বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/আকবর
৮৯
আকবর
৪ঠা সেপ্টেম্বর, ১৯৩২
বাবর তাঁর সেনাপতিত্বে এবং সামরিক প্রতাপের সাহায্যে উত্তর-ভারতের একটি বড়ো অংশ অধিকার করেন। তিনি দিল্লির আফগান সুলতানকে পরাজিত করেন, এবং পরে আরও একটি কঠিনতর কাজ সম্পাদন করেন; সেটা হচ্ছে, রাজপুত-ইতিহাসের একজন বিখ্যাত বীর, পরমশক্তিমান যোদ্ধা রাণা সংগ্রামসিংহের নেতৃত্বে মিলিত রাজপুতদের বিরুদ্ধে তাঁর জয়লাভ। কিন্তু পুত্র হুমায়ুনকে তিনি বড়ো কঠিন কাজ দিয়ে গেলেন। হুমায়ুন শিক্ষিত এবং মার্জিত ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু বাপের মতো যোদ্ধা ছিলেন না। তাঁর নবলব্ধ সাম্রাজ্যের সর্বত্র গোলমাল বাধল, এবং ১৫৪০ সালে, বাবরের মৃত্যুর দশ বৎসর পরে, শের খাঁ নামে বিহারের একজন আফগান রাজা তাঁকে পরাজিত করে ভারত থেকে বিতাড়িত করলেন। এইরূপে মহা-মোগলবংশের দ্বিতীয় সম্রাট যাযাবরবৃত্তি-অবলম্বনে বাধ্য হলেন, তাঁর অদৃষ্টে জুটল নিরন্তর আত্মগোপন এবং বহুতর দুর্দশা। রাজপুতানার মরুভূমিতে এইরকম ভ্রমণের সময়ে ১৫৪২ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর পত্নী একটি পুত্র প্রসব করলেন। এই ছেলের মরভূমিতে জন্ম হলেও কালে ইনি সম্রাট আকবর নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন।
হুমায়ুন পারশ্যে পলায়ন করে সেখানকার শাহ্ তামাস্প-এর আশ্রয় গ্রহণ করলেন। ইতিমধ্যে উত্তর-ভারতে শের খাঁর অবিসংবাদী প্রাধান্য ঘটল এবং তিনি পাঁচ বছর শের শাহ নাম নিয়ে রাজত্ব করলেন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর কর্মতৎপরতার অনেক নিদর্শন দিয়েছিলেন। সংগঠন-কার্যে তাঁর শক্তি ছিল অসাধারণ, এবং তাঁর শাসনবিধি ছিল কর্মঠ ও নিপুণ। যুদ্ধের মধ্যেই তিনি কৃষিজীবীদের দেয় কর নির্ধারণের জন্যে উন্নততর ভূমিরাজস্বববিধির প্রবর্তন করার সময় পেয়েছিলেন। তিনি মানুষ হিসেবে ছিলেন নির্মম ও কঠিন, কিন্তু ভারতের যাবতীয় আফগান-অধিপতির মধ্যে এবং অন্য অনেকের চেয়েও তিনি ছিলেন নিশ্চিতরূপে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু সচরাচর দক্ষ একনায়কতন্ত্রের ফলে যা হয়, তিনিই ছিলেন শাসনবিভাগের সর্বেসর্বা, ফলে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে রাজ্য ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
হুমায়ুন এই ভগ্নদশার সুযোগ নিয়ে ১৫৫৬ সালে সসৈন্যে পারশ্য থেকে ফিরে এলেন। তিনি জয়ী হলেন এবং দীর্ঘ ষোলো বছরের অবসানে পুনরায় দিল্লির সিংহাসনে বসলেন। কিন্তু বেশি দিনের জন্যে নয়; ছ মাস পরে তিনি সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মারা গেলেন।
