বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/অশোকের সময়ের পৃথিবী
২৫
অশোকের সময়ের পৃথিবী
৩১শে মার্চ, ১৯৩২
আমরা দেখেছি, অশোক দূরদেশে ধর্মযাজক ও দূত পাঠাতেন এবং ভারতের সঙ্গে এসব দেশের অবাধ সহযোগিতা ছিল। অবশ্য তোমার মনে রাখতে হবে যে, তখনকার যোগাযোগ এবং বাণিজ্য এখনকার মতো ছিল না। এখন ট্রেনে, স্টীমারে উড়োজাহাজে মালপত্র পাঠানো খুবই সহজ। কিন্তু সেই অতীতকালে প্রত্যেকটি যাত্রাই ছিল সুদীর্ঘ সংকটময় এবং দুঃসাহসী, কষ্টসহিষ্ণু মানুষ ছাড়া কেউ সে যাত্রার ভার নিত না। কাজেই তখনকার ও এখনকার বাণিজ্যে তুলনাই হতে পারে না।
অশোক কোন্ ‘সুদূর দেশের’ নির্দেশ দিয়েছেন? তাঁর সময়ে পৃথিবীর আকৃতি ছিল কীরকম? মিশর ও ভূমধ্যসাগরের উপকূল ব্যতীত আফ্রিকার কিছুই জানি না। ইউরোপের উত্তর, মধ্য ও পূর্বাঞ্চল সম্বন্ধেও আমরা অল্পই জানি। আমেরিকার সম্বন্ধেও সবই অজ্ঞাত আমাদের কাছে। কিন্তু বহু লোক আছেন যাঁরা মনে করেন বহু পূর্ব থেকেই আমেরিকায় উন্নত সভ্যতার বিকাশ হয়েছিল। বহুযুগ পরে পঞ্চদশ শতাব্দীতে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছেন বলে জানা যায়। আমরা জানি, দক্ষিণ আমেরিকার পেরুতে ও চতুষ্পার্শ্বের অন্যান্য দেশে উন্নত সভ্যতা তখন বর্তমান ছিল। কাজেই খৃষ্টের জন্মের পূর্বের তৃতীয় শতকে, যখন ভারতে ছিলেন অশোক, তখন আমেরিকায় সভ্য জনগণ বসবাস করত ও তারা সুসমঞ্জস সমাজের সৃষ্টি করেছিল, এ খুবই সম্ভব। কিন্তু সে সম্বন্ধে আমাদের হাতে কোনো প্রমাণ নেই এবং অনুমান করে বিশেষ ফল হবে না। আমি এগুলির উল্লেখ করছি, কারণ আমরা এইরকমই ভাবতে অভ্যস্ত যে, যেসব দেশের কথা আমরা শুনেছি ও পড়েছি, সভ্য লোক বুঝি কেবল পৃথিবীর সেইসব জায়গাতেই বাস করত। বহুদিন ধরে ইউরোপীয়দের ধারণা ছিল যে, প্রাচীন ইতিহাস বলতে কেবল গ্রীস, রোম আর ইহুদিদের ইতিহাসকেই বোঝায়। পৃথিবীর অন্যান্য অংশ তাদের মতে তখন ছিল জনমানবশূন্য। পরে তারা বুঝেছিল, কত সীমাবদ্ধ তাদের জ্ঞান, যখন তাদেরই পণ্ডিতবর্গ ও প্রত্নতাত্ত্বিকেরা তাদের শোনালেন চীন ভারত ও অন্য দেশের কাহিনী। কাজেই আমাদের সাবধান হওয়া প্রয়োজন; মনে রাখা উচিত যে, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটেছে বা ঘটছে সবই আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বর্তমানে আমরা বলতে পারি যে, অশোকের সময়ে, অর্থাৎ খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে, প্রাচীন সভ্য পৃথিবী প্রধানত ছিল ইউরোপের ও আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরোপকূলের দেশগুলি, পশ্চিম-এশিয়া, চীন ও ভারতবর্ষ নিয়ে। চীন তখন পশ্চিমের দেশগুলি, এমনকি, পশ্চিম-এশিয়া থেকেও প্রায় বিচ্ছিন্নই ছিল এবং তখন চীন বা ক্যাথে সম্বন্ধে পাশ্চাত্যে বহু অদ্ভূত ধারণার উদ্ভব হয়েছিল। পশ্চিমের সঙ্গে চীনের যোগসূত্র ছিল বোধহয় ভারতবর্ষ।
