বানিয়ে পূজা শুরু করল। কিন্তু তখনও বুদ্ধের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয় নি, তাঁর প্রতিকৃতি গড়া হয় নি।
তার পর এসে পৌঁছল গ্রীস এবং অন্যান্য হেলেনিক দেশের অধিবাসীদের চিন্তাধারা। এইসব দেশে দেবতাদের খুব সুন্দর প্রস্তরমূর্তি গড়া হত। সেইগুলোকে পূজা করা হত। ভারতের উত্তরপশ্চিমে গান্ধার-প্রদেশে এদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল, এইখানে পাথর খোদাই করে শিশ-বুদ্ধের মূর্তি রচনা করা হল। গ্রীকদের নিজেদের ক্ষুদ্র অথচ মনোহারী দেবতা কিউপিডের মতো হল তাঁর রূপ, অথবা হল পরের যুগে শিশু-খৃষ্টের মূর্তি যেমন করে গড়া হয়েছিল—ইতালীয়রা তাঁর নাম দিয়েছিল Sacro Bambine (স্যাক্রো ব্যামবিনো) এইভাবে বৌদ্ধধর্মের মধ্যে মূর্তি পূজা শুরু হল; ক্রমেই এ বাড়তে বাড়তে শেষে এমন অবস্থা হল যে, প্রত্যেক বৌদ্ধমন্দিরই বুদ্ধের অসংখ্য মুর্তিতে ভরে উঠল।
ভারতীয় শিল্পকলার উপরে ইরান বা পারশ্যের প্রভাবও এসে পড়েছিল। বৌদ্ধদের জাতক এবং হিন্দুদের সমৃদ্ধ পৌরাণিক আখ্যানের মধ্যে ভারতীয় শিল্পীরা অফুরন্ত বিষয়বস্তুর সন্ধান পেয়ে গেলেন; অন্ধ্রদেশে অমরাবতী, বোম্বাইর কাছে এলিফাণ্টা গুহা, অজন্তা ও ইলোরা, এবং এমনি আরও অনেক জায়গাতে প্রস্তরলিপি এবং ছবিতে জাতক এবং পুরাণের এইসব প্রাচীন কাহিনী এখনও অমর হয়ে রয়েছে। এই জায়গাগুলো আশ্চর্য রকম দেখবার মতো, আমার মনে হয় স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী প্রত্যেকেরই এর অন্তত কিছুটা দেখে আসা উচিত।
সমুদ্র পার হয়ে ভারতের পৌরাণিক কাহিনী চলে গেল বৃহত্তর ভারতে। জাভার বোরোবুদুরে অনেকগুলো ধারাবাহিক প্রস্তরনির্মিত প্রাচীরচিত্রে বুদ্ধের সমস্ত ইতিহাসটা এঁকে রাখা হয়েছে। আঙ্কোর ভ্যাটে ধ্বংসাবশেষের মধ্যে এখনও অনেক সুন্দর মূর্তি পাওয়া যায়। সেগুলোকে দেখলে মনে পড়ে আট শো বছর আগেকার কথা, যখন পূর্ব-এশিয়াতে এই নগরীটির নাম ছিল ‘সমৃদ্ধিশালী আঙ্কোর’। এই মূর্তিগুলোর ভাব অতি প্রশান্ত এবং প্রাণবস্তুতে পরিপূর্ণ; এদের অনেকের মুখে একটি অদ্ভুত রহস্যময় হাসি দেখতে পাওয়া যায়, তার নামই হয়ে গেছে ‘আঙ্কোরের হাসি’। মূর্তিগুলোর মধ্যে নানারকম জাতির প্রতিকৃতি আছে, কিন্তু এই হাসিটি সর্বত্রই সমানভাবে ফুটে রয়েছে, একে দেখতে কখনই ক্লান্তি লাগে না।