শের শাহ্ এবং হুমায়ুনের সমাধি-মন্দিরের তুলনামূলক আলোচনা বেশ শিক্ষাপ্রদ। আফগান রাজার কবর বিহারে সাসারাম নামক স্থানে, আসল মানুষটির মতোই কঠোর শক্তিমান তার গঠন। হুমায়ুনের কবর দিল্লিতে; এটার গঠন সুদৃশ্য এবং শিল্পসঙ্গত। এই দুটি প্রস্তরগৃহ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর সাম্রাজ্যের দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর বেশ ভালো ধারণা করা যায়।
আকবরের বয়স সে সময়ে মাত্র তেরো। তাঁর পিতামহের মতো তিনিও সিংহাসন পেয়েছিলেন অল্প বয়সে। বৈরাম খাঁ, অথবা খাঁ-বাবা নামে তাঁর একজন অভিভাবক ও রক্ষক ছিল। কিন্তু বছরচারেকের মধ্যেই আকবর অন্য লোকের অভিভাবকত্বে অতিষ্ঠ হয়ে শাসনভার স্বহস্তে গ্রহণ করলেন।
১৫৫৬ সালের প্রারম্ভ থেকে ১৬০৫ সালের শেষ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ বছর আকবর ভারত শাসন করেছিলেন। এটা ছিল ইউরোপে নেদারল্যাণ্ড্সের বিদ্রোহ এবং ইংলণ্ডে শেক্সপীয়রের যুগ। আকবরের নাম ইতিহাসের পাতায় অনেকের উপরে, এবং কয়েক বিষয়ে তিনি অশোককে মনে করিয়ে দেন। আশ্চর্য এই যে, খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর ভারতের এক বৌদ্ধ সম্রাট এবং খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর একজন মুসলমান সম্রাট একই রকম ভাবে, এমনকি প্রায় একই স্বরে বাণী উচ্চারণ করতেন। কী জানি হয়তো বা এ হল ভারতের চিরন্তন বাণী, তাঁর দুই শ্রেষ্ঠ সন্তানের মুখে উচ্চারিত। অশোক সম্বন্ধে তিনি নিজে শিলালিপিতে যা রেখে গেছেন তা ছাড়া আমাদের জ্ঞান অল্প। আকবর সম্বন্ধে আমরা অনেক-কিছু জানি। তাঁর সভার দু’জন সমসাময়িক ঐতিহাসিক দীর্ঘ বিবরণ রেখে গেছেন, তা ছাড়া যেসব বৈদেশিকরা তাঁর কাছে আসতেন, বিশেষত যে জেসুইট্ পাদ্রীরা তাঁকে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা করেছিলেন, তাঁরাও অনেক কিছু লিখে গেছেন।
বাবর হইতে বংশপরম্পরায় তিনি ছিলেন তৃতীয়। কিন্তু মোগলরা তখনও দেশে নবাগত। তাদের তখনও বিদেশী হিসেবেই দেখা হত, এবং দেশে সামরিক শক্তি ছাড়া আর কোনো প্রভাব তাদের ছিল না। আকবরের রাজত্বকালই মোগল রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করল, এবং তাকে পরিপূর্ণ ভাবে সব বিষয়ে ভারতীয়ে পরিণত করল। তাঁর রাজত্বকালেই ইউরোপে ‘গ্রেট মোগল’ অথবা ‘মহামোগল’ কথাটার প্রথম উৎপত্তি হয়। তিনি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাতন্ত্রী ছিলেন এবং তাঁর ক্ষমতা ছিল অপ্রতিহত। সে সময়ে ভারতে রাজার ক্ষমতা প্রতিহত করার বাষ্পও ছিল না। যা হোক, আকবর ছিলেন জ্ঞানী একনায়কতন্ত্রী, এবং তিনি ভারতের জনসাধারণের মঙ্গলের জন্য বহুল পরিশ্রম করতেন। এক হিসেবে তাঁকে ভারতের জাতীয়তাবাদের জনক বলা যেতে পারে। যে সময় দেশে জাতীয়তাবোধ ছিল না বললেই হয়, এবং ধর্মই ছিল বিরোধের মূল, আকবর ইচ্ছে করেই ধর্মের বিভিন্নতার উপরে ভারতের জাতীয়তাবোধের আদর্শকে স্থান দিলেন। তিনি যে সম্পূর্ণ সফল হয়েছিলেন তা নয়, কিন্তু সেই সাফল্যের পথে যে দূরত্ব তিনি অতিক্রম করেছিলেন তা বিস্ময়কর।
