বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপে বিভিন্ন ভাবধারার বিরোধ

উইকিসংকলন থেকে

৯৫

অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপে বিভিন্ন ভাবধারার বিরোধ

১৯শে সেপ্টেম্বর, ১৯৩২

 এবার ইউরোপে ফিরে গিয়ে সেখানকার পরিবর্তনশীল নিয়তির অনুসরণ করা যাক। যে বিরাট পরিবর্তন পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় অমোঘ ছাপ রেখে গেছে, ইউরোপ এখন সেইসব পরিবর্তনের উপক্রমণিকায় এসে উপস্থিত হয়েছে। এসব পরিবর্তন উপলব্ধি করতে হলে বাইরের আবরণের ভিতরে যা ঘটছে তাই দেখতে হবে, আর মানুষের মনের মধ্যে কী আছে তা অনুভব করতে হবে। কারণ, কাজ আর কিছুই না, চিন্তা এবং মনোবৃত্তি, কুসংস্কার, আশা, ভয়, সব জিনিষের জটিল সংমিশ্রণে এর উৎপত্তি। আর, শুধু কাজের দ্বারাই তার স্বরূপ উপলদ্ধি করা যায় না; জানা চাই কী কারণে সে কাজের শুরু হল। কিন্তু সে খুব সহজ কথা নয়; যদি আমি এইসব কারণ আর উদ্দেশ্য, যার থেকে ইতিহাসের স্মরণীয় ঘটনাবলীর সৃষ্টি হয়, তার সম্বন্ধে বিজ্ঞভাবে লিখতে পারতাম, তা হলেও অকারণে এই চিঠিগুলোকে দুষ্পাচ্য এবং একঘেয়ে করতে দ্বিধা করতাম। সম্ভবত সময়ে সময়ে কোনো-এক বিশেষ বিষয় অথবা দৃষ্টিভঙ্গির সম্বন্ধে উৎসাহবশত আমি আত্মবিস্মৃত হয়ে যা বলতে চাই তার চেয়ে বেশি বলে ফেলি। তোমার অবশ্য এসব সহ্য করতে হবে। যাই হোক, এ বিষয়ে আর গভীরভাবে বলবার চেষ্টা করব না। কিন্তু সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেলেও নির্বুদ্ধিতা হবে। যদি এড়িয়ে যাই তা হলে ইতিহাসের আকর্ষণকারী এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলিই হারাব।

 ষোড়শ শতাব্দীতে এবং সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপের গোলযোগ এবং অশান্তি সবন্ধে আলোচনা করেছি। সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ওয়েস্টফ্যালিয়ার সন্ধিতে (১৬৪৮) ত্রিশ-বর্ষব্যাপী ভীষণ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। পরের বছর ইংলণ্ডে গৃহযুদ্ধ শেষ হয় এবং প্রথম চার্ল্‌সের প্রাণদণ্ড হয়। এর পরে কিছুদিন অপেক্ষাকৃত শান্তিতে কাটে। ইউরোপ মহাদেশ শ্রান্তিতে অবসন্ন হয়ে পড়েছিল। আমেরিকার উপনিবেশসমূহ এবং অন্যসব জায়গার সঙ্গে বাণিজ্যের ফলে ইউরোপে অর্থাগম হতে লাগল এবং দুরবস্থার খানিকটা নিরসন হল; শ্রেণী-বিরোধটাও একটু নরম হল।

 ইংলণ্ডে শান্তিপূর্ণ বিপ্লব এল, যার ফলে দ্বিতীয় জেম্‌সের বিতাড়ন এবং পার্লামেণ্টের জন্ম ঘটল (১৬৮৮)। প্রথম চার্ল্‌সের বিরুদ্ধে যুদ্ধেই পার্লামেণ্টের প্রকৃত জন্ম হয়েছিল। এই শান্তিপূর্ণ বিপ্লবে শুধু চল্লিশ বছর আগেকার বাহুবলে উপনীত সিদ্ধান্তের পাকাপাকি গ্রহণ ঘটল মাত্র।