শিল্পকলা হচ্ছে কোনো একটি যুগের জীবনযাত্রা এবং সভ্যতার অতি সত্য প্রতিবিম্ব। ভারতের সভ্যতায় যখন প্রাণের প্রাচুর্য ছিল, তখন সে অপূর্ব সুন্দর সব বস্তু সৃষ্টি করেছে, তার শিল্পকলার সমৃদ্ধি ঘটেছে, সে কলার প্রতিধ্বনি বহুদূর বিদেশেও গিয়ে পৌঁচেছে। তার পরে আবার তার জীবনযাত্রার শৈথিল্য, ধ্বংস; দেশটাই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল, তার সঙ্গে সঙ্গে তার শিল্পকলারও ঘটল অধঃপতন। শক্তি এবং প্রাণ হারিয়ে গেল তার, তখন তার ক্রমেই বেড়ে উঠল খুঁটিনাটি জবড়জঙের বোঝা, কখনও-বা সে হয়ে উঠল একেবারেই অস্বাভাবিক। মুসলমানরা আসবার ফলে আবার সে একটু গা-নাড়া দিয়ে জেগে উঠল; অধঃপতিত ভারতীয় শিল্প কেবল অলংকারবাহুল্য নিয়েই মত্ত হয়ে ছিল, মুসলমানদের সঙ্গে সঙ্গে যে নূতনতর প্রভাব দেশে এল সে তাকে সেই বাহুল্য থেকে মুক্তি দিল। তখনকার সৃষ্টিতে পিছনে থাকল ভারতের পুরোনো অংশ, কিন্তু তার বাইরের রূপ সহজ এবং শোভন হয়ে উঠল, আরব এবং পারশ্যের নবাগত সজ্জা ধারণ করে। প্রাচীন কালে ভারত থেকে হাজার হাজার ওস্তাদ শিল্পী পশ্চিম এশিয়া মধ্য-এশিয়ায় গিয়েছিলেন। এবার পশ্চিম-এশিয়া থেকে স্থপতি আর চিত্রকররা এলেন ভারতবর্ষে। পারশ্য এবং মধ্য-এশিয়াতে তখন শিল্পকলার একটা পুনরুজ্জীবন হয়েছে; কন্স্টাণ্টিনোপ্লে বড়ো বড়ো স্থপতিরা বিরাট সব প্রাসাদ তৈরি করছেন। এইটেই ছিল আবার ইতালিরও পুনরুজ্জীবনের প্রথম যুগ, সেখানে তখন অপূর্ব প্রতিভাশালী বহু শিল্পী চমৎকার সুন্দর চিত্র এবং মূর্তি সৃষ্টি করছেন।
তখনকার দিনে তুর্কির বিখ্যাত স্থপতি ছিলেন সিনান, তাঁর প্রিয় শিষ্য ইউসুফকে বাবর এ দেশে নিয়ে এলেন। ইরানের প্রসিদ্ধ চিত্রকর ছিলেন বিহ্জাদ, তাঁর কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে এসে আকবর তাঁর রাজকীয় চিত্রকর করে রাখলেন। ভারতের স্থাপত্যে এবং চিত্রশিল্পে পারশ্যের প্রভাব ক্রমেই পরিপুষ্ট হয়ে উঠল। আগের একটি চিঠিতে তোমাকে মোগল-ভারতের এই হিন্দু-মুসলিম শিল্পের সৃষ্ট কয়েকটি বড়ো বড়ো প্রাসাদের কথা বলেছি, তুমিও এদের অনেকগুলো দেখেছ। এই ভারতীয়-পারশিক শিল্পের সবচেয়ে বড়ো গৌরবের সৃষ্টি হচ্ছে তাজমহল। বহু বিখ্যাত শিল্পী একত্র হয়েছিলেন একে গড়ে তুলতে। শোনা যায়, এর প্রধান স্থপতি ছিলেন ওস্তাদ ইশা নামক একজন তুর্কি বা পারশ্যবাসী; বহু ভারতীয় স্থপতিও তাঁর সহকারী ছিলেন। এর ভিতরকার কারুকার্য নাকি সম্পন্ন করেছিলেন কয়েকজন ইউরোপীয় শিল্পী, বিশেষ করে একজন ইতালীয় শিল্পী। বিভিন্ন জাতির ও রীতির এতজন শিল্পী একত্রে একে তৈরি করেছেন, তবু কিন্তু এর কোথাও কোনো অসংলগ্নতা বা অমিল নেই। বিভিন্ন রকমের সমস্ত রীতি একত্র মিলে গিয়ে একটা অপূর্ব সামঞ্জস্য সৃষ্টি করেছে, এইটেই আশ্চর্য! কত দেশের কত লোকই যে তাজের নির্মাণে সহায়তা করেছে তার হিসাব নেই। কিন্তু এর মধ্যেও যে দুটি দেশের প্রভাব বড়ো হয়ে রয়েছে সে হচ্ছে পারশ্য এবং ভারত; মঁসিয়ে গ্রুসে তাই একে বলেছেন “ভারতের দেহে ইরানের আত্মার আবির্ভাব”।