তবু আকবরের সাফল্য তাঁর স্বকীয় প্রচেষ্টার বশেই হয় নি। কোনো মানুষ বড়ো কাজে কৃতকার্য হতে পারে না, যদি-না সময় এবং আবহাওয়া অনুকূল হয়। শক্তিশালী ব্যক্তি নিজেই আবহাওয়া তৈরি করে নিয়ে অনেক সময়েই দ্রুতগতিতে সাফল্য আনতে পারেন। কিন্তু সেই শক্তিশালী ব্যক্তি নিজেই হচ্ছেন যুগের সন্তান। সেইরকম আকবর ছিলেন ভারতের তৎকালীন যুগের পুত্র।
আগের এক চিঠিতে আমি লিখেছিলাম, কীরূপে বহু নিঃশব্দ শক্তি দুই সংস্কৃতি এবং ধর্মের সমন্বয় ঘটানোর জন্যে একত্র হয়ে ভারতে কাজ করেছিল। স্থাপত্যের নূতন ধারা, এবং ভারতীয় ভাষাসমূহ, বিশেষ করে উর্দু অথবা হিন্দুস্থানির উৎপত্তির কথা বলেছি। তা ছাড়া
বলেছি সংস্কারক ও ধর্মগুরুদের কথা—যেমন রামানন্দ, কবীর ও নানক—যাঁরা ইসলাম এবং হিন্দু ধর্মকে পরস্পরের কাছে টেনে আনতে চেষ্টা করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, দুই ধর্মের যা এক তাদের গ্রহণ এবং অনুষ্ঠান-উপচারের বর্জন। আকাশে বাতাসে এই সমন্বয়ের ভাব ঘুরে বেড়াচ্ছিল, আকবর তাঁর উদার মন দিয়ে এই ভাবকে গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি তিনিই ছিলেন এর প্রধান প্রবর্তক।
রাজনীতিজ্ঞ হিসেবেও তিনি নিশ্চয় এই তথ্যে উপনীত হয়েছিলেন যে, তাঁর বল এবং জাতির বল এই সমন্বয়ের মধ্যেই নিহিত আছে। যোদ্ধা হিসেবে তাঁর সাহসের অভাব ছিল না এবং তিনি নিপুণ সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। অশোকের মতো তাঁর কখনও যুদ্ধে অরুচি হয় নি। কিন্তু তিনি তরবারি-অর্জিত লাভের চেয়ে প্রীতি দিয়ে যা পাওয়া যায় তার বেশি পক্ষপাতী ছিলেন, এবং জানতেন যে, তা অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী। অতএব তিনি হিন্দু অভিজাতবর্গ এবং জনসাধারণের শুভেচ্ছা-লাভের জন্যে চেষ্টা করলেন। তিনি অমুসলমানদের উপরে ধার্য জিজিয়া কর এবং হিন্দু তীর্থযাত্রীর দেয় করের রহিত করলেন। তিনি এক উচ্চবংশীয় রাজপুত রমণীকে বিবাহ করলেন। পরে তাঁর ছেলেরও বিয়ে দিলেন এক রাজপুত রমণীর সঙ্গে। এবং এইরূপে সঙ্কর-বিবাহে তিনি উৎসাহ প্রদান করতে লাগলেন। রাজপুত-রাজন্যদের তিনি সাম্রাজ্যের উচ্চতম পদে নিযুক্ত করতে লাগলেন। তাঁর সেনাধ্যক্ষদের মধ্যে অনেক দুঃসাহসিক অধ্যক্ষ, সুদক্ষ মন্ত্রী এবং শাসনকর্তাদের অনেকে ছিলেন হিন্দু। এমনকি কিছু কালের জন্যে রাজা মানসিংহ কাবুলে শাসনকর্তারূপে প্রেরিত হয়েছিলেন। রাজপুত্র-রাজন্যবর্গ এবং