 এইরূপে ইংলণ্ডে রাজার ক্ষমতা কমে গেল, কিন্তু ইউরোপ মহাদেশে সুইজারল্যাণ্ড, হল্যাণ্ড প্রভৃতি দু-একটা ছোটো ছোটো স্থান ছাড়া সর্বত্রই এর বিপরীত ছিল। ইউরোপে তখনও সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাতন্ত্রী রাজার রীতিই ছিল এবং ফ্রান্সের গ্র্যাণ্ড্ মনার্ক চতুর্দশ লুই ছিলেন অন্যদের বরণীয় এবং অনুসরণীয় আদর্শ। ইউরোপে সপ্তদশ শতাব্দী ছিল বলতে গেলে চতুর্দশ লুইয়ের শতাব্দী। ইংলণ্ডের প্রথম চার্লসের দৃষ্টান্ত দেখেও নিজেদের ভয়াবহ ভবিষ্যতের প্রতি দৃষ্টিপাত না করে ইউরোপের রাজারা চরম নির্বুদ্ধিতার সঙ্গে সেচ্ছাচারের পথে চললেন। তাঁদের দাবি ছিল দেশের সমস্ত ধন এবং ক্ষমতার উপরে, আর তাঁদের দেশ ছিল প্রায় তাঁদের নিজ ভূসম্পত্তির মতো। চার শো বছরেরও বেশি আগে বিখ্যাত ওলন্দাজ পণ্ডিত ইরাস্‌মুস্ লিখেছিলেন:

 “অন্যসব পাখির মধ্যে একমাত্র ঈগলই জ্ঞানীব্যক্তিদের কাছে নরপতির আদর্শ। সুন্দর নয়, গান গাইতে পারে না, খাদ্য নয়; শুধু মাংসাশী, লোভী, সকলের ঘৃর্ণিত, সকলের কাছে অভিশাপের মতো, এবং অন্যায় আচরণের সমস্ত শক্তি থাকার ফলে সেই আচরণের ইচ্ছায় পরিপূর্ণ।”

 এ যুগে রাজা প্রায় নেই; যারা আছে তারাও অতীত যুগের একটা টুকরো মাত্র, কোনো ক্ষমতা নেই তাদের। আমরা তাদের তুচ্ছ করতে পারি। কিন্তু তাদের জায়গায় এসেছে অন্যেরা, তাদের চেয়ে ঢের বেশি ভয়ানক; এবং ঈগল পাখি এখনও এ যুগের লোহা তেল সোনা রুপোর রাজা এবং সাম্রাজ্যবাদীদের উপযুক্ত প্রতীক।

 ইউরোপের রাজশাসিত রাষ্ট্রসমূহ প্রবল কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। সামন্ততান্ত্রিক যুগের মালিক এবং সামন্তের ধারণা লোপ পাচ্ছিল। দেশকে সম্পূর্ণ একক ভাবে দেখার আদর্শ আস্তে আস্তে সেই স্থান অধিকার করছিল। রিশেলিউ ও মাজারিন-নামক দুজন প্রতিভাশালী মন্ত্রীর প্রভাবে ফ্রান্স এই পরিবর্তনের নেতৃস্থান গ্রহণ করেছিল। এমনি করে জাতীয়তা এবং অল্প পরিমাণে দেশপ্রেম বৃদ্ধি পেল। এতদিন ধর্মই ছিল মানুষের জীবনের সবচেরে প্রধান জিনিষ এখন তা পিছু হটে গেল, তার স্থান অধিকার করল নূতন নূতন ভাবধারা, যার সম্বন্ধে আমি পরে কিছু বলব।

 সপ্তদশ শতাব্দীতে এর চেয়েও উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল বর্তমান বিজ্ঞানের ভিত্তিস্থাপন, এবং দেশের উৎপন্ন মাল সারা পৃথিবীতে বিক্রয়ের বন্দোবস্ত। এই বিরাট নূতন বিক্রয়স্থল স্বতঃই ইউরোপের পুরোনো অর্থনীতি উল্টে দিল, এবং পরবর্তীকালে ইউরোপ এশিয়া ও আমেরিকায় যা ঘটেছিল তা বুঝতে হলে এই নূতন বিক্রয়স্থলের কথা স্মরণ রাখতে হবে। বিজ্ঞানের উন্নতি হল পরে, এবং তার সাহায্যে সারা পৃথিবীর বিক্রয়স্থলের মালের অভাব মোচনের উপায় ঘটল।