আগেই দেখেছি আলেকজাণ্ডারের মৃত্যুর পর তাঁর সেনাধ্যক্ষরা তাঁর সাম্রাজ্য ভাগ করে নিয়েছিলেন। তিনটি প্রধান বিভাগ ছিল তার: (১) সেলিউকস-কবলিত পশ্চিম এশিয়া, পারশ্য ও মেসোপটেমিয়া; (২) টলেমির অধীন মিশর; (৩) অ্যাণ্টিগোনাস-অধিকৃত মাসিডোনিয়া। প্রথম দুটি বহুদিন টিঁকে ছিল। তোমার মনে আছে, সেলিউকস ছিলেন ভারতের লোভী প্রতিবেশী, তিনি চেয়েছিলেন ভারতের একটি খণ্ড নিজের সাম্রাজ্যের অন্তর্গত করে নিতে। কিন্তু চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন তাঁর অজেয় প্রতিদ্বন্দী, তিনি সেলিউকসকে হটিয়ে দিলেন, আফগানিস্থানের একাংশ কেড়েও নিলেন তাঁর কাছ থেকে।
মাসিডোনিয়ার ভাগ্য আরও খারাপ। উত্তরদিক থেকে গল্ ও অন্যান্য জাতিরা এসে তাকে কেড়ে নিল, একটি ক্ষুদ্র অংশ কেবল গল্দের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা বজায় রাখতে
পারল। সেটি হচ্ছে এশিয়া-মাইনরে পার্গামম, আজ যেখানে তুরস্কের অবস্থান। সে একটি ছোট্ট গ্রীক রাজা, কিন্তু এক শো বছর ধরে গ্রীক শিল্পসভ্যতার নিবাস সেখানেই ছিল, সেখানেই গড়ে উঠেছিল বিরাট প্রাসাদ, গ্রন্থাগার ও যাদুঘর। একদিক দিয়ে সে ছিল সাগরপারের আলেকজান্দ্রিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী।
মিশরে টলেমিদের রাজধানী ছিল আলেকজান্দ্রিয়া। প্রাচীন পৃথিবীর খুব প্রসিদ্ধ নগর হয়ে উঠেছিল সেটি। এথেন্সের মহিমা বহুলপরিমাণে তখন খর্ব হয়েছে, তখন আলেকজান্দ্রিয়াই হল গ্রীক সভ্যতার কেন্দ্র। প্রাচীন পৃথিবীর পণ্ডিতদের মন তখন দর্শন, গণিত, ধর্ম ও অন্যান্য শাস্ত্রে পূর্ণ ছিল। যেসব ছাত্রেরা এই নিয়ে আলোচনা করত, আলেকজান্দ্রিয়ার বিশাল গ্রন্থভবন ও যাদুঘর ছিল তাঁদের লোভনীয়। ইউক্লিড, যাঁর কথা সব ছেলেমেয়েরা স্কুলে শুনেছে, তিনি ছিলেন আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসী ও অশোকের সমসাময়িক।
তুমি জানো, টলেমিরা ছিল গ্রীক; কিন্তু বহু মিশরীয় আচারব্যবহার তাদের মধ্যে এসে গিয়েছিল। মিশরের প্রাচীন দেবদেবীদেরও কেউ কেউ তাদের পূজা পেতেন। প্রাচীন গ্রীসের জুপিটার, অ্যাপোলো প্রভৃতি দেবতারা, যাঁদের কথা হোমর তাঁর মহাকাব্যে বহুবার বর্ণনা করেছেন—মহাভারতের বৈদিক দেবদেবীদের মতো, তাঁরা নূতন বেশে, নূতন নামে আবির্ভূত হলেন। প্রাচীন গ্রীসের ও প্রাচীন মিশরের আইসিস, ওসাইরিস, হোরাস প্রভৃতি দেবতাদের মধ্যে এক মিশ্রণ ঘটল, আর এই মিশ্রিত দেবতাদের খাড়া করা হল জনগণের সামনে পূজা করার জন্যে। যাকেই পূজা করা হোক-না, যে নামেই ডাকা হোক-না, যতক্ষণ পূজা করার মতো কিছু, আছে ততক্ষণ আর ভাবনা কী? এই নবনির্জরদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধি ‘সেরাপিস’দেবের।
আলেকজান্দ্রিয়া বাণিজ্যকেন্দ্রও ছিল এবং সভ্য পৃথিবীর অন্যান্য জায়গা থেকে বণিকেরা সেখানে আসত। আমরা শুনেছি, আলেকজান্দ্রিয়ায় একদল ভারতীয় বণিক থাকত এবং দক্ষিণভারতে মালাবার উপকূলে একদল আলেকজান্দ্রিয়ানিবাসী বণিকের বসত ছিল।
ভূমধ্যসাগরের পারে আলেকজান্দ্রিয়ার অদূরে রোম তখন বড়ো হয়ে উঠেছে, আরও বড়ো ও শক্তিশালী হবার চেষ্টায় আছে। আফ্রিকার কূলে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে কার্থেজ, তার প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু। প্রাচীন পৃথিবীর সম্বন্ধে ধারণা জন্মাতে হলে তাদের কাহিনীও কিছুটা আলোচনা করতে হবে।
প্রাচ্যে তখন চীন হয়ে উঠছিল রোমের সমান; অশোকের সময়কার পৃথিবীর ছবি আঁকবার জন্যে তারও আলোচনা আমাদের করতে হবে।