হিন্দু জনসাধারণের সদ্ভাব-রক্ষণের জন্যে তিনি এতদূর অগ্রসর হতেন যে, মধ্যে মধ্যে মুসলমানদের উপর অবিচার করে বসতেন। কিন্তু তিনি হিন্দুদের শুভেচ্ছালাভে সমর্থ হয়েছিলেন, এবং রাজপুতরা তাঁর সেবা এবং সম্মান করার জন্যে এগিয়ে এসেছিল—কেবল একজন অদম্য ব্যক্তি ছাড়া, তিনি মেবারের রাণা প্রতাপসিংহ। রাণা প্রতাপ শুধু নামেও আকবরের বশ্যতা স্বীকার করতে আপত্তি জানালেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে, তিনি আকবরের সামন্তরূপে ভোগসুখ লাভের চেয়ে, বনে বনে ঘুরে বেড়ানোই শ্রেয় মনে করলেন। এই গর্বিত রাজপুত যোদ্ধা আজীবন দিল্লীশ্বরের বিরুদ্ধে লড়লেন, এবং কখনও বশ্যতা স্বীকারে রাজি হলেন না। তাঁর জীবনের শেষ দিকে তিনি কিছু কিছু সফলও হয়েছিলেন। এই মহান রাজপুত বীরের স্মৃতি রাজপুতানার অতি গৌরবের বস্তু, এবং তাঁকে কেন্দ্র করে বহু কাহিনী গড়ে উঠেছে।
আকবর রাজপুতদের প্রীতি এবং প্রজাদের কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করলেন। তিনি পার্শিদের এমনকি যেসমস্ত জেসুইট পাদ্রী তাঁর সভায় এসেছিল তাদেরও অনুগ্রহ করতেন। এই অনুগ্রহ-প্রদর্শন, এবং কতকগুলি মুসলমান অনুষ্ঠানের প্রতি অমনোযোগের ফলে তিনি মুসলমান ওম্রাহদের অপ্রিয় হয়ে পড়লেন, এবং তাঁর বিরুদ্ধে তারা বহুবার বিদ্রোহ করেছিল।
আমি অশোকের সঙ্গে তাঁর তুলনা করেছি, কিন্তু ভুল বুঝো না। অনেক বিষয়েই তাঁর অশোকের সঙ্গে অমিল ছিল। তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষারও শেষ ছিল না, এবং শেষজীবন পর্যন্ত তিনি ছিলেন রাজ্যজয়ী, সাম্রাজ্যের প্রসারের জন্যে ব্যগ্র। জেসুইট্রা লিখেছেন:
“তাঁর মন ছিল সদাজাগ্রত এবং বিচারশীল; তাঁর ভালোমন্দজ্ঞান ছিল গভীর, রাজকার্যে তিনি ছিলেন বিজ্ঞ, এবং সবার উপরে তিনি ছিলেন সদয়, অমায়িক এবং উদার। এইসব গুণের সঙ্গে তাঁর সেইরকম সাহস ছিল, যা বড়ো বড়ো কাজের ভার নিয়ে তা সম্পন্ন করতে পারে......তাঁর বহু বিষয়ে কৌতূহল ছিল, এবং শুধু-যে সামরিক এবং রাজনৈতিক ব্যাপারেই তাঁর ঘনিষ্ঠ জ্ঞান ছিল তা নয়, বহুবিধ যন্ত্রের ব্যবহারও তিনি জানতেন।...... সদয় ভাব এই রাজার দেহ থেকে ফুটে বের হত, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে আততায়ীকেও তিনি ক্ষমা করতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি প্রায় কোনো সময়েই মেজাজ গরম করতেন না। যদি কোনো কারণে তা হত তা হলে তাঁর জ্ঞান থাকত না; কিন্তু তাঁর ক্রোধ কখনোই বহুক্ষণ স্থায়ী হত না।”
মনে রেখো, এ কোনো সভাসদের লেখা বিবরণ নয়; এ হল ভিন্ন দেশের এক আগন্তুকের রচনা, যিনি আকবরকে পর্যবেক্ষণ করার অনেক সুযোগ পেয়েছিলেন।