 অষ্টাদশ শতাব্দীতে উপনিবেশ ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, বিশেষ করে ইংলণ্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে, শুধু ইউরোপে নয়, কানাডা ও ভারতেও যুদ্ধ ঘটেছিল। শতাব্দীর মধ্যভাগে এইসব যুদ্ধের পরে পুনরায় কিছুদিনের জন্যে অপেক্ষাকৃত শান্তভাব দেখা দিল। ইউরোপের উপরিতলা ছিল শান্ত এবং আপাতদৃষ্টিতে তরঙ্গহীন। ইউরোপের অসংখ্য রাজসভা অতি অমায়িক এবং মার্জিত ভদ্রমহোদর ও মহোদয়াগণে পূর্ণ ছিল। কিন্তু এ শান্তভাব শুধু বাইরের। ভিতরে ছিল ঝড় এবং মানুষের মন আন্দোলিত হচ্ছিল নূতন ধারণা ও ভাবধারায়। এবং ক্রমবর্ধিষ্ণু দারিদ্র্য-বশত কেবল রাজসভায় মায়ামঞ্চ এবং উচ্চশ্রেণীর কেউ কেউ ছাড়া মানষের দেহ ক্রমে ক্রমে দুর্দশার নিষ্পেষণে পিষ্ট হচ্ছিল। ইউরোপে অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের শান্তভাব প্রকৃত অবস্থার সূচক ছিল না। এ ছিল শুধু ঝড়ের আগের শান্তভাব। ১৭৮৯ সালের ১৪ই জুলাই ইউরোপের রাজতন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো অধিপতির রাজধানী প্যারিসে ঝড় দেখা দিল। এর ঝাপ্‌টায় রাজতন্ত্র এবং সেইসঙ্গে বহু প্রাচীন কীটদষ্ট রীতিনীতি নিশ্চিহ্ন করে নিয়ে গেল।

 এই ঝড় এবং পরবর্তী পরিবর্তন ফ্রান্সে এবং অংশত ইউরোপের অন্যান্য দেশেও বহুকাল ধরে নূতন ভাবধারার সাহায্যে তৈরী হয়েছিল। সারা মধ্যযুগ ধরে ইউরোপে কর্মই ছিল সবচেয়ে বড়ো জিনিষ। এমনকি পরেও, অর্থাৎ সংস্কারের যুগে, ধর্মই ছিল সব। রাজনৈতিক অথবা অর্থনৈতিক, সব প্রশ্নেরই বিবেচনা হত ধর্মের দিক দিয়ে, ধর্ম জিনিষটাকে এমন করে তৈরি করে নেওয়া হয়েছিল যে পোপ অথবা খৃষ্টধর্মের বড়োকর্তাদের মতামতই ছিল ধর্ম। সমাজের সংগঠন ছিল অনেকটা ভারতবর্ষের জাতিভেদের মতো। মূলে জাতিভেদের অর্থ ছিল পেশা বা কর্ম-ভেদে সমাজের বিভাগ। এই বৃত্তিভেদে সামাজিক শ্রেণী-বিভাগই ছিল মধ্যযুগের সামাজিক আদর্শ। একই শ্রেণীর ভিতরে, যেমন ভারতে একই জাতির ভিতরে, সাম্য ছিল। কিন্তু দুই অথবা ততোধিক শ্রেণীর মধ্যে বৈষম্য ছিল। এই বৈষম্য সমাজবিধির মূলে ছিল, কিন্তু কেউ তাতে আপত্তি জানাত না। এই প্রথায় যাদের দুরবস্থা ঘটত তাদের বলা হত, তারা স্বর্গে পুরস্কারের প্রত্যাশা করতে পারে। এই উপায়ে ধর্ম এই অন্যায় সামাজিক শ্রেণী-বিভাগের সমর্থন করত এবং পরলোকের কথা তুলে ইইলোকের চিন্তা থেকে মানুষকে অন্যমনস্ক করার চেষ্টা করত। এই প্রথা আর-একটি মতবাদের সৃষ্টি করেছিল—‘গচ্ছিত-রক্ষা’। অর্থাৎ ধনীরা ছিলেন দরিদ্রের একরকম গচ্ছিত-রক্ষা-কর্তা। ভূম্যধিকারীর কাছে প্রজার জমি ‘গচ্ছিত’ থাকত। ধর্ম এমনি করে একটা কঠিন পরিস্থিতির সমাধান করতে চেষ্টা করেছিল। ধনীর এতে কিছু এসে-যেত না, দরিদ্রেরও কোনো সান্ত্বনা ছিল না। চাতুরী করে নূতন ধরনের ব্যাখ্যা করলেই তাতে নিরন্নের অন্নের সংস্থান হয় না।

 ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যাণ্টদের তীব্র ধর্ম সংগ্রাম, ক্যাথলিক ও কালভিনিস্ট উভয় সম্প্রদায়ের ধর্ম-অসহিষ্ণুতা, সব মিলিয়ে একটা অসহ্য ধর্মসংক্রান্ত এবং সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এনেছিল। ভেবে দেখো। ইউরোপে, বিশেষ করে পিউরিটানদের হাতে, লক্ষ লক্ষ স্ত্রীলোক ডাকিনী-অপবাদে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা পড়েছিল। বিজ্ঞানের নূতন মতবাদ বন্ধ করে দেওয়া হত; কারণ, সেসব নাকি, চার্চের প্রচলিত সংস্কারের বিরোধী। এ হল জীবনের নিশ্চল অবস্থা, উন্নতির কোনো প্রশ্ন এ অবস্থায় উঠতে পারে না।

 ষোড়শ শতাব্দী থেকে ধীরে ধীরে এসব ধারণার পরিবর্তন ঘটতে থাকে; বিজ্ঞানের প্রথম আগমন হয় এবং ধর্মের সর্বভূতে অধিকার কমে যায়। রাজনীতি এবং অর্থনীতির বিচার হয় ধর্মকে বাদ দিয়ে। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তিবাদের অভ্যুদয় হয়, অর্থাৎ অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে বিচারের ব্যবহার। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পরমতসহিষ্ণুতার প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল বলা হয়। অংশত কথাটা সত্য। কিন্তু এই জয়ের আসল অর্থ হল মানুষ আর পূর্বের মতো ধর্মে অত গুরুত্ব আরোপ করত না। পরমতসহিষ্ণুতার সঙ্গে নিস্পৃহ ভাবের অল্পই প্রভেদ। কোনো বিষয়ে যখন মানুষের তীব্র নিষ্ঠা থাকে তখন তারা বড়ো-একটা তার বিরোধী মত সহ্য করতে পারে না। যখন সে বিষয়ে তার আসত্তি কমে যায়, সে উদারভাবে ঘোষণা করে যে, সে পরমত সম্পর্কে পরম সহিষ্ণু। ব্যবহারিক শিল্প ও বস্ত্রযুগের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ধর্ম সম্বন্ধে অনাসক্তি আরও বাড়ল। বিজ্ঞান ইউরোপের প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি টলিয়ে দিল। নূতন শিল্প এবং অর্থনীতির উদ্ভবে নূতন নূতন সমস্যা মানুষের চিন্তা আচ্ছন্ন করে থাকল। ফলে ইউরোপের লোকেরা ধর্মসংক্রান্ত বিশ্বাস বা মতবাদ নিয়ে পরস্পরের মাথাভাঙা অভ্যাস ত্যাগ করল (অবশ্য পুরোপুরিভাবে নয়)। তার পরিবর্তে তারা অর্থনৈতিক এবং সমাজনৈতিক কলহে মাথাভাঙা আরম্ভ করল।

 ইউরোপের এই ধর্মযুগের সঙ্গে বর্তমান ভারতের তুলনামূলক আলোচনা শিক্ষাপ্রদ কৌতূহলজনক। ভারতবর্ষকে অনেক সময়ে, কখনও-বা প্রশংসা আবার কখনও-বা বিদ্রূপের ছলে বলা হয়, ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক দেশ। ইউরোপের সঙ্গে এর তুলনা করে দেখানো হয় যে, ইউরোপ ধর্মহীন দেশ, এবং ইহলোকের বিলাসিতায় মগ্ন। প্রকৃতপক্ষে ‘ধার্মিক’ ভারত আর ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপের মধ্যে আশ্চর্য মিল পাওয়া যায়। অবশ্য এ তুলনামূলক সাদৃশ্য বেশি দূর টেনে নেওয়া চলে না। কিন্তু একটা জিনিষ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কারে অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ, বিভিন্ন ধর্মানুবর্তীদের স্বার্থের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মিশ্রণ, সাম্প্রদায়িক কলহ এবং মধ্যযুগের ইউরোপে আর যেসব সমস্যা ছিল তার অনুরূপ সমস্যা আমাদের দেশেও বর্তমান। আসল প্রভেদ বস্তুতান্ত্রিক পশ্চিম এবং আধ্যাত্মিক ও ধর্মপ্রাণ পূর্বের মধ্যে নয়। আসল প্রভেদ, আধুনিক যন্ত্রযুগের ভালো এবং মন্দ নিয়ে গড়া কর্মকুশল পশ্চিম এবং প্রাক্-শিল্প-যুগের কৃষিজীবী পূর্বের মধ্যে।