আকবরের দৈহিক শক্তি এবং কর্মপটুতা ছিল অসাধারণ, এবং হিংস্র বন্য জন্তু শিকার করতে তিনি পরম আনন্দ পেতেন। সৈনিক হিসেবে তাঁর সাহস দুঃসাহসিকতার পর্যায়ে পড়ত। আগ্রা থেকে আহমদাবাদ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ নয় দিনে অতিক্রম করার গল্প থেকেই তাঁর প্রচণ্ড পরিশ্রম-ক্ষমতা বোঝা যায়। গুজরাটে বিদ্রোহ আরম্ভ হয়েছিল, তাই আকবর একটি ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী নিয়ে রাজপুতানার মরুভূমির মধ্য দিয়ে ৪৫০ মাইল পথ অতিক্রম করে সেখানে গিয়েছিলেন। এটা অসাধারণ বাহাদুরির কথা। মনে রাখতে হবে, তখন রেলওয়ে অথবা মোটরগাড়ি ছিল না।
কিন্তু প্রকৃত বড়ো লোকদের এসব ছাড়া অন্য কিছুও থাকে। লোকে বলে, তাঁদের একপ্রকার চুম্বকশক্তি থাকে যা লোককে আকর্ষণ করে। এই জিনিষটি আকবরের প্রচুর পরিমাণে ছিল। জেসুইট্দের চমৎকার বর্ণনায়—তাঁর দু চোখ ছিল “সূর্যালোকে সমুদ্রের মতো কম্পমান!” এই লোকটি যে এখনও আমাদের মুগ্ধ করেন, এবং তাঁর রাজোচিত পৌরুষপূর্ণ মূর্তি রাজা-নাম-ধারী অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে যে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, তাতে অবাক হবার কিছু নেই।
দেশজয়ী হিসেবে আকবর উত্তর-ভারতের সর্বত্র, এমনকি দক্ষিণ-ভারতেও কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। তাঁর সাম্রাজ্যে তিনি গুজরাট, বাংলা, উড়িষ্যা, কাশ্মীর এবং সিন্ধুদেশ যোগ করেন। মধ্য ও দক্ষিণ ভারতেও তিনি বিজয়ী হয়ে কর গ্রহণ করেছিলেন। মধ্য-ভারতের রানী দুর্গাবতীকে পরাজিত করার মধ্যে অবশ্য তাঁর কৃতিত্ব বিশেষ কিছু নেই। রানী ছিলেন বীরনারী এবং সুশাসিকা, এবং আকবরের কোনো ক্ষতি করেন নি। কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সাম্রাজ্যের অভিলাষের কাছে ওসব বাধা খুব গ্রাহ্য নয়। দক্ষিণ ভারতে তাঁর সৈনাবাহিনী আর একজন রমণীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল, ইনিই যশস্বিনী চাঁদবিবি, আহমদনগরের রাজমাতা। এই নারীর সাহস এবং কর্মক্ষমতা ছিল, এবং যুদ্ধে তাঁর পরাক্রম মোগল বাহিনীকে এত মুগ্ধ করেছিল যে, তিনি নিজের অনুকূলে শান্তির শর্ত পেলেন। দুর্ভাগ্যবশত পরে তিনি নিজেরই কয়েকজন অসন্তুষ্ট সৈনিকের হাতে নিহত হন।
আকবরের সেনাদল চিতোরও অবরুদ্ধ করেছিল। এ হল রাণা প্রতাপের পূর্ববর্তী কালে। জয়মল অতুল বীর্যের সঙ্গে চিতোর রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ভীষণ জহরব্রতের পুনরভিনয় ঘটল এবং চিতোরের পতন হল।