 ইউরোপের এই পরমতসহিষ্ণুতা এবং যুক্তিবাদ জন্মেছিল ধীরে ধীরে। পুস্তকের সাহাযে খুব বেশি এর প্রসার হয় নি, কারণ প্রকাশ্যভাবে খৃষ্টধর্মের সমালোচনা করতে লোকে ভরা পেত, করলে কারাদণ্ড বা অন্য কোনো দণ্ডভোগ করতে হত। কন্‌ফুসিয়স্‌কে অতিরিক্ত প্রশংসা করার অপরাধে একজন জর্মন দার্শনিককে প্রাশিয়া থেকে নির্বাসিত করা হয়। এই প্রশংসার অর্থ করা হয় যে, এটা খৃস্টধর্মের নিন্দা। অষ্টাদশ শতাব্দীতে অধিকসংখ্যক লোকের মনে যখন এসব ধারণা পরিষ্কার হয়ে এল তখন এসব বিষয়ে বই বের হতে শরু হল। যুক্তিবাদ এবং অন্যান্য বিষয় সম্বন্ধে সবচেয়ে বিখ্যাত লেখক ছিলেন ভল্‌টেয়ার নামক একজন ফরাসি; কারাবাস ও নির্বাসনদণ্ড ভোগ করে অবশেষে তিনি জেনেভার কাছে ফার্নিতে বসবাস আরম্ভ করেন। কারাদণ্ডকালে তাঁকে কাগজ অথবা কালি দেওয়া হয় নি। অগত্যা তিনি সীসের টুকরোর সাহায্যে বইয়ের ছত্রগুলির মধ্যের ফাঁকা জায়গায় কবিতা রচনা করতেন। খুব অল্প বয়সেই তিনি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁর অসাধারণ শক্তি লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভল্‌টেয়ার অবিচার ও বেচ্ছাচারের বিরোধী ছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। তাঁর বিখ্যাত বাণী ছিল—Ecrasez Pinfame (কুসংস্কারের আবর্জনা দূর করো)। তিনি বহুকাল বেঁচেছিলেন (১৬৯৪-১৭৭৮) এবং অসংখ্য বই লিখেছিলেন। তাঁর খৃষ্টধর্মের বিরদ্ধে সমালোচনার জন্যে গোঁড়া খৃষ্টানরা তাঁকে বিদ্বেষের চোখে দেখতেন। তাঁর একটা বইতে তিনি লিখেছিলেন, “যে ব্যক্তি বিনা পরীক্ষায় তার ধর্ম স্বীকার করে নেয় সে সেই ষাঁড়ের মতো, যে ঘাড়ে জোয়াল চাপালে আপত্তি করে না।” ভল্‌টেয়ারের রচনায় প্রভাবাম্বিত মানুষের মন যুক্তিবাদ এবং নূতন চিন্তাধারার দিকে ঝুঁকেছিল। ফার্নি শহরে তাঁর পুরোনো বাড়ি এখনও অনেকের কাছে তীর্থস্থান।

 ভল্‌টেয়ারের সমসাময়িক, তবে তাঁর চেয়ে বয়সে ছোটো, আর-একজন বড়ো লেখক ছিলেন ঝাঁ-ঝাক্-রুশো। তাঁর জম্মস্থান ছিল জেনেভা, এবং জেনেভা সেইজন্যে গৌরবান্বিত। সেখানে তাঁর প্রতিমূর্তি দেখেছ, মনে আছে? ধর্ম ও রাজনীতি সম্বন্ধে রুশোর লেখায় তুমুল হৈচৈ উঠেছিল। সে যাই হোক, তাঁর নূতন ধরনের নির্ভীক, সামাজিক ও রাজনৈতিক মতবাদ অনেকের মনে নূতন চিন্তাধারা, নূতন আদর্শের আলো জ্বেলেছিল। তাঁর রাজনৈতিক মতবাদ এখন পুরোনো হয়ে গেছে, কিন্তু বিপ্লবের জন্যে ফ্রান্সের জনসাধারণকে তৈরি করতে তাদের ভূমিকা কম ছিল না। রুশো বিপ্লবের মত প্রচার করেন নি, হয়তো-বা বিপ্লবের প্রত্যাশাও করেন নি। কিন্তু নিঃসন্দেহ তাঁর লেখা মানুষের মনে যে বীজ বপন করেছিল, তারই পরিণতি হয়েছিল বিপ্লবে। তাঁর সর্বাধিক খ্যাত বই হচ্ছে Du Contrat Social অর্থাৎ সামাজিক চুক্তি। এই বইয়ের আরম্ভ হচ্ছে একটি বিখ্যাত ছত্র দিয়ে “মানুষ জন্মায় স্বাধীন, কিন্তু সর্বত্রই আছে শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায়।”