আকবর বহু নিপুণ অনুরক্ত সহকারীর সাহায্য পেয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন ফৈজি ও আবুল ফজল-নামক দুই ভাই এবং বীরবল—যাঁর সম্বন্ধে এখনও অসংখ্য গল্প প্রচলিত। তাঁর অর্থসচিব ছিলেন টোডরমল। সমস্ত রাজস্বরীতির তিনিই পুর্নগঠন করেন। তোমার হয়তো শুনে অদ্ভুত লাগবে যে, সে যুগে জমিদারি প্রথা অথবা জমিদার-তালুকদারের অস্তিত্ব ছিল না। রাষ্ট্রের সঙ্গে রায়তের ব্যক্তিগতভাবে কারবার চলত। এই প্রথার নাম ছিল রায়ৎয়ারি প্রথা। বর্তমান যুগের জমিদারেরা ব্রিটিশের সৃষ্টি।
জয়পুরের রাজা মানসিংহ আকবরের শ্রেষ্ঠ সেনাধ্যক্ষদের অন্যতম। আকবরের রাজসভার আর-একজন খ্যাতনামা ব্যক্তির নাম হল বিখ্যাত গায়ক তানসেন, যিনি পরবর্তী কালে ভারতের যাবতীয় গায়কের পূজ্য হয়েছেন।
আকবরের রাজত্বের আরম্ভে তাঁর রাজধানী ছিল আগ্রা, এবং সেখানেই তিনি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। তার পরে তিনি ফতেপুর সিক্রিতে নূতন শহর নির্মাণ করালেন; এ জায়গাটা আগ্রা থেকে প্রায় পনেরো মাইল দূরে। শেখ সেলিম চিস্তি নামে একজন মহাপুরুষ ফকির সেখানে থাকতেন বলে রাজধানীর জন্যে এই স্থান নির্বাচিত হয়েছিল। এখানে তিনি একটি মনোরম নগর নির্মাণ করালেন, যা সে যুগের ইংরেজ ভ্রমণকারীদের মতে “লণ্ডন থেকে অনেক বড়ো।” পনেরো বছর ধরে এখানেই তাঁর রাজধানী থাকল, তার পরে তিনি লাহোরে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। আকবরের বন্ধু ও মন্ত্রী আবুল ফজল বলেন, “সম্রাট চমৎকার চমৎকার বাড়ির পত্তন করেন এবং তাঁর মন ও হৃদয়ের কাজকে পাথর ও মাটির পোশাক পরান।” ফতেপুর সিক্রি, তার বিখ্যাত মসজিদ, বলদ দরবাজা ও আরও অনেক প্রাসাদ এখনও দাঁড়িয়ে আছে। এটা এখন জনমনুষ্যহীন শহর এবং কোথাও জীবনের চিহ্ন নেই। কিন্তু এক মৃত সাম্রাজ্যের প্রেতাত্মা যেন এখনও এর রাজপথ এবং প্রশস্ত প্রাঙ্গণ দিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
আমাদের বর্তমান এলাহাবাদ নগরও আকবর পত্তন করেছিলেন; অবশ্য এ শহরের অস্তিত্ব বহু প্রাচীনকাল থেকেই আছে, এবং রামায়ণের যুগেও প্রয়াগের অস্তিত্ব ছিল। এলাহাবাদের দুর্গ আকবর নির্মিত।
আকবরের জীবন ছিল রাজ্যজয় এবং বিশাল সাম্রাজ্যের সংগঠনে কর্মব্যস্ত। কিন্তু এই রাজ্যজয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর চরিত্রের আর-একটি লক্ষণ দৃষ্টিগোচর হয়। তা হল সত্যের অনুসন্ধানে তাঁর অপরিসীম কৌতূহল। যে-কেউ যে-কোনো বিষয় সম্বন্ধে কোনো জ্ঞাতব্য তথ্য বলতে পারত, আকবর তাঁকেই ডেকে পাঠিয়ে প্রশ্ন করতেন। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোকেরা তাঁর ইবাদতখানায় মিলিত হতেন, প্রত্যেকের মনেই আশা, তাঁকে নিজের ধর্মে নিয়ে আসবেন। অনেক সময়েই তাঁরা পরস্পরের সঙ্গো কলহ করতেন, এবং আকবর বসে শুনতেন, এবং মধ্যে মধ্যে তাঁদের তর্কের বিষয় সম্বন্ধে নানা প্রশ্ন করতেন। যতদূর মনে হয় তিনি স্থিরনিশ্চর হয়েছিলেন যে, সত্য কোনো ধর্ম অথবা সম্প্রদায়-বিশেষের একচেটিয়া নয়, এবং তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁর নীতি হল সকল ধর্মের সম্বন্ধে ঔদার্য।
তাঁর রাজত্বকালের একজন ঐতিহাসিক—বদাউনি—যিনি নিশ্চয় এসব তর্কসভায় যোগদান করতেন, আকবর সম্বন্ধে কৌতূহলজনক বর্ণনা দিয়েছেন; তার খানিকটা আমি উদ্ধৃত করে দিচ্ছি। বদাউনি নিজে ছিলেন গোঁড়া মুসলমান, এবং আকবরের কার্যকলাপ তীব্রভাবে অপছন্দ করতেন। তিনি লিখেছেন:
“সম্রাট সকলেরই, বিশেষ করে যারা মুসলমান নয় তাদের মতামত সংগ্রহ করে যা তাঁর পছন্দ তাই গ্রহণ করতেন, এবং যা-কিছু তাঁর খেয়ালের কাছে প্রীতিকর নয় তাই বর্জন করতেন। অতি শৈশবকাল থেকে যৌবন পর্যন্ত, এবং যৌবন থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত সম্রাট ধর্মবিষয়ে এবং ধর্মানুষ্ঠান বিষয়ে অসংখ্য মতামতের সংস্পর্শে এসেছেন, এবং কেতাবে যা পাওয়া যায় সবই সংগ্রহ করেছেন তাঁর নিজস্ব মনীষা দিয়ে, এবং তাঁর জিজ্ঞাসু মন দিয়ে, যা যাবতীয় ইসলামনীতির বিরুদ্ধে। এইরূপে তাঁর হদয়ের আরশিতে কতকগুলি ধর্মের প্রাথমিক নীতি প্রতিফলিত হয়ে এক নূতন ধর্মবিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়েছে, এবং সম্রাটের উপর বিস্তৃত যাবতীয় লোকের প্রভাবের ফলে তাঁর মনে ধীরে ধীরে এই ধারণাই গড়ে উঠেছে যে, সব ধর্মেই জ্ঞানী লোক আছে, চিন্তাশীল ব্যক্তি আছে, এবং সব জাতির মধ্যেই অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন লোক আছে। যদি এইরূপে সর্বত্রই কিছু কিছু সত্য জ্ঞান পাওয়া যায় তবে সত্য এক ধর্মে সীমাবদ্ধ থাকবে কেন ......”
তোমার বোধ হয় মনে আছে, এই যুগেই ইউরোপে ধর্মবিষয়ক ব্যাপারে অসাধারণ অসহিষ্ণুতা চলছিল। স্পেন, নেদারল্যাণ্ড্স্ এবং অন্যত্র ইন্কুইজিশন (ধর্মের নামে নির্যাতন) চলছিল, এবং ক্যাথলিক ও কাল্ভিনিস্ট উভয় পক্ষই ভাবত, অপরের ধর্মের প্রতি ঔদার্য-প্রদর্শন মহাপাপ।
বছরের পর বছর আকবর সকল ধর্মের পণ্ডিতদের সাথে তাঁর ধর্মবিষয়ক আলোচনা এবং তর্কাদি চালিয়ে গেলেন, এবং অবশেষে এইসব পণ্ডিতরা তাঁকে নিজ নিজ ধর্মমতে আনবার চেষ্টা ব্যর্থ বুঝে বিরক্ত হয়ে গেলেন। যখন সব ধর্মেই কিছু কিছু সত্য রয়েছে তখন তিনি এক ধর্ম আঁকড়ে ধরে থাকেন কী করে? জেসুইট্দের বিবরণ অনুসারে, তিনি নাকি বলেছিলেন, “হিন্দুরা তাদের ধর্মনীতি ভালো মনে করে; মসলমান ও খৃস্টানরাও নিজ নিজ ধর্ম উৎকৃষ্ট ভাবে। অতএব, কোন ধর্মের কাছে আত্মসমর্পণ করব?” আকবরের প্রশ্ন সম্পূর্ণ বিধিসঙ্গত, কিন্তু জেসুইট্ পাদ্রীরা বিরক্ত হয়ে লিখেছিলেন, “এই রাজার মধ্যে নাস্তিকের প্রধান দোষ বর্তমান, অর্থাৎ তিনি বিশ্বাসকে তর্কের উপরে স্থান দেন না; এবং তাঁর ক্ষীণবুদ্ধি মন দিয়ে যা বুঝতে পারেন না, তাকে বিনা বাক্যব্যয়ে সত্য বলে গ্রহণ করার পরিবর্তে যা মানুষের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানেরও অতীত সে বিষয়ে নিজের অসম্পূর্ণ বিচারবুদ্ধির উপর নির্ভর করেন।” এই যদি নাস্তিকের সংজ্ঞা হয় তবে এরকম নাস্তিক যত বেশি হয় ততই ভালো।