 রুশো একজন বড়ো শিক্ষাবিদও ছিলেন এবং তিনি শিক্ষাদানের যেসব নূতন পদ্ধতির সন্ধান দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অনেকগুলো এখন স্কুলে স্কুলে ব্যবহৃত হয়।

 ভল্‌টেয়ার ও রুশো ছাড়া অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে তারও অনেক যশস্বী চিন্তাবীর এবং লেখক ছিলেন। আমি আর মাত্র একজনের নাম করব—মঁতেস্কিউ—যাঁর লেখা অনেক বাইরের মধ্যে একখানা হচ্ছে Esprit des Lois। এই সময়ে প্যারিসে একখানা বিশ্বকোষও প্রকাশিত হয়, তাতে দিদেরো এবং আরও অনেক দক্ষ লেখকদের রাজনৈতিক ও সমাজনৈতিক বিষয়ে রচনা বের হয়। ফ্রান্সে এ সময়ে বহু দার্শনিক ছিলেন, তাঁদের রচনার বহুল প্রচার ছিল এবং তাঁরা বহুসংখ্যক সাধারণ লোকের মনে তাঁদের চিন্তাধারা বপন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এইরূপে ফ্রান্সে একটি শক্তিশালী মতবাদের দল গড়ে উঠল, ধারা পরধর্ম-অসহিষ্ণুতা এবং রাজনৈতিক ও সমাজনৈতিক বিশেষ অধিকারের বিরোধী ছিল। স্বাধীনতার একটা অস্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা লোকের চিত্ত অধিকার করল। কিন্তু মজা এই, দার্শনিক অথবা জনসাধারণ, কেউই তখনও রাজার অপসারণের কথা ভাবে নি। সাধারণতন্ত্রের ধারণা তখন প্রচলিত ছিল না, এবং লোকে তখনও আশা করত, হয়তো তারা একজন আদর্শ রাজা পাবে, অনেকটা প্লেটোর দার্শনিক রাজার মতো, যে তাদের সব দুর্দশার দূরীকরণ করবে এবং তাদের সুবিচার ও খানিকটা স্বাধীনতা দেবে। অন্তত এই ছিল দার্শনিকদের রচনার বিষয়বস্তু। কিন্তু জনসাধারণ রাজাকে কতটা ভালোবাসত সে বিষয়ে সন্দেহ জাগে।

 ইংলণ্ডে রাজনৈতিক চিন্তাধারার এত প্রসার ঘটে নি। কথায় বলে, ফরাসি রাজনৈতিক জন্তু, কিন্তু ইংরেজ তা নয়। এ ছাড়া ১৬৮৮ সালের বিপ্লবের ফলে ইংলণ্ডে সমস্যার খানিকটা লাঘব হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও শ্রেণীবিশেষের অনেক বিশেষ অধিকার বর্তমান ছিল। নূতন অর্থনৈতিক প্রসারণ, আমেরিকা ও ভারতে ব্যবসায় ও অন্যান্য হাঙ্গামায় ইংরেজের মন অন্য দিকে ব্যস্ত ছিল। এবং যখন সামাজিক অসন্তোষ বেড়ে গেল, সাময়িক আপোষ দিয়ে তাকে ঠাণ্ডা করে রাখা হল। ফ্রান্সে আপোষের কোনো উপায় ছিল না, ফলে বিপ্লব এল।

 অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ইংলণ্ডে আধুনিক উপন্যাসের উদ্ভব হয়। আগেই বলেছি, এই শতাব্দীর প্রারম্ভে ‘গালিভার্‌স্ ট্রাভল্‌স্’ এবং ‘রবিন্‌সন্ ক্রুশো’ প্রকাশিত হয়। তার পরে আরম্ভ হয় সত্যিকারের উপন্যাস। ইংলণ্ডে এই সময়ে জনসাধারণের মধ্যে নূতন পাঠকগোষ্ঠির আবির্ভাব হয়েছিল।

 এই অষ্টাদশ শতাব্দীতেই গিবন-নামক ইংরেজ তাঁর বিখ্যাত বই Decline and Fall of the Roman Empire (রোম সাম্রাজ্যের অধোগতি ও পতন) রচনা করেন। যে চিঠিতে আমি রোম সাম্রাজ্য সম্বন্ধে আলোচনা করেছি তাতে তাঁর কথাও আগেই বলেছি।