আকবরের লক্ষ্যবস্তু কী ছিল ঠিক বোঝা যায় না। তিনি কি সম্পূর্ণরূপে রাজনীতিবিষয়ে প্রশ্নটিকে গ্রহণ করেছিলেন? সর্বসাধারণগ্রাহ্য জাতীয়তাবাদের খাতিরে তিনি কি জোর করে সব ধর্মকে একই প্রণালীতে চালাতে চেয়েছিলেন? অথবা হয়তো তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সত্যধর্মের অনুসন্ধান? এ প্রশ্নের উত্তর জানি না। কিন্তু আমার মনে হয়, তাঁর ভূমিকা ছিল রাজনীতিকের, ধর্মসংস্কারকের নয়। তাঁর উদ্দেশ্য যাই হোক-না কেন, তিনি সত্যিই এক নূতন ধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন, যার নাম ‘দিন-ইলাহি’—এবং যার নেতা ছিলেন তিনি স্বয়ং। অন্য বিষয়ে যেমন, ধর্মেও তেমনি, তাঁর একনায়কত্ব ছিল অবিসংবাদী, এবং পদচুম্বন, সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত প্রভৃতি খেলো কতকগুলো জিনিষের উদ্ভব হয়েছিল। এ নূতন ধর্ম কারও মনে ধরল না। মাঝ থেকে মুসলমানদের মনে বিরক্তির উৎপাদন করল।
আকবর ছিলেন কর্তৃত্ববাদের প্রতীক। তবু জানতে কৌতূহল হয়, রাজনীতিতে উদারনৈতিকবাদের উপর তাঁর প্রতিক্রিয়া কেমন হত। যদি বিবেকের স্বাধীনতার অধিকার থাকে তবে জনসাধারণের বেশি রাজনৈতিক স্বাধীনতাই বা থাকবে না কেন? বিজ্ঞানের প্রতি যে তাঁর অনুরাগ জন্মাত সেটা নিঃসন্দেহ। দুর্ভাগ্যবশত, এইসব ভাবধারা তখন ইউরোপে কোনো কোনো লোকের মনে প্রভাব বিস্তার করলেও ভারতে তখন তার অস্তিত্ব ছিল না। তখন মুদ্রাযন্ত্রের ব্যবহারও প্রচলিত ছিল বলে মনে হয় না, ফলে শিক্ষা ছিল সীমাবদ্ধ। তুমি শুনে অবাক হবে, আকবর ছিলেন নিরক্ষর, লিখতেও জানতেন না, পড়তেও না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন উচ্চশিক্ষিত, এবং অপরকর্তৃক পুস্তক-পাঠ শুনতে ভালোবাসতেন। তাঁর আদেশে অনেক সংস্কৃত বই ফার্শিতে অনূদিত হয়েছিল।
তিনি হিন্দু-বিধবাদের সহমরণ-প্রথা এবং যুদ্ধবন্দীদের দাসত্ব-প্রথা আইন জারি করে বন্ধ করেছিলেন।
চৌষট্টি বছর বয়সে ১৬০৫ সালের অক্টোবর মাসে প্রায় পঞ্চাশ বছর রাজত্ব করার পর আকবর মারা গেলেন। আগ্রার কাছে সেকেন্দ্রায় এক রমণীয় সমাধিমন্দিরের নীচে তিনি সমাহিত আছেন।
আকবরের রাজত্বকালে উত্তর ভারতে কাশীতে একটি লোক ছিলেন, যাঁর নাম যুক্তপ্রদেশের প্রত্যেকটি গ্রামবাসী জানে। সেখানে তিনি আকবর অথবা যে-কোনো রাজার চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত, অনেক বেশি জনপ্রিয়। তাঁর নাম তুলসীদাস, যিনি হিন্দিতে রামচরিতমানস অথবা রামায়ণ রচনা করেছিলেন।